সে আমার বন্দিনী পর্ব ৮৩
তানিয়া হুসাইন
ইশায়া আর সহ্য করতে না পেরে অস্ফুটে বলে,
__পা…নি, পানি!
শব্দটা এতটাই দুর্বল, এতটাই ভাঙা যে মনে হচ্ছে গলার ভেতর থেকে কষ্ট করে টেনে বের করতে হয়েছে।
ভীরের কানে শব্দটা পৌঁছাতেই সে মাথা তোলে।
এক মুহূর্তও দেরি না করে উঠে দাঁড়ায়।ভীর দাড়াতেই
লম্বা, সুঠাম, বলিষ্ঠ দেহটা তখন অন্ধকার রুমে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।উদোম শরীরে বসে ছিল ভীর একটু আগেই শাওয়ার নিয়েছে। ভেজা চুলের ফোঁটা এখনও ঘাড় বেয়ে নেমে আসছে। শরীর থেকে হালকা সাবানের গন্ধ ভেসে আসছে।
ভীর এগিয়ে গিয়ে রুমের লাইট অন করে।
হঠাৎ করেই আলোয় ভরে যায় পুরো ঘরটা।
সেই উজ্জ্বল আলোয় ইশায়ার ক্লান্ত, শুকনো মুখটা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
ভীর টেবিল থেকে এক গ্লাস পানি তুলে নেয়।
ধীর পায়ে এসে ইশায়ার সামনে বসে পড়ে।গ্লাসটা ইশায়ার মুখের সামনে ধরে।
ইশায়া কাঁপা হাতে গ্লাসটা ধরতে চায়,কিন্তু ভীর তাকে নিতে দেয় না।
সে নিজেই গ্লাসটা ধরে রাখে ইশায়ার মুখের সামনে।
ইশায়া কিছু বলে না,
তার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে, পানি না খেলে পিপাসায় সে হয়তো মরে যাবে এমন একটা অবস্থা।
তাই সে আর কিছু না বলে চুপচাপ ভীরের হাত থেকেই পানি খেয়ে নেয়।
পানি খেতে গিয়ে হঠাৎ করেই ইশায়ার কাশি উঠে যায়।সে কাশতে কাশতে কুঁকড়ে যায়।ভীর তৎক্ষণাৎ তার মাথায় হাত রাখে।
নরম গলায় বলে,
__আস্তে…
তার হাতটা ধীরে ধীরে ইশায়ার মাথার ওপর বুলিয়ে যায়।
ইশায়া আবারো পানি খায়।পুরো গ্লাসের পানি শেষ করে সে,
পানি খাওয়ার পর তার গলার জ্বালা কিছুটা কমে।
শরীরেও সামান্য শান্তি নামে।
কিন্তু পর মুহূর্তেই মনটা বিষিয়ে যায়।
এই পানি এই যত্ন
সবকিছুই এক ভয়ংকর কারাগারের ভেতরের দয়া।
ভীর তখনও তার খুব কাছে বসে।
সে হাত বাড়িয়ে ইশায়ার পিঠে আলতো করে হাত বুলায়।তার স্পর্শে অদ্ভুত এক ধীরতা যা ইশায়াকে শান্ত করার চেষ্টা করছে।
