সে আমার বন্দিনী পর্ব ৬৮
তানিয়া হুসাইন
ভীরের গলা থেকে কোনো আওয়াজ বের হয় না, এক ফোঁটা শব্দও নয়।
পরের মুহূর্তেই ভীর দক্ষ হাতে ছু*রিটা সোজা ওই লোকটার গ*লায় ঢুকিয়ে দেয়।লোকটা লুটিয়ে পড়ে মাটিতে। চোখ দুটো বিস্ফারিত, হাত-পা ছটফট করছে কয়েক সেকেন্ড তারপর নিথর হয়ে যায়। নিঃশব্দ রাতটায় র*ক্তের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে।ভীরের মুখে কোনো পরিবর্তন নেই।না রাগ, না ভয় শুধু ঠান্ডা নিয়ন্ত্রণ।
তখনই নিকো দৌড়ে আসে ভীরের কাছে। বুক চিতিয়ে ভীরের সামনে দাঁড়ায়, চারপাশে চোখ বুলিয়ে নেয় কেউ আছে কি না।
___ফোনের ওপাশে ইশায়ার কণ্ঠ থামে না।
সে অনবরত কথা বলে যাচ্ছে।
নিকোকে দেখে ভীরে একটু শান্ত হয়।সে জানে এদিকটা নিকো সামলে নেবে।এর মধ্যেই ভীরের আরও লোক এসে পড়ে। একে একে ছড়িয়ে যায় চারপাশে। ব্যাকআপ টিম পুরো এলাকাজুড়ে ছায়ার মতো নেমে পড়ে। নিঃশব্দে, নিখুঁতভাবে তারা শত্রুদের খুঁজে বের করে নিশ্চিহ্ন করতে থাকে।
___ভীর ফোনটা কানে ধরে রাখে।সে শান্ত যেন কিছুই ঘটেনি।
ভীর গম্ভীর গলায় বলে,
__এতো রাতে তুমি?ঘুমাও নি কেনো?ওষুধ খেয়ে ঘুমাতে বলা হয় নি তোমাকে?
এতোক্ষন পর ভীরের গলা শুনে স্বস্তি পায় ইশায়া।
কিন্তু পরেই ভীরের এই কথাগুলো শুনে ইশায়ার মুখটা আপনাআপনি ছোট হয়ে আসে।
চোখ নামিয়ে নেয় সে।
অভিমানটা চেপে রেখে তবুও ফিসফিস করে বলে,
__এতো শব্দ কিসের?আপনি ঠিক আছে।
___ভীরের কণ্ঠ একটুও বদলায় না। একই স্বরে বলে,
None of your business.
এই কথাটাই যথেষ্ট।ইশায়ার বুকের ভেতর কেমন করে ওঠে। চোখের পাটা টলমল করে ওঠে তার,অশ্রু জমে,
ইশায়া আর কিছু বলে না।ফোনের ওপাশে নীরবতা নেমে আসে।
আর এই নীরবতার মধ্যেই ভীর প্রথমবার অনুভব করে
যুদ্ধের ময়দানে দাঁড়িয়ে থেকেও, এই একটা মানুষের কন্ঠ তাকে কতোটা শান্তি দিচ্ছে।
ভীর ফোন কানে নিয়েই ল্যাপটপ অন করে।
স্ক্রিন জুড়ে ভেসে ওঠে ইশায়ার মুখ।ইশায়ার ছটফট দেখে ভীর,বার বার হাতের নড়াচড়া, চাদর খামচে ধরা কিছুই নজর এরায় না তার।
একটা দীর্ঘ নীরবতা নেমে আসে দু’জনের মাঝখানে।
ইশায়া বুঝে উঠতে পারে না সে কী বলবে।
প্রতিটা কথায় এই লোকটার গলায় যে চাপা ধমক লুকিয়ে থাকে, সেটাই তার বুকের ভেতর অজানা এক ভয় ঢেলে দেয়।শব্দগুলো মুখে এসেও আটকে যায়।
___ভীর ফোন কাটে না।
ফোন কানে রেখেই ল্যাপটপের স্ক্রিনে দৃষ্টি স্থির করে রাখে।
ঠিক তখনই বাইরে সব শেষ হয়ে যায়।শত্রুদের একে একে মাটিতে নামিয়ে দেয় ভীরের লোকেরা।
