সে আমার বন্দিনী পর্ব ৪০
তানিয়া হুসাইন
সকালটা নরম রোদে ভিজে,
দূরের পাহাড়ের গা বেয়ে আলতো আলো নামছে নিচে, জানালার ফাঁক গলে ঘরের মেঝেতে ঝিরঝিরে সোনালি রেখা এঁকে দিচ্ছে,
আকাশটা নীলচে-সাদা তুলোর মতো মেঘে মোড়ানো।
বিছানার একপাশে রাখা ফোনটা একটু পর পর অনবরত বেজে চলেছে। ফোনের আওয়াজে ঘুমের মধ্যেই ভীরের কপালে বিরক্তির ভাজ ফুটে ওঠে,
ঘুম ঘুম চোখে তাকায় সে,
একটু নড়তে গেলে টের পায় বুকের ওপর এক উষ্ণতা জড়ানো।
এক নরম অস্তিত্ব নিঃশব্দে তাকে আঁকড়ে ধরে আছে।
ভীরের হাত চলে যায় সেখানে
একটা ক্ষীণ শরীর,উষ্ণ নিঃশ্বাসের স্পর্শ তার ত্বকে ছুঁয়ে আছে।
সে হাত বুলায় মেয়েটার উন্মুক্ত পিঠে।
সাবধানে, যেন ছুঁয়ে দিলে ভেঙে যাবে।
নিমিষে হালকা টানে বুকের কাছটায় তুলে নেয় তাকে।
সামনে আসে ঘুমন্ত নিষ্পাপ অসম্ভব মায়ায় জড়ানো মুখটা,শান্ত, অথচ গভীরভাবে জর্জরিত।
ভীর তাকিয়ে থাকে অপলক।
মেয়েটার চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ,
চোখের কোণে শুকিয়ে যাওয়া পানি,
গত রাতের তীব্রতা আর ভীরের অস্থির ভালোবাসার ছাপ যেন লেগে রয়েছে প্রতিটি ইঞ্চিতে।
চোখের নিচের ফোলা ভাব, ঠোঁটের কোণে লালচে ছাপ, ঘাড়ের কাছে ক্ষীণ আঁচড়ের দাগ,
একেকটা চিহ্ন তার নিজেরই তৈরি করা।
ভীর মাঝে মাঝে বিরক্ত হয়,
এতদিন পরও মেয়েটা কেন তার সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারছে না?
প্রতিবারই একই নাটক।
চোখের জল, কাঁপুনি, কান্না
আর সেই অসহ্য নীরব প্রতিরোধ।যা ভীরকে রাগিয়ে তুলে।
ভীর ইশায়ার কপালের পাশের চুল সরিয়ে দেয়,
অবশ্য তার এই ডেস্পারেট, অধিকারজ্ঞান সম্পন্ন আচরণ সহ্য করাও তো মুখের কথা না,তাও আবার এই ছোট্ট শরীরে।
তবু সে নিজেকে নিয়ন্ত্রনে আনতে পারে না।
যা তার, সেটা শুধু তার।
চোখ রাঙিয়ে, ভালোবেসে, পিষে যেভাবেই হোক, সে রেখে দেবে তার কাছে সযত্নে।
এই মেয়েটার অস্তিত্ব মিশে আছে তার সাথে।
অবশ্য এটা ভালোবাসা না। এটা এক ধরনের পাগলামি।
নিঃশেষ করে দেওয়া মালিকানা।
ভীরের ইশায়াকে দেখার মাঝখানেই তার ঘোর কাটে
আবারো ফোনের শব্দে।
ভীর চোখ সরিয়ে ফোনটা দেখে,
স্ক্রিনে থাকা নামটা দেখে
রিসিভ করতেই ওপ্রান্ত থেকে কণ্ঠ ভেসে আসে,
বস, আমরা মিগুয়েলের অবস্থান ট্রেস করেছিলাম।
এখানের সিয়েরা পাহাড়ের ভেতরে একটা পুরোনো সীমানা ঘেরা জায়গায় আছে ওরা।
আমরা রাতেই খবর পেয়েছি।
ওরা এখানে আছে কিনা শিওর হওয়ার জন্য,
