Home সে আমার বন্দিনী সে আমার বন্দিনী পর্ব ৮০

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৮০

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৮০
তানিয়া হুসাইন

হলরুমে নীরবতা।
কেউ কোনো কথা বলছে না।
এদিকে ভয়ে এলিজার দম বন্ধ হয়ে আসছে।
সে জানে তার হাতে আর সময় নেই।আর বাঁচতে পারবে না সে।তার সব খেলা শেষ।কিন্তু একটা কাজ অন্তত সে করতে পেরেছে।
এদিকে চিৎকার চেচামেচি বারছে এক এক জনকে প্রশ্ন করা হচ্ছে।
শরীর হিম হয়ে আসছে এলিজার।মৃ*ত্যুর ভয় কার না আছে?কিন্তু এলিজার এখানে কিছু করার নেই।
সে পালাতেও পারবে না।
সে যদি এখান থেকে এক পাও নড়ে তাহলে তাকে মুহূর্তে গু*লি করে মেরে ফেলবে ওরা।
তার গলা শুকিয়ে গেছে ভয়ে।সে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে লাইনের এক পাশে অপেক্ষা করছে নিজের নাম উচ্চারণের।

ভীর রাগে হিসহিস করছে।
তার এত সুন্দর সাজানো, গোছানো সব কিছু মুহূর্তেই ধ্বংস হয়ে গেছে।
যার কারণে এটা হয়েছে সে তাকে আস্ত রাখবে না।
এমন ভয়ংকর মৃ*ত্যু দেবে যাতে মৃ*ত্যু নিজেও ভয় পায়।
নিকো চিৎকার করতে থাকে।
একজন একজন করে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়।
কে দায়িত্বে ছিল?রিপোর্ট কোথায়?ক্যামেরা কেন অফ ছিল?ডেটা কার কাছে গেছে?
যে কাজের দায়িত্ব যে ছিলো সে সঠিক জবাব দিতে না পারলেই নিক গু*লি করছে।
এদিকে সবাই ভয়ে কাঁপছে প্রানের ভয়ে।

_____ভীর বেরিয়ে যাওয়ার পর লুসিয়া রুমে ঢুকে।
ইশায়ার এই অবস্থা দেখে
লুসিয়া ছুটে গিয়ে ডাক্তার এনাকে নিয়ে আসে.
ডাক্তার এনা ইশায়াকে দেখে। ইশায়ার এরকম বিধ্বস্ত অবস্থা দেখে তার খুব খারাপ লাগে।
কি ক*রুন অবস্থা করেছে ওই জানোয়ার বাচ্চা মেয়েটার।
ইশায়ার সুন্দর ফর্সা মোমের মত শরীরটার জায়গায় জায়গায় লাল লাল ছোপ, কালচে দাগ বসে গেছে।
কিছু কিছু জায়গায় চামড়া কেটে রক্ত বের হচ্ছে।
ঠোঁট ফেটে গেছে, চোখের কোণে শুকিয়ে থাকা অশ্রুর রেখা, নিঃশ্বাসটা ভাঙা ভাঙা।
ডা. এনা ধীরে ধীরে তার পাশে বসে। কণ্ঠে কঠোরতা থাকলেও চোখে মমতা।লুসিয়া, স্যালাইন রেডি করো। আর ক্লিন গজ দাও।প্রথমে তিনি ইশায়ার নাড়ি পরীক্ষা করেন। দুর্বল কিন্তু চলছে।তারপর রক্তচাপ মাপেন। মাথার পাশে জমে থাকা শুকনো রক্ত পরিষ্কার করেন।কাটা জায়গাগুলো অ্যান্টিসেপটিক সলিউশন দিয়ে ধুয়ে দেন।
ডা. এনা শান্ত গলায় বলেন,
___ও শকে গেছে। শরীর অতিরিক্ত ট্রমা সহ্য করতে পারেনি।তিনি স্যালাইনের ক্যানোলা সেট করেন হাতে। ধীরে ধীরে ফ্লুইড নামতে থাকে শিরায় শরীরের পানিশূন্যতা কাটানোর জন্য।
ইনজেকশন দেওয়ার আগে তিনি ইশায়ার চোখের পাতা তুলে পিউপিল পরীক্ষা করেন। আলো ফেলেন ছোট টর্চ দিয়ে। প্রতিক্রিয়া ধীর, কিন্তু আছে।

