সে আমার বন্দিনী পর্ব ৭৯
তানিয়া হুসাইন
ইশায়া দুই পা পিছিয়ে যায়। তার মনে হচ্ছে পা দুটো ভারী হয়ে গেছে,এক ইঞ্চিও আর এগোতে চাইছে না। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ভীর তীক্ষ্ণ, শিকারি দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। সেই চোখ এড়িয়ে যাওয়ার উপায় ইশায়ার নেই। ইশায়ার প্রতিটি শ্বাস, প্রতিটি কাঁপন, প্রতিটি অস্থির নড়াচড়া সবকিছু ভীর ঠান্ডা মাথায় পরখ করছে।
ইশায়া পেছাতে পেছাতে হঠাৎ-ই পিছন ফিরে দৌড় দেয় ওয়াশরুমের দিকে। ইশায়া শুধু এটাই চাইছে ভীর এর থেকে দূরে যেতে,ভীরের উপস্থিতিতে তার দম বন্ধ হয়ে আসছে।এটাই হয়তো তার শেষ ভরসা।
কিন্তু ভীর যেন সেই মুহূর্তটার অপেক্ষাতেই ছিল।ইশায়া কি করে এটার জন্য-ই,
ইশায়া যেতেই চোখের পলকে সে ঝড়ের গতিতে দৌড়ে এসে পেছন থেকে ঝাপটে ধরে তাকে।
ইশায়ার যে হাতটা লুকানো ছিলো ভীর সেটাই শক্ত করে চেপে ধরে। এমনভাবে, যেন মুহূর্তেই হাড় গুঁড়িয়ে ফেলবে।শুরু হয় ধস্তাধস্তি।
ইশায়া নিজের সর্বশক্তি লাগিয়ে দেয়। বুকের ভেতর জমে থাকা সমস্ত রাগ, অপমান, ভয় সবকিছু একসাথে ঢেলে দেয় সে ভীরের বিরুদ্ধে। কিন্তু ভীরের পুরুষালি শক্তির কাছে সে যেন একমুঠো হাওয়া। তবুও সে থামে না। কারণ সে জানে এটাই তার শেষ সুযোগ। তার কাছে আর লড়ার মতো কিছু নেই। সে অসহায় এই জা*নোয়ারদের সাথে পেরে ওঠার শক্তি তার নেই।
তবুও আজ তাকে পারতেই হবে। ইশায়া প্রাণপণে হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করে।
আর এদিকে ভীর হাতের চাপ আরও বাড়ায়। তার আঙুলগুলো লোহার শিকলের মতো শক্ত হয়ে আসে, মুঠো খুলে নিতে চায় জোর করে।
ব্যথায় ফুঁপিয়ে ওঠে ইশায়া।ভীর দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিসিয়ে বলে,
___হাত খোল। কি তোর হাতে?
ইশায়া মানে না।এক হাতে সে ভীরের গলা আর বুক খামচে ধরে, সর্বশক্তি দিয়ে ধাক্কা দেয়। কিন্তু ভীরকে এক চুল ও টলাতে পারেনা।
শেষ উপায় না পেয়ে ইশায়া হঠাৎই ভীরের গলায় দাঁত বসিয়ে দেয় নিজের সর্বশক্তি দিয়ে।
হঠাৎ আচমকা তীব্র ব্যথায় ভীর থমকে যায়। তার গলা থেকে রক্ত বেরিয়ে আসে। ভীরের হাত ছুটে যায় ইশায়ার শরীর থেকে।
ভীর ছাড়তেই ইশায়া ছুটে ঢুকে পড়ে ওয়াশরুমের ভেতরে। কয়েক কদম এগোতেই পেছন থেকে ভীর ইশায়ার ওড়না টেনে ধরতেই ইশায়া শরীর থেকে ওড়না ফেলে দেয়, কিন্তু ভীর ইশায়াকে থামাতে পা দিয়ে ল্যাং মারে ইশায়াকে। ইশায়া ছিটকে পড়ে যায়
সোজা গিয়ে পড়ে বাথটাবের কোনায়, আঘাত লাগে তার মাথায় নরম চামড়া ফেটে যায় মুহূর্তেই। রক্ত গড়িয়ে নামতে শুরু করে কপাল বেয়ে।ব্যথায় মুখ নীল হয়ে আসে তার। চোখ ঝাপসা হয়ে যায়। পৃথিবী দুলতে থাকে।তবুও হাতে শক্ত করে মুঠো করে রাখা ঔষধগুলো সে শেষ শক্তিটুকু দিয়ে মুখে পুরে নেয়।
রক্ত, ব্যথা, অপমান সবকিছুকে উপেক্ষা করে।