কিন্তু সেই স্পর্শে ইশায়ার শরীরের ভেতর দিয়ে শীতল একটা ঘৃণার স্রোত বয়ে যায়।
ইশায়া চুপচাপ বসে আছে। তার চোখে কোনো শব্দ নেই, মুখেও নেই কোনো প্রতিবাদ।
ইশায়াকে চুপ থাকতে দেখে ভীর বলে,
___আর খাবে?
ইশায়া মাথা নাড়িয়ে না বোঝায়।
ইশায়াকে শান্ত হতে দেখে ভীরের বুকের ভেতর অদ্ভুত এক স্বস্তি আসে। এতক্ষণ যে ঝড়টা তার ভেতরে চলছিলো সেটা একটু থামে।
সে ঠিক করে আজ সে ইশায়াকে বোঝাবে শান্তভাবে।তার স্বভাবের বাইরে গিয়ে সব কিছু করবে সে তার জন্য। ভীর কখনো এভাবে বলে না কাউকে বোঝানোর ধার সে ধারেনা।
সে আদেশ দেয়, সবাই তা মেনে চলে।
কিন্তু আজ সে চাইছে বোঝাতে।
সে চায় আগের মতো সব স্বাভাবিক হয়ে যাক।
স্বাভাবিকই তো ছিলো সবকিছু…যদি না ওই মেয়েটা তাদের জীবনে এসে সবকিছু ওলটপালট করে দিতো।
ভীর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
তারপর ধীরে ধীরে ইশায়ার মুখটা নিজের দুই হাতের মাঝে তুলে নেয়।ইশায়া তাকায়।
ভীর তার চোখের দিকে গভীরভাবে তাকিয়ে নরম গলায় বলে,
___যা হয়েছে ভুলে যাও।
মুছে ফেলো সব কিছু মন থেকে। আমরা একটা ফ্রেশ স্টার্ট করি।
তার কণ্ঠস্বর একটু ভারী হয়ে আসে,
দেখো… তুমি, আমি… আর আমাদের সন্তান। আমার কাছে সব কিছু।আমার কাছে সব কিছুর ঊর্ধ্বে তুমি। সেটা তুমি ও জানো।সব তো মিথ্যা ছিলো না। আমাদের মাঝে যা ছিলো… সেগুলো সত্যি ছিলো।অতীতকে টেনে এনো না।তার আঙুলের চাপ একটু শক্ত হয় ইশায়ার গালে।ভুলে যাও আগের সব কিছু।বর্তমান আর ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবো।তার কণ্ঠস্বর নিচু কিন্তু দৃঢ়।
আমার সব কিছু তোমার। বাইরে আমি যাই হই না কেনো… আমার অন্ধকার জীবনের কোনো কিছুই তোমাকে স্পর্শ করতে পারবে না।আর না আমার সন্তানকে,তোমরা সবসময় সুরক্ষিত থাকবে।
ভীর ঝুঁকে আসে,
আমি তোমাকে আলোর মাঝেই রাখবো সবসময়।
তআমার সব কিছুই তোমার।ভালোবাসি তোমাকে আমি।আমার সন্তানের মা তুমি।
তার গলায় অনুনয়ের সাথে অদ্ভুত এক অধিকার মিশে আছে।
তোমার সাথে যুদ্ধ করতে চাইছি না আমি।
মেনে নাও সবকিছু। ভালো থাকবে।আমাদের সুন্দর একটা সম্পর্ক থাকবে।
এতোদিন যেমনটা ছিলো।
শেষ কথাটা প্রায় ফিসফিস করে বলে সে,
ভুলে যাও সবকিছু। মেনে নাও।
ইশায়া চুপচাপ ভীরের দিকে তাকিয়ে আছে।তার মুখে কোনো কথা নেই।কিন্তু তার ভেতরে এক ভয়ংকর ঝড় বয়ে যাচ্ছে।সে তো শুধু সময় চেয়েছিলো তার কাছে।সে চেয়েছিলো ভীর তাকে একটু সময় দিক, তার সাথে দুটো ভালোবাসার কথা বলুক…
তাকে ভালোবাসুক, কিন্তু আজ সব সত্যি জানার পর এতোদিনের সেই ইচ্ছে পূরণ হওয়ার পরও তার ভেতরে কোনো আনন্দ নেই।
বরং বুকের ভেতরটা এমনভাবে ব্যথা করছে মনে হচ্ছে কষ্টে তার বুকটা ফেটে যাবে।
ইশায়াকে চুপ থাকতে দেখে ভীর ঝুঁকে তার কপালে একটা চুমু খায়।
তারপর নিচু গলায় বলে
__ আমার কথাগুলো ভেবে দেখো।তুমি যা চাইবে পাবে।
সব দিবো তোমাকে আমি।
এই বলে ভীর ইশায়াকে শক্ত করে ইশায়াকে নিজের বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরে।
তার বাহুর শক্ত বন্ধনে একটা অদৃশ্য খাঁচা তৈরি হয়।এভাবেই কেটে যায় কিছু সময়।ঘরটা নিস্তব্ধ।
