সিকান্দার শাহ্ পর্ব ৩৫
Raiha Zubair Ripti
গ্রামে আজ সালিশ বসেছে। পীরের সালিশ। চেয়ারম্যান বাড়ি থেকে চেয়ারম্যান কে আনিয়ে ছেড়েছে সিকান্দার। চেয়ারম্যান শুরুতে আসতে চায় নি। নিজের লোককে কে সাজা দিতে চায়? সিকান্দার চেয়ারম্যানের সেই আসতে না চাওয়ার মতকে দু পায়ে ঠেলে লোক দিয়ে খবর পাঠালো। বলে দিলো, চেয়ারম্যান না আসলে। সে বিচার না করলে। সিকান্দার নিজেই এমন বিচার পীরের করবে যে পীর আদোও বাঁচবে কি মরবে তার গ্যারান্টি সে দিতে পারবে না।
ব্যাটার এমন হুমকি শুনে চেয়ারম্যান আসলো। ছেলেটার গায়ে অনেক শক্তি। পীর কে যদি আবার মারে। সত্যি সত্যি মরে যায় তখন? একপ্রকার বলা চলে মনের বিরুদ্ধে জোর করেই এসেছে।
পীর তখনও মাটিতে পড়া। সিকান্দার কুয়া থেকে বালতি ভরে জল উঠিয়ে পীরের মুখের উপর ছুঁড়ে মারে। পীর লাফিয়ে উঠে। শালাহ্ একটা জ্ঞান হারানোর অভিনয় করছিল লজ্জা শরম ঢাকতে। কিন্তু এই হতচ্ছাড়া সিকান্দার নড়লই না তাকে রেখে। দূরে গামছা দিয়ে মুখ চেপে দাঁড়িয়ে ছিলো।
পীর চোখ মেলে তাকাতেই সিকান্দার চোখ মুখ কুঁচকে বলল,
” অভিনয় তো ভালোই জানেন মিয়া। তবে অভিনয়ের কারণে কিঞ্চিত বেঁচে গেছেন। পুরোপুরি নয়। তখন মাটিতে লুটে পড়ার অভিনয় না করলে এতক্ষণে আপনার মাথাটা দেহ থেকে আলাদা করে ফেলতাম। তা চেয়ারম্যান সাব,এখন করুন বিচার আপনার পীর সাবের। তিনি ছাগলের মাংস বলে শূকরের মাংস খাইয়েছে গ্রামবাসী দের। আপনি নিশ্চয়ই জানেন এটার মাং আমাদের জন্য খাওয়া হারাম? পীর তো নিজেকে সর্বসেরা ভাবে। তো সে কি অবগত ছিলো না এই বিষয়ে? অবশ্যই ছিলো। না করলেই ওর মাথা ফাটাবো আমি।
চেয়ারম্যান গলা খাঁকারি দিয়ে পীরের দিকে তাকাল। তারপর বললেন,
” ঘটনা যা ঘটেছে, হ্যাঁ সেটা অন্যায় হয়েছে। পীর সাহেব ভুল করেছেন। গ্রামের মানুষের কাছে ক্ষমা চাইবেন। আর সামনে থেকে এমন করবেন না। ”
শেষ! এই হলো সাজা! চারপাশ থেকে সঙ্গে সঙ্গে গুঞ্জন উঠল। একজন বলে উঠল, “এইডা আবার কেমন বিচার?”
