সীমান্তরেখা পর্ব ৩৯
ঝিলিক মল্লিক
“আম্মা আমি মশলা বেঁটে দিই?”
মেজবাহ’র আজ রাজশাহী ফেরার কথা। সকাল থেকে ইশা বেগম রান্নাবান্না শুরু করেছেন। ওবাড়ির মেয়ে সাথী এসে তরি-তরকারি কেটেকুটে দিয়ে গেছে, ভুড়ি পরিষ্কার করে দিয়ে গেছে। শুধু মশলা বাটা বাকি। এই বাড়িতে রান্নায় তরিতরকারিতে আবার ব্লেন্ডারের ব্লেন্ড করা মশলা ব্যবহার করা হয় না৷ শিলনোড়ায় বাটা মশলা-ই বেশিরভাগ সময় ব্যবহার করা হয়। শিলনোড়ার মশলা দিলে তরকারির স্বাদ বাড়ে। এটা ইশা বেগমের অনুসন্ধান।
মশলা বাটার কাজ আকসার ফুপু শাশুড়ি রিতু বেগম করার তোড়জোড় করছিলেন। তখন আকসা এসে ওর শাশুড়ির কাছে মশলা বাটার অনুমতি চাইতেই ইশা বেগম দিলেন এক ধমক। বিয়ের ছয় মাসের মাথায় এই প্রথম আকসা ওর শাশুড়ি ধমক খেলো। হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলো শাশুড়িআম্মার দিকে। ইশা বেগম বেশ রাগান্বিত হয়ে বললেন, “তোমাকে আমি মশলা বাটতে বলেছি? এখানে এত মানুষ আছে। তোমাকে কেন করতে হবে? ঘরে যেয়ে চুপচাপ বসো। ফলমূল রাখা আছে ডাইনিং-এ, ওগুলো খাও। রান্নাঘরের এই গরম-তাপের মধ্যে এসো না।”
আকসা ধমক খেয়ে উল্টোদিকে ঘুরে গুটি গুটি পায়ে হাঁটা ধরলো। যাওয়ার সময়ে শুনতে পেল, ওর শাশুড়িআম্মা গজগজ করতে করতে বলছেন, “আমি আমার আব্বার বউকে আগে কোনোদিন রান্নাঘরে আসতে দিই নাই। তারে এখন আমি এই সময়ে রান্নাঘরে কেন আসতে দেবো? আমি কি এতই খারাপ শাশুড়ি হয়ে গেছি রিতু?”
রিতু বেগম মাথা নেড়ে সান্ত্বনা দিচ্ছেন ইশা বেগমকে।
“থাক ভাবী। তুমি মন খারাপ কইরো না। ও হয়তো ভাবছিল, এখানে সবাই অন্য কাজে ব্যস্ত, তাই একটু হাত লাগালে সাহায্য হইতো। এমনিতেও বউরে দিয়ে একটু-আধটু কাজ করালে কিছু হবে না৷ এই সময়ে সারাদিন শুয়ে-বইসা থাকলে আরো সমস্যা।”
“তাহলে বাইরে হাঁটাচলা করুক, ঘুরে আসুক। এসব করার কোনো দরকার নেই। রিতু আছে, আমি আছি। আমরা যতদিন বেঁচে আছি, সুস্থ-সবল আছি; ততদিন সব আমরাই করে নেবো। আমরা না থাকলে তখন নাহয় ওরা সংসার গুছিয়ে নেবে।”
বড় ভাবীর শক্ত গলায় দেওয়া জবাবের পর রিতু বেগম আর কিছু বলার সাহস পেলেন না৷ চুপ করে গেলেন তিনি।