শুধু দুইটা মানুষের নিঃশ্বাসের শব্দ ভেসে আসছে।
কিছুক্ষণ পর ভীর আবার জিজ্ঞেস করে,
__কিছু খাবে?
ক্ষিদের যন্ত্রণায় ইশায়া তখন কাহিল।তার পেটটা মুচড়ে উঠছে।শরীর দুর্বল হয়ে আসছে।ভীরের কথায় ইশায়া ধীরে উপর নিচ মাথা নাড়ায়।
যার মানে সে খাবে।
ইশায়া খাবে শুনে ভীরের বুকের ভেতর জমে থাকা ভারটা একটু হলেও নানে। এই একটা বিষয় নিয়েই সে সবচেয়ে বেশি ভয় পাচ্ছিল।আর কিছু করতে না পেরে ইশায়া যদি খাওয়া বন্ধ করে দেয়?তাহলে সে কি করবে এখন তো সে একা না,তার ভেতরে তার অংশ আছে। ইশায়াকে নিয়ন্ত্রণ করা, তাকে আটকে রাখা এসব ভীরের কাছে কঠিন কিছু না। সে জানে কীভাবে মানুষকে ভেঙে ফেলতে হয়, কীভাবে নিজের ইচ্ছেমতো চালাতে হয়। কিন্তু সমস্যা একটাই ইশায়ার ক্ষেত্রে সে সেই ভীর থাকতে পারে না।
তার সমস্ত কঠোরতা, সমস্ত নির্মমতা যেন এই মেয়েটার সামনে এসে ভেঙে পড়ে। মাথাটা ফাঁকা হয়ে যায়, যুক্তি হারিয়ে ফেলে সে। তখন নিকোর কথাগুলোই তার কাছে একমাত্র যুক্তিসঙ্গত মনে হয়েছিল।
ভীর এই চিন্তা থেকে সরে আসে।
দেরি না করে দ্রুত মারিয়া এলেনাকে খাবারের ব্যবস্থা করতে বলে।
এদিকে ইশায়া স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে নিজের হাতের শিকলের দিকে। ঠাণ্ডা লোহার সেই বন্ধন যেন তাকে বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে তার পরিণতি । দুদিন আগেও সবকিছু কত স্বাভাবিক ছিল! নিজের ভালোবাসা নিজের মানুষ, নিজের স্বাধীনতা সবকিছু ছিল তার।আর আজ?
আজ সে বন্দি।একজন মানুষের কাছে, যাকে সে একসময় অন্যরকম ভেবেছিল।সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না ভীরের এই আসল রূপ। তার ভেতরে কোথাও একটা আগুন জ্বলছে ধিকিধিকি করে, পুড়িয়ে দিচ্ছে তাকে। এই মানুষটার জন্যই তার সব শেষ হয়ে গেল।
কিন্তু পরক্ষণেই সে নিজেকে শক্ত করে।
না, সে স্বার্থপর হতে পারে না। এখন ভেঙে পড়লে চলবে না।
ইশায়াকে শিকল ধরতে দেখে। ভীর ইশায়ার দুই হাত নিজের হাতে তুলে নেয়, শিকলসহ সেই হাত দুটো নিজের মুঠোয় বন্দি করে আলতো করে চুমু খায়। তারপর নিচু গলায় বলে,
___আমার রাজ্যের রানী তুমি…
তার কণ্ঠে একধরনের উন্মাদনা মিশে আছে।
কিন্তু আজ তোমার জেদের কারণেই আমাকে এটা করতে হলো। ছেড়ে দাও সব জেদ…আগের মতো হয়ে যাও ইশায়া… খুলে দেবো এটা আমি।
কিন্তু আমার কথা না মানলে আমার কিছু করার নেই। এভাবেই থাকতে হবে বাকি জীবন। আই রিপিট এভাবেই থাকতে হবে। আমি ছাড়বো না তোমাকে। আমি না থাকলেও তুমি আমার থাকবে।আমার কাছেই থাকবে, থাকতে হবে আজীবন।এই জীবনে তোমার মুক্তি নেই আমার হাত থেকে।
আমি না থাকলেও আমার চারপাশের বেড়াজাল তোমাকে ছাড়বেনা।পৃথিবীর বুকে আমার অস্তিত্ব না থাকলেও, মিটে গেলেও তুমি আমার থাকবে আমি সেই ব্যাবস্থা করে যাবো।
___ঠিক তখনই দরজা খুলে মারিয়া এলেনা খাবারের ট্রে নিয়ে ভেতরে ঢোকে।
তাদের সামনে এনে রাখে সবকিছু সাজিয়ে দিয়ে,
মাথা ঝুকিয়ে সম্মান জানিয়ে চলে যায় আবার।
ভীর জীবনে যা কখনো করেনি, আজ সেটাই করছে। নিজের হাতে প্লেটে খাবার তুলে নেয় সে। ইশায়ার পছন্দের ঝাল করে গরুর মাংস ভুনা আর সাদা পোলাও নেয় প্লেটে।
