সে আমার বন্দিনী পর্ব ৭৩
তানিয়া হুসাইন
ইশায়া এলিজার সঙ্গে কথা বলে ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে আসে।
রুমে ঢুকেই বিছানায় শুয়ে পড়ে।হঠাৎ করেই কেন জানি শরীরটা অস্বাভাবিক দুর্বল লাগতে থাকে তার।
ভীরের সঙ্গে রাগ করে সারাটাদিন কথা বলেনি সে, এই অভিমানটা এখনো বুকের ভেতর জমে আছে।
তবু সকাল থেকে লোকটাকে না দেখার অস্থিরতা ইশায়ার ভেতরটা ছটফট করে তুলছে।
রাগ আছে, অভিমান আছে কিন্তু তার চেয়েও বেশি আছে এক অদ্ভুত টান।ভীর কাছে না থাকায় আরো খারাপ লাগছে তার।
শুয়ে থাকতে থাকতে, একসময় ঘুমিয়ে পড়ে ইশায়া।
ঘুমের মাঝেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে কিছু অস্পষ্ট দৃশ্য,ছুটোছুটি…হাসি…ঘুরে বেড়ানো…স্কুল ছুটির পর রাস্তায় হাটা…মেঘে ভেজা বিকেল…ফুচকা খাওয়া।
সবকিছু যেন খুব পরিচিত, অথচ দূরে।মাথায় তেল দেওয়া,বিড়াল,পাখির সাথে কথা বলা আর হঠাৎ করেইদেখে একটা মেয়ের শরীর কোলে মেয়েটার সারা মুখ, মাথা র*ক্তে মাখামাখি।
চুলে, কপালে, গালে শুধু রক্ত আর রক্ত।ভয় আর ধাক্কায় ইশায়া ঘুমের মধ্যেই উঠে বসে।
এটা কী দেখেছে সেহৃদস্পন্দনঅস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়।সে-ই তো ছিল।কিন্তু কোথায় ছিল?কী দেখছিল?এরা কারা, ইশায়া চোখ বন্ধ করে স্পষ্ট করে মনে করার চেষ্টা করে।মাথার ভেতর যেন কুয়াশা জমে আছে।কিছু ধরতে গেলেই হাত ফসকে যায়।
ঠিক সেই সময় দরজার শব্দ হয়।মারিয়া এলেনা রুমে ঢুকে পড়ে।ইশায়াকে উঠে বসে থাকতে দেখে সে বলে ওঠে,
___ম্যাম, আপনি উঠেছেন! আমি বার বার এসে দেখছি আপনি ঘুমাচ্ছেন, তাই ডাকিনি।
উঠুন ম্যাম, আপনাকে তৈরি হতে হবে।
ইশায়া অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,
___কেনো?
মারিয়া এলেনা হালকা হাসি নিয়ে বলে,
___বস বলেছেন, ম্যাম। আপনাকে রেডি করে দিতে।
আজকে আপনাকে বাইরে ডিনারে নিয়ে যাবেন।
এই বলে সে সামনে একটা ব্যাগ এগিয়ে দেয়।
এটা আপনার জন্য বস পাঠিয়েছেন।
মারিয়া এলেনার কথাগুলো শুনতেই ইশায়ার চোখে-মুখে খুশির আলো ফুটে ওঠে।
একটু আগের দুঃস্বপ্ন, রাতের অভিমান,এলিজার বলা কথাগুলো।সবকিছু মুহূর্তের মধ্যেই হারিয়ে যায়।
খুশিতে সে একেবারে আত্মহারা হয়ে ওঠে ।
