Home সায়রে গর্জন সায়রে গর্জন পর্ব ৫১

সায়রে গর্জন পর্ব ৫১

সায়রে গর্জন পর্ব ৫১
নীতি জাহিদ

মেয়েকে তৈরি করে মনোযোগ দিয়ে দেখছে দিয়া। দোয়া পড়ে ফুঁ দিলো মেয়ের শরীরে যাতে বদ নজর না লাগে। এই প্রথম ছোট্ট শেহজা ফুফি-চাচ্চুর বিয়েতে লাল লেহেঙ্গা পরেছে। মেয়ের ঝাঁকড়া চুলে ফুল পেঁচিয়েছে। ঘুরে ঘুরে খাটের উপর লাফাচ্ছে। দিয়া হিমশিম খাচ্ছে মেয়েকে নিয়ে। পাশ থেকে একটা খেলনা নিয়ে খেলতে বসিয়ে দিলো। এই সুযোগে নিজে তৈরি হয়ে নিচ্ছে। বাকিরা বাইরে সাজছে।
তাহির শরীরে কিছুক্ষন আগে মা,খালা হলুদ ছোঁয়ালেন। খুবই সাধারণ ঘরোয়া হলুদের আয়োজন ছিলো। সন্ধ্যা হতেই বিউটিশিয়ান এসে সাজানো শুরু করেছে। দিয়া সেজেছে আজ বাঙালী রাজবধূ সাজে। হাতে মোটা মানতাশা, রতনচুড়, গলায় বাহারী সিতা। মেজেন্ডা পাড়ে জরি সুতায় জড়ানো কালো কাতানের প্রতিটি কুচি থাকে থাকে সাজানো। এক হাতে ফুলের গাজরা। শেহজা ছটফট করছে। হাঁটা শেখার পর থেকে একটুখানি চুপচাপ বসতে নারাজ মেয়েটা। মেয়েকে অতিষ্ট হয়ে মৃদু ধমক দিলো,

– শেহজা, চুপ করে বসো। এমন করছো কেনো? বাইরে নিবোনা। পিট্টু দিব বলে দিলাম।
চোখ রাঙিয়ে তাকায় মেয়ের দিকে। মেয়ে গাল ফুলিয়ে টলমল চোখে উচ্চারণ করে,
– বাবা দাবো, বা বা আ আ আ আ।
ফোনে কথা বলতে বলতে উদয় হলো স্ব কামরায়। চাবি দিয়ে নিজেই লক খুললো কামরার। গলার ভারী আওয়াজে স্পষ্ট, গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা চলছে ফোনে৷ আয়নায় শাড়িটি ঠিক করে মেয়েকে খাটে দাঁড় করিয়ে মেয়ের পোশাক ঠিক করে দিচ্ছে। অন্যদিকে আহ্লাদী কন্যা বাবা আসার আলামত পেয়ে গলা ছাড়লো পূর্বের চেয়ে তীব্র আওয়াজে। কান থেকে ফোন খানা নামিয়ে ত্রস্ত্র পায়ে এগিয়ে প্রথমে নজর পড়লো কন্যার দিকে। দ্রুত পা চালিয়ে মেয়েকে কোলে নিয়ে সহধর্মিণীকে বললো,

– শুরু হয়ে গেলো ঝাড়াঝাড়ি…
থেমে গেলো চলন্ত অধর। প্রেয়সীর একি রূপ! এত এত রূপে ভস্ম হলো, এই রূপ তো অচেনা। রাজ বধূ লাগছে। স্বর্ণে মুড়িয়েছে আজ নিজেকে। শুকনো ঢোক গিলে মেয়ের দিকে ফিরে মেয়ের চোখ মুছে দিলো। মিষ্টি হাসি দিয়ে বলে,
– আম্মাজান আপনি ঠোঁটে লাল রঙ লাগিয়েছেন?
কি নাটুকে মেয়ে! বাবাকে দেখে তার ঠোঁটে হাসি। এদিকে চোখ এখনো পানিতে ছলছল। যে কেউ দেখলে এক্ষুনি বলে দিবে এই মেয়ে কাঁদছে। শেহজা ঠোঁটে তর্জনি দিয়ে খিলখিলিয়ে হেসে বলে,
– মা ইবিত্তিক।
শাহাদ মেয়ের কথায় হো হো করে হেসে বলে,
– আপনার ইবিত্তিক সুন্দর আম্মা। মা ইবিত্তিক লাগিয়ে দিয়েছে?
শেহজা ঠোঁট উলটে দেখাচ্ছে,