ইশায়া এমনভাবে আঘাত পাবে এটা ভীর কল্পনাও করেনি।সে শুধু তাকে আটকাতে চেয়েছিল। থামাতে চেয়েছিল।কিন্তু এর পরের দৃশ্যটা তার বুকের ভেতর রক্ত হিম করে দেয়।ইশায়া হাতে মুঠো করে রাখা সব ঔষধ এই দৃশ্য দেখেই ভীর এক সেকেন্ড দেরি না করে ভীর ঝাঁপিয়ে পড়ে। দ্রুত ইশায়ার গলা চেপে ধরে।এদিকে ইশায়ার ফর্সা মুখ রক্তে লাল হয়ে উঠছে কপাল ফেটে ঝরতে থাকা রক্ত গড়িয়ে পড়ছে গাল বেয়ে। তার ঠোঁট কাঁপছে, চোখ ঝাপসা।
ভীর গলা আরও শক্ত করে চেপে ধরে।একহাতে মুখ খোলে, ইশায়া কাশতে শুরু করে। ইশায়া মাথা সরাতে চায়, শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে তার। তবুও ভীর ছাড়ে না। মুখ চেপে ধরে, আঙুল ঢুকিয়ে একে একে ঔষধগুলো বের করে আনার চেষ্টা করে।
ভয়ের চোটে ভীরের নিজের শরীর কাঁপছে।হাত কাপছে তার।ইশায়ার হাতে মুঠো ভর্তি যে ওষুধ ছিল সেগুলো সে মুখে ঢুকিয়েছে।যদি সে গিলে ফেলে? যদি দেরি হয়ে যায়,কিছু হয়ে যায়?
যদি সে তাকে হারিয়ে ফেলে?সে কিভাবে বাঁঁচবে।
ইশায়ার শ্বাস প্রায় বন্ধ হয়ে আসছে। বুক ওঠানামা করছে অস্বাভাবিকভাবে। কিন্তু ভীর হাত ছাড়ে না।
অপর হাত দিয়ে সে ইশায়ার মুখের ভেতর থেকে সব গুলো ঔষধ বের করে আনে।তবুও তার মন শান্ত হয় না।তার ভেতরের সন্দেহ, আতঙ্ক, অস্থিরতা কিছুতেই থামে না।এদিকে ইশায়া কাশতে কাশতে প্রায় শেষ। চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে, শরীর নিস্তেজ হয়ে আসছে।
ভীর তার গলা ছেড়ে দেয় কিন্তু মুখ চেপে ধরে রাখে শক্ত করে।তারপর নিজের আঙুল ঢুকিয়ে জোর করে ইশায়াকে বমি করায়।ইশায়া যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গিয়ে বমি করতে থাকে। শরীর কাঁপছে, শ্বাস ভেঙে ভেঙে আসছে।ইশায়াকে বমি করতে দেখে ভীর এক মুহূর্তের জন্য স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে।এই ভেবে।ভেতরে আর কিছু নেই। যা ছিলো সব বের হয়ে গেছে।ঔষধ গিলতে পারেনি সে।কিন্তু সেই স্বস্তি এক ফোঁটা মাত্র।
তার রাগ, তার ভয়, সব মিলে শরীর কাঁপছে এখনও।ইশায়ার এই দুঃসাহসী কাজ তাকে ভেতর থেকে আগুনের মতো জ্বালিয়ে দিচ্ছে।
ভীরের হাতের মুঠো চলে যায় ইশায়ার চুলের ভাজে।
এলোমেলো চুল মুঠো করে ধরে ইশায়ার মুখ তোলে ভীর।ভীরের চোখ দুটো লাল হয়ে আছে রাগে,ভীর হিসহিসিয়ে বলে,
___কিসের ঔষুধ ছিলো এগুলো? বল!কোথায় পেয়েছিস তুই?কে দিয়েছে তোকে ঔষধ? ভীরের চিৎকারে কাপছে ইশায়া,এগুলো কিসের ঔষুধ?
__কিন্তু ইশায়া কিছু বলে না।
তার শরীর দুর্বল হয়ে এসেছে। মাথা ঝিমঝিম করছে। কপালের ক্ষত থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে এখনও। শ্বাস ভারী হয়ে আছে, বুক কাঁপছে।তার ঠোঁট নড়ে না।
ভীর আবারো জিজ্ঞেস করে,
ভীরের ধৈর্য ভাঙে।রাগে সে হিতাহিত জ্ঞান শূন্য।
ভীর পানি ভর্তি বাথটাবের মধ্যে ইশায়ার মুখ চেপে ধরে, ঠান্ডা পানির ভেতর ডুবিয়ে দেয়।পানির শব্দে চারপাশ ভারী হয়ে ওঠে।
গর্জে ওঠে বলে ভীর,
মরার এত শখ তোর? তাই না?
