সে আমার বন্দিনী পর্ব ৬৭ (২)
তানিয়া হুসাইন
এলিজার সাথে এমন ব্যবহার দেখে ইশায়া চমকে যায়। মেয়েটা স্বাভাবিকভাবে খাবার নিয়ে এসেছিলো, এক কথায় তাকে থামিয়ে দেওয়া হলো কেন?
ঠিক তখনই মারিয়া এলেনা ব্রেকফাস্টের ট্রেটা হাতে নিয়ে ঘরে ঢোকে।ইশায়ার দিকে তাকিয়ে নিখুঁত ভদ্রতায় মাথা নত করে বলে,
___ম্যাম, আপনি ফ্রেশ হয়ে আসুন। ব্রেকফাস্ট করতে হবে। আপনার সকালের ওষুধ আছে।
কণ্ঠে কোনো আবেগ নেই, শুধু প্রশিক্ষিত আনুগত্য।
ইশায়া আর কৌতূহল চেপে রাখতে পারে না।
__ওনার সাথে তোমরা সবাই এভাবে কথা বললে কেন? সে তো শুধু খাবার নিয়ে এসেছিল।
মারিয়া এলেনার মুখে কোনো পরিবর্তন আসে না। এই প্রশ্নটার জন্য সে আগে থেকেই প্রস্তুত।
__আপনার দেখাশোনার জন্য বস আলাদা একটি টিম রেখেছেন, ম্যাম। এর বাইরে আপনার আশেপাশে আসার অনুমতি আর কারোর নেই।এই প্যালেসে যার জন্য যেই কাজ বরাদ্দ সে শুধু সেই কাজই করবে।
ইশায়া ভ্রু কুঁচকে তাকায়।
—কিন্তু কেন?
মারিয়া এলেনা একটু থামে, তারপর বলে,
—বসের আদেশ। তিনি আপনাকে নিয়ে খুব প্রটেকটিভ। আপনার প্রতিটি জিনিস, প্রতিটি প্রয়োজন সবকিছু তিনি খুব সূক্ষ্মভাবে নজরে রাখেন। এই প্যালেসের হাজার হাজার গার্ড শুধুমাত্র আপনার সুরক্ষার জন্য নিয়োজিত।
শব্দগুলো ইশায়ার বুকে ভারী হয়ে নামে।
__এত কিছু… শুধু আমার জন্য?তার নিজের কণ্ঠেই তার বিশ্বাস হচ্ছে না।
মারিয়া এলেনা আরেক ধাপ এগিয়ে আসে। এবার কণ্ঠ নরম, সহানুভূতিশীল,
__বস আপনাকে ভালোবাসেন, ম্যাম। আপনি ছাড়া তার আর কেউ নেই। বসের সবকিছু আপনার জন্য।আপনাকে নিরাপদ রাখার জন্য,ভালো রাখার জন্য।
এই কথাটাই ঠিক জায়গায় আঘাত করে।
ইশায়ার শূন্য, ক্লান্ত মস্তিষ্কে যেন কেউ ধীরে ধীরে একটাই ছবি বসিয়ে দিচ্ছে,ভীর।
তার রাগ, তার নীরবতা, তার নিয়ন্ত্রণ সবকিছুর আড়ালে আছে ভালোবাসা।ভীর খুব সাবধানে জালটা বিছিয়েছে।যেন ইশায়ার চারপাশের প্রতিটা কণ্ঠ, প্রতিটা আদেশ, প্রতিটা যত্ন সবশেষে এসে এক নামেই ঠেকে। আর সেটা সে,ভীর।