ইশায়া ব্যাগটা নিয়ে খুলে দেখে।ভেতরে লাল রঙের শাড়ি।ফুল স্লিভ ব্লাউজ।আর সঙ্গে ঝলমলে ডায়মন্ডের নেকলেস।এসব দেখে ইশায়ার চোখ বড় বড় হয়ে যায়।খুশি হয় সে ভীরের থেকে গিফট পেয়ে।
___মারিয়া এলেনা আর আরেকজন মহিলা গার্ড মিলে ইশায়াকে রেডি করিয়ে দেয়।প্রথমেই মেইকআপের কাজ শুরু করে। ইশায়ার মুখে হালকা ফাউন্ডেশন দেয়,
চোখের নিচ গাঢ় কাজল, আইলাইনার টান দেওয়া,
হালকা ব্রোঞ্জ শেড,ঠোঁটে ডিপ নিউড রেড লিপস্টিক।
ইশায়ার কালো, ঘন চুলগুলো দুইজন মিলে ধীরে ধীরে কার্ল করে। ঢেউ খেলানো কার্লগুলো কোমর ছুঁয়ে নিচে নেমে আসে।
মারিয়া এলেনা নিজের হাতে ইশায়াকে শাড়ি পরিয়ে দেয়।লাল রঙের শাড়িটা তার শরীরের সঙ্গে সুন্দর ভাবে জড়িয়ে যায়।গলায় ডায়মন্ডের হার,কানে মিলিয়ে দুল।হাতে সোনার মোটা চুড়ি।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ইশায়াকে দেখে এক মুহূর্ত থমকে যায় সবাই।তার চোখে আছে গভীরতা,
চেহারায় আছে রাজকীয় ঔজ্জ্বল্য।
ইশায়া পুরোপুরি রেডি হওয়ার পর মারিয়া এলেনা বলে,
__চলুন ম্যাম, নিচে গাড়ি অপেক্ষা করছে।
ইশায়া এলিজাকে সঙ্গে নিতে চাইলে এলিজা খুব সুন্দর করে একটা অযুহাত দেয়,
__না ম্যাম, আপনার আর বসের প্রাইভেট সময়।
আপনি এনজয় করেন।এলিজার কথায় ইশায়ার গাল লাল হয়ে ওঠে।সে লজ্জা পায়।
কিন্তু এলিজার এই কথার পেছনে ছিলো অন্য উদ্দেশ্য।
নিক, ডিয়েগো এই মুহূর্তে কেউ প্যালেসে নেই।
ভীর বাইরে, ইশায়াও বাইরে যাবে।এটাই সুযোগ।
যে করেই হোক তাকে আয়ুষকে ম্যাপটা দিতে হবে।
আর যে সব ইনফরমেশন সে কালেক্ট করেছে সব।
কিন্তু সুযোগ বের করতে পারছে না।কারণ প্যালেসের সুরক্ষা আগের চেয়ে অনেক বেশি বেড়ে গেছে।
সেদিনের সেই হামলার পর এখানে এখন সবাই আরও সতর্ক হয়ে গেছে।
ইশায়া গাড়ির কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। ইশায়ার চোখ শুধু ভীরকেই খুঁজে বেড়ায়।চারপাশে তাকায়।কিন্তু সে নেই কোথাও নেই।হালকা হতাশা নিয়ে ইশায়া চুপচাপ গাড়িতে বসে পড়ে।
কিছু বলে না।শুধু জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকে।
গাড়ি ধীরে ধীরে চলতে শুরু করে তার গন্তব্যের উদ্দেশ্য। আর ইশায়া জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে।
___গুয়াদালাহারার সবচেয়ে বড়, দামি আর সবচেয়ে অভিজাত রেস্টুরেন্টটা আজ অন্যরুপে সেজছে।ভীর এই রেস্টুরেন্টেই ইশায়ার জন্য ডেট প্ল্যান করেছে।
রেস্টুরেন্টের নাম আলকাল্দে।ভীর আগে থেকেই পুরো এলাকা নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়।
