সীমান্তরেখা পর্ব ৩৩
ঝিলিক মল্লিক
“Don’t tease me, sweetheart. Otherwise, I won’t be gentle.”
ঘাড়ে শার্টের এক ইঞ্চি গভীরে মাঝারি আকৃতির মেয়েলি নখের আঁচড় লাগতেই কথাটা বলে একপ্রকার থ্রেট দিলো মেজবাহ। পুনরায় আকসার ঠোঁটের কিনারায় ঠোঁট এগোতেই হঠাৎ শরীরের সর্বোচ্চ শক্তির ব্যবহার দ্বারা ওকে এক ধাক্কায় আড়াই হাত দূরে ছিটকে সরিয়ে দিলো আকসা। চট করে নিজে শোয়া থেকে উঠে বসে ও। গায়ে ওড়নাটা এমনভাবে জড়িয়ে নেয়, যা দেখে দুই ভ্রু সমান আঙ্গিকে কুঁচকে ফেলে মেজবাহ। যেন কোনো লম্পট লম্পটামি করার চেষ্টা করছে আকসার সাথে। ভাবখানা ওর এমনই। মেজবাহ প্রতিক্রিয়া দেখানোর আগেই আকসা হিসহিসিয়ে বলে ওঠে, “কোন অধিকারে আমার কাছে আসছেন? কীসের অধিকারে? আমার ওপর কোনো অধিকার নেই আপনার। সুতরাং, এভাবে বারবার জোরপূর্বক আমার কাছে আসবেন না৷ নচেৎ, আমি আপনার নামে মামলা করবো।”
“মামলা?”
মেজবাহ ঠোঁট কামড়ে হাসে। যেন খুব লেইম জোকস শুনলো সবে। আকসা কঠোর গলায় জবাব দিলো, “হ্যাঁ মামলা। ‘ম্যারিটাল রেইপ’ ওয়ার্ডটা শুনেছেন? আপনি মূলত আমার সাথে সেটা করার চেষ্টা করছেন। আর এই অন্যায়ের জন্য দেশে আইনও আছে।”
“ম্যারিটাল রেইপ? তোমাকে আবার রেইপ করলাম তবে?”
মেজবাহ অবাক না হয়ে পারে না। শার্টের হাতা গুটিয়ে বসে আকসার মুখ থেকে স্পষ্ট জবাব শোনার জন্য। আকসা চুপ করে থাকে৷ কোনো জবাব দেয় না প্রশ্নের। মেজবাহ’র এই নিরবতা সহ্য হলো না। ও পালঙ্কের কোণে মুঠো কোরে রাখা হাত টোকা দিয়ে তাঁরস্বরে বললো, “কী হলো? চুপ করে আছো কেন? বলো, তোমাকে আবার রেইপ করলাম কবে? হু?”
“আপনি আমার সাথে জোরজবরদস্তি করেন। স্বামী-স্ত্রী’র মধ্যে বৈধ বিয়ে থাকা সত্ত্বেও স্ত্রী’র সম্মতি ছাড়া জোরপূর্বক শারীরিক সম্পর্ক করা মানেই ম্যারিটাল রেইপ৷ আপনার নামে আমি এই মামলা দিবো, যদি আর একবারও আমার কাছে আসার চেষ্টাও করেন!”