__গুড… এখনও রেসপন্স করছে।ইনজেকশন ধীরে ধীরে পুশ করেন।
তারপর ভেজা ঠান্ডা কাপড় কপালে চাপা দেন।
গলার পাশে ও কব্জিতে হালকা রাবিং রক্ত সঞ্চালন বাড়াতে। কয়েক সেকেন্ড তারপর মিনিট,সময় গড়ায়
ঘরের ভেতর নিঃশব্দ টানটান অপেক্ষা।
___ইশায়া… শুনতে পাচ্ছো? ডা. এনা নরম গলায় ডাকেন।
পালকের মতো কাঁপতে থাকে চোখের পাতা।
তারপর ধীরে খুব ধীরে… চোখের কোণে জমে থাকা যন্ত্রণা নিয়ে ইশায়া চোখ মেলে।চোখে ভয়।
অপরিসীম আতঙ্ক।আর এক অদ্ভুত শূন্যতা।
জ্ঞান ফেরার সঙ্গে সঙ্গে বুকের ভেতর জমে থাকা কষ্ট যেন আবার জীবন্ত হয়ে ওঠে।সে নড়তে যায় কিন্তু ব্যথায় মুখ বিকৃত হয়ে যায়।ডা. এনা তার কাঁধে হাত রাখেন শান্ত হও।
___ওকে নজরে রাখবে। জ্বর উঠতে পারে। শরীর ট্রমায় আছে।বলে ডাক্তার চলে যায়।
____মারিয়া এলেনা প্রথমে ভীরের সামনে এসে দাঁড়ায়। তার চোখে অস্বস্তি, ঠোঁট শুকনো।সে মাথা নিচু করে সব জানায়।
ভীর চুপ করে শুনছিল। তার চোয়াল শক্ত।
মারিয়া এলেনার কথা শেষ হওয়াএ পর কায়রা এগিয়ে আসে।
তার গলায় দ্বিধা থাকলেও চোখে দৃঢ়তা।

___বস আমার একটা সন্দেহ ছিল ওই মেয়েড়াকে ঘিরে,এলিজাকে দেখিকে বলে।
কথাটা বলতেই এলিজার মুখের রঙ পাল্টে যায়। তার আঙুলগুলো কাঁপছে।
ডিয়েগো ঠান্ডা গলায় বলে,
___এলিজা, সামনে আসো।ধীর পায়ে এলিজা সামনে আসে। যেন মৃ*ত্যুদণ্ড শুনতে যাওয়া কোনো আসামি।
ভীরের সামনে দাঁড়াতেই তার বুক ওঠানামা করছে দ্রুত।
ভীর নিচু, কর্কশ স্বরে জিজ্ঞেস করে,
___কি বলবে তুমি?
এলিজার গলা কাঁপছে। তবুও নিজেকে সামলে বলে,
আমাকে ম্যাম বলেন সব কাজ করতে… তাই আমি করি।
তার চোখে জল চিকচিক করে ওঠে।
___আমি এসব বিষয়ে কিছু জানিনা বস।
কথাগুলো যতই সাজানো হোক, ভয় তার গলা চেপে ধরেছে।
এর মাঝেই রানীয়া হঠাৎ বলে ওঠে,
___বস, লাস্ট বার ওই গেছে ম্যাম এর রুমে।
ভীরের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ছুরির মতো গিয়ে বিঁধে এলিজার চোখে।
সেই দৃষ্টি থেকে পালানোর জায়গা নেই।
মারিয়া এলেনা আবার বলে ওঠে,

___ও সবসময় ম্যামের সাথে থাকে। ম্যাম সবসময় ওর সাথে কথা বলে, বস। আমাদের কোনো কাজই ম্যাম পছন্দ করেন না।
কায়রা এবার স্পষ্ট গলায় বলে,
___ ওকে আমি অনেক সময় কাউন্সিলিং রুমের চারপাশে দেখেছি। আমার প্রথমেই সন্দেহ হয়েছে, বস। কিন্তু ম্যামের সাথে থাকার জন্য কিছু বলতে পারিনি ম্যামের কারনে।
প্রতিটা শব্দ এলিজার গলায় দড়ির মতো জড়িয়ে যাচ্ছে।
হঠাৎ নিকো এগিয়ে আসে। এক ঝটকায় বন্দুক বের করে এলিজার মাথায় চেপে ধরে।
শক্ত গলায় বলে,
___মিথ্যে বললে এখানেই শেষ করে দেব!
এলিজা কেঁপে ওঠে। হাঁটু ভেঙে পড়ে যাওয়ার উপক্রম।
ভীর হাত তুলে নিকোকে থামায়।
তার চোখ এখনও এলিজার উপর স্থির।
___ব*ন্দুক নামা, নিক। এখন না।
ঠিক তখনই ডিয়েগো দ্রুত ভেতরে ঢুকে আরেকটা ল্যাপটপ এনে ভীরের সামনে রাখে।