তার কণ্ঠস্বর ঠান্ডা, নিষ্ঠুর।
___যা… তোর শখ আজ আমি পূরণ করবো।
ইশায়ার শরীর পানির ভেতর ছটফট করতে থাকে। হাত দুটো দুর্বলভাবে আঘাত করতে থাকে ভীরের হাতে। পানি ঢুকে যায় ইশায়ার নাকে, মুখে। শ্বাস নেওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে সে।
আর ভীর তার মুখে সেই ভয়ংকর কঠিন অভিব্যক্তি।
কিছুক্ষণ পর ভীর টেনে তোলে ইশায়াকে।
পানির ভেতর থেকে উঠে আসতেই ইশায়া হা করে শ্বাস নিতে থাকে,ফুসফুস ভরে বাতাস টেনে নিতে চাইছে মরিয়া হয়ে। তার চোখে আতঙ্ক, মুখে কাতরতা। কাঁপা হাতে সে ভীরকে ঠেকাতে চায়, যেন বলতে চায় এরকম না করতে,তার কষ্ট হচ্ছে কিন্তু ভীর থামে না।
আবারও তার চুল চেপে ধরে ঠান্ডা পানিভর্তি বাথটাবে ডুবিয়ে দেয়।
কয়েক সেকেন্ড তারপর আবার তোলে।
এই নির্মম খেলাটা বারবার চলতে থাকে।প্রতিবারই ইশায়ার ছটফটানি একটু একটু করে কমে আসে। তার শক্তি ক্ষয়ে যেতে থাকে। শেষমেশ সে প্রায় নেতিয়ে পড়ে দুর্বল, নিঃশ্বাসহীন।
ইশায়ার এই অবস্থা ভীরের চোখে পড়ে।ভীর ইশায়ার বাহু ধরে টেনে তোলে। ভেজা শরীরটাকে টেনে হিঁচড়ে রুমে নিয়ে আসে। তারপর এক ঝটকায় ফ্লোরে ছুড়ে ফেলে দেয়।ধপ করে পড়ে যায় ইশায়া। গুটিয়ে যায়। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে তার। বুক ওঠানামা করছে অস্বাভাবিকভাবে। চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে চারপাশ কুয়াশায় ঢেকে যাচ্ছে।
ভীর দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর নিচু স্বরে, কিন্তু হুমকিতে ভরা কণ্ঠে বলে,
___বাঁচতে চাইলে মুখ খোল। নাহলে আজকে তোর কী হবে আমি নিজেও জানি না।
রুমের ভেতর পায়চারি করতে থাকে ভীর। ভারী পদক্ষেপে এদিক ওদিক হাঁটে। রাগ কমানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু তার বুকের ভেতরের আগুন থামছে না।
এদিকে ফ্লোরে পড়ে থাকা ইশায়া পেটে হাত দিয়ে কাতরাচ্ছে। তার শরীর কাঁপছে। প্রতিটা শ্বাস যেন ছুরির মতো বিঁধছে ভেতরে।
হঠাৎ ভীর আবার তার দিকে এগিয়ে আসে। টেনে তোলে তাকে।ইশায়ার বিদ্ধস্ত চেহারাটা চোখে পড়ে তার ফ্যাকাশে মুখ, র*ক্তে ভেজা কপাল, কাঁপতে থাকা ঠোঁট। এক সেকেন্ডের জন্য ভীরের ভেতরে কেমন একটা খারাপ লাগা জেগে ওঠে।ইশায়ার এই অবস্থা সে নিতে পারছেনা।
কিন্তু আরেকটা চিন্তা তার মাথায় আগুন ধরিয়ে দেয় ইশায়া তার থেকে দূরে যেতে চেয়েছে।সে তাকে ছেড়ে চলে যেতে চেয়েছে।সে নিজেকে শেষ করে দিতে চেয়েছে।
আর এক সেকেন্ড দেরি হলে তাকে হারিয়ে ফেলতে পারতো।এটা ভীর কোনোভাবেই মানতে পারছে না।ইশায়া ছাড়া সে একটা মূহুর্ত ও কল্পনা করতে পারেনা।
তার শরীরের র*ক্ত আবার গরম হয়ে ওঠে। চোখে নেমে আসে সেই ভয়ংকর তেজ হারানোর আতঙ্কে জ্বলে ওঠা আগুন।
ইশায়াকে এভাবে ব্যথায় কুঁকড়ে যেতে দেখে ভীর থামে। দ্রুত এগিয়ে গিয়ে ইশায়াকে উঠিয়ে বিছানায় বসায়। ইশায়ার শরীর ছেড়ে দিয়েছে, কপালের অনেক জায়গা কেটে গেছে, র*ক্তের গাঢ় লাল রেখা এঁকে বসে আছে ফর্সা ত্বকের ওপর।
ভীর ড্রয়ার থেকে ঔষধ বের করে। ড্রয়ার লক ছিল সে কাল রাতে নিজে হাতে লক করেছে। তার নিজেরই মনে আছে, চাবি তার কাছে। তাহলে ইশায়া ঔষধ পেলো কোথায়?
