Home সে আমার বন্দিনী সে আমার বন্দিনী পর্ব ৪৩

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৪৩

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৪৩
তানিয়া হুসাইন

বাইরে জয়ের খবর শুনে সবাই স্বস্তি পায়।
প্রত্যেকের মধ্যে একটা মৃ*ত্যুর আতঙ্ক কাজ করছিল। হঠাৎ করে এসবের জন্য কেউই প্রস্তুত ছিল না।
এখন আবার সবাই যে যার কাজে লেগে পরে,
ইশায়ার জন্য নির্ধারিত গার্ডরা রুমে আসে।
দরজা খুলেই ভেতরে চোখ বুলিয়ে নেয় তারা।

___ম্যাম!
কিন্তু কোথাও কোনো সাড়াশব্দ নেই।
এলিসা আরো কয়েকবার ডাকে।
কিন্তু বরাবরই শূন্য কোথাও কারো অস্তিত্ব নেই।
রুমটা অস্বাভাবিক নীরব। বিছানাটা এলোমেলো, জানালার পর্দা একপাশে হেলে আছে, বাতাসে হালকা দুলছে,
কিন্তু কোথাও ইশায়ার কোনও চিহ্ন নেই।
মুহূর্তেই গার্ডদের চোখে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। একজন ধীরে ধীরে বলে ওঠে,
—ম্যাম কোথায় গেল?
একজন তাড়াহুড়ো করে বাথরুমের দরজা খুলে দেখেখালি।
আরেকজন বিছানার নিচে, আলমারির ভেতর, জানালার পাশে, ব্যালকনি পর্যন্ত দেখে কিন্তু কিছুই নেই।
মহিলা গার্ডরা একে অপরের দিকে তাকায় । কারো ঠোঁট কাঁপছে, কারো কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম।
তারা ভালো করেই জানে,

ম্যাম নেই মানে তাদের মৃত্যু নিশ্চিত।
এই একজন চোখের আড়াল হওয়া মানে-ই বসেট সামনে নিজ হাতে কবর খুঁড়ে ফেলা।
গলা শুকিয়ে আসে সবার,
একজন গার্ড ফিসফিস করে বলে,
—আমরা শেষ,আমরা বাঁচবো না।
কিন্তু এরপরও তারা হার মানে না শেষ চেষ্টা করতে,
তারা হন্তদন্ত হয়ে পুরো প্রাসাদে খুঁজে ইশায়াকে।
করিডোর, স্টোর রুম, সিঁড়ি, অন্ধকার কর্নার, যত দূর চোখ যায়, তত দূর তারা ছুটে ছুটে খুঁযে,
প্রত্যেকটা হৃদস্পন্দন যেন নিঃশ্বাস টেনে নিচ্ছে।
রক্ত জমে যাচ্ছে শরীরে, এক ভয়াবহ মৃত্যুর ছায়া ঘিরে ধরেছে তাদের সবাইকে।

অন্যদিকে
ভীর! তার মুখে এক ভয়ংকর তৃপ্তির ছায়া।
পেছনে আগুনের লেলিহান শিখা।
চারদিক থেকে ধোঁয়া উঠছে, আর তার চোখের সামনে গুঁড়িয়ে যাচ্ছে মিগুয়েলের অস্তিত্ব।
একেকটা গু*লি মানে একটা শত্রুর সমাপ্তি।
একেকটা বি*স্ফোরণ মানেই নতুন এক জমি, এক রাজ্য, সব কিছুই তার পায়ের নিচে এসে পড়ছে।
ভীরের ঠোঁটে হালকা বাঁকা হাসি।
সেই হাসিতে নেই কোনো মানবতা, নেই কোনো দয়া।
শুধু এক তৃপ্তি,এক অদ্ভুত শান্তি।
দেখছে সে সামনে ছি*ন্নভিন্ন শরীর আর ধ্বংসস্তূপ সে অন্যমনস্ক হয় না, বরং র*ক্ত দেখেই তার মন শান্ত হয়।
আজ একটার শেষ, কাল আরেকটা শুরু। ধ্বংসই হবে তাদের সাম্রাজ্য যারা আমার সামনে দাঁড়াবে।
তার চোখের সামনে একমাত্র জিনিস অধিকার,সবকিছুর উপর অধিকার একমাত্র তার সবকিছুই তার।
এবং কেউ যদি এ অধিকার প্রশ্ন করে,তবে তার শেষ কেবল মৃ*ত্যু নয়, তার চেয়েও ভয়াবহ কিছু।

