সিকান্দার শাহ্ পর্ব ৪০
Raiha Zubair Ripti
ধান কাটা শেষ হয়েছে বেশ কয়েকদিন হলো। কিন্তু ধান কাটা শেষ হলেও সিকান্দারের সব কাজ শেষ হয় নি। বরং মাঠে তখন শুরু হলো তার ধান ঘরে তোলার আসল ব্যস্ততা।
সে সিকান্দার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ধানের প্রতিটি কাজ মাঠেই করবে। বাড়িতে শুধু চাল বানানো ধানগুলো বস্তায় করে নিয়ে যাবে। সকাল হতেই শ্রমিকেরা মাঠে এসে জড়ো হলো। প্রথমে শুরু হলো ধান মাড়াই। একেকটা আঁটি শক্ত করে ড্রামের সাহায্যে আছড়ে শীষ থেকে ধান আলাদা করছে। ধীরে ধীরে খড় একদিকে আর ধান অন্যদিকে জমতে লাগল। সারাদিনের পরিশ্রমে চার বিঘা জমির সব ধান মাড়াই শেষ হলো। তারপর শুরু হলো ঝাড়াই। কুলায় করে ধান তুলে বাতাসে ঝাড়া হচ্ছে। ধানের সঙ্গে মিশে থাকা খড়কুটো, শুকনো পাতা আর হালকা আবর্জনা বাতাসে উড়ে যাচ্ছে। কয়েক দফা ঝাড়াই করার পর ধানগুলো বেশ পরিষ্কার হয়ে এলো। এরপর সিকান্দার বলল,
“এবার মাপেন।”
বস্তা এনে একে একে ধান মাপা হলো। একবার মাপা হলো।
তারপর হিসাব মিলিয়ে আবার মাপা হলো। শেষ পর্যন্ত হিসাব দাঁড়াল চার বিঘা জমিতে প্রায় আশি মন ধান। সিকান্দার কিছুক্ষণ চুপ করে সেই ধানের স্তূপের দিকে তাকিয়ে রইল। এই গ্রামের এ বছর সবচেয়ে বেশি ধান উঠেছে তার জমিতেই।একজন শ্রমিক বিস্মিত হয়ে বলল,
“ভাইজান, আপনার তো ফলন একেবারে বাম্পার হইছে!”
সিকান্দার মৃদু হেসে বলল,
” মেহনত করলে আল্লাহ ফলন দেন। বাকিটা তাঁর রহমত।”
অর্ধেক ধান সে জমির মালিকের বাড়ি পাঠিয়ে দিলো। বাকি ৪০ মনের এক তৃতীয়াংশ ভিজিয়ে রাখলো। ভোর বেলা এসে সিদ্ধ করবে। তাই বাড়ি ফিরলো রাত ৯ টার দিকে। মুনতাহা তখন কাজবাজ সেরে ভার্সিটির পড়াশোনা করছিল। সামনেই তার প্রেজেন্টেশন আছে। তারজন্য দরকার ল্যাপটপ। কিন্তু এখানে তো বিদ্যুৎই নিয়ে ল্যাপটপের আশা করা তো বিলাসিতা।
সিকান্দার আজ বাড়ি ফিরে দেখলো মুনতাহা বসার ঘরে বসে পড়াশোনা করছে। সিকান্দার কে দেখামাত্রই সে উঠে দাঁড়ালো। এগিয়ে এসে সামনে দাড়ালেই সিকান্দার ঠোঁট কামড়ে বলল,
“ আমাকে ধরবেন না। ধুলা ময়লা লেগে যাবে আপনার শরীরে। ”
মুনতাহা ভ্রু কুঁচকে তাকালো। অদ্ভুত ভাবে বলল, “তো?”
” তো মানে? আপনি নোংরা হয়ে যাবেন তো। দেখুন কী অবস্থা আমার। ”
মুনতাহা এগিয়ে এসে সিকান্দার কে জড়িয়ে ধরতে ধরতে বলল,
” দেখি দেখি কী অবস্থা আমার স্বামী টার। কোথায় কোথায় ময়লা ধুলো লেগে আছে। ”
কথাটা বলতে বলতে সে টুপ করে চুমু খেলো তার গালে। সিকান্দার হেঁসে ফেললো মুনতাহার এমন কার্যকলাপে। সিকান্দার ঠোঁট ছুঁয়ালো স্ত্রীর কপালে হাতে। তারপর অসহায় চাহনি করে বলল,
” গোসল করে আসি আগে? না করলেই নয়। ”
মুনতাহা হেঁসে বলল, ” অবশ্যই। ”
সিকান্দার গোসল করে আসলে তারা রাতের খাবার খেলো একসাথে। খাওয়া দাওয়া শেষ করে মুনতাহা সব গোছগাছ করে সিকান্দারের পাশে এসে বসে কাধে মাথা ঠেকিয়ে বলল,
” আপনি একা একা কত কাজ করেন। আমি একটু সাহায্য করলে কি হয়? ”
সিকান্দার ওভাবেই সরল ভঙ্গিতে জানতে চাইলো,
” তা কি সাহায্য করবেন শুনি? ”
” এই যে ধানের কাজ করছেন। বাড়িতে এনে সিদ্ধ করলে তো আমি রোদ দিতে পারতাম সারাদিন। ”
” কেন, মাঠে কি কম রোদ আছে নাকি? আপনাকে রোদে পুড়ানোর ইচ্ছে নেই আমার। গায়ের রং পুড়ে যাবে আপনার। আমি তা হতে দিব না। আমার স্ত্রী আমার কাছে রাণী। সে রাণীর মতই থাকবে। ”
” ওহ্! গায়ের রং পুড়ে কালো হয়ে গেলে তখন আমাকে আর ভালো লাগবে না। সেই ভয়ে এত কিছু, তাই না? বুঝি তো! ”
সিকান্দার হেঁসে দিলো। নিজের হাতের সাথে মুনতাহার হাত দেখিয়ে বলল,
” উত্তর চাই আরো? ”
মুনতাহা সরিয়ে দিলো সিকান্দারের হাত। মুখ গোমড়া করে বলল,
” আমার চেয়ে আপনি ফর্সা সুন্দর বলে এভাবে অপমান করবেন! ”
