সে আমার বন্দিনী পর্ব ৭১ (২)
তানিয়া হুসাইন
আদ্রিয়ান ঘরের ভেতরের শ্বাসরুদ্ধ করা শব্দ, মানুষের কথা, বাস্তবতা সবকিছু পেছনে ফেলে সে সোজা গাড়িতে উঠে পড়ে।ইঞ্জিন স্টার্ট হয়।গাড়ি ছুটে চলে অন্ধকার রাস্তার বুক চিরে।
চলে আসে সাফার বাড়ির সামনে।এই বাড়ি। এই জায়গা।আজ এটা সম্পূর্ণ খালি।এখানে আর কেউ থাকেনা।কিন্তু এখানেই ছড়িয়ে আছে তাদের হাজার হাজার স্মৃতি।খুনসুটি, রাগ-অভিমান, ভালোবাসা।
এই বাড়ির সামন থেকেই প্রতিদিন সকালে আদ্রিয়ান সাফাকে পিক করতো একসাথে ভার্সিটিতে যেত।
হাসতে হাসতে, ঝগড়া করতে করতে।
সাফা রাগ করলে বাইক নিয়ে ঠিক এই জায়গাতেই এসে দাঁড়াত আদ্রিয়ান।আর সাফা আসতো ব্যালকনিতে।হাত ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে থাকতো, রাগী মুখে তাকিয়ে থাকতো নিচে।
আদ্রিয়ানের চোখ ঝাপসা হয়ে আসে।
সে বিড়বিড় করে বলে ওঠে,
___ওই যে… ওই দূরে সাফা।
ওইই দূরে…ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় আদ্রিয়ান।
এক পা… তারপর আরেক পা…হঠাৎ করেই তার হাঁটু ভেঙে যায়।সে বসে পড়ে রাস্তায়।চুপচাপ অনেকক্ষণ।
কিছু বলে না।যে আদ্রিয়ান এই জায়গায় এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তার সাফার সাথে কথা বলতো আজ তার মুখ থেকে একটা শব্দও বের হয় না।কাগজে-কলমে তাদের বিয়ে হয়নি।কিন্তু ধর্মীয় মতে তারা তো বিবাহিতই।
সম্পর্কের আট মাসের মাথায় হারাম সম্পর্কে লিপ্ত থাকবে না বলে সাফা যখন ব্রেকআপ করতে চেয়েছিল
সেই দিনই আদ্রিয়ান তাকে নিয়ে গিয়েছিল কাজি অফিসে।শরীয়ত মতে বিয়ে করেছিল লুকিয়ে।
এই বিষয়টা শুধু জানতো ইশায়া।পরিবারের সবাই জানলে কষ্ট পাবে বলে এই সত্য কখনোই সামনে আনেনি তারা।কারণ তাদের উদ্দেশ্য ছিল একটাই সবাইকে জানিয়ে পারিবারিকভাবে বিয়ে করবে।শুধু হারাম সম্পর্কে থাকবে না বলেই আগেভাগে বিয়ে করেছিল তারা।আদ্রিয়ান বসে থাকে।নড়াচড়া করে না।
কথা বলে না।তার চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে।
দ্রুত মুছে নেয় সে।পুরুষ মানুষের কাঁদতে নেই।
কাঁপা কণ্ঠে অস্ফুটে বলে ওঠে,
__ই…শায়া বুড়ি কেনো চলে গেলি এভাবে?একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস আটকে রেখে বলে
তুই থেকে যেতি তোর জায়গায় আমি চলে যেতাম।
তার গলা ভেঙে আসে।নিজেকে ধরে রাখতে পারে না আদ্রিয়ান।বুক ফাটা আর্তনাদ বেরিয়ে আসে তার মুখ থেকে।তার চিৎকার, তার আহাজারি, সবকিছু একাকার হয়ে যায়।
আদ্রিয়ান চিৎকার করে বলে,
__তোর আদ্র অন্য কারো হয়ে যাবে জান!
তুই আজকে আমাকে কোথায় এনে দাঁড় করালি?আমাকে কেনো একা রেখে চলে গেলি তুই?
আহহহহহহহহহ!
দু’হাতে ভেজা মাটি চেপে ধরে আদ্রিয়ান চিৎকার করতে থাকে,
___আমাদের কেনো একটা সংসার হলো না?চোখে অন্ধকার নেমে আসে তার।
তুই কেনো আমার হোলি না, সাফা?”