আলকাল্দে রেস্টুরেন্টের চারপাশের বিশাল এলাকা ঘিরে ফেলা হয়।আমেরিকাস অ্যাভিনিউ, পাবলো নেরুদা সড়ক,তেরানোভা এলাকা, প্রোভিদেন্সিয়া আবাসিক অঞ্চল,কোলোমোস পার্কের আশেপাশের সব রাস্তাএই সব জায়গা পর্যন্ত ভীরের লোকেরা ছড়িয়ে পড়ে।কালো গাড়ি, কালো স্যুট, রাস্তায় রাস্তায় ব্যারিকেড বসানো।
যে গাড়ি আসে, তাকে ঘুরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
এই মুহূর্তে এই বিশাল এলাকার আশেপাশেও কেউ যেতে পারবে না। ছাদের ওপর লোক। প্রবেশপথে অ*স্ত্রধারী গার্ড।ভেতরে ছদ্মবেশে বডিগার্ড।
রেস্টুরেন্ট এর চারপাশ ফুল দিয়ে ডেকোরেট করা।গাঢ় লাল গোলাপ, সাদা ফুল, কালচে বেগুনি অর্কিড সবকিছু সুন্দরভাবে সাজানো।
টেবিলের ওপর মোমবাতির হালকা আলো।আলো আর অন্ধকারের মাঝখানে একটা নরম, গভীর আবহ।
মাঝখানে বড় একটা সুইমিং পুল।পানির ওপর ফুল ভাসছে।পুরোটা লাল গোলাপের পাপড়িতে ঢাকা,
পুলের চারপাশে আলো এমনভাবে পড়ছে, পানির ঢেউয়ে আলো কেঁপে কেঁপে উঠছে।
চারদিকে গান বাজছে।একপাশে কয়েকজন লোক বসে আছে বাদ্যযন্ত্র নিয়ে, লাইভ মিউজিক। সুরগুলো ধীর, গভীর, বুকের ভেতর ঢুকে যাওয়ার মতো।
ইশায়ার গাড়ি এসে থামে। গাড়ি থেকে নামার আগে ইশায়া চারপাশে তাকায়।এতো বড় জায়গা।এতো লোক।এতো সুরক্ষা।কেন জানি তার খুব ভয় করছে,রাস্তায় সে একটা মানুষ ও দেখেনি।এই চেহেরাব গুলো তার কাছে অপরিচিত,তার চোখ শুধু ভীরকেই খুজছে।
ইশায়া নামার এক মহিলা এগিয়ে আসে।মেক্সিকান ভাষায় তাকে স্বাগত জানায়।তার হাতে একটা ফুলের তোড়া তুলে দেয়।
__ইশায়া ফুলের বুকে নিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ে।ভেতরে ঢুকেই সে থেমে যায়।চারপাশে তাকিয়ে শুধু মুগ্ধ হয়ে থাকে।রেস্টুরেন্টটা অনেক সুন্দর।তার পছন্দ হয়েছে খুব।চারদিকে দেখার মতো এতো সুন্দর জিনিস আর মিউজিক।সবকিছু তার হৃদয় ছুঁয়ে যায়, চোখে লেগে থাকে।
সাইডে বাদ্যযন্ত্র বাজানো লোকগুলো ধীরে ধীরে সুর তুলছে।এই জায়গাটা যেন বাস্তব না।ইশায়ার লাগছে সে কোন রুপকথার জগতে চলে এসেছে। স্বপ্নের মতো সবকিছু।