তার প্যালেসে এসব কি হচ্ছে,ভীরের মাথা কাজ করছে না রাগের পরিমান সীমা ছাড়িয়েছে।
তবুও নিজেকে যথাসাধ্য শান্ত রেখে ভীর ইশায়ার কাছে যায় ঔষধ লাগাতে।
ভীর ইশায়ার দিকে ঝুকতেই ইশায়া হাত সরিয়ে দেয় তার। সেই দুর্বল হাতেও একরকম তীব্র ঘৃণা লুকানো। ভীর আবারও লাগাতে নিলে ইশায়া মাথা সরিয়ে ফেলে। শরীর তার কুলাচ্ছে না, চোখ আধবোজা, ঠোঁট কাঁপছে তবুও ইশায়া ভীরের স্পর্শ সহ্য করতে পারছে না।
এক মুহূর্তের জন্য ভীর চোখ বুজে নেয় নিজেকে নিয়ন্ত্রন করতে। তারপর আচমকা ইশায়ার চোয়াল শক্ত করে চেপে ধরে। তার আঙুলের চাপ দৃঢ় সে নিজেকে অনেক কষ্ট করে নিয়ন্ত্রণ করছে। ভীর জোর করেই ঔষধ লাগায়, ব্যান্ডেজ করে নিজে। প্রতিটা স্পর্শে ইশায়ার দেহ কেঁপে ওঠে, কিন্তু ভীর থামে না।
সব শেষ করে সে কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে থাকে ইশায়ার দিকে। তার চোখে ঝড়, অথচ কণ্ঠে বরফ জমে আছে।
ভীর গম্ভীর গলায় বলে,
___মেজাজ খারাপ করিস না আমার। নাহলে আজ তোর কি হাল হবে তুই কল্পনাও করতে পারবি না।
ভীর ইশায়াকে রেখে উঠে দাঁড়ায়। পকেট থেকে সিগারেট বের করে আগুন ধরায়। ধোঁয়া ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে ঘরের ভেতর। সে পায়চারি করতে থাকে এক কোণ থেকে আরেক কোণে। ভারী বুটের শব্দ মেঝের ওপর আঘাত করছে।ঘটনাটা কি হয়েছে ভীরের মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে। সে জিনিসটা হজম করতে পারছে না। ইশায়া কেন এমন করলো? তার আসতে যদি আরেকটু দেরি হতো, যদি সে সত্যিই…
ভাবনাটা শেষ করতে পারে না ভীর।
ইশায়ার হঠাৎ করা এই কাজের মানে কি। এই ঔষধগুলো কিসের ছিল?
ভীর তীক্ষ্ণ চোখে চারপাশে তাকায়। তারপর ঔষধের পাতা খুঁজতে শুরু করে ড্রয়ার, মেঝে, বিছানার নিচে। তার চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। একটাই প্রশ্ন ঘুরছে ড্রয়ার সে নিজে লক করেছিল।তাহলে ইশায়া ঔষধ পেলো কোথায়?
ইশায়া চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। বুকটা ওঠানামা করছে ধীরে ধীরে। খুব খারাপ লাগছে তার শরীরেও, মনে আরও বেশি।
ভীর আবারো তার কাছে এসে দাঁড়ায়। নিচু গলায় বলে,
ঔষধের পাতা কোথায়?