সিকান্দার এতক্ষণ চুপ করে শুনছিল। হঠাৎ হেসে উঠল।
সেই হাসি শুনে আশপাশের মানুষজনও চুপ হয়ে গেল।
সিকান্দার ধীরে ধীরে চেয়ারম্যানের দিকে এগিয়ে গেল।
” চেয়ারম্যান সাব, একটা কথা জিজ্ঞেস করি? ”
চেয়ারম্যান বিরক্ত চোখে বলল,
” বলো। ”
” আপনি হিন্দু ধর্মালম্বী রাইট? আপনার নিজের ঘরের মানুষকে যদি কেউ ছাগলের মাংসের নামে গরুর মাংস খাওয়ায়, তখনও কি এই সাজাই দিতেন? সরি টু স্যে আপনার বিচার আমার পছন্দ হয়নি। তাই আপনার বিচার আপনি আপনার কাছেই রাখেন। পীর সাহেবের সাজা আমি দিচ্ছি। ”
পীর কেঁপে উঠলেন ভয়ে। এই জাউরা নিশ্চয়ই কোনো কঠিন সাজা দিবে তারে। এজন্য কাঁপা গলায় বললেন, ” আমি ভুল করেছি। মাফ করে দাও। ”
” আবার ভুল বলছন! শূকরের মাংসকে ছাগলের মাংস বানানোর মতো ভুল হয় না। আপনি জানতেন। রান্না করিয়েছেন। মানুষের সামনে পরিবেশন করেছেন। জিজ্ঞেস করলে মিথ্যা বলেছেন। আর এখন ধরা পড়ে বলছেন ভুল? ”
পীর মুখ নামিয়ে নিলেন। সিকান্দার এবার চারপাশের লোকজনের দিকে তাকাল।
” আপনারা কি জানতেন, কী খাচ্ছেন?”
সবাই একসঙ্গে বলল, ” না। ”
” জেনে খেতেন? ”
” না!”
” তাহলে আপনাদের সঙ্গে প্রতারণা হয়েছে?”
” হয়েছে! ”
সিকান্দার এবার চেয়ারম্যানের দিকে তাকাল।
” শুনলেন?”
চেয়ারম্যান গম্ভীর হয়ে বসে রইল। সিকান্দার বলল,
” আজ থেকে পীর সাহেবের নামে গ্রামের মানুষের কাছ থেকে এক টাকাও চাঁদা উঠবে না। কোনো মানত, কোনো দান, কোনো খাবার,কিছুই না। মসজিদের টিন পাল্টাবেন। মেঝে পাকা করে দিবেন। এবং কাল ফজরের পর থেকে প্রতিদিন আপনি মসজিদ ঘর পরিষ্কার করবেন। সেই সাথে সত্যি সত্যি ছাগল জবাই দিয়ে গ্রামের সকল মানুষকে খাওয়াবেন। এতে যত গুলো ছাগল লাগে কিনবেন। দরকার হলে আমি এসে জবাই করে মাংস বানিয়েও দিব। তারপরও আপনাকে এটা করতে হবে। গ্রামের প্রতিটি ঘরের সামনে গিয়ে দু হাত চেপে নিজের অপরাধের জন্য ক্ষমা চাইবেন। আর আপনি নিজেকে পীর বলে কোনো মানুষকে প্রভাবিত করতে পারবেন না। কোনো তাবিজ বিক্রি করতে পারবেন না, কোনো ঝাড়ফুঁকের নামে টাকা নেবেন না, কোনো মানত নিজের নামে নেবেন না। ধর্মের নামে ব্যবসা বন্ধ। কাজ করে খেটে খাবেন। ”
পীর এবার প্রায় চিৎকার করে উঠলেন। কত সাজা দিচ্ছে এ ছেলে! তার কি গাদিগাদি টাকা পয়সা আছে নাকি!
” এইডা একটু বেশিই হইয়া গেলো না? ”
সিকান্দার স্থির চোখে তাকিয়ে বলল,
” কোন দিক দিয়ে বেশি মনে হলো? মানুষের ঈমান, বিশ্বাস আর খাবারের সঙ্গে প্রতারণা করার সময় এই কথা মনে ছিল না? চেয়ারম্যান সাব এখন আপনি বাড়ি যান। বিচার শেষ। দাওয়াত দিলাম পীর সাবের পক্ষ থেকে। আসবেন কিন্তু খেতে। ”
সিকান্দার তারপর হাঁটা ধরলো বাড়ির উদ্দেশ্যে। রহিমুদ্দিন মিয়ার বাড়ির সবাই পীরের উপর অনেক চড়াও হলো। ভণ্ড করছে টা কি!