এই ছোট ছোট জিনিসগুলোও সে কতটা খেয়াল করে রেখেছে।
সবকিছু মেখে নিয়ে সে ইশায়ার মুখের সামনে ধরে।
ইশায়া দ্বিধায় পড়ে যায়। সে কি বলবে সে নিজে খাবে।
সে বলতে চায় কিন্তু তার ঠোঁট নড়ে না। কোনো শব্দ বের হয় না। মাথাটা ঘুরছে, শরীর দুর্বল।ভীর আবারও মুখের সামনে খাবার নিয়ে তাড়া দিলে শেষ পর্যন্ত কিছু না বলে ইশায়া মুখ খুলে।
ক্ষুধা তাকে হারিয়ে দেয়,
খাবার মুখে যেতেই এক ধরনের শান্তি অনুভব করে সে।তাই আর কিছু না বলে চুপচাপ পুরোটা খেয়ে নেয়।
প্লেট খালি হয়ে গেলে ভীর আবারও খাবার তুলে নেয় তার জন্য।
কিন্তু এবার ইশায়া দুইবার মুখে দিয়ে মাথা নাড়িয়ে জানিয়ে দেয়।আর খাবে না, তার পেট ভরে গেছে।
ভীর কিছু বলে না।
চুপচাপ বাকি খাবার নিজেই খেয়ে নেয়।
খাওয়া শেষ হলে মারিয়া এলেনা এসে ট্রে নিয়ে চলে যায়।
মারিয়া এলেনা যেতেই
ভীর উঠে গিয়ে রুমের দরজা লক করে দেয়।তারপর ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আসে।
ঘরে ফিরে লাইট অফ করে বিছানায় শুয়ে পড়ে ইশায়াকে নিজের বুকে টেনে নিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে।
ইশায়া চুপচাপ শুয়ে থাকে।তার শরীর নিস্তব্ধ, কিন্তু মন?সে ভাবছে সে কী করবে?সে কি পারবে?সে কি পারবে এই মানুষগুলোর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে?
আর এদিকে ভীর
তার খালি বুকে ইশায়ার মাথা চেপে ধরে তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখেছে। যেন এভাবেই সে তাকে নিজের মধ্যে গেঁথে রাখতে চায়।এভাবেই নিজের কাছে রাখতে চায় সারাজীবন।
ইশায়াকে শান্ত দেখে ভীরের ভেতরে অদ্ভুত এক তৃপ্তি জন্ম নেয়।
সে ভাবে ইশায়া হয়তো বুঝে গেছে।তার সাথে যুদ্ধে সে জিততে পারবে না।
সে নিজের হার মেনে নিয়েছে।এই ভ্রান্ত স্বস্তি নিয়েই ভীর চোখ বন্ধ করে।
কিন্তু ইশায়া?তার চোখ বন্ধ, শরীর স্থির…তবুও তার মস্তিষ্কে তুমুল ঝড় বয়ে যাচ্ছে।বারবার মনে পড়ছে সাফার কথা।সাফার সেই দৃঢ়তা। অন্যায়ের সামনে মাথা নত না করার সাহস, প্রতিবাদ করার শক্তি।
ইশায়ার বুকের ভেতর সেই আগুনটা জ্বলে ওঠে।
_____অন্ধকারে ডুবে থাকা, জনমানবহীন এক শূন্য জঙ্গল…গভীর রাতের নিস্তব্ধতা যেন শ্বাসরোধ করে দিচ্ছে চারপাশকে। সেই জঙ্গলের ভেতর দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে ম্যাটিয়াস সতর্ক, ঠান্ডা, কিন্তু ভেতরে চাপা টানটান উত্তেজনা।
তার পায়ের শব্দ পর্যন্ত গিলে নিচ্ছে শুকনো পাতার স্তূপ।
কিছুদূর এগিয়ে পাহাড়ের বুক চিরে তৈরি হওয়া সুরঙ্গের মতো এক সরু পথের মধ্যে ঢুকে পড়ে সে। এই পথটাই এখন লুকার নতুন আস্তানার একমাত্র প্রবেশদ্বার।
জঙ্গলটাই বেছে নিয়েছে তারা ভীরের হাত থেকে বাঁচতে হলে মানুষের চোখের আড়ালে থাকাটাই সবচেয়ে নিরাপদ।
সুরঙ্গ পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই সামনে এসে দাঁড়ায় লুকা। তার চোখে অস্বাভাবিক তীব্রতা, যেন বহুদিন ধরে জমে থাকা রাগ বিস্ফোরণের অপেক্ষায় ছিল।
ম্যাটিয়াসকে দেখেই লুকা মাতেও এগিয়ে আসে ঝড়ের মতো।
এক মুহূর্ত দেরি না করে সে ম্যাটিয়াসের কলার চেপে ধরে,চোখ দুটো রক্তিম, কণ্ঠে হুমকির আগুন।