___ বস… এটা দেখুন।
ভীর ল্যাপটপ খুলে ফুটেজ চালু করে।ঠিক সে বেরিয়ে যাওয়ার পর থেকে দেখা শুরু করে।
ইশায়ার উঠা এলিজার আসার পরের সময়টা। সবকিছু,স্ক্রিনে দেখা যায় ইশায়া ব্রেকফাস্ট না করে কি একটা করছিলো।ক্যামেরার সামনে পিঠ হওয়ায় পুরোটা দেখা যায় না।কিন্তু তার করা কাজগুলো… একটার পর একটা সম্পূর্ণ দৃশ্যমান।রুমে পিনপতন নীরবতা।এলিজার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে।ভীর ধীরে ধীরে স্ক্রিন থেকে চোখ তুলে তাকায় এলিজার দিকে।সে দৃষ্টিতে আগুন নেই বরং তার থেকেও ভয়ংকর কিছু আছে।
এলিজার ঠোঁট কাঁপে।কথা বের হয় না।তার কপাল বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ে।
মাফিয়া সাম্রাজ্যে বিশ্বাসঘাতকতার শাস্তি একটাই।
ভীর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়।তার জুতোর শব্দ মার্বেলের উপর ঠকঠক করে বাজে।সে এলিজার সামনে এসে দাঁড়ায়।
বাইরে আকাশ কালো হয়ে আসছে।ঝড় নামার আগে যেমন নিস্তব্ধতা নামে… ঠিক তেমন।আজ সেই ঝড় নামবে আলভারেয স্টেইটে।
স্যালাইনের সুই এখনো হাতে। শরীরটা কাঁপছে তবুও ইশায়া নিজের সবটুকু শক্তি দিয়ে উঠে বসে।
মাথা ঘুরছে, দৃষ্টি ঝাপসা। তবু বুকের ভেতর একটাই নাম এলিজা।
তার এলিজার জন্য ভয় হচ্ছে।তার জন্য যদি ভীর এলিজাকেও মেরে ফেলে এই ভাবনাটা বিদ্যুতের মতো কাঁপিয়ে দিচ্ছে তাকে।

___না… ফিসফিস করে ওঠে ইশায়া।
এলিজার কিছু হতে দিবোনা আমি।
ইশায়া এলিজাকে নিজের মতো ভাবছে সে যেভাবে তার পরিবার হারিয়েছে বোন হারিয়েছে।
এলিজা ও তো নিজের আপন মানুষকে হারিয়েছে।তাইতো প্রতিশোধ নিতে এই পথ অবলম্বন করেছে।
হাতের ক্যানোলা টান লেগে ব্যথা করে। তবুও ইশায়া বিছানার কিনারা ধরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। হাঁটু ভেঙে পড়ে যাওয়ার উপক্রম তবু নিজেকে সামলায়।
তার জন্য যদি ভীর এলিজাকেও মেরে ফেলে আবারোম
একবার তার জন্য সাফা মারা গেছে ইশায়া আর এরকম চায় না ইশায়া উঠে যেতে নেয়, লুসিয়া তাকে আটকায়।
___ম্যাম! আপনি কি করছেন?লুসিয়া ছুটে এসে তাকে ধরে ফেলে।
ম্যাম আপনার শরীর ভালো না আপনি উঠবেন না।
ইশায়ার চোখ লাল, দৃষ্টি উন্মত্ত।

___ছাড়ো… আমাকে যেতে হবে।
লুসিয়া মরিয়া হয়ে ধরে রাখে ইশায়াকে।
আপনি বাইরে যেতে পারবেন না। বসের নিষেধ আছে। আপনাকে এখানেই থাকতে হবে। এখন নিচে যাওয়া যাবেনা।
ইশায়া থামেনা।
তার মাথার ভেতর শুধু একটাই ছবি সাফার মুখ র*ক্ত… এলিজার সাথে সে এরকম টা হতে দিবে না।
লুসিয়া আবারও বাধা দেয়।
____প্লিজ ম্যাম, আপনি এখন যেতে পারবেন না।
ইশায়া হঠাৎ করে সমস্ত শক্তি জড়ো করে লুসিয়াকে ধাক্কা দেয়।
ধাক্কাটা খুব জোরালো না কিন্তু তার নিজের মরিয়া চেষ্টার তীব্রতায় লুসিয়া ভারসাম্য হারিয়ে পেছনে সরে যায়।
স্যালাইনের স্ট্যান্ড ধাক্কা খেয়ে কেঁপে ওঠে।
সুঁই টান পড়ে হাতের চামড়া ছিঁড়ে সামান্য র*ক্ত বের হয়।
কিন্তু ইশায়া থামে না।
সে দ্রুত বেরিয়ে যায় রুম থেকে।
পায়ের নিচে ঠান্ডা মার্বেল ফ্লোর।প্রতিটা পদক্ষেপে ব্যথা শরীর ছিঁড়ে ফেলছে।বুকের ভেতর শ্বাস কাঁপছে।
দেয়ালের সঙ্গে ভর দিয়ে দৌড়ানোর চেষ্টা করে ইশায়া।
চুল এলোমেলো, ব্যান্ডেজের ফাঁক দিয়ে লাল দাগ উঁকি দিচ্ছে।ইশায়ার মাথায় একটাই চিন্তা তাকে বাচাতে হবে এলিজাকে,যে করেই হোক।নিজের জান দিয়ে হলেও তাকে বাচাবে।
সিঁড়ির ধাপে এসে সে থামে । নিচ থেকে ভেসে আসছে শব্দ ইশায়ার বুক ধকধক করে ওঠে।
ভাঙা শরীর নিয়েও সে সিঁড়ির রেলিং ধরে দ্রুত নামতে শুরু করে।প্রতিটা ধাপে তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠছে।
চোখে পানি চলে আসে ব্যথায়।
তবুও সে থামে না।
কারণ সে জানে আজ যদি দেরি হয়,
তাহলে হয়তো এলিজাকে বাঁচানো যাবে না।