– ইবিত্তিক লাল
হাতের মেহেদী দেখাচ্ছে,
– মিদী লাল, তেজা লাল।
মানে লিপস্টিক লাল, মেহেদী লাল, শেহজা লাল। একটু করে সব কিছু বুঝতে শিখছে দু বছরের শেহজা। শাহাদ মেয়ের কথায় সায় দিয়ে বলে,
– সব লাল, শুধু শেহজার মা গোলাপী। চোখ জুড়ানো সৌন্দর্য্য।
মেয়ের দিকে তাকিয়েই এসব বলছে। দিয়া ভ্রু কুঁচকে ভাবছে মানুষটা তার দিকে না তাকিয়ে কেনো মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলছে? শাহাদ গলা ঝেড়ে বলে,
– যে সাজে সেজেছো চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে, ভাগ্যিস ইনভাইটেড গেস্টরা সবাই কাছের, নিজেদের আপনজন।
দিয়া নিজের দিকে তাকিয়ে বলে,

– কি এমন সেজেছি, এমন ভাবে বলছেন মনে হয় যেন আমি আসামী।
– মা/রাত্মক অপরাধী তুমি, অন্তরদহনের গন্ধ পাওনা?
বৃদ্ধা আঙ্গুলে ঘষে চট করে টকটকা রানী গোলাপি রঙের লিপস্টিক মুছে দিলো রমনীর অধর থেকে। দু ঠোঁটের মাঝে দূরত্ব এলো মানবীর। হা হয়ে গেলো মুখ গহবর। মানুষটা লিপস্টিক শুদ্ধ বৃদ্ধাঙ্গুল নাকের কাছে নিয়ে সুবাস বোঝার চেষ্টা করলো। মুখে বিরক্তিকর শব্দ করে বলে উঠলো,
– মাঝে মাঝে সব কিছু বেশি বুঝি, কি দরকার ছিলো আঙ্গুলে লিপস্টিকটা মোছার? অনুভূতি নিয়ন্ত্রণ করতে লিপস্টিকটা আঙুলে না মুছে অনুভুতিকে আশকারা দিয়ে ঠোঁট দিয়েই মুছলেই পারতাম! ইশ!এখন আর বলে কি লাভ! যা ভুল করার তো করেই ফেলেছি। ঘড়িতে বাজে আটটা, বসে থাকতে হবে বারোটা অবধি, মর্মে মরিবে হৃদয়।
ফোস করে দম ছেড়ে পুনরায় বললো,

– বাই দ্য ওয়ে, হালকা রঙা লিপস্টিক লাগিয়ে নাও। যার দেখার সে দেখে নিয়েছে গোলাপিতে কুইন ফারাহ্ লাগছিলো। বাকিরা দেখার প্রয়োজন নেই। আমি শেহজাকে নিয়ে ডাইনিংয়ে যাচ্ছি। দেখি ওদিকে কতদূর হলো।
চক্ষুচড়ক গাছ শাহাদ বধূর। স্বামী মানুষটা তাকে দেখিয়ে বৃদ্ধাঙ্গুলে ঠোঁট ছুঁইয়ে জিহবা লাগিয়ে বললো,
– টেস্টলেস। আই প্রেফার মাই পারসোনাল বার্মিজ গ্রেইপ।
দু অধর আলগা করে বিস্মিত মানবী। এই মানুষটা একেকবার একেকরকম কাজ করে। এ রূপের ব্যাপারে যদি পরিবার, বন্ধু সমাজ জানতে পারে হয়তো তাদের মাঝে অনেকের মিনি হার্ট অ্যাটাক আসতে পারে।
ঠোঁট উলটে কাঁদো কাঁদো ভাব করলো দিয়া। চোখ দুটো ছলছল করছে। অনেকটা সময় নিয়ে আজ আউটলাইন করে লিপস্টিকের কয়েকটি শেড মিলিয়ে প্রপার শেড দিয়েছিলো। লোকটা এসে সব ভেস্তে দিলো। দিয়ার করুন অবস্থা দেখে শাহাদ ঠোঁট কামড়ে হাসছে। হায়! লিপস্টিকটা মোছাতে বেচারীর অবস্থা দেখার মতো হলো। শাহাদ যেতে যেতে বললো,
– এটা তোমার শাস্তি ফারাহ্ শাহাদ। কিছুক্ষন আগে আমার মেয়েটাকে কাঁদিয়েছিলে না।