ইশায়া চোখ মেলে না।এমন ভাব যেন শব্দটাই সে শুনতে পায়নি।
ভীরের গলা এবার শক্ত হয়।
__কোথায় বল? কিসের ঔষুধ ছিলো? কোথায় পেয়েছিস?
ইশায়া নির্বিকার হয়ে শুয়ে আছে। চোখের পাতা পর্যন্ত মেলে না। তার এই নিশ্চুপ থাকা ভীরের অহংকারে আগুন ঢালে।
ভীর ঝুঁকে তাকে টেনে তোলে। শক্ত হাতে বাহু চেপে ধরে বলে,
___কথা শুনতে পাচ্ছিস না? নাটক করছিস আমার সাথে?
ইশায়া চুপ। ঠোঁট শক্ত করে বন্ধ। চোখ এখনও বন্ধ।
ভীরের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়।
ঠাসসসসস করে একটা থা*প্পড় বসায় ইশায়ার বাম গালে।সেকেন্ডের গতিতে একই গালে আবারও বাজিয়ে থা*প্পড় বসায় ভীর।ঘরের ভেতর শব্দটা কাঁপিয়ে ওঠে।
আঘাতের পর আঘাত। ইশায়া ফুঁপিয়ে ওঠে ব্যথায়। গালটা জ্বলে যাচ্ছে তার, যেন আগুন ছুঁয়ে গেছে। মাথাটা ঝাঁকুনি খেয়ে একদিকে কাত হয়ে পড়ে। আর সহ্য করতে পারছে না সে।
ভীর আবারও ঝাঁঝালো গলায় বলে,
___বল, কীসের ঔষধ ছিলো? আর কোথায় পেয়েছিস?
ইশায়া চিড়বিড়িয়ে, দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
___বলবো না।
ইশায়ার বলতে দেরি হয়। ভীরের আবারও থা*প্পড় মারতে দেরি হয় না।
তার চোখ লাল হয়ে উঠেছে।
___তুই কি মনে করিস, তুই না বললে আমি বের করতে পারবোনা।আমাকে কি মনে হয় তোর? এক ঘন্টার মধ্যে খুঁজে বের করবো আমি। তারপর দেখ তুই আর আমি কি করি।
ইশায়া কাঁপা কাঁপা গলায় বলে,
___কি আর করবেন… মে*রে ফেলবেন। চোখের কোণে জমে থাকা জল গড়িয়ে পড়ে।
যেভাবে মেরে ফেলেছেন কালকের ওই লোককে, সাফা আপুকে আর আমার বা… বাকিটা আর বলতে পারে না। কান্নায় গলা আটকে আসে ইশায়ার।
সাফা নামটা শোনামাত্রই ভীর অবাক হয়ে যায়।
ভীরের বুকের ভেতর ধক করে উঠে।কানে বারবার বাজতে থাকে ইশায়ার বলা কথা।ইশায়ার ঠোঁট থেকে এই নামটা বের হওয়ার কথা না। কোনোভাবেই না।কিভাবে এমন হলো।ইঞ্জেকশন দেওয়া হয়েছে এখনো একমাসও হয়নি।তাহলে?সে কি ভুল শুনলো?
না… না, সে ভুল শুনেছে।
ভীরের মনে পড়ে ইশায়ার আগের সেই পাগলামি…
কী অবস্থায় গিয়ে সে সেই সিদ্ধান্তটা নিয়েছিল।
কীভাবে নিজের হাতে তাকে অন্ধকারে ডুবিয়ে রেখেছে শুধু যেন সত্যটা আর কোনোদিন তার সামনে না আসে এজন্য।আর যদি আবার আবার যদি এরকম কিছু হয়?
ভীর ইশায়ার দু’ বাহু শক্ত করে ধরে তাকে নিজের কাছে আনে।
চোখ দুটো লাল, কপালর রগ ফুলে উঠেছে তার।
___কি বললি? কার নাম বললি তুই এই মুহূর্তে?
বল… আবার বল!