নিকো দুই হাত পেছনে মেলে আড়মোড়া ভাঙে। তার কণ্ঠে স্বস্তির ছোঁয়া, ক্লান্ত অথচ তৃপ্তির ছায়া।
শেষ। আমাদের কাজের সমাপ্তি হয়েছে।
এখন পরবর্তী গন্তব্যের পালা
তার গলায় বিজয়ের এক অদ্ভুত গর্ব।
—এখন আমি ছুটিতে যাবো। রেস্ট দরকার আমার। এতদিন ধরে এত কাজের চাপে আমি তো একেবারে শুকিয়ে গেছি,ঠাট্টা করে বলে।
নিকোর ঠোঁটে অদ্ভুত এক হাসি,
অন্যদিকে ডিয়েগো দাঁড়িয়ে আছে ভীরের পাশে, নিকোর এই খামখেয়ালী কথার একটাও তার কানে ঢোকে না। তার দৃষ্টি স্থির ভীরের মুখে।
ভীরের চোখে তখনো আগুন জ্বলছে।
নিকো এবার সান্তিয়াগোর দিকে তাকিয়ে ইশারা করে কিছু বোঝায়।
সান্তিয়াগো যেনো আগে থেকেই জানে কী করতে হবে, তাই সে চোখ নামিয়ে শুধু বলে,

— হয়ে যাবে, বস।
ভীরের সারা শ*রীর রক্তে ভেজা। তার গা থেকে ঝরছে রক্তের স্রো*ত,
কিন্তু সে একবারের জন্যও নিজেকে দেখে না,
তার চোখে তখন একটা দৃশ্যই ভাসছে ইশায়া।
আজকের এই মৃ*ত্যু-নৃত্যের, র*ক্তের বন্যার একমাত্র কারণ ইশায়া।
ওদের উদ্দেশ্য-ই ছিল ইশায়াকে টার্গেট করা।
তার সব শত্রুরাই এখন থেকে সবার আগে তার দুর্বলতাকেই টার্গেট করবে।
এটাই ভীরের রাগের একমাত্র কারণ।
ভীর মনে মনে প্রতিজ্ঞা নেয়,
আর কখনো না,কোথাও না। তোকে আমি বাইরে কোথাও আনবো না।
তার জন্য এই দুনিয়ায় সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা একটাই ভীরের প্রাসাদ।
ওখানেই সে থাকবে, তার বন্দিনী হয়ে, শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত।
সেখানে কেউ আসতে পারবে না,
কোন কিছুর ছায়া ও তাকে স্পর্শ করতে পারবে না,
কেউ ছুঁতে পারবে না।

বাইরের আলো, বাতাস ও আর ছুঁতে পারবে না তোকে।
তোকে স্পর্শ করার অধিকার একমাত্র আমার, আর কিছু তার দিকে চোখ তুলে তাকানোর অধিকার নেই,
ইশায়া জারিন শুধু রাজভীর আলভারেয এর।
আমি-ই তোর সব থেকে নিরাপদ আশ্রয়।
ভীরের চোখে তখনো র*ক্ত আর আগুন।
আজকে একটু হলেই সে হারাতে পারতো তাকে।
ভীর ধীরপায়ে র*ক্তমাখা শরীর নিয়ে প্রাসাদের দরজায় প্রবেশ করে।
একপা একপা করে সে এগিয়ে যায় নিজের কামরার দিকে,
সেই কামরা যেখানে তার প্রাণ আছে।
তার একমাত্র নিজস্ব সম্পদ,
সবচেয়ে মূল্যবান।
যাকে সে,এখন এই মুহূর্তে নিজের বাহুতে চাইছে।
তার চোখে তখন শিকারি হা*য়েনার মতো ক্ষুধা, উন্মাদ ভালোবাসার এক ভয়ংকর ছায়া।

___ভীর দরজাটা ঠেলে রুমে প্রবেশ করে।
তার ভারি বুটের শব্দ পুরো ঘর জুড়ে প্রতিধ্বনিত হয়, যেন নিজেরই আগমনের পূর্বাভাস সে নিজেই দিচ্ছে।
তার চোখ রুম জুড়ে দ্রুত ছুটে যায়, বিছানার দিকে তাকায় একদম মাঝখানে থাকা জায়গাটা ফাঁকা।
যেখানে ইশায়ার থাকার কথা, অপেক্ষা করে থাকার কথা তার জন্য,
সেখানেই নেই সে।
ভীরের কপালে ভাঁজ পড়ে।
চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে মুহূর্তেই।
স্নায়ু টানটান করে সে ধীরে ধীরে রুমটা চষে ফেলে চোখের দৃষ্টিতে।
___কোথায়? কোথায় সে? মনে মনে সে ফুঁসে ওঠে ভীর।
তার ঠোঁটের কোণে রাগ স্পষ্ট।
___ভীরের মাথায় তখনো কিছু আসে নি,

হঠাৎ মনে পড়ে ও সে তো বলেছিল ইশায়াকে সুরক্ষিত কোন জায়গায় রাখার জন্য, যাতে কেউ তার নাগাল না পায়।
হয়তো সেজন্যেই ও এখানে নেই।
ভীর নিজের রাগ সামলায়,
কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে এক ঝটকায় নিজের কালো কোটটা খুলে নিচে ছুঁড়ে মারে,
তারপর সাইডে থাকা ডিভানে এ বসে গা এলিয়ে দেয়।
শ্বাস ভারী হয়ে উঠেছে তার।
চোখে উত্তাল এক তীব্রতা।
ডান হাতে রি*ভলবারটা রেখে দেয় সাইড টেবিলে।
__ভীর চিৎকার করে ডাকে
গার্ডদের!
ডাক শুনে তৎক্ষণাৎ কয়েকজন গার্ড ভিতরে প্রবেশ করে।
তাদের চোখ নিচু, পা জড়ানো, কেউ কারো দিকে চোখে চোখ তুলে তাকাতে পারছে না।
ভীর ক্লান্ত গলায় বলে,