রক্ত, চিৎকার, আর ব*ন্দুকের শব্দ থেমে গিয়ে চারপাশে শুধু নীরবতা।
___ ইশায়া আধঘুমে দুলছে।
ওষুধের ঘোরে চোখ ভারী হয়ে আসছে।
স্ক্রিনের ওপাশ থেকে ভীর সেটা দেখে ঠান্ডা গলায় বলে,
__ঘুমাও।
কিন্তু ভীরের মুখে বলা ওই একটামাত্র শব্দেই ইশায়ার ঘুম একেবারে উবে যায়।
চোখ বড় হয়ে যায় তার।
হঠাৎ করেই বুকের ভেতর কেমন যেন কেঁপে ওঠে।
ইশায়া বলতে যায়,
__শু..নু.
কিন্তু পুরো কথাটা শেষ হওয়ার আগেই ভীর মুহূর্তের মধ্যেই ফোন কেটে দেয়।
ফোন কাটা পড়তেই ইশায়া হাঁপিয়ে ওঠে।হঠাৎ যেন শ্বাস নিতে কষ্ট হয় তার।
যে কারণে ফোন দিয়েছিল সেই কথাটাই আর বলা হলো না।আবার কি ফোন দেবে?
হাতটা একটু নড়ে আবার থেমে যায়।
কেন জানি এই লোকটার সঙ্গে কথা বলতে তার অস্বাভাবিক রকম ভয় লাগে।
শব্দ যেন ফুরিয়ে আসে, গলা শুকিয়ে যায়।
ইশায়া ফোনটা কান থেকে নামাতেই মারিয়া এলেনা এগিয়ে আসে।
নরম কণ্ঠে বলে,
___ম্যাম, ফোনটা দিয়ে দিন।
বস রাগ করবেন আপনাকে ফোন দেওয়া নিষেধ।
ইশায়া কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে।
মাথার ভেতর হাজারটা কথা ঘুরতে থাকে।
ভয়, দ্বিধা আর না বলা কথাগুলো একসাথে গলা চেপে ধরে।তারপর অনেক ভেবে, অনেক দ্বিধা নিয়ে আবার ফোনটা কানে তোলে ইশায়া।
____ভীর একটা সিগারেট ধরায়।আগুনের লাল শিখাটা কয়েক সেকেন্ড তার চোখে প্রতিফলিত হয়, তারপর ধোঁয়ার আড়ালে হারিয়ে যায়।চেয়ারে মাথা এলিয়ে দেয়, শরীরটা ক্লান্ত, কিন্তু মাথার ভেতরটা ভয়ংকরভাবে সজাগ।একটার পর একটা আক্রমণ
একটার পর একটা নিখুঁত চাল।
ভীর ভেবে পাচ্ছে না এভাবে ধারাবাহিক আঘাতের পেছনের আসল কারণটা কী।তাদের প্রতিটা ডিল, প্রতিটা মুভ, প্রতিটা সময় তারা কোথায় আছে সবকিছুর ইনফরমেশন শত্রুপক্ষ পাচ্ছে ।কিন্তু কিভাবে?এর পিছনে কে আছে।
ধোঁয়ার ফাঁকে চোখ দুটো সরু হয়ে আসে তার।
অবশ্যই বাইরের কেউ ভেতরে ঢুকেছে,নাহলে আমাদের ডিলের প্রত্যেকটা ইনফরমেশন ওরা পাচ্ছে কোথা থেকে?ভীর এসব ভাবনায় মশগুল।সে একটার পর একটা হওয়া আক্রমনের হিসাব মিলাচ্ছে।
ঠিক সেই সময় নীরবতার বুক চিরে ফোনটা বেজে ওঠে।ভাবনায় ব্যাঘাত ঘটায় মেজাজ হারায় সে।
ভীর বিরক্তিতে ফোন রিসিভ করে।
কণ্ঠে চাপা রাগ, ধারালো ঠাণ্ডা ভাব,
___কি সমস্যা?
এক সেকেন্ড থামে, তারপর আরও কঠিন গলায় বলে,
__বার বার ফোন দিচ্ছো কেনো?
ঘুমাতে বলেছিনা তোমাকে?কথা কানে যায় না?
