সায়রে গর্জন পর্ব ৪৭
নীতি জাহিদ
অম্বরে সাদা পেজা তুলো। হাত বাড়িয়ে ছোঁয়ার অপরিসীম প্রতীক্ষা। মন ভালো আজ। নতুন ঋতুর প্রত্যাবর্তন। সকালে উঠার অভ্যাস করাটা বড্ড কষ্টের তবুও গত কয়েক মাসে অনেকটাই অভ্যাস হয়ে গিয়েছে। পায়ের ব্যায়াম হয়। সকালে একটু করে হেঁটে এরপর রিকশায় উঠে। ডাক্তার জানিয়েছে পায়ের ব্যায়াম বাঞ্চনীয়। বুকের পাশটা অনেকটা ভালো আছে। ভাইজান ছাড়া অনেকের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। এখন তার সংসার মা এবং নিজেকে নিয়ে। রিকশায় উঠে রওয়ানা দিলো অফিসের উদ্দেশ্যে। স্বনামধন্য মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে জব পেয়েছে কয়েকমাস আগে। রেজাল্ট যেমন তেমন, কমিউনিকেশন স্কিল বরাবরের মতো চমৎকার। চাকরি না হওয়ার সুযোগই নেই। গোপন প্রফেশনাল অভিজ্ঞতা তো আছেই।
অফিসে প্রবেশ করতেই কিছু ফাইল নিয়ে সি ই ওর রুমে চলে গেলো। ফাইল সাইন করিয়ে কিউবিকলে বসতেই ভাইজানের কল। রিসিভ করে সালাম জানালো।
– বিকেলে বাসায় আসবে। গতবারের মত কোনো অকান্ড ঘটাবেনা। তাহিকে দেখতে আসবে ছেলে পক্ষ।
ধক করে উঠলো লিমনের বুকের মধ্যিখানে ছোট্ট পাম্পটা। গত মাসগুলোতে ভীষন যন্ত্রনারাও কুপোকাত করতে পারেনি হৃদয়টাকে, দূরত্ব মেনে চলেছে সর্বোচ্চ। এতদিনে তো সব ভুলে যাবার কথা। তবে ভুলে নি কেনো? গত সপ্তাহের ঘটনাটি জীবনের অন্য সব দূর্ঘটনা ভেবে ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করছে। এইযে! কটা দিন বন্ধু,কলিগ,আড্ডা, মাস্তিতে নিজেকে যথেষ্ট ব্যস্ত রাখার আপ্রাণ চেষ্টা বুঝি আজ জলে গেলো? আর ভাইজানই বা কেনো কাঁ টা ঘাতে নূন ছেটাতে চাইছে। সে কথা কি আর প্রশ্ন করার সাধ্য আছে? ফোস করে দম ফেলে বললো,
– জ্বি ভাইজান। কিন্তু আমার কাজ কি?
– আপাতত কথা কম বলা। শাহীন আসবে পরশু। আজ ছেলেরা রিং পরিয়ে চলে যাবে। ভাই হিসেবে পাভেল, তুমি, আমি আর কাব্য থাকবো।
– জ্বি ভাইজান।
স্বল্প কথায় ফোন রেখে দেয় ওপাশে থাকা পাষাণ মানুষটা। বিয়ের জন্য যদি তাহিকে রাজি করাতে পারে তবে লিমনের জন্য করালেও তো পারতো। গাল ফুলিয়ে রাজ্যের ভাবনা ভাবতে ভাবতে মনে পড়লো কিসব বকছে দুঃখে। ভাইজানের উপর কিসের রাগ? রাগ তো ওই ডাক্তারের উপর। খুব তো বলেছে বিয়ে করবোনা এখন ঠিকই ধেঁই ধেঁই করে বিয়ের পিড়িতে বসবে।
– বাবু সব কিছুর সীমা আছে? কেনো এসব করছো? দেখতেই পারছো মেয়েটা রাজি নয় বিয়েতে।
– আম্মু আপনাদের মতো এত আবেগ আসে না আমার। মেয়ে মানুষ হয়ে জন্মানো যেমন কঠিন, ঠিক তেমনি টিকে থাকাও কঠিন। গত সপ্তাহে হাসপাতালে যে অকারেন্স টা ঘটেছে এরপর থেকে কিছুতেই তাহির একা থাকার উপর ভরসা করতে পারছিনা। খালাম্মা কেমন অসুস্থ হচ্ছে মেয়ের দুশ্চিন্তায় বোন হয়ে কি আপনার চোখে লাগছেনা এসব? আব্বু আপনি কিছু বলুন?
