Home সে আমার বন্দিনী সে আমার বন্দিনী পর্ব ৮২

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৮২

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৮২
তানিয়া হুসাইন

ভীরের কথা বলার মাঝেই আবার নিকো আসে।
তার মুখে একরাশ উচ্ছ্বাস।
কিন্তু ভীরকে দেখে তার সেই হাসি খানিকটা মলিন হয়ে যায়।কারণ যার আজ সবচেয়ে বেশি খুশি থাকার কথা সেই ভীর বসে আছে নিস্তব্ধ হয়ে, মুখ শুকনো, চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ।নিকো কয়েক সেকেন্ড চুপ করে তাকিয়ে রয় তার দিকে।
তারপর সে এগিয়ে এসে ভীরের কাঁধে হাত রাখে, এতো টেনশন কেনো করছো ব্রো?
রিল্যাক্স… সব ঠিক হয়ে যাবে।এতো ভাবারতো কিছু নেই ইশায়ার ১৮ বছর হয়ে গেছে তো।কোন কপ্লিকেশন হওয়ার তো কথা না।আর ডাক্তার তো আছেই কোন হেলথ ইস্যু হলে সামলে নিবে।
ভীর কিছু বলে না। সামনের দিকে তাকিয়ে আছে সে।
নিকো ভীরের মুড ঠিক করতে চাইছে,কিন্তু ভীর তার কোন কথাতেই পাত্তা দিচ্ছে না,
নিকো আবার বলে,

___কয়েকটা মাস ইতো ব্রো… দেখতে দেখতে চলে যাবে। এরপর যদি কোনো সমস্যা হয় ডা. কাস্তেলান তো আছেই। শুধু এই কয়টা দিন সামলে নিলেই হবে।
এতো বড় বড় যুদ্ধ জিতেছি আমরা… আর তুমি এই সামান্য কারণে এতো প্যানিক করছো?
এদিকে ভীরের কোন কিছুতেই ধ্যান নেই।সে কিছুই বলছে না।
নিক ভীরের কাঁধে চাপড় দিয়ে বলে,
___গার্ড তো আছেই । আরো বাড়িয়ে দাও। ২৪ ঘন্টা নজরে রাখো। আগে যেভাবে ছিলো এখনো সেভাবেই থাকবে।তুমি এটা নিয়ে বেশি-ই ভাবছো ব্রো। লক্ষ্য থেকে সরে যাচ্ছো। আমাদের পেছনে খুব বড় ষড়যন্ত্র চলছে।ভেতরে অবদি ঢুকে গেছে স্পাই।
তোমার সেদিকে নজর দেওয়া জরুরি।
ভীর এবার ধীরে ধীরে মাথা তুলে,তার চোখে স্পষ্ট বিরক্তি আর ক্লান্তি।
সে নিকোকে থামিয়ে দিয়ে বলে,

___আই নো… এগুলো আমি পরে দেখবো।
এখন বাকি যা আছে তুই আর ডিয়েগো দেখে নে। আর ম্যাটিয়াসের কাজ কতটুক এগিয়েছে দেখ। তোমরা সামলে নাও।কথাগুলো বলেই আবার চুপ হয়ে যায় ভীর।ঘরে কয়েক মুহূর্তের জন্য অদ্ভুত নীরবতা নেমে এল।
নিকো ভ্রু কুঁচকে ভীরের দিকে তাকিয়ে রইল।
___ব্রো এতো কেনো ভাবছো?
এখন তোমার খুশি হওয়ার সময় Let’s get celebrate.
ভীর হঠাৎ তীক্ষ্ণ চোখে তাকায় তার দিকে।
___তুই বুঝছিস না…একটু থেমে নিঃশ্বাস ফেলল সে।ও সু*ইসাইড এটেম্পট করেছে।আগে ও একা ছিলো… এখন দুজন।আমার বাচ্চা ওর কাছে।ওর যদি কিছু হয়ে যায় নিক… আমি ভাবতে পারছিনা।ভীর নিজের কপালে দু হাত চেপে ধরে,
আমার কেনো নিজেকে এতো হেল্পলেস লাগছে… I don’t know.
নিকো কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।ভীরকে এভাবে খুব কমই দেখেছে সে।যে মানুষটা শত শত মানুষের মৃ*ত্যু দেখে চোখের পাতা ফেলেনি… আজ সে ভয় পাচ্ছে।
কিছুক্ষণ পরে নিকো ধীরে ধীরে বলল,

