সায়রে গর্জন পর্ব ৪৯
নীতি জাহিদ
প্রতিটি মেয়ের জীবনে প্রথম পুরুষ তার বাবা। সন্তানের কাছে বাবা একজন অসামান্য ব্যক্তিত্ব। যার তুলনা শুধু বাবা নিজেই। বাবার জায়গা কারো পক্ষে দখল করার সাধ্য নেই। সব প্রশ্নের সহজ সমাধান বাবা। বাবা-সন্তানের বন্ধন অন্য প্রতিটি বন্ধনের চেয়ে অনেক বেশি দৃঢ়,মজবুত। সুলতানা মঞ্জিলে সেই সম্পর্কে আজ চোট লেগেছে। ভাববার বিষয় চোট কতখানি গভীর?
মেয়ের মাথায় পানি দিতে ব্যস্ত দিয়া। সুলতানা কবির নাতনীর হাতে পায়ে তেল মালিশ করছে। ছোটদের রাগ থাকেনা, কষ্ট হয়না, এতকিছু কি বুঝে এতটুকু বাচ্চা! এসব কথা শুনেই বড় হয় মানুষ নামক সামাজিক জীব। অতি অপ্রিয় মিথ্যা এটি। একজন প্রাপ্ত বয়স্ক,বুঝদার মানুষ রাগ, দুঃখ এবং কষ্ট প্রকাশ করার ক্ষমতা রাখে। কিন্তু শিশু পারেনা বোঝাতে। তার মানে এই নয় যে তার রাগ নেই,কষ্ট নেই। মানসিক কষ্ট ছোট থেকেই শুরু হয়। মস্তিষ্কের বিকাশ ঘটে শিশু কাল থেকে। তাদের কষ্ট প্রকাশ পায় অন্যভাবে। এই যে বাবার ধমক, রাগ, কোলে না নিয়ে তাচ্ছিল্য বাচ্চা মেয়েটার অবুঝ হৃদয়ে এমন ভাবে আঘাত দিলো শরীর কেঁপে জ্বর এসেছে। কেঁপে কেঁপে কাঁদছে ঘুমের মাঝে। হঠাৎ করে উঠে চিৎকার দেয়। মাঝে মাঝে বাবা ডাকে। সুলতানা কবিরের কান্না বন্ধ হচ্ছেনা। নাতনীর পাশ থেকে সরছে না। শাহাদের ফোন বন্ধ। দিয়া স্বাভাবিক আছে। সবাইকে হেসে বললো,
– এত চিন্তা করছেন কেনো আপনারা? মাঝে মাঝে বকা খাওয়া ভালো। বেশি আহ্লাদে রাখলে ঝামেলা। এখনি দেখেন যেই না ঝাড়ি দিলো অমনি জ্বর বাঁধিয়েছে। বড় হলে তো টু শব্দ ও করা যাবেনা।
রত্না ভেজা গলায় বলে,
– চুপ করো বৌমা। ওই দুই অপরাধীর জন্য আমাদের শেহজাটার এই অবস্থা। এই নিষ্পাপ বাচ্চাটার দোষ হলো, সে লিমন-তাহির ভাইঝি।
মোমেনা এসেছে মেয়েকে সাথে নিয়ে রেদোয়ানের সাথে দেখা করতে। মনি হুইলচেয়ারে বসে আছে। টাকার প্রতি লোভ লালসা তো তার ছিলোনা। কাউকে ভালোবেসে এতটা নিচে নেমেছিলো যে একটার পর একটা ভুল করেছে,অন্যায় করেছে। পাপ কাজে লিপ্ত হয়েছে। নিজের চরিত্রে দাগ লাগিয়েছে।
অন্ধ ভালোবাসা বরাবরই খারাপ। শাহাদের দিকে হাত বাড়িয়ে যে ভুলটা করেছে তার মাশুল আজ পুরো পরিবারকে গুণতে হচ্ছে। চাইলে জীবনটা আরো সুন্দর হতে পারতো। কারো কোনো ক্ষতি হলো না। যা হওয়ার নিজের হলো। বাবাও ঠকালো মাকে। এখন বড় বাবার আশ্রয়ে থাকতে হয়। বাবাকে জেল ছাড়ানোর কোনো উপায় জানা নেই। হত্যা মামলার আসামী রেদোয়ান। শুনেছিলো মুরাদ নামে বাবার একজন কাছের বন্ধু ছিলো। অথচ সেই বন্ধু ও তার স্ত্রীকে বাবা কিসের লোভে খুন করলো? শাহাদ জানে সেই কথা৷ এখন বাবার পাপের সর্বোচ্চ সাজা হবে। বাবার আদরের পরী আজ পথের ভিখারি।