ওপাশে ইশায়া ভীরের ধমকে কেঁপে ওঠে।হাতটা শক্ত করে ফোন চেপে ধরে।
তবুও কাঁপা-কাঁপা গলায় বলে,
__আপনি আসবেন না?
ভীর চেয়ারে মাথা এলিয়ে দেয়।চোখ বন্ধ করে রাখে কয়েক সেকেন্ড।নিজেকে সামলায়।একটু আগের রক্ত, শব্দ, লড়াই সব চিন্তা মাথা থেকে সরিয়ে দেয় জোর করে।
তারপর ঠান্ডা, নিস্পৃহ গলায় বলে,
___কেনো, আমাকে দিয়ে তোমার কি কাজ?
ভালো আছো শান্তি মিলছে না?শান্তিতে থাকতে পারছো, ঘুমাচ্ছো সহ্য হচ্ছে না?
ইশায়া ভীরের কথার জবাব দেয় না,সে তার মতো করে বলে,
__আপনি চলে আসুন।আমার খুব ভয় করছে।
আমার কিছু ভালো লাগছে না।
ভীরের গলা আবার তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে,
___আমি আসলে আপনার এই শান্তির ঘুম হারাম হয়ে যাবে।আমি যর দূরে থাকবো আপনার জন্য ততই ভালো।
ইশায়া নাছোরবান্দা।
___আমি কিছু জানিনা।আসুন আপনি প্লিজ।
ভীরের ঠোঁটে খেলে যায় একটা ধীর বিপজ্জনক হাসির রেখা।একটু আগের সব চিন্তা মুহূর্তেই মিলিয়ে যায় তার মাথা থেকে।
এই মেয়েটা বুঝছেই না কার কাছ থেকে কী চাইছে।
___বুঝিয়েন কিন্তু, ম্যাডাম।
পরে আমি কোনো এক্সকিউজ মানবো না।
ইশায়ার গাল লাল হয়ে আসে।লজ্জা, ভয়, আর অদ্ভুত এক নির্ভরতা মিশে যায় সেখানে,ইশায়া নরম গলায় বলে,
___তবুও আসেন।
এই এইটুকুই যথেষ্ট।ভীরের ঠোঁটে ফুটে ওঠে বিজয়ের হাসি।এটাই সে চেয়েছিল।ইশায়া যেন নিজে থেকে তার কাছে আসে।তার কাছে নিজের আশ্রয় খোঁজে।
সে তার কাজে সফল।ইশায়া এখন পুরোপুরি তার হাতের মুঠোয়।
—ঘুমাও।
চুপচাপ শুয়ে পরো।এই বলে ভীর ফোন কেটে দেয়।
ইশায়ার আর সাহস হয় না আবার ফোন দেওয়ার।
তবুও বুকের ভেতর কোথাও একটা অদ্ভুত বিশ্বাস জন্ম নেয় ভীর তার কথা শুনবে।
সে আসবে।
আর অন্ধকারের ভেতর ভীর ধোঁয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে,হাসিটা ধীরে ধীরে গাঢ় হয়।
এরপর ইশায়া আর কিছু বলে না।ফোনটা ধীরে কানে থেকে নামিয়ে নেয়।মারিয়া এলেনাকে দিয়ে দেয় ফোন।