লিভিং রুমে বাড়ির পুরুষরা সবাই। সাথে আছেন কাজী সাহেব। তাহিকে বিয়ে পড়ানোর পরই আনা হবে। রুমে সবার গমগমে অবস্থা। কাজী এসে পাশে বসেছে। সেদিন ও এতটা নার্ভাস লাগেনি আজ যতটা কষ্ট ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে। সকলের আড়ালে বলাতে সেদিন মনে হয়েছিলো হাফ ছেড়ে বেঁচেছে। অথচ একই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি মাত্র, তবে কেনো আজ এতটা বিচলিত লাগছে। হৃদ স্পন্দন বেড়ে চলেছে ক্রমশ। কাজী সাহেব বারবার কবুল বলতে বলছে। অথচ তাহি নিরব। কামরা ভিড় ঠেলে শাহাদ সোজা সোজি একটা চেয়ার টেনে তাহির বরাবর বসলো। তাহির মাথায় হাত রাখতেই মেয়েটা সজোরে কেঁদে দিলো। স্বাভাবিক স্বরে শাহাদ বলে উঠলো,

– তাহি কবুল বলো। আল্লাহ যা করেন সবই মঙ্গলজনক। সময় নষ্ট করা তোমায় সাজেনা। সময় নিয়েই তোমার কাজ, এক মিনিট দেরী হলে যেমন তোমার রোগী ছটফটিয়ে শেষ হয়ে যায় ঠিক তেমনি প্রতিটি মিনিটের গুরুত্ব অসীম। শুভকাজ শেষ করো। আমি আছি পাশে। কবুল বলো।
বড় বড় নিঃশ্বাস টেনে তাহি কবুল বললো। কাজী কলম এগিয়ে দিলে স্বাক্ষর করে দেয়। কাজী বেরিয়ে গেলো লিমনের কাছে কবুল শুনে সই নিয়ে বিয়ের পর্ব শেষ করে।
শাহাদ নিজ হাতে বিয়ে দিলো তাহির। সবটা স্বাভাবিক। আচমকা শাহাদ উঠে দাঁড়ায়। বেডরুমে এসে দরজা আটকে দিলো। বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠলো। মনে হলো যেন একটা সাদা চকচকে হোয়াইট বোর্ডে লিখা স্মৃতি গুলো বিস্মৃত হয়ে যাচ্ছে। ড্রয়ার থেকে ছবিটা বের করতেই টুপটুপ করে বারির ন্যায় ধারা বেয়ে পড়ছে নেত্র বেয়ে কাচের ফ্রেমের উপর। হাস্যজ্বল মানুষটা। নাক টেনে ছবির দিকে তাকিয়ে বললো,

– আমি কথা রেখেছি রাশেদ। তোর তাহির একটা ব্যবস্থা করেছি। গত কটা দিন এত পরিমাণ অশান্তিতে কেনো রেখেছিস আমাকে? শান্তিতে চোখ দুটো বুজতে দিস নি। চোখ বুজলেই মনে হতো এসে বলছিস তাহির যেন একটা ব্যবস্থা করি। এখন তোর কি হবে? কে ভাববে তোকে নিয়ে। আমি আর আম্মা ছাড়া তো আর কেউ রইলো নারে? সবাই ভাবে শক্ত পোক্ত কঠিন পুরুষ শাহাদ। তুই তো জানিস আমি কত ভঙ্গুর। অন্যরা বলে শাহাদ ইমরোজের শরীর জুড়ে ক্রোধ অথচ আমি মন খারাপ হলেই তোর কাছে গিয়ে গাল ফুলিয়ে রাখতাম৷ তোকে জড়িয়ে কাঁদতাম। সেদিন কেনো বেঁচে গেলাম আমি? আমার বন্ধু রাশেদ হা/রিয়ে গিয়েছে।

