রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ৫ (২)
সিমরান মিমি
স্পর্শীয়া রেগে, তেজের সহিত প্রস্থান করেছে মাঠ। বারবার অনুরোধ করেও থামানো যায় নি তাকে। এমনকি মানাতেও পারে নি। এ নিয়ে মোটেও আফসোস নেই পাভেল শিকদারের। শুধু ভয় লাগছে শেষের কথাগুলো ভেবে। যখন রেগে শেষের কড়া কথাগুলো স্পর্শীয়া তাকে শোনাচ্ছিলো, তখন কলেই ছিলো পরশ শিকদার। নিশ্চয়ই সবকিছু শুনেছে। এসব যে নাটক ছিলো তাও হয়তো বুঝতে বাকি নেই। ঘটনাটা যে আরো গুরুতর দিকে এগোচ্ছে সেটা ভেবেই শঙ্কা হচ্ছে। কেনো যে এই পরিকল্পনা সে করতে গেলো? এর চেয়ে ভাইকে বুঝিয়ে, ক্ষমা – টমা চেয়ে হাজার দুয়েক হলেও পেয়ে যেতো। ফোন টাকে হাতে নিয়ে উদাস চিত্তে বসে রইলো পাভেল। বন্ধুরা কল দিচ্ছে সকাল থেকে। হয়তো কোথাও বের হবে। কিন্তু তার পক্ষে যাওয়া কিছুতেই সম্ভব না। গেলেই বড়সড় একটা খরচে বাঁধবে। এর থেকে ফোন রিসিভড না করাই শ্রেয়।
মেজাজ খারাপ স্পর্শীর। পাভেলের জন্য রাগ, মায়া দুটোই কাজ করছে। এ কেমন পরিবার পেয়েছে ছেলেটা? একটুতেই বাড়ি থেকে দূর দূর করে তাড়িয়ে দেয়, হাত খরচ কমিয়ে দেয়। একবার ও ভাবে না ছেলেটা খাবে কি? এমনকি এক্সিডেন্টের কথা শুনেও একটু চিন্তিত হলো না! যেনো এ সব কিছু দুধভাত! বিশেষ করে রাগ হচ্ছে পাভেলের বড় ভাইয়ের উপরে। সে তো ছোট নয়। নিশ্চয়ই বয়স্ক, ম্যাচিয়্যুর, দায়িত্বশীল কোনো পুরুষ হবে। বাচ্চা, কাচ্চাও আছে হয়তো। থাকতেই পারে, পাভেলের ও বড়। সে কি আর ছোট দুধের শিশু হবে? কিন্তু মূল কাহিনি বয়স নিয়ে নয়। তার আচরণ নিয়ে। এমন একজন মধ্যবয়স্ক পুরুষ কি করে তার সাথে এমন ব্যবহার করতে পারলো? কিছু না জেনে, না বুঝে হুট করেই চোর বলে দিলো? অসহ্যকর!
ক্লাস শেষ করে বাড়িতে ঢুকে আরো হতবাক হয়ে গেলো স্পর্শী। মন খারাপেরা জেঁকে ধরলো প্রবল ভাবে। মায়ের রুমে বসে আছে সোভাম। তার স্থির দৃষ্টি জানালার বাইরে। বিছানার এক কোণে পিপাসা নিজের মাথা নিচু করে বসে আছে। দুজনের কপালেই চিন্তার ভাঁজ। আর এটা যে সে চিন্তা নয়, যাকে বলে দুশ্চিন্তা। যেনো কোনো ঘটনা নিয়ে দৃঢ়ভাবে শঙ্কায় ভুগছে দুজন।
স্পর্শীয়া বিভ্রান্ত পায়ে এগিয়ে গিয়ে বসলো ভাইয়ের পাশে। চিন্তিত কন্ঠে জানতে চাইলো,
– কিছু কি হয়েছে? তোমরা এমন চিন্তিত কেনো?
সোভাম এক পলক তাকিয়ে মায়ের দিকে দৃষ্টিপাত করলো। পিপাসা নিজেকে সামলে ঠোঁটে হাসি ফুটালো। বললো,
– সোভামের চাকরি হয়ে গেছে।
স্পর্শী হা হয়ে তাকিয়ে রইলো। এটা তো আনন্দের সংবাদ। তাহলে দুজনেরই মুখ গোমড়া কেনো? ভাইয়া কি আবারো মাকে পীড়া দিচ্ছিলো পার্লার ছাড়ার জন্য। সে মায়ের দিকে তাকিয়ে বললো,
– চাকরি হয়ে গেছে? এটা তো ভালো খবর। তাহলে তোমরা দুজন মন খারাপ করে কেনো আছো? আর কোন কোম্পানিতে চাকরি হলো?