ইশায়া আর কোনো প্রশ্ন না করে, কোনো ভাবনা না টেনেচুপচাপ ঘুমিয়ে পড়ে।
ঘুমের ভেতরও তার বুকের গভীরে কোথাও একটা আশ্বাস জেগে থাকে,ভীর আসবে।
____বাংলাদেশ!!!
গভীর রাত ঢাকা তখন গভীর ঘুমে।নিয়ন লাইটে ভেজা রাস্তা, দূরে দূরে চলমান গাড়ির হেডলাইট অন্ধকারে কাটা কাটা দাগের মতো।
ফ্লাইওভারের নিচে বাতাস ভারী, শহরের কোলাহল ক্লান্ত হয়ে ধীরে ধীরে স্তব্ধ।
কোথাও কোনো চায়ের দোকান এখনো জ্বলছে, কোথাও আবার রাতজাগা শহরের শেষ নিঃশ্বাসটা ভেসে আসে।
এই শহর জানে কীভাবে কান্না লুকিয়ে রাখতে হয়।
মধ্যরাতে ফিরেছে আদ্রিয়ান।
অফিস থেকে সাফার কাছে গিয়েছিলো সে। অবশ্য এটা নতুন কিছু না, প্রতিদিন যায় সে ।
তার ধারণা সে একদিনও না গেলে সাফা রাগ করবে।
সাফা খুব ভয় পায় একা থাকতে।কিন্তু সে নিজেই সবাইকে ছেড়ে চলে গেছে।
কেউ তো আর যায় না তার কাছে।তাই আদ্রিয়ান যায়।প্রতিদিন যায়।২৪ ঘন্টার মাঝে এই দু-তিন ঘন্টা সে সবসময় তার জানের জন্য তুলে রাখে।তার প্রিয়তমাকে একটু সময় দিতে।
এই সময়টা তার জন্যই বরাদ্দ।
হ্যাঁ সে ফুল নিয়ে যেতে ভুলে না কখনো।
কিভাবে ভুলবে?
তাহলে যে ঘুমের মাঝেই তার রাগিনী পাখি এসে তাকে শাসাবে,মুখ ফুলিয়ে অভিমানি গলায় বলবে,
___ফুল আনলিনা কেনো?
“তুমি আমাকে ভুলে যাচ্ছো আদ্র?
না। ভুলে নি আদ্র।
আদ্র তার সাফাকে ভুলবে না।কোনোদিনও না।
যতদিন সে এই পৃথিবীতে বেঁচে আছে,যতদিন তার নিঃশ্বাস চলছে এই পৃথিবীর বুকে। ততদিন তার বুকের ভেতর বেঁচে থাকবে সাফা।
এটা তার প্রতিদিনের কাজ।
একটা নীরব প্রতিজ্ঞা।
বাড়ি ফিরে আদ্রিয়ান লম্বা একটা শাওয়ার নেয়।
গরম পানির নিচে দাঁড়িয়ে সে চোখ বন্ধ করে থাকে
কিছুক্ষণ। কালো রঙের টাওজার পরে বেরিয়ে আসে।উন্মুক্ত শরীরের।
তারপর খালি পেটেই একটা ঘুমের ওষুধ খেয়ে শুয়ে পড়ে।
কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পরেই তার ঘুম হালকা হয়ে আসেপায়ের কাছে অনবরত কারোর কান্নার শব্দ।একটা চাপা, ভাঙা কান্না যেটা ঘুম আর জাগরণের মাঝখানে বারবার তাকে টেনে তোলে।