দুপুর তখন একটা কি দেড়টা হবে। বাইরে কড়া রোদ। জানালার গ্রিলের ফাঁকফোকড় হতে তেজদীপ্ত রোদের ফাল ঠিকরে সমান্তরালভাবে রুমের মেঝের ওপরে এসে পরছে। সোনালু রোদ চিকচিক করছে৷ ওদিকে তাকালেই চোখ ধাঁধায়। আবার চোখ সরিয়ে অন্যদিকে তাকালে দু-তিন মিনিটের জন্য সব অন্ধকারাচ্ছন্ন দেখায়৷ তারপর আবার সব স্বাভাবিক। আকসা ফ্লোরের ছায়ায় মোড়ানো শীতল এককোণে বসে সেই রোদ দেখছিল কুঁকড়ানো চোখে। পেটে বাচ্চা আসার পরে ইদানীং একটা অভ্যাস হয়েছে ওর। না, ঠিক অভ্যাস নয়। বরং, বদভ্যাস বলা চলে। সবসময় বিছানায় শুতে বা বসতে ভালো লাগে না ওর। গা জ্বালাপোড়া করে। হুটহাট বালিশ একটা নিয়ে মেঝেতে শুয়ে বা বসে পরে ও। টাইলস করা মেঝেতে ঘন্টার পর ঘন্টা শুয়ে-বসে থাকে৷ ওর শাশুড়ি, চাচিশাশুড়ি কয়েকবার দেখে রাগারাগি করেছেন। সতর্ক করেছেন, ঠান্ডা মেঝেতে না থাকতে। এতে ক্ষতি হয়। কিন্তু আকসা শোনেনি। মেঝেতে শুলে, বসলে একটু আরাম লাগে৷ এছাড়া বিছানায় সারাটা দিন ছটফট করে ও।
আকসা বসে আপেল খাচ্ছিল। ডাইনিং থেকে নিয়ে এসেছে৷ এই বাসায় ফলমূল অহরহ যত্রতত্র থাকে৷ পরিবারের বড় সদস্যরা বেশিরভাগ সবাই বাইরের খাবার এড়িয়ে চলেন। তার বদলে ঘরে তৈরি স্বাস্থ্যকর খাবার, ফলমূল — এসব খান৷ ফল তো তাদের নিত্যসঙ্গী বলা চলে৷ শুরু থেকেই দেখে আসছে আকসা৷ ও আগে খুব একটা ফলমূল খেতো না। তবে ইদানীং খেতে হচ্ছে। ওর শ্বশুরের কড়া আদেশ, প্রতিদিন অন্তত একটা করে হলেও আপেল, কমলালেবু আর আঙুর খেতে হবে৷ সে যতই অভক্তি আসুক না কেন। কমলালেবু আর আঙুর আকসার পেটে সয়নি। গ্যাসের সমস্যা করে৷ আপেলটা আবার সয়ে গেছে। এজন্য প্রতিদিন একটা কি দু’টো করে আপেল খাচ্ছে ও। আজ সকালে খেতে মনে ছিল না৷ এজন্য দুপুরে গোসল দেওয়ার পরে মনে পরতেই নিয়ে ঘরে এসেছে। সবে দু’টো কামড় ফ্রেশ আপেলটার গায়ে বসাতে পারেনি, এরইমধ্যে রুমের বাইরে বারান্দা পেরিয়ে ড্রয়িংরুম নয়তো সদর দরজা হবে; সেদিক থেকে হৈরৈ শোনা গেল। আকসার খাওয়া থেমে গেল। ও ভ্রু কুঁচকে কান পাতলো। বড়দের গলার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে হালকা। তবে কি যে বলছে, সেটা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। আকসা কৌতূহল নিয়ে বের হলো।
বারান্দার দরজার কাছে যেয়ে দাঁড়াতে দেখলো, ঠিক সোজা সামনের ডাবল সোফায় মেজবাহ বসে আছে! ওর হাতে গ্লাস। বোধহয় পানি খেয়েছে মাত্র। লোকটা এখন এসেছে! তার না সন্ধ্যায় আসার কথা ছিল? ফোনে নাকি মামনিকে বলেছিলও তাই। আকসার মনে জাগা প্রশ্ন মেজবাহ শুনতে পেল না। তবে অন্যরা আগেই প্রশ্ন করেছিল হয়তো। তার প্রতিত্তোরে মেজবাহ’র কন্ঠস্বর শোনা গেল — “এক্সুয়ালি ফেরার পথে বাস সবসময় জ্যামে পরে৷ এজন্য ফিরতি টাইম হতে অতিরিক্ত কিছু টাইম বাড়িয়ে বলেছিলাম। তবে আজ লাক ভালো। জ্যাম ছিল না তেমন। এজন্য হ্যাসেল ছাড়া টাইমের আগেই চলে এসেছি৷ মামনি, খিদে পেয়েছে।”
