সীমান্তরেখা পর্ব ৪৩
ঝিলিক মল্লিক
শিরিনকে কলপাড়ে মেজবাহর জন্য পানির ব্যবস্থা করতে দেখে আকসা সঙ্গে সঙ্গে বসা থেকে উঠে গেল। সোজা কলপাড়ের দিকে গেল৷ ওপরে উঠে শিরিনকে হাত দিয়ে ঠেলে সরিয়ে দিলো৷ শিরিনের হাসি হাসি মুখ মলিন হয়ে গেল মুহূর্তের মধ্যেই। মুখ কালো করে একপাশে দাঁড়িয়ে বাঁকা চোখে দেখতে লাগলো৷ আকসা কলের ডান্ডায় চাপ দিতেই মেজবাহ হাত উঠিয়ে ডান্ডা চেপে ধরে ওকে থামানোর চেষ্টা করে বললো, “কি করছো! প্রেগন্যান্ট তুমি। এমন অবস্থায় পরিশ্রমের কাজ কেন করছো? ছাড়ো আকসা। রুমে যাও। গিয়ে রেস্ট নাও।”
আকসা কল ছাড়লো না। বরং আরো শক্ত করে ডান্ডা চেপে ধরে ওর কর্মকান্ডে হতচকিত মেজবাহ’র দিকে কটমট চোখে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে শক্ত গলায় বললো, “এই ভিলায় কোনো মাহরাম নারী অথবা কোনো পুরুষের অভাব পরেছে তো, একারণে আমার-ই বাধ্য হয়ে আসতে হলো।”
আকসা গায়ের সবটুকু জোর লাগিয়ে কলে প্রেশার ফেললো। পানি অতিরিক্ত পরে মেজবাহ’র পোশাক-আশাক সব ভিজে গেল। মেজবাহ হতবাক হয়ে তাকিয়ে দেখতে লাগলো আকসাকে। আকসা পারলে চোখ দিয়েই মেজবাহকে গিলে ফেলে। কল ছেড়ে ও শিরিনের দিকে তাকালো। শিরিন ঠোঁট উল্টে চোখে অসহায় ভাব এনে নিরীহ বেশে দাঁড়িয়ে আছে দেখে আকসার শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে আগুন জ্বলে উঠলো। ও রুক্ষ স্বরে বললো, “আর তুমি।”
“জি ভাবিপু।”
“তুমি আমার সাথে আসো।”
আকসা হুকুম জারি করে উল্টোদিকে ঘুরে সোজা পথে হাঁটতে শুরু করলো। শিরিন ভয়ে ভয়ে বাধ্য মেয়ের মতো আকসার পিছু পিছু গেল৷
উঠোনের মাঝের শোরগোল পেরিয়ে আকসা বাড়ির পেছন দিকের পুকুর ঘাটের কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। পিছু ফিরলো ও। দেখলো, শিরিন ওর পেছনে দাঁড়িয়ে হাতের নখ দ্বারা অপর হাতের নখে আঁচড় কাটছে৷ আকসা একবার অবজ্ঞা সহকারে ওকে পা থেকে মাথা অবধি দেখলো। তারপর বললো, “বয়স কত তোমার?”
“জি ভাবিপু?”
“জিজ্ঞাসা করেছি, বয়স কত তোমার? এই সতেরো আঠারো হবে, তাই-না?”
“জি।”
শিরিনের চোখের পাতা কাঁপতে লাগলো। আকসা একইরকম শান্ত স্বরে বললো, “এই বয়সেই অন্যের স্বামীর দিকে চোখ? এখনো সারাটা জীবন তো পরে আছে। মানুষের স্বাভাবিক আয়ু ষাট থেকে সত্তর বছর। অর্থাৎ, বলা চলে তোমার জীবনের এখনো চল্লিশ বছর পরে আছে৷ এই চল্লিশ বছরে কত বিবাহিত পুরুষের দিকে নজর দেবে? হিসাব কি করে রেখেছো? নাকি আমি করে দেবো?”