আদ্রিয়ান ঘুমের ঘোরে উঠে বসে।
সাইড থেকে লাইট অন করে।
রুমের হালকা আলোয় ভেসে ওঠে রাহির কান্না-মাখা মুখ।
চোখ লাল, মুখ ভেজা, নিঃশ্বাস ভাঙা।
আদ্রিয়ানের দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সে।
রাতের নিস্তব্ধতার ভেতর
একটা ঘরের মধ্যে জমে ওঠে এমন এক শূন্যতা, যার কোনো শব্দ নেই কিন্তু ওজন আছে।
রাহির কান্নাটা শুরুতে ছিল নিঃশব্দ।কিন্তু সেই নীরবতাও বেশিক্ষণ টিকল না।
আদ্রিয়ান তাকে দেখে থমকে যায়। চোখে-মুখে বিরক্তি নয়, বরং অস্বস্তি।
___কি হয়েছে তোর? এভাবে কাঁদছিস কেন?
রাহি থামে না।উল্টো তার কান্না আরও বেড়ে যায়। এতক্ষণ যে কান্না চাপা ছিল, সেটাই এবার শব্দ হয়ে ভেঙে পড়ে। বুকফাটা হাহাকার।
হঠাৎ করেই সে উঠে এসে আদ্রিয়ানের পা জড়িয়ে ধরে।আদ্রিয়ানের খারাপ লাগে।এই দৃশ্য তার কাছে অস্বস্তিকর।রাহির কান্নার কারণ সে বুঝে উঠতে পারছে না।সে ঝুঁকে রাহির বাহু ধরে তাকে সরিয়ে দেয়।তারপর উঠে গিয়ে রুমের সব আলো একসাথে জ্বালিয়ে দেয়। অন্ধকারটা আর সহ্য হচ্ছে না তার।
সোফায় বসে পড়ে।
ঠান্ডা কিন্তু কঠিন চোখে রাহির দিকে তাকিয়ে বলে,
___কান্না থামিয়ে বল, কি হয়েছে।
রাহি নিজেকে সামলায়। কান্না গিলে নেয়। ভাঙা কণ্ঠে বলে,
___আমাকে বিয়ে করবে আদ্র ভাইয়া।
এক মুহূর্তের জন্য আদ্রিয়ান চুপ করে যায়।তারপর হাত দিয়ে মাথার এক পাশ চেপে ধরে।
গলা শক্ত হয়ে আসে তার,
___আদ্রিয়ান। আদ্র বলবি না আমাকে। এক কথা তোকে কতবার বলতে হয়?
রাহি নিজের কান্না গিলে নেয়।আবার আদ্রিয়ানের পায়ের কাছে গিয়ে বসে পড়ে।
কাতর কণ্ঠে বলে,
__আমাকে বিয়ে করবে আদ্রিয়ান ভাই। প্লিজ! দয়া করো আমাকে।
তারপর এক নিশ্বাসে সব বেরিয়ে আসে,
মা আমার বিয়ের জন্য অনেক দিন ধরে খুব চাপ দিচ্ছে। আমি কাউকে জানাইনি। কিন্তু এখন তারা একটা ছেলের সাথে আমার বিয়ে ঠিক করেছে। আমি বিয়ে করবো না। তুমি প্লিজ কিছু করো।
আদ্রিয়ান ঠান্ডা গলায় বলে ,
___করে নে বিয়ে। ভালো হবে। ছেলে ভালো। খালামনি আমাকে বলেছেন। বিয়ের পর তোকেও ইংল্যান্ড নিয়ে যাবে।
__আদ্রিয়ান ভাই…
রাহির কণ্ঠটা অসহায় হয়ে ভেঙে পড়ে।
আদ্রিয়ান এবার আরও শক্ত গলায় বলে,
___মরিচিকার পেছনে ঘুরিস না রাহি। তোকে দেওয়ার মতো আমার কাছে কিছুই নেই। আমি একেবারে শূন্য।
তবুও রাহি হাল ছাড়ে না।
__আমার কিছু চাই না আদ্রিয়ান ভাই। কোনো অধিকার চাই না। কিচ্ছু চাই না। আমার শুধু তোমাকেই চাই। তোমার পায়ের নিচে কাটিয়ে দেবো সারা জীবন। কোনো অধিকারের, কোনো প্রতিশ্রুতির দরকার নেই আমার। আমি অন্য কাউকে আমার এই জীবনের সাথে জড়াতে পারবো না। তুমি প্লিজ আমাকে একটু দয়া করো।আমার আর কিছুই চাইনা তোমার কাছে।
আমি মাটিতে থাকবো,আমার কোন অধিকার চাইনা,আমি অন্য কাউকে বিয়ে করতে পারবোনা প্লিজ একটু বুঝো আমাকে।
___আদ্রিয়ান কিছু বলে না।নিঃশব্দে তাকিয়ে থাকে।
এইভাবে জীবন চলে না।
__এভাবেই যাবে। আমি চালিয়ে নেবো। আমি মানিয়ে নেবো নিজেকে। আমি কখনো সাফাপুর জায়গা চাইবো না তোমার কাছে। আমি শুধু একটু মর্যাদা চাইছি তোমার কাছে। আর কিছু না।এইটুকু দয়া করে আমাকে।
আদ্রিয়ান চুপ।
রাহি হঠাৎ করে ভয়ংকর শান্ত গলায় বলে,
__তুমি আমাকে বিয়ে না করলে আমি কাউকে বিয়ে করবো না। প্রয়োজনে আমি গ*লায় দ*ড়ি দেবো। তারপরও আমি কাউকে বিয়ে করবো না।
আদ্রিয়ান একটা দীর্ঘ শ্বাস নেয়।তারপর বলে,