আকসা এবার কথাটা বেশ জোর খাটিয়েই বললো। মেজবাহ’র কোনো হেলদোল হলো না৷ ও সামান্য মাথা নাড়িয়ে ঠোঁট কামড়ে হেঁসে বিরবির করলো, “পাগল-ছাগল! এখনো ঠিকমতো কিছুই করলাম না, অথচ কি জঘন্য তকমা লাগিয়ে দিলো! শালা জীবনটাই লসে ভরপুর! যেদিন পুরোপুরি সব করবো, সেদিন মামলা দিও। নাহলে তোমার এই মামলাটাও মিথ্যা হয়ে যাবে।”
মেজবাহ উঠে দাঁড়ায়। পরনের শার্ট ঠিক করে নিয়ে বৃষ্টিভেজা খোলা ব্যালকনির নিকটে গিয়ে থামে। ব্যালকনির দুই পাশে কতক সাদা পর্দা টাঙানো। বৃষ্টির তোড়, দমকা হাওয়ায় সেগুলো নড়েচড়ে, হেলেদুলে হাউসবোটের ভেতরের এই তুলকালাম ঝঞ্ঝাটে পরিপূর্ণ কক্ষে প্রবেশ করে৷ আবার বাইরে ছোটাছুটি করে। কতক্ষণ যাবত এমনটাই ঘটছে। হাওরের ওপর থেকে বয়ে আসা শীতল বাতাস কি নিদারুণভাবে গা ছুঁয়ে যায়! চোখ বন্ধ করে ব্যালকনিতে দাঁড়ালে আরাম লাগে বেশ। পরিবেশটা অদ্ভুত সুন্দর হয়ে আছে৷ যেন মোহময় একটা রাত। আকসা ধীরে-সুস্থে উঠে বসে। বিছানা থেকে নেমে ওয়াশরুমে গিয়ে মুখে পানির ছিটা দিয়ে আসে। চোখ-মুখ লাল ওর। ফুলেও গেছে। খেয়াল করলো, মেজবাহ তখনও ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছে। মুখ দেখা যাচ্ছে না তার। পেছন থেকে দেখে লোকটার হাবভাব কিছুই বোঝা গেল না।
তবে অবাক করা ব্যাপার হলো, একেবারে নিঃশব্দে রুমে প্রবেশ করলেও মেজবাহ আকসার উপস্থিতি টের পেয়েছে। সেটা বোঝা গেল মেজবাহ’র একটা কথায়। মেজবাহ সামনে বৃষ্টিস্নাত হাওরের দিকে তাকিয়েই ভয়ঙ্কর রকমের গম্ভীর স্বরে বললো, “রাজশাহী ফিরে আমার বাসায় ওঠার প্রয়োজন নেই। বাপের বাড়ি চলে যেও। ডিভোর্স পেপার পাঠিয়ে দেবো, সাইন করে ফেরত দেবে।”
মেজবাহ বোধহয় আশা করেছিল, আকসা সামান্য হলেও ভ্রুক্ষেপ করবে। আঘাত পাবে। যন্ত্রণা হবে ওর। কিন্তু কিছুই হলো না। নিতান্তই অস্বাভাবিক রকমের স্বাভাবিক ভঙ্গিতে আকসা পাল্টা জবাব দিলো — “ঠিক আছে। পারলে একটু দ্রুত পাঠিয়ে দিবেন। আপনি তো আবার এখান থেকে ফিরে চট্টগ্রামে চলে যাবেন। যাওয়ার আগে পাঠিয়ে দিলে ভালো হয়। নাহলে দেখা গেল, সেখানে যেয়ে আবার ফিরলেন পাঁচ-ছয় মাস পরে। তখন আরেক তামাশা!”
শব্দগুলো মেজবাহ’র কানে অনবরত ঝনঝন করে বাজতে লাগলো। ও ঘাড় ঘুরিয়ে অবাক কন্ঠে প্রশ্ন করে, “সো, তুমি ডিভোর্স দিতে রাজি?”
“অবশ্যই! এক পায়ে খাঁড়া। আপনার মতো লোকের সাথে আর থাকতে হবে না, এই খুশিতে কী করা যায় বলুন তো? মিষ্টিমুখ করাবো? নাহ, মিষ্টি তো এখানে নেই৷ তাহলে?”
আকসা মূলত মেজবাহ’র ইগো হার্ট করার জন্যই এমন প্রতিক্রিয়া দেখানো শুরু করে৷ আবছা আঁধারে দাঁড়িয়ে মেজবাহ ওর কার্যকলাপ দেখতে থাকে। মেয়েটা লম্বা ভেজা চুল পিঠের ওপর মেলে রেখেছে। ওড়নাটা গায়ে এমনভাবে প্যাঁচিয়ে রেখেছে যেন, সামান্য একটু সরলেই মেজবাহ ওর ওপরে ঝাঁপিয়ে পরবে বা খারাপ কিছু করবে ওর সাথে। আকসা মেজবাহকে অপমান করার জন্য এভাবে ওড়না পরেছে— এমনটাই মনে হলো মেজবাহ’র। শরীরের শিরা-উপশিরা চিড়বিড় করতে শুরু করলো। মেজবাহ দেখলো, আকসা ঠিক একই নাটকীয় ভঙ্গিতে লাগেজ খুলে সেখানে মিষ্টিজাতীয় খাবার খুঁজছে। যেন এই মুহূর্তে মেজবাহকে মিষ্টিমুখ করানো ওর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ৷ মেজবাহ জানে যে, লাগেজে কোনো মিষ্টিজাতীয় খাবার নেই৷ এমনকি আকসাও একথা খুব ভালো কোরেই জানে৷ অথচ এমন একটা ভাব করছে! সহ্য হচ্ছে না মেজবাহ’র। বহুকষ্টে নিজের ভেতরকার আগ্নেয়গিরির লাভার ন্যায় জ্বলন্ত অগ্নিকুন্ডকে দমন করে রেখেছে। কিন্তু অগ্নিশিখা আর বেশিক্ষণ নিরীহ থাকার পরিস্থিতিতে রইলো না৷ যেই না আকসা সুর কোরে বলে উঠলো, “ইশশ! লাগেজে একটাও মিষ্টি তো দূর, দুই টাকার চকলেটও পাচ্ছি না। এখন জনাব মেজবাহ ইফতেখারকে আমি মিষ্টিমুখ করাবো কিভাবে!”