বাড়ি গরম করে ফে*লেছে শাহাদ। প্রতিটি শব্দের উচ্চ আওয়াজে উচ্চারিত প্রতিধ্বনি দেয়ালে দেয়ালে আ*ঘাত প্রাপ্ত হচ্ছে। রায়হান সাহেব ছেলের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করছেন। সম্মতিসূচক মাথা নাড়িয়ে বললেন,
– আমি শাহাদকে সমর্থন করছি সুলতানা। তাহির নিরাপত্তা প্রয়োজন। হাসপাতালে রোগীর আত্নীয়রা একজন ডাক্তারের সাথে কিভাবে কথা বলতে হয় তার ম্যানার নাহয় নাই বা জানতে পারে কিন্তু আশেপাশের ডাক্তার কলিগ কজন প্রতিবাদ করেছে? পাভেল, শাহাদ ঢাকার বাইরে, শাহীন খাগড়াছড়ি মেয়েটা না পারতে লিমনকে কল দেয়। ভাগ্যিস ছুটে গিয়েছিলো ছেলেটা। নাহয় কিভাবে ওদের কাছে অপদস্ত হতে হতো ভাবতে পারছো। মেয়েটার গায়ে অবধি হাত তুলতে চেয়েছিলো পেশেন্ট পার্টি। ভাবতেই আমার
ভ য় লাগছে।
শাহাদ মায়ের দিকে তাকিয়ে বললো,
– এতটুকুতে থেমে গেলে তো ভাবতাম যাক হাসপাতালের অহরহ ঘটনা এসব। বাসায় অবধি হামলা চালালো। নিশ্চিত খবর পেয়েছে পুরুষ মানুষ থাকেনা। এদের কলিজা কাঁপলো না যে আমার বোনের বাসায় হামলা চালায়।
শেফালী কথার মাঝে বললো,
– ভাইজান এরা তো স্বাভাবিক মস্তিষ্কের না? এরা কি করে বুঝবে কোনটা আমাদের বোন। আর তাহি আপা তো কাউকে বলেও না। নিজের মত থাকে। এই বাড়িতেও থাকবেনা, নিরাপত্তা ও লাগবেনা তার। সব ইগো একসাথে নিয়ে বসে থাকবে আর নিজের বিপদ নিজেই ডেকে আনবে।
– আমার ডিসিশন ফাইনাল। এবার ওকে মে*রে ধরে বিয়ে দিব। রাশেদকে ও আমার থেকে বেশি মিস করে? করতেই পারে হাসবেন্ড ছিলো। কিন্তু রাশেদ যাওয়ার সময় আমার অর্ধেক প্রাণ নিয়ে গিয়েছে। আমি বেঁচে নেই? বাঁচতে হবে,শিখতে হবে। মেহেরজান আম্মা যেই ছেলের জন্য অন্য পথ বেছে নিয়েছে উনি বেঁচে নেই। আছে। আমি তাহির নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত।
– আমি ম*রে গেলে আপনি আরেকটা বিয়ে করবেন শেহজার বাবা?
