সুইটহার্ট পর্ব ৮
মোনালিসা মেহরোজ
পরদিন সকালটা মেহরিনের শুরু হলো এক অদ্ভুত অনুভূতি নিয়ে। ঘুম থেকে ওঠার পর থেকেই মেহরিনের মাথার ভেতর একটাই মুখ ঘুরপাক খাচ্ছে—অভ্র তালুকদার। গতকাল পর্যন্ত ছেলেটা ছিলো শুধুই রাস্তার মাঝে দেখা এক “হিরো”। আর আজ? আজ সে সম্ভাব্য পাত্র! কথাটা ভাবতেই মেহরিনের গা শিরশির করে উঠলো।
—ইয়া আল্লাহ… এতো তাড়াতাড়ি নাটকের প্লট টুইস্ট কেনো আসে আমার জীবনে?
নিজের মাথায় নিজেই চাপড় মারলো মেহরিন।
অন্যদিকে শিফা আর শাওন ইতোমধ্যেই তৈরি হয়ে বসে আছে। সকাল সকাল শিফা তৈরি হয়ে মেহরিনকে নিতে এসেছে একসাথে যাবে বলে। বাড়ি তাদের পাশাপাশি। ছোট্ট বেলা থেকে দু’বান্ধবি একসাথে যাওয়া-আসা করতো স্কুল-কলেজে, আর এখন ভার্সিটিতে।
নিচে নেমেই মেহরিন দেখলো দুজনের মুখে অদ্ভুত হাসি। মেহরিন সন্দেহভরা চোখে তাকালো।
—তোদের হাসি দেখে আমার ভয় লাগছে।
—লাগার’ই কথা।
চট করে বললো শিফা। কপাল কুঁচকে নিলো মেহরিন।
—কেন?
—কারণ তোর হিরো এখন তোর পাত্র।
শিফার কথা শেষ হতেই মেহরিন কুশন তুলে ছুঁড়ে মারলো।
—চুপ!
শাওন-শিফা দুজন হেসে উঠলো মেহরিনের বিরক্তি দেখে। তাদের হাসতে দেখে চোখ পাকিয়ে তাকালো মেহরিন। অতঃপর তিনজনই ভার্সিটির উদ্দেশ্যে বের হলো। রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মেহরিন মনে মনে দোয়া করতে লাগলো—
—হে আল্লাহ, আজকে যেন ওই ছেলেটার সাথে দেখা না হয়। বাবা বলেছিলো দেখা করতে আসবে। কিন্তু সেটা যেনো না হয়।
মেহরিন দোয়া পড়তে পড়তে হাঁটতে লাগলো সামনের দিকে। কিন্তু পৃথিবীতে মেহরিনের দোয়া খুব কমই কবুল হয়। এই যেমন এখনি হলো না৷ তারা ভার্সিটির দিকে হাঁটতে হাটঁতে কয়েক মিনিট পরই সামনে একটা কালো গাড়ি এসে থামলো। গাড়ির দরজা খুলে নামলো অভ্র। মুহূর্তেই মেহরিনের চোখ বড় হয়ে গেলো।
—ইন্না লিল্লাহ…
—কি হলো?
শিফা জিজ্ঞেস করলো মেহরিনকে। মেহরিন চোখজোড়া বড়বড় করেই অবিশ্বাস্য গলায় বললো—-
—হিরো!
—কোথায়?
—সামনে!
শাওন সামনে তাকিয়ে হেসে ফেললো।
—তোর ভাগ্য ভালো।
—আমার ভাগ্য ভয়ংকর খারাপ।
ফিসফিস করলো মেহরিন। অভ্রও ওদের দেখে ফেলেছে। মেহরিন সঙ্গে সঙ্গে নিজের ওড়না টেনে মুখের অর্ধেক ঢেকে ফেললো। তারপর শিফার পেছনে গিয়ে লুকানোর চেষ্টা করলো।
—আমি নেই।
—কি?