কটাক্ষ করে কথাটা বলতেই মেজবাহ’র হাতের বাহুর এবং কপালের শিরা সব ফুলে গেল৷ ও ব্যালকনি থেকে দুই কদম ভেতরে এগিয়ে এসে পেছন থেকে টান দিলো আকসাকে। আচমকা টান খাওয়ায় নিজেকে সামলানোর বা ছাড়িয়ে নেওয়ার সময়-সুযোগ মিললো না আকসার। মেজবাহ ওকে এক টানে ব্যালকনিতে নিয়ে গেল।
বৃষ্টির ঝাঁপটা বেড়েছে। আকাশ ঘন কালো মেঘের আবরণে ঢাকা৷ মুষুলধারে এই বৃষ্টির তোড়ে দূর-দূরান্তে সামনে কিছুই দেখা যায় না৷ ধোঁয়াশা সব। শুধু বৃষ্টি আর বৃষ্টি। বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটাগুলো হাওরের পানিতে আছড়ে পরছে৷ জলের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ হচ্ছে। মাঝেমধ্যে ব্ল্যাকহোলের ন্যায় কালো আসমানে তাঁরার মতো ঝলক দেখিয়ে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। বজ্রপাত হচ্ছে। তা-ও যেন-তেন নয়। বরং হৃদয় কাঁপানো মতো ভয়ঙ্কর বলা চলে। আকসা বেশ ভয় পাচ্ছে বজ্রপাতের শব্দে। পাওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। এরকম খোলা ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে থাকলে বুক কাঁপবেই। তারওপর মেজবাহ ইফতেখার। এই লোকের চেয়ে ভয়ঙ্কর বজ্রাঘাত আর কিছু হতেই পারে না! আকসা এবার ইচ্ছাকৃত, জেনে-বুঝে মেজবাহ’র গলায় জোরে খামচি বসিয়ে দিয়ে বললো, “কোলে নিয়েছেন কেন? কোল থেকে নামান। নাহলে লাথি দেবো।”
‘লাথি’ দেওয়ার কথা শুনে শেষ যেটুকু ধৈর্য অবশিষ্ট ছিল, সেটাও উড়ে গেল মেজবাহ’র। আকসার গ্রীবা শক্ত হাতে চেপে ধরে মেজবাহ ওর মুখের নিকটে মুখ এগোয়। ঘৃণায়, বিতৃষ্ণায় আকসা মুখ সরিয়ে নেওয়ার প্রাণপণ প্রচেষ্টা করে। তবে সম্ভবপর হয় না। শেষমেশ, বাইরের দমকা হাওয়া, প্রবল বৃষ্টিমুখর পরিবেশকে ছাপিয়ে এক অবর্ণনীয়, দহরমমহরম পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো। ঠোঁটে শীতল ছোঁয়া শরীর কাপিয়ে তুললো৷ শরীরের সর্বোচ্চ বল প্রয়োগ করলো। তবে সৃষ্টিগতভাবে অধিক শক্তির ক্ষমতাধর জাতের একজনের কাছে পরাজয় নিশ্চিত হলো। জয়ের সম্ভবনা তো স্বপ্নাতীত!
আকসার ঠোঁট হতে পুরু ওষ্ঠদ্বয় সরিয়ে এনে মেজবাহ কর্কশ আওয়াজে বললো, “নাও, মিষ্টিমুখ হয়ে গেছে।”
একথা বলেই ও আকসাকে এক ধাক্কায় দূরে সরিয়ে দিলো। দূরে সরে গিয়ে আকসা ঘৃণার দৃষ্টি ফেলে মেজবাহ’র দিকে চেয়ে রইলো৷ ঠোঁটের কোণে ওর চরম ধিক্কার। তবে সেসবে মেজবাহ’র সামান্য ভ্রুকুটি কুঞ্চিত হলো না। আকসা ওই ঘৃণা আর বিতৃষ্ণা সঙ্গে নিয়ে দ্রুত পা চালিয়ে কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেল।
লবিতে আলো আছে বেশ। সেই আলো ধরেই আকসা উদ্দেশ্যহীনভাবে সামনে হাঁটছে। হঠাৎ ধাক্কা খেল। এই মাঝরাতে লবিতে কার সাথে ধাক্কা লেগেছে — এটা দেখার জন্য নতমুখ ওঠাতেই বিব্রত হলো আকসা। তিন-চারটে ছেলে৷ এরা আজ ছাঁদে ছিল৷ আকসার নাচও দেখেছে বলে খেয়াল হলো ওর৷ ছেলেগুলো ওর দিকেই একধ্যানে তাকিয়ে আছে। ঠোঁট টিপে আসছে। ঠোঁটের কোণে এই অদ্ভুত হাসিটা যে কতোটা ভয়ঙ্কর লাগলো আকসার কাছে, সেটা ও বলে বুঝাতে পারবে না৷ ও পাশ কাটিয়ে চলে যাবে, তখনই পেছন থেকে শোনা গেল, “ওয় চিকনি চামেলি, নাচটা কিন্তু সেই ছিল!”