___তাহলে একটা কাজ করতে পারো।
ভীর ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
___কি কাজ?
নিকো ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে জানালার কাছে যায়।
কয়েক সেকেন্ড বাইরে তাকিয়ে থেকে আবার ঘুরে দাঁড়ায়।
___ ব্রো… বেইবি হওয়ার পর সব ঠিক হয়ে যাবে।তুমি তো এই সময়টার কথা ভাবছো, তাহলে…
ভীর এক পা এগিয়ে এসে বলে।
__তাহলে কি?
তাহলে ওকে গ্র্যানির কাছে পাঠিয়ে দাও।গ্র‍্যানি ওকে দেখে রাখতে পারবে,তোমার সব কিছুই সে খুব যত্ন সহকারে আগলে রাখে।
এই সময়টাতে ইশায়ার যত্ন নেওয়ার জন্য উনি অনেক ভালো অপশন। ওর টেইক কেয়ারও ঠিকমতো করতে পারবেন।
ভীরের চোখ হঠাৎই ঠান্ডা হয়ে গেল। সে নিচু গলায় বলে,

__আমি থাকতে পারব না… ওকে নিজের থেকে দূরে সরিয়ে।তার কণ্ঠে এমন এক দৃঢ়তা ছিল, যে এই বিষয়ে আর কোনো কথা বলার জায়গা নেই।
নিকো আর কিছু বলে না।
ভীরের মাথায় অন্যকিছু ঘুড়ছে।
সে শুধু নীরবে ভীরের দিকে তাকিয়ে রয়।কিন্তু পরমুহূর্তেই তার দৃষ্টি সরে গেল একটু দূরে।
দূরের করিডোরের কোণে দাঁড়িয়ে ইসাবেলা।
সে লুকিয়ে লুকিয়ে তাদের কথোপকথন শুনছিল।
ভীর আর নিকোর কথা শেষ হতে দেখে ইসাবেলা দ্রুত সেখান থেকে সরে যায়।
___তার পদক্ষেপ দ্রুত হয়ে উঠে, এই খবরটা তাকে ক্যাটালিনাকে জানাতে হবে।
এত বড় একটা নিউজ শুনে মম কি বলবেন এটাই ভাবতে ভাবতে সে নিজের রুমের দিকে এগিয়ে গেল।
ইসাবেলা তার রুমে ঢুকেই ফোনটা হাতে নেয়,
তার রুম বলতে আসলে নিকোরই রুম।
কারণ একই রুমেই থাকে তারা দুজন।ফোনের স্ক্রিনে ক্যাটালিনার নাম ভেসে উঠতেই ইসাবেলা দ্রুত ফোন লাগায়।
ওপাশ থেকে ফোন রিসিভ হতেই ইসাবেলা আর দেরি করল না।
দ্রুত ক্যাটালিনাকে খবরটা জানিয়ে দেয়,

___ইশায়া প্রেগন্যান্ট মম।
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড সম্পূর্ণ নীরবতা নেমে আসে।
তারপরই বিস্ময়ে ভরা কণ্ঠ ভেসে উঠে,
__কি বলছিস তুই?
ক্যাটালিনা বিশ্বাসই করতে পারছে না।
ইসাবেলা আবারো একই কথা আওড়ায়।
মনের ভেতর একের পর এক ভাবনা ঘুরতে থাকে ক্যাটালিনার।এই সাম্রাজ্যের সম্পত্তির ভাগ সে কাউকে দেবে না।ভীরের সন্তান মানে সবকিছু একদিন সেই বাচ্চার হবে।
না… এটা সে কখনোই হতে দেবে না।
ক্যাটালিনা ঠান্ডা গলায় জিজ্ঞেস করে,