____পরিবেশটা হঠাৎ বদলে যায়।চারদিক নিঃশব্দ হয়ে আসে।ঠিক যেন কারো আগমনের জন্য জায়গা করে দিচ্ছে।ভীর এসে গেছে।রেস্টুরেন্টের প্রবেশপথ দিয়ে সে ধীরে ধীরে ভেতরে ঢোকে।
তার পরনে নিখুঁত সাদা শার্ট যেটা তার শরীরের গঠনকে ভয়ংকর রকমের আকর্ষণীয় করে তুলেছে।কালো প্যান্ট।শার্টের উপরের দুইটা বোতাম খোলা, চওড়া বুক স্পষ্ট দৃশ্যমান।কব্জিতে ঝলমলে দামি ঘড়ি।চুল পেছনে আঁচড়ানো,ঘাড় সমান চুলগুলো পেছনে বাঁধা।
মুখে হালকা দাড়ি আজ তাকে অদ্ভুত রকমের সুন্দর লাগছে।
ভীর সামনে আসতেই তার চোখ পড়ে ইশায়ার ওপর।
লাল শাড়িতে দাঁড়িয়ে থাকা ইশায়াকে দেখে ভীর থেমে যায় এক মুহূর্তের জন্য।তার বুকের ভেতর কিছু একটা কেঁপে ওঠে।লাল শাড়িটা আগুনের মতো জ্বলছে ইশায়ার গায়ে।ঢেউ খেলানো চুলগুলো তার কোমর বেয়ে নেমে এসেছে।ভীরের চোখ গুলো ঘোলাটে হয়ে আসে তাকিয়ে থাকতে থাকতে।
অজান্তেই তার মনে আসে এই নারীকে দেখার জন্যই হয়তো সে এত রক্ত,এত যুদ্ধ, এত অন্ধকার পার করেছে।তার চোখে ভেসে ওঠে গর্ব,অধিকার।ভীর ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে তার দিকে।
ইশায়া ভীরকে দেখে দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরে।
আনন্দে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে
___আই লাভ ইউ।
থ্যাংক ইউ সো মাচ।এত সুন্দর সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য আমি খুব খুব খুব খুশি হয়েছি।
ভীর ইশায়ার দিকে তাকিয়ে, নিচু গলায় বলে,
আজ তোমাকে ভয়ংকর সুন্দর লাগছে।আই কান্ট কন্ট্রোল মাইসেল্ফ।
ইশায়া চোখ নামিয়ে নেয়।লজ্জায় তার ঠোঁট কেঁপে ওঠে।
ভীর ইশায়ার হাত ধরে নিয়ে যায় ডান্স ফ্লোরে।
গানের তালে তালে ভীর ইশায়াকে ঘুরাতে থাকে।
ইশায়া নাচ করতে ভালোবাসে ভীর সেটা জানে।সে প্রায়-ই ফুটেজে ইশায়াকে নাচতে দেখে।
গানের তালে তালে দু’জনের শরীর একে অপরের সঙ্গে মিশে যায়।
ভীর হঠাৎই ইশায়ার মুখের কাছে ঝুঁকে পড়ে, তারপর ধীরে তার ঠোঁটে আলতো একটা চুমু আঁকে।
এত লোকের মাঝে এমন আচরণে ইশায়া একটু ইতস্তত করে ওঠে।
চোখ বড় করে ভীরের দিকে তাকায়,
ইশায়া ভীরকে বাধা দিয়ে কিছু বলতে গেলে,
ঠিক তখনই ভীর আবারও ইশায়ার ঠোঁটের ভাঁজে নিজের ঠোঁট ডুবিয়ে দেয়।
দশ মিনিট পর ভীর সরে আসে।
ইশায়ার কপালে নিজের কপাল ঠেকিয়ে, নিচু গলায় বলে,
___Do you really think I care about anyone?
Does anyone here even have the guts to look this way?