____ফোন বন্ধ কেনো তোমার?
তারপর আরও কাছে ঝুঁকে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
আমাদের সাথে বেইমানী করছো ম্যাটিয়াস? তাহলে কিন্তু ভীরের আগে তোমাকে শেষ করবো আমরা,কান খুলে শুনে রাখো।
কিন্তু ম্যাটিয়াস থেমে থাকার মানুষ না।
সে শক্ত হাতে লুকার হাত ঝাড়া মেরে সরিয়ে দেয়, চোখে চোখ রেখে ঠান্ডা গলায় বলে,
___তোমার লোক আয়ুষ আর এলিজা ধরা পড়েছে, ভীর শেষ করে দিয়েছে ওদের।
কথাটা যেন আগুনে ঘি ঢালার মতো কাজ করে।
লুকা আর মাতেও দুজনের চোখ জ্বলে ওঠে রাগে, হিংস্রতায়।
ম্যাটিয়াস থামে না।
সে ধীরে ধীরে সবকিছু খুলে বলে প্রতিটা তথ্য, প্রতিটা ঘটনা, কিছুই লুকায় না।
তারপর এক মুহূর্ত থেমে কণ্ঠ নিচু করে বলে,
___আমাকে প্যালেসে ফিরে যেতে হবে। আমি আর যোগাযোগ করতে পারবোনা সময় সুযোগ বুঝে সব জানাবো তোমাদের।এখন আমাদের খুব বুঝে শুনে পা ফেলতে হবে।একটা ভুল খেল খতম
ম্যাটিয়াস একটু এগিয়ে এসে বলে,
__ভীর সন্দেহ করছে… তার সন্দেহের তালিকায় কেউ বাদ নেই। ভীর এখন সব খুঁজে বের করবে।নিকো ও তার সন্দেহের তালিকার বাইরে নয়।
তাই বলছি… এখন কয়েকদিন চুপচাপ গা ঢাকা দিয়ে থাকো। পরিস্থিতি ঠান্ডা হোক, আমি সব জানাবো।
শেষবারের মতো তাকায় তাদের দিকে,
চোখে কোনো আবেগ নেই, শুধু হিসেবি বাস্তবতা এখন আমাকে বিশ্বাস করা ছাড়া তোমাদের আর কোনো পথ নেই, আমি ঠিক সময় বুঝে যোগাযোগ করবো।আমি নিজে থেকে যোগাযোগ না করলে তোমরা যোগাযোগ করার চেষ্টা করবেনা।
নীরবতা নেমে আসে চারপাশে।
মাতেও আর লুকা দুজনেই জানে, ম্যাটিয়াস যেটা বলছে সেটা ঠিক।
এখন তাদের হাতে সত্যিই কিছু নেই।ম্যাটিয়াসই তাদের শেষ ভরসা।
আর ভীর।সে এখন আর মানুষ নেই।একটা হিংস্র বাঘ, যে নিজের শিকারকে খুঁজে বের না করা পর্যন্ত থামবে না।
এই মুহূর্তে চুপ থাকা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই তাদের।কিন্তু এই নীরবতা এই পিছিয়ে যাওয়া এটা পরাজয় না।
দু’পা পিছিয়ে তারা এমন এক আঘাতের প্রস্তুতি নিচ্ছে
যেটা হবে আরও ভয়ংকর, আরও নির্মম এমন আঘাত
যা ভীরের অস্তিত্বই ধ্বংস করে ফেলবে।
____ক্যাটালিনা বেলার সাথে কিছুতেই যোগাযোগ করতে পারছে না।বারবার ফোন করছে।বারবার লোক পাঠাচ্ছে,কিন্তু কোনোভাবেই কোনো উত্তর পাচ্ছে না সে।
__সে প্যালেসের গার্ডদের সাথে যোগাযোগ করে।
ঠান্ডা, কঠিন গলায় একের পর এক প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়
কোথায় বেলা?কার সাথে ? ওর ফোন বন্ধ কেনো,
কিন্তু গার্ডদের কেউই ঠিকঠাক কিছু বলতে পারে না।