এত বড় স্পর্ধা যে মেয়ে কখনো দেখায় নি আজ সকলের সামনে এই প্রশ্ন করলো। শেফালী শুকনো ঢোক গিললো। সুলতানা কবির ভীষণ অবাক হলেন। এমন বেফাঁস প্রশ্ন পুত্রবধূর করা উচিত হয়নি। শাহাদ নিশ্চিত রে গে যাবে। সকলকে অবাক করে দিয়ে শাহাদ দিয়ার দিকে ফিরে হেসে বললো,
– জ্বি না। করতাম না। আমার শেহজা আছে জীবন কা*টানোর জন্য। রাশেদ যদি সম্বল রেখে যেত আমি দুনিয়া লড়ে তাহিকে সিকিউরিটি দিতাম।যদি খালুজান বেঁচে থাকতেন মাথা ঘামাতাম না। রাশেদ আমার ভাই। ভাইয়ের সন্তান আর তার বউয়ের নিরাপত্তার দায়িত্ব নেয়া সমাজে যত সহজ, বিধবা খালাতো বোনের দায়িত্ব নেয়া ঠিক ততটাই কঠিন। সম্পূর্ণ অবান্তর একটা প্রশ্ন করলেন ফারাহ্ শাহাদ।
– শেহজা বড় হলে একা থাকবেন কি করে?
পূর্বের চেয়েও প্রসারিত অধর। ক্ষীণ হেসে বলে,
– নিরাপত্তার প্রয়োজন তো নেই আমার। তবে আমি যদি ম*রে যাই নিশ্চিত করে আদেশ করে গেলাম সবাইকে আপনাকে যেন ধরে সবাই আরেকটা বিয়ে দেয়। আপাতত চুপ থাকুন। রুমে গিয়ে আলোচনায় বসবো আপনার সাথে।
কথাটা বলেই মৃদু হেসে পুনরায় আলোচনায় মনোযোগ দিলো। অদ্ভুত মানুষ! একটি বার উচ্চারণ করলো না যে, তোমায় ভালোবাসি, তোমার স্মৃতি নিয়ে থাকবো তবুও বিয়ে করবোনা। কেমন বাজে বেখাপ্পা উত্তরটা দিলো। তার নাকি নিরাপত্তার প্রয়োজন নেই! অন্যদিকে দিয়াকে নাকি আরেক বার বিয়ের আদেশ দিয়ে যেত। খারাপ লোক।
অন্যদিকে বাড়ির প্রত্যেকে হতচকিত, চমকিত শাহাদ ইমরোজ রাগ না করে হেসে হেসে মিষ্টি ভাষায় এমন সিচুয়েশন ট্যাকেল দিলো! এই বাড়ির মানুষ সবে মাত্র চমক পেতে শুরু করেছে। রায়হান সাহেব স্বাভাবিক ভাবে ব্যাপারটা নিয়ে মুচকি হেসে বললেন,
– বৌমা জন্ম,মৃত্যু এবং বিয়ে আল্লাহর হাতে। লালসা গ্রস্থ পুরুষ ব্যতীত সাধু পুরুষ কখনো বিনা প্রয়োজনে বিয়ে করেনা। পুরুষ চারটি কারণে বিয়ে করে। যৌবনে, বার্ধক্যে, প্রয়োজনে এবং লালসায়। আমার শাহাদ কোন পুরুষের তালিকায় পড়ে ভেবে নিও। উত্তর সহজ।
বাবার দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে হাসি রেখে চোখের পলক ঝাপটে বুঝালো,
– ”বাবা মানে সমস্ত গোলকধাঁধার নিরব,নির্ভুল সমাধান। বাবা মানে চিন্তিত সন্তানের প্রশস্ত কাঁধে ভরসার হাত। বাবা মানে সৃষ্টিকর্তার শ্রেষ্ঠ উপহার।”
সুলতানা মঞ্জিলে দ্বিতীয় বার তাহিকে দেখতে আসছে ছেলেপক্ষ। অন্যদিকে এবার শেফালী নিজ থেকে রুমে গিয়ে দরজা দিয়েছে। শিফা চলে গিয়েছে বান্ধবীর বাসায়। বাসায় আছে দিয়া ও নওরীন। দুজনের জন্য কড়া নিয়ম আজ কামরা থেকে যেন না বের হয়, যতক্ষন না সব পাকাপোক্ত হবে। তবে এমন কিছুই হওয়ার সম্ভাবনা আজ নেই। কারণ ছেলে শাহীন এবং পাভেলের ছেলেবেলার বন্ধু। আইনজীবী নিলয় ইসলাম। যথেষ্ট ভদ্র এবং মার্জিত। ভদ্রতায় রায়হান সাহেব এবং শাহাদ দুজনই মুগ্ধ। নাস্তার আয়োজন শেষ। ছেলের পরিবারের লোকজন তাহিকে দেখতে চাইলো।
অফিস শেষে লিমন সরাসরি সুলতানা মঞ্জিলে প্রবেশ করেছে। ড্রইং রুমে সবাইকে দেখে সালাম দিলো। নিলয় হেসে লিমনকে বললো,
– কেমন আছেন লিমন সাহেব?