আদ্রিয়ানের আত্মচিৎকারে কেঁপে ওঠে চারপাশ।
বৃষ্টি আরও জোরে নামে।
সময় গড়ায়।বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে-মুছে যায় আদ্রিয়ানের কান্না।কিন্তু কষ্ট যায় না।সময় গড়ায় আদ্রিয়ান নিজেকে সামলায়।পুরুষ মানুষের কান্না করলে চলে না।তাকে সবকিছু সামলাতে হবে।বাবা-মাকে দেখতে হবে।শেষমেশ আদ্রিয়ান উঠে দাঁড়ায়। হাঁটে মসজিদের দিকে।নামাজ পড়ে।তারপর কবর জিয়ারত করে।
সবশেষে কোনো কথা না বলে কোনো দিকে না তাকিয়েঅজানা গন্তব্যের দিকে হাটা ধরে।
অফিসে যাওয়ার কোনো ইচ্ছেই নেই আজ তার।
বাড়িতেও ফিরবে না।চার দেয়ালের ভেতর দম বন্ধ হয়ে আসে।সাফার দেওয়া গিটারটা হাতে তুলে নেয় আদ্রিয়ান।কোথাও দূরে… খুব দূরে চলে যেতে ইচ্ছে করে।শহরের কোলাহল ছেড়ে, একটা নিরিবিলি নদীর পাড়ে এসে বসে পড়ে সে।নদীর পানি ধীরে বয়ে চলে।
ঠিক যেমন সময় বয়ে গেছেকিন্তু আদ্রিয়ানের জীবন থেমে আছে।গিটারটা কোলে নিয়ে আনমনে সুর তুলতে থাকে সে।অনেকদিন গিটার ছোঁয়া হয়নি।আগে তো প্রায় প্রতিদিনই বাজাতো।কারণ, সাফা খুব পছন্দ করতো তার গান।একটা গান শোনাও না।এই কথাটা কতবার যে শুনেছে। আজ বড্ড শুনতে ইচ্ছে করছে আবারো কথাটা।
গিটারটার তারে আঙুল ছোঁয়াতেইমনে হয়, সাফা ঠিক পাশেই বসে আছে।হাসছে চোখে সেই চেনা আলো।
কিন্তু বাস্তবটা নির্মম।সোনালী অতীতগুলো কিভাবে যে এমন করে ফসকে চলে গেল,আদ্রিয়ান বুঝতেই পারেনি।আজ তার জীবন পুরোপুরি রঙহীন।হাত বাড়ালেই শুধু শূন্যতা।হাত বাড়ালেই শুধু অন্ধকার।
তবুও আজ কেন যেন এই গিটারটা হাতে নিতে ইচ্ছে করলো তার।
আদ্রিয়ান আনমনেই সুর তুলতে থাকে,
তারপর গুন গুন করে গান গাইতে শুরু করে,
___ভালোবাসা কেনো এতো অসহায়…
বুকে প্রেম, মনে আশা নিভে যায়….
ভালোবাসা কেনো এতো অসহায়, বুকে প্রেম মনে আশা নিভে যায়….
এই পথে আজ আছি এক-ই সাথে,কারো যদি মাঝ পথে দূরে যেতে হয়, পিয়া রে পিয়া রে পিয়া রেএএ,কাদে মন কাদে এই হিয়া রে…
কিন্তু আর পারে না।গলা ভেঙে আসে।শব্দগুলো আটকে যায় বুকের গভীরে।চোখের কোণে জমে ওঠা জল আর ধরে রাখতে পারে না আদ্রিয়ান।গিটারটা পাশে রেখে সে শুয়ে পড়ে মাটির ওপর।আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে চুপচাপ।চোখ বন্ধ করতেই সাফার মুখটা ভেসে ওঠে। তাদের একসাথে কাটানো মুহূর্তগুলো,হাসি, খুনসুটি, ঝগড়া, আবার মিল।সব এক এক করে চোখের পাতায় ভেসে ওঠে আদ্রিয়ান লম্বা একটা নিঃশ্বাস নেয়, কিন্তু সেই নিঃশ্বাসে প্রাণ নেই।আছে শুধু একরাশ শূন্যতা।
এভাবেই সময় গড়িয়ে যেতে থাকে।একটা দিনের পর আরেকটা দিন নিরবচ্ছিন্ন গতিতে।এই সময়ের ফাঁকে ফাঁকে অজান্তেই ইশায়ার ভীরের প্রতি দুর্বলতা দিন দিন আরো বাড়তে থাকে।ভীর ছাড়া যেন তার এক মুহূর্তও চলে না এখন, ভীরের কাছাকাছি থাকতে চায় সবসময়।তার উপস্থিতি, তার কণ্ঠ, এমনকি তার নিঃশ্বাসের শব্দ সবকিছুতেই ইশায়া এক অদ্ভুত প্রশান্তি খুঁজে পায়।কিন্তু ভীরের জীবন তো সহজ নয়।আর পাচটা স্বাভাবিক মানুষের মতো তার জীবন নয়।