___ইশায়া আর কিছু বলেনা।
আজ ভীর যেন ঠিক করে রেখেছে,ইশায়ার সব শখ পূরণ করবে।তার চাওয়ার সবকিছু তার পায়ের কাছে বিছিয়ে দেবে।নাচ শেষ হলে দু’জন গিয়ে বসে ডিনার টেবিলে।
ঠিক তখনই ওয়েটাররা একে একে খাবার নিয়ে আসতে শুরু করে,গ্রিল করা গরুর মাংসের টাকো,রুটি,তারপর চিকেন।এরপর মাছের সেভিচে, একপাশে সুন্দর করে সাজানো।সবজি এনচিলাদা,এর সঙ্গে মেক্সিকান রাইস,পাশে রাখা অ্যাভোকাডো দিয়ে তৈরি গুয়াকামোলি,ড্রিংক্স।
এক এক করে সব খাবার সাজানো হয় টেবিলে।
ভীর ইশায়ার দিকে তাকিয়ে ধীরে বলে,
__সবকিছু তোমার জন্য বেছে নেওয়া।
খেয়ে দেখো, ভালো লাগবে।
ইশায়া তাকিয়ে থাকে ভীরের দিকে।এই মানুষটা ভয়ংকর।এই মানুষটা নিষ্ঠুর।তবু এই মুহূর্তে সে কেবল একজন পুরুষ যে নিজের পুরো পৃথিবীটা সাজিয়ে এনেছে তার নারীর জন্য।
গান বাজতে থাকে।ফুলের ঘ্রাণ বাতাসে ভাসে।
আর গুয়াদালাহারার এই রাতে দুজনের ভালোবাসা ধীরে ধীরে আরও গভীর,আরও অন্ধকারের দিকে
এগিয়ে যায়।
ভীর ইশায়াকে সার্ভ করে দেয়। ইশায়ার মুখে তুলে দেয় এটা ওটা।ইশায়াকে একেকটা জিনিসের নাম বলছে আর মুখে তুলে দিচ্ছে।ইশায়া ও খাচ্ছে ভীরের হাতে আর এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখছে।তার খুশি আজ আকাশ ছোয়া।
ইশায়া ভীরকে বলে এতোকিছু করার কি প্রয়োজন ছিলো,আমি তো শুধু ঘুড়তে নিয়ে যেতেই বলেছিলাম।
আর আপ…
ইশায়াকে থামিয়ে দিয়ে ভীর বলে,
___ভীর যাকে ভালোবাসে, তার জন্য পুরো শহর থামিয়ে দিতে পারে।
ইশায়া ভীরের দিকে তাকিয়ে বলে,
___আপনি ভালোবাসেন আমাকে।এই কথাটায় ভীর হঠাৎ চুপ হয়ে যায়।নিজেও ঠিক বুঝতে পারে না কি বলেছে সে।সে ভালোবাসায় বিশ্বাসী না।এই শব্দটার সঙ্গে তার কোনো চুক্তি নেই।ইশায়া তার প্রয়োজন।
তার দুর্বলতা,তার অধিকার।সে নিজের সবটুকু দিয়ে ইশায়াকে আগলে রাখে,ঢাল হয়ে দাঁড়ায়,ছায়া হয়ে ঘিরে রাখে সবসময়।কিন্তু ভালোবাসা?
ইশায়া নীরবতা ভাঙে,একটু অভিমানের সুরে বলে,
__কি হলো, বলুন। আপনি আগেও তো বলেন নি।
ভীর প্লেটের দিকে তাকিয়ে থাকে।খেতে খেতেই ঠান্ডা গলায় বলে,
___তোমার কী মনে হয়?
ইশায়া এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলে,
___জানিনা।
ভীরের কণ্ঠ আরও ঠান্ডা হয়ে আসে,
___জানতে হবে ও না।সব কিছু জানা ভালো না,কিছু কিছু জিনিস গোপনেই সুন্দর।
খাবার শেষ করো।আরেকটা সারপ্রাইজ আছে তোমার জন্য।
__আরেকটা সারপ্রাইজ।ইশায়া জোড়েই বলে।
ভীরের ঠোঁটে হাসি ফুটে ওঠে, ছোট ছোট জিনিসে এই মেয়ে কতোটা খুশি হয়ে যায়।
এই কথাটা শুনেই ইশায়ার মন খুশিতে ভরে যায়।
মনে জমে থাকা প্রশ্নগুলো,ভীরের নীরবতা সব ভুলে যায়।
____ভীর ওই রেস্টুরেন্টের হোটেলের সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে অভিজাত রুমটা বুক করে।এটা কোনো সাধারণ রুম না এটা রাজভীর আলভারেযের রুচির প্রতিচ্ছবি।
রুমের দরজা খুলতেই যেন এক অন্য জগৎ।
মেক্সিকোর বাদশাহ যখন কিছু সাজায়, সেখানে বিলাসিতা শুধু চোখে পড়ে নাতা অনুভব করা যায় শ্বাসে।উঁচু ছাদ থেকে ঝুলছে ক্রিস্টালের ঝাড়বাতি, আলো পড়ে ভেঙে ভেঙে রুপোলি হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে পুরো ঘরে। দেয়ালের রঙ গাঢ়, রাজকীয় ডিপ মারুন আর সোনালি ছোঁয়া। রুমের মাঝখানে বিশাল বিছানা।সাদা আর গোলাপি ফুলে সাজানো।চারিদিকে মোমবাতি নিভু নিভু আলোয় রুমটা স্বপ্নের মতো লাগছে।একটা টেবিলের ওপর সুন্দর করে লেখা ইশায়া।
আর পাশে রাখা কেকটায় লেখা,
“Happy Anniversary, My Little Princess.”