বাবার সাহস বরাবরই বেশি ছিলো। অথচ মা মেয়ে ভেবেছে তা সৎ সাহস ছিলো। রক্তে এদের সাহস। কেউ সেই সাহস সৎ কাজে লাগিয়েছে আর কেউ অসৎ কাজে। সব কটা ভাই এক বাবার। রায়হান সাহেব ঠিক যতটা নিষ্ঠাবান ছিলেন, রেদোয়ান ছিলো বিপরীত। দুই পরিবার দু রকম শিক্ষা পেয়েছে। মনির সাজা হতে পারতো তাহিকে ফাসানোর দায়ে, ইয়াজের নামে রেইপের তকমা লাগানোর জন্য সর্বশেষ শাহাদের সম্মানহানির জন্য। মনিকে মাফ করে দিয়ে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করেছে ও বাড়ির মানুষজন। টাকার সম্পর্ক ছাড়া কেউ সম্পর্কে রাখতে নারাজ।
স্কেজেউল অনুযায়ী বিকেলের মিটিং,কাজ শেষ করে সবে মাত্র ফোন হাতে নিলো। রাগ করে আজ পাভেলের সাথে কথা বলছেনা। ওকে আসতে বারণ করেছে। মিটিং রুমে জ্যামার থাকার কারনে ফোনে নেটওয়ার্ক ছিলোনা, কারো সাথেই যোগাযোগ করা হয়ে উঠে নি। সব সামলে হাঁপিয়ে উঠে মাঝে মাঝে। শাহীনের মেসেজ দেখে ঘাবড়ে গেলো।
হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে এলো অফিস থেকে। ড্রাইভারকে বললো স্পিড তুলতে ৮০। বিকেল বেলা। রাস্তা ফাঁকা আজ। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সুলতানা মঞ্জিলে পৌঁছাতে হবে। শাহীনের মেসেজ ঢুকার পর নিজেকে স্থির রাখতে পারছেনা৷
গাড়ির আওয়াজ শোনা যাচ্ছে নিচে। রায়হান সাহেব কিছুটা স্বস্তি পেয়ে বললো,
– এইতো শাহাদ এসেছে। এবার যদি আমার নাতনীটা শান্তি পায়।
মেয়েটা মায়ের কোলে। কারো কাছে যাচ্ছেনা। কিছু খেতে চাইছেনা। জ্বর একশ তিন। কয়েক বার বমি করেছে জোর করেছে খাওয়ানোতে। দিয়া হাল ছেড়ে চুপ করে বসে আছে।
ধুপধাপ পা ফেলে নিচ থেকে ছুটে এসেছে। যেভাবে দৌঁড় দিয়েছে বাকিরা বিচলিত হয়ে গিয়েছে। জান হাতে দিয়ে এসেছে। কে জানতো সকালের ঘটনা এত বড় রূপ ধারণ করবে? শাহাদ গায়ের ব্লেইজার ছুঁড়ে মে*রে শার্টের হাতা গুটিয়ে দিয়ার কোল থেকে শেহজাকে নিতে চাইলো। শরীর ছুঁতেই শাহাদ কেঁপে উঠলো। ধোঁয়া বের হবে এমন উত্তপ্ত গরম। ছোট্ট শরীরটা এই গরম কিভাবে সইছে? পিটপিট নয়নে মেয়েটা তাকিয়ে আছে বাবার দিকে। হাত বাড়িয়ে মেয়েকে কোলে নেয়ার চেষ্টা। বাবার কোলে যেতে চাইছেনা। শাহাদ পুনরায় চেষ্টা করলো। এবার দিয়াকে আরো শক্ত করে আকড়ে ধরলো শেহজা। মুখ ঘুরিয়ে নিলো শাহাদ থেকে। শাহাদের চক্ষু ছানা বড়া। দিয়ার দিকে তাকিয়ে বললো,
– আসছেনা কেনো?
