সায়রে গর্জন পর্ব ৩২
নীতি জাহিদ
জায়নামাজ থেকে উঠে হামজার দিকে তাকালো। সিস্টার মেরি সামনে দাঁড়িয়ে আছে। গত কয়েকদিন সেবা করতে করতে মায়ায় পড়ে গিয়েছে। ছেলের মতোই যত্ন করেছে শাহাদকে।শাহাদ হামজার দিকে তাকিয়ে বলল,
– বাইরে গিয়ে একটু রেস্ট নিবে। খাওয়া দাওয়া করবে। যা কিছু হোক ভেঙে পড়বে না। পৃথিবীতে শূন্য স্থান বলতে কিছু থাকেনা। ভালো থাকো।
হামজা ছলছলে চোখে বলে উঠলো,
– স্যার আপনি সুস্থ হয়ে যাবেন।
– ইনশাআল্লাহ।
শাহাদ হামজাকে জড়িয়ে ধরলো। হামজা আর থাকতে না পেরে হাউ মাউ করে কেঁদে দিলো জোরে। শাহাদকে আঁকড়ে ধরে বললো,
– স্যার আমি আপনাকে ছাড়া দেশে যাবোনা। আপনি না থাকলে কি হবে আমাদের। অপারেশন লাগবে না আপনি চলেন আমার সাথে। হুদাই ভোগাস কথাবার্তা বলে সবাই,কিচ্ছু হবেনা আপনার।
শাহাদ হামজার পাগলামী দেখে হাসছে। সিস্টার এসে হামজাকে বললো, শাহাদের সাথে অপারেশন থিয়েটার পর্যন্ত যেতে। শাহাদকে নিয়ে ডাক্তাররাও বেরিয়ে পড়লো। হঠাৎ শাহাদ থমকে গেলো। হামজার দিকে ফিরে বললো,
– আমার ব্যাগে একটা ডায়েরী আছে, ওটা ম্যাডামের হাতে দিও যদি না ফিরি।
এরপর চলে গেলো ভেতরে। হামজা দুহাতে মুখ ঢেকে ওটির বাইরে বসে গেলো। এই অপারেশন কখন শেষ হবে সেই অপেক্ষা। সবাইকে মেসেজ পাঠিয়ে দিয়েছে। কারো সাথে কথা বলার অবস্থাতে নেই।
হামজার মেসেজ পেয়ে স্তব্ধ দিয়া। দাঁড়িয়ে আছে আকাশের পানে চেয়ে। মনে পড়ে গেলো শাহাদের সেই কথা,
– ফারাহ আকাশটাকে দেখো।তারা গুলো জ্বলজ্বল করছে। হয়তো অন্য কোনো সন্ধ্যারাতে এভাবে বারান্দায় দাঁড়িয়ে তুমি শাহাদকে খুঁজবে দূর আকাশে।তখন আমাদের দূরত্ব হবে হাজার বছরের।যদি উত্তম কাজ করি তবে দেখা হবে জান্নাতে।
কেমন যেন অস্থির লাগছে নিজেকে। তাহি ছুটে এসেছে কিছুক্ষন আগে, লিমন ও এসেছে। ঘড়িতে রাত নয়টা। সিঙ্গাপুর সময় এগারোটা। প্রায় দু’ঘন্টার পার্থক্য। শাহাদের অপারেশন চলছে। তাহি হঠাৎ করে কাঁধে হাত রাখলো। দিয়া ঘাড় ঘুরিয়ে তাহিকে দেখে আবার আকাশের দিকে তাকিয়ে বললো,
– আপু, আপনার ভাই আকাশ খুব পছন্দ করতো। আকাশের বিশালতা নাকি তাকে খুব টানতো। একটা জিনিস লক্ষ্য করেছেন আকাশের বুকটা কত বড়? এখানে সবার জায়গা আছে, তারাদের,পাখিদের, প্লেনের,মেঘেদের। আচ্ছা আপনার ভাই যদি আকাশে থাকে তবে কি আমার জায়গা হবে সেখানে! দেখেন অল্প কয়েকটা তারা আছে আকাশে। আজ কি আকাশের মন খারাপ?