কাজের প্রয়োজনে তাকে প্রায়ই বাইরে থাকতে হয় দিনের পর দিন, কখনো রাতও কেটে যায় ফেরার নাম না করে।এই অনুপস্থিতিতেই জন্ম নেয় ইশায়ার অভিমান।অভিযোগের শেষ নেই তার।কেন সে বাইরে যাবে?কেন সে রাতে ফিরবে না? কেনো তাকে
সময় দেয়না,তাকে ভালোবাসে না।কি এমন কাজ, যে কাজের নাম সে বলতে পারে না?প্রশ্নের পর প্রশ্ন, অভিযোগের পর অভিযোগ, ইশায়ার কণ্ঠে কখনো রাগ, কখনো ভয়, কখনো নিঃশব্দ কান্না লুকিয়ে থাকে।ভীর সবকিছুই দেখে।সবকিছুই বোঝে।তবু সে কখনো উত্তেজিত হয় না।
ঠান্ডা মাথায়, ধীর, ধৈর্যের সঙ্গে সামলে নেয় ইশায়াকে।
কখনো ইশায়া চটে যায়,কখনো চিৎকার করে ওঠে,
কখনো রাগে মুখ ফিরিয়ে নেয়।অভিমান করে কথা বলে না।আবার ইশায়া নিজে থেকেই তার কাছে যাবে।নিজে থেকেই ভালোবাসার দাবি করবে।জোর করে সময় নিবে।ভীরের থেকে দূরে থাকা যেন তার জন্য অসম্ভব হয়ে উঠেছে।এতোটাই ডুবে গেছে সে তার মাঝে।
ভীর তখনও নির্লিপ্ত থাকে সবসময় এর মতো।
ইশায়ার ক্ষেত্রে তার আচরণ আগের থেকেও ঠান্ডা হয়ে এসেছে।ভীর তাকে ভালোবাসার এক অদৃশ্য চাঁদরে মুড়ে রাখে প্রতিটা সময় ইশায়াকে দিন দিন পাগল করে তুলেছে সে। ভীরের একটু ভালোবাসার উষ্ণতায় ইশায়া ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসে।ভুলে যায় সব, সব ভয়, রাগ অভিমান সব প্রশ্ন।তারপর আবারও সে ভীরের পিছু পিছু ঘুরতে শুরু করে।ঠিক যেন অন্ধকারের মাঝে ভীর তার জীবনের একমাত্র আলো যেটা হারাতে ভয় পায় সে।
ভীরের লোকদের ওপর হামলা হয় ওরা মূলত সীমানায় ঢুকতে চেয়েছিল,তার সাম্রাজ্যের ভেতরে পা রাখার দুঃসাহস দেখিয়েছে,কিন্তু পারেনি।শেষ সীমানা পেরোনোর আগেই থেমে গেছে ওদের অগ্রযাত্রা। তবু ক্ষতি হয়েছে।ভীরের অনেক লোক মারা গেছে,তাদের উদ্দেশ্য ছিলো খুব-ই নিখুত, সাম্রাজ্যের ভেতর ঢুকে চারদিকে ছড়িয়ে পড়া
নিজেদের রাজ্য বাঁচাতে গিয়ে প্রাণ গেছে তার বিশ্বস্ত সৈন্যদের।কিন্তু শত্রুরা পালাতে পারেনি।ধরা পড়েছে।আর ধরা পড়ার পর… মুখ খুলাতে সময় লাগেনি ভীরের, নির্মমভাবে মে*রেছে তাদেরকে।ওদের থেকেই বেরিয়ে আসে মাথার নাম।এখন সেগুলো নিয়েই চলছে গবেষণা ভীরের কাউন্সিলিং রুমে।
ডিয়েগো বলে,
ইতালীয়ান মাফিয়া ডন লরেঞ্জ ডি লুকা। সে-ই জড়িত একটার পর একটা হামলার পিছনে।ভীরের পিছনে লেগেছে সে।একা নয় তার সাথে আছে ভীরের পরাস্ত করা রাজ্যের লোকেরা, পুরোনো মাফিয়ারা।যাদের সাম্রাজ্য ভীর একসময় ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছিল।সবাই এক জোটে তার বিরুদ্ধে নেমেছে।
ভীর হাসে, ঠান্ডা হিমশীতল তার কন্ঠ,তার কাছে এগুলো কিছুই না।ভীর সোজা হয়ে বসে।
তার কণ্ঠ শক্ত, নিঃসন্দেহ একে একে সব শেষ করবো।
প্রত্যেকটাকে শেষ করবো।
ওদের অস্তিত্ব ধুলোয় মিশিয়ে দিব।রাজভীরকে টেক্কা দিতে এসেছে?