মারিয়া এলেনা আলমারি খুলে ইশায়ার জন্য পোশাক বের করে দেয়।
___ম্যাম!
ডাক শুনে ইশায়ার ধ্যান ভাঙে।সে ধীরে ধীরে ওয়াশরুমে যায়।শাওয়ার চালু হতেই ঠান্ডা পানি তার শরীর বেয়ে নামতে থাকে।চোখ বন্ধ করতেই মাথার ভেতর কোলাহল শুরু হয়।ভীরের কথা।মারিয়া এলেনার বলা কথা।
__তিনি আপনাকে ভালোবাসেন। এই কথাটা বাজতে থাকে ইশায়ার কানে।আপনি ছাড়া তার কেউ নেই।
পানি শরীর ছুঁয়ে নিচে পড়ছে, আর ইশায়ার স্মৃতির কোণে কোণে যেন নতুন ব্যাখ্যা ঢুকে দেওয়া হচ্ছে।
ভীরের উপস্থিতি অদ্ভুতভাবে নিরাপদ মনে হচ্ছে তার।
এইভাবেই ভীর তার স্মৃতির ফাঁকে ফাঁকে ঢুকে পড়ে।
জোর করে নয় নরম কথায়, সুরক্ষার অজুহাতে, ভালোবাসার নামে।একটা একটা করে ভাবনা মুছে যায়।একটা একটা করে সত্য বদলে যায়।আর ইশায়া বুঝতেই পারে না সে আর নিজের চিন্তায় ভাবছে না,
ভীর তাকে যেমন ভাবাতে চায়, ঠিক তেমনটাই ভাবছে।
___ইশায়া শাওয়ার নিয়ে বেরিয়ে আসতেই দেখে
রুমটা আগের চেয়েও নিখুঁত।একটাও জিনিস এলোমেলো নয়।সব কিছু সুন্দর করে সাজিয়ে গুজিয়ে রাখা হয়েছে।মারিয়া এলেনা আর লুসিয়া আগেই সব গুছিয়ে ট্রে সাজিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।টেবিলের উপর সাদা কাপড় পাতা, তার ওপর সাজানো ব্রেকফাস্ট গরম খাবারের হালকা ধোঁয়া উঠছে।তার পাশেই রাখা ছোট্ট একটি সিলভার বক্স।
মারিয়া এলেনা এগিয়ে এসে গ্লাসটা তার দিকে বাড়িয়ে দেয়।কণ্ঠে নিখুঁত আনুগত্য,
___ম্যাম, আগে এগুলো।
ইশায়া ওষুধগুলোর দিকে তাকায়।তারপর শান্ত গলায় প্রশ্ন করে,
__আমি তো ঠিক আছি, এগুলো কিসের ওষুধ?
মারিয়া এলেনার কণ্ঠ একই রকম স্থির, নির্ভুল।
___স্ট্রেস, ঘুম আর মাইগ্রেনের জন্য। বস বলেছেন খেতে, ম্যাম।
ইশায়া চোখ তুলে তাকায়।উনি বলেছেন?
__জি, ম্যাম।
এই একটা শব্দই যথেষ্ট।ইশায়া আর কোনো প্রশ্ন করে না।একটার পর একটা ট্যাবলেট গিলে নেয়।
গ্লাস নামিয়ে রাখে নিঃশব্দে।ভীর এখন ইশায়ার কাছে শুধু একজন মানুষ না।সে তার বিশ্বাসের একমাত্র আশ্রয়।তাই ভীরের কোনো আদেশ, কোনো সিদ্ধান্তে
ইশায়া আর প্রশ্ন করে না।
______এভাবেই কেটে যায় তিনটা দিন।
ভীর আসে নি প্যালেসে।সে বাইরে ছিল তার কাজে।
কোরিয়া থেকে আসা এক বিশাল চালান,
হাই-গ্রে*ড অ*স্ত্র আর কে*মিক্যাল ড্রা*গস।মেক্সিকোর ভেতর দিয়ে ট্রানজিট হয়ে যাবে এশিয়ার দিকে।ডিলটা ভীরের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।কিন্তু মাঝপথেই সবকিছু বদলে যায়।মেক্সিকোর এক নির্জন হাইওয়ে।
রাত ঘন হয়ে নেমেছে।চারদিকে শুধু কনভয়ের হেডলাইটের তীব্র আলো,আর টায়ারের একটানা শব্দ।