তাদের অস্পষ্ট, ভয়ে কাঁপা উত্তরগুলো ক্যাটালিনার রাগকে আরও উসকে দেয়।
এসব দেখে ক্যাটালিনা রেগে ফেটে পড়ে।
তার চোখ দুটো রক্তবর্ণ হয়ে ওঠে।হাতে ধরা গ্লাসটা শক্ত করে চেপে ধরে একসময় সেটাই ছুড়ে মারে দেয়ালের দিকে।গ্লাসটা ভেঙে চুরমার হয়ে ছড়িয়ে পড়ে মেঝেতে।
রুমটা ভারী হয়ে ওঠে তার দমবন্ধ করা ক্রোধে।
সে দাঁড়িয়ে যায়।তার ঠোঁটের কোণে তীক্ষ্ণ এক হাসি ফুটে ওঠে,
যে হাসির ভেতরে লুকিয়ে আছে ভয়ংকর কিছু।
সে ঠিক করে সিনালোয়া থেকে গুয়াদালাহারা ফিরে যাবে।আর দূরে বসে কিছু নয় এবার সামনে থেকেই করতে হবে যা করার।
তার চোখে তখন জ্বলছে বহু বছরের লালসা, লড়াই আর দখলের আগুন।তার এতোদিনের স্বপ্ন সে ভেঙে যেতে দেবে না।এই সাম্রাজ্য এই ক্ষমতা এই সিংহাসন
সে অন্য কাউকে দেবে না।
কাউকে না।তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে ওঠে।
সে ধীরে, স্পষ্ট করে নিজের মনেই বলে,
আগে ভীরের মাকে সরিয়েছি এখন প্রয়োজনে ভীরের সন্তানের মাকেও সরিয়ে দেবে।তার চোখে কোনো দ্বিধা নেই।
কোনো অনুশোচনা নেই।শুধু একটাই লক্ষ্য ক্ষমতা।
সে ঠান্ডা গলায় ফিসফিস করে,এই বাচ্চাকে আসতে দিবো না আমি,কিছুতেই না।
ক্যাটালিনার প্রতিটা কথা
অদূরে দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে শুনে ফেলেন ভীরের গ্র্যান্ডমাদার, ইলারা আলভারেয।দূরের দাঁড়িয়ে তিনি স্থির চোখে তাকিয়ে ছিলেন ক্যাটালিনার দিকে।
ক্যাটালিনার শেষ কথাটা
এই বাচ্চাকে সে আসতে দিবে না… কিছুতেই না।
এই কথাটা শুনেই একটা দীর্ঘশ্বাস তার বুকের ভেতরেই আটকে যায়।
তিনি মনে মনে বলেন,
___তুমি যেটা চাইছো সেটা হবে না ক্যাটালিনা।
তার কণ্ঠ কোন আওয়াজ নেই কিন্তু সেই নীরব প্রতিজ্ঞা শক্তিশালী।
তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে অতীত নাজিয়া ভীরের মা যাকে তিনি রক্ষা করতে পারেননি।
একটা অদৃশ্য অপরাধবোধ বছরের পর বছর ধরে তাকে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে।তার আঙুলগুলো ধীরে মুঠো হয়ে আসে।
মনে মনে আবার বলেন,
নাজিয়াকে বাঁচাতে পারিনি আমি তোমার হাত থেকে,
কিন্তু আমার ভীরের বউ আর তার সন্তানের উপর আমি তোমার ছায়াও পড়তে দিবো না। তার চোখে স্পষ্ট আগুন।
