Home সে আমার বন্দিনী সে আমার বন্দিনী পর্ব ২৪

সে আমার বন্দিনী পর্ব ২৪

সে আমার বন্দিনী পর্ব ২৪
তানিয়া হুসাইন

ভীর এখন কলম্বিয়ার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে। মেক্সিকোর পর, এই অঞ্চল তার জন্য আরও এক শক্তিশালী ঘাঁটি।
এভাবেই সে একে একে তার সাম্রাজ্য বিস্তার করছে।
তার নাম ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বজুড়ে।
আন্ডারওয়ার্ল্ডের সবাই তার নাম শুনলেও ভয় পায়।
একটা আতঙ্কের নাম রাজভীর আলভারেয।
দ্যা কিং অফ শ্যাডো।
বিশাল দোতলা অফিসরুমে বসে আছে সে। রুমজুড়ে দেয়ালে ঝুলছে পৃথিবীর সবচেয়ে দামি পেইন্টিং, কাচের জানালা দিয়ে দেখা যায় পাহাড়, বন আর সমুদ্র। চারপাশে গার্ড, সামনে কাঁচের টেবিল, তার পাশে বসে আছে নিকো, সান্তিয়াগো, ম্যাটিয়াস আর ডিয়েগো।

____নিকো একটা ম্যাপ টেনে টেবিলে বিছিয়ে বলে, কলম্বিয়ার এই অংশ পুরোপুরি আমাদের দখলে এখন। এখানে কো*কেন উৎপাদনের সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে প্রাকৃতিক পরিবেশ আর দরিদ্র শ্রমিক।
ভীর গম্ভীর গলায় বলে, আমরা এখান থেকে শুধু কো*কেনই নয়, অ*স্ত্র ব্যবসাও শুরু করবো। কিন্তু মুখোশ পরে নয়। লিগ্যাল ব্যবসার আড়ালে সবকিছু চলবে।
কলম্বিয়ায় তারা কি কি করবে এই নিয়েই আলোচনা চলছে।
প্রথমেই তাদের টার্গেট ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি। কো*কেন ও অন্যান্য ড্রা*গ বৈজ্ঞানিক গবেষণার নামে প্রক্রিয়াকরণ ও পাচার।
তারপর স্পোর্টস প্রোডাক্ট কোম্পানি।
ক্রীড়াসামগ্রী প্রস্তুতের নামে আন্তর্জাতিক চালান ও মানি লন্ডা*রিং।
মাইক্রোফাইন্যান্স অর্থ বৈধ করার পথ তৈরি।
কো*কেন রিফাইনিং ল্যাব তারা করবে গভীর জঙ্গলের ভেতর।

____ডিয়েগো বলে,
প্রথম ধাপে আমরা স্থানীয় মেয়র, পুলিশ অফিসারদের কিনে ফেলবো।
ভীর সিগারেট টেনে বলে, খেয়াল রাখো সব কাজ ঠিকমতো হয় কি না।
____ক্যাটালিনা আর থাকেনি প্রাসাদে।
কালকের ঘটনার রেশ ধরে সকাল বেলাই সিনালোয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।
ইসাবেলা তাকে আটকানোর চেষ্টা করলেও তিনি থাকেন নি।
ইসাবেলাকে রেখেই চলে যান।
কিন্তু এলিসা কে এইখানে কি হয় না হয় সবকিছু তাকে জানানোর জন্য বলে দিয়ে গেছে।
___ইসাবেলা রয়ে যায় তার উদ্দেশ্য ভিন্ন।
যেহেতু এখানে সে এখন নিকোকে পেয়েছে তাই এক পা ও নরবেনা এখান থেকে।
____ বিকেলের দিকে কয়েকজন মহিলা এসে পৌঁছায় ভীরের প্রাসাদে।
হাতে বিভিন্ন ধরনের জিনিসপত্র।
ভারী ভারী ব্যাগ, বক্স।
যে জায়গার যে জিনিসটা ভালো সেই খানকার সেই সেই জিনিস গুলো আনা হয়েছে।

___ হীরা, পান্না, রুবি, নীলকান্তমণি, সাদা সোনার হালকা সেট, চোকার, ব্রেসলেট, আংটি। নামীদামি ডিজাইন।
___জামদানি, কাঞ্জিভরম, বেনারসি, সিল্কের শাড়ি।
সিল্ক, স্যাটিন, লেইস ওরনেট ডিজাইন এর গাউন।
ডিজাইনার কাজের,স্যালয়ার সুট।
জুতা, পারফিউম, মেকআপ ডিওর এর।
সবকিছুর ব্যবস্থা করেছে ভীর ইশায়ার জন্য।
সবকিছু দিয়ে ভরিয়ে রাখবে তাকে সে।
এই মেয়ের উপর সে সসন্তুষ্ট।
তাই তার জন্য এই সামান্য উপহার।
সবাইকে বাড়িতে আনিয়েছে এখান থেকে যা যা ওর পছন্দ সেগুলো বাছাই করে নিতে।