সিকান্দার টেনে আনলো স্ত্রী কে। এক হাত দিয়ে তার থুতনি ধরে মুখটা একটু উঁচু করে নিজের দিকে তাক করল।
” আপনাকে অপমান করার দুঃসাহস কি আমার আছে মন? আপনার গায়ের রং নষ্ট হবে এটা আমার চিন্তা না। আপনার সৌন্দর্য আমার কাছে আপনার গায়ের রঙে আটকে নেই। রোদে পুড়ে আপনি কালো হয়ে গেলেও আপনি আমার কাছে আমার মুনতাহাই থাকবেন। একটুও কম না। আমার চিন্তা হলো, সারাদিন রোদে দাঁড়িয়ে থাকলে আপনার মাথা ধরবে, শরীর খারাপ হবে, হাত-পা ব্যথা করবে। আপনি কষ্ট পাবেন।
আর আমি আপনাকে কোনো ধরনের কষ্ট দিতে চাই না। কোনো পেরেশানির মধ্যেও ফেলতে চাই না। জীবনে যত কষ্ট আছে, যত পরিশ্রম আছে, যত পেরেশানি আছে সব সহ্য করার জন্য সিকান্দার একাই যথেষ্ট। তার ভাগ আমি আপনাকে দেব না।
নারী কোমলতার প্রতীক। আর আমার স্ত্রী তো আমার কাছে শুধু স্ত্রী নয়, সে আমার হৃদয়। আমার ঘরের রাণী। আর রাজা থাকতে রাণীকে দিয়ে রাজ্যের ভার বহন করানো মানায় না। আপনি কেবল রাণী হয়ে থাকবেন আমার সংসারে আমার জীবনে। আপনি ভালো থাকবেন, হাসবেন, শান্তিতে থাকবেন এইটুকুই আমার কাছে যথেষ্ট। আপনাকে কষ্ট পেতে দেখতে আমার ভালো লাগে না।আমার জীবনে যতটুকু কষ্ট আছে, সেটা আমার। আপনার ঘাড়ে তুলে দেওয়ার জন্য আপনাকে আমি বিয়ে করিনি।”
মুনতাহা ধীরে বলল, “কিন্তু সংসারের কাজ করা তো আমারও দায়িত্ব।”
“দায়িত্ব পালন করবেন। অবশ্যই করবেন। এই যেমন আমি বাড়ি ফিরলে আমার সামনে চুপটি করে বসে থাকবেন। আমার চক্ষু শীতল না হওয়া অব্দি। ”
“আপনি সবকিছুতেই আমাকে ছাড় দেন।”
“কারণ আমি সেসব পারি। আর যা আমি পারি তা আপনার কাজ নয়। এখন এসব নিয়ে তর্কাতর্কি না করে চলুন ঘুমাতে। ভোরে যেতে হবে। ধান সিদ্ধ করবো। ইনশাআল্লাহ সব ঠিকঠাক হলে আগামী সপ্তাহে চাল আসবে ঘরে। ”
ভোর বেলা নামাজ শেষ করে সিকান্দার সোজা ক্ষেতে চলে আসলো। মাঠের এক পাশে বড় বড় ডেকচি বসানো হলো। সেই ডেকচি তে ভিজিয়ে রাখা ধান গুলো দিয়ে আগুন জ্বালানো হলো নিচে। ধীরে ধীরে গরম পানির ভাপ উঠতে লাগল। সিকান্দার নিজে দাঁড়িয়ে সিদ্ধ হওয়ার সময়টা দেখল। বেশি সিদ্ধ হলে চালের মান নষ্ট হবে, কম সিদ্ধ হলে ঠিকমতো চাল হবে না।
সিদ্ধ হয়ে গেলে ধানগুলো পানি ঝরিয়ে আবার বড় বড় চাটাইয়ের ওপর ছড়িয়ে দেওয়া হলো। এরপর বেলা ৮ টার দিকে রোদে শুকাতে লাগল। একদিন নয়, ভালোভাবে শুকানোর জন্য কয়েক দফা রোদে দেওয়া হলো। মাঝে মাঝে পায়ের সাহায্যে দিয়ে উল্টেপাল্টে দেওয়া হচ্ছে, যেন ভেতরে কোনো আর্দ্রতা না থাকে। ধান পুরোপুরি শুকিয়ে গেলে এবার নিয়ে আসা হলো চাল ভাঙানোর মেশিন।
মেশিনে একে একে সিদ্ধ-শুকনো ধান ঢুকতে লাগল।
বিকট শব্দে মেশিন চলছে। এক পাশ দিয়ে তুষ বের হচ্ছে, অন্য পাশ দিয়ে বের হচ্ছে চাল। চাল আবার বাছাই করা হলো। আস্ত চাল একদিকে, ভাঙা চাল একদিকে, কুঁড়া আলাদা।
সব কাজ শেষ হতে সন্ধ্যা নেমে এলো। চালগুলো বস্তায় ভরা হলো। চার বিঘা জমির ধান থেকে পাওয়া চালের বস্তাগুলোর দিকে তাকিয়ে সিকান্দারের মুখে ক্লান্তির মাঝেও তৃপ্তির ছাপ ফুটে উঠল।
কিন্তু সেদিনই গ্রামের অন্য প্রান্তে অন্য হিসাব চলছিল। সেই হিসেবের জের ধরে গ্রামের রাস্তা দিয়ে চেয়ারম্যান বাড়ির দুজন লোক এগিয়ে এলো। গ্রামের লোকজনের মুখ শুকিয়ে গেলো। চেয়ারম্যান সাহেব প্রতি বছর এই দুজন লোককে পাঠায় তাদের ধানের বড় একটি অংশ নেওয়ার জন্য। কিন্তু এবার তো তাদের নিজেদেরই ফলন ভালো হয় নি। চেয়ারম্যান কে দিলে তারা সারা বছর খাবে কি?
লোক দুজন এসে সিকান্দারের সামনে দাঁড়াল। একজন গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
“সিকান্দার ভাই, চেয়ারম্যান সাবের বাড়ি থেইকা আইছি।”
সিকান্দার কাজ করছিল। চোখ তুলে তাকিয়ে বলল,
“কী ব্যাপার?”