—আমি অদৃশ্য।
—তুই গাধা।
—চুপ কর।
মেহরিন নিজেকে আড়াল করার আপ্রাণ চেষ্টা করলো। কিন্তু অভ্র ইতোমধ্যেই এগিয়ে এসেছে তাদের সামনে। ঠোঁটে ভদ্র হাসি ঝোলানো তার৷ শিফার পিছনে মেহরিনকে আড়াল হতে দেখে ক্রুর হাসলো পুরুষটি। নিরেট গলায় বললো—-
—আসসালামু আলাইকুম।
শিফা আর শাওন সালামের উত্তর দিলো। তারাও সালাম দিলো ভদ্রগলায়। মেহরিন দেয়ালের দিকে তাকিয়ে রইলো। যেনো আশপাশে কেউ নেই। সে দেখতে পাচ্ছে না কাউকে।অভ্র হাসলো তা দেখে। মেয়েটিকে সে অনেক আগেই ছবিতে দেখেছে। পরে আবার কালকে দেখলো। কিন্তু কালকে তো মেহরিন কথা বলার সুযোগ’ই দিলো না। আর না অভ্র নিজের পরিচয় দিলো। তবে কাল মেহরিনের বাবা মনোয়ার শেখের সাথে কথা বলেছে সে৷ মনোয়ার শেখ নিজেই দিয়েছেন মেহরিনের ভার্সিটির ঠিকানা। আর তাই তো বান্দা এসে হাজির।
—আপনি কি আজও আইসক্রিম খাচ্ছেন?
মেহরিন চমকে তাকালো অভ্রের কথায়। অভ্রের চোখে মৃদু দুষ্টুমি খেলা করছে। মেহরিন কাশি দিয়ে বললো—
—নাহ্।
—ওহ।
—আজকে বিস্কুট খেয়েছি।
শাওন মুখ চেপে ধরলো। অভ্র হেসে ফেললো মেহরিনের কথায়।
—আমি অভ্র।
—জানি।
—জানেন?
—জি।
—কিভাবে?
মেহরিন বুঝলো বিপদ হয়েছে। বিয়ের কথা তো তোলা যাবে না। তাই দ্রুত কথা ঘুরিয়ে বললো—
—বাংলাদেশের সবাই জানে।
কপাল কুঁচকে নিলো অভ্র। আশ্চর্য কন্ঠে সুধালো—-
—আমি কি সেলিব্রিটি?
—হতে পারেন।
চট করে বলে দিলো মেহরিন। অভ্র এবার সত্যিই মজা পাচ্ছে। কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বললো—
—আচ্ছা, কালকে ধন্যবাদটাও ঠিকমতো নিতে পারিনি।
—সমস্যা নেই, এখন নিন।
—আর আপনার নাম?
—বলবো না……
শিফা সঙ্গে সঙ্গে কনুই দিয়ে ঘুতো মারলো মেহরিনকে। এসময় অভদ্রতামো করার কোন মানেই হয়না। শিফার ইশারা বুঝে মেহরিন গলা খাঁকারি দিলো। ভদ্রভাবে বললো—
—মেহরিন।
—সুন্দর নাম। আপনার মতোই আপনার নামটাও কিউট।
মুহূর্তেই বিব্রত হয়ে পরলো মেহরিন। কি বলবে তা বুঝে উঠতে পারলো না।এমন সময় দূর থেকে একটা কালো গাড়ি ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো তাদের কাছাকাছি। পুরোটা না এসে মাঝপথে থেমে গেলো। গাড়ির ভেতরে বসে ছিলো আদ্রিয়ান। আজ তার মেজাজ এমনিতেই ভালো না। ভার্সিটিতে ঢোকার আগ মুহূর্তে হঠাৎ তার দৃষ্টি রাস্তার পাশে গিয়ে থামলো। আর পরের মুহূর্তেই মুখ শক্ত হয়ে গেলো মেহরিনকে দেখে। মেহরিন দাঁড়িয়ে আছে। আর তার সামনে একজন অচেনা যুবক। তারা কথা বলছে। ছেলেটার মুখে হাসি। মেহরিনও উত্তর দিচ্ছে ছেলেটার কথার বিপরীতে।