___তুই কি সত্যি জানিস?
ইসাবেলা দ্রুত বলে,
__হ্যাঁ মম। এই মাত্র আমি ভীর আর নিকোকে কথা বলতে দেখেছি।
ক্যাটালিনার কণ্ঠ হঠাৎ কঠিন হয়ে উঠে,
সে দাঁত চেপে বলতে লাগে,
এমনিতেই তোর বাবা মা*রা যাওয়ার পর আমরা এই সাম্রাজ্যে পর গাছা হয়ে আছি। ভীর আমাদের কোন কিছুতেই দাম দেয় না।
তার গলায় জমে থাকা ক্ষোভ স্পষ্ট বোঝা যায়ন
আর এখন যদি ওর ছেলে হয় তাহলে আমরা কানা কড়িও পাবো না।
সে তীব্র স্বরে বলে উঠে,
__সব কিছু ওই মেয়ে আর তার সন্তানের নামে করে দেবে ভীর। এটা হতে দেওয়া যাবে না।
ইসাবেলাও তাল মিলয়ে বলে,
__হ্যাঁ মম… এবার বেশি বেশি-ই হয়ে যাচ্ছে। এতোদিন চুপ থাকলেও এখন এভাবে চলবে না।
ক্যাটালিনার গলা ধীরে ধীরে ভয়ংকর হয়ে উঠে,
___এই বাচ্চা নষ্ট করতে হবে… প্রয়োজনে এই মেয়েকেই মে*রে ফেল।
ইসাবেলা একটু থমকে যায়,

__কিন্তু কিভাবে মম?
কথা বলতে বলতেই সেধীরে ধীরে পেছনে ঘুরে,
আর ঘুরতেই তার বুকটা ধক করে উঠে,
দরজার কাছে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে নিকো।
দুই হাত বুকের সামনে ভাঁজ করা, চোখ দুটো স্থিরভাবে ইসাবেলার দিকেই তাকিয়ে আছে।
এই মুহূর্তে নিকোকে এখানে দেখে ইসাবেলা আতকে উঠে।
তার মাথার ভেতর একটাই প্রশ্ন ঘুরছে নিকো কি কিছু শুনেছে কিছু।
ওপাশে তখনো ক্যাটালিনা ফোনে কথা বলে যাচ্ছে,

___হ্যালো… হ্যালো বেলা! কথা বলছিস না কেনো?
কিন্তু নিকোকে সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ইসাবেলার গলা থেকে আর কোনো আওয়াজ বের হয় না।
সে শুধু স্থির চোখে নিকোর দিকে তাকিয়ে আছে।
নিকোর চোখ দুটো ও স্থির হয়ে আছে ইসাবেলার উপর।
পরের মুহূর্তেই সে ধীরে ধীরে রুমের ভেতরে ঢুকে দরজাটা ভেতর থেকে লক করে দেয়।
তারপর ধীর পায়ে ইসাবেলার দিকে এগিয়ে আসে সে।
নিকো তার সামনে এসে থামে। ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে বলে,

__কি কথা বলছিলে?
ইসাবেলা থতমত খেয়ে যায়।
কিছুটা জোর করেই স্বাভাবিক গলায় বলে,
___কই কিছু না… এমনি ফ্রেন্ডসদের সাথে কথা বলছিলাম।
নিকোর ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠে।
সে একটু ঝুঁকে এসে বলে
___ফ্রেন্ডসদের সাথে কথা বলছিলে…?
এলিজা চুপ হয়ে যায়
নিকো হালকা হেসে আবার বলে,
___নাকি প্যালেসের খবর তোমার মায়ের কাছে ট্রান্সফার করছিলে?
ইসাবেলার মুখের রং মুহূর্তেই বদলে যায়।
সে কিছু বলল না।শুধু থতমত খেয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রয়।
নিকো এক ঝটকায় ইসাবেলার হাত থেকে ফোনটা ছিনিয়ে নেয়

___এই! কি করছো?
ইসাবেলা চিৎকার করে উঠে,
আমার ফোন কেন নিলে? ফোন দাও বলছি!
তার গলায় স্পষ্ট রাগ।
নিকো ফোনটা হাতে ঘুরাতে ঘুরাতে হেয়ালি ভরা গলায় বলে,
___এই ফোন… আর তুমি পাবে না বেবস,
বলেই সে ফোনটার ভেতর থেকে সিম কার্ডটা বের করে
দুই আঙুলের মাঝে চেপে ভেঙে ফেলল।
তারপর বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে পুরো ফোনটা দেয়ালে জোরে আছড়ে মারে।
মূহুর্তেই ফোনটা ভেঙে মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ে।
ওদিকে তখনো ফোনের ওপাশে ক্যাটালিনা
হ্যালো… হ্যালো বেলা?বেলা কথা বলছিস না কেন?
কিন্তু কোনো উত্তর নেই।
কিছুক্ষণ পর কলটা কেটে গেল।ক্যাটালিনা সঙ্গে সঙ্গে কল ব্যাক করে।কিন্তু এবার ফোনে দেখাচ্ছে।ফোন সুইচড অফ।সে আবার কল দিল,আবারও একই জিনিস।রাগে তার মুখ শক্ত হয়ে গেছে।
এদিকে রুমের ভেতরে ইসাবেলা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছে।
সে দাঁত চেপে বলে উঠে,