পীর সাব চেয়ারম্যানের পা ধরে বসে রইলো। ছাগল কেনার টাকা,মসজিদের টিন,মেঝে পাকা করার টাকা পাবে কই এখন? যা আয় করেছিল তার তো সবই শেষ।
চেয়ারম্যান সাহেব কয়েক হাজার টাকা পীরের হাতে ধরিয়ে দিয়ে চলে গেল। পীর দুটো ছাগল কিনলো। কিনে সত্যি সত্যি পুরো গ্রাম বাসী কে খাওয়ালো। এবং প্রতিটি ঘরের দুয়ারের সামনে গিয়ে ক্ষমা চাইলো। মসজিদের নতুন টিন বদললো। মেঝে পাকা করলো। সব করা শেষে এখন সিকান্দার তাকে রোজ একবার করে কুরআন শরীফ খতম দেওয়াচ্ছে। পীর পারছে না সিকান্দার কে তুলে আছাড় দিতে। কেঁদে কেঁদে হেগেমেগে শেষ পর্যন্ত তাকে সিকান্দারের কথাতেই উঠবস করতে হচ্ছে।
সিকান্দার আজও ছাপাখানায় গিয়েছিল।
এক সপ্তাহের মতো হবে, সে একটা বাটন ফোন কিনেছিল। পুরোনো সিমটা আবার বের করে ফোনে ঢোকাতেই নাদিমের একের পর এক কল এসে ফোনটা ভরিয়ে দিল। সিকান্দার কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে নাদিমের ব্যস্ত কণ্ঠ ভেসে এলো। বেশ কিছুক্ষণ কথা হলো দুজনের। কথার এক ফাঁকে নাদিম জানাল, সে আর ইলা আগামী সপ্তাহে আসছে। সিকান্দার নিষেধ করল না। বরং স্বাভাবিকভাবেই আসতে বলল। কথার একপর্যায়ে সেলিম মির্জার প্রসঙ্গ উঠল। নাদিম জানাল, সেলিম মির্জার ব্যবসার অবস্থা ভালো যাচ্ছে না। একের পর এক লোকসান হচ্ছে। যে ব্যবসা একসময় তার অহংকার ছিল, সেটাই এখন ধীরে ধীরে তার হাত থেকে সবকিছু কেড়ে নেওয়ার পথে। সিকান্দার কথাগুলো শুনল। মুখে কোনো প্রতিক্রিয়া ফুটল না। হয়তো প্রতিক্রিয়া দেখানোর মতো কিছুই ছিল না। কারন সে জানে, এক সিকান্দার সেলিম মির্জার জীবনে না থাকলে সেলিম মির্জার কি হতে পারে।
তবু কারও পতনের সংবাদে সিকান্দারের মনে আনন্দ হলো না। আল্লাহ উত্তম পরিকল্পনাকারী। মানুষ নিজের জীবন নিয়ে যত হিসাবই করুক, আল্লাহর পরিকল্পনার কাছে মানুষের হিসাব বড়ই সামান্য। তাঁর কোনো সিদ্ধান্তের পূর্ণ অর্থ মানুষ সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারে না। সময় পেরিয়ে গেলে একদিন পেছনে ফিরে তাকিয়ে বোঝে যে ঘটনাটাকে সেদিন দুর্ভাগ্য মনে হয়েছিল, সেটাই হয়তো ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে নতুন কোনো দরজা খুলে দেওয়ার শুরু।
প্রতিদিনের মতো দুপুরের পর, কখনো সন্ধ্যা পেরিয়ে সিকান্দার ছাপাখানায় আসে। কখনো আবার নিজের নতুন কেনা ভিটাটায় যায়। কিছুক্ষণ কাজ করে, ঘরের কাজ দেখে, মাটির অবস্থা দেখে। তারপর রাত গভীর হলে বাড়ির পথ ধরে। এই ছাপাখানাটা তার জীবনের নতুন এক অধ্যায়ের সাক্ষী।