লোকটা খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
“খাজনা দিতে হইবো।”
সিকান্দারের ভ্রু কুঁচকে গেল।
“খাজনা? ”
“জ্বি। ধানের খাজনা।”
সিকান্দার কিছুক্ষণ লোকটার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।তারপর শান্ত গলায় বলল,
“কীসের জন্য ধানের খাজনা দিব?”
লোকটা এবার একটু অস্বস্তিতে পড়ল। এই বেডা এত তর্ক করতেছে কেন।
“এই গেরামের নিয়ম। জমির ধানের একটা বড় অংশ চেয়ারম্যান বাড়িতে দিতে হয়।”
সিকান্দারের কপালে দু ভাজ পরলো।
“এই নিয়ম কে বানিয়েছে?”
লোক দুজন একে অপরের মুখের দিকে তাকাল।
“আগ থেইকাই চলে আসতেছে। হেই জমিদারি থিকাই।”
সিকান্দার ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। “আগে চলে আসছে বলে কী এখনও চলবে?”
” গ্রামের সবাই দেয়। আপনেরও দিতে হইবো।”
“সবাই দেয় বলে আমিও দেব এই যুক্তিটা আমার কাছে গ্রহণযোগ্য না। আমার ধান আমি আমার পরিশ্রমে ফলিয়েছি। জমির মালিকের যে অংশ, সেটা আমি দিয়ে দিয়েছি। বাকি ধান আমার। এর ওপর আপনার চেরয়াম্যান সাবের কোনো অংশ নেই।”
লোকটা আর কথা বাড়াল না। তবে যাওয়ার আগে বলে গেল,
“আমনে তাইলে আর ধান দিবেন না? ”
” না। গ্রামের আর বাকি সবাই চাইলে দিতে পারে। তাদের হৃদয় অনেক বড়। দান খয়রাত করার সামর্থ্য আছে। আমার নেই। ”
গ্রামের লোকজন একে ওপরের দিকে তাকালো।
” চেয়ারম্যান সাবরে কী কইমু?”
সিকান্দার ধানের বস্তাগুলোর দিকে তাকিয়ে বলল,
“সত্য কথাটাই বলবে।”
“কী সত্য?”
“সিকান্দার শাহ্ তাকে একটি ধানও দিবে না।”
লোক দুজন মুখ কালো করে চলে গেল। সিকান্দার গ্রামের লোকজনের দিকে তাকিয়ে বলল,
” প্রতি বছরই কেন আপনারা আপনাদের ধান তাকে দেন? এটা অন্যায়। ”
গ্রামবাসী অসহায় মুখ করে বলল, ” তয় আর কী করমু আমরা? আমাগো তো তোমার মতো অত সাহস নাই যে চেয়ারম্যান সাবের সামনে গিয়া কইব, ধান দিমু না। মানুষটা মেলা পাজি। না দিলে অত্যাচার করে। কারও জমিতে পানি আটকে দেয়, কারও কাম বন্ধ করে দেয়, কারও নামে উল্টাপাল্টা কথা ছড়ায়। আমরা গরিব মানুষ। তার লগে লাগলে সংসার চালানো দায় হইয়া যায়।”
” তাহলে কাল ধান নিতে আসলে দিয়ে দিয়েন। ”
” আর তুমি? ”
” দিব না। ”
” তাইলে আমরা কেন দিমু। ”
” দিয়েন না তাহলে। অন্যায়ের প্রতিবাদ না করলে অন্যায়কারী আরো শক্ত করে চেপে বসে। এটা আর সেই ব্রিটিশ আমল না যে তাকে খাজনা দিতে হবে। নিজের পরিশ্রমে ফলানো ফসলে কেবল নিজেদেরই ভাগ থাকবে। আপনারা সিদ্ধান্ত নিন কি করবেন। অন্যায়ের সাথে আপোষ করবেন নাকি রুখে দাঁড়াবেন। ”
সবাই একে অপরের দিকে তাকালো। এই পুলার অনেক দম আছে। ওর কথাই শোনা উচিৎ। সবাই সিদ্ধান্ত নিলো ধান এবার তারা চেয়ারম্যান কে দিবে না। সবার সিদ্ধান্ত শুনে সিকান্দার যাওয়ার সময় বলে গেল,
” কাল চেয়ারম্যানের লোক এলে আমার বাড়িতে আসতে বলবেন। বাকিটা আমি সামলাব।”
চেয়ারম্যান বাড়িতে ইতিমধ্যে খবর গেছে। প্রথমে সিকান্দার তারপর এক এক করে গ্রামের সকলে তাকে ধান দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। কত পরিকল্পনা ছিল তার! গ্রামের ধান উঠলেই একসঙ্গে বড় চালান যাবে শহরে। কৃষকদের কাছ থেকে ধান তুলে নিয়ে শহরের আড়তে চড়া দামে বিক্রি করবে। এ বছর ফলনও ভালো হয়েছে কয়েকজনের। সব মিলিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা আসার কথা।কিন্তু এই বেয়াদব সিকান্দার পানি ঢেলে দিলো।
বিনোদিনীর কানেও এসেছে খবরটা। শোনামাত্রই সে আরো আগ্রহ প্রকাশ করলো সিকান্দারের উপর। তার জহুরি চোখের দৃষ্টি মন্দ নয়। আর বিনোদিনী যখন কোনো কিছুর প্রতি আগ্রহী হয়, তখন সহজে সেখান থেকে চোখ সরায় না।
হরিমতি কে খবর পাঠালো। আজ বিকেলেই সে সিকান্দারের বাড়ি যাবে। যা বলা সেই কাজ। বিকেল হতেই সে সিকান্দারের বাড়ি চলে গেল।
মুনতাহা তখন সবে ভার্সিটি থেকে ফিরেছে। সিকান্দার প্রতিদিন দিয়ে আসে আবার ক্লাস শেষে নিয়ে আসে। আজ পৌঁছে দিয়েই কাজে চলে গেছে। মুনতাহা বোরকা নিকাব খুলে কলপাড়ে গিয়ে হাত মুখ ধুয়ে কেবলই রুমে এসেছে। আর ওমনি বাড়ির দরজায় করাঘাত। পরপর দুবার হলো। মুনতাহা এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো, ” কে? ”
হরিমতি জবাব দিলো, ” আমি হরিমতি। চেয়ারম্যান বাড়ি থিকা আইছি। দরজা খোলেন। দিদিমনি আমনের লগে দেখা করবে। ”
মুনতাহা ভাবলো। কে এই দিদিমনি? সে জিজ্ঞেস করলো, ” আপনাদের সাথে কোনো পুরুষ আছে কী? ”
” না নাই। ”
মুনতাহা ওড়নাটা চাদরের মতো করে শরীরে জড়িয়ে নিলো। তারপর ওড়নার এক প্রান্ত দিয়ে মুখ ঢেকে দরজা খুললো। ভেতরে এসে ঢুকলো দুজন নারী। একজন রঙবেরঙের শাড়ি গায়ে। আরেকজন ধবধবে সাদা শাড়ি গায়ে। চোখ তুলে তাকালো মুখের দিকে। হরিমতি মেয়েটার গায়ের রং চাপা। বাচ্চা বাচ্চা দেখতে। কিন্তু পাশের জন গম্ভীর, সৌন্দর্য সারা শরীর জুড়ে খেলছে। নিঃসন্দেহে সে রূপবতী বটে।
বিনোদিনী আদ্যপ্রান্ত মুনতাহা কে দেখে জিজ্ঞেস করলো,
” তুমিই তবে সিকান্দার শাহ্ এর স্ত্রী? ”
মুনতাহা ভদ্রতার সহিত জবাব দিলো, ” জি। ”
” দেখি মুখের উপর থেকে ওড়নাটা সরাও। তোমাকে দেখার জন্যই আমার আসা। ”
ঠিক বুঝলো না মুনতাহা। তাকে দেখতে আসা মানে?