মেজবাহ জবাব শেষে মায়ের দিকে তাকিয়ে কথাটা বলতেই ইশা বেগম ছুটলেন রান্নাঘরে। রান্না তখনো সম্পূর্ণ হয়নি। তরকারির শেষ ঝোল টানা বাকি। ফাতিমাকে তাড়া দিলেন প্লেটে আলাদা করে সাদা ভাত বাড়ার জন্য। তার ছেলেটা আবার পোলাও খায় না।
মেজবাহ ব্যাগ আর লাগেজ তাহসিনের কাছে দিলো। ও নিয়ে ভেতরে রাখলো। মেজবাহ আর ভেতরে গেল না। ড্রয়িংরুম সংলগ্ন ওয়াশরুম থেকে হাত-মুখ ধুয়ে এসে সোজা ডাইনিং-এ বসে গেল। ইশা বেগম নিজে ছেলেকে মুখে তুলে তুলে খাইয়ে দিলেন। এহসানুল হক এসে পাশে বসে হালচাল শুনলেন। এরমধ্যে তিনি বললেন, “আব্বু আগেই যখন চলে এসেছো, তাহলে আজ-ই হাঁটে গেলে ভালো হয়। কুরবানির গোরুর হাট তো। বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা হবে আরেকদিন দেরি করলে। আমরা বরং তিনটার দিকে বের হই? তাহলে সন্ধ্যার আগে গোরু কিনে ফিরতে পারবো।”
“আচ্ছা আব্বু। আমি খেয়ে ড্রয়িংরুমে রেস্ট নিচ্ছি কিছুক্ষণ। তিনটা বাজার দশ মিনিট আগে ডাক দিও।”
মেজবাহ আর তার আব্বু, ছোট চাচা হাট থেকে গোরু কিনে ফিরেছেন এইতো কিছুক্ষণ আগে। নিচে প্রতিবারের মতো গোয়ালঘর তৈরি করে রাখা ছিল। সেখানে গোরুর রাখার ব্যবস্থা করা হলো। একটা ছেলেকে গোরুর দেখাশোনার দায়িত্বে রাখা হয়েছে। সকল ব্যবস্থা সেরে তারা ওপরে আসলেন মাগরিবের আজানের পর। মেজবাহ ভীষণ ক্লান্ত। একে তো আট-নয় ঘন্টার জার্নি। তারওপর আবার পরপরই বিনা বিশ্রামে হাঁটে যেয়ে গোরু কিনে কয়েক মাইল হতে সেটা বাসা পর্যন্ত নিয়ে এসে থাকার ব্যবস্থা করে দেওয়া। সবকিছু বলা চলে ও একা হাতেই সামলেছে। বাপ-চাচার বয়স হয়েছে। তাদের দ্বারা এত খাটাখাটুনি সম্ভব নয়।
মেজবাহ ড্রয়িংরুমে এসে সোজন সোফায় বসে পরলো ধপ করে। বাসার মোটামুটি প্রায় সবাই নিচে৷ গোরু দেখতে গিয়েছে। বাপ-চাচাদের এনার্জি অনেক। তারা আবার নেমেছে। শুধু মেজবাহ’র মামনি আর ফুপু বোধহয় রান্নাঘরে ছিলেন। মেজবাহ চেঁচিয়ে ডাকলো, “মামনি, এক গ্লাস পানি দিয়ে যাও।”
ডাকার দুই মিনিটের মধ্যেও কোনো সাড়া আসলো না। আর না তো পানি। মেজবাহ অধৈর্য হয়ে উঠে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ালো। ডাইনিং পেরিয়ে রান্নাঘর আর ডাইনিং রুমে প্রবেশের মাঝামাঝি দরজার কাছে আসতেই ভেতর থেকে গলার আওয়াজ শুনে থেমে দাঁড়ালো। চাপা কন্ঠস্বর। ওর মামনির।
“আকসা, মা তুমি সারাদিন কিছু খাওনি! শুধু একটা আপেল! আজ সারাদিন কত কাজে ব্যস্ত ছিলাম জানো তো। এজন্য তোমাকে বেড়ে দিতে পারিনি৷ তাই বলে তুমি একটু নিয়ে খাবে না মা?”