___আমি দেখছি বিষয়টা। পরে কথা বলবো এ নিয়ে। যা, গিয়ে ঘুমিয়ে পড়।
এই কথায় রাহি একটু স্বস্তি পায়।আদ্রিয়ান ভাই যখন বলেছে সে দেখবে তার মানে সে দেখবে।কথার খেলাপ করে না সে।
রাহি কিছু বলে না,চোখ মুছতে মুছতে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে নেয়।
ঠিক তখনই আদ্রিয়ান বলে ওঠে,
__সাফা আমার জীবনের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ আর পবিত্র একটা অংশ। আমি এই জীবনে কখনো কোনোদিনও ওর জায়গা আর কাউকে দিতে পারবো না। আমার সাথে নিজেকে জড়িয়ে পরে পরে তোকে আফসোস করতে হবে। তখন আমাকে দোষ দিতে পারবি না।
রাহি কিছু বলে না।নিঃশব্দে চলে যায়।
সকাল থেকেই ইশায়ার বুকের ভেতর এক অদ্ভুত অস্থিরতা।
সময় যেন আজ ইচ্ছে করেই থমকে আছে,প্রতিটা সেকেন্ড তার কাছে দীর্ঘ অপেক্ষার শাস্তি হয়ে ধরা দিচ্ছে।
সকালে গড়িয়ে দুপুর পেরিয়ে এখন সন্ধা হওয়ার অপেক্ষায়।
আজ ইশায়া পরেছে আকাশি রঙের একখানা স্যালোয়ার কামিজ।রঙটা ঠিক তার মনের মতো নরম, শান্ত, অথচ ভেতরে জমে থাকা আবেগে টলমল।ইশায়ার মুখের দিকে তাকালেই চোখ আটকে যায়।
দুধে আলতা মেশানো গায়ের রঙ,চোখ দুটো বড় অপার্থিব মায়া জমে থাকে প্রতিটা দৃষ্টিতে।
ঘন কালো চোখের পাতার নীচে লুকিয়ে থাকে কষ্ট,আর ঠোঁট দুটো যেন সদ্য ফোঁটা গোলাপ,নরম, স্পর্শকাতর, কথা বললেই কাঁপে সামান্য।
ঠোঁটের পাশে ছোট্ট তিলটা তার সৌন্দর্যে এমন এক মোহ যোগ করেছে,যা দেখলে চোখ সরানো দায়।
রাণিয়া খুব যত্ন করে তার লম্বা, ঘন কালো চুল বেঁধে দিয়েছে।চুলগুলো এখন হাঁটু ছাড়িয়ে আরও নীচে নেমে গেছে,একটা কালো রেশমি নদীর মতো তার পিঠ বেয়ে নামছে।
ইশায়া আয়নার দিকে তাকিয়ে হালকা বিরক্তি নিয়ে বলে ওঠে,
__এই চুলগুলোর জন্যই আমি খুব বিরক্ত। চুল কাটতে চাই আমি।
রাণিয়া কথাটা শুনে যেন আঁতকে ওঠে।
ভয় মিশ্রিত গলায় তড়িঘড়ি বলে,
___কি বলছেন ম্যাম! বস শুনলে রক্ষে নেই। আপনার চুল বসের ভীষণ পছন্দের। বস নিজে বলেছেন আপনার চুলের আলাদা করে যত্ন নিতে। আগে তো আপনার চুল এত লম্বা ছিল না।
একটু থেমে আবার বলে,
___বস পৃথিবীর কোনো কিছুই বাকি রাখেননি আপনার জন্য। সবথেকে ভালো, সবথেকে এক্সপেন্সিভ সবকিছু এনেছেন। বস আপনার চুল ভীষণ ভালোবাসেন ম্যাম… আপনি চুল কাটলে বসের আমাদের গলা কাটতে সেকেন্ড লাগবে না।
___রাণিয়ার শেষ কথাটা শুনে ইশায়া চুপ করে যায়।
ভয়ের বদলে তার বুকের ভেতর অদ্ভুত এক উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ে।মনের ভেতর অজান্তেই আনন্দের ঢেউ উঠে।এই মানুষটা তার ছোট থেকে ছোট জিনিস পর্যন্ত খেয়াল রাখে।এতটা নজর, এতটা যত্ন ইশায়ার চোখ ভিজে ওঠে অজান্তেই।
নিচু স্বরে বলে,
___উনি আমার সবকিছুর খেয়াল রাখেন।
রাণিয়া হেসে বলে,
__তা আবার বলতে ম্যাম! এই যে দেখুন না, প্যালেসে দুইজন ডাক্তার বসিয়ে রেখেছেন। আপনার ছোট থেকে ছোট সবকিছুই বসের নজরে থাকে।
কথাগুলো শুনে ইশায়ার মন ভরে যায়।
তার যে আর কেউ নেই এই কষ্টটা সে ভুলে যেতে শুরু করে।এই একজন মানুষের এত যত্ন, এত ভালোবাসার আড়ালে তার নিঃসঙ্গতা ধীরে ধীরে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে।
এখন তার মস্তিষ্কজুড়ে শুধুই একজনের অস্তিত্ব।
আর সে অধীর আগ্রহে তার অপেক্ষায়।কিন্তু অপেক্ষার মাঝেই মনটা আবার ভারী হয়ে ওঠে।
কেন আসছেন না উনি?