___ইশায়া কোথায়? নিয়ে এসো আমার সামনে।
কেউই কিছু বলে না।
এক অস্বস্তিকর, হাড় গিলে খাওয়া নীরবতা ঝেঁকে ধরে পুরো ঘরটায়।
চারদিক নিস্তব্ধ অথচ ভয়াল।
ভীর চোখ খোলে।
এক ঝলকে তাকিয়ে সোজা হয়ে বসে।
তার চোখে যেন আগুন।
কথা কানে যায়নি? হা?
তার গলার আওয়াজ যেন প্রতিধ্বনিত হয় দেয়ালে দেয়ালে।
___এলিসা সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে, কাপা কণ্ঠে আমতা আমতা করে বলে ওঠে,
ম্যাম..
___ভীরের চোখ সরু হয়ে আসে,

ধমকে ওঠে,
কি?
স্পিক আপ, ড্যাম ইট!
এলিসা এক নিঃশ্বাসে সবকিছু বলে ফেলে
বস ম্যাম নেই। আমরা সারা প্রাসাদ খুঁজেছি। উনি কোথাও নেই।
তবুও তার মুখে কথাটা যেন ঠিকঠাকভাবে বেরোচ্ছে না,
আটকে আটকে আসছে।
ভীর দাঁড়িয়ে পড়ে,
সে যেনো শুনে ও শুনেনি,এটা অসম্ভব।
মাথার ভেতরটা মুহূর্তেই যেন ব্ল্যাঙ্ক হয়ে গেছে।
নিজে ভুল শুনেছে মনে করে আবারও বলে,
__কি?
এলিসা এবার কাঁদো কাঁদো গলায় আবার বলে,

__ম্যাম নেই, ম্যামকে কোথাও খুঁজে পা….
সম্পূর্ণ কথা শেষ করার আগেই ভীর রাগে উন্মত্ত হয়ে সাইড টেবিল থেকে রি*ভলভারটা তুলে নেয়,
এক মুহূর্ত সময় ব্যয় না করে, এলিসার কপাল বরাবর শু*ট করে।
ধোঁয়া আর রক্তে ঢেকে যায় সেই অংশটা।
মুহূর্তেই মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে এলিসা।
চারপাশ স্তব্ধ হয়ে যায়।
রুমে দাঁড়িয়ে থাকা বাকি গার্ডরা আতঙ্কে কেঁপে উঠে।
একজন হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে কাঁদতে কাঁদতে বলে,
___বস প্লিজ, মাফ করে দিনআমরা চেষ্টা করছি,ম্যাম কে বারবার বলেছি এখান থেকে কোন সুরক্ষিত জায়গায় নিয়ে যাওয়ার জন্য কিন্তু তিনি মানেননি। আমরা ম্যামকে খুঁজেছি…

ভীর কিছুই শুনছে না।
তার মাথায় তখন কিছু একটা বিস্ফোরণের মতো হচ্ছে।
হৃৎস্পন্দন এত দ্রুত হচ্ছে, যেন সারা শরীরটাকেই টান দিচ্ছে।
ঠিক তখনই বাইরে থেকে দৌড়ে রুমে ঢুকে আসে নিকো আর ডিয়েগো।
ভীর তাদের দিকে তাকায়, মুখ আগুনের মতো লাল, চোখ জ্বলছে উন্মত্ততায়।
সে চিৎকার করে বলে ওঠে
Where is my girl? Bring her to me right now.
আমি এই মুহূর্তে ওকে দেখতে চাই, নিয়ে আসো ওকে।
তার চিৎকারে কাঁপে পুরো রুম।
কেউ সাহস করে এক পা পর্যন্ত আগায় না।
আর এক সেকেন্ডও সময় না নিয়ে ভীর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আট জন গার্ডের দিকে একে একে তাক করে গুলি চালাতে থাকে।
একটা, দুইটা, তিনটা… আটটা গুলি,শেষ আটটা প্রাণ।
এক মুহূর্তেই জায়গাটা র*ক্তাক্ত লা*শের স্তূপে পরিণত হয়।

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৪২

___ডিয়েগো এবং নিকো হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
কেউ কথা বলার সাহস পায় না।
ভীরের হাত তখনও কাঁপছে।
তার শ্বাস খুব দ্রুত চলছে।
ভীর ধপ করে বসে পড়ে বিছানায়।
নিকো দৌড়ে আসে তার কাছে।
ভীরের চোয়াল শক্ত হয়ে আছে, চোখে শুধুই আগুন ভেতরে ভয়।
এই প্রথম জীবনে এই প্রথম ভীর কাউকে হারিয়ে ফেলার ভয় পাচ্ছে।

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৪৪