ভীর টেবিলে হাত রাখে, চোখে আগুন,
___প্রত্যেকটা চেকপোস্টে পাহারা বসাও।সন্দেহজনক কাউকে দেখলে সাথে সাথেই গু*লি করার নির্দেশ দাও।
এক মুহূর্ত থেমে সে আবার বলে, গলায় চাপা ক্রোধ
___ওদের লোক ভেতরে ঢুকেছে।আমাদের প্রত্যেকটা ইনফরমেশন ওরা কিভাবে পাচ্ছে?আমাদের প্রত্যেকটা মুভমেন্টের খবর ওদের কাছে যাচ্ছে তার মানে ভেতরের কেউই ওদেরকে খবর দিচ্ছে।
ঘরে চাপা ফিসফাস শুরু হওয়ার আগেই ভীরের গলা আরও কঠিন হয়,কে সে দ্রুত বের করো তাকে।
___টাকা খরচ করো।আরো গার্ড লাগাও।যত লোক প্রয়োজন হয় লাগাও।কিন্তু শত্রুর শেষ আমি দেখতে চাই।
ভীর ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে,
ওরা পেছন থেকেই আক্রমণ করবে সামনে আসবে না,
তাই আমাদেরকেই ওদেরকে খুঁজে বের করতে হবে।
আর সামনে থেকে আক্রমণ করতে হবে।এই যুদ্ধ থামবে না যতক্ষণ না শত্রুর শেষ নিঃশ্বাস মাটিতে মিশে যায়।
সান্তিয়াগো নত মস্তকে বলে,
__হয়ে যাবে বস।
আজ ইশায়ার মন ভীষন খারাপ।সকালে ঘুম থেকে উঠে ভীরকে পায়নি সে।ভীরকে ছাড়া তার খালি খালি লাগে।সারাদিন অপেক্ষা করেছে সে,এই লোকটার আসার।কিন্তু অপেক্ষা শুধু অপেক্ষাই রয়ে গেছে।যখন শুনেছে ভীর প্যালেসে ফিরেছে,
তবু তার কাছে আসেনি তখন ইশায়ার মন খারাপের পাল্লা আরও ভারী হয়।অভিমানটা বুকের ভেতর জমে আছে, অনেকক্ষণ রাগ করে থাকার পরও
যখন ভীর আসলো না ইশায়া আর স্থির থাকতে পারে না।সে আরও বেশি ছটফট করতে শুরু করে।
এই মানুষটাকে ছাড়া সে থাকতে পারে না বেশি সময়।দম বন্ধ হয়ে আসে তার।ঘরের চার দেয়াল যেন তাকে আটকে ফেলছে।আর থাকতে না পেরে নিচে চলে যায় ইশায়া।
আজ সে গাঢ় কমলা রঙের শাড়ি পড়েছে।এই রঙ ভীরের পছন্দ সে জানে।আর এই রঙের জামার অভাবও নেই তার আলমারিতে।আজ সে শাড়িটাই পড়েছে।চুলগুলো খোপা করে বাঁধা।মুখে কোনো প্রসাধনী নেই।সে এমনিতেই অনন্যা।তার থেকে চোখ সরানো যায় না।মেয়েরাও চোখ দিয়ে গিলে খায় তাকে এমন সৌন্দর্য তার।খাওয়া-দাওয়া ঘুম ঠিক থাকায় আগের থেকেও আরও সুন্দর হয়ে উঠেছে সে, শরীরটাও আগে থেকে একটু ভালো হয়েছে।
একটু ওয়েট গেইন করেছে আর সেটাই তাকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
ইশায়া দেখে সবাই ব্যস্ত, গার্ডরা দ্রুত চলাফেরা করছে। ইশায়ার পিছন পিছন মারিয়া এলেনা আর রানিয়াও আসে।ইশায়া সামনে তাকিয়ে দেখে
এলিজা কিচেনে।সে সেদিকেই যায়।এলিজার মাথার ভেতর অন্য হিসাব চলছে।তার উদ্দেশ্য একটাই কফি বানিয়ে যদি কোনোভাবে কাউন্সিলিং রুমে ঢোকা যায়,তাহলে আজকের মিটিং থেকে কিছু ইনফরমেশন পাওয়া যাবে।ভীরের নেক্সট টার্গেটের খবর সে আগেই পৌঁছে দিয়েছে ডন লুকাকে।আজকে ঠিক কী হয়েছে সে জানে না।সেটাই তাকে জানতে হবে যে করেই হোক।
এর মাঝেই ইশায়া কিচেনে ঢোকে।ইশায়াকে রান্নাঘরে যেতে দেখে রানিয়া তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে বলে,