ফোন দিতে ভয় পায় ইশায়া
এই মানুষটার কণ্ঠে যেভাবে কঠোরতা মিশে থাকে,
তাতে তার আত্মা পর্যন্ত কেঁপে ওঠে।
ঠিক তখনই মারিয়া এলেনা আসে নরম গলায় বলে,
___ম্যাম, আপনি কিছু খেয়ে নিন। সকাল থেকে আপনি কিছু খাননি। আপনার ওষুধ আছে ম্যাম!বস শুনলে খুব রাগ করবেন। প্লিজ খেয়ে নিন, আপনি এমনিতেই অসুস্থ।
ইশায়া ধীরে মাথা নাড়ায়।
___না… আমার এখন কিছুই ভালো লাগছে না।
তার চোখ দুটো বাইরে আটকে আছে।উনি আসছেন না কেন?কখন আসবেন?উনি কি খুব দূরে কোথাও গেছেন।ব্যবসায়িক কাজে?
মারিয়া এলেনা চুপ করে থাকে।
সে জানে কিছু প্রশ্নের উত্তর না দেওয়াই নিরাপদ।
কিন্তু ইশায়া কি থামার মানুষ,
সে আবার ও প্রশ্ন করে।
___আচ্ছা… উনি কি খেতে পছন্দ করেন?
তার কণ্ঠে ছিল কৌতূহলের মিশ্রণ।কিন্তু উত্তর আর শোনা হয় না ইশায়ার।
হঠাৎ করেই বাইরে থেকে ভেসে আসে এক অদ্ভুত গর্জন,আকাশ কাঁপানো শব্দ।
প্যালেসের চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে।
রানওয়ের আলো জ্বলে ওঠে দূরে,আকাশ চিরে নেমে আসে ভীরের প্রাইভেট জেট।
দানবের মতো সেটা ধীরে ধীরে মাটি ছোঁয়।
একটার পর একটা কালো এসইউভি ঢুকে পড়ে বিশাল লোহার গেট দিয়ে।
হা*তভর্তি অস্ত্র, চোখে নির্মম সতর্কতা।
ভীরের গার্ডস আর্মি এসে দাঁড়ায় প্যালেসের চারপাশে,
যেন পুরো জায়গাটা এক মুহূর্তে যু*দ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়।
ইশায়া আর কিছু বলে না।
শব্দটা শুনেই তার বুকের ভেতর কেমন করে ওঠে।
সে আচমকা ঘুরে দাঁড়িয়ে দ্রুত রুম থেকে বেরিয়ে যায়।
খালি পায়ে প্রায় দৌড়াতে দৌড়াতে সে নামতে থাকে সিঁড়ি বেয়ে।
ইশায়ার পিছু পিছু বেরিয়ে আসে মারিয়া এলেনা, রাণিয়া আর বাকি মহিলা গার্ডরা।
ইশায়াকে থামাকে তারা বলতে থাকে,
___ম্যাম! ম্যাম! দাঁড়ান!
মারিয়া এলেনা পিছন থেকে ডাকতে থাকে,আপনি পড়ে যাবেন!
