সে আমার বন্দিনী পর্ব ৬৯
তানিয়া হুসাইন
ভীর ইশায়াকে কোলে নিয়েই রুমে ঢোকে।দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দটা পুরো ঘরটাকে আলাদা করে দেয় পৃথিবী থেকে।ভীর খুব ধীরে ইশায়াকে বিছানায় নামিয়ে দেয়।কিন্তু তার চোখের অস্থিরতা লুকোনো যায় না।
পরের মুহূর্তেই ভীর কয়েক কদম এগিয়ে গিয়ে দরজাটা লক করে দেয়।বন্ধ হওয়ার শব্দটা ইশায়ার কানে গিয়ে বাজে বু*লেটের মতো।
ভীরের এমন আচরণ দেখে ইশায়া ভয়ে গুটিয়ে যায়।
তার শরীর আপনাতেই সঙ্কুচিত হয়ে আসে।
তার মনে হচ্ছে এই লোকটাকে আসতে বলে হয়তো সে ভয়ংকর একটা ভুল করেছে।ভুল না অপরাধ করেছে।
ভীর ধীরে ঘুরে দাঁড়ায়।তার চোখে নেশা।কঠিন, গভীর, অন্ধকার নেশা।দীর্ঘদিন অপেক্ষা করেছে সে।
কতটা যন্ত্রণায় নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে,শুধু সে-ই জানে।
ভীর তার কালো ওভারকোট খুলে একপাশে ছুড়ে ফেলে।তার উপস্থিতিতেই ঘরের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে।ইশায়ার গলা শুকিয়ে আসছে, তারপর ভীরের হাত চলে যায় তার শার্টের বোতামে।একটার পর একটা খুলতে খুলতে বিরক্তিতে হঠাৎ একটান দেয় সব বোতাম ছিঁড়ে পড়ে মেঝেতে।
শব্দ হয় ইশায়ার বুকের ভেতর কেঁপে ওঠে।
ভীরের এই অধৈর্যতা দেখে ইশায়া ঢোক গিলে।
ইশায়া পিছিয়ে যায় বিছানার আরও সাইডে।ভীর যত এগোয় ইশায়া আরো পিছিয়ে যায়।পিঠ ঠেকে যায় ঠান্ডা হেডবোর্ডে।ভীর ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে।
ভীর যখন খুব কাছে এসে দাঁড়ায়,ইশায়া আমতা আমতা করে বলে ওঠে,
___দেখুন…
তার কণ্ঠ কাঁপছে।
চোখে অনিশ্চয়তা, ভয়,তবুও কোথাও লুকানো এক ফোঁটা টান।
ভীর তার দিকে ঝুঁকে পড়ে।তার নিঃশ্বাস ইশায়ার গালে লাগে।ঠান্ডা গলায়, কিন্তু ভেতরে আগুন নিয়ে সে বলে,
___দেখাও।
একটু থামে।তারপর খুব নিচু স্বরে যোগ করে বলে,
___দেখতেই তো এসেছি।
ইশায়ার বুক ধক করে ওঠে।
ভীরের চোখে কোনো তাড়াহুড়ো নেই,বরং একধরনের অধিকার,একধরনের ভয়ংকর ভালোবাসা তার ভালোবাসা কোমল না।তার ভালোবাসা ধারালো,অন্ধকার।এবং ভয়ংকরভাবে গভীর।
ভীরের লাগামছাড়া কথায় ইশায়ার কান গরম হয়ে ওঠে লজ্জায়। বুকের ভেতর অজানা শিহরণ ছুটে বেড়ায়, অথচ সে কিছু বলার আগেই এক সেকেন্ড ও ভাবার সময় না দিয়ে ভীর হিংস্র আবেশে ইশায়ার অধর জোড়া তার দখলে নিয়ে নেয়।
ইশায়া ছটফট করে ওঠে।ভীর দুহাতে তাকে শক্ত করে আগলে নেয়, পালানোর কোনো পথ নেই। ঠোঁটের চাপ আরও গভীর হয়।দাঁতের ঘর্ষণে ইশায়া ঠোঁটে নোনতা কিছু অনুভব করে। ইশায়া যত নড়ার চেষ্টা করছে ভীর তাকে তত আকড়ে ধরছে নিজের সাথে।
ভীর ইশায়ার ওষ্ঠ চেপে ধরেই তার গলা থেকে ওড়না টেনে নেয়,পাশে ছুড়ে ফেলে। ইশায়া অস্থির হয়ে ওঠে। সেই মুহূর্তে তার হাত গিয়ে লাগে ভীরের ব্যান্ডেজ করা হাতে।
ভীর ইশায়ার ঠোঁট কামড়ে ধরে হঠাৎই সরে আসে।
ভীর ছেড়ে দিতেই ইশায়া জোরে জোরে শ্বাস নিতে থাকে। উঠে বসে চোখ তুলে তাকাতেই তার নজরে পড়ে ভীরের হাতের ব্যান্ডেজ।