__ম্যাম, আপনি এখানে এসেছেন কেনো?
আপনার কিছুর প্রয়োজন হলে আমাকে বলতেন।
আমি আপনাকে এনে দিতাম।আপনি প্লিজ আপনার রুমে যান। আমাকে বলুন আপনার কি লাগবে আমি এনে দিচ্ছি রুমে।
রানিয়ার এই কথাটাই আগুনে ঘি ঢেলে দেয়, এমনিতেই ভীরের জন্য ইশায়ার মেজাজ খারাপ।
অভিমান, শূন্যতা, অপেক্ষা সব একসাথে মাথায় চেপে বসে আছে।
এর মাঝে এদের সব কাজে এসে বাগড়া দেওয়ায় ইশায়া রেগে যায়।
ইশায়া চেঁচিয়ে ওঠে,
___তোমরা যাও তো এখান থেকে।আমার যেখানে ইচ্ছা আমি সেখানে যাব।তোমরা এখান থেকে সরে যাও।
সব সময় আমার পিছু পিছু থাকবে না।
কিচেনের ভেতর মুহূর্তের জন্য নীরবতা নেমে আসে।
ইশায়ার হঠাৎ এমন রাগ দেখে।কারণ স্বভাবতই ইশায়া খুবই ঠান্ডা প্রকৃতির মানুষ।
মারিয়া এলেনা তাড়াতাড়ি রানিয়াকে সরিয়ে আনে।
ফিসফিস করে বলে,
__ম্যামকে উত্তেজিত করিস না।ওই ডাক্তার বলেছিলো,
ম্যামকে তিন-চার মাসের মধ্যে আবার ইনজেকশন দিতে হবে।আজকে পুরো তিন মাস হয়েছে।আজকে ইনজেকশন দেওয়ার কথা।একটু থেমে, আরও নিচু গলায় বলে,বস আসলে দেওয়া হবে।এখন এরকম কোনো কথা বলিস না যাতে হিতে বিপরীত হয়।
ম্যামকে ম্যামের মতো থাকতে দে।
রানিয়া মাথা নেড়ে চুপ করে যায়।
এদিকে এলিজা ইশায়ার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে,
__ম্যাম, আপনার কিছু লাগবে?
ইশায়া মাথা নেড়ে না বোঝায়।
এলিজা নরম গলায় বলে,
__ম্যাম, আপনার মন খারাপ বসের জন্য।আপনার কাছে যাননি বলে।
ইশায়ার মুখটা আরও ছোট হয়ে আসে।
চোখের কোণে জমে থাকা অভিমান লুকানো যায় না।
এই সুযোগটাই এলিজা খুঁজছিল।মুহূর্তের মধ্যেই তার মাথায় একটা শয়তানি বুদ্ধি এটে যায়।নিজের কাজ হাসিল করতে