____ঘরটা ভারী হয়ে আছে বা*রুদের গন্ধে, আতঙ্ক, আর জমাট রাগে।
রাজভীরের হাতে ধরা রি*ভলবারের নল সোজা এলিজার কপালের দিকে তাক করা।
ভীর গম্ভীর গলায় বলে,
___কার লোক তুই? কে পাঠিয়েছে তোকে? মাতেও??
এলিজার শরীর থরথর করে কাঁপছে। ঠোঁট শুকিয়ে সাদা। চোখে জল জমে আছে, কিন্তু শব্দ বেরোচ্ছে না।
ভীর রিভলবারের ট্রিগার টানে। ধাতব শব্দটা নিস্তব্ধতাকে ছিঁড়ে দেয়।
____বল! কোথায় ওরা? কে কে জড়িত আছে এর সাথে? আর কে আছে?এই প্যালেসে কিভাবে ঢুকলি।
ভীর যেই কিছু করতে যাবে,
ঠিক তখনই,
___থামুন!চিৎকার করে ওঠে ইশায়া।
সবাই থমকে যায় এক মুহূর্তের জন্য।
ইশায়ার গলা শুনে ভীর পিছনে তাকায়।
এই মুহূর্তে এখানে ইশায়াকে এখানে দেখে তার রাগের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। বুকের ভেতর জমে থাকা আগুন দ্বিগুণ জ্বলে ওঠে।
কি করবে সে এই মেয়েকে?
আর কত আঘাত করবে এই ছোট্ট শরীরে?এত অবাধ্য কেন এই মেয়ে?
ভীরের রাগ আরও বাড়ে ইশায়ার এই বিদ্ধস্ত অবস্থা দেখে। মাথার ব্যান্ডেজ, গালে থা*প্পড়ের দাগ, ঠোঁট কেটে শুকনো রক্ত। শরীরটা দুর্বল, তবু চোখে সেই একই জেদ।
মারিয়া এলেনা দ্রুত এগিয়ে এসে ইশায়াকে ধরে ফেলে।

___ম্যাম, আপনি এখানে এসেছেন কেনো? আপনার শরীর ভালো নেই। রুমে চলুন।
রানিয়া ও এগিয়ে আসে, দু’জনে মিলে তাকে ধরে রাখে।
কিন্তু ইশায়া তাদের সরিয়ে সামনে এগোতে চায়।
পা কাঁপছে, তবু থামে না।
ইশায়া যেতে চাইলে তারা তাকে শক্ত করে ধরে।
ইশায়া রাগি গলায় বলে,
___ছাড়ো আমাকে!কিন্তু তারা ছাড়ে না।ভীর দাঁড়িয়ে সব দেখছে।ইশায়ার এই জেদ এই বেপরোয়া সাহস দেখে তার ধৈর্যের সীমা পেরিয়ে যাচ্ছে।
এটাই সমস্যা। সে রাগ কন্ট্রোল করতে পারে না। আঘাত করে ফেলে।
আর পরে ওর এই করুন মুখ, ভেজা চোখ তার সহ্য হয় না।
ভীরের সব রাগ গিয়ে পড়ে এলিজার উপর।সব তো ঠিক ছিলো।আজ ওর কারণেই এসব হয়েছে।
না। ও না আসলে ইশায়া জানতো না।
ইশায়া এরকম কিছু করতো না।সব ঠিক থাকতো
সে ও আঘাত করতো না।
ইশায়ার এই চেহারা মাথায় ক্ষত, ফুলে থাকা গাল দেখে ভীরের রাগ আরও তরতর করে বাড়তে থাকে।
কিন্তু সেই রাগ পুরোটা এলিজাকে ঘিরে।
ভীর আবারও রিভলবারটা শক্ত করে ধরে।
চোখে হিংস্র আগুন।

