Home রাজনীতির রংমহল ৩ রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ৫

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ৫

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ৫
সিমরান মিমি

—আমার চড়ুই পাখিটা ছটফটানি বাদ দিয়ে এমন চুপচাপ কেনো?
পাভেল শিকদারের আদুরে কন্ঠস্বর শোনা গেলো। নিশ্চুপ হয়ে বসে থাকা স্পর্শীয়া ঘাড় ঘুরিয়ে তার পানে তাকালো। চোখ রাঙিয়ে এক ফালি আগুনের লাভা ছুঁড়ে মারলো। পাভেল হতদন্ত হয়ে সরে বসলো। ভয় পাওয়ার ভান ধরে পুণরায় দাঁত মেলে হাসলো। ধীরে ধীরে একটু একটু করে আবার এগিয়ে বসলো স্পর্শীয়ার কাছে। বিরক্তিতে তেঁতো হয়ে গেছে মুখ। কিছুই ভালো লাগছে না স্পর্শীর। ভাইকে নিয়ে যথেষ্ট চিন্তিত সে। ক্লাসেও মন বসছে না। এতোসবের মধ্যে পাভেলের বিরক্তিকর ঠাট্টা আরো যন্ত্রণা দিচ্ছে। এক সময় মুখ গম্ভীর করে রুক্ষস্বরে বলে উঠলো,
– তুই কি খেয়ে এসেছিস? খাবার হজম হচ্ছে না, মার খাবি? তো সোজাসাপটা বল না – দু চার টা থাপ্পড় মেরে দেই। এতো ঢং করার কি আছে?
পাভেল কিছু বলতে গিয়েই থেমে গেলো। স্পর্শীর চোখে মুখে দুশ্চিন্তার ছোঁয়া, গাম্ভীর্যতার ছাঁপ দেখা যাচ্ছে। হাসি বন্ধ করে ড্যাবড্যাব চোখে তাকালো তার দিকে। কন্ঠে মলিনতার ছাঁপ নিয়ে বললো,

– তুই কি রেগে আছিস? আমি কি কিছু করেছি?
এক পলক তাকিয়ে চোখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকালো স্পর্শী। এই শান্ত চাহনিতে বিভ্রান্ত হয়ে গেলো পাভেল। ব্যস্ত হয়ে বলে উঠলো,
— বল না কি করেছি? আমার তো কিছু মনে পড়ছে না। আচ্ছা যাই’ই করি, সব ভুলে যা। সরি চড়ুই! আর করবো না, প্লিজ!
স্পর্শীর ভীষণ হাসি পেলো। কিন্তু তা প্রকাশ করলো না। পাভেলকে শান্ত করতে বলে উঠলো,
– একটু চুপ করবি? আমি ভাইয়াকে নিয়ে টেনশনে আছি।
পাভেল মেরুদন্ড সোজা করে স্পর্শীর দিকে ফিরে বসলো। বললো,
– তোর ভাইয়ের আবার কি হলো?
সিগ্ধ দৃষ্টিতে তাকালো স্পর্শী। ভেঁজা, মলিন কন্ঠে অনুশোচনার সুরে বললো,
– আমার হয়তো কাল ওই ফটো টা পাঠানো উচিত হয় নি।
– কেনো?
– আমি নিশ্চিত ওদের মধ্যে ব্রেক আপ হয়ে গেছে। ভাইয়াকে কেমন বিধ্বস্ত লাগছিলো। বাইরে থেকে এসে যতক্ষণ বাসায় থাকে, রুমের দরজা আটকে বসে থাকে। আমার সাথে কথাও বলছে না।
অবাক হয়ে গেলো পাভেল। চোখ দুটো টেনে হতভম্বের সুরে বলল,