জানিস ফরিদ ম*রাতে সবাই খুশি অথচ আমি খুশি হইনি৷ ও আরো কয়েকটা বছর বাঁচতো আর ম*রনের তীব্র যাতনা সহ্য করতো। রাশেদ তোর ‘কিং অভ ওয়েভ’ এর সাহস হারিয়েছে, আলবাট্রস আর আগের মত উড়তে পারেনা। আমার বুক ফেটে যাচ্ছে বন্ধু। আমি তাহিকে লিমনের হাতে তুলে দিই নি মনে হয়েছে রাশেদকে চিরতরে হারিয়েছি। অথচ কেউ বুঝলোনা রাশেদের জায়গার ক্ষতিপূরণ অপূর্ণ থেকে যাবে। তবে আমার লিমনকে মাফ করে দিস বন্ধু। ও পাগলের মতো তোর তাহিকে ভালোবেসে ফেলেছে।
দরজার খটাখট আওয়াজ পেয়ে চোখ মুছে ফ্রেম পুনরায় ড্রয়ারে ঢুকিয়ে রাখলো। দরজা খুলেই দেখতে পেলো সহধর্মিণীকে। খানিকটা হেসে বললো,

– কোনো সমস্যা?
দিয়া প্রশ্ন ছুঁড়লো,
– মন খারাপ?
– উঁহু।
বেড সাইড টেবিল থেকে ফোন নিয়ে উঠে বললো,
– চলো।
সামনে এগিয়ে শাহাদের হাত ধরে যাওয়া আটকে দিলো। শাহাদকে ধরে খাটে বসিয়ে রুমের দরজা আটকে দিলো। চোখ মুখে স্পষ্ট যন্ত্রণা। এই যন্ত্রণা বিয়োগের,বিষাদের, চির শূণ্যস্থানের। মানুষটার গালে ডান হস্ত ছোঁয়াতেই, সেই হস্তে মুখের ভার ছেড়ে দিলো। দিয়া দু হাতে দু গাল ধরে অবলোকন করার চেষ্টা করছে। নিরবতা, নিস্তব্ধতা ব্যতীত সকল ধরনের শব্দ কামরায় অনুপস্থিত। ভেতর থেকে মানুষটা গুমরে যাচ্ছে৷ কাউকে হারানোর কষ্ট প্রকাশ করতে না পারাটা অসহনীয় মানসিক যন্ত্রনা দেয়। স্বামীর মাথা বুকে চেপে ধরে আশ্বস্ত করলো,

– লিমন ভাইয়া, আপুকে ভালো রাখবে কমান্ডার সাহেব।
এই ভরসা চেয়েছিলো এতটা সময়। দু হাতে প্রেয়সীর কোমড় জড়িয়ে নিজেকে আড়াল করে ছোট্ট নরম হস্তদ্বয়ের মধ্যিখানে। মুখনিঃসৃত বাক্যরা যেন আজ ঝংকার হারালো, শব্দেরা তাল লয় তুঙ্গে তুলে সুর হারিয়েছে। দিয়া স্বামীর মাথা তুলে বললো,
– শেহজা দেখলে বলতো বাবা কাঁদে না, আতো আদর কলে দিই।
শাহাদ দিয়ার দিকে তাকিয়ে হেসে দিলো। দিয়া শাহাদের দুচোখে হাত রেখে কপাকে উষ্ণ পরশ দিয়ে বললো,
– আপনাকে মানায় না এমন ভঙ্গুরতায়। আপনি থাকবেন পাহাড়ের মত অটল, পাথর মত কঠিন এবং…
– এবং…
– এবং ভালোবাসা দেয়ার মত কোমল।
– লোভ তাই না? গ্রিডি লেডি। ইট’স নট ফেয়ার।
– সামলাতে পারিনা সেই লোভ।
দুজন মিলে হেসে দেয়। এই প্রস্তর কঠিন মানবকে সামলানোর জন্য কোমলতাময়ী মানবী যথেষ্ট।