__শেষবার জিজ্ঞেস করছি… বল।
ইশায়া যখন দেখে এভাবে ভীরকে থামানো যাবে না, তার কণ্ঠ, তার কান্না, তার অনুরোধ কিছুই রাজভীর আলভারেযকে থামাতে পারবে না।ইশায়া ভাবতে থাকে কি করবে সে
তার চোখ হঠাৎ থেমে যায় সেন্টার টেবিলের উপর।
একটা রি*ভলবার রাখা।
মুহূর্তের মধ্যে সে মারিয়া আর রানিয়ার হাত ঝটকা মেরে ছাড়িয়ে দৌড়ে গেল সেখানে। শরীর এখনো দুর্বল, মাথার ক্ষত ধুকধুক করছে তবু সে থামলো না। কাঁপতে থাকা আঙুলে সেটা তুলে নেয়।
তারপর ভীরকে উদ্দেশ্য করে বলে,

___থা… থামুন!
ইশায়ার হাত কাপছে। বুকের ভেতর হৃদস্পন্দন এত জোরে যে মনে হচ্ছে পুরো ঘর শুনতে পাবে,
ভীর ঘুরে তাকায়।
তার চোখে ক্রোধ।
ইশায়ার হাতে ব*ন্দুক দেখে ভীর নিজের হাতে ধরা রি*ভলবারটা মাথার পাশে ঠেকিয়ে কপালে হালকা ঘষতে ঘষতে তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলে,
___তুই কি ঠিক করেই নিয়েছিস আজ মরবি আমার হাতে? সুখ পেটে সইছে না তোর, তাই না?
তার গলায় রাগ,পরমুহূর্তেই ভীর গর্জে ওঠে বলে,
____নামাও ওটা হাত থেকে, ইশায়া।
তার চিৎকার দেয়াল কাঁপিয়ে দেয়।
হাত থেকে ফেল ওটা,নাহয় আজ তুই ম*রবি আমার হাতে।কিন্তু আজ ইশায়া ভয় পায় না।উল্টো সে ভীরের থেকেও জোরে চিৎকার করে ওঠে,
__মরে যাবো,তার পরেও তোর সাথে থাকবোনা।
তোর সাথে থাকার থেকে মরে যাওয়া ভালো!

___তুই।এই শব্দটা রাজভীরের বুক চিরে ঢুকে যায়।মস্তিষ্কে আঘাত করে।
ইশায়ার মুখে তুই-তুকারি শুনে ভীর নিজের চুল খামছে ধরে। দাঁতে দাত চেপে ধরে নিজেকে নিয়ন্ত্রন করে সে জানে
এখন যদি মেজাজ হারায়, এরপর যা করবে পরবর্তীতে আবার সেই কাজের জন্য তাকে পস্তাতে হবে।
তার চোখ রক্তলাল। তবু সে নিজেকে ধরে রাখার চেষ্টা করছে।
ভীরকে চুপ থাকতে দেখে ইশায়া ব*ন্দুক ঘুরিয়ে নিকোর দিকে তাক করে।
___ছেড়ে দিন এলিজাকে। নাহলে আমি ওকে মেরে ফেলবো।ছাড়ুন বলছি,সরে যান এখান থেকে।ঘরের সবাই স্তব্ধ।নিকো এক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকে ইশায়ার দিকে।
তারপর সোফায় গিয়ে বসে সে ভাবলেশহীন। পায়ের ওপর পা তুলে আয়েশ করে হেলান দেয়।যেন এই দৃশ্যটা সে উপভোগ করছে।তার ঠোঁটে হালকা বাঁকা হাসি।
ইশায়া আবার চিৎকার করে ওঠে,