আদ্রিয়ানের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো মুহূর্তেই।
স্টিয়ারিংয়ে ধরা হাতের শিরাগুলো ফুলে ফেঁপে উঠলো। ঘাড় বাঁকালো পুরুষটি। আর সঙ্গে সঙ্গেই মট করে শব্দ হলো তার কাঁধে। আদ্রিয়ানের চোখের দৃষ্টি তখন জলন্ত কয়লার ন্যায় রূপ ধারণ করলো। যেই কয়লাতে সুস্পষ্ট ফুটে উঠেছে মেহরিনের ছবি। আদ্রিয়ানের ঠোঁটের কোণায় বাঁকা আর তীক্ষ্ণ হাসি ফুটে উঠলো। ধারালো দৃষ্টি ফালা ফালা করতে লাগলো রমনীর কায়া।
আদ্রিয়ান মেহরিনের থেকে দৃষ্টি সরিয়ে তা স্থাপন করলো পাশের যুবকটির পানে। কয়েক মুহূর্ত হাস্যরত যুবকটির পানে তাকিয়ে থেকে ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো পুরুষটি। শক্ত হাতের মুঠোই নিজের চুল খামচে কালচে ঠোঁট জোড়া নাড়িয়ে বিড়বিড় করে আওড়ালো—–
—অভ্র তালুকদার। দিস ইজ নট ফেয়ার মাই ফা*কিং বা*স্টার্ড, দিস ইজ নট ফেয়ার। ছোট্ট বেলা থেকে আমার আমি যেটা চাই সেটাতে ভাগ বসিয়েছিস তুই, বাট এবার সেটা হবে না। কজ আদ্রিয়ান চৌধুরী আর সেটা বরদাস্ত করবে না।
হাতের মুঠোই শক্ত করে দ্রুত গাড়ি স্টার্ট দিয়ে ধুলো উড়িয়ে সেখান হতে চলে গেলো আদ্রিয়ান চৌধুরীর ব্ল্যাক মার্সিটিজটা।
অন্যদিকে অভ্র তালুকদার মেহরিনের সাথে কথা বলার মাঝখানেই ঘুরে তাকালো। ধুলো উড়িয়ে যাওয়া গাড়িটার পানে তাকিয়ে ক্রুর হাসলো যুবক। কপালে স্লাইড করতে করতে আওড়ালো—
—জানো*য়ার একটা।
ভার্সিটিতে পৌঁছেই সরাসরি নিজের কেবিনের দিকে পা বাড়ালো আদ্রিয়ান। তার মুখভঙ্গি এতটাই কঠোর আর গম্ভীর ছিল যে, সামনে পড়া কেউই সাহস পেলো না কোনো প্রশ্ন করতে। বরং একনজর তার মুখের দিকে তাকিয়েই সবাই নিঃশব্দে সরে দাঁড়ালো পথ ছেড়ে।
করিডোরজুড়ে এক অদ্ভুত চাপা নীরবতা নেমে এলো। স্টাফ থেকে শুরু করে ছাত্রছাত্রী—যারা আদ্রিয়ানকে চিনতো, তারা সকলেই বুঝতে পারলো আজ তার মেজাজ সুবিধার নয়।
আদ্রিয়ান অবশ্য সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ করলো না। দীর্ঘ পদক্ষেপে হেঁটে গিয়ে নিজের কেবিনে প্রবেশ করলো সে।
এমনিতেই এই ভার্সিটিতে তার আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। কারণ তার বাবা, আশিক চৌধুরী, বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম অংশীদারদের একজন। তাছাড়া নিজের ব্যক্তিত্ব, কঠোরতা আর কর্তৃত্বপূর্ণ আচরণের কারণেও আদ্রিয়ানকে সবাই সমীহ করে চলে। তাই তার রাগান্বিত মুখ দেখে কারো পক্ষেই সামনে গিয়ে কথা বলার সাহস হলো না। বরং সবাই শুকনো ঢোক গিলে দূরত্ব বজায় রাখাই শ্রেয় মনে করলো।