শিরিন যেন বুঝতে পারেনি আকসার কথা— এমন নিরীহ বেশে আকসার দিকে তাকিয়ে বিরবির করে বললো, “আপনি কি বলছেন আমি ঠিক বুঝতে পারছি না ভাবিপু।”
সঙ্গে সঙ্গে শিরিনের গালে পরলো একটা বিরাশি সিক্কির থাপ্পড়। শিরিন হতভম্ব হয়ে গালে হাত দিয়ে ভয়ার্ত চোখে তাকালো আকসার দিকে৷ আকসা এবার গলার জোর কিছুটা বাড়িয়ে দাঁতে দাঁত পিষে বললো, “বুঝো না তুমি? ন্যাকা সাজো? অন্যের স্বামীর দিকে কিভাবে নজর দিতে হয়, সেটা তো খুব ভালো কোরে বুঝো। তাহলে খাঁটি বাংলায় বলা কথা বুঝতে এতো কষ্ট হচ্ছে কেন? কি, খুকি তুমি? নতুন করে বাংলা বর্ণমালা শিখিয়ে দিতে হবে?”
শিরিন একদম চুপ। বোবা বনে গেছে যেন। মুখ থেকে একটা রা’ও বের হলো না ওর৷ আকসা বলতে লাগলো, “ভেবেছো কী? আমি প্রেগন্যান্ট বলে আমার স্বামী আমার কাছে শারীরিক ফায়দা না পেয়ে অন্য নারীর প্রতি আকৃষ্ট হবে? তবে একটা কথা শুনে রাখো, আমি যদি কোনোদিন প্যারালাইজডও হয়ে যাই সারাজীবনের জন্য, তবুও মেজবাহ ইফতেখার আমি ব্যতীত পৃথিবীর কোনো মেয়ের দিকে নজরও দেবে না ইন শা আল্লাহ — এতটুকু বিশ্বাস আমার ওনার ওপরে আছে। আর তুমি ছ্যাঁচড়া, ব্যক্তিত্বহীন মেয়ে মনে করেছো, আমি প্রেগন্যান্ট বলে আমার স্বামী তোমার দিকে খেয়াল করবে? বোকা মেয়ে! উনি তোমাকে জাস্ট একটা হেল্প করতে বলেছে! বোনের দৃষ্টিতে দেখে তোমাকে। আর তুমি তাকে কোন নজরে দেখছো? আশিকের নজরে? থাপড়ে থাপড়ে গাল লাল করে দেবো নির্লজ্জ মেয়ে! আর যদি কখনো আমার স্বামীর আশেপাশে তো দূর, তার ছায়াও তোমাকে মাড়াতে দেখি; তাহলে ধরে মাথা ন্যাড়া করে ঘোল খাইয়ে গাধার পিঠে উঠিয়ে পুরো শহর ঘোরাবো। এখন যাও চোখের সামনে থেকে!”
শিরিন দৌড়ে পালালো সেখান থেকে। আকসা ধীরে-সুস্থে বের হলো বাড়ির পেছন থেকে। মেজবাহ উঠোনেই ছিল। আকসা আসতেই মেজবাহ’র সামনে পরলো৷ মেজবাহ ওকে দেখে জিজ্ঞাসা করলো, “ওদিকে কী করছিলে?”
আকসা জবাব দেওয়ার পরিবর্তে গম্ভীর গলায় বললো, “রুমে আসুন।”
‘রুমে আসুন’ কথাটা বলেই আকসা গটগট পায়ে হেঁটে বাড়ির ভেতরে চলে গেল। মেজবাহ চিন্তিত ভীষণ। হঠাৎ কি হলো মেয়েটার!
আকসা রুমে আসার মিনিট দুই-তিনেকের মধ্যেই মেজবাহও আসলো। আকসা যেভাবে সোজা হয়ে বিছানায় বসে ছিল, ওভাবেই বসে রইলো৷ মেজবাহ এসে ঘরে পরা স্লিপার খুলে বিছানায় উঠে আকসার মুখোমুখি বসে চটপটে গলায় জিজ্ঞাসা করলো, “কী হয়েছে আকসা? হঠাৎ রুমে ডাকলে কেন? মিস করছিলে নাকি?”