হঠাৎ, সামনের গাড়িটা বিকট বিস্ফোরণে উপরে উঠে উল্টে পড়ে।রাস্তায় আগুন ছড়িয়ে পড়ে মুহূর্তেই।ধোঁয়ায় ঢেকে যায় চারদিক।শত্রুপক্ষের চিৎকার।
চারদিক থেকে শুরু হয় গু*লিবর্ষণ।অন্ধকার ভেদ করে আগুনের রেখা ছুটে আসে।নিকো গাড়ির ডিকির উপর উঠে উল্টো গুলি ছোড়ে।এক সেকেন্ডও দেরি করে না।
ভীর নিজের গাড়ির দরজা খুলে ধীরে বেরিয়ে আসে।
তার চোখে কোনো ভয় নেই।শুধু ঠান্ডা হিসেব,ফরমেশন ধরো,তার গর্জনে রাত কেঁপে ওঠে। সান্তিয়াগো আর এনরিকো মুহূর্তেই পজিশন নেয়। গার্ডরা কনভয়ের চারপাশে দেয়ালের মতো দাঁড়িয়ে পড়ে। ইতালিয়ান গ্যাং সামনে থেকে আক্রমণ করছিল। ওরা ভেবেছিল চালান নিয়ে পালালেই শেষ।ভীর এখানে আছে এই তথ্যটা তাদের পরিকল্পনায় ছিল না।কারণ তাদের কাছে ইনফরমেশন ছিল,ভীর তখন আলভারেয স্টেইটে।ভীর নিজে সামনে এগিয়ে যায়।এক হাতে ব*ন্দুক। ভীরের সেফটির জন্য চারপাশে গার্ড তাকে আড়াল করে দাঁড়ায়।
প্রথম ইতালিয়ান গ্যাংয়ের একজন কাছে আসতেই
এক গু*লিতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে সে।
আরেকজন পিছন থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
ভীর ঘুরে দাঁড়িয়ে এক ঝটকায় ছু*রিটা গলার নিচে ঢুকিয়ে দেয়। রক্ত ছিটকে পড়ে বাতাসে।
ভীর চিৎকার করে ওঠে,
____কেউ যেন পালাতে না পারে!একটাও বাঁচতে দিও না!এই আদেশ মানে মৃ*ত্যু।চারদিকে শুরু হয় খু*নোখু*নি।ব*ন্দুকের শব্দ, আর্তচিৎকার,
আর র*ক্তের তীব্র গন্ধ।ভীর নিজে সামনে থেকে লড়ছে।ইতালিয়ান গ্যাং লিডার ভীরকে টার্গেট করে এগিয়ে আসে।চোখে ঘৃণা, হাতে ব*ন্দুক ক্ষমতার লোভ
কিন্তু দেরি হয়ে যায়। সে ভীরকে আক্রমণ করার আগেই,ভীরের গুলি ঠিক কপালে এসে লাগে তার।
তারপর পুরো গ্যাং ভেঙে পড়ে।রাস্তায় পড়ে থাকে র*ক্তে ভেজা দেহগুলো।
ভীর ধীরে ধীরে হেঁটে আসে।চালানের দিকে তাকায়।
___চালান ঠিক আছে?
___জি, বস। সব ঠিক আছে।
কোনো ক্ষতি হয়নি।
ভীরের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হিংস্র হাসি ফুটে ওঠে ঠান্ডা নিষ্ঠুর।
ওষুধের প্রভাবে ইশায়ার মাথার ভেতর হালকা ঝিমুনি, চোখের পাতা ভারী কিন্তু মনটা অদ্ভুতভাবে অস্থির। সে বিছানার ওপর বসেই আছে, আঙুলের ডগা বারবার চাদরের ভাঁজ চেপে ধরছে।
পাশেই তার বিড়াল ছানাটা ঘুমিয়ে আছে।
এটা নাকি তার বিড়াল ছিলো,কিন্তু তার কিছু মনে নেই।
মনে করতে গেলেই মাথা ব্যাথা শুরু হয়ে যায়।
তাই সে এগুলো নিয়ে ভাবাই ছেড়ে দিয়েছে এখন।যেটা বাস্তব যেটা সে দেখছে সেটাই মেনে নিয়েছে।আর সত্যটা তার সামনে পানির মতো পরিস্কার।