তাহি দুহাতে আগলে ধরেছে দিয়াকে। মেয়েটা কি বলছে না বলছে মাথা ঠিক নেই। ঘন্টা দুয়েক আগে নিজে ও একই কাজ করেছে। পাগলের মতো রাস্তায় আচরণ করেছে। মাথায় সারাক্ষন রাশেদ ঘুরে। দিয়া ফুঁফিয়ে কাঁদছে। কোনো দিকে আজ খেয়াল নেই। শেহজাকে আজ বাড়ির কোনো মেয়ে ধরছেনা। সব গুলো নেতিয়ে গিয়েছে। শেফালীকে দেখে আসলো শাহাদের দেয়া সব ছোট খাটো গিফট আগলে বসে আছে। শিফা রুমের দরজা দিয়ে কাঁদছে। সুলতানা কবির জায়নামাযে। নওরীন কিছুটা স্বাভাবিক থেকে খাবার রেডি করছে। লিমনকে দেখলো শেহজাকে বুকে নিয়ে ড্রইং রুমের সোফায় শুয়ে আছে। শাহীন বাইরে। রায়হান সাহেব নির্বাক। আজ রাতটা কি করে পার হবে?
সকালের সূর্য উঁকি দিয়েছে। তাহি দিয়াকে জড়িয়ে বারান্দায় ঘুমিয়ে পড়েছে। নওরীন টেবিলেই কাত হয়ে ঘুম। বাকিরা যে যেই অবস্থায় ছিলো সেই অবস্থায় আছে। কলিংবেলের শব্দে সকলে উঠে গিয়েছে। ছুটে আসলো প্রতিটি মানুষ ড্রইং রুমে। কে এসেছে! আফিয়া খালা দরজা খুললো। শাহীন ধীর পায়ে ঢুকলো। নওরীন বেসিনে এসে মুখে পানির ঝাপটা দিলো। ওড়নায় মুখ মুছে শাহীনের পাশে দাঁড়ালো। সুলতানা কবির তাসবী ঝপছে, লিমন নড়েচড়ে বসলো। উপর থেকে পাভেল ছুটে এসেছে। সকলের চোখ শাহীনের দিকে। শাহীনের চোখ মেঝেতে। রায়হান সাহেব ছেলের কাঁধে হাত রাখতেই শাহীন শব্দ করে কেঁদে দিলো। দিয়া ধপ করে নিচে বসে পড়লো। তাহির শরীর ঝাঁকি দিয়ে উঠলো। লিমন কাঁপা গলায় প্রশ্ন করলো,
– ছোট ভাইয়া, বড় ভাইজান…
পাভেল অনবরত হামজাকে কল দিচ্ছে। শাহীন কথা বলছেনা। হামজা ফোন রিসিভ করার সাথে সাথে পাভেল গালি ছুঁড়লো,
– হা***মী ফোন ধরোস না ক্যান? বস কই? কেমন আছে?
ডাইনিং এর চেয়ার টেনে পাভেল বসে পড়লো। কান থেকে ফোন নামিয়ে সবার মুখের দিকে তাকালো। সবাই যেন মুখিয়ে আছে নিউজ শোনার জন্য। পাভেল বুকে হাত দিয়ে বললো,
– স্টেবল না অবস্থা, আই সি ইউ তে।অপারেশনের পর পরই খিঁচুনি উঠে গিয়েছে। সন্দেহ করছে হেমোরেজিক স্ট্রোক হতে পারে…
তাহি চিৎকার দিয়ে বলে,
– পাভেল ভাই হেমোরেজিক স্ট্রোক বুঝেন আপনি? কেনো গেলো আমার ভাইজান একা। আরো কয়টা দিন বাঁচতো। কেনো আটকালেন না। স্ট্রোক যদি হয় অবজারভেশনে রেখেও লাভ নেই বাঁচবেনা তো আমার ভাইজান। ভাইজানের হাইপ্রেশার। আমার বাপ ও নাই, স্বামী ও নাই, ভাই ও নাই হয়ে যাবে। আমি কি নিয়ে থাকবো!
রায়হান সাহেব শক্ত পোক্ত ভাবে বললেন,
– তাহি আমরা কি মনকে শক্ত করবো? প্রস্তুতি নেব?
– খালুজান…
তাহির বিষন্ন ডাক পুরো কামরা জুড়ে ঘোর সৃষ্টি করে দিয়েছে। লিমন আচমকা বলে উঠলো,
– ডাক্তার সাহেবা এদিকে আসুন তো?