লুইস গিয়েছিল পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে।
সাথে ছিল আমাদের চারজন স্না*ইপার রেঞ্জার,আর কিছু গার্ড।
___হুম, তারপর।
ভীরের গম্ভীর গলার আওয়াজ।
এক মুহূর্ত চুপ থাকে সে,
তারপর নিচু গলায় বলে,
ওদের কেউই আর বেঁচে নেই।
ওদের লা*শ জঙ্গলের রাস্তার সামনে ফেলে রেখেছে।
খুবই নিশংসভাবে মেরেছে ওদেরকে।
___ভীর চোখ বন্ধ করে নেয়।
তার কানে বাজতে থাকে কথাগুলো।
মাথা সামান্য নিচু করতেই তার কপালের রগ ফুলে উঠে।
নিঃশ্বাস টেনে চোয়াল শক্ত করে শক্ত গলায় ভীর বলে ওঠে,
_F**k
ভীরের শ্বাস নেয়ার ভঙ্গিতে আগুন ঝরছে।
তার কণ্ঠে আগুনে মোড়া এক হিংস্র শিকারির হুঙ্কার।
সব গার্ড সাবগোর্ড একত্রে করো।
সিয়েরার চারপাশ একে একে ঘেরাও করো।
একটাও মাছি যেন সেখান থেকে বেরোতে না পারে।
___ওকে বস।
ভীর ফোনের লাইন কেটে দেয়।
তার শরীরজুড়ে একটা যুদ্ধের প্রস্তুতির মতো থমথমে অস্থিরতা। কোমরে একটা তোয়ালে পেঁচিয়ে উঠে দাঁড়ায় ভীর।
তার শরীর থেকে যেন বিদ্যুৎ বেরিয়ে আসছে। এক মুহূর্তও সময় নষ্ট না করে দ্রুত চলে যায় শাওয়ার নিতে।
দুই মিনিটের ও কম সময়ে বেরিয়ে আসে ভেজা চুল ঝাড়তে ঝাড়তে।
গায়ে চড়িয়ে নেয় তার মিশনের নির্দিষ্ট কালো পোশাক।
এই পোশাক যেন রক্তের গন্ধে চেনে। মৃত্যুর আগুন ছড়ানো পুরোনো কমব্যাট স্মৃতি বয়ে আনে
ড্রয়ার থেকে তার বড় ছু*ড়ি নিয়ে কোমরে গুজে নেয়। বাঁদিকের ওয়ারড্রোব টেনে খোলে।
ভেতরে সাজানো একাধিক অ*স্ত্র, কিন্তু তার হাত গিয়ে পৌঁছায় ঠিক একটাই জায়গায়,রিভ*লবার।
কালো, ভারি, রক্ত মাখা ইতিহাস বহন করা কাস্টম হ্যা*ন্ডগান।
নিঃশব্দে সেটিকে তুলে নেয়, হাতের তালুতে কিছু সময় ঘুরিয়ে দেখে,
তারপর কোমরের বেল্টের ভেতর নিখুঁতভাবে গুঁজে নেয়।
এই রিভ*লবার নিয়ে যতবার বেরিয়েছে, কারও না কারও জীবনের সমাপ্তি হয়েছে।
আর আজ তার উদ্দেশ্য শুধুমাত্র একজন, একজনের জীবনে শেষ করা।
আর তাকে সে শেষ করবেই।
সবকিছু নিয়ে দ্রুত বেরিয়ে পড়ে ভীর
ঘরজুড়ে ছড়িয়ে থাকে কাগজপত্র, ওষুধ, ছিন্ন বস্ত্র সব উপেক্ষা করে সে গেট খুলে বেরিয়ে পড়ে।
তাকে এখন কিছুই থামাতে পারবে না।
না অনুভূতি, না ভয়, না ভালোবাসা।
একজনের রক্তের বদলে সে হাজার জনের রক্ত ঝরাবে।
বেরোবার আগে একবারও তাকায়নি সে ইশায়ার দিকে, তার মাথায় তখন খুন চড়ে ছিলো। হয়তো এ নিয়ে পড়ে তার আফসোস হবে খুব।
ঘরের এক কোণে ঘুমন্ত অবস্থায় পড়ে আছে ইশায়া
নিস্তেজ, নিশ্চুপ।