” আপনারা ভেতরে আসুন। বসুন। ”
বিনোদিনী আর হরিমতি ভেতরে গেলো। মাটির ঘরও এতটা পরিপাটি আর সুন্দর হতে পারে! মুনতাহা চার্জার ফ্যানটা চালিয়ে দিলো। চা,বিস্কিট আর কিছু ফল কেটে তাদের সামনে পরিবেশন করলো। বিনোদিনী চা খেলো। খেতে খেতে জিজ্ঞেস করলো,
” তোমাদের বিয়েটা হলো কিভাবে? ”
খুবই ব্যক্তিগত কথা জিজ্ঞেস করলো। প্রথম দেখাতেই কেউ এসব জিজ্ঞেস করে না। মুনতাহা জবাব দিলো,
” পারিবারিক ভাবেই হয়েছে। ”
” তোমার স্বামী তোমাকে অনেক ভালোবাসে তাই না? ”
এবার মুনতাহা নড়েচড়ে উঠলো। উনি ঘুরেফিরে বার বার বৈবাহিক সম্পর্কের বিষয়বস্তু নিয়ে কথাবার্তা বলছে। উদ্দেশ্য কি তার?
” আমি তার বিবাহিত স্ত্রী, হালাল সম্পর্ক আমাদের। সেখানে আমার স্বামী আমাকে,আর আমি তাকে ভালোবাসবো এটাই তো হবে। ”
বিনোদিনী চায়ের কাপ টা সামনে টেবিলে রাখলো। তারপর মুনতাহার দিকে তাকিয়ে বলল,
” আজ উঠি তবে। ”
” আপনার পরিচয় টা? ”
বিনোদিনী চলে যেতে যেতে বলল, ” সময় মতো জেনে যাবে। ”
” নামটা? ”
” বিনোদিনী। ”
মুনতাহা তার যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইলো। নামটা বিরবির করে উচ্চারণ করলো। অদ্ভুত এক নারীর সামনে বসেছিল সে এতক্ষণ। হুট করে আসলো, দুটো অপ্রাসঙ্গিক কথাবার্তা বলে চলে গেল! উদ্দেশ্য কি এই নারীর?
সিকান্দার আজ পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে এসেছে। অফিসের ভেতরে ঢুকে কাউন্টারের সামনে দাঁড়াল। এক লোককে জিজ্ঞেস করলো,
“আমাদের গ্রামে এখনো বিদ্যুতের লাইন যায়নি। নতুন লাইন নেওয়ার ব্যাপারে কার সঙ্গে কথা বলতে হবে?”
কর্মকর্তা মাথা তুলে তাকালেন।
“গ্রামের নাম?”
“মোহনগঞ্জ।”
“ওখানে কি একেবারেই কোনো বিদ্যুতের লাইন নেই?”
“না। আশপাশের কয়েকটা গ্রামে আছে। আমাদের গ্রামটা বাদ পড়ে গেছে।”
কর্মকর্তা খাতাটা টেনে নিলেন।
“তাহলে এটা ব্যক্তিগত মিটারের সংযোগের বিষয় না। আগে লাইন সম্প্রসারণের আবেদন করতে হবে। আমাদের লোক গিয়ে জায়গাটা জরিপ করবে। কোথা থেকে লাইন নেওয়া যাবে, কতগুলো খুঁটি লাগবে, কত দূর তার টানতে হবে সব দেখে একটা প্রাক্কলন হবে। অনুমোদন হলে কাজ শুরু হবে।”
সিকান্দার মাথা নেড়ে বলল,
“আবেদনটা আজই করা যাবে?”
“যাবে। তবে সময় লাগবে।”
“যত সময় লাগার লাগুক। আবেদনটা আজই করতে চাই।”
কর্মকর্তা তার দিকে কাগজ এগিয়ে দিলেন।
“নাম, ঠিকানা, গ্রামের নাম আর প্রয়োজনীয় তথ্যগুলো দিন।”
সিকান্দার কলম হাতে নিল। আবেদনটা লিখে কাগজটা কর্মকর্তার হাতে দিল। কর্মকর্তা একবার পুরোটা পড়ে নিয়ে বললেন,
“আপনি গ্রামের পক্ষ থেকে আবেদন করছেন?”
“জি।”
“শুধু নিজের বাড়ির জন্য না?”
সিকান্দার শান্ত গলায় বলল,
“নিজের বাড়িতে আলো জ্বালিয়ে পাশের বাড়িটাকে অন্ধকারে রেখে লাভ কী? পুরো গ্রামেই লাইন লাগবে।”
কর্মকর্তা এবার একটু আগ্রহ নিয়ে তাকালেন।
“গ্রামে মোটামুটি কতগুলো পরিবার আছে?”