জানালার ধারে দাঁড়িয়ে আছে ইশায়া।
বাইরের নীলচে আকাশে ভেসে থাকা মেঘ যেন তার চোখের ভেতরকার ধূসরতাকে ছুঁয়ে গেছে।
তার দীর্ঘ চুল হাওয়ায় উড়ছে নিঃশব্দে।
তার ঠিক পেছনে দুই গার্ড,
একজন ডান পাশে, একজন বাঁয়ে,
চোখ-মুখ শক্ত করে দাঁড়িয়ে আছে।
তাকে ২৪ ঘণ্টা নজরে রাখার নির্দেশ তাদের, কেউ ভুলতে সাহস করে না তা।
কিছুক্ষণ পর নরম অথচ দৃঢ় পায়ের শব্দে মারিয়া এলেনা ঘরে প্রবেশ করে।
— ম্যাম, বস আপনার জন্য কিছু জিনিস অর্ডার করেছেন।
যেগুলো আপনার পছন্দ , আপনাকে সেগুলো নিতে বলেছেন।
আপনি নিচে আসুন।

___ইশায়া একটুও নড়লো না।
না পিছন ফিরে তাকালো।
তার দৃষ্টি জানালার বাইরের দিকে বিস্মৃত, শূন্য।
— আমার কিছু লাগবে না।
তার কণ্ঠ কোমল, কিন্তু ভিতরে রাগ।
ওদের চলে যেতে বলো।
___মারিয়া নতমুখে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর সাহস করে আবার বলে,
— ম্যাম!
বস বলেছেন আপনাকে আসতেই হবে। আপনি কিছু না নিলে স্যার রেগে যাবেন।
ইশায়া চোখ বন্ধ করে একটু নিঃশ্বাস ফেলে।
ভয়ের নয়, একরকম জেদের গন্ধ মিশে আছে তাতে।
— আমি কিছু নিবো না।
তার শব্দগুলো ধীরে ধীরে ধ্বনির মতো ছড়িয়ে পড়ে ঘরে।
গার্ডদের চোখের কোণে খানিকটা অস্বস্তি।
এই মুহূর্তে, সবার মনে একটা কথাই ঘোরে,
যদি বস জানতে পারে, তখন কি হবে।

সায়মা বেগম বসেছেন রাহিকে নিয়ে।
একটা বাটিতে নারকেল তেল গরম করেছেন।
তার নিজের হাতে বানানো তেল।
মেয়ের চুলের খুব যত্ন নিতেন তিনি।
রাহির চুলে নারকেল তেল মাখাতে গিয়ে ইশায়ার কথা মনে পড়ে যায় তার।
চোখের সামনে ভেসে ওঠে ইশায়ার চুল বেঁধে দেওয়া, তার হাসিমুখ।তেল মাখানো নিয়ে কত ঝগড়া।
বাবার কাছে কত নালিশ।
হঠাৎ করেই ভিতর টা মুচড়ে ওঠে।
রাহি তার কাঁধে মাথা রেখে বলে,
মামনি, কেদো না। আমি আছি তো।
আমি ও তো তোমার মেয়ে।

___সায়মা চোখ মুছে বলেন, হ্যা এজন্যই তো তোকে নিয়ে এসেছি।
___তুই তোর আদ্রিয়ান ভাইয়াকেও দেখবি। আমার ছেলেটা একেবারে ভেঙে গেছে রে।ধীরে ধীরে নিজেকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
___তুই ছোট, আমি জানি, কিন্তু মামনীর জন্য একটু সাহস কর।
আমার ছেলেটা এমন রাগি না এখন এমন হয়ে গেছে।
তুইই ওকে একটু বুঝা,
আমি তোকে সাফার মতো করে সব কিছু শিখিয়ে দেব।
তুই সাফার মতো করে চলবি।
সাফা যা যা করতো,যেভাবে জামা কাপড় পরতো ওর চলাফেরা সবকিছু তোকে রপ্ত করতে হবে।
কাল তোকে নিয়ে শপিং মলে যাবো আমি।
আদ্রিয়ানের সব বিষয়ে খেয়াল রাখবি ঠিক আছে।
আমার ছেলেটাকে স্বাভাবিক হতে সাহায্য কর মা।
মা হয়ে ছেলের এই অবস্থা টা আমি আর নিতে পারছিনা।
মেয়েটাকে তো আর হারিয়েছি।
ছেলেটাকে এভাবে তিলে তিলে শেষ হয়ে যেতে দেখতে পারবো না।

___কিন্তু মামনি আবির ভাইয়া তো কতো ভালো আমার সাথে কত সুন্দর করে কথা বললো।
আদ্রিয়ান ভাইয়া তো শুনেও না শোনার ভান করে চলে গেছে।
আমাকে অপমান করলো।
আমি তার সাথে কথা বলতে পারবোনা।
বলেই মুখ ফুলায় রাহি।
___ও এখন এরকম হয়ে গেছে রে।
না হয় আমার আদ্রিয়ান আর ইশায়া সারাদিন এই বাড়িটাকে মাতিয়ে রাখতো।
কি থেকে কি হয়ে গেলো।
আমার মেয়েটা আজ নেই,ছেলেটা ও হারিয়ে গেছে।
___উফফ মামনি,
তুমি মন খারাপ করো না তো শুধু দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে।