সে ইশায়ার দিকে তাকিয়ে বলে,
___চলুন ম্যাম,বসের মিটিং চলছে।ওদের জন্য কফি বানিয়েছি।
একটু থেমে, খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলে,
__তাদের কফি দিবো,
আর আপনারও বসের সাথে দেখা হয়ে যাবে।
এলিজার কথা শুনে ইশায়া খুশি হয়ে যায়।
কিন্তু ঠিক পরমুহূর্তেই
তার মুখটা অন্ধকার হয়ে ওঠে।
ইশায়ার মুখটা ভার হয়ে আছে দেখে এলিজা নরম গলায় জিজ্ঞেস করে,
___কি হয়েছে ম্যাম?
ইশায়া চোখ নামিয়ে বলে,
___না, বাদ দাও।উনি রেগে যাবেন।
এলিজা কণ্ঠে কৃত্রিম আন্তরিকতা ঢেলে বলে,
___না ম্যাম, বস রাগ করবেন কেনো?উল্টো খুশি হবে।সে একের পর এক কথা বলে ইশায়াকে বোঝানোর চেষ্টা করে।
বস ব্যস্ত, তার মাথায় হাজারটা চাপ,আর ঠিক এই সময় আপনার উপস্থিতিই তাকে শান্ত করবে।
ইশায়াকে অনেক কিছু বোঝায় এলিজা।
কারণ এই মুহূর্তে
ওই জায়গায় পৌঁছানোর একমাত্র হাতিয়ার
ইশায়াই।
একসময় ইশায়া বলে,
__ঠিক আছে, চলো।
এই কথাটাই এলিজার ভেতরে বিজয়ের হাসি এনে দেয়,যদিও বাইরে সে সেটা লুকিয়ে রাখে।তারপর ইশায়া এলিজার সাথে সাথে যায়।
কিন্তু কাউন্সিলিং রুমের ঠিক আগেই গার্ডরা তাদের আটকে দেয়।
কায়রা ইশায়াকে দেখে সঙ্গে সঙ্গে সম্মান জানায়।
তার ভঙ্গি বদলে যায়, মাথা নিচু,তারপর এলিজার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলে,
___তুমি এখানে এসেছ কেন?
এলিজা মাথা নিচু করে উত্তর দেয়,
__ম্যামের সাথে এসেছি।আর সবার জন্য কফি এনেছি।
কায়রার চোখ সরু হয়ে আসে।গলা আরও কঠিন তুমি তো দেখছি আগ বাড়িয়ে অনেক কাজ করো।
তোমাকে কি কেউ কফির জন্য বলেছে?
তোমাকে আগে একদিন আমি বলিনি,এই রুমের ধারে কাছেও আসতে।
এই কথায় এলিজার বুক কেঁপে ওঠে।ধরা পড়ে যাওয়ার ভয় চোখেমুখে স্পষ্ট।দুঃখী গলায় সে বলে,
___আমাকে ক্ষমা করবেন।
ম্যাম বলেছেন তাই আমি এসেছি।
সব দোষ ইশায়ার ওপর চাপিয়ে দিলেও।ইশায়া কিছুই বুঝেনি।উল্টো দৃঢ় কণ্ঠে বলে,
__ও আমার সাথে এসেছে।
কোনো সমস্যা?
কায়রা তৎক্ষণাৎ গলা নামিয়ে আনে,
___জ্বি না, ম্যাম।কিন্তু এই জায়গায় আসার কারোর অনুমতি নেই।বসের নিষেধ আছে।
এই কথাটাই ইশায়ার ভেতরের জেদটা বাড়িয়ে দেয়।সে শক্ত গলায় বলে,
___আমি যাবো।
আমার ক্ষেত্রে কোনো নিয়ম নেই।এই কথা বলেই ইশায়া সামনে এগোতে নেয়।
কায়রা আবার বাধা দিতে চায়, কিন্তু ইশায়া শোনে না।
আর কায়রার আর সাহস হয় না কিছু বলার।
সে খুব ভালো করেই জানে
বস রেগে গেলে কী হবে।
ইশায়ার পিছু পিছু এলিজা এগোতে চাইলেকায়রা তার সামনে এসে দাঁড়ায়।কঠোর গলায় বলে,
___এই, তুমি যাও এখান থেকে।
এলিজা আমতা আমতা করে বলে,
__ম্যাম… আর কফি,
কায়রা সঙ্গে সঙ্গে তাকে থামিয়ে দেয়,
___এখানে রাখো।
তারপর আবারো বলে এই মুহূর্তে তুমি এই জায়গা থেকে যাও।
এলিজার আর কিছু করার থাকে না।রাগে কাপতে কাপতে সে এই স্থান ত্যাগ করে।কিন্তু তার চোখে আগুন জ্বলছে।মনে মনে সে শপথ করে নেয়
এই ভীরের আগে সে এই দাসীকে শেষ করবে।
___ইশায়া রুমের কাছাকাছি আসতেই আরও কয়েকজন গার্ডের সম্মুখীন হয়।
কালো পোশাক, ঠান্ডা চোখ, হাতে অ*স্ত্র।ইশায়াকে দেখে একটা দেয়ালের মতো দাঁড়িয়ে যায় তারা।
হাতে অ*স্ত্র দেখে ভয় পায় ইশায়া।
তবুও ইশায়া সাহস করে ভেতরে যেতে চায়। কিন্তু ইশায়া ভেতরে যেতে চাইলেগার্ডেরা তাকে আটকে ফেলে।
কারণ এটাই তাদের নিয়ম এই রুমে যারা যায়,
তাদের বাইরে আর কারোর ঢোকার অনুমতি নেই।
এটা বসের স্পষ্ট নিষেধ।
কিন্তু ইশায়া নাছোড়বান্দা।
সে একবার নয়, বারবার একই কথা বলে, জোর করে এগোতে যায়।
কিন্তু গার্ডরা তাকে আটকায়,
বাইরে এই শব্দে ভেতরের মিটিংয়ে ব্যাঘাত ঘটায়।
ভীরের চোখে-মুখে ভাঁজ পড়ে বিরক্ত হয় সে।
রুমের ভেতরের সবাই থেমে যায়,একসাথে সবাই ঘুরে দরজার দিকে তাকায়,আওয়াজটা কেন আসছে?