“অনেক। সঠিক সংখ্যা বলতে পারব না। আপনারা জরিপ করলে সঠিক হিসাব পাবেন।”
“ঠিক আছে। আবেদনটা গ্রহণ করছি। এরপর আমাদের লোকজন জায়গাটা পরিদর্শনে যাবে। তবে একটা বিষয় লাইন কোথা দিয়ে নেওয়া হবে, কতগুলো খুঁটি লাগবে, ট্রান্সফরমার লাগবে কি না এসব জরিপের পরই বলা যাবে।”
“কবে আসবেন?”
“নির্দিষ্ট দিন এখন বলতে পারছি না। তবে আবেদনটা প্রসেসে যাবে।”
সিকান্দার উঠে দাঁড়াল।
“আমি অপেক্ষা করব। কিন্তু একটা অনুরোধ আছে।”
“বলুন।”
“ একটু তাড়াতাড়ি করার চেষ্টা করবেন। ”
তারা মাথা নেড়ে সম্মতি জানাতেই সিকান্দার সেদিনের মতো চলে গেল। তারপর কেটে গেল কয়েকটা দিন। এক সকালে গ্রামের মানুষজনের মধ্যে হঠাৎ হৈচৈ পড়ে গেল। পাকা রাস্তার মাথায় কয়েকজন অপরিচিত লোক এসেছে। সঙ্গে কাগজপত্র, মাপজোখের সরঞ্জাম। দুজনের হাতে লম্বা মাপার ফিতা, আরেকজন রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে চারপাশ দেখছে। খবরটা মুহূর্তেই ছড়িয়ে গেল,পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের লোক এসেছে। সিকান্দার তখন বাড়িতে ছিল না। খবর পেয়েই দ্রুত সেখানে চলে এলো।
“আপনারাই কি বিদ্যুৎ অফিস থেকে এসেছেন?”
একজন কাগজ থেকে গ্রামের নাম মিলিয়ে বলল,
“জি। মোহনগঞ্জ?”
“জি।”
“আপনিই সিকান্দার শাহ্?”
“জি।”
“আপনার আবেদনটা আমরা পেয়েছি। আজ জায়গাটা জরিপ করতে এসেছি।”
সিকান্দার চারপাশে তাকাল।
“কাজটা কোথা থেকে শুরু করবেন?”
লোকটি রাস্তার দিকে ইশারা করল।
“এখানকার মূল লাইনের অবস্থান আগে দেখতে হবে। তারপর সেখান থেকে আপনার গ্রাম পর্যন্ত দূরত্ব, রাস্তার অবস্থা, বাড়িঘরের অবস্থান সব মাপজোখ করতে হবে। কোথায় খুঁটি বসানো যাবে সেটাও দেখতে হবে।”
সিকান্দার সঙ্গে সঙ্গে বলল,
“চলুন।”
তারপর পুরো দলটাকে নিয়ে সে গ্রামের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত ঘুরতে লাগল। যেখানে রাস্তার পাশে খুঁটি বসানোর জায়গা হতে পারে, সেখানে দাঁড়িয়ে মাপ নেওয়া হলো। কোথাও জমি, কোথাও পুকুর, কোথাও সরু রাস্তা,প্রতিটি জায়গা দেখে তারা নিজেদের কাগজে হিসাব লিখে নিচ্ছিল। গ্রামের মানুষজন দূর থেকে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। কারও চোখে কৌতূহল, কারও চোখে বিশ্বাসই হচ্ছে না। সত্যিই কি তাদের গ্রামে বিদ্যুতের খুঁটি উঠবে?
এক বৃদ্ধ কৃষক ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল,
“বাবা, সত্যিই কি এবার আমাগো গ্রামে বিদ্যুৎ আইবো?”
জরিপ করতে আসা লোকটি হাসল।
“আবেদন হয়েছে, জরিপ হচ্ছে। এরপর অনুমোদন আর কাজের প্রক্রিয়া আছে। সময় লাগবে, তবে কাজ এগোচ্ছে।”
বৃদ্ধ লোকটা আকাশের দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল,
“আল্লাহ যেন এইবার সত্যিই বিদ্যুৎ দেয় আমাগো।”
চেয়ারম্যান সাবের কানেও এই কথাটা চলে গেল। গ্রাম তার উন্নতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। অথচ চেয়ারম্যান এসব চায় নি কখনো। গ্রাম উন্নত হলে গ্রামের লোকজন ও আর পিছিয়ে থাকবে না। তারও চালাক হবে। হবে কি? ইতিমধ্যে হতে শুরু করেছে। এ বছর ধান দেয় নি। সিকান্দার ছেলেটার সাথে তো তর্কে পারবে না। সেজন্য শহর থেকে বড় ভাইয়ের ছেলে কে খবর পাঠালেন। অনেক বছর হলো সে আসে না এখানে। সেজন্য বললেন ভাইস্তা কে আসতে। ভাইস্তা কে দিয়ে কিছু করানো যায় কি না দেখবে।
চেয়ারম্যান সাবের ভাইস্তা নাম প্রতাপ রায়। গত বছর বিদেশ থেকে পড়াশোনা শেষ করে বাবার বিজনেস দেখা শোনা করছে। ২৭ বছরের এক সুদর্শন যুবক। দেখতে শুনতে কোনো অংশে কারো থেকে কম না। জমিদারি জমিদারি ভাইব আছে তার মধ্যে। গ্রাম ছেড়েছে তারা বহু বছর আগে। চট্রগ্রামে খুবই নামডাক আছে তাদের। চাচার খবর পেয়েছে। কিন্তু যেতে চায় নি। তবে বাবার জোড়াজুড়ি তে তাকে যেতেই হলো। দুপুরের আগ দিয়ে রওনা হলো। বিকেলের পরপর গিয়ে মোহনগঞ্জের রেল স্টেশনে এসে থামলো। তার চাচা তার জন্য জিপ গাড়ি পাঠিয়েছেন। প্রতাপ সেটায় উঠলো না। জামাকাপড়ের ল্যাগেজ টা দিয়ে হাঁটা ধরলো। সে হেঁটে হেঁটে যাবে।
মির্জা বাড়িতে আজ ছেলে পক্ষ এসেছে। সুনেহরা কে দেখতে। সালমান মির্জা দের সবাই কে থাকতে বলেছে। নাদিমের ইচ্ছে না থাকা স্বত্বেও সে এসেছে। শুধুমাত্র দাদিজানের সাথে সিকান্দার কে কথা বলিয়ে দেওয়ার জন্য। দাদির সাথে কথা হলো। সিকান্দার জানলো তার দাদিজানের শরীর খুব একটা ভালো নেই। সেজন্য জানালো সে খুব শীগ্রই আসবে তার সাথে কথা বলার জন্য।