মেজবাহ’র মুখের ফিচেল হাসি দেখে আকসার জমে থাকা রাগ আরো তরতর করে বাড়লো৷ ও আচনক আকসার কলার টেনে ধরলো। অপ্রত্যাশিত এমন ঘটনার জন্য মেজবাহ প্রস্তুত ছিল না৷ ভড়কালো ও। আকসা দাঁতে দাঁত চেপে বললো, “রুমে ডাকবো না? বাইরে পুরো বাড়ি ভর্তি মেয়েমানুষ। আপনার ওখানে কী? এসময়ে আপনি থাকবেন রুমে। বাইরে বের হবেন, মেয়েরা দেখে সিডিউস করবে, সেগুলো নিতে খুব মজা লাগে তাই-না?”
“ছি ছি। তওবা তওবা, কি বলো! বাইরে সবাই আমার মা-বোনের মতো। সবাইকে আমি সেই চোখেই দেখি। আল্লাহ জানেন, আমার মনে কোনো বাজে চিন্তাভাবনা নেই।”
“আপনি বোনের নজরে দেখলেও সবাই তো আপনাকে ভাইয়ের নজরে দেখে না৷ ওইযে শিরিন..”
“শিরিন কী করেছে?”
“ওই মেয়েটা সুবিধার না৷ ওর নজর ভালো না। জেনেশুনে বিবাহিত পুরুষের দিকে নজর দেওয়া মেয়েরা কি ভালো হয়? এত মানুষ থাকতে ও আপনাকে পানি দিতে গেল, আর আপনিও ড্যাংড্যাং করে ওর সাথে চলে গেলেন!”
“আমি তো জাস্ট হাত-মুখ ধুতে গিয়েছিলাম।”
“কেন যাবেন আপনি? কি প্রয়োজন? দরকার হয় সারাদিন ওরকম কাঁদা মাথা অবস্থায় থাকবেন৷ তবু কেন যাবেন একজন নন-মাহরাম মেয়ের সাথে। যতই বোন ভাবুন! কার মনে কি চলে আর কি ইন্টেনশন থাকতে পারে, সেটা তো আর আপনি জানেন না। শুনুন একটা কথা। আমাকে দুর্বল মেয়ে মনে করবেন না মেজবাহ। আপনাকে আমি বিশ্বাস করি৷ কিন্তু শয়তানের ধোঁকাকে নয়। আপনি ভালো মনে করে এক পা এগোলে দেখা গেল, শয়তান শয়তানি করে আপনাকে ধোঁকা দেওয়ার চেষ্টা করলো। আর সৃষ্টিকাল হতে এপর্যন্ত শয়তানের ধোঁকা হতে কয়জন বাঁচতে পেরেছে? আপনার ইন্টেনশন পিওর থাকলেও শয়তানের নয়। শিরিন একটা শয়তান মেয়ে। ওর সাথে যদি আপনাকে আর কখনো দেখি না…!”
আকসা সামনে নিরীহবেশে বসে থকা মেজবাহ’র চুল আরো জোরে টেনে ধরলো৷ দাঁতে দাঁত পিষে বললো, “বলুন, ‘শিরিন নামে পৃথিবীতে কোনো মেয়ে নেই, আমি কোনো শিরিনকে চিনি না৷ আর যদি কেউ শিরিন পরিচয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়ায়, তাহলে তাকে আমি হিজড়া মনে করবো এবং একইসাথে লাথিও দেবো।”
সীমান্তরেখা পর্ব ৪২
পোষা শালিক যেভাবে বুলি আওড়ায়, মেজবাহও সেভাবেই অসহায়ের ন্যায় আওড়ালো— “শিরিন নামে পৃথিবীতে কোনো মেয়ে নেই, আমি কোনো শিরিনকে চিনি না৷ আর যদি কেউ শিরিন পরিচয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়ায়, তাহলে তাকে আমি হিজড়া মনে করবো এবং একইসাথে লাথিও দেবো।”