মারিয়া এলেনা এসে জানানোর পর একে একে সবাই বেরিয়ে গেছে তাদের আনা জিনিস-পত্র গুটিয়ে।
এখন তিনি এই ভয় পাচ্ছেন বস এটা শোনার পর কি করবেন।
__কিন্তু তাকে তো জানাতেই হবে।
না জানালে তার রক্ষে নেই।
___যেই জায়গায় ডিয়েগো স্যার কে ছাড় দেন নি বস,
ম্যামের কথা না জানানোর জন্য।
সেদিকে তারা তো কেউ না।

মারিয়া এলেনা এনরিকো কে ফোন দিয়ে জানায় সব।
ভীরকে জানানোর জন্য।
রিকো গিয়ে সেটা ভীরকে জানায়।
___ভীর তখন কলম্বিয়ায় তার নতুন ব্যবসার খুঁটিনাটি নিয়ে সবার সঙ্গে পরিকল্পনায় ব্যস্ত।
মুখভরা তীব্রতা, কণ্ঠে অনমনীয় দৃঢ়তা।
পুলিশ থেকে রাজনীতিবিদ সবাই আমার মুঠোয়। এখন আমরা কীভাবে কো*কেন সরবরাহ করবো, রুট কি হবে, কোথায় গুদাম হবে,
সবকিছু নিখুঁত চাই।
ঠিক সেই সময় রিকো এসে ভীরকে জানায়।
___বস,
ম্যাম।
আপনার পাঠানো জিনিস নিতে নারাজ।
ম্যাম কিছু নিতে চাননি। উনি বলেছেন তার কিছু লাগবে না।
তিনি বাইরে আসতেও অস্বীকার করেছেন।
__চুপ হয়ে যায় ভীর।
কথাটা বুঝতে তার সময় লাগে।
তার পাঠানো উপহার রিজেক্ট করা।
তার আদেশ অমান্য করা, তাকে হেয় করা।
কয়েক সেকেন্ড কেউ কিছু বলতে সাহস করে না।

____তারপর
হঠাৎ করে হওয়া শব্দে সবাই একটু নড়ে ওঠে।
ভীর এক ঝটকায় সামনে থাকা কাচের অ্যাশট্রেটি তুলে দেয়ালে ছুড়ে মারে।
মুহূর্তেই চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায় সেটা।
___কি বললি তুই?
তার কণ্ঠ গর্জে উঠলো,
দেয়াল কাঁপে,
____ম্যাম..
কিছু নিতে চান না।
বললেন ওনার ইচ্ছা নেই।
রিকো কাঁপা কাঁপা গলায় বলে।
____ভীর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়।
তাঁর চোখদুটি লাল হয়ে উঠেছে, আগুন জমে আছে সেখানে।
___এই মেয়ে কি ভেবেছে নিজেকে?
সে না খেয়ে, না পড়ে, কিছু না নিয়ে আমার ওপর মানসিক যুদ্ধ চালাচ্ছে।
এভাবে পার পেয়ে যাবে সে।
আমার কাছ থেকে রেহাই পাওয়ার একটা ছেলেমানুষি চেষ্টা করে রক্ষা পাবে।
তার কণ্ঠের নিচে চাপা বিষ।

____তাহলে লিটল হার্ট
তোমাকে মনে করিয়ে দিতে হবে তুমি কোথায় আছো।
কার জিম্মায় আছো।
ভীর এর সাথে এসব ছেলে মানুষি করে পার পেয়ে যাবেনা তুমি
___আমার একটু নরম আচরনে তুমি পার পেয়ে গেছো।
তাহলে এখন রিয়েলিটিতে তোমাকে আসতে হবে।
ভালো কথার মানুষ যখন তুমি না,তাহলে তো কঠোর হতেই হয়।
__ভীর এক ঝাপটায় চেয়ারটা উল্টে ফেলে।
গ্লাস টেবিল থেকে তুলে আছড়ে ফেলে দেয় মেঝেতে।
কাঁচ ছড়িয়ে যায় চারদিকে।
রাগে তার মাথা ছিড়ে যাচ্ছে।
খনে খনে মেজাজ হারাচ্ছে সে।
এইটুকুন একটা মেয়ের সাহস কি করে হয় বার বার তার আদেশ অমান্য করার।
____উপস্থিত সকলেই স্তব্ধ ভীরের এমন আচরণ দেখে।

সে আমার বন্দিনী পর্ব ২৩

তোমার এই জেদ আমি এমন ভাবে ভাঙবো মেয়ে,
দেখবে আর সারাজীবন মনে রাখবে।
আমাকে বাধ্য করো না খারাপ হতে।
সহ্য করতে পারবেনা তুমি।
___ভীর কিছু একটা ভেবে ফোনটা হাতে নেয়।

সে আমার বন্দিনী পর্ব ২৫