দাদিজান সিকান্দার কে দেখতে চাইলো। ভিডিও কল দিতে বলল। কিন্তু সিকান্দার জানালো তার ফোন থেকে ভিডিও কল করা যায় না। বাটন ফোন তার। স্মার্ট ফোন কিনে ভিডিও কল দিবে।
বেশ অনেকক্ষণ কথাবার্তা বলার পর সিকান্দার জানলো সুনেহরা কে দেখতে এসেছে আজ পাত্রপক্ষ। সিকান্দার কেবল জিজ্ঞেস করলো,
” ছেলে ভালো তো? কোনো বাজে রেকর্ড নেই তো? ”
নাদিম জানালো,নেই। ছেলে ভালোই। আরো বেশ কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলে ফোন কেটে দিলো। সুনেহরার বিয়ে ঠিক হলো। আগামী মাসের ৪ তারিখে বিয়ে। ছেলে ইঞ্জিনিয়ার। গুলশানে তাদের দুটো বাড়ি আছে। অঢেল টাকা পয়সার মালিক।
নাদিমের মন মেজাজ কি যে খারাপ হলো। তার বড় সিকান্দার, সে বিয়ে করেছে। তার ছোট অর্নব সেও বিয়ে করেছে তার ছোট দুই বোন মুনতাহা আর সিমরানেরও বিয়ে হয়েছে। এবার তো তার বিয়ে নিয়ে কথাবার্তা হওয়া উচিৎ ছিলো। তা না করে সুনেহরার বিয়ে ঠিক হলো। নাদিম বড় আফসোসের সহিত তার বাবার দিকে তাকিয়ে বলল,
” আপনার কি আমাকে চোখে পড়ে না? নাকি দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েই বিয়ের চ্যাপ্টার খালাস করে দিছেন জীবন থেকে। ”
সালমান মির্জা ভ্রু কুঁচকে তাকালেন। নাদিম আবার বলল, ” শুধু মেয়েদেরই কেন বিয়ে দেন? ছেলেদের দিকেও একটু নজর দেন। আমাকে কি খুঁটি বানিয়ে ঘরে রাখতে চাচ্ছেন? আমি মুখ ফুটে বিয়ের কথা বলি না দেখে কি আপনারা একবারও আমার বিয়ের কথা তুলবেন না? বয়স কত হলো আমার হিসেব আছে? ”
সালমান মির্জা নড়েচড়ে বসলেন। জিজ্ঞেস করলেন,
” তুমি কি বিয়ে করতে চাও? ”
নাদিম মাথা নত করে বলল,
” জি, ছোটখাটো করে হলেও একটা বিয়ে করতে চাই। বিয়ে না করলে ছেলে মানুষ নষ্ট হয়ে যায়। নিজেকে নষ্ট হওয়া থেকে বাঁচানোর জন্য কেবল একটি বিয়ে করতে চাই আপনার মতো। ”
” কাউকে পছন্দ? নাকি আমরাই মেয়ে খুঁজবো? ”
” একটু-আধটু একটা মেয়েকে পছন্দ হয়েছে। ”
” পুরোপুরি না? ”
” শিওর না। তবে তাকে বিয়ে করে বউ বানানোর ইচ্ছে আছে খুব। আপনারা একটু সাহায্য করলেই ইচ্ছে টা পূরণ হয়। যদি কৃপা করে একটু দৃষ্টি ফেলতেন আমার উপর তাহলে উপকৃত হতাম। ”
সালমান মির্জা তপ্ত শ্বাস ফেলে বলল, ” নাম কি মেয়ের? বাড়ি কোথায়? ”
” নাম ইলা। মুনতাহার বান্ধবী। ও কে আমার পছন্দ হয়েছে। আপনারা চাইলে তার বাবা মায়ের সাথে কথা বলতে পারেন। তার সাথে আমার বিয়ে ঠিক করতে পারেন। মেয়েটা ভালো অনেক। ”
” ঠিক আছে সুনেহরার বিয়েটা হয়ে যেতে দাও। তারপর কথা বলছি। ”
নাদিম ভেতরে ভেতরে পাগলু ডান্স দিলেও বাহিরে তা প্রকাশ করলো না। কেবল লজ্জা পাওয়ার ভান করে চলে গেল। রুমে এসে দরজাটা লাগিয়ে দিয়ে নাচা শুরু করলো। ফাইনালি সে বিবাহের দিকে আগাচ্ছে। এবছর সিঙ্গেল থেকে মিঙ্গেল হবে। আগামী বছর মিঙ্গেল থেকে তারা ট্রিপল হবে।
সন্ধ্যা নামার আগ দিয়ে মুনতাহা রুম থেকে বেরিয়ে উঠানে এসেছে। এতক্ষণ সে কুরআন শরীফ পড়ছিল সিকান্দার একটু শহরে গেছে। ফিরবে সন্ধ্যার পর। বিড়াল ছানা টা উঠান জুড়ে লাফালাফি করছে। মুনতাহা প্রথমে গাছ গুলোতে পানি দেওয়ার জন্য কলপাড়ে গেলো। বালতি ভরে পানি এনে বেড়ার গা ঘেষে থাকা গাছগুলোতে পানি দিতে দিতে সে অনুভব করলো আজ তার খুব ভালো লাগছে। মনে হচ্ছে আজ কিছু একটা হবে। বিশেষ কিছু। সে আনমনে খুশি হলো। এতক্ষণ রুমে মুখস্ত করতে থাকা কুরআন শরীফের সূরা আল-আনকাবূত টা আনমনে তেলওয়াত করতে লাগলো। ইতিমধ্যে সে অনেক গুলো সূরা মুখস্থ করেছে। আজ এই সূরা ধরেছিল। তেলওয়াত করতে করতে হঠাৎ করে ৫৬ আয়াতে এসে তার গলার স্বর উচু হয়ে গেল। সে ৫৬-৬৬ তম আয়াত কিছুটা জোরে তেলওয়াত করতে লাগলো
ইয়া ইবাদিয়াল্লাযীনা আমানূ, ইন্না আরদী ওয়াসি‘আতুন, ফা-ইয়্যায়া ফা‘বুদূন।
অর্থ: হে আমার ঈমানদার বান্দাগণ! নিশ্চয়ই আমার পৃথিবী প্রশস্ত। অতএব তোমরা শুধু আমারই ইবাদত করো।
কুল্লু নাফসিন যাইকাতুল মাউত। ছুম্মা ইলাইনা তুরজা‘উন।
অর্থ: প্রত্যেক প্রাণী মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। অতঃপর তোমাদেরকে আমার কাছেই ফিরিয়ে আনা হবে।
ওয়াল্লাযীনা আমানূ ওয়া আমিলুস-সালিহাতি লানুবাওয়্যিয়ান্নাহুম মিনাল জান্নাতি গুরাফান, তাজরী মিন তাহতিহাল আনহারু খালিদীনা ফীহা। নি‘মা আজরুল আমিলীন।
অর্থ: আর যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে, আমি অবশ্যই তাদেরকে জান্নাতের সুউচ্চ কক্ষে স্থান দেব, যার নিচ দিয়ে নদী প্রবাহিত হবে। তারা সেখানে চিরকাল থাকবে। সৎকর্মশীলদের পুরস্কার কতই না উত্তম!