সকলে লিমনের দিকে বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে আছে। লিমন শেহজাকে ভালো করে কোলে নিয়ে বললো,
– শেহজা কেমন যেন নেতিয়ে গিয়েছে দেখুন তো, ওর গা জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে।
তাহি ছুটে গিয়ে দেখলো মেয়েটার গায়ে সত্যি জ্বর। অকস্মাৎ সকলের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু যেন শেহজা হয়ে উঠলো।
– শিফা থার্মোমিটার নিয়ে আয়।
লিমনের কথায় ছুটে গেলো শিফা। তাহি জ্বর মেপে দেখে ১০৪ এর বেশি। মেয়েটার হুশ নেই যেন। জ্বরের ঘোরে দু একবার পিট পিট করে চোখ খুলছে। শেফালী জল পট্টি দিতে ব্যস্ত। তাহি গাড়ি বের করতে বললো। কেমন যেন সব থমকে গেলো সুলতানা মঞ্জিলে। দিয়া মেঝের এক কোণে আগের মত বসে আছে। নিষ্প্রাণ দেহ। মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললো,
– যা মা, তুই ও চলে যা। তোর বাবা চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে তুই থাকবি কি করে!আমি তোকে জন্মদিলেও তুই তোর বাবার প্রাণ। বাবাকে ছাড়া এমনিও বাঁচবিনা।
প্রকৃতি ঠিক কতটা অদ্ভুত। এই অবুঝ বাচ্চার শরীর,মন বাবার অনুপস্থিতিকে এতটা প্রভাবিত করেছে যে জ্বরের কম্পন লাগিয়ে দিয়েছে। ঠিক কতটা গভীর সম্পর্ক এদের মাঝে। তাহি, পাভেল,লিমন,শাহীন ছুটলো শেহজাকে নিয়ে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে। দিয়া অনুভূতিশূন্য। বিড়বিড় করে বললো,
– দুনিয়াতে একা এসেছি! একাই থাকবো! একাই যাব! আমার কেউ নেই।
শিফা আর শেফালী দু পাশ থেকে ভাবীকে জড়িয়ে ধরেছে। নওরীন দেখছে সুন্দর পরিবারটার দূর্দশা। মেনে নিতে পারছেনা। পুরো পরিবারের ভীত নড়ে যাবে, শাহাদ-শেহজার কিছু হলে। এরা যেন পরিবারের প্রাণ।
ঘড়িতে সকাল ছয়টা। হঠাৎ ব্রেক কষলো পাভেল। সবাই সামনে ঝুঁকে গেলো। নেমে দেখলো কোথাও একটা সমস্যা হয়েছে। আশ্চর্য এই সময়ে নষ্ট হতে হলো। পাভেল সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললো,
– শাহীন বের হ শেহজাকে নিয়ে। এই গাড়ির ও আজ নষ্ট হতে হলো।
শাহীন, তাহি আর লিমন বেরিয়ে আসলো। অকস্মাৎ শেহজা বমি করে দিলো তাহির গায়ে। মেয়েটার উত্তাপ যেন তাহির শরীর জ্বালিয়ে দিচ্ছে। তাহি ওড়না দিয়ে মুখ মুছে দিলো। এবার লিমন এসে কোলে নিলো। একটা সি এনজি ডেকে উঠে পড়লো তিনজন। পাভেল গাড়ি নিয়ে সারাতে গেলো।