ঠিক তখনই নিকো উঠে যায়।দরজার কাছে গিয়ে সে দেখে,
ইশায়া ভেতরে ঢোকার জন্য চিৎকার করছে,
আর গার্ডরা তাকে বার বার নিষেধ করছে।
এই দৃশ্যটা নিকোর চোখে পড়তেই সে সঙ্গে সঙ্গে গার্ডদের উদ্দেশ্যে বলে,
___গার্ডস, স্টপ।
তারপর ভেতরের দিকে তাকিয়ে,
ভীরকে উদ্দেশ্য করে বলে,
__ব্রো… ইশায়া।
এই মুহূর্তে ইশায়ার নাম শুনে ভীর অবাক হয়ে যায়।সে চেয়ার থেকে উঠে আসে।
দরজার দিকে এগিয়ে যায়।
ভীরকে দেখতেই ইশায়া দৌড়ে এসে তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে।এটার জন্য ভীর প্রস্তুত ছিল না।সে এক মুহূর্তে স্থির হয়ে যায়।ইশায়া এখানে কেন?কে তাকে এখানে নিয়ে এসেছে।এই জায়গায় তো তার আসার কথা না।
ইশায়া ভীরকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে।
তার কণ্ঠ কাঁপছে,
___আমি মিস ইউউ…আই মিস ইউ সো মাচ।
আপনাকে আমি অনেক মিস করছিলাম।
আপনি আমাকে না বলে কেন চলে গেলেন?
আমি কত ফোন দিয়েছি আপনাকে…
আপনি ফোনও ধরেনননি।
___ভীর কোনো উত্তর দেয় না।একটা শব্দও না।সে শুধু চোখের ইশারায় চারপাশে থাকা সবাইকে এখান থেকে চলে যেতে বলে।ভীরের ওই এক ঝলক দৃষ্টি
আদেশের মতো কাজ করে।একজন একজন করে
সবাই রুম থেকে বেরিয়ে যায়।কাউন্সিলিং রুমটা ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে আসে।
সবার শেষে নিকোও বেরিয়ে যায়। দরজা বন্ধ হয়।
আর সেই বন্ধ দরজার ভেতরে থেকে যায় শুধু মাফিয়া বস আর তার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।
____এলিজা রাগে ফেটে পড়ছে।তার এত সুন্দর প্ল্যানটা নষ্ট করে দিয়েছে ওই কায়রা।এই মেয়েকে সে ছাড়বে না।এলিজা চুপচাপ কিছুক্ষন বসে থাকে তারপর তার হঠাৎ মনে হয়, ভীরের রুম এখন পুরো খালি।
ভীর নেই,ইশায়াও রুমে নেই এটাই সুযোগ তার কাছে।
এলিজা ভাবে সে কি করবে।
চুপচাপ ওয়াশরুমে গিয়ে বুকের ভাজ থেকে এই প্যালেসের ম্যাপটা বের করে।
চারদিক সিসিটিভিতে নিয়ন্ত্রিত।এই ক্যামেরাগুলো সাধারণ কোনো সিস্টেম না। এগুলো সরাসরি প্যালেসের সিকিউরিটি কন্ট্রোল রুম আর ভীরের পার্সোনাল মনিটরে ফিড দেয়।এক সেকেন্ডের ব্ল্যাঙ্ক স্ক্রিন মানেই সন্দেহ,সবাই সতর্ক হয়ে যাবে। এরপর এই প্যালেসে সে ধরা পড়বে নিশ্চিত। আর ধরা পরা মানেই মৃ*ত্যু।এলিজা এটা জানে।সে জানে ক্যামেরা ভাঙা যাবে না। ওয়্যার ও কাটা যাবে না। হঠাৎ বন্ধ করলে অ্যালার্ম বেজে উঠবে।তাই তাকে অন্যকিছু করতে হবে।
এলিজা বেরিয়ে আসে।