দিয়া কিঞ্চিৎ হেসে বললো,
– হয়তো ভ য় পেয়েছে বা রা/গ করেছে। সমস্যা নেই আপনি ফ্রেশ হয়ে নিন। স্বাভাবিক হয়ে যাবে ও।
শাহাদ ক্ষে পে উঠলো,
– অসম্ভব।
মেয়ের দিকে তাকিয়ে হাত বাড়িয়ে বললো,
– আম্মা আসো। এইতো বাবা চলে এসেছি।
বাচ্চার ভেতর কতটা অভিমান জমেছে হয়তো এমন চিত্র না দেখলে কেউ বুঝতেই পারতোনা। চিৎকার দিয়ে কেঁদে মুখ ফিরিয়ে নিলো। খামছে ধরেছে দিয়ার শাড়ি৷ শাহাদের কলিজা ধক করে উঠলো। মেয়ে মুখ ফিরিয়ে নিলো! মেনে নিতে পারছেনা শাহাদ। যেই মেয়ে বাবা ছাড়া কিছু বুঝেনা, বাবার পায়ের আওয়াজ শুনলেই খুশিতে উচ্ছ্বসিত হয়, দূর থেকে গলা শুনলে বাবা বাবা বলে চিৎকার দেয়, বাবার কাছে ঘন্টার পর ঘন্টা থাকে। বাবাকে পেলে যেই মেয়ে মাকে ভুলে যায়। বাবার শার্ট, পাঞ্জাবি, টি শার্ট জড়িয়ে ঘুমায়, আজ সেই মেয়ে বাবার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলো।
মুহূর্তে মুখাবয়বে পরিবর্তন এলো শাহাদের। অসহায় চোখে দিয়ার দিকে তাকিয়ে বললো,
– সরো তুমি? আমার মেয়েকে আমার কোলে দাও।
দিয়া মুখটাকে অসহায় করে বললো,
– যেতে চাইছেনা তো আমি কি করবো?
শাহাদ জোর করে ছিনিয়ে নিতে চাইছে। এদিকে রায়হান সাহেব, সুলতানা সবার বারণ সত্ত্বে ও কাউকে তোয়াক্কা করছেনা এক্স লে.কমান্ডার। সুলতানা বলছে,
– বাবু, মেয়েটাকে আর কষ্ট দিও না। ব্যাথা পাবে।
রায়হান সাহেব ও একই কথা বললেন,
– তুমি ফ্রেশ হও। ডাক্তার ডেকেছি। এসে একবার দেখে যাক।
কে শুনে কার কথা! শাহাদ বার বার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে মেয়ের দিকে কোলে নেয়ার জন্য। যত ধরছে মেয়ের কান্নার জোর বাড়ছে। জোর করে মেয়েকে কোলে নিলো। মেয়েটা কোলেই কাঁদছে অনবরত। নেমে যেতে চাইছে। ছটফট করছে নামার জন্য। গা উত্তপ্ত। মেয়ের চিৎকার শুনে নিজেকে আর সামলাতে পারলো না গম্ভীরমুখো এক্স কমান্ডার। কেঁদে দিলো উচ্চস্বরে সকলের সামনে,
– আম্মারে বাবা আর বকা দিবোনা। এমন করেনা তো আম্মা। বাবাকে মাফ করে দেন।
শেহজা আরো জোরে কাঁদছে। মেয়ের সাথে কাঁদছে বাবাও, চোখ বেয়ে পানি পড়ছে। বুকের সাথে চেপে ধরে রেখেছে। বাবা মেয়ের কান্নায় রুম ভারী হয়ে উঠেছে। বাকিরা ভীত শাহাদের অবস্থা দেখে। বর্তমান পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে মেয়ের কিছু হলে তো সে পাগল হয়ে যাবে! এমন ভাবে কথা বলছে নিশ্বাস যেন আটকে আছে। শাহাদের কথা শুনে মনে হচ্ছে পাগলের প্রলাপ বকছে,
– আপনি এমন করছেন কেনো আম্মা? বাবা কষ্ট পাচ্ছে তো। বাবা ম*রে যাবো আম্মা আপনি মুখ ঘুরিয়ে নিলে। একবার বাবা বলেন আম্মা৷ অনেক বড় অন্যায় করে ফেলেছি আজ আমার মাকে বকে৷ আর কোনোদিন ও বকা দিবোনা। আপনি আমাকে বকা দেন, মা*রেন। তাও মুখ ফিরিয়ে নিয়েন না আম্মা। কথা বলেন?