হাসপাতালের সামনে এসেই ছুটলো তাহি। শেহজাকে নিয়ে গেলো এমার্জেন্সীতে। বাইরে বসে রইলো লিমন। প্রতিটা প্রহর কা*টছে আতঙ্কে। ঝলমলে আকাশটা হঠাৎ করে কেমন অমোঘ মেঘে ঢেকে গেলো। প্রকৃতি যেন ঘোর বিপদের ঘোষণা দিচ্ছে। হাম্মাদ ছুটে এলো হাসপাতালে। পাভেল জানিয়েছে। শাহীনের মাথায় হাত। ওর যেন কোনো ভাবে মস্তিষ্ক কাজ করছেনা। হাম্মাদকে পেয়ে একটু শক্ত হলো মন। নিজ থেকে গিয়ে হাসপাতালের ফরমালিটিস পূরণ করছে। শেহজাকে এডমিট করিয়েছে। ট্রিটমেন্ট চলছে ভেতরে। মেয়েটার নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। ডাক্তাররা জ্বর কমাতে ব্যস্ত।
– শাহাদের মেয়ে হাসপাতালে, যদি পারিস ওটাকে শেষ করে দেয়। ও বেঁচে ফিরলেও ম*রে যাবে মেয়েকে হারিয়ে।
এমন ক্রুর, অশুভ, মারাত্নক কথা শুনে কেঁপে উঠলো ঘাতকের অন্তরাত্নাও। এতটা পাষবিক হিংস্রতা সম্পূর্ণ হুকুম কেউ দিতে পারে বলে জানতোনা এই ঘাতক। কি অন্যায় এই নিষ্পাপ বাচ্চার! শুধুই কি শাহাদের মেয়ে বলে তাকে পৃথিবী ছাড়তে হবে নাকি এই অসুন্দর নিষ্ঠুর পৃথিবী তার যোগ্য নয়। এর আগেও বেশ কয়েকবার ঘোলা চোখের পরীর মত বাচ্চাটাকে শাহাদের কোলে দেখেছে ঘাতক। তবে হুকুম শিরধার্য। মালিকের আদেশ পালন করা কর্তব্য।
মেয়েটা ঘুমাচ্ছে চুপচাপ নিশ্চিন্তে। কি মায়াবী চেহারা। কিভাবে এতটা নিষ্ঠুর হয় মানুষ। তাহি পাশে বসে আছে। ডাক্তারকে দেখে বললো,
– আপনি কি নতুন ডক্টর?
উপর নিচ মাথা নাড়ালো। সাথে আরেকজন নার্স আছে। বাচ্চাকে দেখে ডাক্তার, নার্স সহ বেরিয়ে এলো। সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। শেহজার জ্বর একটু কমে এসেছে। দিয়া এসেছে ঘন্টা খানেক আগে। শাহাদের এখনো কোনো খবর নেই। দিয়া আর তাহি শেহজার পাশে বসে আছে। স্যালাইন চলছে। মেয়েটা কাল রাত থেকে না খাওয়া। স্যালাইন শেষ হলেই খাইয়ে দিতে বলেছে ডাক্তার। তাহি একটা জরুরি কল এটেন্ড করতে বাইরে গিয়েছে। হাম্মাদ,লিমন কেবিনে ডুকলো। কিছুক্ষন বসে দিয়াকে খাবার দিয়ে বেরিয়ে এলো। চারদিকে কড়া নিরাপত্তা দিচ্ছে হাম্মাদের লোকজন। শেহজার ট্রিটমেন্ট করছে একজন ডক্টর। বাকিরা এসে দেখে যায়, স্টুডেন্ট মনে হচ্ছে।
ছোট বাচ্চার রুমে এত ডাক্তারের আনাগোনা একজনের পছন্দ হচ্ছেনা। এখন যে ডাক্তার ঢুকেছে তাকে স্বাভাবিক মনে হয়নি । দিয়া ঘুমে আচ্ছন্ন। পাশ থেকে একটা বালিশ নিয়ে শেহজার মুখের উপর চাপ দিলো। প্রমানহীন মৃত্যু দিতে চেয়েছিলো মেয়েটাকে। ছটফট করে উঠলো ছোট্ট প্রাণটা। এর মাঝে দিয়া উঠে যায়, চিৎকার দেয়ার আগেই এক হাতে দিয়ার গলা টিপে ধরে, অন্য হাতে শেহজার মুখের উপর বালিশ। ঠিক তখনই লোকটার গলার উপর কেউ ধারালো, প্রখর চকচকের স্টিলের ধাতু সজোরে চালনা করে। আচমকা এমন আক্রমণে দুহাত ছেড়ে পেছন ফিরে দেখে রক্তিম চোখের এক মানব তার মৃত্যুদূত হিসেবে সামনে দাঁড়িয়ে। দিয়া কম্পিত গলায় বললো,
– মামুজান…
-শুষ… শেহজাকে ধরো।