ইশায়া ভেতরে ঢুকেই থমকে যায়।চোখ বড় হয়ে যায় তার।এতটা সৌন্দর্য সে কল্পনাও করেনি।
তার তো কিছুই মনে নেই।এই দিন, এই মুহূর্ত সবই তার কাছে অচেনা।
তবু বুকের ভেতর কোথাও যেন অদ্ভুত একটা অনুভূতি জেগে ওঠে।
ভীর দরজা লক করে।
ইশায়া ঘুরে তাকায়।চোখে প্রশ্ন, অবাক বিস্ময়।ভীর কিছু বলে না।শুধু চোখ দিয়ে ইশারায় বোঝায়,
__এটা সত্য। সবটাই।
ইশায়ার চোখ ভিজে আসে অকারণেই।
ভীর তাকে কোলে তুলে নেয়।শক্ত হাতে নয় অভ্যাসের মতো, নিজের জিনিসকে যেমন করে ধরে।
ভীর ইশায়াকে কোলে নিয়ে বসে,
ইশায়াকে তার উরুর উপর বসায়,কেক কাটে।ইশায়া কেকের একটা টুকরো ভীরের মুখে তুলে দেয়।তারপর ভীর ইশায়াকে খাইয়ে দেয়।
ইশায়ার চোখ চিকচিক করে ওঠে, এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোতেই তো ভালোবাসা বেঁচে থাকে।
হঠাৎ ইশায়া ভীরের গালে শব্দ করে চুমু খায়।
গলা জড়িয়ে ধরে আবেশে বলে,
___আপনাকে পেয়ে জীবনটা আমার স্বপ্নের মতো হয়ে গেছে।
অনেক বেশি ভালোবাসি আপনাকে।আপনার সাথে এভাবে যেন হাজার বছর থাকতে পারি।আই লাভ ইউ।
এই কথায় ভীরের চোখ মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে যায়।
ভীর ইশায়ার কপালে চুমু খায়,তারপর ইশায়াকে কোলে নিয়ে এগিয়ে যায় বিছানার দিকে।
ইশায়া ভীরের গলা জড়িয়ে ধরে আছে,আবেশে, ভরসায়।ভীর ইশায়াকে বিছানায় শুইয়ে দেয়।
ঠিক তখনই, অজান্তে, প্রথম দিনের কথা মনে পড়ে যায় তার।কত অন্ধকার পেরিয়ে আজ এই মুহূর্ত।এক বছরে কত কিছু বদলে গেছে।
ভীর ইশায়ার রক্তাভ গালে ঠোঁট ছোঁয়ায়।তারপর ঠোঁটের দিকে এগোতে নিলে
ইশায়া মুখ সরিয়ে নেয়।ভীর হাসে।ইশায়ার করা কোন কিছুই আজকাল তার রাগের কারন হয় না।
ভীরের ধৈর্য ভাঙে।তার হাত শার্টের বোতামে অস্থির হয়ে ওঠে।ইশায়া চেষ্টা করে তাকে সামলাতে।ইশায়ার দুটো হাত আঁকড়ে ধরে ভীরের উন্মুক্ত পিঠ।নখের আচড়ে ভীর আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে।
এই মিলনের সাক্ষী আজ সবকিছু।মোমবাতির আলো।
নিভু নিভু বাতাস।আর জানালা দিয়ে ঢুকে পড়া চাদের আলো। ভীর হারিয়ে যায় ইশায়ার মাঝে।
লএই মুহূর্তে সে কোন মাফিয়া না,আর না কোন বাদশাহ, সে শুধু একজন পুরুষ যে নিজের ভালোবাসার কাছে সম্পূর্ণভাবে আত্মসমর্পণ করেছে।কিন্তু কেনো যানি ভীরের ভেতরে কিসের একটা অস্থিরতা দিন দিন বেরে উঠছে।