– সে কিরে! তোর সাথে কথা বলছে না?
ওভার এক্টিং! স্পর্শী জানে এই কথা গুলো শুনে পাভেলের একটুও খারাপ লাগছে না। খালি খালিই সে তাকে খুশি করার জন্য কষ্ট পাওয়ার ভান করছে। এমন ভাবে চমকে যাওয়ার চেষ্টা করছে যে দেখে গা পিত্তি জ্বলে উঠছে। কিন্তু তারপরেও চুপ রইলো স্পর্শী। অন্যদিকে তাকিয়ে বললো,
– উহহুউউউ! কথা কেনো বলবে না? কথা তো বলছে, শুধু আগের মতো আমায় আর জ্বালাচ্ছে না।
থেমে দাঁত খিটমিট করে বললো,
– সব দোষ ওই দিশার। আমি ওকে ধরবো। কত্ত বড় সাহস আমার ভাইকে ঠকায়! দেখেছিলি তুই ওর পাশের ছেলেটাকে? ব্যাঙের মতো বাঁকা হয়ে দাঁড়িয়েছিলো, শালা! ওর সাথে নাকি আমার ভাইয়ের তুলনা চলে। ওই দিশার চোখ খারাপ। ওর ভাগ্য ভালো যে আমার ভাই ওকে পছন্দ করেছে। কত্তবড় অসভ্য! একটা থাকতে আবার একটা ধরেছে। উফফফফ! কেনো যে ছেড়ে দিয়েছিলাম আমি? ইচ্ছে করছে গুণে গুণে চুল ছিড়ে দেইই। নষ্ট মেয়ে!
বাঁধ সাধলো পাভেল। বললো,

– তুই কি শিউর জানিস ওরা প্রেমিক- প্রেমিকাই ছিলো? অন্যকিছুও তো হতে পারে। আমরাও তো হাঁটি, তাই বলে কি আমরা প্রেমিক – প্রেমিকা?
যে কথাই হোক, ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সেই একই প্রশ্ন পাভেলের। এই সুচতর কায়দা টা বুঝতে খুব বেশি সময় লাগলো না স্পর্শীর। পুরোপুরি ইগ্নোর করে বলে উঠলো,
— সে যাই হোক, আমার ভাই তো কষ্ট পাচ্ছে।
স্পর্শী অসহায় দৃষ্টিতে পাভেলের দিকে তাকালো। ভেতরটা কেমন করছে। ধীরে ধীরে খারাপ লাগাটা আরো গাঢ় হচ্ছে। মন চাইছে এক্ষুণি দিশার বাড়ি যেতে। সেখানে গিয়ে আচ্ছা করে ঘন্টা খানেক ঝগড়া – মারামারি করলে হয়তো ভালো লাগতো। কিন্তু সে তো ঠিকানা জানে না। কিভাবেই বা যাবে? আচ্ছা দিশার নাম্বারে কি কল করা উচিত? তবে মন সায় দিলো না। ফোনকলে কি আর ঠিকভাবে ঝগড়া করা যায়? শেষে কোনো কথা বাদ পড়ে গেলে রাতে তো ঘুম হবে না। উফফফ!! কি এক মুছিবত! চারদিকে বাঁধা। এখন তো কাঁদতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু ভরা মাঠে এতো লোকের মধ্যে কিভাবেই বা কাঁদবে? লজ্জা লাগবে তো।
স্পর্শীর মুখের দিকে থাকিয়ে থম মেরে বসে রইলো পাভেল। সেকেন্ডে সেকেন্ডে তার মুখভঙ্গি পরিবর্তন হচ্ছে। এই সংকেত চিনতে একটুও সময় ব্যয় হলো না পাভেলের। আশেপাশে তাকিয়ে ঘাবড়ানো কন্ঠে বললো,