লিমন হেসে উত্তর দিলো,
– জ্বি আলহামদুলিল্লাহ ভালো।
পাভেল ভ্রু কুঁচকে বললো,
– তোরা কি চিনিস একে অপরকে?
নিলয় জানালো,
– হুম, আমি লিমন সাহেবদের অফিসের লিগেল এডভাইজার। অফিসের অনেক কাজেই উনার সাথে যোগাযোগ রাখতে হয়। এছাড়া লিমন সাহেবের তো আলাদা পাওয়ার অফিসে।
লিমন ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলো। শাহাদ চোখ ছোট করে লিমনের দিকে তাকাতেই দেখে ছেলেটা মুখ কালো করে বসে আছে। রায়হান সাহেব প্রশ্ন করলো,
– কেমন পাওয়ার?
নিলয় জানায়,
– আমাদের চেয়ারম্যান স্যারের অনেক স্নেহের। অফিসের কাগজপত্রে অনেক টাকার একটা গোলমেল হয়েছিলো। আমার হাত দিয়েই ওটা বেরিয়ে এসেছিলো। হিসেব মেলাতে পারছিলোনা অথোরিটি, একাউন্টস সেকশন। তিনজন নির্দোষ অফিসারের চাকরি যেত। লিমন সাহেব আটাশ দিনের মাথায় প্রবলেম সলভ করে দিলেন। সেই সুবাদে উনাকে অফিসের অনেকেই ভয় পায়। কার কখন কোন ভান্ডা ফুটে।
রায়হান সাহেব এবং সুলতানা কবির হেসে দিলেন। শুনে ভালো লাগছে পরিবারের ছেলেটা এবার দায়িত্বশীল হলো। অন্যদিকে লিমন শাহাদের দিকে তাকিয়েই ভবিষ্যতের চিত্র দেখছে। মন চাচ্ছে পায়ে ধরে বলতে আজকের পাত্রকে আমি ইচ্ছে করে চিনিনা। আজকে ঝামেলা হবেই না ভাইজান। কিন্তু সে নিরুপায়। কারণ পাত্র এতক্ষন তার উপর আস্থাশীল হওয়ার পরিচয় দিয়েছে। তাহিকে ভেতর থেকে আনার আগেই শাহাদ বললো,
– লিমন বাসায় যাও। তোমাকে ক্লান্ত দেখাচ্ছে। রাতে কথা হবে।
ব্যস্, হয়ে গেলো। যা বুঝার তা বুঝে নিলো। ব্যাগ টা কাঁধে নিয়ে মাথা নেড়ে উঠে দাঁড়ায়। নিলয়ের সাথে হ্যান্ডশেক করে বেরিয়ে যাবে এমন সময় তাহিকে নিয়ে আসে। ঝাপসা দেখেই লিমন সেদিকে না তাকিয়ে ঝটপট বেরিয়ে গেলো। যেদিকে তাকানো বারণ সেদিকে চোখ না পড়াই শ্রেয়। শাহাদ আজই বিয়ে পড়িয়ে দিবে তাহির। কথাটা কানে বাজছে।
বাসার নিচে টং দোকানটাতে বসে আছে। ভেতরে যেতে ইচ্ছে করছেনা৷ টং দোকানদার প্রশ্ন করলেন,
– মামা চা দিতাম নি?