কিন্তু ইশায়া শোনে না।
তার পা যেন নিজেই তাকে টেনে নিচে নামিয়ে আনে।
সে এসে পৌঁছায় ড্রয়িং রুমে ফ্রন্ট হলে।উঁচু ছাদ, বিশাল ঝাড়বাতি, দেয়ালে ঝুলছে র*ক্তাক্ত ইতিহাসের নিঃশব্দ সাক্ষী সব ছবি।সেখানে পৌঁছাতেই ইশায়ার পা থেমে যায়।সামনের দিক থেকে হেঁটে আসছে একজন।
___ভীর!
রাজভীর এই লোকটা তার স্বামী।তার একমাত্র আপন মানুষ।ইশায়া অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে।এই প্রথমবার মুগ্ধতার দৃষ্টিতে তাকায় তার দিকে। কালো শার্ট। কালো প্যান্ট। কালো ওভারকোট।আজ তাকে অন্যরকম লাগছে।দাড়ি কাটা ঘাড় ছোঁয়া চুলগুলোও পরিপাটি করে ছাঁটা। লোকটা ভয়ংকর সুন্দর।ভয়ংকর রকমের সুন্দর। ইশায়া খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে তাকে দেখে।
কিন্তু কেন যেন ইশায়ার তাকে বিজনেসম্যান মনে হচ্ছে না। তার চোখে, তার ভঙ্গিতে যেন সে একেবারে গ্যাংস্টার।একজন রাজত্ব করা শিকারি।
ইশায়াকে নিচে দেখে ভীর চোখ ছোট ছোট করে তাকায়।তার রুম থেকে বের হওয়া নিষেধ।
এত গার্ড থাকার পরেও সে নিচে এলো কীভাবে।
এই চিন্তাটাই মাথার ভেতর ঘুরছে।
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মারিয়া এলেনা, রাণিয়া আর বাকি গার্ডরা ভয়ে জমে যায়।
ভীরকে কী বলবে,
কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না।
___ভীর আবার তাকায় ইশায়ার দিকে।
তার ঠোঁটে হালকা একটা হাসি।সে তার জন্যই দাঁড়িয়ে ছিল।এক বছর হতে চলল সে এই ঠোঁটে হাসি কখনো দেখেনি।সবসময় বিষণ্ন, ঠান্ডা, পাথরের মতো ছিলো।
আজ তার হাসি তার সৌন্দর্যকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
ইশায়া খুশিতে ভীরের দিকে আরও এক ধাপ এগোতে নেয়।কিন্তু সামনে রাখা চেয়ারে পা লেগে যায় তার।
সে নিচে ঝুঁকে পড়তেই
ঝড়ের গতিতে ভীর এসে তাকে পাজা কোলে তুলে নেয়।
এক মুহূর্তও দেরি না।
ইশায়া ভয় পেয়ে তার গলা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে।
ভীর বড় বড় পা ফেলে হাঁটতে থাকে,সোজা তার রুমের দিকে।
নিকো দূরে দাঁড়িয়ে সবটা দেখে।তার চোখে একধরনের চিন্তার ছায়া।
___আর একপাশে এলিজা জ্বলতে থাকা চোখে তাকিয়ে দেখে ওদের চলে যাওয়া।
এলিজার ভেতরে চলতে থাকে তীব্র ক্রোধের আগুন।
ইশায়া ভীরের বুকে লেপ্টে যায়।মাথা এলিয়ে দেয় তার শক্ত বুকের ওপর।
সে শুনতে পায় ভীরের হার্টবিট।খুব জোরে বিট করছে।ইশায়া সেখানে নিজের হাত চেপে ধরে।
ভীর তাকায় ইশায়ার দিকে।
তার চোখ অস্বাভাবিকভাবে লাল।যেন রক্ত আর আগুন মিশে আছে সেখানে।
ইশায়া ও তাকিয়ে থাকে তার ঘোলাটে চোখের দিকে।
সে আমার বন্দিনী পর্ব ৬৭ (২)
ভীর দু’হাতে ইশায়াকে একটু উঁচু করে,তার অধরে শব্দ করে এক চুমু খায়।
ইশায়ার হাত ভীরের গলায় আরও শক্ত হয়ে আসে।চোখ বন্ধ করে নেয় সে।
কিন্তু ভীরের হাঁটার গতি থামে না।সে তাকে কোলে নিয়েই অদৃশ্য হয়ে যায় করিডরের গভীরে।