___তোমার সাহস কি করে হয় আমার ফোনটা ভাঙার!
বেশি বাড়াবাড়ি করে ফেলছো না তুমি?
নিকোর চোখের রং মুহূর্তেই বদলে যায়,
সে রাগি গলায় বলে,
__বাড়াবাড়ি আমি করছি না… তুই করছিস।
সে একটু ঝুঁকে ইসাবেলার দিকে তাকায়,
__হুমমম…কি প্ল্যান করছিস মায়ের সাথে মিলে?
তার গলা ধীরে ধীরে আরও ভয়ংকর হয়ে উঠে,
ইশায়াকে মে*রে ফেলার ইসাবেলা স্থির হয়ে যায়।
নিকো ঠান্ডা গলায় বলে,
__ভীরের কানে এটা গেলে… তোদের মা মেয়ের অস্তিত্ব রাখবে না সে।
তারপর সে ইসাবেলার গালে হাত রেখে বলে ,

__সুযোগ দিচ্ছি তোকে আমি… ভালো হয়ে যা।
ইশায়া আর তার সন্তান থেকে দূরে থাক।”
আর তোর মায়ের সাথে যেন তোকে যোগাযোগ করতে না দেখি আর।
নিকোর কথা শেষ হওয়ার আগেই ইসাবেলা চিৎকার করে উঠে,
__আমার মমের নামে একদম উল্টাপাল্টা কথা বলবে না।আমার যা ইচ্ছা আমি করবো।তুমি বলার কে,বাইরে কি করে বেরাও জানিনা আমি,কিসের অধিকার দেখাতে আসো তুমি আমাকে।
আমার কোন বিষয়ে তুমি কিছু বলতে আসবেনা।
নিকো কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রয়,তারপর ধীরে ধীরে নিজের শার্টের বোতামে হাত চালাতে চালাতে বলে,

__ঠিক আছে বলছি না।
……..
_____ড্রয়িংরুমের সোফায় পাশাপাশি বসে আছেন আদনান রহমান আর সায়মা রহমান। দুজনেই চুপচাপ বসে আছেন।
রান্নাঘর থেকে ট্রেতে করে কফি নিয়ে আসে রাহি।
মৃদু হেসে সে বলে,
___মামনি কফি।
রাহি কাপগুলো টেবিলে রেখে দেয়। কফির গরম ধোঁয়া ধীরে ধীরে উঠতে থাকে।সায়মা রহমান কাপটা হাতে নিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।বাড়িটা আজ একটু বেশি-ই ফাঁকা লাগছে।
জান্নাত তার ছেলেকে নিয়ে আজ তার বাবার বাড়িতে গেছে ঘুরতে।
আর আবির সকালেই অফিসে বের হয়ে গেছে।
বাড়িতে এখন মূলত আছেন আদনান রহমান, সায়মা রহমান…রাহি আর আদ্রিয়ান।
কয়েকদিন আগেই একটা এক্সিডেন্ট হয়েছে তার। ডাক্তার কড়া করে বেড রেস্ট দিয়েছেন।
ড্রয়িংরুমের পরিবেশটা শান্ত, কিন্তু সেই নীরবতার ভেতরেই অদৃশ্য একটা চাপা টানাপোড়েন লুকিয়ে আছে।
উপরে নিজের ঘর থেকে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামে আদ্রিয়ান। কয়েকদিন আগের এক্সিডেন্টের কারণে হাঁটার ভঙ্গিতে এখনো সামান্য সতর্কতা আছে, তবুও সে নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছে।
নিচে বসে থাকা আদনান রহমান ছেলেকে নামতে দেখে ভ্রু কুঁচকে তাকালেন।