অনেকক্ষন চুপ থাকার পর ইশায়া ডেকে ওঠে,
__আন্টি!!
তার কণ্ঠটা নরম, কিন্তু ভেতরে জমে থাকা অস্থিরতা চাপা দিতে পারছে না সে।
উনি কোথায়? উনি আসছেন না কেন এখনো?
_মারিয়া এলেনা ইশায়ার চোখের দিকে তাকিয়ে মিথ্যে হাসি টেনে আনে।
____বস ব্যস্ত আছেন, ম্যাম। তার কাজ আছে।
কিন্তু ইশায়া যেন শুনছেই না।উনি কি আজও আসবেন না?একই প্রশ্ন। বার বার।
মারিয়া এলেনার কপালে ভাঁজ পড়ে। এইকদিনে সে বুঝে গেছে ইশায়া চুপচাপ থাকার মেয়ে নয়। সে কথা বলে,প্রচুর কথা বলে।এতোদিন চুপ ছিলো শুধু। তার প্রতিটা কথার শেষ গিয়ে থামে একজনের নামেই ভীর।
___এদিকে, দূরে একটা অন্ধকার ঘরে বসে আছে ভীর।মাত্রই এসে শাওয়ার নিয়েছে সে। একাধিক মনিটরে ইশায়ার প্রতিচ্ছবি। তার হাঁটা, বসা, চোখের নড়াচড়া তার প্রত্যেকটা কথা,একটাও বাদ যাচ্ছে না।
ইশায়ার প্রতিটা প্রশ্ন, প্রতিটা দীর্ঘশ্বাস সে শুনছে।
ভীরের ঠোঁটের কোনে হাসি ফুটে ওঠে ।সে ইচ্ছে করেই দূরে আছে।ইচ্ছে করেই।
সে চায় ইশায়াকে আরও অস্থির করতে।তার ভেতরে একটা শূন্যতা তৈরি করতে, যেখানে শুধু ভীরই থাকবে।যাতে সে তাকে কাছে পাওয়ার জন্য ছটফট করে, আর নিজের অজান্তেই সারাক্ষণ তাকে নিয়েই ভাবতে থাকে।
কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর ইশায়া আবার ও প্রশ্ন করে,
___ওনার শরীরে এত ক্ষত কেন? উনি আসলে কী কাজ করেন?
মারিয়া গুছানো, ঠান্ডা কন্ঠে জবাব দেয়,
___ব্যবসায় করেন।তার অনেক কোম্পানি আছে।
এই বিষয়ে আর কিছু জানি না, ম্যাম। বসের কাছে কোনো মহিলা যায় না। তবে যতটুকু শুনেছি আপনাকে টার্গেট করে বসকে আক্রমণ করা হয়েছে বহুবার।
এই কথাগুলো ইশায়ার মনে গভীর ছাপ ফেলে। সে ফিসফিস করে বলে,
__ তাহলে… উনি সত্যিই আমার জন্য এত কিছু করেছেন?
মারিয়া এবার চোখ তুলে তাকায়। এই দৃষ্টিতে সহানুভূতি নেই, আবেগও না আছে একধরনের কঠিন নিশ্চয়তা।