আদ্রিয়ান প্রথম ক্লাসে ঢুকতেই ছাত্রছাত্রীরা বুঝে গেলো আজ পরিস্থিতি সুবিধার না। সাধারণত আদ্রিয়ান কঠোর আজ ভিষন। আজ ভয়ংকর তার রূপ। ক্লাসের মধ্যেই একটা প্রশ্নের ভুল উত্তরে মোট সাত জনকে দাঁড় করিয়ে রাখলো আদ্রিয়ান। পুরো ক্লাসে এমন নীরবতা নেমে এলো যেনো কেউ নিশ্বাসও নিতে ভয় পাচ্ছে।
অন্যদিকে মেহরিন বসে আছে শেষ বেঞ্চে।
মাথা নিচু তার। আজকে কেন যেনো বারবার মনে হচ্ছে—ঝড় আসছে। কিন্তু কি হচ্ছে তা বুঝে উঠতে পারছে না। ক্লাসের মধ্যেই একবার আদ্রিয়ানের চোখে চোখ পরেছিলো তার। তবে তার জলন্ত দৃষ্টিতে এক সেকেন্ডও টেকেনি মেহরিন। বরং সেকেন্ডের ব্যবধানে চোখ ফিরিয়ে গুটিসুটি মেরে বসে আছে।
ক্লাস শেষ হওয়ার সাথে সাথে সবাই দ্রুত বেরিয়ে গেলো। মেহরিনও বসা হতে উঠে দাঁড়ালো। তখনি শিফা বলে উঠলো—-
—মেহু, আয়। আজকে ফুঁচকা খাবো। আমি শাওনকে ডাকি।
শিফা রূম থেকে বেড়িয়ে সেকেন্ড ইয়ারের ক্লাসের দিকে এগিয়ে গেলো শাওনকে নিতে। অন্যদিকে ফুঁচকার কথা শুনে মেহরিনের চোখ চকচক করে উঠলো। শিফাকে যেতে বলে ব্যাগ গুছিয়ে বের হলো মেয়েটা।
করিডর ধরে হেলেদুলে হাঁটতে হাঁটতে বিড়বিড় করে আওড়ালো—–
—টেনশন সাইডে রেখে ফুঁচকার মজা নে মেহু। আগে খাওয়া-তারপর দুনিয়া।
মেহরিন গুন গুন করতে করতে তিনতলা ভবন থেকে নামতে লাগলো। ঠিক তখনি আগের বারের ন্যায় হুট করেই কারো শক্ত হাতের থাবা বসলো তার মেইলি কোমড়ে। মেহরিন চমকে উঠলো। তীব্র ব্যথা অনুভূত হলো সরু কোমড়ে। চোখজোড়া বন্ধ করে নিলো মেয়েটা। অন্যদিকে পুরুষালী শক্ত হাতের থাবা তখন তার কোমড়ে আরও গাঢ় হয়ে উঠলো। বাতাসের গতিতে তাকে টেনে অন্ধকার আচ্ছন্ন একটা ফাঁকা রূমে প্রবেশ করলো আগন্তুক।
মেহরিনের বুকটা ধক করে উঠলো। ভয়ে ঘাম ঝরলো কপোল বেয়ে। নাজুক দেহখানা নুইয়ে পরলো। মেহরিন জোড়ে শ্বাস টানলো। সেই সাথে নাসারন্ধ্রে প্রবেশ করলো পারফিউম এর কড়া ঘ্রাণ। মেহরিন আতঙ্কে খামতে ধরলো আগন্তুকের শক্ত বাহু।
তার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম। চোখ মেলে তাকালো মেয়েটা। তবে দেখতে পারলো না কিছুই। শুধু কানে বারি খাচ্ছে গাঢ় নিশ্বাসের শব্দ। মেহরিনের হৃদয় লাফিয়ে উঠলো। কাঁপা গলায় তোতলাতে তোতলাতে বললো—-
—ক…কে?
—ইট’স মি সুইটহার্ট।
হিসহিসিয়ে কথাটা বললো আগন্তুক। আর এদিকে হুট করেই মনের সমস্ত ভয় উধাও হলো মেহরিনের। মাথাটা গরম হয়ে গেলো আচানক। দাঁতে দাঁত পিষলো রমনী।
—আবার তুই?