____এদিকে এত সিকিউরিটির কারণে এলিজা আজও বেরোতে পারেনি।প্যালেসটা এখন একেকটা স্তরের খাঁচা।চারদিকে পাহাড়া,ম্যাপটা দেওয়া ভীষণ জরুরি।
সময় থেমে নেই।কিন্তু সুযোগ সেটাই ধরা দিচ্ছে না।
এলিজা নিজের জীবনের পরোয়া করে না।কখনোই করেনি।কিন্তু এই ম্যাপটা জায়গামতো পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত তাকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে হবে।
এতটা সময়।এত দিনের কষ্ট।রক্ত, ভয়, লুকিয়ে থাকা, রাত জেগে জেগে হিসাব কষা এই সবকিছুর বিনিময়ে সে ওই ম্যাপটা জোগাড় করেছে।
এখন যদি ভুল করে তিরে এসে যদি তরী ডুবে যায় তাহলে সব শেষ।
না।সে সেটা হতে দিবে না।
তাকে অনেক ভেবে চিন্তে কাজ করতে হবে।এলিজা জানালার ধারে দাঁড়িয়ে আছে।বাইরে রাত।
অন্ধকারের ভেতরেও প্যালেসের সিকিউরিটি আলো ঝলমল করছে।
__আয়ুষ গার্ডদের ছদ্মবেশে প্যালেসের বাইরে আছে।
এলিজার শুধু একটাই কাজ
প্যালেসের ভেতর থেকেই এই ম্যাপটা তার হাতে তুলে দেওয়া।এর বেশি কিছু না।
আয়ুষ তারপর এটাকে ডন লুকার কাছে পৌঁছে দেবে।
তারপর তাদের কাজ সমাপ্ত।
এই পর্যায় পর্যন্ত এলিজাকে বাঁচতে হবে।এরপর?
এরপর বাদ বাকি তারা নিজেরাই সামলে নেবে।
এলিজা জানে এই খেলায় শেষটা কখনো সুন্দর হয় না।
কিন্তু সে সুন্দর শেষ চায়ও না।
সে শুধু চায় বদলা,তার বোনের জীবনের বদলা ভীর নিকের ধ্বংস।
এই ম্যাপটা ঠিক হাতে পৌঁছাক।নিজের জীবন যদি এর দাম হয়,তাতেও তার আপত্তি নেই।সে শুধু জানে এই রাত, এই প্যালেস, এই নিঃশ্বাস সবই এখন সময়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ।আর এলিজা কখনো যুদ্ধ থেকে পালায় না।
সে আমার বন্দিনী পর্ব ৭২ (২)
____এই একই সময়ে,
অন্য এক প্রান্তে ভীর ইশায়াকে নিজের বাহুতে আগলে রেখেছে।
মোমবাতির আলো,
চাদেরর নরম ছোঁয়া,
ইশায়ার নিঃশ্বাস সব মিলিয়ে মুহূর্তটা শান্ত।অস্বাভাবিক রকম শান্ত।ভীর ইশায়ার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে চোখ বন্ধ করে।তার বুকের ভেতরে হালকা অস্থিরতা।
ইশায়া ঘুমিয়ে আছে।
ভীর জানেই না এই মুহূর্তেই তার সাম্রাজ্যের ভেতরে আরেকটা খেলা চলছে।
সব কিছু ধীরে ধীরে তার দিকে এগোচ্ছে।