__বস যাকে নিজের বলে মানেন… তার জন্য তিনি সব করেন।
এই সব শব্দটা ইশায়ার ভেতরে কাঁপন ধরিয়ে দেয়।
এভাবেই দিন কেটে। ভীরের অপেক্ষায় সময় পার করে ইশায়া।
বারবার মারিয়া এলেনাকে ডাকে।
প্রশ্নগুলো বদলায়, কিন্তু কেন্দ্র একটাই ভীর।
___ উনি কবে আসবেন?
জানি না, ম্যাম।
___উনি খেয়েছেন?
জি, ম্যাম।
প্রতিটা উত্তরের সঙ্গে সঙ্গে ইশায়ার মনে ভীর আরও গভীরে গেঁথে যায়। তার চোখে ভীর আর ভয়ংকর কেউ নয়। ধীরে ধীরে সে হয়ে ওঠে তার একমাত্র আপন মানুষ।যার চারপাশে শত্রু।যে কাউকে বিশ্বাস করে না।
যে শুধু তাকেই বাঁচাতে লড়ছে।
হঠাৎ করেই ইশায়া প্রশ্ন করে বসে,
__উনি কি কখনো… হাসেন?
মারিয়া সামান্য থামে। তারপর ধীরে বলে,
__আপনার সামনে… কখনো কখনো।
এই কথাটুকু ইশায়ার বুকের ভেতর অদ্ভুত এক আনন্দ জাগিয়ে তোলে। সে নিজেও বুঝতে পারে না ভয় বদলে গেছে চিন্তায়,চিন্তা বদলে যাচ্ছে টানে,
আর টান বদলে যাচ্ছে ভালোবাসায়।
রাতে একা শুয়ে শুয়ে সে ভাবে উনি না থাকলে আমি কি বেঁচে থাকতাম?
মারিয়া এলেনা একের পর এক জবাব দিতে দিতে হিমশিম খায়। কখনো বিষয় ঘোরায়, কখনো আশ্বাস দেয়, কখনো নীরব থাকে।
কিন্তু ইশায়ার প্রশ্ন থামে না।
আর ল্যাপটপের ওপাশে বসে থাকা মানুষটা সব দেখছে।সব শুনছে।ভীর জানে, এই অস্থিরতা ভাঙার নয়।এটা সে নিজেই তৈরি করছে।কারণ এবার বন্দি শরীর নয়,সে বন্দি করতে চায় ইশায়ার মন।
___ভীর প্যালেসে না থাকলেও, ইশায়ার দুনিয়াটা তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে এক মুহূর্তের জন্যও যায় না।
সে তখন সিনালোয়ার সীমান্তঘেঁষা সান্তা নোচে।
মাফিয়াদের অস্থায়ী ঘাঁটি।
যেখানে রাত নামে ব*ন্দুকের শব্দে, আর চুক্তি সই হয় র*ক্তের শপথে।কাজের ভিড়ে থেকেও ভীর প্রতিটা নির্দেশ দেয়।ইশায়ার খাবার, ওষুধ, ঘুম সবই তার চোখের ভেতর বন্দী।
ফিরে এসে, ক্লান্ত শরীর নিয়েও, সে সোজা ল্যাপটপ খোলে।ইশায়ার পুরো দিনের ফুটেজ একে একে দেখে।কিছু কিছু জায়গা রিভার্স করে দেখে,কোথায় সে থেমেছে, তার কথা জিজ্ঞেস করা, বার বার তাকে নিয়ে প্রশ্ন একটাও বাদ যায় না।
আর প্যালেসে, রাণিয়া মারিয়া এলেনার কাছ থেকে ভীর নিয়মিত খোঁজ নেয়।ইশায়া ঠিক আছে কি না,শরীরের অবস্থা সবসময় চেইকআপের মাঝেই রাখা হয় ইশায়াকে।
সব তথ্য শেষ পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছায় এক জায়গায়