আগন্তুকের বাহু হতে হাত সরিয়ে আচমকা হিঁটু তুলে আঘাত করলো স্পর্শকাতর স্থানে। আগন্তুকের মুখ দিয়ে অস্ফুট আর্তনাদ বেড়িয়ে এলো—
—আহ্, আউচ্। মা গো….।
—হারা*মজাদা একটা। সেদিনের মতো আবারো আমাকে ভয় পাইয়ে দিতে এসেছিস? তোর তো সাহস কম নয় রে জাউ*ড়া বেডা। নে, তোর পটল থেতলে দিয়েছি।
দাঁতে দাঁত পিষে কথাখানা বলেই তীব্র রাগে ফুঁসতে লাগলো মেয়েটা। অন্যদিকে মেহরিনের অতর্কিত হামলায় আগন্তুকের অবস্থা নাজেহাল হয়ে পরলো। তীব্র ব্যাথায় কুঁকড়ে গেলো পুরুষটি৷ চোখে পানি আসার উপক্রম। চোখমুখ লাল হয়ে গেলো আচমকা। নিশ্বাস খিঁচে অন্ধকারের আড়ালেই হেলে পরলো পুরুষটি। সাথে মেহরিনের বা*জে ভাষার গালি তার মাথায় আগুন ধরিয়ে দিলো। নিজেকে খানিক ধাতস্থ করে দাঁতে দাঁত চেপে বললো—-
—শালী শশুরের নেংটা হয়ে জন্ম নেওয়া বাচ্চা, আমি তোর ওই হিজ*রা শাওন নয় রে, আমি আদ্রিয়ান চৌধুরী। আর তুই পটল থেতলে দেসনি, তুই তোর ভবিষ্যৎ থেতলে অন্ধকার করে দিয়েছিস।
শাওনের বদলে আদ্রিয়ানের কর্কশ কন্ঠে ভরকে গিয়ে থ মেরে গেলো মেহরিন। চোখজোড়া বড়বড় হয়ে গেলো তার, এমনি বড় যে দেখলে মনে হবে এখনি তা কোটর হতে বেড়িয়ে আসবে। স্টাচুর মতো অন্ধকারেই থমকে দাঁড়িয়ে রইলো সে। অন্যদিকে আদ্রিয়ান চোখ বন্ধ করে বেঞ্চে হেলে পরলো।
—জানো*য়ারের বাচ্চা একটা। দয়া-মায়া কিচ্ছু নাই শরীরে।
মেহরিন কাঁপতে লাগলো ভয়ে। আদ্রিয়ান তাকে কেনো এভাবে এখানে টেনে এনেছে তা আর ভাবার সময় পেলো না। তীব্র ভয়ে ঘামতে লাগলো মেয়েটা। হাত তুলে ঘাম মুছে কাঁপা গলায় সুধালো—-
—ইয়ে…মানে স্যার আপনি?
—হ্যাঁ! আমি! তোর বলা জা*উড়া বেডা!
মেহরিনের গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেলো। হাত-পা ঠান্ডা হয়ে এলো ভয়ে।
—ইয়া আল্লাহ…
সে এক পা পিছিয়ে গেলো।অন্যদিকে আদ্রিয়ান ব্যথায় কুঁকড়ে গিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বললো—
—তুই আমার-তোর দু’জনের’ই ভবিষ্যৎ শেষ করে দিয়েছিস!
—আমি… আমি আসলে…
—চুপ!
—স্যার, আমি তো ভাবছিলাম—
—উফ্, চুপ কর।
—আমি জানতাম না…।
—চুপ করতে বলেছি!
—আমি দেখি?
—কি দেখবি?
—আঘাতটা…
কথাটা বলেই মেহরিন সত্যি সত্যি অন্ধকারের মধ্যে হাতড়ে সামনে এগিয়ে গেলো। আদ্রিয়ান আতঙ্কিত হয়ে ছিটকে তিন হাত দূরে সরে গেলো।
—এই! এই! থাম!
—কোথায় লাগছে স্যার?
—খবরদার সামনে আসবি না!
—কিন্তু আপনি তো কাঁদার মতো শব্দ করছেন!
—আমি কাঁদছি না!
—একটু আগেই তো “মা গো” বললেন!
—ওটা রিফ্লেক্স ছিল!
মেহরিন আবারও এক পা এগিয়ে গেলো।
—আমি একটু চেক করি?
—কি চেক করবি?
—যেখানে লেগেছে…
—ইয়া আল্লাহ!