দিয়া মেয়েকে কোলে নিয়ে বুকের সাথে আঁকড়ে ধরলো। মেয়েটা কেঁপে কেঁপে উঠছে। লোকটা ছটফট করতে করতে সেখানেই প্রাণ ত্যাগ করলো। হাম্মাদ ভাগ্নির দিকে তাকিয়ে বললো,
– উম্মি, এখন থেকে অনেক কিছুই দেখবে, অনেক কিছুই শুনবে। কিন্তু চোখকে বলবে দেখিনি,কানকে বলবে শুনিনি। ক্লিয়ার। তোমাদের হেফাজতে রাখার মহান দায়িত্ব হামাকে শাহাদ দিয়ে গিয়েছে।
দিয়া ভয়ে দু পাশে মাথা নাড়লো। হাম্মাদ কাকে যেন ফোন করলো। দুজন ডাক্তারের এপ্রোন পরে ভেতরে এলো। চোখ দিয়ে ইশারা করে বুঝালো, একে নিয়ে যাও। ওরা ছদ্মবেশী ডাক্তার নিয়ে বেরিয়ে গেলো। হাম্মাদ সেই ছদ্মবেশধারী লোকের ফোনটা হাতে নিয়ে দেখছিলো। লক দেয়া। কিভাবে যেন একটা ডিভাইস লাগিয়ে লক খুলে ফেললো। ঠিক তখনই ফোন আসলো। স্ক্রিনে বস লিখা ভেসে উঠেছে। হাম্মাদ রিসিভ করতেই পরিচিত কণ্ঠ শুনে এক পেশী কুটিল হাসি দিলো। লিমন, তাহিকে ডেকে দিয়ার কাছে রেখে বেরিয়ে এলো।
শাহীনের কাছে বসে বললো,
– ভেতর থেকে একটা ডাস্ট ক্লিন করে আসলাম শাহীন।
শাহীনের চোখ বড় বড় হয়ে গেলো। হাম্মাদের ইঙ্গিত সঠিক বুঝতে পেরেছে। কিছুক্ষন আগেই হাম্মাদ বলেছিলো সন্দেহের কথা। হাম্মাদ পুনরায় বলে উঠলো,
– মিশনে চলে যান, আমি এখানে আছি।
– কার কাজ ছিলো আজকের আক্রমণ?
হাম্মাদ শাহীনের দিকে শান্ত চোখে তাকিয়ে বললো,
– ফরিদের।
শাহীন উঠে দাঁড়ায়। হাম্মাদের দিকে ফিরে বলে,
– বড্ড ভুল করে ফেলেছে। রিপোর্টের জন্য মরিয়া হওয়া, সিঙ্গাপুরে ভাইজানের হাসপাতালে ওর গুপ্তচর পাঠানো,আর আজ তো লিমিট ক্রস করেছে আমাদের শেহজার দিকে চোখ দিয়ে। ও যখন ম*রণ নেশায় নেমেছে তাহলে আমরা কেনো শান্ত থাকবো হাম্মাদ?
হাম্মাদ মৃদু হেসে বললো,
– মেজর, নাও ইটস ইউর টার্ন।
– আল্লাহ হাফেজ। টেক কেয়ার অফ মাই ফ্যামিলি।
শাহীন বেরিয়ে গেলো। আজ কোনো কষ্টই কষ্ট লাগছেনা। কিছুক্ষন আগে হামজা মেসেজ করে জানিয়েছে মাউন্ট এলিজাবেথ হসপিটাল থেকে শাহাদকে অন্য হসপিটালে ট্রান্সফার করেছে গোপনে। শরীরের কন্ডিশন ভালোনা। হাম্মাদের লোকজন ডাক্তারের পরামর্শে সরিয়ে নিয়েছে।
অন্ধকার ঘর। হাত,পা,মুখ বাঁধা। চোখ খুলে দেখলো একটা ভাগাড়ের মতো জায়গা। বিশ্রী গন্ধ। আশপাশটা নিরব। কোথায় এনে রাখলো। মাথা এখনো ধরে আছে৷ এয়ারপোর্ট থেকে এই বিচ্ছিরি কামরায় কি করে এলো? ধীরে ধীরে সব মনে পড়ে গেলো। হতবুদ্ধি হয়ে গেলো। বার বার মনে পড়ছে প্লেন মিস হয়ে গেলো। আর কি তবে শাহাদকে পাবে না? দরজার খচ করা শব্দে সেদিকে চেয়ে দেখলো এয়ারপোর্টের সেই পরিচিত পুরুষ। অনল দৃষ্টি ছুঁড়লো মনি। হো হো করে হেসে মনিকে ঘাড়ে তুলে বেরিয়ে এলো ইয়াজ। গাড়ির ভেতর ছুড়ে মা*রলো। নিজের করুন পরিণতি চোখের সামনে দৃশ্যমান। কেঁদে উঠলো হাউ মাউ করে। বাঁধা মুখ দিয়ে উ আ আওয়াজ বের হচ্ছে। গাড়ি ছুটছে খালেদ পারভেজের বাংলো বাড়ির দিকে।