সিকান্দারের নিজের হাতে কুরআন শরীফ লেখার বিষয়টা হঠাৎ করে শুরু হয়নি। এর পেছনে লুকিয়ে আছে তার তেরো বছরের বিদেশজীবন। তেরো বছর দেশের বাইরে থাকার সময় পৃথিবীর বহু শহর ঘুরেছে সিকান্দার। কখনো কোনো শহরের পুরোনো মসজিদের এক কোণে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কুরআন তিলাওয়াত করেছে, কখনো কোনো মাদরাসার আলেমের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কাটিয়েছে। তুরস্ক, মিসর, জর্ডান, সৌদি আরব, কাতারসহ বিভিন্ন দেশের মসজিদ, ইসলামিক সেন্টার, কুরআন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও গ্রন্থাগারে তার যাতায়াত ছিল। সব জায়গায় সে পরিচিতি তৈরি করার চেষ্টা করেনি কিন্তু নিজের আচরণ, জ্ঞান, কুরআনের প্রতি ভালোবাসা আর মানুষের সঙ্গে সুন্দর ব্যবহারের কারণে অজান্তেই অনেক মানুষের সঙ্গে তার সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল।
বিশেষ করে কুরআনের পাণ্ডুলিপি, আরবি ক্যালিগ্রাফি আর হাতে লেখা কুরআন নিয়ে তার আগ্রহটা অনেকেই জানত।
সিকান্দার সম্পূর্ণ কুরআন শরীফ মুখস্থ রেখেছে এটা যেমন সত্য, তেমনি তার আরবি হস্তলিপিও ছিল অসাধারণ সুন্দর। তেরো বছর ধরে বিভিন্ন দেশের কুরআনপ্রেমী মানুষদের সঙ্গে চলাফেরা করতে করতে সে কুরআনের বিভিন্ন লিপিশৈলী, অক্ষরের মাপ, আয়াতের বিন্যাস, সূরা শুরুর নকশা এসবের প্রতিও গভীর মনোযোগী হয়ে উঠেছিল।
তবে সে কখনো এটাকে পেশা বানানোর কথা ভাবেনি।বিদেশে থাকার শেষ দিকের এক ঘটনা। ইস্তাম্বুলের একটি ইসলামিক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে প্রায়ই যাতায়াত করত সিকান্দার। সেখানকার একজন বয়োজ্যেষ্ঠ ক্যালিগ্রাফার ও কুরআন গবেষকের সঙ্গে তার বেশ ভালো সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। একদিন সিকান্দারকে হাতে লেখা কয়েক পৃষ্ঠা দেখাতে বলেছিলেন তিনি। সিকান্দার তখন নিজের হাতে লেখা কিছু আয়াত বের করে দিয়েছিল। বৃদ্ধ মানুষটি অনেকক্ষণ কিছু না বলে পৃষ্ঠাগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিলেন।তারপর শুধু বলেছিলেন,
” তুমি কি জানো সিকান্দার তুমি একজন অসাধারণ মানুষ? ”
সিকান্দার মৃদু হেসে বলেছিল,
“ আমি খুবই সাধারণ একজন মানুষ।”
“না তুমি সাধারণ নও। কোনো জেনারেল লাইনে পড়া ছেলে কখনোই এতটা আল্লাহপ্রেমী হয় না। তারা দুনিয়ার চাকচিক্যের পেছন ছুটে বেড়ায়। ”
সিকান্দার ভ্রু কুঁচকে তাকিয়েছিল।