আদ্রিয়ান চোখজোড়া বড়বড় করে নিলো। ঠোঁটে হাত দিয়ে এবার সত্যি সত্যি দেয়াল ঘেঁষে আরো দূরে সরে গেলো সে।
—তুই আর এক পা সামনে আসলে আমি জানালা দিয়ে লাফ দিবো! আর তোকে কুত্তা দিয়ে দৌড়ানি খাওয়াবো।
মেহরিন শুকনো ঢোক গিললো আদ্রিয়ানের রাগ দেখে। মাথার ভেতর তখন একটাই কথা ঘুরছে—মেহু, আজ তোর জীবন শেষ!’
আদ্রিয়ান দেয়ালে হেলান দিয়ে অনেক কষ্টে দাঁড়িয়ে বললো—
—মেহু আজকে তোকে আমি…।
বাকিটা আর শোনা হলো না মেহরিনের। কারণ তার আগেই মেহরিন ঘুরে দাঁড়িয়েছে দরজার পানে।
—ইয়া আল্লাহ, এবারের মতো বাঁচিয়ে দাও!
চিৎকার করে এক দৌড়ে দরজার দিকে ছুটলো সে।
—এই! দাঁড়া!
আদ্রিয়ানের গর্জন ভেসে এলো পেছন থেকে।
মেহরিন আরো জোরে দৌড়ালো।
—দাঁড়া বলছি!
—পারবো না!
—মেহরিন!
—আম্মাগো!
করিডোরে বের হয়েই প্রায় উড়ে চললো সে।
এদিকে আদ্রিয়ান কষ্ট করে দুই কদম এগিয়ে এসে থেমে গেলো। মুখ বিকৃত করে ফিসফিস করলো—-
—শশুরের বাচ্চা নয়, এটা তো জানো*য়ারের বাচ্চা।
তারপর আবার ব্যথা অনুভব হতেই চোখ বন্ধ করে দেয়ালে মাথা ঠুকলো।
—আমি শিক্ষা দিতে গিয়েছিলাম…
দীর্ঘশ্বাস ফেললো আদ্রিয়ান। অতঃপর ফের বললো—
—উল্টো নিজেই শিক্ষা নিয়ে ফেললাম!
আর অন্যদিকে মেহরিন তিনতলা থেকে নামতে নামতে শুধু একটাই দোয়া পড়তে লাগলো—-
—হে আল্লাহ, আজকে যেন স্যার আমাকে খুঁজে না পায়। কালকে যেন আমাকে চিনতে না পারে। পরশু যেন আমাকে ভুলে যায়। আর যদি সম্ভব হয়, স্যারকে দুইদিনের জন্য বিদেশ পাঠিয়ে দাও!
কথাটা বলেই সিঁড়ি বেয়ে এমন গতিতে নিচে নামলো, যেন পেছনে আদ্রিয়ান না, পুরো পুলিশ বাহিনী ধাওয়া করছে।
ফুচকার স্টলের সামনে এসে আচমকা শিফার উপর হামলে পরলো মেহরিন। শাওনের মুখ হা হয়ে গেলো তা দেখে। শিফা বিরক্তিতে ভ্রু কুঁচকে নিলো। মেহরিন হাঁপাতে হাঁপাতে শিফার হাত ধরে টানতে লাগলো।
—চল এখান থেকে। আমাদের বের হতে হবে।
শিফা চোখমুখ বিকৃত করে হাত ছাড়িয়ে নিতে নিতে বললো—-
—আরে আগে খেতে দে। কেনো তারাহুরো করছিস?
—কারণ থেতলে দিয়েছি।
কপাল কুঁচকে গেলো শিফার। সন্দেহভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো—-
—কি থেতলে দিয়েছিস?
—পটল থেতলে দিয়েছি। এখন পটলের মালিক আমায় খুঁজছে। সামনে পেলে বিসমিল্লাহ বলে কুরবানি দিয়ে দিবে।
সুইটহার্ট পর্ব ৭
শাওন আশেপাশে তাকালো। কপালে ভাজ ফেলে বললো—–
—এখানে পটল পেলি কই, মেহু?
মেহরিন শিফাকে টেনে সামনে নিয়ে যেতে যেতে আওড়ালো—-
—পেয়েছিলাম এক জায়গায়। তোর ভেবে অন্যেরটাতে লাথি মেরেছি৷ এখন থেতলে গেছে মেইবি। আমার কি দোষ বল? নিষ্পাপ আমিটা কি জানতাম ওটা তুই নয়, ওটা ওই খাটাশ?