মেয়ের সারা শরীরে হাতে,মুখে আদরে ভরিয়ে তুলেছে। নেতিয়ে যাচ্ছে শেহজা। শাহাদ চিৎকার দিয়ে বললো,
– শেহজা…আম্মা কি হয়েছে?
মেয়েকে নিয়ে বের হয়ে গিয়েছে রুম থেকে। জ্বরের ঘোরে মেয়ে আরো বেশি জ্বালাচ্ছে। শাহীন পাভেল,কাব্য এবং লিমন ও পিছনে ছুটেছে। দিয়া খাটের হেডবোর্ডে হেলান দিয়ে নিশ্চুপ,নির্বাক। শরীর চলছেনা। শাহাদ গেট দিয়ে মেয়েকে নিয়ে বের হয়ে একটা রিকশায় চড়ে বসলো। হুঁশ হারিয়ে বসেছে শাহাদ। গাড়ি ফেলে রিকশায় উঠেছে। তার সাথে বাকিরাও দুইটা রিকশা নিয়ে শাহাদের পিছু নিলো। হাসপাতালের সামনে এসে দাঁড়ায় রিকশা।
ভয় পেয়ে মেয়েটার এমন হয়েছে। কাঁদতে কাঁদতে জ্বর এসেছে। ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী জোর করে মেডিসিন খাইয়ে দিলো। সারাদিন কিছু না খাওয়াতে শরীর দূর্বল। বাসায় নিয়ে খাওয়ানোর পরামর্শ দিলেন। জ্বর কমার জন্য ঔষধ দিলেন। কোলে নিয়ে হাঁটাহাঁটি করতেই ঘুমিয়ে পড়লো বাবার কোলে। আশে পাশে মানুষজন আছে৷ বাইরে ভিড় ও আছে। মেয়েকে কোলে নিয়ে ডাক্তারের চেম্বার থেকে বের হতেই দেখতে পেলো সব ভাইয়েরা সামনে। কথা না বাড়িয়ে চিন্তিত মুখে হেঁটে বেরিয়ে এলো৷ পাভেল উবার ডেকেছিলো। সবাই মিলে উঠে পড়ে। শেহজাকে বুকে চেপে রেখেছে। আর কত রাগ দেখাবে!
বাড়ির সামনে গাড়ি থামতেই বেরিয়ে এলো। থমথমে পরিবেশ সুলতানা মঞ্জিলের। সকলের অপেক্ষা সুলতানা মঞ্জিলের জান নিয়ে ফিরে আসার। মেয়ে অনেকটাই শান্ত বাবার কোলে। বাড়ির ভেতরে ঢুকতেই সুলতানা কবির এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলেন,
– কি অবস্থা বাবু? ডাক্তার কি বলেছে?
মেয়েকে নিয়ে সোফায় বসেছে শাহাদ। মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বললো,
– আম্মু আজকে আমার মেয়েটার কিছু হলে আমি সত্যিই ম*রে যেতাম।
চোখ মুখ লাল হয়ে আছে শেহজার। ভাপ যাচ্ছে শরীর দিয়ে৷ শাহাদের সাদা শার্ট ভিজে গিয়েছে নিজের ঘাম ও মেয়ের শরীরের উত্তাপে। বদলানো দরকার। অথচ মেয়েকে বুক থেকে সরাতে ইচ্ছে করছেনা। সকালে যেই কান্ড ঘটিয়েছে, সবার রা*গ মেয়েটার উপর ঝেড়েছে। এখনো শাহাদের চোখে পানি। শার্টের হাতায় চোখের পানি মুছে নিরবে মেয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। সত্যি ম*রে যাবে এই মেয়ের কিছু হলে। শাহাদের সবটা জুড়ে এই শেহজা। মেয়েকে আদর করছে তৎক্ষণাৎ চোখ গেলো তাহির দিকে। দরজা ধরে দাঁড়িয়ে কাঁদছে। উঠে দাঁড়ায় শাহাদ। তাহির সামনে যেতেই ওড়নায় মুখ মুছে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়ায়। এক হাত বাড়িয়ে দিতেই শাহাদের বুকে ঝাপিয়ে পড়ে জোরে কেঁদে দেয়। কোলে শেহজা, আরেক পাশে তাহি। কাঁদতে কাঁদতে বলছে,
– আমি বুঝিনি ভাইজান আপনি এত কষ্ট পাবেন। আমি আর এমন কাজ করবোনা। আপনি ছাড়া কেউ নেই আমার। আমাকে মাফ করে দেন। বাবা নেই কখনো বুঝতে দেন নি আপনি আর খালুজান। আপনি যদি আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন আমার কি হবে?