কিন্তু সে জানেনা, হয়তো আন্দাজ ও করেনি
সে ফিরে এলে হয়তো এই না দেখার কারণে নিজের বুক নিজেই ছিঁড়বে।
এই মেয়ে, যার একটুখানি নড়াচড়াও তার নিশ্বাস থামিয়ে দেয়, তাকে এভাবে ফেলে যাওয়া না তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়।
____দরজার দিক এগোতে গিয়েই আচমকা তার পা বেজে যায়।
ছোট একটা টেবিলের কোণায় হোঁচট খায়।
নিজেকে সামলে নেয় সে, অস্ফুটে মুখ থেকে বেরিয়ে
আসে,
শিট।
আজকে একটার পর একটা ঝামেলা লাগছে।
গলার স্বরটা ঘরের দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসে।
____বাড়িতে প্রায় তিনশোর মত গার্ড রেখে যায় ভীর।
পুরো ক্যাসলের নিরাপত্তা বেষ্টনী ছিলো ছোটখাটো একটা সামরিক ঘাঁটি।
প্রতিটি টাওয়ারে, প্রতিটি গেটপোস্টে, আন্ডারগ্রাউন্ড চেম্বারে,
দু-তিনশর মতো গার্ড তৎপর।
তাদের প্রত্যেকের হাতে অটোমেটিক রা*ইফেল, পিঠে ও*য়্যারলেস।
বাকিরা সব বেরিয়ে পড়ে মিশনের উদ্দেশ্যে।
ভীরের নির্দেশ আসার সঙ্গে সঙ্গেই
দলগতভাবে সবাই বেরিয়ে পড়ে।
বাইরে অপেক্ষা করছে কনভয়ের পর কনভয়।
বজ্রপাতের মতো শব্দ তুলে একের পর এক গাড়ি পাহাড়ি রাস্তা ধরে ছুটে যায়।
উদ্দেশ্য একটাই,
সবার মাথা খুন চড়ে আছে সবার উদ্দেশ্যে আজকে মিগুয়েলের কাহিনী চিরতরে শেষ করে দিবে।
তাদের চোখে কোনো ভয় নেই,
শুধু তীব্র প্রতিশোধের নীল আগুন।
এদিকে মিগুয়েলের পুরো সৈন্যরা ওত পেতে আছে। কখন ভীর আর তার বিশ্বস্ত গার্ডরা বাড়ি ছেড়ে বের হবে আর তারা বাড়ি আক্রমণ করবে। সেই অনুযায়ী তাদের প্ল্যান এগোচ্ছে।
মিগুয়েলের গুপ্ত বাহিনী
ভীরের পুরো ক্যাসল ঘিরে আছে জঙ্গলের ভেতর।
তাদের সব পরিকল্পনা ছক কষা শেষ।
ভীরকে সরানোর জন্য-ই মূলত এই প্ল্যান করেছে।
আর ভীর তার ট্র্যাপে পা দিয়েছে।
ভীর এর বেরিয়ে যাওয়ার খবর শুনেই মিগুয়েলের মুখে শয়তানি হাসি ফুটে ওঠে।
___তারা অপেক্ষা করছিলো, কখন ভীর আর তার টিম ক্যাসল ছেড়ে বেরিয়ে যাবে।
তারা জানে,
এই বাড়িটাতেই আছে ভীরের সবচেয়ে দুর্বল জায়গা।
আর যখন এখানে সে থাকে না, তখনই এর পতন ঘটানো সম্ভব।
এর জন্যই তাদের ভীরকে এখান থেকে সরানো।
মিগুয়েলের সৈন্যরা বাড়ি থেকে প্রায় অনেকখানি দূরে অবস্থান করছে।
ভীরের গাড়িগুলো পাহাড়ের বাঁক ঘুরে অদৃশ্য হতেই
মিগুয়েলের সাথের লোক সালদানা বলে ওঠে,
___চলো, এখন যাওয়ার পালা,
এইবার ভীর বুঝবে এবার তার পাল্লা কাদের সাথে পড়েছে।
মিগুয়েল ঠান্ডা গলায় বলে,
_ এখন না।