-কোনো কোম্পানিতে চাকরি হয়নি। শিক্ষক নিবন্ধনের রেজাল্ট দিয়েছে। পিরোজপুর স্কুল এন্ড কলেজে বাংলা বিষয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে সুপারিশ পেয়েছে।
উৎফুল্ল হলো স্পর্শী। খুশিতে সারা মুখ চকচক করছে। উত্তেজনা নিয়ে বলে উঠলো,
– সিরিয়াসলি!আমার তো বিশ্বাসই হচ্ছে না। এক্সাম টাইমে নকল করেছিলি নাকি? আর সেসব নাহয় বাদ, এটা নিয়ে এমন মনমরা কেনো তোমরা?
সোভাম পূর্বের মতোই নির্বিকার। পিপাসা সবটা ধামাচাপা দিতে মলিন গলায় বলে উঠলো,
– পিরোজপুর তো অনেক দূর। অজানা- অচেনা জায়গায়, অপরিচিত মানুষদের মধ্যে ও কি থাকতে পারবে? তার উপর দিনশেষে রান্না করে খেতে হবে। হোটেলের খাবার আর কতদিনই বা খাওয়া যায়?
মা তার আদরের সন্তান কে নিয়ে বড্ড চিন্তিত। কিন্তু এসব দুশ্চিন্তা তো যৌক্তিক নয়। সারাজীবনই কি কাজকর্ম হীন মায়ের আচলের তলায় লুকিয়ে থাকবে ছেলে? স্পর্শীয়া উঠে দাঁড়ালো। গরমে যা তা অবস্থা! হাতে জামা-কাপড় নিয়ে বাথরুমের দিকে অগ্রসর হলো। যেতে যেতে সিরিয়াস ভঙ্গিতে বললো,
– এটা কোনো যৌক্তিক কারন নয়। এসব নিয়ে চিন্তা করাও হাস্যকর। তোমার ছেলে যথেষ্ট বড়! এই বয়সে বিয়ে শাদি করে গোটা দুয়েক বাচ্চা থাকলেও সেটা অস্বাভাবিক কিছু ছিলো না। সেখানে এক বিভাগ ছেড়ে অন্য আরেকটা বিভাগে চাকরির জন্য যাবে, এ টা নিয়ে চিন্তা করা আহাম্মকের কাজ। যদি মনে করো ছেলের উজ্জ্বল একটা ক্যারিয়ার থাকুক, সে ভালো থাকুক, তাহলে যেতে দাও। এমন নয় যে বাচ্চা! যেখানে সেখানে গিয়ে মারামারি লাগাবে। বাকি রইলো রান্না বান্নার ব্যাপার। সে নাহয় পিরোজপুর থেকেই ভালো একটা রাধুনি কে বিয়ে করিয়ে দিলে।
বাথরুমের দরজা আটকে দিলো স্পর্শী। সে চোখের আড়াল হতেই সোভাম মায়ের দিকে তাকালো। বসে আছে মায়ের উত্তরের অপেক্ষায়। পিপাসা নিজেও সিদ্ধান্ত হীনতায় ভুগছে। একপর্যায়ে অনেক ভেবে চিনতে নিজেই সিদ্ধান্ত নিলো সোভাম। শান্ত গলায় মাকে আশ্বস্ত করে বললো,
– তাকে আমি চিনি না। চেনার চেষ্টা ও করি নি কখনো। শুধু নামটাই জানি। তুমি নিশ্চিন্ত থাকো, সোভাম সরদার পিরোজপুরে শুধুমাত্র শিক্ষক হিসেবে যাচ্ছে, আর কিছু নয়। তবে দোয়া করো, খুব তাড়াতাড়ি যেনো অন্য জেলায় ট্রান্সফার হই।