বাগানে ঘরোয়া অতিথিদের ভিড়। মাঝে কিছু সংখ্যক শাহাদ এবং শাহীনের বন্ধু এসেছে। শাহাদের বন্ধুরা আলোচনায় বসেছে। পূর্ব পরিচিত সকলে। পাইলট কানিজ রোকসানা শাহীনের বিয়েতে ও এসেছিলো। দিয়াকে দূর থেকে আসতে দেখে শাহাদকে একটু পিঞ্চ দিয়ে বললো,
– বাবু মশাই, এই অনন্ত যৌবনা নারীকে নিয়ে ভালোই দিনকাল কাটছে তবে এদিকে যে একখানা পত্র পাঠানো হলো বন্ধু মহল থেকে তা কি গিন্নীকে জানিয়েছেন? নাকি একেবারে ঘরের ছেলে, বউয়ের বাধ্যগত সোয়ামী হয়ে বাকি জীবনটা মা বৌয়ের আঁচলের তলে কাটাবেন ভাবলেন। তাতে অবশ্য দোষের কিছু নেই মানে আমরা শুধু জানতে চাইলাম আর কি আপনি যাবেন?
কথার মাঝেই লক্ষ্য করলো এক্স লে. কমান্ডারের চোখ হাসছে, সকলের তার চোখ অনুসরণ করে সম্মুখে চেয়ে দেখে শাহাদপ্রিয়া শাড়ির কুচি ধরে ধীর পায়ে এদিকেই এগিয়ে আসছে। তাহলে শাহাদের নজর বুঝি তাতেই নিবদ্ধ! চোখের ভাষায় মুগ্ধতা ছড়িয়ে পড়েছে। দিয়া সামনে চলে এসেছে। সবাইকে দেখে সালাম দিলো। ডাক্তার মল্লিকা হেসে জড়িয়ে ধরলেন। ঠোঁটের কোণে হাসি দিয়ার। চিকন স্বরে শুধালো,

– ভালো আছেন আপু?
মল্লিকাও ভালোবেসে জবাব দিলো,
– আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি ভাবী। আপনাকে মিস করছিলাম এতক্ষন। আপনার কথাই হচ্ছিলো।
– আমার কথা?
ব্যারিস্টার মনিরুজ্জামান আগ বাড়িয়ে বললেন,
– রাজকন্যাটি কোথায় ভাবীসাহেবা?
– আম্মুর কাছে, আচ্ছা দুষ্টু হয়েছে। সকলকে নাস্তানাবুদ করে রেখেছে। বাড়ি জুড়ে ছুটোছুটি করছিলো। একজন আত্নীয়ের বেবি আছে তার সাথে খেলা করছে। আম্মু,আব্বু পাহারায় বসে আমাকে আপনাদের কাছে পাঠিয়েছেন। চলুন খেতে বসবেন।
কমিশনার রকিব হালদার আচমকা কেশে উঠলো। শাহাদের মনোযোগ বিচ্যুত হলো। এতক্ষন এই পুরুষ তার চোখ নিবদ্ধ করেছিলেন আপন রমনীতে। ধরনীতে সংঘটিত বাকি ঘটনায় তার মনোযোগ শূন্য। রকিবের দিকে তাকাতের সে বললো,

– মানে ভাবী একটা কথা বলতাম?
দিয়া সেদিক ফিরে নম্রতা নিয়ে বললেন,
– জ্বি ভাইয়া বলুন।
– আমরা একটা ট্যুরের প্ল্যান করছি শাহাদ কি অনুমতি পাবে যাওয়ার?
চোয়াল ঝুলে গেলো দিয়ার। হতবাক হয়ে বিনা বিলম্বে প্রশ্ন করলো,
– আমাকে জিজ্ঞেস করছেন ভাইয়া?
বাকিরা একে অন্যের মুখ চেয়ে অবাক চোখে দিয়ার দিকে তাকালো। শাহাদ সেই ভ্রম ভেঙ্গে বললো,
– ম্যাডাম আপনার কাছ থেকে অনুমতি না নিলে কার কাছে থেকে নিবে? আফটার অল শাহাদের উপর কব্জা তো আপনার, তাই একটা ছোট্ট জিজ্ঞাসা এই অপরাধীদের।
কানিজ রোকসানা শাহাদের দিকে তাকিয়ে বলে,

– এবার বুঝলাম বন্ধু আমার কেনো দেওয়ানা।
দিয়ার লজ্জ্বয় আনত মুখ। কানিজ এগিয়ে এসে দিয়াকে ধরে বললো,
– আর লজ্জ্বা পেতে হবে না। আসল কথায় আসি…
শাহাদ থামিয়ে দিলো হাতের ইশারায় কানিজকে। দিয়ার দিকে তাকিয়ে বললো,
– ফারাহ্ আপনাকে তো আপাতত ক্লাস করতে হবে না তাই না?
– না।
– আলহামদুলিল্লাহ। তাহলে রকিব, শুন আমার জন্য তিনটা টিকিট কাটবি। তবে এখানে নয়, সাউথ আমেরিকা থেকে কা*টবি। তোরা আগে যাবি আমি সী হয়ে যাবো।
মল্লিকা ভ্রু কুৃঁচকে চমকে বললো,