– তোর কি মুড সুইং হচ্ছে?
উপরনিচ মাথা নাড়িয়ে স্পর্শী ছোট্ট করে জবাব দিলো – হু।
– খিদে পেয়েছে?
– হু।
মেরুদন্ড সোজা করে দাঁড়িয়ে পড়লো পাভেল। বললো,
– চল, তোকে কিছু খাওয়াই। কাচ্চি খাবি?
স্পর্শী জবাব দিলো না। শুধু সম্মতি সূচক উঠে দাঁড়ালো। সাথে সাথেই বসে পডলো পাভেল। করুন কন্ঠে বললো,
– কিন্তু আমার হাতে টাকা নেই।
চপাট করে গালের উপর থাপ্পড় মারলো স্পর্শী। খুব বেশি জোরে নয়, শুধুই প্রতীকি রুপে রাগের বশে। এভাবে নাটক করার মানে কি? মনে হলো কেউ সামনে খাবার দিয়ে টেনে নিয়ে গেলো। স্পর্শীর হাত ধরে টেনে নিজের পাশে বসালো পাভেল। গমগমে স্বরে বললো,
– হাতে টাকা নেই একদম। মাসের খরচ একটানে অর্ধেক কমিয়ে দিয়েছে। আমি খুব অসহায় রে। এই মুহুর্তে তোকে কাচ্চি খাওয়াতে হলে আগে আধঘন্টা ডেইরি গেটে থালা নিয়ে বসতে হবে। মাত্র একটা সিগারেটের টাকা আছে।
স্পর্শী মুখ বিকৃত করে ফেললো বিরক্তিতে। বললো,
– তোর ফ্যামিলি টা এমন কেনো? দু দিন পর পর একেক টা তালবাহানা। আর এবার তো গেছিলি অনেক দিন থাকতে, বের কেনো করে দিলো? কি করেছিলি? হাতখরচ ই বা কেনো কমিয়েছে?
পাভেল মাথা নিচু করলো। খানিকক্ষণ পর স্পর্শীর দিকে তাকিয়ে নির্লজ্জের মতো হেসে বলে উঠলো,

– পোস্টার ছাপাতে টাকা দিছিলো। অর্ধেক মেরে দিছি। তাই…..
অবাক হতে গিয়েও হেসে ফেললো স্পর্শী। বললো,
-তা সেই টাকা গুলো কোথায়?
– ভাইয়া নিয়ে নিছে।
ঠোঁট উঁচু করে শ্বাস ছাড়লো স্পর্শী। শান্ত কন্ঠে বললো,
– তা এখন কি করবি? মাসের বাকি দিন চলবি কিভাবে?
পাভেল দুশ্চিন্তায় পরে গেলো। পকেটে মাত্র ত্রিশ টাকা। বাড়িতে কিছুতেই চাওয়া যাবে না। বাবা তো জুতো ছুড়ে মারবে। মায়ের কাছে চাইতেও লজ্জা লাগছে। বাকি রইলো শুধু প্রেমা। কিন্তু এটা কি তার বোন? কখনোই না। বোমা মারলেও এই ছারপোকাটার কাছ থেকে পয়সা বের হবে না। অনেকক্ষণ ভেবে চিনতে একটা পরিকল্পনা করলো পাভেল। স্পর্শীর দিকে তাকিয়ে উত্তেজিত কন্ঠে বললো,
– শোন না, একটা হেল্প কর প্লিজ। তুই এক্ষুণি আমার ফোন নিয়ে ভাইয়াকে ফোন দে। বল – পাভেল এক্সিডেন্ট করেছে, টাকা লাগবে।
পরিকল্পনা শোনার সাথে সাথেই উঠে দাঁড়ালো স্পর্শী। বললো,

– কক্ষনো না। এমন মিথ্যা কথা বলে আমি টাকা আনতে পারবো না। শেষে তোর ভাই আমাকে ধরবে। আর যাই হোক, আমি তোর ফ্যামিলির লোকের সাথে কথা বলতে যাবো কেনো? আমি পারবো না। অন্য কাউকে বলে দেখ।
পাভেল নাছোড়বান্দা। ক্রমাগত জ্বালাতে লাগলো স্পর্শীকে। এক পর্যায়ে বাধ্য হয়ে সে রাজি হলো। কিন্তু মন মানছে না। অচেনা, অপরিচিত একটা মানুষের সাথে হুট করেই এতো বড় মিথ্যে, কি করে বলবে সে। রিং পড়ছে অনবরত। দু তিন বার ফোন দেওয়ার পরেও যখন রিসিভড হলো না তখন সস্তির নিঃশ্বাস ফেললো স্পর্শী। কিন্তু তার সস্তিকে অসস্তিতে রুপ দিয়ে ওপাশ থেকেই কল ব্যাক করলো ‘ভাই’ নামে সেভ করা নাম্বারটা। রিসিভড করে কানে ধরতেই শোনা গেলো কোলাহল। মাইকিং, ভাষণ, স্লোগান, লোকজনের আমেজ সব মিলিয়ে মাথা ধরে যাবে প্রায়। এর মধ্যে শোনা গেলো পুরুষালি গম্ভীর এক আওয়াজ। পরশ শিকদার ওপাশ থেকে বললো,