___ছেড়ে দিন বলছি ওকে। নাহলে কিন্তু আমি গু*লি করবো।
তার কণ্ঠ কাঁপছে।
এদিকে ইশায়া ঠিকমতো ব*ন্দুকটা ধরতেও পারছে না। তার হাত এতটাই কাঁপছে যে ব*ন্দুকের নল বারবার নিচে নেমে যাচ্ছে। আঙুল ট্রি*গারে ঠিকভাবে বসছে না। ঘামে ভিজে যাচ্ছে হাতের তালু।
ভীর তাকিয়ে আছে ইশায়ার দিকে,
ভীরের চোখ শুধু ইশায়ার হাতে ধরা ব*ন্দুকের দিকে।
ইশায়া যদি নিজের কিছু করে ফেলে? এটাই ভাবছে সে।
___ এলিজার বুকের ভেতর লতুম আশার আলো জ্বলে উঠেছে। এটাই সুযোগ,এটাই তাকে কাজে লাগাতে হবে।
আজ না হলে আর কখনো না।
ইশায়ার মাথায় কিছুই নেই।
না ভয়, না ভবিষ্যৎ, না নিজের অস্তিত্ব।শুধু একটা বেপরোয়া শূন্যতা।তার মাথায় শুধু এটাই ঘুড়ছে তাকে এলিজাকে বাচাতে হবে।
ভীর নিজের মাথা ঠান্ডা করার চেষ্টা করে।
নিচু গলায় বলে,

___ছেড়ে দিবো ওকে… হাত থেকে নামাও এটা।
ইশায়া মাথা নেড়ে মানে না।চোখ দুটো রক্তাভ।
___আপনি ছাড়ুন আগে।
কায়রা সাবধানে এগিয়ে এসে ইশায়াকে ধরতে যায়।
ইশায়া তৎক্ষণাৎ সরে যায়, শক্ত গলায় বলে,
__আমার কাছে আসবেনা।
নিককে এভাবে বসে থাকতে দেখে ইশায়ার বুক কেঁপে ওঠে।সে বুঝতে পারছে না কি করবে, এদের সাথে সে পেরে উঠবে না সেটা জানে।
ইশায়া নত হয় আরেকটা ব*ন্দুক নিতে টেবিল থেকে।ওটা হাতে নিতে ইশায়া ঝুকতেই কায়রা তাকে ধরতে নেয়…
ভীর দৌড়ে আসে ইশায়াকে থামাতে,
কিন্তু ইশায়া ব*ন্দুক দিয়ে কায়রার মাথায় আঘাত করে বসে।কায়রা মাথা চেপে বসে পরে।
ভীর কাছে আসতেই ইশায়া পেছনে সরে যায়।
চোখে বন্য আতঙ্ক আর উন্মাদ দৃঢ়তা।
নিজের মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে চিৎকার করে বলে,

___আসবে না আমার কাছে!
ইশায়া নিজের দিকে ব*ন্দুক ঠেকাতেই ভীর থেমে যায়।
থামতে বাধ্য হয়।
তার হাত শক্ত হয়ে আসে।
ইশায়া অপর হাতের ব*ন্দুকটা এলিজার দিকে ছুড়ে দেয়।
এলিজার ধরে ফেলে সেটা,অভ্যাসসিদ্ধ নিখুঁত ভঙ্গিতে।
এতোক্ষণ নিক বসে থাকলেও এবার সে উঠে দাঁড়ায়।
তার চোখ সরু হয়ে আসে।
কারণ সে জানে এলিজা কোনো সাধারণ মেয়ে না।
সে প্রফেশনাল।
মুহূর্তের ভেতরেই গার্ডরা ভীরকে ঘিরে দাঁড়ায়।
একটা বৃত্ত তৈরি হয়।
কারণ যদি এলিজা আক্রমণ করে বসে প্রথম টার্গেট হবে ভীর।
কিন্তু ভীরের চোখ এখনও শুধু এক জায়গায়
ইশায়ার কপালে ঠেকানো বন্দুক।
সে মা*ফিয়া।সে অসংখ্যবার গু*লি চালিয়েছে।এরকম পরিস্থিতি তার কাছে কিছুইনা সে এটাই ভাবছে ইশায়ার যদি কিছু হয়।
নিকো কোনো দ্বিধা করেনি।কারন এলিজা যেকোন সময় যে কারোর উপর আক্রমন করবে।
ভীরের কাছে ইশায়া প্রায়োরিটি হলেও নিকোর কাছে ভীরের আগে কিছুই না।
নিকো গু*লি চালায় ইশায়ার হাতে,
মুহূর্তেই এলিজার হাত থেকে ব*ন্দুকটা ছিটকে মেঝেতে পড়ে ।
রক্ত গড়িয়ে নামতে শুরু করল তার কবজি বেয়ে।
ইশায়া কেঁপে উঠে গু*লির শব্দে।
এলিজা যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠে,
ইশায়া কিছু বলতে যাবে,
তার আগেই নিকো ঠান্ডা, ধারালো কণ্ঠে বলে উঠল,
___তুমি কি চাইছো ইশায়া তোমার জন্য তোমার পরিবারের কিছু হোক? এমন কিছু করোনা যার পরিণাম তোমার পুরো ফ্যামিলিকে ভোগ করতে হয়। আমার একটা ফোন কলে তোমার পুরো পরিবার নিচিহ্ন হয়ে যাবে এটা মনে রেখো।
হলরুমের বাতাস ভারী হয়ে উঠে।
ইশায়া হেসে বলে,