কেস উঠেছে কোর্টে। সব প্রমান পৌঁছানো শেষ। তদন্ত চলছে। সাক্ষীদের মধ্যে সকলে অনুপঅস্থিত৷ রায় ঘোষনা করবে আগামীকাল । এর আগেই অদ্ভুত চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসলো। এই রিপোর্ট পোস্ট ম্যান এসে দিয়ে গেলো হাম্মাদের হাতে। রিপোর্ট হাতে হাম্মাদ স্তব্ধ। রিপোর্টের এনভেলাপের পাশে চিরকুট। খুলে পড়তে শুরু করলো,
আজ পঁচিশ তারিখ। রিপোর্টের মূল কপি কোর্টে পেশ করা হয়েছে। সন্দেহ অনুসারে কাজ চালিয়ে প্রকৃত রিপোর্ট রেডি হয়েছে। প্রথম সন্দেহ করা হয়েছিলো, রাশেদ এত ঠুংকো কারণে ম*রে যাবে? নেভি ওকে এই শিক্ষা দেয়নি। রাশেদকে আ*ত্নহত্যা করতে বাধ্য করা হয়েছিলো। মৃত্যুর আগে রাশেদকে ভয়ংকরভাবে ম্যানিপুলেট করা হয়, বলা হয়েছিলো প/তি/তার সন্তান। মানসিকভাবে ভেঙ্গে দেয়া হয়েছিলো। সেই ফোনকলের রেকর্ড কোর্টে জমা দেয়া হয়েছে। সমাজের অপমান,স্ত্রীর অবিশ্বাস, মায়ের আসল পরিচয় সব জানার পর রাশেদের মনোবল গুড়িয়ে যায়। বাধ্য হয় আ/ত্ন/হ/ন/নের পথ বেছে নেয়।
আ/ত্ন/হ/ত্যা কখনোই কোনো সমাধান হতে পারেনা,এ কথা ভুলে বসেছিলো। মানুষ ভূলের উর্ধ্বে নয়। ছোট ছোট ভুল গুলোই মহাপ্রলয় বাঁধিয়ে দেয়। রাশেদের মৃত্যুর পেছনে সবচেয়ে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে ফরিদ রেজা যিনি সম্পর্কে রাশেদের ছোট চাচা। এক্স লে. কমান্ডার শাহাদ আমাদের সাথে একমত। তিন বাহিনীর প্রতিটি সদস্য আজ মিলিত হয়েছে রাশেদকে নিরপরাধ, নির্দোষ প্রমানের জন্য।
সকলের পক্ষ থেকে,
~ এডমিরাল মানিক মোজাম্মেল।
একই চিরকুট আরো দুজনের নামে এসেছে। তাহি এবং মেহেরজান আম্মা। সুদিনের দেখা কি মিলবে তবে?
চোখের সামনে নিজের কৃতকর্ম ভেসে উঠেছে। লাইভ সম্প্রচার হচ্ছে টিভি চ্যানেলগুলোতে। পঞ্চান্ন বছর বয়সী হোম মিনিষ্টার ফরিদ রেজা মেয়েদের নিয়ে ক্লাবে মাতামাতি করছে। ফরিদের সব ভিডিও চিত্র ফাঁস। কোন মেয়ের সাথে কখন, কোন সময় মেলামেশা করেছে ক্লিপ আকারে দেখানো হচ্ছে দেশের মানুষকে। হাত পা বাঁধা চেয়ারে, প্রজেক্টরে চলছে স্বীয় কাজ। চিৎকার দিয়ে উঠলো,
– কোন শূ******চ্চা রে আমার এসব ছাড়ছিস সামনে আয়। টুকরো করে গাঙ্গের জলে ভাসাবো। এই বাই*****দ।
হা হা হো হো হি হি অট্টহাসিতে হল রুম প্রতিধ্বনিত। ধপ করে রুমের লাইট জ্বলে উঠলো। চেয়ারে বসে টেবিলের উপর পা তুলে পা দুলাচ্ছে মেজর শাহীন। ঠোঁটের কোণে ধোঁয়া উঠা সিগারেট। কুন্ডলী পাকিয়ে যাচ্ছে সেই ধোঁয়া। এই ছেলেটাকে সাধারণ ভাবে নিয়েছিলো ফরিদ। এটাও ভাইয়ের মত গোখরা। সুযোগ বুঝে ছোবল মা*রলো।
– আফসোস ফরিদ। তুমি আমাকে বড্ড সহজ ভাবে নিয়েছিলে…