ইশায়া চোখে আগুন নিয়ে তাকিয়ে আছে।
তার কণ্ঠে ভয় নেই, আছে জমে থাকা ঘৃণা আর দহন।
ঝাঝালো গলায় বলে,
___আপনি আমার পুরো ফ্যামিলিকে শেষ করে দিয়েছেন।আমার জীবন নষ্ট করেছেন।মে*রে ফেলুন আমাকে। আমাকেও মে*রে ফেলুন।আমি থাকবোনা। আমি বাঁচতে চাই নাআপনার সাথে আমি থাকবোনা।
আপনি… আপনি একটা খু*নি।
শব্দগুলো ভীরের বুকে ছু*রির মতো আঘাত করছে।
ইশায়ার শরীরে রাখা তার হাত কেঁপে উঠে।মুহূর্তের জন্য যেন তার দৃষ্টি পরিবর্তন হয়ে যায়। কিন্তু সেই নরমতা সে গিলে নেয়।
নিজেকে সামলে, দাঁত চেপে বলে,
___কে বলেছে তোকে এগুলো?কে বলেছে বল।
আমি-ই তোর ফ্যামিলি।
আমি তোর সব।আর কেউ নেই তোর।আমি ছাড়া তোর আর কেউ নেই,বুঝেছিস।ইশায়াকে ঝাকিয়ে বলতে থাকে ভীর।
তোর কোনো পরিবার নেই।রাজভীর আলভারেয-ই তোএ সব।আমি তোর একমাত্র আপন মানুষ এই পৃথিবীতে।আমি ছাড়া কেউ নেই তোর।
ইশায়া তার হাত ঝাঁকিয়ে ছাড়াতে চেষ্টা করে।চোখ ভিজে তার, কিন্তু কান্না করছে না,ইশায়া মাথা উঁচু করে
চিৎকার করে বলে,
___আর কত মিথ্যা বলবেন?
আপনি কি ভেবেছেন এভাবে সারাজীবন কাটিয়ে দিবেন?ভুল আপনি।সত্য কখনো চাপা থাকে না।
মিথ্যা একদিন ঠিকই সামনে আসে।
আপনার খেলা শেষ, মি. রাজভীর আলভারেয।
একদিন আপনার এই সাম্রাজ্যেরও শেষ হবে।
যেভাবে আমি আমার সবকিছু হারিয়েছি
একদিন আপনিও আপনার সবকিছু হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যাবেন।মনে রাখবেন আমার এই কথা।
ইশায়ার এই কথাগুলো ভীরের অহংকারে আগুন ঢেলে দেয়। সে ইশায়ার গলা চেপে দেয়ালে ঠেসে ধরে।
তার কণ্ঠ গর্জে ওঠে,
___বড় বড় কথা বলতে শিখেছিস,তোর জিভ আমি আগুনে পুড়িয়ে দিবো।কে বলেছে তোকে এগুলো?
হ্যাঁ? কে বলেছে?ভীরের চিৎকার বাড়তে থাকে,
বলছিনা তোর আমি ছাড়া কেউ নেই!কেনো শুনছিস না।এক কথা বার বার বলছিস কেনো?
সাহস তোর খুব বেশি বেড়ে গেছে।
আমাকে রাগাস না, ইশায়া।
ইশায়ার শ্বাস আটকে আসছে, তবুও তার চোখে ভয় নেই।সে তাকিয়ে আছে ভীরের চোখের দিকে তেজি দৃষ্টিতে।
ভীরের আঙুলের চাপ ধীরে ধীরে কমে আসে।
কারণ সে বুঝে ইশায়ার সব মনে পড়ে গেছে। আর তার ভেতরের আগুনও জেগে উঠছে। আগুনকে যতই চাপা দাও একদিন সে দাউ দাউ করে জ্বলবেই।
কিন্তু না…
সে ইশায়াকে আগুন হতে দেবে না।ইশায়া থাকবে শান্ত।বরফের মতো যেভাবে সবসময় ভীরের বুকে শীতলতা ছড়িয়ে দিয়েছে, ঠিক সেভাবেই।সে জ্বলবে না।সে ধ্বংস হবে না।সে শুধু থাকবে ভীরের নিয়ন্ত্রণে।তার বুকের খাঁচায় বন্দি পাখি হয়ে।
হঠাৎই ভীর ইশায়াকে টেনে নিজের বুকের ভেতর জড়িয়ে ধরে। শক্তির আলিঙ্গন না এটা এক ধরনের মরিয়া আশ্রয় খোঁজা।ভীরের বুকটা অস্বাভাবিকভাবে লাফাচ্ছে। যেন ভেতর থেকে কেউ মুঠো করে ধরে আছে হৃদপিণ্ড।সে ইশায়ার মাথা নিজের বুকে শক্ত করে চেপে ধরে রাখে।যেন এই চাপেই সব সত্য, সব বিদ্রোহ, সব আগুন চুপ হয়ে যাবে।