“জেনারেল লাইনে পড়লেই আল্লাহকে ভালোবাসা যায় না—এমন কোনো কথা আছে? মানুষ কোথায় পড়েছে, কোন বিষয়ে পড়েছে, কী পেশায় আছে এসব দিয়ে তার রবের সঙ্গে সম্পর্কের গভীরতা মাপা যায় না। কেউ মাদরাসায় পড়ে আল্লাহকে ভুলে থাকতে পারে, আবার কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে রাতের অন্ধকারে সিজদায় গিয়ে নিজের রবকে খুঁজে পেতে পারে। আল্লাহর কাছে আমার পরিচয় আমি কী পড়েছি, সেটা না। আমি তাঁর বান্দা এই পরিচয়টাই আসল। আমি ডাক্তার হতে পারি, ইঞ্জিনিয়ার হতে পারি, ব্যবসায়ী হতে পারি, কৃষক হতে পারি কিংবা কেবল একজন সাধারণ মানুষ হয়েই জীবন কাটাতে পারি কিন্তু দিনশেষে আমাকে তাঁর কাছেই ফিরে যেতে হবে।”
লোকটা অনেক মুগ্ধ হয়েছিল সিকান্দারের উপর। পরবর্তীতে সেই পরিচয়ের সূত্রেই তার সঙ্গে যোগাযোগ হয় ইস্তাম্বুলভিত্তিক একটি আন্তর্জাতিক কুরআন প্রকাশনা ও ইসলামিক আর্ট সংস্থার। প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন দেশের দক্ষ ক্যালিগ্রাফার ও হাফেজদের হাতে লেখা কুরআনের বিশেষ সংস্করণ প্রকাশ করত। উদ্দেশ্য ছিল ডিজিটাল যুগে হাতে লেখা কুরআনের ঐতিহ্যটাকে ধরে রাখা এবং নির্বাচিত পাণ্ডুলিপি ছাপিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মসজিদ, ইসলামিক সেন্টার ও পাঠাগারে পৌঁছে দেওয়া।
সিকান্দারের পরিচয়, আরবি ভাষায় দক্ষতা এবং হাতে লেখা কয়েকটি নমুনা তাদের কাছে পাঠানো হয়েছিল। তারপর একদিন মেইলে একটি প্রস্তাব আসে।
সিকান্দারকে একটি সম্পূর্ণ কুরআন শরীফ নিজের হাতে লিখে দেওয়ার অনুরোধ করা হয়। শর্ত ছিল কাজটি নিখুঁত হতে হবে। প্রতিটি আয়াত, প্রতিটি হরফ, প্রতিটি হরকত, প্রতিটি পৃষ্ঠা একাধিকবার যাচাই করা হবে। পাণ্ডুলিপিটি শেষ হলে তা প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞদের কাছে পাঠানো হবে। যাচাই ও অনুমোদনের পর সেটির সীমিত সংস্করণ ছাপা হবে এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ও ইসলামিক সেন্টারের মাধ্যমে বিতরণ করা হবে।
প্রথমে সিকান্দার রাজি হয়নি। টাকার জন্য নয় বরং দায়িত্বটার কথা ভেবে। একটি সম্পূর্ণ কুরআন শরীফ নিজের হাতে লেখা কোনো সাধারণ কাজ নয়। নিজের ওপর এত বড় আমানত নেওয়ার ব্যাপারে সে দ্বিধায় পড়ে গিয়েছিল।শেষ পর্যন্ত সে একজন আলেমের সঙ্গে পরামর্শ করেছিল।আলেম তাকে বলেছিলেন, “যদি নিয়ত আল্লাহর সন্তুষ্টি হয় এবং তুমি যথাযথ যাচাইয়ের ব্যবস্থা রাখো, তাহলে এটাকে শুধু কাজ হিসেবে দেখো না। এটা তোমার জন্য আমানত।”