বিকাশ থেকে ছোট্ট একটা মেসেজ এসেছে। ক্যাশ ইন হয়েছে একাউন্টে। এমাউন্ট দশ হাজার দুইশো। এই বাড়তি টাকা টা নিশ্চয়ই ক্যাশ আউট করার খরচ। কিছুক্ষণ হতভম্ব হয়ে বিভ্রান্তিকর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো মেসেজ টার দিকে। বিশ্বাস হচ্ছে না। এতো বড়া আকাম করার পরেও পরশ শিকদার টাকা পাঠিয়েছে, এ যেনো অষ্টম আশ্চর্য। পাভেল খুশি হতে পারছে না। অনুভূতি গুলিয়ে যাচ্ছে। আশা না করেও যখন প্রয়োজনীয় জিনিস গুলো পাওয়া যায় তখন মানুষ অনুভূতি শূণ্য হয়ে তাকিয়ে থাকে ড্যাবড্যাব করে। বড় ভাইয়ের নাম্বার কন্টাক্ট লিস্টের সবার প্রথমে। কিছুটা অসস্তি নিয়ে ফোন দিয়েও কেটে দিলো তা। কি বলবে সে? এটাই যে টাকা দেওয়ার জন্য তোকে ধন্যবাদ! ভাবতেই পেট মুচড়ে উঠলো। হাসি পেয়ে গেলো ভীষণ। তাদের সম্পর্ক মোটেও এতো ফরমাল নয়। ওই মারামারি, ঝগড়াঝাটি, কাড়াকাড়ি তেই অভ্যস্ত। সেখানে হুট করে এতোটা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা অনর্থক। পাভেল লজ্জা পাবে।
ভাইয়ের নাম্বার বদলে কল লাগালো স্পর্শীর নাম্বারে। ওপাশ থেকে রিসিভড করতেই আদুরে স্বরে সুর তুলে বললো,
– চড়ুই, উড়ে উড়ে রেডিও কলোনিতে চলে আয়। তোকে নিয়ে কাচ্চি ডাইনে যাবো। ভাইয়া টাকা পাঠিয়েছে।
– আসছি।
দুপুরে খাওয়ার পর ঘুমিয়ে পড়েছিলো স্পর্শী। ইদানীং ভীষণ ঘুম পায়। বড়রা বলে মেয়েদের বিয়ের আগে আগে ঘুমেরা হামলা করে। বিছানায় লেগে থাকতে মনে চায়। হচ্ছেও তাই। তাহলে কি শীঘ্রই বিয়েটা হয়ে যাচ্ছে স্পর্শীর ? বিয়ের কথা মনে পড়তেই স্মরণে এলো মাছুদ সাহেবের কথা। ও বাড়ি থেকে কি কিছু জানিয়েছে এখনো? কোনো সাড়াশব্দ তো পাওয়া যাচ্ছে না। যদি কিছু বলে থাকতো, তাহলে নিশ্চয়ই মা সেটা নিয়ে বাড়ি মাথায় তুলতো। তার এতো শান্ত পরিবেশ ভালো লাগছে না। পাশেই শুয়ে আছে পিপাসা। ঘুমোয় নি। একটু পরেই পার্লারের উদ্দেশ্যে বেরোবে। তাকে খোঁচা মেরে বললো,
– উহহহ! মাছুদ সাহেবের কথা মনে পড়ছে প্রচুর। কোথায় হারিয়ে গেলেন তিনি? আচ্ছা মা, ও বাড়ি থেকে কেউ কিছুই বলে নি?