___এই ভয় আর আমাকে দেখিয়ে লাভ হবেনা। আমি জানি আমি ওদেরকে বাঁচাতে পারবো না। আমি থাকলেও কি আর না থাকলেও কি। এর থেকে ভালো এগুলো দেখার থেকে ম*রে যাওয়া।
এলিজা হাত চেপে মাটিতে বসে আছে। রক্ত বের হচ্ছে থামছে না।তার চোখে জেদ।
আবারও ঝুঁকে ব*ন্দুকটা তুলতে যাবে এর আগেই নিকো এগোয়।
ঠিক তখনই ইশায়া চিৎকার করে ওঠে,
____ভীর! ওকে থামতে বলুন! আমি কিন্তু সত্যি বলছি, আমি নিজেকে শেষ করে দিবো।থামতে বলুক ওকে,ইশায়া গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে বলতে থাকে।
এবার কিন্তু আমি একা না।
ইশায়ার কণ্ঠ কাঁপছে।
এলিজার কিছু হলে আপনি কিন্তু আপনার সন্তানকেও হারাবেন।আমি শেষ করে ফেলবো।
শব্দটা যেন বোমার মতো বিস্ফোরিত হলো হলরুমে।
সন্তান। ভীর স্থির হয়ে যায় ইশায়ার কথায়।
তার চোখে প্রথমবারের মতো ভয় দেখা গেল।
সে কি ঠিক শুনেছে?
ইশায়া ধীরে ধীরে বন্দুকটা নিজের পেটের উপর চেপে ধরে।
ভীরের শরীর ঝাঁকিয়ে উঠে।তার মাথার ভেতর বাজছে
সন্তান।
নিকোও থমকে যায় এই কথা শুনে। তারপর কিছু একটা ভাবে সে এক সেকেন্ড, দুই সেকেন্ড।
তারপর সে ডিয়েগোর দিকে সূক্ষ্ম একটা ইশারা করল।
মুহূর্তেই সবাই নিজের নিজের অবস্থান বদলে নিল।
গার্ডরা ছড়িয়ে পড়ল।
এলিজা দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠল,

___ইশায়া, তুমি গু*লি চালাও। শেষ করে দাও তাদের যারা সাফাকে মেরেছে। এটাই শেষ সুযোগ। আর যদি না পারো, তাহলে নিজেকে শেষ করে দাও। এর পর এই জানোয়া….
তার কথা শেষ হওয়ার আগেই নিভে যায় প্যালেসের সব লাইট।অন্ধকার হয়ে ওঠে চারপাশ।
তারপর একসাথে কয়েকটা গু*লির শব্দ চিৎকার।
লুসিয়া আর মারিয়া এলেনা লাইট অফ হওয়ার সাথে সাথেই ঝাঁপিয়ে পড়ে ইশায়ার উপর।
তার হাত চেপে ধরে।
ছিনিয়ে নেয় ব*ন্দুকটা।
সবকিছু এত দ্রুত ঘটে যে ইশায়া বুঝে উঠতে পারেনি কি থেকে কি হয়ে গেল।
অন্ধকারের ভেতর পাঁচটা পরপর গু*লির শব্দ শোনা যায়।
তারপর নিস্তব্ধতা।
লাইট আবার জ্বলে ওঠে।আবার আলোকিত হয় চারপাশ।মেঝেতে এলিজা লুটিয়ে পড়ে আছে।
নড়ছে না।তার চারপাশে ছড়িয়ে আছে র*ক্ত।
নিকোর হাতে এখনো ধোঁয়া ওঠা ব*ন্দুক।
ইশায়া তাকিয়ে থাকেঅস্ফুটে আওড়াতে থাকে,