ভীরের কাছে।দূরে থেকেও সে কাছেই থাকে।
কারণ ভীরের জন্য দূরত্ব কোনো বাধা নয় এটা শুধু আরেকটা অ*স্ত্র ইশায়াকে পুরোপুরি দখলে নেওয়ার।
রাতটা ছিল অস্বাভাবিক নীরব।সিনালোয়ার আকাশে চাঁদটা মেঘের আড়ালে লুকিয়ে আছে যেন আসন্ন রক্তপাতের সাক্ষী হতে চায় না।
ভীরের ঘাঁটিতে তখন গভীর রাত অনেক গার্ড ক্লান্ত শরীর নিয়ে ঘুমে ঢলে পড়েছে।তাদের খাবারে কিছু মেশানো হয়েছে। চারপাশে শুধুই বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ আর দূরের পাহাড়ের গা ছুঁয়ে বয়ে যাওয়া শীতল অন্ধকার।ঠিক তখনই ছায়ার ভেতর থেকে ছায়ার মতোই নড়ে উঠে শত্রুপক্ষ।নীরবে। নিখুঁত পরিকল্পনায়।
পেছন থেকে লুকিয়ে প্রথম গার্ডটাকে মারলো কোনো শব্দ ছাড়াই একটা ধারালো ছু*রি গলা ভেদ করে ঢুকিয়ে দেয়, র*ক্তের উষ্ণতা মাটিতে ছড়িয়ে পড়ে অন্ধকারে।
দ্বিতীয় জনের মুখ চেপে ধরে ঘাড় মুচড়ে দেয় আরেকজন।একজন একজন করে ভীরের লোকেরা মাটিতে লুটিয়ে পড়তে লাগল কেউ বুঝে ওঠার আগেই।শত্রুরা জানতো,রাতটাই তাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র।আস্তে আস্তে তারা এগোতে থাকে ভীরের মূল ঘাঁটির দিকে, মৃ*তদেহ পেরিয়ে, র*ক্তের দাগ মাড়িয়ে।
কিন্তু নিখুঁত পরিকল্পনাও কখনো কখনো ভুল করে।
বাইরের গার্ডের দিকে পৌঁছাতে পারলেও মূল ঘাটির দিকে পৌঁছানো এতো সহজ না।হঠাৎ একটা টর্চের আলো এক গার্ডের চোখে পড়ে গেল অচেনা ছায়া।
পরের সেকেন্ডেই আকাশ ফেটে বেরিয়ে এল গু*লির শব্দ।ছায়া দেখেই সে সেটাকে কেন্দ্র করে গু*লি ছুড়তে থাকে। ঠাস! ঠাস! ঠাস!
নীরব রাত মুহূর্তেই রূপ নিল যুদ্ধক্ষেত্রে।গু*লির শব্দে ঘুম ভেঙে যায় সবার। ভীরের ঘাঁটিতে শুরু হলো বিশৃঙ্খলা চিৎকার, দৌড়ঝাঁপ, অ*স্ত্র লোড করার শব্দ।
ডিয়েগো প্রথম বেরিয়ে আসে হাতে স্বয়ংক্রিয় রা*ইফেল, চোখে বরফশীতল হিসাব।
তার পেছনেই নিকো, এনরিকো, ম্যাটিয়াস, সান্তিয়াগো লুইস সবাই এক মুহূর্তেই ছড়িয়ে গেলো শত্রুদের শেষ করতে।
নিকো ফোন বের করেই গর্জে ওঠে,
—ব্যাকআপ পাঠাও! এখনই! পুরো ঘাঁটি ঘেরাও হয়ে গেছে!কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে।শত্রুপক্ষ চারদিক থেকে ঘাঁটি ঘিরে ফেলেছে।গু*লি আর গু*লির জবাব
আগুনের ঝরনা নেমে আসে অন্ধকারে।