মাথা নেড়ে না জানালো। চোখ নিবদ্ধ রাস্তার ধূলাতে। গাড়ির টুং টিং ক্রাং আওয়াজ আসছে। আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে নিরব হয়ে। মেঘ করেছে আকাশে। আচমকা ঝড় উঠেছে, ধূলো ঝড়। হাত ঘড়িতে সাতটা বাইশ বাজে। সুলতানা মঞ্জিল ছেড়েছে তখন চারটা পঞ্চাশ। শার্টের হাতা উলটে বার বার বেয়ে নেত্র ধারা মুছতে ব্যস্ত। কাব্য ফোন দিয়ে টংয়ের সামনে এসে উপস্থিত। এই ধূলো ঝড় সব একসাথ করে এসেছে। ছেলেটা চোখে মুখে উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টি। লিমন কাব্যকে পেয়ে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে দিলো। এই মুহুর্তে কাব্যকে ভীষণ প্রয়োজন ছিলো। কাব্যকে জড়িয়ে ধরে ক্রন্দনরত গলায় বললো,
– আমার তাহি হা*রিয়ে গেলো কাব্য। ওরা আমার তাহিকে নিয়ে যাবে। কেনো ভাইজান বুঝলো না আমাকে।
কাব্য কিছুতেই সামলাতে পারছেনা। টং এর আসগর মামাও এই ভরা ঝড়ে ওদের ভেতরের ঢুকতে বলছে। চারদিকে বালুর তুফান। এর মধ্যে শুরু হয়ে গেলো বজ্রনাদ। মেঘে ঘর্ষন, প্রবল বেগে বৃষ্টি। প্রকৃতি যেন তান্ডব লীলা শুরু করেছে। করবে নাই বা কেনো। উপকূলীয় অঞ্চলে চলছে নয় নম্বর মহা বিপদ সংকেত।
এর মাঝেই ছুটে আসছে কেউ। আসগর মামা জোরেই বলে উঠলো,
– মাইয়া মানুষ পাগল হইয়া গেছে। কেমনে দৌড়াইয়া আইতাছে। ঝড়,তুফান বালু দিয়া এমনে দৌঁড়াইলে কোনো ক্ষতি হইয়া যাইবো। ওই খালা এমনে ছুটতাছেন কেন?
আসগর চিৎকার দিয়ে ডাকতে লাগলো। কাব্য এবং লিমন দুজনই ঘাড় ঘুরিয়ে দোকানের তেরপালের আড়ালে তাকালো। সত্যি একটি মেয়ে ছুটে আসছে। কাব্য সামান্য ভিজে গিয়েছে। মেয়েটি ছুটে এসেই তেরপালের ভেতর ঢুকলো। কাব্য আর লিমন স্তম্ভিত, বিভ্রান্ত হয়ে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে আছে। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। আসগর মামা এক গ্লাস পানি এগিয়ে দিয়ে বললো,
– এই নেন খালা পানি টুকু খাইয়া লন। হাঁপাইতাছেন তো।
সব টুকু পানি ঢকঢক করে গিলে নিলো। পরনের শাড়িতে কাঁদা। অনেকটাই ভিজে গেছে শাড়ির নিচের অংশ। কাব্য বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করলো,
– আপা আপনি এখানে?
তাহি টংয়ের ভেতরে একপাশে এসে বেঞ্চিতে বসলো। লিমনের দিকে তাকিয়ে দেখে ছেলেটা চোখ ফিরিয়ে নিলো। মাটির দিকে দৃষ্টি নত। তাহি চোখ বুজে একদমে বললো,
– লিমন এই মুহুর্তে বিয়ে করবেন আমায়?
চক্ষুছানা বড়া কাব্যের। মনে হলো মাথার উপর বাঁজ পড়েছে। লিমনের দিকে তাকিয়ে দেখে ছেলেটা চোখ বন্ধ করে রেখেছে। দু চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে জল। তাহির চোখে মুখে বেদনার ছাপ। নিষ্পলক তাকিয়ে আছে লিমনের দিকে। আসগর মামাও হতবাক। এখানে কি চলছে বুঝতে পারছেনা। সকলের অপেক্ষা লিমনের প্রতি উত্তরের। অথচ লিমন নিঃশব্দ আজ। চোখ খুলছে না কেনো এই ছেলে? ঠোঁট দুটো আলগা করে বললো,
– ডাক্তার তাহি পালিয়ে এসে ঠিক করলেন না? ভাইজানকে কষ্ট দিয়ে ফেলেছেন?