_____এদিকে সময় নিজের গতিতেই এগিয়ে যেতে থাকে। কিন্তু ইশায়ার ভেতরের পৃথিবীটা প্রতিটা দিনেই আরও বেশি ভেঙে পড়তে থাকে।শারীরক মানসিক সব দিক থেকেই ভেঙে পড়েছে সে।
প্রেগনেন্সির শুরুর এই সময়টা তার জন্য হয়ে ওঠে এক ভয়ংকর অভিজ্ঞতা। সকালে ঘুম ভাঙতেই বমির তীব্র অনুভূতি এসে আঘাত করে গলায়। কিছু খাওয়ার চেষ্টা করলেই শরীর যেন প্রতিবাদ করে ওঠে একটু পরই সব কিছু বমি হয়ে বেরিয়ে যায়। দিনের বেশিরভাগ সময়ই সে কিছুই ধরে রাখতে পারে না পেটে।তার শরীর দিন দিন দুর্বল হয়ে পড়ে। মাথা ঘোরা, হালকা জ্বর জ্বর ভাব,শরীরের ভেতর অস্বস্তি সবকিছু মিলিয়ে সে নিজের শরীরের উপরই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। কখনো হঠাৎ পেটে তীব্র ব্যথা শুরু হয়, আবার কখনো এমন দুর্বল লাগে যে বিছানা ছেড়ে ওঠার শক্তিও পায় না।
এই শারীরিক কষ্টের পাশাপাশি মানসিক চাপও তাকে ভেঙে দিচ্ছে। একদিকে বন্দী জীবন, অন্যদিকে নিজের শরীরের অজানা পরিবর্তন সব মিলিয়ে সে এক গভীর দ্বন্দ্বে আটকে থাকে। কখনো ভয়, কখনো বিভ্রান্তি, কখনো নীরব কান্না এইসবই এখন তার প্রতিদিনের সঙ্গী।মুড সুয়িং তো আছে।
এদিকে ভীর এই পরিবর্তন গুলোকে সম্পূর্ণ অন্যভাবে দেখতে থাকে।তার ধারণা, ইশায়া ইচ্ছে করেই খাচ্ছে না। নিজের শরীর খারাপ দেখাচ্ছে। তার মতে, ইশায়া বাচ্চাটাকে চায় না এই কারণেই সে এমন আচরণ করছে।
এই ভাবনা ভীরকে আরও ডেসপারেট করে তোলে। তার ভেতরের অধিকারবোধ, ভালোবাসা আর ভয় বাচ্চার জন্য অগাধ মায়া সবকিছু একসাথে মিশে গিয়ে তাকে আরও কঠোর করে তোলে। সে তার বাচ্চার কিছুই হতে দিবেনা।
ইশায়াকে সে জোর করতে শুরু করে সব কিছুতেই,বাধ্য করে তাকে। খাবার সামনে এনে বসিয়ে দেয়, নিজের হাতে তুলে খাইয়ে দিতে চায়। কখনো শান্তভাবে বোঝানোর চেষ্টা করে, কখনো আবার চাপ সৃষ্টি করে তার কণ্ঠে লুকিয়ে থাকে অস্থিরতা আর একরাশ দুশ্চিন্তা।
কিন্তু প্রতিবারই একই ঘটনা ঘটে।এই চক্র বারবার চলতে থাকে খাওয়ানো, আর তারপরই শরীরের প্রতিরোধ।ভীরের চোখে এই দৃশ্যগুলো ধীরে ধীরে ভয় ঢুকিয়ে দেয়।
যতবার সে নিজের চোখে দেখে ইশায়ার দুর্বল শরীর, কাঁপতে থাকা হাত, ফ্যাকাশে মুখ ততবারই তার ভেতরের বিশ্বাসটা ভাঙতে শুরু করে।একসময় ভীর সম্পূর্ণভাবে ঘাবড়ে যায়।তার সেই কঠিন, নিয়ন্ত্রণশীল মানসিকতা কোথাও যেন নরম হয়ে যায়।
সে আমার বন্দিনী পর্ব ৮২
ধীরে ধীরে সে তার সব মিশন, ব্যবসা, ডিল পরিকল্পনা সবকিছু থেকে সরে আসে। দায়িত্ব তুলে দেয় ডিয়েগো, সান্তিয়াগো আর নিকোর উপর। নিজের দুনিয়ার কেন্দ্রবিন্দু এখন আর কোনো কার্টেল বা ক্ষমতা নয় বরং ইশায়া।
সে সারাক্ষণ ইশায়ার পাশে থাকতে শুরু করে। তার অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে, ডাক্তার সব সময় থাকে। কিন্তু তার নিজের অস্থির মন তাকে বারবার এক জায়গায় আটকে রাখে।