সেদিন সিকান্দার সম্মতি দিয়েছিল। তারপর বহু মাস ধরে নিজের হাতে কুরআন শরীফ লিখেছিল সে। প্রতিটি পৃষ্ঠা লেখার পর নিজে মিলিয়েছে। আবার অন্য হাফেজ ও আলেমদের দিয়েও মিলিয়েছে। কোথাও সামান্য সন্দেহ হলে পুরো পৃষ্ঠা নতুন করে লিখেছে। শেষ পর্যন্ত সেই পাণ্ডুলিপি সিকান্দার দেশে আসার একমাস আগে ইস্তাম্বুলের প্রতিষ্ঠানের কাছে পাঠানো হয়েছিল।
সেখানে দীর্ঘ যাচাই-বাছাইয়ের পর গত সপ্তাহে পাণ্ডুলিপিটি অনুমোদিত হয়,এবং সিকান্দার ফোন কেনার পর সর্ব প্রথম এই খবরটিই পায়। তখন সিকান্দারের দুচোখ দিয়ে অশ্রু গড়ায়। দুঃখে নয় বরং সুখে। আল্লাহ কেন সিকান্দার কে এত ভালোবাসে! কেনো! কেনো! এই উত্তর সিকান্দারের জানা নেই। তবে সিকান্দার ও যে তার রবকে ভালোবাসে এটাও সত্য।
সিকান্দার কে অগ্রীম রয়্যালটি দেওয়া হয়। যা সিকান্দারের এই দুর্দিন কাটিয়ে উঠার একমাত্র সাথী। এরপরই ছাপাখানার সঙ্গে যোগাযোগ। সিকান্দারের হাতে লেখা কুরআন শরীফের সেই পাণ্ডুলিপি থেকে প্রকাশনার কাজ শুরু হয়। শুধু বিদেশে নয় বাংলাদেশেরও কয়েকটি ইসলামিক সেন্টার, মসজিদ ও কুরআন শিক্ষাকেন্দ্রেও এর কপি পাঠানোর পরিকল্পনা হয়।
সিকান্দারের জীবনে এটাও ছিল আল্লাহর এক অদ্ভুত ব্যবস্থা। তা না হলে তার এই দুর্দশার সময়ই কেন এতো বড় সুখবর টা সে এভাবে পাবে! যে মানুষটা ছিলো শূন্য হাতে, যার নিজের থাকার মতো একটা ঘর পর্যন্ত ছিল না, সেই মানুষটির হাতেই আল্লাহ এমন একটি কাজ তুলে দিয়েছিলেন, যার লেখা পৌঁছাবে দেশের সীমানা পেরিয়ে বহু মানুষের কাছে।
আর আজ সিকান্দার ছাপাখানায় এসেছে মূলত কুরআন শরীফের প্রথম কপিটা নিতে। এটা সে তার মুনতাহা কে উপহার দিবে। কুরআন শরীফের প্রথম কপিটা নিয়ে তারপর সে হাঁটা ধরলো। মসজিদে এশার নামাজ শেষ করে সিকান্দার ধীর পায়ে বাড়ি ফিরল। উঠোন পেরিয়ে রহিমুদ্দিন মিয়ার পাশে এসে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইল। পাশে শফিক সাহেবও বসেছিলেন। দুজনের মাঝখানে বসে কিছুক্ষণ নীরব রইল সে। মনে হলো, কথাটা কীভাবে শুরু করবে সেটাই বুঝে উঠতে পারছে না। অবশেষে দীর্ঘ একটি শ্বাস ফেলে সিকান্দার বলল,
” ঠিক কীভাবে কথাটা শুরু করব আমি বুঝতে পারছি না। ”
রহিমুদ্দিন মিয়া তাকালেন। ” কী হইছে?”
সিকান্দার কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “আপনাদের কাছে একটা কথা বলার ছিল।”
” হ্যাঁ বাবা কও না। ”
” আমি আর মুনতাহা আজই, এখনই চলে যেতে চাচ্ছি। ”
শফিক সাহেব সঙ্গে সঙ্গে ভ্রু কুঁচকে তাকালেন।
” চলে যেতে চাচ্ছ মানে? কোথায় যাবে?”