হতভম্ব তাহি এবং কাব্য। এ যেন চোরের মুখে ধর্মের কাহিনী। এখনো চোখ বন্ধ লিমনের। তাহি শাড়ি ধরে উঠে দাঁড়ায়। কাব্যের দিকে তাকিয়ে বললো,
– কোথায় যাচ্ছি জানিনা। কেউ আমার খোঁজ করলে বলো জলে ডুবে ম*রতে যাচ্ছি।
লিমন চোখ খুলে তাহির হাত ধরে আটকালো। তাহির দিকে তাকিয়ে ধমকে বললো,
– এত ম*রার শখ কেনো? এত গুলো মাস আমাকে ধুকে ধুকে কষ্ট দেয়া হয়েছে অথচ আমার একটা লাইন সহ্য করার ক্ষমতা নেই। পালিয়ে এসেছেন কেনো?
দুচোখ ভরা জল নিয়ে তাহি বলে উঠলো,
– আমি পারবোনা বিয়ে করতে ভাইজান যার সাথে বিয়ে দিচ্ছেন উনাকে। উনি চাইবেন সংসার করতে। আমি তো রাশেদ কে ভুলতে পারবোনা।
কাব্য ভ্যাবাচেকা খেয়ে বলে,
– লিমনের সাথে বিয়ে করলে সংসার করবেন না?
– ওই আইনজীবীর সাথে সংসার করার চেয়ে লিমনের সাথে করা ভালো।
লিমন ক্ষীন হেসে বলে,
– আচ্ছা এইকারণ ? তাহলে ঠিক আছে চলুন। আমার আপত্তি নেই।
কাব্য ক্রোধে বললো,
– কিসের আপত্তি নেই। তাহি আপা এসব কি বলছেন আপনি? লিমন একটা মানুষ। আপনি মনের মাঝে রাশেদ ভাইকে রেখে লিমনকে ট্রাম্প কার্ড বানিয়ে বিয়ে করাটা কি প্রতারণা নয়?
তাহি লিমনের দিকে তাকিয়ে ওর ভাব বুঝার চেষ্টা করলো। তাহির হাত এখনো শক্ত করে ধরে আছে লিমন। তাহি জোরে দম ফেলে বললো,
– বাসার সবাই আমাকে বিয়ে দিবেই। বাধ্য হয়ে অপরিচিত একজন মানুষকে বিয়ে করার চেয়ে পরিচিত লিমনকে বিয়ে করাই ভালো। লিমন রাশেদকে শ্রদ্ধা করে। আর যাই হোক কখনো রাশেদ রিলেটেড কিছু হলে লিমন আমাকে অপদস্ত করবেনা। ওর জায়গায় অন্য কেউ হলে অবশ্যই করবে। বিধবা তকমা তো লেগেছে বেশ কয়েক বছর। সম্মানের চোখে কয়জন দেখে? সেদিক থেকে লিমনের উপর ভরসা করতে পারি।
কাব্য প্রশ্ন করে,
– আর ভালোবাসা?