ওরা আগে আমাদের দেওয়া আস্তানায় পৌঁছাক। এখনই আমরা আক্রমণ করলে ওদের কাছে খবর পৌঁছে যাবে, আর তখন ওদের ফিরে আসতে বেশি সময় লাগবে না।
কিন্তু একবার আমাদের দেওয়া আস্তানায় পৌঁছানোর পর।
যখন খবর পাবে, তখন তারা ফিরেতে ফিরতে যা থাকবে, তা কেবল ধ্বংসাবশেষ।
তার চোখের পাতা একটুও কাঁপে না।
সে জানে, আজ যদি সে সঠিক সময়ে আঘাত করে,
তাহলে ইতিহাসের পাতায়
ভীর আলভারেয শুধু হেরে যাবে না,একেবারে ভেঙে গুরিয়ে যাবে ম
তার সব থেকে বড় দুর্বলতাই আজ সে শেষ করবে।
রোদের কড়া আলোয় ইশায়ার ঘুম ভেঙে যায়।
বেলা হয়েছে অনেক।
চোখ মেলতেই যেন শরীরটা ভেঙে পড়ছে পীড়ায়,
মাথায় হাত চেপে ধরে, হাত-পা যেন সাড়া দিতে চায় না।
কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ বসে থাকে ইশায়া
তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়, দেহের একেকটা পেশিতে ব্যথার ঝড় বইছে।
দেয়ালের ধারে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে যায় ওয়াশরুমে।
ঠান্ডা পানির নিচে দাঁড়িয়ে থাকে অনেকক্ষণ,
পানি যেন শরীর নয়, তার মনকেও ধুয়ে দিচ্ছে।
লম্বা একটা শাওয়ার নিয়ে বের হয়, এখন শরীরটা কিছুটা হালকা লাগছে
ড্রয়ারের পাশ থেকে একটা পেইনকিলার নেয়,
কাঁপা হাতে মুখে তুলে খেয়ে নেয় সেটি।
এমনসময় দরজায় টোকা পড়ে।
একজন নারী গার্ড দরজা খুলে বলে,
_ম্যাম নাস্তা তৈরি, খেয়ে নিন।
ইশায়া মুখ ঘুরিয়ে বলে,
পরে খাবো। এখন একটু একা থাকতে দিন আমাকে।
তার গলায় ভাঙা ক্লান্তি। গার্ড কিছু না বলে চলে যায়।
ইশায়ার চোখ পড়ে দেয়ালের এক বিশাল মনিটরের দিকে,
রুমের একপাশে বড় স্ক্রিনটা চালায় সে রিমোট দিয়ে,
সেখানে ভীরের বিলাসবহুল প্রাসাদেরই নানা জায়গার ফুটেজ চলছে।
ইশায়ার চোখ যায় পরিচিত রুমটা যেখানে সে থাকে।
মনিটরের স্ক্রিনে দেখা যায় ছোট্ট বিড়ালটা,তার কিট্টি।
জানালার পর্দা ধরে উপরে উঠছে,
আবার ভারসাম্য হারিয়ে নিচে পড়ে যাচ্ছে।
পরে আবার উঠার চেষ্টা করছে।
ওর মুখ দিএ মেও মেও শব্দ করছে, যেন কাউকে খুঁজছে,
বারবার মাথা উঁচু করে এদিক সেদিক তাকায়।
সে আমার বন্দিনী পর্ব ৩৯
__ইশায়ার চোখের কোণে হালকা পানি জমে ওঠে।
আমাকে খুঁজছিস?
মৃদু স্বরে ফিসফিস করে ওঠে সে।
একটানা তাকিয়ে থাকতে থাকতে মন ভেঙে পড়ে।
এই ঘরের ভেতর থেকেও যেন হৃদয় ছুটে যাচ্ছে সেই রুমে,
যেখানে ছোট্ট সেই প্রাণটা অপেক্ষা করছে তার জন্যে।
____হঠাৎ একটি বিস্ফোরণের শব্দ আকাশ কাঁপিয়ে ভেসে আসে।