পূর্বের কথা মনে পড়তেই অপমানে থমথমে হয়ে গেলো পিপাসার মুখ। সেই যে গেলো, এরপর আর ফোন দেয় নি ও বাড়ি থেকে। কত গুলো দিন অপেক্ষা করেছে, কিন্তু তাদের কোনো সাড়া নেই। চক্ষুলজ্জায় নিজে থেকেও ফোন দিতে পারেন নি। তার মেয়ে কি ফেলনা? কেনো পছন্দ হবে না। সেদিন ইচ্ছে করছিলো তাদের দেওয়া টাকা দু হাজার ছুড়ে মুখের উপর ফেলতে। কিন্তু তা সম্ভব হয় নি। পরবর্তী নিজে থেকে বিকাশ করেছে টাকা। সাথে হোয়াটসঅ্যাপে ভয়েস পাঠিয়েছে, “ আপনাদের ছেলে আমার পছন্দ হয় নি। এমনকি আপনাদেরকেই পছন্দ হয় নি। এমন দায়িত্ব জ্ঞানহীন পরিবারে আমি আমার একমাত্র মেয়ের বিয়ে দেবো না।”
পিপাসা আন্দাজ করতে পেরেছিলো তাদের না বলার কারন। সব ঠিকঠাক, শুধুমাত্র মেয়ের সাথে কথা বলার পরেই তাড়াহুড়ো করে চলে গেলো। নিশ্চয়ই স্পর্শীয়ার কথা বলার ধরণ বা অন্য কোনো কারনে ছেলে না করে দিয়েছে।কিন্তু সেটা মেয়েটাকে জানতে দেওয়া উচিত হবে না। হয়তো অপমান বোধ করবে। তিনি ক্ষ্যাপাস্বরে বললেন,
– আমি না করে দিয়েছি ওদের। ছেলে পছন্দ হয় নি আমার। শুধুমাত্র সরকারি একটা চাকরি করলেই হয় না। আদব- কায়দা, জ্ঞান বুদ্ধি থাকা উচিত। দেখে মনে হচ্ছিলো একটা কাঠের পুতুল। একে মা-বোন, ভাবি কথার তালে ঘোরায়। এমন পরিবারে গেলে সুখী হবি না। যে পুরুষের মেরুদন্ড নেই, তার সাথে সংসার করা যায় না।
আমার চাকরি হয়ে গেছে।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে মলিন কন্ঠে কথাটা বললো সোভাম। সন্ধ্যা পরবর্তী সময়টা তার ব্যস্ততায় কাটে। অফলাইন, অনলাইন ক্লাস মিলিয়ে প্রাণ ওষ্ঠাগত সময়। তবে মাঝেমধ্যে তার অন্যথা হয়। সপ্তাহে তিনদিন সন্ধ্যার পরে একটু অবসর পায়। তবে আজ তা নেই। সে ব্যস্ত! একটু পরেই শুরু হবে পেইড ব্যাচের অনলাইন ক্লাস। বোধহয় বারো মিনিট আছে। দিশা শুনলো। একপর্যায়ে নিজের অনুভূতিকে লুকিয়ে বলে উঠলো,
– আমারো এনগেইজমেন্ট হয়ে গেছে।
কেঁপে উঠলো সোভাম। বুকের ভেতরটা জ্বলে উঠলো দাবানলের মতো। শ্বাস ঘন হলো ক্রমশ। অবাক কন্ঠে বললো,
– এতো তাড়াতাড়ি, এক দিনের মধ্যেই?
দিশা চোখ বন্ধ করে এক ফোটা অশ্রু বিসর্জন দিলো। নিরবে, নিভৃতে। সেই অশ্রুর সাক্ষী শুধুমাত্র বদ্ধ, অন্ধকারাচ্ছন্ন রুম ই হলো। শক্ত কন্ঠে বললো,
– তোমার সিদ্ধান্ত জানার ক্ষেত্রে অনেক অলসতা করেছি। সময় দিয়েছি, নিয়েছি। দেখো সোভাম, তোমাকে সময় দিতে দিতে আজ আমার হাতে আর কোনো সময় অবশিষ্ট নেই। যা আছে, সেটা শুধু মাত্র দায়িত্বের, প্রয়োজনের।এখন একটা সংসার পাতা প্রয়োজন, বাবা- মাকে দেখা প্রয়োজন। যাকে স্বামী হিসেবে স্বীকার করেছি, তাকে সন্তান দেওয়া প্রয়োজন। এখন আর আমার কিছু গোছানোর সময় নেই। সংসার গোছানোর সময়টা তোমাকে গোছাতে গোছাতেই শেষ করলাম।
সোভাম নিরব হয়ে সবটা শুনলো। কিছু বলতে ইচ্ছে করছে না, বলার কিছুই নেই। শুধু বললো,
রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ৫
– কংগ্রাচুলেশনস! ভালো থেকো।
এরপর ক্ষানিকটা সময় নিরবতায় কাটলো। ভেবেছিলো দিশা কিছু বলবে। কিন্তু সেরকম কিছুই বললো না। একপর্যায়ে সোভাম নিজেই বলে উঠলো,
– কাল ঢাকা ছাড়ছি।
দিশার হৃদয়টা মুচড়ে উঠলো। কিন্তু তাও কিছু বললো না। কেটে দিলো কল। সোভাম বসে রইলো ওভাবেই, কানে ফোন নিয়ে। যেনো কিছু শোনার তীব্র তৃষ্ণা তার।