এক মুহূর্তের মধ্যেই ভুলে যায় সব ব্যস্ত হয়ে সে জিজ্ঞেস করে,
___আপনার হাতে কী হয়েছে?
ভীর কোনো উত্তর না দিয়ে ইশায়ার পেছনে হাত গলিয়ে তার জামার চেইন নামাতে নামাতে বলে,
__নাথিং।
পরমুহূর্তেই ভীর ইশায়াকে বিছানায় শুইয়ে দেয়। নিজে তার ওপর ঝুঁকে পড়ে। কাঁধ বেয়ে জামা নামাতেই
ইশায়ার কণ্ঠ কাঁপতে থাকে,
___আমার খুব ভয় করছে। এমন করবেন না, প্লিজ। আমাকে একটু স…
ভীর বিরক্ত স্বরে বলে ওঠে,
___হোয়াট দ্য…
প্রথমবার নাকি তোমার? ভয় পাচ্ছি মানে কী? হাজার ও বার ছুঁয়েছি তোমায়।
ভীরের কথায় ইশায়া ঢোক গিলে নেয়। আমার কিছু মনে নেই…
ভীর ইশায়ার আবেশে ডুবে যেতে যেতে নিচু স্বরে বলে,
___You don’t need to remember anything. Just feel me. Let this moment take over you… lose yourself in me.
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ভীর আরও হিংস্র হয়ে ওঠে। ইশায়ার চাপা চিৎকার তার কানে বাজে। দুজনের ভারী নিঃশ্বাসে ভরে ওঠে । অজান্তেই ইশায়া ভীরকে জড়িয়ে ধরে।চরম মুহূর্তে ভীর যখন ইশায়াকে উল্টে নিজের ওপর টেনে নেয়, তখনই ইশায়ার চোখ পড়ে ভীরের হাতের ব্যান্ডেজে জমে ওঠা রক্তে।
ইশায়া আঁতকে ওঠে,
___আপ… আপনার হাত থেকে ব্লিডিং হচ্ছে।
ভীর ভারী নিশ্বাস নিতে নিতে ইশায়ার কানে ফিসফিস করে,
___হুশশশ…
Just scream my name… nothing else. Only my name.
এরপর ভীর ধীরে ধীরে পুরোপুরি ইশায়ার মাঝে হারিয়ে যায়।এই প্রথমবার ইশায়াও নিজেকে নিজের ভেতর থেকে ছুড়ে ফেলে ভীরের সাথে জড়িয়ে নেয়।
ইশায়ার সাড়া পেয়ে ভীর আরও উন্মাদ হয়ে ওঠে।ভীরের উন্মাদনা সীমা হারায়
ইশায়া পিষ্ট হয় ভীরের নিচে। মিশে যায় একে অপরের অস্তিত্বে।
সময় গড়ায়,সন্ধা পেরিয়ে রাত হতে চললো।
ইশায়ার পিঠে হাত জড়িয়ে, গলায় মুখ গুঁজে ঘুমিয়ে আছে ভীর। নিঃশ্বাসের ওঠানামায় বোঝা যায় লোকটা গভীর ঘুমে।ইশায়ার চোখে ঘুম নেই। এই মানুষটার জন্য সে নড়তেও পারছে না। শরীর ব্যথায় অবশ, অথচ তার বুকে মাথা রেখে সে আরামে ঘুমিয়ে আছে,এই মানুষ্টা একান্তি তার এই ভাবনাটাই তাকে অদ্ভুত এক অনুভূতিতে ভরিয়ে দেয়।
ইশায়া আলতো করে ভীরের হাতের ট্যাটুতে আঙুল ছোয়ায়। ঘর্মাক্ত, বলিষ্ঠ শরীরটা দেখে সে আবেশিত হয়।মুগ্ধ চোখে ভীরকে দেখতে থাকে ইশায়া। তার হাত চলে যায় ভীরের চুলের ভাঁজে, কেন জানি লোকটা কাছে থাকায় তার ভেতরটা খুব খুশি খুশি লাগছে। পেটের ভেতর যেন প্রজাপতি উড়ছে। বুকের গভীরে আলাদা এক ধরনের শান্তি যেটা সে আগে কখনো অনুভব করেনি।
ভীরের চুলে হাত বোলাতে বোলাতেই ইশায়া খুব আলতো করে তার কানের লতিতে চুমু খায়। এমনভাবে, যাতে ভীরের ঘুম না ভাঙে।
কিন্তু পরমুহূর্তেই ভীর হঠাৎ করে ইশায়ার গলার নিচে কামড়ে ধরে।
আকস্মিক ব্যথায় কুঁকিয়ে উঠে ইশায়া।
চিৎকার করে ওঠে,
___আহহহহ!! আল্লাহ!
ছাড়ুন আমাকে, অসভ্য লোক!