শাহাদ হালকা হেসে বলে,
– কান্না বন্ধ কর। যা হবার হয়েছে। আমি সবসময় আছি ইনশাআল্লাহ। যেভাবে যা করলে ভালো থাকবি তাই কর।
লিমনকে ইশারায় ডাকলো। গুটি পায়ে এগিয়ে আসলো। তাহিকে ছেড়ে লিমনকে বুকে নেয়। লিমনের চোখেও পানি তবে মুখে কথা নেই। বুকে চেপে ধরে বললো,
– আমি যা জানি তোর সম্পর্কে অনেকেই অনেক কিছু জানেনা। সেই জানা থেকে বড় ভাই হিসেবে আমি তোকে শুধু স্নেহই করিনা, শ্রদ্ধা ও করি। দুজনের সিদ্ধান্তকে আমি শ্রদ্ধা করি, ভবিষ্যৎ তোদের হাতে। সাজিয়ে নেয়। অতীতকে মনে করে ভবিষ্যত নষ্ট করার প্রয়োজন নেই। ঠিক আছে?
লিমন মাথা ঝাঁকিয়ে বললো,
– জ্বি ভাইজান।
দুজনের মাথায় হাত বুলিয়ে শাহাদ বললো,
– ঠিক আছে সবাই বসো আমি ফ্রেশ হয়ে নিই। শেহজা জন্য ভেবো না। ঠিক হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।
রুমের দিকে যাওয়ার আগে দিয়াকে ডেকে নিলো,
– ফারাহ্ রুমে আসো কথা আছে।
পুনরায় থেমে শাহীন এবং পাভেলের দিকে তাকিয়ে বললো,
– কালই ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ডাকো। সব ব্যবস্থা করো বাগানে। আমাদের ক্লোজ গেস্টদের ইনভাইট করো। ঘরোয়া বিয়ে পড়ানো হবে। আর এই ক্রিমিনাল দুটোকে আলাদা রুমে রাখার ব্যবস্থা করো।
লিভিং রুমে বোম পাঠিয়ে নিজের রুমে চলে গেলো শাহাদ। বাকিরা থতমত খেয়ে গেলো। রায়হান সাহেব আর সুলতানা বেগম মুখ টিপে হাসছে। অন্যদিকে সাবিনা,রত্না গাল ফুলিয়ে বসে আছে। বাকিরা সবাই হো হো করে হাসতে হাসতে মাটিতে গড়াগড়ি খায় মত অবস্থা। মুহুর্তে পরিস্থিতি বদলে গেলো। সুলতানা কবির উঠে দাঁড়ায়। রায়হান সাহেবকে বলে,
– বাবুর বাবা সবাইকে ফোন দাও। যা করার তাড়াতাড়ি করতে হবে। আর সাবিনা, রত্না আমার সাথে আসো কাজ আছে।
শিফা কালকের পর আজ বিকেলে এসে সব শুনে চুপ হয়ে গিয়েছে। ভাইজানের রিয়েকশন শুনে ভয়ে আশ পাশে থাকানো বন্ধ করে দিয়েছে। অন্য দিকে পাভেল শিফাকে দেখলে পালাই পালাই অবস্থা।
ঘড়িতে এখন সন্ধ্যা। নওরীন,শিফা,শেফালী বাকি কাজিনদের ফোন দিয়ে চলে আসতে বলেছে আধ ঘন্টার মধ্যে। নিজেদের মাঝে প্ল্যান করলো ঘরোয়া একটা হলুদ আজই হয়ে যাক। শাহাদের কাছ থেকে অনুমতি নেয়া শেষ। মঞ্জিলা রীতিমতো রওয়ানা দিয়েছে পরিবার নিয়ে। রেদোয়ানের সাজা শুনানির সময় দেশে এসেছিলো। যত যাই হোক ভাই বলে কথা। নিশাদ বউ এবং নিশিকে নিয়ে এসেছে বেশ কিছুদিন আগে। সুলতানা মঞ্জিল আবার আরেকটা বিয়ের সাক্ষী হতে যাচ্ছে।