কথাটা শোনামাত্র আকসা তড়াক করে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকায়। ও কোনো জবাব দিতে যাবে, তার আগেই একটা ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটে গেল চোখের সামনে!
মেজবাহ’র গলার আওয়াজ পেয়ে চমকে উঠেছে। নিজের পেছনে তাকিয়ে দেখে, মেজবাহ দাঁড়িয়ে আছে পকেটে দু’হাত পুরে। আকসা ওকে একবার পরখ করে ঢোক গিলে। লোকটার মতিগতি একদমই ভালো ঠেকছে না৷ একটা ভয়াবহ কান্ড না ঘটে যায়! ভাবতে না ভাবতেই হলোও ঠিক তাই। মেজবাহ আকসাকে ছাড়িয়ে সামনে ছেলেগুলোর দিকে এগিয়ে গেল৷ ভারিক্কি স্বরে প্রশ্ন করলো, “কী বললি?”
ছেলেগুলো চুপ। ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে মেজবাহ’র দিকে। মেজবাহ আবারও জিজ্ঞাসা করে, “কী বললি হু? আবার বল!”
ওদের মধ্য থেকে কে জানি এবার বলে বসলো, “যা বলার বলেছি। আরো বলবো। কোনো সমস্যা?”
সঙ্গে সঙ্গে সেই ছেলে ভয়ংকর বিরাশি সিক্কার চড় খেয়ে মাটিতে পড়ে গেল। সাথের ছেলেগুলো নড়েচড়ে দাঁড়ালো। মেজবাহ মেঝেতে নিচু হয়ে বসে সেই ছেলেটার শার্টের কলার চেপে ধরে দাঁতে দাঁত কামড়ে বললো, “সমস্যা? সমস্যা না৷ তার থেকেও ভয়াবহ কিছু। এরপর থেকে ওর আশেপাশে তোদের ছায়া দেখলেও জানে মেরে ফেলবো হারামজাদা!”
ছেলেটা মেজবাহ’র কাছ থেকে নিজেকে ছাড়ানোর প্রচেষ্টা চালালো। এমনকি, ওর সাথের ছেলেরা মেজবাহকে সরিয়ে আনার চেষ্টা করতে তৎপর হলো। তবে কোনোভাবেই সেটা সম্ভব হলো না। একটা ছেলে পেছন থেকে বলে উঠলো, “এই মাইয়া কি তোমার রক্ষিতা হয়, যে এতো প্রটেকশন মারাইতে আসছো!”
সীমান্তরেখা পর্ব ৩২
কথাটা শোনামাত্র তড়িৎ উঠে দাঁড়িয়ে এক ঘুষিতে সেই ছেলেকে জোরে ঘুষি মেরে মেঝেতে শুইয়ে ফেলে মেজবাহ। ওর গলা চেপে ধরে। ছেলেটার জবান তবু থামে না৷ ও কপটতার হাসি হাসতে হাসতে বলে, “আহারে কত ভদ্রলোক রে! নিজের রক্ষিতার ব্যাপারে কিছু শুনতেও খারাপ লাগে? এতো ভালো মানুষ আজকাল কই পাওয়া যায়?”
মেজবাহ ’র আর সহ্য হলো না! ওর মুখ বরাবর একটা ঘুষি বসিয়ে দিয়ে জোরে চেঁচিয়ে উঠলো, “রক্ষিতা নয়, বউ হয় ও আমার৷ কাগজে-কলমে, শরীয়াহ মোতাবেক বিয়ে করা একমাত্র বউ। ওর নাম মুখে এনে একটা কথা বললেও জিভ টেনে ছিঁড়ে ফেলবো হারামির বাচ্চা!”