___কোথায় যাচ্ছো এখন?
আদ্রিয়ান থামলো না। স্বাভাবিক গলায় উত্তর দিলো,
___একটু বাইরে যাচ্ছি।
পাশেই বসে থাকা সায়মা রহমান চুপ করে ছেলের দিকে তাকিয়ে থাকেন। তিনি জানেন ছেলে প্রতিদিন কোথায় যায়। তাই তিনি প্রথমে কিছু বলেন না। কিন্তু মনের ভেতরের জমে থাকা কথাগুলো শেষ পর্যন্ত আর আটকে রাখতে পারলেন না।
হালকা গম্ভীর স্বরে বললেন,
___বিয়ে করবে বলে তো তোমার আর কোনো হেলদোল নেই। করবো বললেই তো হয়ে যায় না, তাই না?
আদ্রিয়ান তাকায় না, কিন্তু তার হাঁটার গতি একটু ধীর হয়ে যায়।
সায়মা রহমান আবার বলেন,
__তোমার খালা আমাকে বার বার ফোন দিচ্ছে। তারা একটা ডেইট ফিক্সড করতে বলছেন। এখন তুমি বলো… এখন তো সুস্থ আছো… আমরা এই মাসে….
কথা শেষ করার আগেই আদ্রিয়ান তাকে থামিয়ে দেয়, তার চোখে বিরক্তি আর ক্লান্তির ছায়া।
সে মায়ের কথা কেটে দিয়ে বলে উঠে,
___মম… এখন না।
বিয়ে করবো বলেছি যখন করবো। কিন্তু এখন না… আমাকে একটু সময় দাও।
সায়মা রহমানের মুখের ভাব মুহূর্তেই বদলে যায়। রাগ আর হতাশা একসাথে ভেসে ওঠে তার চোখে।
তিনি বিরক্ত গলায় বলেন,

___আর কত সময় লাগবে তোমা…
কিন্তু বাকিটা আর শোনা হলো না।
তার আগেই আদ্রিয়ান গটগট করে দরজার দিকে হাঁটা ধরে। আর এক মুহূর্তও এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে ইচ্ছে করছে না তার।
আদ্রিয়ান বেরিয়ে গাড়ির দিকে এগোচ্ছিল। ঠিক তখনই পিছন থেকে একটা মেয়েলি রিনরিনে কণ্ঠ ভেসে আসে,
___আদ্রিয়ান ভাই…
আদ্রিয়ানের পা থামে।
কিন্তু সে পিছন ফিরে তাকায় না।
কিছুটা দূর থেকে দাঁড়িয়ে থাকা রাহি আবার বলে,
__তুমি চিন্তা করোনা আদ্রিয়ান ভাইয়া। মামনি তোমাকে প্রেশার দিচ্ছেন কারণ আমার মা বাবা একটু জোর করছেন।
আদ্রিয়ান চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। তার নীরবতা যেন একটা দেয়ালের মতো।
রাহি একটু সাহস জোগাড় করে আমতা আমতা করে আবার বলে,
___আদ্রিয়ান ভাই আ…আমরা এনগেজমেন্টটা করে নেই। তাহলে বাবা মা আমাকে অন্য কোথাও বিয়ের জন্য জোর করতে পারবেন না।
তার কণ্ঠে লুকানো অনুরোধ,
আদ্রিয়ান চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে।
একবারো পিছন ফিরে তাকায় না।
রাহি আবারো বলে,