মেয়েকে বুকে আগলে রেখেছে, সহাস্য বদন। কিছুক্ষণ পর পর মেয়ে বাবার গাল,নাক,চোখে চুমু দিচ্ছে। বাবাও মেয়েকে আদরে আদরে ভরিয়ে দিচ্ছে।
চোখ ফেরানো দায় এই ধূসর রঙা চোখের মানবের উপর থেকে। ভাবনায় যখনই হানা দেয় মানুষটি তার, মনের ভেতর প্রজাপতি উড়ে। গম্ভীরমুখো মানুষটি যখন তার ছোট্ট হাত পায়ে বেড়ে ওঠা মেয়ের সাথে ব্যক্তিগত আলোচনায় ব্যস্ত, তার ঘোরে বিভোর তখন ছোট্ট প্রানীর মা। মেয়ে এখন বেশ খানেকটা সুস্থ। বাবার উপর রাগ করে জ্বর বাঁধিয়েছে ছোট্ট প্রাণ খানা। রক্ত বলে কথা। কি প্রবল তেজ! কথা ছোঁয়ানো যাবেনা! খোদ শাহাদ ইমরোজকে ও এই মেয়ে গোল খাইয়ে দিলো। মেয়েকে খাওয়ানোর জন্য যেই সময়টুকু বরাদ্দ ছিলো তাতেই এক্স লে.কমান্ডার তার পোশাক বদলে এসেছে। দুটো ঘন্টা যাবৎ বুকে নিয়েই বসে আছে, এর মাঝে মেয়ের জ্বর ছেড়ে দিয়েছে। রাজ্যের গল্প জুড়ে দিয়েছে মেয়ের সাথে। ছোট্ট পাখির মতো ঠোঁট আওড়ে হাজারো অভিব্যক্তি। একটু পর পর কিছু দূর্বোধ্য ভাষা উত্থাপিত করছে বাবার সামনে। মনে হচ্ছে যেন বকা দেয়ায় অভিযোগের ঝুড়ি নিয়ে বসেছে। কমান্ডার সাহেবের অবস্থা দেখে দিয়া হাসছে। মেয়ের সব প্রশ্নের উত্তরে মুখের অবস্থা করুন করে দুঃখিত জানাচ্ছে । এই যেমন এখন মেয়েকে উত্তর দিচ্ছে,
– একদম আমার আম্মা সব ঠিক বলে। হ্যাঁ তাই তো বাবা পঁচা। দাদা… আচ্ছা দাদাকে বলবো বাবাকে বকে দিতে কেমন।
মেয়ে মাথা ঝাকাচ্ছে। দিয়া চক্ষু ছানা বড়া করে এদের বাপ-কন্যার অবস্থা পরোখ করছে ঠোঁট উলটে। আলোচনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাঁধা দিলেই কেলেঙ্কারি হবে এমন অবস্থা। এক পর্যায়ে দিয়া বলে উঠলো,
– অনুগ্রহপূর্বক একটু কি তাকাবেন বাবা- মেয়ে?
দুজনই তাকিয়েছে একসাথে। হেসে দিয়া বললো,
– ধন্যবাদ পিতা ও কন্যা। কন্যার পিতা এই মেয়েকে কি সারাজীবন নিজের কাছে রেখে দিবেন?
স্ত্রীর কথা শুনে চিন্তিত ভঙ্গি করলো। যেন উত্তর খুঁজতে ব্যস্ত। কিছুটা ভেবে বললো,
– দূরে যাওয়ার কারণ?
– মেয়েরা কি বাবার কাছে সারাজীবন থাকতে পারে?
শাহাদ মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলে,
– আম্মা, চলে যাবেন বাবাকে ছেড়ে? থাকতে পারবেন?
মেয়ে কি আর বুঝে!