“আমার আসলে খেতে ইচ্ছে করছিল না আম্মা। এজন্য খাইনি। খেতে ভালো লাগে না।”
“এখন ক’টা খেয়ে নাও। নাহলে তো শরীর খারাপ করবে।”
“খাবো না আম্মা। খেতে মন চাচ্ছে না।”
“তোমার শ্বশুরআব্বু, মেজবাহ তারা কেউ শুনলে কিন্তু তুলকালাম হয়ে যাবে। বাড়ির বউ সারাদিন না খাওয়া!”
“পরে খাব। এখন যাই, কলি কল দিচ্ছে।”
একটা অজুহাত দিয়ে কোনোরকমে রান্নাঘর থেকে বের হয়ে বামদিকে পা বাড়ানোর আগেই ডানপাশে ডাইনিংরুমের দরজার সামনে মেজবাহকে দেখে বুক ধ্বক করে উঠলো আকসার। মেজবাহ ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে সেখানো। চোয়াল শক্ত ওর। তারমানে সব কথা শুনেছে! আকসা আতঙ্কিত হলো। এক মুহূর্তও দাঁড়ালো না সেখানে। এক দৌড়ে বিকল্প পথ হতে ডাইনিং পেরিয়ে রুমে চলে গেল। রুমে গিয়ে সঙ্গে সঙ্গে ভেতর হতে দরজা আঁটকে দিলো।
তৎক্ষনাৎ বাইরে থেকে একটা ভারী কন্ঠস্বর শোনা গেল। মেজবাহ’র গলা।
“আকসা?”
“জি!”
“দরজা খোলো।”
মেজবাহ’র ভরাট ঠান্ডা কন্ঠস্বর শুনে ভয়ে গুটিসুটি মেরে ব্যালকনির পর্দার আড়ালে গিয়ে লুকিয়ে পরলো আকসা। এত ঠান্ডা কেন লোকটা? তার তো এমন বরফের ন্যায় শীতল থাকার কথা নয়! নিশ্চিত ঝড়ের পূর্বাভাস। ও আতঙ্কিত সুরে জোরে চেঁচিয়ে বললো, “খুলবো না! খুলবো না আমি দরজা!”
“আকসা দরজা খুলতে বলেছি। আর একবারও বলবো না!”
“দরজা আজ আমি কোনোমতেই খুলবো না!”
সীমান্তরেখা পর্ব ৩৮
ঠান্ডা মাথার হুমকিটা পেয়েও পাল্টা চড়া জবাবটা দিতে দ্বিধা করলো না আকসা। তৎক্ষনাৎ দরজার ওপাশ থেকে মেজবাহ’র কন্ঠস্বর শোনা গেল— “ভালোয় ভালোয় দরজা খুলবে। নাহলে আজ নিচে গোয়ালঘরের ওই গোরুটার বদলে আমি তোমার কুরবানি দিয়ে দিবো!”