আল্লাযীনা সাবারূ ওয়া ‘আলা রাব্বিহিম ইয়াতাওয়াক্কালূন।
অর্থ: যারা ধৈর্য ধারণ করে এবং তাদের প্রতিপালকের ওপরই ভরসা করে।
ওয়া কা-আইয়িন মিন দাব্বাতিল্লা তাহমিলু রিযকাহা। আল্লাহু ইয়ারযুকুহা ওয়া ইয়্য়াকুম। ওয়া হুয়াস-সামী‘উল-‘আলীম।
অর্থ: আর কত জীবজন্তু আছে, যারা নিজেদের রিযিক বহন করে না। আল্লাহই তাদের রিযিক দেন এবং তোমাদেরও। আর তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।
ওয়া লা-ইন সা-আলতাহুম মান খালাকাস-সামাওয়াতি ওয়াল-আরদা ওয়া সাখখারাশ-শামসা ওয়াল-কামারা লায়াকূলুন্নাল্লাহ। ফা-আন্না ইউফাকূন।
অর্থ: আর তুমি যদি তাদের জিজ্ঞেস করো, কে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন এবং সূর্য ও চন্দ্রকে নিয়ন্ত্রণাধীন করেছেন? তারা অবশ্যই বলবে, আল্লাহ। তাহলে তারা কোথায় বিভ্রান্ত হয়ে যাচ্ছে?
আল্লাহু ইয়াবসুতুর-রিযকা লিমান ইয়াশাউ মিন ‘ইবাদিহী ওয়া ইয়াকদিরু লাহু। ইন্নাল্লাহা বিকুল্লি শাইইন ‘আলীম।
অর্থ: আল্লাহ তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাকে চান তার রিযিক প্রশস্ত করেন এবং যার জন্য চান সীমিত করেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সবকিছু সম্পর্কে সর্বজ্ঞ।
ওয়া লা-ইন সা-আলতাহুম মান নাযযালা মিনাস-সামাই মা-আন, ফা-আহইয়া বিহিল-আরদা মিন বা‘দি মাওতিহা লায়াকূলুন্নাল্লাহ। কুলিল-হামদুলিল্লাহ। বাল আকছারুহুম লা ইয়াকিলূন।
অর্থ: আর তুমি যদি তাদের জিজ্ঞেস করো, কে আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেন, অতঃপর এর মাধ্যমে পৃথিবীকে তার মৃত্যুর পর জীবিত করেন? তারা অবশ্যই বলবে, আল্লাহ। বলো, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর। কিন্তু তাদের অধিকাংশই বোঝে না।
ওয়া মা হাজিহিল-হায়াতুদ-দুনইয়া ইল্লা লাহউও ওয়া লা‘ইব। ওয়া ইন্নাদ-দারাল-আখিরাতা লাহিয়াল-হায়াওয়ানু, লাও কানূ ইয়ালামূন।
অর্থ: আর এই পার্থিব জীবন তো খেল-তামাশা ছাড়া কিছুই নয়। আর নিশ্চয়ই পরকালের আবাসই প্রকৃত জীবন যদি তারা জানত!