বলতে বলতে ইশায়া ভীরের বুকে ধাক্কা দেয় সরে আসার জন্য।
ভীর ছাড়ে না,ঘুম-ঘুম কন্ঠে চোখ না খুলেই বলে,
___Don’t annoy me.If I wake up now, I won’t let you go.Crying or screaming won’t save you, So let me sleep.
এই কথা বলেই ভীর ইশায়ার গলায় নাক ঘষে আবার ঘুমিয়ে পড়ে।
ইশায়া আর কিছু বলে না।
সে জানে এই মানুষটা ঠিক কতটা বেপরোয়া, কতটা নিয়ন্ত্রণহীন।
ঘরের নীরবতায় শুধু ভীরের নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যায়।
____ইশায়া অনেকক্ষণ ধরে শুয়ে থাকে।চোখ বন্ধ করে, কিন্তু ঘুম আসে না।এভাবে শুয়ে থাকতেও তার ভীষণ অস্বস্তি লাগছে।উঠতে ইচ্ছে করছে, কিন্তু ভয়টা পায়ের কাছে শেকলের মতো বেঁধে রেখেছে তাকে।যদি উনি জেগে যান যে হুমকি দিয়েছে সেই কথাগুলো আবার মনে পড়ে যায়। অনেক চেষ্টা করে, খুব সাবধানে, নিঃশব্দে ইশায়া ভীরকে নিজের থেকে সরাতে সক্ষম হয়।শ্বাস আটকে রেখে, একফোঁটা শব্দ না করে উঠে পড়ে।
ওয়াশরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয়।লম্বা একটা শাওয়ার নেয় ।গরম পানির ধারা শরীর বেয়ে নামতে নামতে যেন মাথার ভেতরের অস্থিরতাটুকুও ধুয়ে নিয়ে যায়।ইশায়া বের হয় বাথরোব পরে।ভীর বেঘোরে ঘুমে,কতদিন পর যে একটু ঘুমিয়েছে।
ইশায়ার চুল থেকে ফোঁটা ফোঁটা পানি ঝরছে।আলমারি খুলে কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে।
কি মনে করে হঠাৎই একটা সুন্দর সাদা শাড়ি বের করে নেয়। মান্তা কটন সুতির মতোই আরামদায়ক, কিন্তু শরীরে পড়লে আলাদা একটা সৌন্দর্য এনে দেয়।
ইশায়া নিজে নিজেই সুন্দর করে শাড়িটা পরে নেয়।
খুব বেশি কিছু না তবুও কেন জানি আজ একটু সাজতে ইচ্ছে করল তার।হঠাৎ মনে হলো, আজ শাড়ি পরলেই ভালো লাগবে।
ভেজা চুল আলগা করে পিঠে ছেড়ে দেয়।মুখে হালকা একটা ভাব।চোখে অদ্ভুত এক শান্তি।
রেডি হয়ে একবার ঘুরে তাকায় ইশায়া ভীরের দিকে।
ভীর তখন ঘুমিয়ে আছে।
কোমর পর্যন্ত ব্ল্যাঙ্কেট জড়ানো, উপুড় হয়ে শুয়ে আছে সে।তার উন্মুক্ত পিঠ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
ইশায়ার ঠোঁটে অজান্তেই একটা ছোট্ট হাসি ফুটে ওঠে।
তার দিকেই তাকিয়ে থাকে কয়েক সেকেন্ড।
তারপর চুপচাপ ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।
___ভীর থাকার কারণে তখন মারিয়া এলেনা বা বাকি গার্ডদের কেউই সেখানে ছিল না।ইশায়া সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামে।
____এলিজা নিচেই ছিল।
সবকিছু পরিষ্কার করছিল সে।ইশায়াকে দেখে তার চোখ মুহূর্তেই চকচক করে ওঠে।
অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে মেয়েটার দিকে।
মুখের আদল দেখলেই বোঝা যায় সতেরো কি আঠারো, এর বেশি হবে না বয়স।
ছোট্ট এই মেয়েটার মুখে কী অদ্ভুত মায়া।
সাদা শাড়ি, হাঁটু ছোঁয়া ভেজা চুল,ঠোঁটের তিলটাই নজর কারে।
ঠোঁটের কাটা জায়গা ভেজা চুলে এলিজার দৃষ্টি গাঢ় হয়।
এলিজা মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকে।কিন্তু সেই মুগ্ধতা বেশিক্ষণ থাকে না।
এক মুহূর্তেই তার চোখের রং বদলে যায়।
ভীরের থেকে বদলা নিতে হলে এই মেয়েটাকেই তার হাতিয়ার বানাতে হবে।এলিজার মনে পড়ে
কী নৃশংসভাবে তার বোনকে মেরেছিল এই রাজভীর।
এই কারণেই নিজের জীবনের পরোয়া না করেই সে এসেছে এই জায়গায়।
হয় সে রাজভীরকে শেষ করবে,নয়তো নিজেই মরবে।
কিন্তু বোনের মৃত্যুর প্রতিশোধ সে নেবেই।যে করেই হোক।
সে আমার বন্দিনী পর্ব ৬৮
___ ইশায়া কিচেনে যায়।
কিচেন জুড়ে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে সবকিছু।
কিন্তু কী করবে, কীভাবে শুরু করবে কিছুই বুঝে উঠতে পারে না সে।
অচেনা সব কিছু তার কাছে।