__এর পর তুমি তোমার মতো থাকো। যতদিন সময় নেওয়ার নাও… আমার কোনো আপত্তি নেই।
এই কথাটা বলার জন্য রাহি অনেক সাহস জুগিয়েছে নিজেকে। বুকের ভেতর হাজারটা আশা নিয়ে সে কথাগুলো বলেছে।
আদ্রিয়ান সবই শুনলো।কিন্তু কিছু বললো না।
নীরবে গাড়ির দরজা খুলে বসে পড়ে।পরের মুহূর্তেই গাড়ি স্টার্ট দিয়ে বেরিয়ে গেল।
গাড়িটা দূরে চলে যেতে থাকে,রাহি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে চোখ তার সেই চলে যাওয়া গাড়ির দিকেই। যেন গাড়ির সাথে সাথে তার আশা গুলোও দূরে সরে যাচ্ছে।
আর এদিকে আদ্রিয়ান শক্ত হাতে গাড়ির স্টিয়ারিং ধরে আছে।
হাতের শিরাগুলো টানটান হয়ে আছে।
সে ধীরে ধীরে স্পিড বাড়ায়।
তার দৃষ্টি সামনে, সোজা রাস্তায়।সে যাচ্ছে তার গন্তব্যের দিকে… তার শান্তির কাছে।
একটা জায়গা, যেখানে গেলে সে একটু স্বস্তি পায়।
এক্সিডেন্টের কারণে পায়ে আর হাতে হালকা আঘাত পেয়েছে সে। তাই এতদিন বেরোতে পারেনি। ঘরের ভেতর বন্দী হয়ে থাকা তাকে আরও অস্থির করে তুলেছিল।কিন্তু আজ আর মনটা মানছে না।বড্ড ছটফট করছে তার মন।
তাই সে বেরিয়ে পড়েছে।তার সেই পরিচিত জায়গাগুলোতে… একটু শান্তির খোঁজে,ভালোবাসার খোজে।

___নিকো বিছানায় হেলান দিয়ে শুয়ে আছে। তার বুক দ্রুত উঠানামা করছে। সারা শরীরে ঘামের চিকচিক আলো, ম্লান আলোয় তার শরীরটা ধাতুর মতো ঝলমল করছে।
অন্যদিকে ইসাবেলা চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে।
তার চুলগুলো এলোমেলো হয়ে বিছানার উপর ছড়িয়ে আছে।
তার মস্তিষ্কে অনেক কিছু থাকলেও এখন কিছুই ভাবতে পারছে না সে।
মনে হচ্ছে সব চিন্তা যেন সাময়িকভাবে থেমে গেছে।
এভাবেই কিছু সময় কেটে যায়।ঘরের বাতাস ভারী হয়ে থাকে, শুধু দুজনের নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যায়।
কিছুক্ষণ পর নিকো ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে ইসাবেলার দিকে তাকায়।
তার ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটে ওঠে,
সে একটু কাছে ঝুঁকে নরম গলায় বলে,

__ বেইব… আমরাও একটা বাচ্চা নেই। কেমন হবে বলো তো?
কথাটা বলার সময় তার চোখে এক অদ্ভুত উচ্ছ্বাস ছিল, যেন সে কথাটা সত্যি সত্যিই ভাবছে।
কিন্তু ইসাবেলা নিকোর কথায় কোনো পাত্তা দেয় না।
একবারও চোখ খোলে না সে।মুখে স্পষ্ট বিরক্তির ছাপ ফুটে ওঠে।
কারণ সে খুব ভালো করেই জানে নিকো কী ধরনের মানুষ।তার মনে তাচ্ছিল্যের একটা ভাব আসে,
কারণ সে ভালো করেই জানে একটু পর আবার কোনো না কোন মেয়ের কাছে যাবে।।এটাই তো তার কাজ।
এই মানুষটার কথায় বিশ্বাস করার মতো বোকা সে না।
নিকো কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে তার দিকে।
তারপর ইসাবেলার কাছে গিয়ে বলে,

__বেলা… মায়ের মতো কুটনামি ছেড়ে দে।
সে আঙুল দিয়ে ইসাবেলার চিবুকটা ঘুরিয়ে নিজের দিকে ফেরায়।
ভীরের পিছনে পরে না থেকে ভালো হয়ে যা… আর কোনো মেয়ের কাছে যাবো না। ছেড়ে দেবো সব।
কথাগুলো বললেও তার গলায় সেই চিরচেনা দম্ভ লুকিয়ে আছে।
ইসাবেলা মুখ অন্যদিকে সরিয়ে নেয়।
একটাও কথা বলে না।বার বার তাকে ইগনোর করায় এবার নিকোর অহংকারে লাগে।
তার মুখের ভাব মুহূর্তে বদলে যায়।
নিকোর রাগ উঠে যায়।
সে হঠাৎ করেই বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ায়।
মেঝেতে পড়ে থাকা একটা প্যান্ট তুলে নিয়ে দ্রুত পরে নেয়।
তারপর দরজার দিকে হাঁটে।
দরজা খুলে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা একজন গার্ডকে ঠান্ডা গলায় বলে,