” আমাদের বাড়িতে। ”
রহিমুদ্দিন মিয়া তপ্ত শ্বাস ফেললো। সে জানে এই সম্পর্কে। তবে জানা ছিলো না সিকান্দার আজই চলে যাবে।
” তুমি কি কোনো ভাবে মনে করতাছো আমরা তোমাগো বোঝা ভাবতাছি? সেই জন্যে এত তাড়াহুড়া কইরা চলে যাইতাছো।”
সিকান্দার মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।
” না চাচা আপনাদের মন নিয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই। সমস্যা আসলে আপনাদের নয়, আমার। যে মানুষকে আল্লাহ দায়িত্ব নেওয়ার মতো শক্তি দিয়েছেন, তার জন্য সারাজীবন অন্যের কাঁধে ভর দিয়ে থাকা ঠিক নয়। আমার কঠিন সময়ের কথা আপনারা জানেন। তখন আমার হাতে কিছুই ছিল না। মাথার ওপর নিজের একটা আশ্রয় ছিল না। পকেটে অর্থ ছিল না, সামনে কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। আমার সঙ্গে আমার স্ত্রীও ছিল। দুজন মানুষ একজন আরেকজনকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকা ছাড়া আর কোনো সম্বল ছিল না। তখন আপনারা আমাদের আশ্রয় দিয়েছেন। আমরা আপনাদের আপনজন ছিলাম না। আমাদের সঙ্গে আপনাদের রক্তের কোনো সম্পর্কও ছিল না, কোনো দায়ও ছিল না। চাইলে আপনারা খুব সহজেই আমাদের এড়িয়ে যেতে পারতেন। কিন্তু আপনারা তা করেননি। আপনাদের অভাব থাকা স্বত্তেও আমাদের আশ্রয় দিয়েছেন, পেটে খাবার দিয়েছেন। আমাদের খাওয়াতে গিয়ে একবারও হিসাব করেননি কতটা চাল গেল, কতটা তরকারি কম পড়ল। আল্লাহ মানুষকে মানুষের জন্য রহমত হিসেবে পাঠান আমি কথাটার অর্থ আপনাদের কাছেই শিখেছি। আল্লাহর কসম, এই দিনগুলোর ঋণ আমি কোনোদিন শোধ করতে পারব না। আমাদের জন্য আপনাদের যতটুকু না করার কথা ছিলো তার চেয়েও বেশি করেছেন। এখন আমার মনে হয়, আপনাদের আতিথেয়তার ওপর আর বোঝা হয়ে থাকা আমার ঠিক হবে না। একটা মানুষকে বিপদে আশ্রয় দেওয়া মহত্ত্বের কাজ, কিন্তু সেই আশ্রয়কে নিজের স্থায়ী ঠিকানা বানিয়ে ফেলা কোনো কৃতজ্ঞতার পরিচয় নয়। আপনারা দয়া করে বাঁধা দিবেন না। আমি খুব ছোট একটা ঘর বানিয়েছি আমাদের জন্য। বড় কিছু না। আমার আর মুনতাহার জন্য যতটুকু প্রয়োজন, ততটুকুই আছে। আমি চাই, এবার নিজেদের ঘরে গিয়ে নিজের সংসারটা শুরু করতে। আপনারা অনুমতি দিন। আমি আমার স্ত্রী কে নিয়ে সেখানে উঠতে চাই। ”
রহিমুদ্দিন মিয়া সিকান্দারের কাধে হাত রাখলো। ছেলেটা দিন রাত পরিশ্রম করেছে একটু খানি নিজস্ব আশ্রয় তৈরি করার জন্য। ছেলেটার ভাগ্য বড্ড সুপ্রসন্ন। যেখানে হাত দেয় সেখান থেকেই সোনা বের হয়। তিনি বাঁধা দিলেন না সিকান্দার কে। সিকান্দার সম্মতি পেয়ে উঠে গিয়ে ধীর গলায় মুনতাহা কে ডেকে বললো রেডি হতে। তারা চলে যাবে আজ।
সিকান্দার শাহ্ পর্ব ৩৪
মুনতাহা প্রথমে চমকালো। এই রাতে কোথায় যাবে তারা? প্রশ্ন করতে পারলো না। বোরকা নিকাব পড়ে শরীরে চাদরটা জড়িয়ে কোলে সেই বিড়ালের ছানা টাকে তুলে নিলো। সিকান্দার কাপড়ের ব্যাগটা হাতে তুলে নিয়ে অন্য হাত দিয়ে মুনতাহার ডান হাতটা ধরলো। তারপর বাড়ির সকলের থেকে বিদায় নিয়ে রাতের আঁধারে তারা চলে গেলো গ্রামের মেঠোপথ দিয়ে। পেছনে ফেলে গেলো কয়েকটা পরিচিত মুখ যারা তাদের যাওয়ার পানে তাকিয়ে আছে। মন থেকে দোয়া করছে ছেলেটা যেন খুব সুখী হয় জীবনে।