অসহায় বদনে উত্তর দিলো,
– জানিনা কি করবো? সে অনেক পরের কথা। মেয়ের বাড়ির পাশে একটা ছোট্ট একটা টিনের বাড়ি বানিয়ে মেয়ের মাকে নিয়ে বাসা বাঁধবো। মেয়েটাকে সারাদিন নিজেদের কাছে রেখে রাতে জামাইর কাছে পাঠাবো। সহজ সমাধান।
– ইশ! আপনি কত আমাকে বাপের বাড়ি যেতে দেন…
– দিই না বলছো? ছিলেনা বুক খালি করে দু মাস?
– কোথায় বুক খালি ছিলো প্রতি সপ্তাহে চলে যেতেন।
– সে তো মেয়ের জন্য।
দিয়া ভ্রু কুচকে ঠোঁট বাকিয়ে বললো,
– ঠিক আছে মাথায় রাখলাম।
রুম থেকে বের হয়ে যাবার প্রস্তুতি নেবে, সিংহের ন্যায় ক্ষীপ্র গতি চালিয়ে খপ করে হাত ধরে নিজের সাথে মিশিয়ে নিলো। নিশ্বাস আছড়ে পড়ছে মুখ জুড়ে। ঠোঁট কামড়ে দুষ্টু হাসি মানুষটার অধর কার্ণিশে। ফুঁ দিলো কেশবতীর ললাট জুড়ে থাকা চুলে। আর কত ঘোরে আচ্ছন্ন করবে মানুষটা। এভাবে আকর্ষিত করলে যে কোনো নারী প্রেমে হাবুডুবু খেয়ে যমুনার জলে গলায় কলসী বেঁধে ডুব দিতে চাইবে। এমন নয় যে স্বামী নতুন, তবুও কেনো ঘোর থেকে বের হয়ে আসা দুষ্কর। চোখের মনিতে যার প্রেম ভাসে, নাকের সূঁচালো ধার যেন বলে দিচ্ছে তার ব্যক্তিত্ব কতটা প্রখর। চোখের মোটা মোটা পুরুষালি পাপড়ির মোহে আটকে গিয়েছে মন। সাক্ষাৎ সর্বনাশ এই পুরুষ। দূরে থাকাই শ্রেয় নারী জাতির।
– যা বলিনা তা বুঝে নিতে পারোনা?
সেই ভারী কন্ঠস্বর। ঢোক গিলতেও গলা কষ্ট বোধ করছে। কি বুঝাতে চাইলো! কি বুঝে নিতে বললো? মাঝে মাঝে অতি দুষ্টু, কখনো কখনো রহস্য। পুনরায় শীতল মোহ জাগানো স্বর,
– মেয়ের চোখ দুটো ঢাকো।
সায়রে গর্জন পর্ব ৪৮
ভ্রু কুচকে এলো দিয়ার। গাঢ় চোখের চাহনীতে কথা না বাড়িয়ে যা করতে বলা হয়েছে তাই করলো।
শক্ত অমসৃণ পুরুষালি এক হাত দিয়ার কোমড়ে, অন্যহাতে কোলের মেয়েকে শক্ত বেষ্টনীতে আবদ্ধ করেছে। দিয়া হাত দিয়ে শেহজার চোখদুটো ধরলো। একদিকে মেয়ে ছটফট করছে। অন্যদিকে বাবা মায়ের কোমল ও ষ্ঠে আলতো স্পর্শে স্ব-অধর ছুঁয়ে দিলো উষ্ণতা সমেত। চোখ দুটো আপনা আপনি বুজে এলো। বেশ কিছুটা সময় পর চট করে মেয়েকে নিয়ে সরে গেলো। হতবাক দিয়া। কি করে নেশা লাগিয়ে এমন একটা কান্ড ঘটিয়ে ফেললো। পুরোটা সময় ঘোরেই কে/টে গেলো অথচ অনুধাবন করতে পারেনি। শক্ত পোক্ত ব্যক্তিগত পুরুষটি আরাম করে হেডবোর্ডে মাথা এলিয়ে বললো,
– দিজ বার্মিজ গ্রেইপ ইজ মোর সুইট দেন এনি আদার গ্রেইপ অফ দ্য ওয়ার্ল্ড। নিড ইট রেস্ট অফ মাই লাইফ এজ মেডিসিন।