__কায়রাকে ডেকে পাঠাও।
গার্ড মাথা নত করে দ্রুত সরে যায়।
কিছুক্ষণ পর কায়রা এসে দাঁড়ায় দরজার সামনে।
নিকো তখন জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
তার মুখে আবার সেই হিসেবি, নির্মম ভাব ফিরে এসেছে।
সে ঘুরে কায়রার দিকে তাকায়।
তারপর ঠান্ডা, নির্দেশমূলক গলায় বলে,
__ও যেন প্যালেস থেকে বাইরে না যায়।ফোন ও দিবে না কেউ ওকে,খুজলেও না।
কারো সাথে যোগাযোগ করতে না পারে না যেন দেখবে।তার চোখে তখন অদ্ভুত এক সতর্কতা।
ওকে নজরে রাখবে… সবসময়।
ঘরের ভেতর তখনো বিছানায় শুয়ে আছে ইসাবেলা।চুপচাপ চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে কারন সে জানে এখানে সে কিছুই করতে পারবেনা।

____ঔষধের প্রভাব ধীরে ধীরে কাটতে শুরু করে।
ইশায়া পিটপিট করে চোখ মেলে তাকায়। যেন অন্ধকারের গভীর কোনো গর্ত থেকে ধীরে ধীরে ওপরে ভেসে উঠছে সে। মাথা ভারি হয়ে আছে মাথার ভেতরটা কেমন ঝিমঝিম করছে।গলা শুকিয়ে কাট।
ইশায়া উঠতে চায়… কিন্তু শরীর আসাড়।
পেট ক্ষিদেয় মুচোড় দিয়ে উঠছে। অনেকক্ষণ কিছু না খাওয়ার সেই অসহ্য খিদে পেটের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠছে বারবার।
ইশায়া আবার উঠার চেষ্টা করে। হাত দিয়ে বিছানায় ভর দিয়ে নিজেকে টেনে তুলতে যায়।
কিন্তু মূহুর্তেই কিছু একটার শব্দ হয় ঝনঝন করে ধাতব একটা শব্দ।হাতটা অস্বাভাবিক ভারী মনে হয় তার।
ইশায়া ভ্রু কুঁচকে নিজের হাতের দিকে তাকায়…
তার কব্জিতে ঠাণ্ডা ধাতব কিছু একটা শক্ত করে আটকানো।একটা স্টিলের হ্যান্ডকাফ।
সেই হ্যান্ডকাফ থেকে একটা মোটা চেইন বের হয়ে বিছানার পাশের ভারী লোহার রিংয়ের সাথে আটকানো।লম্বা শিকলে বন্দি সে।
ইশায়া তার হাতে এটা দেখে অবাক হয়ে যায়।

কয়েক সেকেন্ড সে স্থির হয়ে তাকিয়ে থাকে… যেন ঠিক বুঝতেই পারছে না সে কি দেখছে।
তারপর হঠাৎই অন্য হাত দিয়ে হ্যান্ডকাফটা ছুটানোর চেষ্টা করে।টান দেয়, আরেকবার টানে।
কিন্তু পারে না।শিকল টা ছুটাতে পারেনা হাত থেকে,
চেইনটা টান দিতেই আবার ঝনঝন করে শব্দ করে ওঠে।ইশায়া দাঁত চেপে আবার চেষ্টা করে।আরো জোরে।আরো মরিয়া হয়ে।এরকম করতে করতে
কিছুক্ষণ পর তার হাত ব্যথা করতে শুরু করে। শ্বাস দ্রুত হয়ে যায়।অনেকক্ষণ চেষ্টা করে হাফিয়ে উঠে ইশায়া।গলাটা তার আরো শুকিয়ে আসছে।
ঠোঁট কাঁপছে… বুক উঠানামা করছে দ্রুত শ্বাসে।
তারপর ও হার মানে না ইশায়া,আবারো খুলতে যায়,হাত লাল হয়ে গেছে,
ইশায়া চেষ্টা করতে করতে হাফিয়ে ওঠে।
লোহার শিকলটা যেন তার কবজির সঙ্গে একাকার হয়ে গেছে। যত টানে, ততই লোহার ঠান্ডা ধাতব অংশটা চেপে বসে। ব্যথায় তার আঙুলগুলো কাঁপছে, নিঃশ্বাস ভারী হয়ে ওঠে।রুমটা তখন আধো অন্ধকার।
দেয়ালের এক কোণে রাখা ছোট্ট ল্যাম্পটা থেকে হলুদাভ ম্লান আলো ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। আলো-ছায়ার সেই অদ্ভুত খেলায় রুমটা যেন আরও বেশি ভয়ের।
ইশায়াকে থেমে যেতে দেখে ভীর ঠোঁট বাঁকায়।
সে সামনে রাখা চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে।
এক হাতে হুইস্কির গ্লাস, গ্লাসের ভেতর বাদামি তরলটা হালকা আলোয় ঝিকমিক করছে।
ভীর শান্ত গলায় বলে,