– সী হয়ে মানে? তুই সাগর দিয়ে কিভাবে যাবি?
– ইট’স মাই বিজনেস।
কানিজ আর ঘাটালো না। বেশি ঘাটালে কিছুই বলবেনা। একটু পর হয়তো নিজ থেকেই বলবে। তবে পুনরায় জিজ্ঞেস করলো কানিজ,
– তিনটা টিকিট অমন জায়গার জন্য?
শাহাদ মাথা নেড়ে বললো,
– হুম।
দিয়া হতবিহবল হয়ে মিনমিনে গলায় বললো,
– কি হচ্ছে? কিসের টিকিট।
শাহাদ ইশারা দিলো সামনে হাঁটার জন্য।সবাই সামনে হাঁটছে মনে কৌতুহল নিয়ে। অপেক্ষা শাহাদ মশাইয়ের উত্তরের। দিয়া মুখের উপর প্রশ্ন করেনি। মানুষটা বাগানের ঘাসের উপর এক কদম করে ফেলছে আর ঠোঁটের কোণে রহস্যময় হাসি ঝুলিয়ে রেখেছে। এর মাঝে শাহাদের দিকে তাকিয়ে হাঁটতে গিয়ে উষ্ঠা খেলো রকিব। মনিরুজ্জামান ধরাতে পড়ে যায়নি। থেমে গেলো সকলে। রকিব মৃদু চেঁচিয়ে বললো,

– এ্যাই, ব*দ বুদ্ধির রাজা; কৌতুহল ক্লিয়ার কর। নেমতন্ত করে তো হাত পা ভাঙানোর পায়তারা করছিস। তোর দিকে ফিরে হাঁটছি, আরেকটু হলে পা টা যেত। চাইছিস কি তুই? গেলে যাবি বল না গেলে না যাবি। হেয়ালী করছিস কেনো?
কানিজ ধুপ করে বন্ধুর পিঠে কিল দিলো। রে*গে বললো,
– উলটা পালটা প্রশ্ন করিস কেনো? এতে করে এই মহা রোবট এক কথায় উত্তর দিবে। আগে প্রশ্ন কর তিনটা টিকিট কার জন্য?
শাহাদ হো হো করে হেসে বলে,
– আমার অস্তিত্ব শেহজা এবং প্রিয়দর্শীনি ফারাহ্ র জন্য।
– কিহ???
সমস্বরে চিত্কার।
শাহাদ গম্ভীর গলায় বললো,

– ডোন্ট টক ঠু মাচ, আই উইল লেটার এক্সপ্লেইন।
ইট’ স ফাইনাল। স্ত্রী কন্যাকে নিয়ে আমার স্বপ্ন পাড়ি দেবো।
খাবার টেবিলের কাছাকাছি চলে এসেছে সকলে। এতক্ষন নিরবতা পালন করলেও দিয়া এবার প্রশ্ন করলো,
– কোথায় যাবেন শেহজার বাবা?
সকলের সামনে দু হাত শূন্যে ছড়িয়ে চোখ বুজে উত্তর দিলো,
– গ্যালাপাগোস…

সায়রে গর্জন পর্ব ৫০

আশপাশে উপস্থিত ঘরের মানুষ ছিলো থমকে গেলো সকলের পদযাত্রা। শাহীন দেখছে ভাইয়ের অদম্য ইচ্ছাশক্তি, রায়হান সাহেব বিড়বিড় করলো মনে মনে, গ্যালাপাগোস! পাভেলে চক্ষু ছানা বড়া। বস সত্যি যাবে গ্যালাপাগোস! শিফা চিৎকার দিয়ে উঠলো গ্যালাপাগোস! সবার মুখে একই শব্দ গ্যালাপাগোস! গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জ পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর জীববৈচিত্র পূর্ণ জায়গা। অনেকের কাছে ভূস্বর্গ কাশ্মীর হলেও, পর্যটকদের জন্য ভূস্বর্গ এই দীপপুঞ্জ। অজানা,অদেখা,না শোনা কল্পকথা ঘিরে আছে এই গ্যালাপাগোস জুড়ে। ঘুরে আসা যাক পৃথিবী বিখ্যাত মেরিন ইগুয়ানার, গ্যালাপাগোস কচ্ছপ, আলবাট্রসের দ্বীপ গ্যালাপাগোস।

সায়রে গর্জন পর্ব ৫২