এক গার্ড দৌড়াতে গিয়ে বুকের মাঝখানে গু*লি খেয়ে পেছনে ছিটকে পড়ে মুখ দিয়ে রক্ত ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে আসে।আরেকজন দেয়ালের আড়াল যেতে নিলেই গ্রে*নেডের বিস্ফোরণে শরীর ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়।
___এনরিকো আড়াল থেকে লড়াই করে যাচ্ছে।
ম্যাটিয়াস সামনে এগিয়ে গিয়ে এক শত্রুকে খুব কাছ থেকে গু*লি করে মাথার ম*** উড়ে গিয়ে দেয়ালে লেপ্টে যায়।
ম্যাটিয়াস ছু*রি হাতে ঝাঁপিয়ে পড়ে একেকজনের পে*ট চিরে দেয়, আর্তনাদ করতে করতেই শত্রুপক্ষ মাটিতে গড়িয়ে পড়ে।
চারপাশে শুধু বা*রুদের গন্ধ, রক্ত আর মৃত্যুর চিৎকার।
এই সময় ভীর।সে বেরিয়ে আসে নিজের ঘর থেকে, হাতে কালো রা*ইফেল, চোখে অদ্ভুত এক শান্ত আগুন।
তার প্রতিটা গু*লি লক্ষ্যভেদী।যেখানে সে তাকায় সেখানেই মৃ*ত্যু নামে।একজন শত্রু গুলি ছুঁড়তে গিয়েই বুঝে ওঠার আগেই ভীরের গুলিতে কপাল ফেটে যায়।আরেকজন দেয়াল টপকাতে গিয়ে পিঠে গু*লি খেয়ে নিচে পড়ে ছটফট করতে থাকে। ভীর একের পর এক গুলি ছুড়তে থাকেপুরো সিনালোয়া ঘাঁটি তখন রক্তে ভেসে যাচ্ছে।
_______মাঝরাতে ঘুমের মাঝে হঠাৎ দুঃস্বপ্ন দেখে লাফিয়ে ওঠে ইশায়া।বুক ধুকপুক করছে তার।স্বপ্ন স্পষ্ট না, তবু ভয়ংকর গু*লির শব্দ, আগুনের ঝলক, আর এক রক্তমাখা ছায়া যেখানে সে ভীরকে দেখতে পেয়েছে।
এর মাঝে কেটে গেছে ১০ দিন।আসে নি ভীর আর।
দিন দিন অধৈর্য হয়ে উঠছে ইশায়া।অপেক্ষা এই প্রাসাদের সবচেয়ে নিষ্ঠুর শাস্তি।ইশায়াকে এভাবে হঠাৎ ঘুমের মাঝে লাফিয়ে উঠতে দেখে, রুমের লাইট জ্বালায় মারিয়া এলেনা।আলোয় ইশায়ার মুখ ফ্যাকাশে, চোখে আতঙ্ক জমাট।
দ্রুত এসে সে তাকে জিজ্ঞেস করে,
___কি হয়েছে ম্যাম! কোন সমস্যা।আপনি অপেক্ষা করুন আমি এখনই ডাক্তারকে আনছি।
___ইশায়া তাকে থামিয়ে দিয়ে বলে,
আপনি উনাকে একটা ফোন দিন প্লিজ। আমি ওনার সাথে একটু কথা বলবো।
এই একটা নাম উনি মারিয়া এলেনার বুকের ভেতর শীতল ভয় নামিয়ে আনে।
ইশায়ার এমন কথায় মারিয়া এলেনা চুপ হয়ে যায়।
ইশায়া বার বার বলতে থাকে।
___মারিয়া এলেনা বলে,
ম্যাম বসকে আমরা ফোন দিতে পারিনা।ওনার প্রয়োজনে উনি আমাদেরকে ফোন দেন।
___ইশায়া মানে না।
বার বার একি কথা বলতে থাকে।
ঠিক আছে আপনাকে দিতে হবে না আপনি ফোন আমাকে দেন আমি ওনাকে ফোন দিব।
এই কথাটা মারিয়া এলেনার জন্য সরাসরি বিপদের ঘণ্টা।