___না… না… না…
কাঁপতে কাঁপতে কেঁদে ওঠে সে।সে পারেনি।সে বাঁচাতে পারেনি এলিজাকে।ধীরে ধীরে সবাই তাকে ছেড়ে দেয়।
ভীর এখনো দাঁড়িয়ে আছে, পাথরের মতো।তার দৃষ্টি আটকে আছে ইশায়ার পেটের দিকে।সেখানে কি সত্যিই তার উত্তরাধিকার?তার এখনো নিজের কানকে বিশ্বাস হচ্ছেনা।
ইশায়া উঠে দৌড়ে এলিজার কাছে যেতে নেয়।
চোখে এক অদ্ভুত আতঙ্ক মনে হচ্ছে এলিজা না, যেন সাফা শুয়ে আছে সামনে।একই জিনিশ চোখে ভাসছে ভীরের।
ইশায়া এলিজার কাছে যেতে নিলেই মাঝপথেই ভীর তার হাত চেপে ধরে।
ঝটকা দিয়ে নিজের দিকে টেনে নেয়। শক্ত করে, যেন ছাড়লেই কাউকে হারিয়ে ফেলবে।
ইশায়াকে ঝাকিয়ে বলে,
___কি বললে তুমি? তার গলা ভারী, কাঁপা।
আমার সন্তান মানে? বলো… বলো কি বলেছো?
ভীর দু’হাতে ইশায়ার গাল আকড়ে ধরে । আঙুলের চাপ শক্ত লাল হয়ে ওঠে চামড়া।
ইশায়া চোখে আগুন নিয়ে তাকায় তার দিকে। গলা কাঁপছে না তার সে অদ্ভুতভাবে স্থির।

___নেই কিছু। নেই। আমি একে রাখবোনা। তোর মতো জানোয়ারের বাবা হওয়ার কোনো অধিকার নেই। আমি রাখবোনা এই সন্তান…আমি রাখবোনা। আমি রাখবোনা।ইশায়া চিৎকার করে একই কথা আওড়াতে থাকে বারংবার।
ভীরের দুনিয়া যেন থেমে যায় ইশায়ার কথায়। তার নিজের কানকে বিশ্বাস হচ্ছেনা।
আমার সন্তান এই দুটো শব্দ তার মাথার ভেতর ধাক্কা খেতে থাকে।
ইশায়ার বাকি কথাগুলো জা*নোয়ার,অধিকার নেই,রাখবোনা কিছুই তার কানে ঢুকছে না।
সে হঠাৎ ইশায়ার মাথা শক্ত করে নিজের বুকে চেপে ধরে। যেন ভয় পাচ্ছে এই মুহূর্তে যদি ছাড়ে, সবকিছু ভেঙে যাবে।স্বপ্নের মতো লাগছে সবকিছু।
ইশায়া ছটফট করে।তার চোখ বারবার এলিজার দিকে যায়।কেন জানি এলিজার মুখে সে সাফাকে দেখছে।
আমাকে ছাড়ুন! ছাড়ুন আমাকে!
সে চিৎকার করতে থাকে, পাগলের মতো।

ভীর কিছুতেই ছাড়ে না।এক মুহূর্তের জন্য সে ইশায়াকে কাঁধে তুলে নিতে যায় তার স্বভাবসিদ্ধ রূঢ় ভঙ্গিতে। কিন্তু মাঝপথে থেমে যায়।তার মাথায় হঠাৎ চিন্তা আসে তার বেবি যদি কষ্ট পায়?যদি আঘাত লাগে?
এই প্রথমবার রাজভীর আলভারেজ যে মানুষ ব*ন্দুকের গর্জনে শহর কাঁপায় সে বুঝতে পারছে না একজন নারীকে কিভাবে ধরতে হয়।ইশায়া চিৎকার করেই যাচ্ছে।তার বুক ওঠানামা করছে দ্রুত।শ্বাস কাঁপছে।
ভীর তাকে সামলাতে পারছে না।শেষমেশ খুব আস্তে।সে ইশায়াকে পাজা কোলে তুলে নেয়।
তার ছোট্ট পাখির পেটে…তার বাচ্চা।বিশ্বাসই হচ্ছে না তার।ভীর ধীর পায়ে রুমের দিকে হাঁটে। চারপাশে সবাই নিঃশব্দ। কেউ সাহস করছে না চোখ তুলতে।

ইশায়া কোলে থেকেও ধাক্কা দেয়।আমি রাখবোনা… শুনছেন? আমি রাখবোনা!তার চোখে জল।
ভীরের চোয়াল শক্ত হয়ে যায়।
সে মাথা নিচু করে ইশায়ার পেটে এক ঝলক তাকায়।
তার ভেতর দিয়ে এক অচেনা অনুভূতি বয়ে যায়।
রুমে ঢুকে বিছানায় খুব ধীরে ইশায়াকে শুইয়ে দেয়। যেন পৃথিবীর সবচেয়ে দামী জিনিসটা তার হাতে।
ইশায়া উঠে বসতে যায়।
ভীর দ্রুত তার কাঁধে হাত রাখে।গলা নিচু করে বলে,

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৭৯

___চুপ… একদম চুপ। আমার সন্তানের কিছু হলে আমি কাউকে ছাড়বোনা তোমাকেও না।তার চোখে আগুন।
ইশায়া তাকিয়ে থাকে তার দিকে তারপর বলে,
___এটা তোর সন্তান না… এটা আমার শরীর। আমার সিদ্ধান্ত।

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৮১