কিন্তু ইশায়া ভীরকে সরাতে যায়।
ভীর এবার গর্জে ওঠে না, বরং নিচু স্বরে বলে,
___ডোন্ট মুভ।চুপ থাকো।ভালো লাগছে না আমার।
তার গলা ভারী।তারপর দ্রুত বলে ওঠে,
এগুলো সব মিথ্যা, জান।
কে বলেছে তোমাকে এগুলো? বলো।
কালকের ওই ছেলেটাকে মে*রেছি কারণ ও আমাদের মা*রতে ঢুকেছিলো আমার প্যালেসে, তাই।
ভীর বোঝাতে চায় ইশায়াকে,নিজের মতো করে।
তার ঠোঁট ছুঁয়ে যায় ইশায়ার ঘাড়ে।
ইশায়া হেসে ওঠে।সেই হাসি তাচ্ছিল্যের।
__আর বোকা বানাতে পারবেন না আপনি আমাকে।আর না পারবেন আমাকে আটকে রাখতে।
হয় আমাকে মুক্তি দিবেন, না হয় আমি নিজেকে শেষ করে দিবো।
ভীর চোখ বন্ধ করে।রাগ যেন রক্ত হয়ে শিরায় শিরায় দৌড়াতে শুরু করেছে।না এভাবে হবে না।
এই মেয়েটাকে এভাবে ছেড়ে দিলে সে হাতের বাইরে চলে যাবে।নিককে বলতে হবে তার ইমিডিয়েট এই মেডিসিন চাই।ইঞ্জেকশন এর ব্যবস্থা করতে হবে।
কিন্তু তার আগে ব্যবস্থা করতে হবে ইশায়ার কানে বিষ ঢালা ওই স্পাই কে।
ভীর ইশায়াকে ছেড়ে সরে আসে।
টেবিল থেকে ল্যাপটপ নেয়।
ইশায়া তাকিয়ে আছে ভীরের দিকে।সে কি করছে সেটা দেখছে?
ভীর ল্যাপটপ খুলে তার রুমের সিসিটিভি ফুটেজ অন করে।স্ক্রিনে ভেসে ওঠে তাদের প্রতিটি মুহূর্ত।
ইশায়ার বুক ধক করে ওঠে।সে ভীরকে খুব ভালো করেই চেনে।সে জানে ভীর ধুরন্ধর।একবার সন্দেহ করলে সে শেষ পর্যন্ত যাবে।আর ইশায়া চায় না তার কারণে এলিজার কোনো ক্ষতি হোক।কিন্তু সে কি করবে?ভীর কাল রাত থেকে সব সিসিটিভি ফুটেজ চেক করতে শুরু করে।টেনে টেনে দেখছে সবকিছু।
স্ক্রিনে ভেসে ওঠে ভীর রুম থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে।সেই সিনে এসে ভীর থামে।এক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকে।তারপর আবার প্লে করে।ইশায়া উঠে ঘুম থেকে।ভীরের চোখ স্থির।সে পরের অংশগুলো দেখতে থাকে।
ইশায়ার গলা শুকিয়ে আসে।ভয়ের ঠাণ্ডা স্রোত তার শরীর বেয়ে নেমে যায়।এলিজাকে দেখলে ভীর বুঝে ফেলবে সব।না এটা দেখলে সব শেষ।ইশায়া কি করবে বুঝে উঠতে পারছে না।হঠাৎই সে দ্রুত এগিয়ে যায় ভীরের কাছে।
এক ঝটকায় ল্যাপটপটা তুলে নেয়।
তারপর শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে সেটা মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলে দেয়।ইশায়ার শরীর কাপছে ভয়ে।
ল্যাপটপ আছড়ে পড়ে।স্ক্রিন চূর্ণ হয়ে যায়।
ভীর ধীরে ধীরে মাথা তোলে।তার চোখে আর রাগ নেই।
রাগের থেকেও ভয়ংকর কিছু আছে সেখানে
নিশ্চিত সন্দেহ।
ভীরের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়।এক মুহূর্তে তার ভেতরের মানুষটা সরে দাঁড়ায়।জেগে ওঠে সেই প*শু, যাকে এতদিন সে নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল।এতোটা মাস যার থেকে ইশায়াকে সে আড়ালে রেখেছিল নিজের অন্ধকার থেকে, নিজের র*ক্তাক্ত বাস্তবতা থেকে, নিজের বিকৃত ক্ষমতার খেলা থেকে।