___মারিয়া এলেনা তখন ইশায়ার রুমে ঢোকে, তার হাতে ট্রে ভর্তি ওষুধ।
সব লেবেল করা সময়, ডোজ, নাম। ইনজেকশন, ট্যাবলেট, স্লি*পিং মেডিসিন সবকিছু নিখুঁতভাবে সাজানো।মারিয়া এলেনা খুব সাবধানী। সে জানে এখানে তিল পরিমান কোন ভুল করা যাবে না।ইনজেকশন আজকেই দিতে হবে।ওষুধ রেখে সে বেরিয়ে যায়।
দরজা বন্ধ হতেই করিডরটা আবার নিঃশব্দ হয়ে যায়।
ঠিক তখনই এলিজা বেরিয়ে আসে।সে অপেক্ষা করছিল এই মুহূর্তটার জন্য।
এলিজা হেঁটে আসে ধীরে।
হাঁটার ভঙ্গি একদম সাধারণ।হাতে প্লেট,
ক্যামেরার নিচ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় সে মাথা একটু নিচু করে এমনভাবে, যাতে মুখ পুরো ফ্রেমে না আসে।করিডরের এক কোণে ছোট্ট একটা মেটাল প্যানেল।সাধারণ কেউ দেখলে ভাববে ইলেকট্রিক লাইন।কিন্তু এলিজা জানে, এই প্যানেলের ভেতরেই আছে লোকাল ক্যামেরা লুপ কন্ট্রোল।সে প্যানেল খুলে না।খুললে ধরা পড়বে।সে শুধু আঙুল দিয়ে ভেতরের সেন্সর প্লেটটায় চাপ দেয়
একটা নির্দিষ্ট কোণে,
তিন সেকেন্ড এর মধ্যেই সে সরে আসে।এই সিস্টেমে ক্যামেরা অফ হয় না।
ক্যামেরা লুপে চলে যায়।
মানে আগের পাঁচ মিনিটের ফুটেজ আবার চলতে থাকে।
স্ক্রিনে মনে হবে, সব স্বাভাবিক।গার্ড দাঁড়িয়ে আছে, করিডর ফাঁকা।
কিন্তু বাস্তবে ক্যামেরা এখন বন্ধ।সময় আছে বড়জোর দুই মিনিট।এর বেশি না।
এলিজা এক সেকেন্ডও নষ্ট করে না।এলিজা ভীরের রুমে ঢোকে,
ওষুধ এর ট্রের দিকে এগোয়।প্রতিটা বোতল এক নজরে দেখে নেয়।ঔষধের বোতল খুলে ঔষধ বের করে তার আনা ঔষধ ভেতরে ঢুকিয়ে রাখে।
ভিটামিন, ক্যালসিয়াম, নিউট্রিশন সাপ্লিমেন্ট।
সে আমার বন্দিনী পর্ব ৭১
আর তারপর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস ইনজেকশনের ছোট সিসিটা বদলে দেয় এলিজা।তার ঠোঁটে ক্ষীণ হাসি ফুটে ওঠে।সে জানে এবার কি হবে।তিন/চার মাসের মাথায় নতুন ইনজেকশন না দিলে ইশায়া ধীরে ধীরে তার আগের অবস্থায় ফিরে আসবে।সবকিছু ঠিক জায়গায় রেখে,ট্রেটা আগের মতো সাজিয়ে,এলিজা দ্রুত বের হয়।
পেছনে ফিরে যায় প্যানেলের কাছে এসে আবার সেই সেন্সর প্লেটে চাপ দেয়।এক সেকেন্ড ক্যামেরা লাইভ হয়ে যায়।কন্ট্রোল রুমে কেউ টের পায় না।স্ক্রিনে কোনো ব্ল্যাকআউট নেই।কোনো অ্যালার্ম নেই।সবকিছু একেবারে স্বাভাবিক।এলিজা করিডর দিয়ে হেঁটে চলে যায়।আর পেছনে রয়ে যায় এক নিঃশব্দ বিপর্যয়।
আর খুব শিগগিরই এই নিঃশব্দ কাজটাই
ভীরের সাম্রাজ্যে আগুন লাগাবে।