– বল।
হার্টবিট দ্রুত গতিতে চলছে স্পর্শীর। সে জানে লোকটা ভীষণ রাগী। সেখানে এতোবড় মিথ্যা বলার পর যদি ক্ষেপে যায়, বাজে কথা বলে। তখন মুখ কোথায় লুকাবে সে? কত বড় লজ্জার বিষয় হবে, তা কি এই নির্লজ্জ পাভেল শিকদার বুঝবে? নিজেকে সর্বোচ্চ সামলানোর চেষ্টা করে চিকন সুরে বলল,
– আসসালামু আলাইকুম ভাইয়া! আমি পাভেলের ফ্রেন্ড বলছি।
টানটান হয়ে থাকা কপাল টাতে সরু তিনটা ভাঁজ পড়লো পরশের। গমগমে কন্ঠে বললো,
– পাভেল কোথায়?
ফোনের স্পিকার লাউডে। পাভেল সবটাই শুনছে। স্পর্শী কন্ঠে সামান্য দুশ্চিন্তা ছাঁপ ফেললো। বললো,
– ওকে হস্পিটালে নিয়ে যেতে হবে। যত দ্রুত সম্ভব টাকা পাঠান।
পরশ আশেপাশে তাকিয়ে ভিড় এড়িয়ে বাঁ পাশে গেলো। পুণরায় জিজ্ঞেস করলো,
– কি বললে? আবার বলো।
কেঁপে উঠলো স্পর্শী। মনে হচ্ছে সে ধরা পড়ে গেছে। ছোট ভাইকে হস্পিটালে নিয়ে যাবে শুনেও এই লোকের মধ্যে তেমন কোনো চিন্তার ছাঁপ বা বিষাদ ঠেকলো না। মিহি স্বরে উত্তর দিয়ে বললো,

—পাভেল এক্সিডেন্ট করেছে, ভাইয়া। ইমিডিয়েটলি ওকে হস্পিটালে নেওয়া প্রয়োজন। আমার হাতে কোনো টাকা নেই। আমি ফোন নাম্বার দিচ্ছি, টাকা’টা খুব তাড়াতাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করবেন।
নরম, শান্ত, কাতর মেয়েলি কন্ঠস্বর শুনেও বিশ্বাস করলো না পরশ শিকদার। বরং তার চোয়াল আরো শক্ত হলো। অতি ব্যস্ততার মধ্যেও ফোনটাকে ঘুরিয়ে অন্যকানে ধরলো। পূর্বের তুলনায় কিছুটা শান্ত স্থানে গিয়ে ক্ষুদ্ধ কন্ঠে বললো,

— তুমি কি পাভেলের ফোনটা চুরি করেছো? এখন ফোনের সাথে সাথে ওর ফ্যামিলি থেকেও টাকা নেওয়ার ধান্দা! শোনো মেয়ে, যেটা নিয়েছো, সেটা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকো। আর ফোন দেবে না। গর্দভ টা কিছুদিন ফোন ছাড়া থাকুক।
কথাগুলো শ্রবণ হতেই চিবুক শক্ত করে ফেললো স্পর্শী। ঠাস করে ফোন টাকে ছুড়ে মারলো । পরতে পরতে মোবাইল ক্যাচ করে নিয়ে হতভম্ব হয়ে তাকালো পাভেল। তার দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে ক্ষ্যাপাটে স্বরে বললো,

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ৪

– তোর ভাই আমাকে চোর বললো? কত বড় অপমান। সব তোর জন্য…তুই না খেয়ে মরলেও আর আমার কাছে আসবি না। নিজের টাকা নিজেই চেয়ে নে। এমন পাষণ্ড ভাই কার হয়? মনে দয়া মায়ার ছিটে ফোঁটাও নেই। এক্সিডেন্ট করেছে শোনার পরে একটু চেঁচালোও না। পাষন্ড!

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ৫ (২)