গমগমে আওয়াজটা ফরিদের কানে লাগছে। আজ শাহীনকে যমদূত লাগছে। চেয়ার উলটা করে বসেছে তুহিন। দু পাটির সব দাঁত দেখিয়ে দু হাত নাড়িয়ে টেবিলে ধুম ধাম বাজিয়ে বিট দিয়ে নাচছে আর গাইছে,
জাব আয়ি তেরি ইয়াদ মুড মে জাতি নাহি
সাজনা আব তো নিন্দ ভি মুঝকো আতি নাহি
হো মাজনু মেরি ইয়ার
ইয়ে লায়লা হ্যেয় তাইয়ার
হো জালদি সে লেকে আজা
ইক ডায়মন্ড কি রিং
তেরি লিয়ে দিল কা টেলিফোন
হ্যে বাজতা রিং রিং রারা রিং
হো মেরি দিল কা টেলিফোন।
পাশের চেয়ারে তাকিয়ে দেখে আধম*রা অবস্থায় আলতাফ বাঁধা। পুনরায় তুহিন হাত পা নাচিয়ে একই গান গেয়ে যাচ্ছে। ঠক ঠক হিলের আওয়াজ।পান খেয়ে লাল করা ঠোঁট চোখা করে পানের পিক ফেলে পাশে বসলো মেহেরজান আম্মা। তার মুখেও হাসি। একটা টেপ রেকর্ডার বাজাতে বাজাতে ঢুকছে লেফটেন্যান্ট তানভীর। সেই একই গান রিং রিং রারা রিং, দিল কা টেলিফোন। বাঁশি বাজাতে বাজাতে ঢুকছে শাহাদের সবচেয়ে বিশ্বস্ত গোপনীয়তা বজায় রাখা দুঃসাহসী এসিস্ট্যান্ট ক্রাইম জার্নালিস্ট ইয়াজ। এরা প্রত্যেকে একই গানের সাথে বিট দিয়ে নাচছে। আলতাফের মাথা বেয়ে রক্ত ঝরছে। কিন্তু ফরিদ রেজা অক্ষত। চেঁচিয়ে উঠলো,
– ইয়াজ তুই কত্ত বড় বেঈমান। মেহেরজান এখানে কি তোমার? আর তোমরা এমন নাচছো কেনো?
ইয়াজ তাচ্ছিল্য নিয়ে হেসে বললো,
– এই চুপ কর শা*লা। কিসের বেঈমান। আমি শুরু থেকেই বসের বাধ্য সেক্রেটারি। আমি বেঈমান হলে তুই বা/ট/পা/র।
মেহেরজান আম্মা ভাবলেশহীন ভাবে একটা বোতল থেকে হুইস্কি ঢেলে খাচ্ছে। যেন এতেই পারদর্শী এই দুঃসাহসী নারী। তানভীর একটা ফুলের ট্রেতে করে কয়েকটা ফোন সাজিয়ে নিয়ে এলো। পুনরায় প্রত্যেকে গেয়ে উঠলো,
রিং রিং রারা রিং, দিল কা টেলিফোন। শাহীন হাত উঁচিয়ে সবাইকে থামিয়ে দিলো তখনই সব গুলো ফোন বেজে উঠলো। তুহিন রিসিভ করলো। প্রতিটি ফোনে কেউ না কেউ ফোন করেছে, পি এম, প্রেসিডেন্ট থেকে শুরু করে দলের নেতাকর্মীরা। সকলের মুখে একটাই কথা দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে সরাসরি রিমান্ডে নেয়া হবে। যেখানে আছে সেখান থেকে যেন সারান্ডার করে। ফরিদকে কেউ কোনো কথাই বলতে দিলোনা। এই সবগুলো ফোন ফরিদের পি এসদের। দেশের মানুষের কাছে ফরিদ পলাতক। একসাথে অনেক গুলো তকমা লাগিয়েছে নিজের নামের সাথে- রেপিস্ট ফরিদ, মাদক পাচারকারী, খুনী, লে.কমান্ডার রাশেদ মামলার মূল আসামী সহ আরো অনেক মামলা দায়ের করা হয়েছে। শরীর কাঁপছে ফরিদের। চিৎকার দিয়ে মেহেরজান আম্মাকে বললো,
– তুই করেছিস এসব তাই না, তোকে আমি ছেড়ে দিয়ে বড্ড ভুল করেছি। ভেবেছিলাম তুই স্বেচ্ছায় ধরা দিবি। ভালোবেসেছিলাম তোকে আর তুই প্র/তা/রণা করলি?