__মারিয়া এলেনা পড়েছে বিপদে। ইশায়াকে কোন ধরনের ইলেকট্রনিক্স ডিভাইস দেওয়া নিষেধ।
এখন সে কি করবে।
মারিয়া এলেনা আবারো তাকে বোঝাতে যায়।
বলে এই প্রাসাদে কেউ-ই ফোন ব্যবহার করেনা, কারোর ব্যক্তিগত কোন ফোন নেই, বস আর তার কাঙ্খিত কিছু মানুষ ছাড়া।
___ইশারা চিৎকার করে ওঠে আদেশ দেয় তাকে,
এই মুহূর্তে আমার ফোন চাই,
চাই মানে চাইইই। আমাকে ফোন এনে দেন।
কণ্ঠে ভয়ের চেয়েও বেশি আছে অধিকার।
ইশায়াকে উত্তেজিত হতে দেখে মারিয়া এলেনা ভয় পেয়ে যায়।আর কোন উপায় না পেয়ে তিনি যান নিচে ইশায়াকে ফোন এনে দিতে।
নিয়ম ভাঙায় কোন বিপদ আসবে মারিয়া এলেনা ভয় পাচ্ছে।কিন্তু ম্যাম উত্তেজিত হয়ে কিছু করে ফেলকে বস কাউকে ছাড়বে না।
___মারিয়া এলেনা ফোন আনতেই ইশায়া দ্রুত তার হাত থেকে ফোন কেড়ে নেয়।
ডায়ালে গিয়ে বস নামের নাম্বারে ডায়াল করে সে।
___এদিকে শত্রুদের প্রতিহত করতে ব্যস্ত ভীর।পকেটে ফোনের দিকে তার ধ্যান নেই।কিন্তু অনবরত বাঁজতে থাকা ফোনের শব্দে বিরক্ত হয়ে ওঠে সে।ভীর রাই*ফেল চালাতে চালাতে একসময় তার বুলেট শেষ হয়ে আসে।
র*ক্তে ভেজা হাত, ধোঁ*য়ায় ভরা নিশ্বাস, চারপাশে লা*শ।
____ ভীর ফোন ধরছে না দেখে ইশায়া আরো অস্থির হয়ে ওঠে, বারবার ফোন দিতে থাকে।
মারিয়া এলেনা তাকে নিষেধ করে এতবার ফোন না দিতে, বস রেগে যাবে।
কিন্তু ইশায়া কারো কথা শুনছে না।
স্বপ্নের আতঙ্ক এখন বাস্তবে ভয় হয়ে বুকে চেপে বসেছে।
ভীর চা*কু তুলে নেয় হাতে,তার পুরো শরীর রক্তে রঞ্জিত।
একে একে সবাইকে শেষ করার পর বিরক্তিতে রাগে ফোন রিসিভ করে কানে ধরতেই অপাশ থেকে শোনা যায়।
যুদ্ধক্ষেত্রের কোলাহলের ভেতর এক রমনীর আতঙ্কিত গলার শব্দ।
___হ্যালো, হ্যালো শুনছেন।
ভীর থমকে যায়।
এই কণ্ঠ….যার জন্য সে পুরো দুনিয়াকে আগুনে পুড়িয়ে দিতে পারে।
ওপাশ থেকে কোন উত্তর না আসায় ইশায়া মরিয়া হয়ে ওঠে। আবার ও বলে,
___হ্যালো… হ্যালো! শুনছেন আপনি।
ভীর ইশায়ার গলা শুনে অন্যমনস্ক হয়ে যায়।
সে আমার বন্দিনী পর্ব ৬৭
এক মুহূর্তের জন্য ভুলে যায় সবকিছু সবকিছু হঠাৎ থমকে গেছে।এই প্রথম ইশা…..
ভীরকে অন্যমনস্ক দেখে একজন হঠাৎ ভীরের সাইডে এসে পড়ে।নিস্তেজ চোখে, হাতে লুকানো অস্ত্র এক ঝাপটে সে আঘাত করে ভীরের বাহুতে,
মূহুর্তেই রক্ত ছিটকে পড়ে।
কিন্তু ভীরের গলা থেকে কোন আওয়াজ বের হয় না।