ফা-ইযা রাকিবূ ফিল-ফুলকি দা‘উল্লাহা মুখলিসীনা লাহুদ্দীনা, ফালাম্মা নাজ্জাহুম ইলাল-বাররি ইযা হুম ইউশরিকূন।
অর্থ: অতঃপর যখন তারা নৌযানে আরোহণ করে, তখন তারা একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর কাছে দ্বীনকে উৎসর্গ করে তাঁকে ডাকে। কিন্তু তিনি যখন তাদেরকে স্থলে পৌঁছে উদ্ধার করেন, তখনই তারা শিরকে লিপ্ত হয়।
লিয়াকফুরূ বিমা আতাইনাহুম ওয়া লিয়াতামাত্তাউ। ফাসাওফা ইয়ালামূন।
অর্থ:যাতে তারা আমার দেওয়া নিয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞ হয় এবং ভোগ-বিলাসে মেতে থাকে। অতঃপর শীঘ্রই তারা জানতে পারবে।
সূরাটা এই অবধি পড়া শেষ করতেই আচমকা মুনতাহার হাত থেমে গেল। চোখ দুটো স্থির হয়ে রইল। বুকের ভেতরটা কেমন ভারী হয়ে এলো, শরীরের সমস্ত শক্তি যেন মুহূর্তেই নিঃশেষ হয়ে গেল।
“প্রত্যেক প্রাণী মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে।”
কথাটা মাথার ভেতর ঘুরতে লাগল। আসলেই তো আমরা এমনই। দুনিয়ার পেছনে ছুটতে ছুটতে এমনভাবে বাঁচি, যেন মৃত্যুর সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্কই নেই। রিযিক নিয়ে দুশ্চিন্তা করি, হারানো জিনিস নিয়ে কাঁদি, মানুষের দেওয়া কষ্ট বুকে জমিয়ে রাখি,অথচ যে মৃত্যু একদিন সব হিসাব থামিয়ে দেবে, তার জন্য কতটুকুই বা প্রস্তুতি নিই? আল্লাহ এত কিছু দেওয়ার পরও আমরা অকৃতজ্ঞ হয়ে যাই। দুনিয়াকে আঁকড়ে ধরে থাকি, অথচ শেষ পর্যন্ত এই দুনিয়াই আমাদের ছেড়ে দিতে হবে।
মুনতাহা আর পড়তে পারল না। কী এক অজানা ভার বুকের ওপর চেপে বসেছে। তারপর রশিতে মেলা জামাকাপড়গুলোর দিকে তাকিয়ে থাকল কয়েক সেকেন্ড। পরক্ষণেই তড়িঘড়ি করে একটার পর একটা কাপড় নামিয়ে নিল। কাপড়গুলো হাতে জড়ো করে কোনো রকমে বুকের কাছে চেপে ধরে দ্রুত ঘরের ভেতর ঢুকে গেল।
বাড়ির বেড়ার পাশে তখন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে প্রতাপ রায়। তার পা যেন মাটির সঙ্গে আটকে গেছে। ওপাশ থেকে ভেসে আসা কণ্ঠস্বরটি কানে পৌঁছানোর পর থেকে আর এক পা-ও এগোতে পারেনি সে।
কী অদ্ভুত কণ্ঠস্বর! এমন কণ্ঠ সে আগে কখনো শোনেনি। কোমল, অথচ কোথাও যেন গভীর এক ভার মিশে আছে। শব্দগুলো সে পুরোপুরি বুঝতে পারছিল না, তবুও প্রতিটি শব্দ কেমন করে যেন তার ভেতরে গিয়ে ধাক্কা দিচ্ছিল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই প্রতাপ রায় নিজের অজান্তেই এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে চলে গেল।
ওই নারীময় কণ্ঠ থেকে বেরিয়ে আসা অচেনা শব্দগুলোর অর্থ তার জানা নেই। তবুও শব্দগুলোর মধ্যে এমন কিছু একটা ছিল, যা তাকে থামিয়ে দিয়েছিল। কৌতূহল ছিল, বিস্ময় ছিল আর ছিল এমন এক অস্বস্তিকর টান, যার কোনো ব্যাখ্যা সে নিজেও খুঁজে পেল না।
সে শুধু দাঁড়িয়ে রইল। বেড়ার এপাশে প্রতাপ রায়, ওপাশে অদৃশ্য সেই নারী। মাঝখানে কেবল একটি বেড়া।
সময় কতটা পেরিয়ে গেল, প্রতাপ খেয়ালই করল না। তার চোখ স্থির হয়ে রইল বেড়ার ওপাশে, অথচ নারীটিকে একবারও দেখা হলো না। অবশেষে যখন সেই নারীর কণ্ঠ থেমে গেল, তখনই যেন প্রতাপের ঘোর কাটল। এতক্ষণ যে নিঃশ্বাসটুকুও সে খেয়াল না করে আটকে রেখেছিল, ধীরে ধীরে তা ছেড়ে দিল।
মেয়েটা কেন থামিয়ে দিলো? আর একটু কি বলা যেত না? আচ্ছা মেয়েটা কে? এতক্ষণ সে খেয়াল করে নি। এখন করলো। এখানে তো আগে কোনো বাড়ি ছিলো না। বাড়িটা কার? একবার কি ভিতরে ঢুকবে? দরজা অব্দি গেলো। কিন্তুভেতরে ঢোকার সাহস পেলো না।
তারপর প্রতাপ রায় ধীরে ধীরে উল্টো ঘুরে হাঁটা ধরলো। যাওয়ার কথা ছিল, অথচ পা দুটো যেন বারবার তাকে থামিয়ে দিচ্ছিল। একবার পেছন ফিরে তাকাল সে। বেড়ার ওপাশে তখন নিস্তব্ধতা। প্রতাপের কপালে ভাঁজ পড়ল।
সে নিজেকেই যেন প্রশ্ন করল কেন দাঁড়িয়ে ছিলাম এতক্ষণ?
উত্তর পেল না। বরং অস্বস্তিটা আরও বাড়ল। ঐ সুন্দর চমৎকার কণ্ঠ স্বর থেকে ভেসে আসা শব্দ গুলো অদ্ভুত ছিলো। এমন কিছু বলা হচ্ছিল, যার অর্থ সে না বুঝলেও বুকের কোথাও গিয়ে আঘাত করেছিল।
প্রতাপ রায় আর দাঁড়াল না। দ্রুত পা বাড়িয়ে চেয়ারম্যান বাড়ির দিকে চলে গেল। কিন্তু কয়েক কদম যেতেই আবার থেমে গেল। পেছন থেকে কোনো শব্দ আসছে কি না, শুনতে চেষ্টা করল সে।
না। নীরবতা। প্রতাপ মৃদু বিরক্ত হলো নিজের ওপর। একটা অচেনা নারীর কণ্ঠ তাকে এভাবে থামিয়ে দিল ব্যাপারটা তার নিজের কাছেই হাস্যকর লাগল।
সিকান্দার শাহ্ পর্ব ৩৯
তবু হাঁটতে হাঁটতে তার কানে বারবার সেই অচেনা শব্দগুলো ফিরে আসতে লাগল।
কুল্লু নাফসিন যাইকাতুল মাওত।
অর্থটা সে জানে না। কিন্তু কেন যেন মনে হলো ওই কয়েকটি শব্দের ভেতর এমন কোনো সত্য লুকিয়ে আছে, যেটা তার এতদিনের জীবনকে খুব অস্বস্তিকরভাবে প্রশ্ন করে যাচ্ছে।