তাহি নিশ্চুপ। বৃষ্টির তেজ কমেছে। লিমন তাহির হাত ছেড়ে একটু সামনে এগিয়ে গেলো। একটা সি এন জি ডেকে এনে বললো,
– চলুন। কাব্য তুই ও উঠ।
কাব্য বিরক্ত তাহির উপর। স্বার্থপর মেয়ে। নিজের প্রয়োজনে আজ ঠিকই ছুটে এলো। লিমনের মনে কি চলছে বুঝার উপায় নেই কারো। সি এন জি চলছে। মনে উৎকন্ঠা, ভয়। চোখে জল তাহির। গাড়ি থামলো কাজী অফিসের সামনে।
কাজীর সামনে দুজন। সাক্ষী হিসেবে ডাক দিয়েছে হামজা,তুহিনকে। তাহি ফোনে কাকে যেন লোকেশন পাঠালো। অপেক্ষা করছে সকলে তার আসার জন্য। ভেতরে ঢুকতেই কাব্য এবং লিমনের চক্ষু ছানা বড়া। কাব্য ভ*য় পেয়ে আমতা আমতা করে বললো,
– ছো ছোট দা*।
শাহীন আর পাভেল ইশারা দিলো বিয়ে শুরু করতে। লিমন একবার তাহির দিকে তাকিয়ে মনোযোগ দিলো কাজীর দিকে। স্পষ্ট বুঝতে পারছে তাহি সমস্তটা প্ল্যান করেই এসব করেছে। তাহিকে কবুল বলতে বলাতে মেয়েটা গড়িমসি না করে গড়গড় করে বলে দিলো। মনে হলো যেন কবুল বললেই বেঁচে যাবে। এদিকে লিমনকে বলতে বলায় লিমন নিশ্চুপ। জীবনের এত বড় একটা সিদ্ধান্ত মা, বড় বাবা আর বড় ভাইজান থাকবেনা ব্যাপারটা অনুচিত, অকল্যাণকর। এদের দোয়া ছাড়া আগাবে কি করে জীবনে?অথচ আজকের দিনটা বড্ড আকাঙ্ক্ষার, স্বপ্নের ছিলো। ধ্যানে ফিরে রোবটের মত তিন কবুল বলে দিলো। স্বাক্ষর করে চুপ করে নিজের জায়গায় বসে আছে। তাহির দুচোখ বেয়ে পানি ঝরছে। শাহীন এগিয়ে আসতেই ভাইকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে দিলো। পাভেল লিমনের কাঁধে হাত রেখেছ। সবার পিঠ দেয়ালে ঠেকে গিয়েছিলো। কাব্য না পারতে শাহীনকে আজ সকালে সব জানিয়ে দিয়েছে। ভাইজান যখন রাতেই জানালো তাহির বিয়ের কথা শাহীন প্রস্তুতি নিয়েছিলো পরশু ঢাকা ফেরার। কাব্যের মুখে সব শুনে অপেক্ষা করেনি সকালেই রওয়ানা হয়েছে। নিলয় যদিও পাভেল শাহীনের বন্ধু তবে কাব্যের মুখে যা শুনেছে তাহির প্রতি লিমনের অনুভূতির ব্যাপারে এরপর আর নিলয়কে সেই ঝামেলাতে জড়াতে অনিচ্ছুক ছিলো শাহীন। পাভেলকে জানাতেই পাভেল আঁইঢাঁই করছিলো বসের ভ য়ে। শাহীন নি র্ভয় দেয়াতে দুজনে মিলে কাজটা করেই ফেললো।
কাজী অফিস থেকে বেরিয়ে এসে কাব্য কাঁদো কাঁদো মুখে বলে,
– ও ছোট দা* আমরা কোথায় যাবো?
পাভেল শুকনো ঢোক গিলে বলে,
– কই আর বাঘের ডেরায়। আজকে সব কয়টার গো*স্ত চিবিয়ে খাবে দেখিস।
শাহীন ধমক দিলো,
– চুপ থাক। প্রেম করিস নাতো তাই বুঝিস না প্রেমিকের কষ্ট। আমাকে ভাবতে দে।
পাভেল মনে মনে বলে,
– নাহ একদমই বুঝিনা, শুধু ঘর থেকে উচ্ছেদ করে দিলো আদর করে এই আর কি।
এর মাঝেই লিমন বললো,
– বাসায় চলো। আমি ভাইজানের মুখোমুখি হবো। আম্মুও ওখানে আছে।
শাহীন প্রশ্ন করলো,
– তুই নিশ্চিত?
সায়রে গর্জন পর্ব ৪৬
– শতভাগ। ছোট দা* উপায় নেই তো। এত বড় প্রতারণা করবো মানুষটার সাথে? বিশ্বাস করে আমাকে। কি করলাম এটা। আবেগের জোর এতই বেশি যে আপন জনকে ঠকিয়ে ফেললাম।
হতবাক প্রতিটি চেহারা। তাহির মনে হলো এত বড় অপরাধ সে নিজের কথা ভেবে করে ফেললো! লিমন না বুঝালে হয়তো টের পেতোনা। লিমন তাহির দিকে তাকিয়ে বললো,
– ডাক্তার তাহি আপনি ভাববেন না। সামলে নেব আমি সবটা। আপনার গায়ে আঁচ লাগবে না।