___কি হলো লিটল প্রিন্সেস… শক্তি শেষ?শরীরে এই টুকুন শক্তি নিয়ে তুমি রাজভীরের সাথে লড়তে আসো।
উফফফফফ কত্ত বোকা তুমি।
তার গলায় কটাক্ষের সুর, কিন্তু চোখের গভীরে অদ্ভুত এক উন্মাদ আগ্রহ।
সে গ্লাসটা হালকা ঘুরিয়ে আবার বলে,
এতো যলদি হার মেনে নিলে পাখি?তার ঠোঁটে হাসি।
চেষ্টা করতে থাকো। যতদিন তোমার ইচ্ছে হয়।যত পারো চেষ্টা চালিয়ে যাও।
যখন দেখবে তোমার সব পথ বন্ধ… কিছুই করার নেই। তখন এই জীবন-ই তুমি মেনে নিতে বাধ্য হবে।
ভীর মাথা উঠায় তার চোখ দুটো অন্ধকারে আরও তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে।
কারণ তুমি যে দিকে তাকাবে… শুধু আমাকেই পাবে। রাজভীরকেই পাবে,আমি-ই তোমার একমাত্র গন্তব্য।
এই ছোট্ট কথাটা যত দ্রুত তুমি বুঝবে… সেটা তোমার জন্যই ভালো।
ভীর থামে তারপর গ্লাস থেকে এক চুমুক ড্রিং*ক নিয়ে বলে,

আমার বেইবি আমি আমার হাতে না পাওয়া পর্যন্ত তোমাকে এভাবেই থাকতে হবে, জান।
তার গলার সুরে অদ্ভুত এক কোমলতা আর ভয়ংকর অধিকারবোধ একসাথে মিশে আছে।
সরি পাখি… আমার কিছুই করার নেই।তুমি বাধ্য করলে আমাকে এটা করতে।
দেখো… ভালোই তো ছিলাম আমরা।কেনো আমাকে এরকম করতে বাধ্য করলে?সে চেয়ারে হেলান দিয়ে ইশায়ার দিকে তাকিয়ে থাকে।তোমাকে কেনো বোঝাতে পারিনা বলোতো… আমার তোমার সাথে শক্তি দেখাতে ভালো লাগে না।ভীর সামনের চেয়ারে বসে কথাগুলো বলতে থাকে।
তার হাতে হুইস্কির গ্লাস।রুমটা আবার নিস্তব্ধ হয়ে যায়।
সময় গড়ায়,ইশায়া কিছু বলে না।কিছুসময় পর ভীর আবার বলে,

___বেশি কষ্ট করতে হবে না তোমাকে মাত্র নয় মাস।
দেখতে দেখতে চলে যাবে।
তারপর তোমাকে আর এই বন্দী দশায় থাকতে হবে না…সব কিছু আবার স্বাভাবিক হয়ে যাবে।
ভীরের গলা শুনে ইশায়ার মুখে মুহূর্তে অন্ধকার নেমে আসে।ভীর কি ইঙ্গিত করেছে ইশায়া বুঝেছে,আর এটা সে কিছুতেই হতে দিবেনা।

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৮১

বেশি ভাবতে পারেনা ইশায়া পানির পিপাসায় সে শেষ হয়ে যাচ্ছে,তার চোখ দুটো ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে যায়।
সে একটা শব্দও বের করে না মুখ থেকে।চুপচাপ বসে থাকে।শুধু তার বুকটা ধীরে ধীরে উঠানামা করছে… আর নিঃশ্বাসের শব্দটা ভারী হয়ে রুমের নীরবতায় মিশে যাচ্ছে।

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৮৩