কিন্তু আজ তার মাথায় আর কিছু আসে না।না যুক্তি।
না ভালোবাসা।
ভীর সজোরে ইশায়ার গালে থা*প্পড় মারে।
ইশায়ার ঠোঁটের কোণে লবণাক্ত র*ক্তের স্বাদ জমে ওঠে।ভীর থামে না।সে কোমরের বেল্ট খুলে নেয়।
চামড়ার বেল্টটা তার হাতে কুণ্ডলী পাকায়,
তারপর একের পর এক আঘাত নেমে আসে।
ইশায়ার চিৎকার পুরো রুম জুড়ে বাজতে থাকে।
দেয়াল, ছাদ, মেঝে সব যেন সেই চিৎকারে কেঁপে ওঠছে।
কিন্তু ভীরের কানে লাগে না।তার চোখে শুধু অন্ধকার। এমন অন্ধকার, যেখানে কোনো মুখ নেই, কোনো স্মৃতি নেই শুধু ধ্বংসের লাল আভা।ইশায়ার আত্মচিৎকারেও ভীরের মন গলে না।একটা মুহূর্তের জন্যও না।
এদিকে ইশায়া ব্যথায় কুঁকড়ে যাচ্ছে।
নিজেকে বাঁচাতে হাত তুলছে, আবার পড়ে যাচ্ছে।
চুল ছড়িয়ে গেছে, শ্বাস কাঁপছে।প্রতিটা আঘাত তার শরীরে দাগ হয়ে বসে যাচ্ছেদাগ শুধু চামড়ায় নয়, ভেতরেও।
ভীর থামে না যতক্ষণ না ইশায়া একেবারে চুপ হয়ে যায়। তার চিৎকার থেমে যায়।তার শরীরের নড়াচড়া থেমে যায়।মেঝেতে পড়ে থাকা ইশায়া নিস্তব্ধ।
রুমে শুধু ভীরের ভারী শ্বাসের শব্দ।
তারপর বেল্ট টা ছুড়ে মারে নিচে।
ভীর নিচে ঝুঁকে ইশায়ার চুল খামছে ধরে।
রাগে হিসহিসিয়ে বলেক্স
___কাকে বাঁচাবি তুই?
আমার হাত থেকে রেহাই পেয়ে যাবে ও? এত সহজ?
তার কী করুণ মৃ*ত্যু হয়, তা তুই নিজের চোখে দেখবি।
তুই কি মনে করেছিস ল্যাপটপ ভেঙে ফেললে আমি বের করতে পারবো না ওকে?দেখ তুই এবার ই কি হয়।ভালোভাবো বলেছি সহ্য হয় নি,আমার ভেতরের হিং*স্র জা*নোয়ারটাকে টেনে হিচড়ে বের করলি এখন দেখবি তুই এই জা*নোয়ার ঠিক কি কি করে। আমার থেকে বাইরের মানুষকে গুরুত্ব দেওয়ার পরিণাম কী হয় দেখ।
জাস্ট ওয়েট এন্ড ওয়াচ।
ভীরের আঙুলের চাপ এক মুহূর্ত আরও শক্ত হয়।
তারপর সে ছেড়ে দেয়।
দরজা খুলে বেরিয়ে যায়,ইশায়া পড়ে রয় নিথর।
দরজাটা সজোরে বন্ধ হয়।
ভীর একবারও পেছনে ফিরে তাকায় না।
তার হাঁটার শব্দ করিডোরে প্রতিধ্বনি তোলে।
রাগ তার শরীরে আগুন হয়ে জ্বলছে।
সে আমার বন্দিনী পর্ব ৭৮
ভীর সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামে।প্রাসাদের বিশাল হলরুমে নেমে আসে নিস্তব্ধতা।
সবাইকে নিচে আনো।একটা মাত্র নির্দেশ।
দশ মিনিটের মধ্যে পুরো ম্যানশন কাঁপতে থাকে অদৃশ্য আতঙ্কে।
হলরুমের মাঝখানে কালো লেদারের চেয়ারে ভীর বসে।
পা দুটো ফাঁক করে, কনুই চেয়ারের হাতলে।
তার চোখ র*ক্তলাল।ভয়ংকর দেখাচ্ছে তাকে।
চারপাশে সারি করে দাঁড়িয়ে আছে গার্ডরা।
ইশায়ার দেখাশোনার জন্য নিয়োজিত পাঁচজন মহিলা গার্ড সামনে।
পেছনে বাকি গার্ডরা।সবাই লাইনে,সোজা হয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ।
পুরো হলরুমে পিনপতন নীরবতা।