এক দলা থুথু নিক্ষেপ করলো ফরিদের গালে মেহেরজান। গর্জে উঠলো,
– তুই আমাকে ছেড়ে দিয়েছিস? আমার স্বামীকে মে*রে আমাকে সমাজের কাছে পতিতা বানিয়ে ছেড়ে দিয়েছিস? আমার সম্মানের বিনিময়ে সন্তানকে বাঁচিয়েছিলাম আমি। আমার সন্তানকে আ/ত্ম/হ/ত্যা/র জন্য বাধ্য করে ছেড়ে দিয়েছিস? দিলিনা বাঁচতে আমার মানিককে, তুই আমাকে ছেড়ে দিয়েছিস? আমি তোকে ছেড়ে দিলাম যাহ। এই নে তোর মেডিকেল রিপোর্ট।
তুই একটা এইচ আইভি প্যাশেন্ট। আমার এত বছরের প্রচেষ্টা সফল। কেন পালিয়ে যাইনি কুঠি থেকে জানিস, খোঁজ করছিলাম এইডস আক্রান্ত পতিতার, পেয়েও গেলাম। খুব ভালোবেসে রাতের বেলা যে তোহরাকে কাছে টানতি মেয়েটা আমার তুরুপের তাস ছিলো ফরিদ। আমি সফল। ম*র তুই। আমার ছেলেকে তুই বদনাম করেছিস, আমাকে করেছিস? এখন তোর কি হবে? বদনাম ও তোকে দেখলে লজ্জ্বা পাবে।
অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো। ফরিদের মনে হলো কেউ গায়ে উত্তপ্ত সীসা ঢেলে দিয়েছে। টিভিতে এই খবর ও প্রচার হচ্ছে ফরিদ এইডস আক্রান্ত রোগী। আলতাফ এখানে, খালেদ পারভেজ কোথায়! এদিকে তানভীর গানের রেকর্ডিং আরো জোরে ছেড়ে দিয়েছে। তাল মিলিয়ে বাদ্য বাজিয়ে এভাবে নেচে যাচ্ছে।
শেহজাকে নিয়ে বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত নটা। এদিকে সারাদেশ বিক্ষুব্ধ। রাস্তাঘাটে জ্যাম,র্যালি। কোনোরকমে জ্যাম ঠেলে হাম্মাদ,পাভেল দিয়াকে বাসায় নিয়ে এসেছে। তাহি শেহজার রিপোর্ট নিয়ে লিমনের সাথে এসেছে। সুলতানা কবির নাতনীর শুকিয়ে যাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে দোয়া পড়ছে। তখনই ফোন এলো হামজার। তড়িঘড়ি করে পাভেল রিসিভ করলো,
– আসসালামু আলাইকুম পাভেল ভাই।
– ওয়ালাইকুমুস সালাম, বস কেমন আছে?
– ফোনটা আংকেল,আন্টি আর ম্যাডামের দিকে ঘুরান তো?
পাভেল রায়হানের সাহেবের হাতে ফোন দিলো। রায়হান সাহেব ফোন ধরতেই দেখতে পেলো শাহাদের হাসি হাসি মুখ। মনে হলো এই জীবনে পাওয়া আল্লাহর পক্ষ থেকে সবচেয়ে বড় উপহার সন্তানের এই হাসি। মাথায় ব্যান্ডেজ প্যাঁচানো। আস্তে করে বললো,
সায়রে গর্জন পর্ব ৩১
– আব্বুউউউ…
– হ্যাঁ বাবু বল
পুনরায় দম টেনে থেমে থেমে ঠোঁটের কোণে হাসি ঝুলিয়ে বললো,
– আমার মা..মেয়ে..আর ফারাহ্কে বলে দিবেন আমি..আআসছি.. ইন শা আল্লাহ।
