Home সে আমার বন্দিনী সে আমার বন্দিনী পর্ব ৮৪

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৮৪

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৮৪
তানিয়া হুসাইন

ইশায়ার অবস্থা দেখে ডাক্তার ভীরের দিকে তাকিয়ে বলেন,
____মি.ভীর।এখন যা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সেটা হলো তাকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করা। তাকে শুধু শারীরিকভাবে নয়, মানসিকভাবেও স্থিতিশীল রাখতে হবে। হাসি খুশি রাখার চেষ্টা করুন। এই সময় তার মানসিক চাপ ভয় আর অস্থিরতা তার শরীরকে দুর্বল করে ফেলছে, আর এতে আপনার বাচ্চার উপরও প্রভাব পড়ছে। যদি তাকে এইভাবে ঘরবন্দি করে জোরপূর্বক সব কিছু করানো হয়, সে কখনো স্বাভাবিক হতে পারবে না। এতে শুধু তারই ক্ষতি নয়, বাচ্চারও ক্ষতি হবে।

___ভীর শব্দহীন হয়ে দাঁড়িয়ে রয়। ডাক্তারের কথাগুলো তার কানের ভেতর গভীর ঢেউয়ের মতো বাজছে।
তার জীবনের সব থেকে কঠিন পথে মনে হয় সে এখন হাটছে।সারাজীবন টাকা আর পাওয়ারের জোরে সে সব কিছু হাসিল করে এসেছে।কিন্তু এখন তার নিজেকেই অসহায় মনে হয়।
ইশায়াকে স্বাভাবিক রাখার জন্য আপনাকে প্রথমে তাকে মানসিকভাবে নিরাপদ বোধ করাতে হবে। তাকে ভয় দেখানো যাবে না, চাপ দেওয়া যাবে না। খাবারের প্রতি ও জোর করার চেয়ে ছোট ছোট পদক্ষেপ নিতে হবে,যেমন হালকা স্ন্যাক্স, জল খাওয়ানো, ধীরে ধীরে পুষ্টিকর খাবারের অভ্যাস। সে যদি কিছুই রাখতে না পারে, আতঙ্কিত হবেন না। বারবার চেষ্টা নয়, বরং উৎসাহ দিয়ে খেতে সাহায্য করুন।
দ্বিতীয়ত, তাকে ঘর বন্দি রাখবেন না পুরো সময়। প্রেগনেন্সির সময় কিছু হালকা চলাফেরা, সূর্যের আলো, শান্ত পরিবেশ সবকিছুই মানসিক শান্তি বাড়ায়। কথা বলুন, হাসি ভাগ করুন, ছোট খেলা বা গল্পের মাধ্যমে মনোরঞ্জন দিন।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তাকে জানাতে হবে যে সে একা নয়। আপনার উপস্থিতি, যত্ন এবং ভালোবাসা তার জন্য সবচেয়ে বড় সহায়। প্রেগনেন্সির সময় শরীর এবং মনের সঠিক যত্ন না নিলে বিপদ আসতে পারে জ্বর, বমি, পেট ব্যথা, দুর্বলতা এগুলোতে মারাত্মক অবনতি ঘটতে পারে। তাই এখন আপনার কাজ নিয়ন্ত্রণ নয়, স্নেহ এবং ধৈর্য।

____ভীর ডাক্তারের কথা শুনে,মন দিয়ে শুনে।
ইশায়াকে সুস্থ রাখতে সে সব কিছুই করতে পারবে।
যা যা করতে হয় সে সব করবে।সে ইশায়াকে আর তার বেইবিকে সুস্থ ভাবে নিজের কাছে চায়।
তারপর থেকেই ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করে ভীরের আচরণ।ভীর আগের থেকে অনেক বেশি-ই নরম হয়ে আসে ইশায়ার উপর।তার রাগ জেদ কিছুই আর প্রকাশ পায় না ইশায়ার ক্ষেত্রে।
ভীরের আদেশে প্রতিদিন সকালে আর বিকেলে ইশায়াকে রুমের বাইরে নিয়ে যাওয়া শুরু হয়।বাগানে ছাদে নিয়ে যায় তারা ইশায়াকে, মারিয়া এলেনা রানিয়া লুসিয়া সহ আরো পাচজন মহিলা গার্ড তাকে নিয়ে যায় প্যালেসের বিশাল বাগানে।ওইখানেই ইশায়ার যতক্ষন মন চায় ইশায়া থাকে।
নরম রোদ, হালকা বাতাস ফুলের গন্ধে ভরা সেই বাগান ইশায়ার একটু হলেও হালকা লাগে এই সময়টা।
সে ধীরে ধীরে হাঁটে… খুব বেশি শক্তি নেই শরীরে, তবুও হাঁটার চেষ্টা করে। মাঝে মাঝে থেমে যায়, চোখ বন্ধ করে গভীর শ্বাস নেয়।
এই ছোট্ট সময়টাই এখন তার কাছে মুক্তির মতো।

___দূর থেকে দাঁড়িয়ে ভীর তাকিয়ে থাকে।
সে এগিয়ে যায় না, কথা বলে না শুধু দেখে।কারন তার মনে হয় তাকে দেখলে ইশায়ার সেই আনন্দটুকু ও মলিন হয়ে যাবে।ইশায়ার মুখে যখন একটু হলেও শান্তির ছাপ পড়ে, ভীরের বুকের ভেতর অদ্ভুত এক অনুভূতি জন্ম নেয়।যেটা তার কাছে একেবারেই নতুন।
কিন্তু এই সামান্য মুক্তির সময় শেষ হলেই আবার সেই বাস্তবতা।রুমে ফিরে আসার পর আবারও শিকলে বন্দী হয়ে যায় ইশায়া।হাতের সেই ঠাণ্ডা লোহার বাঁধন, দরজার বাইরে পাহারা সব কিছু আগের মতোই থাকে।
ভীর নিজেই এই নিয়ম তৈরি করেছে।তার একটাই কথা
আগামী নয় মাস এভাবেই থাকতে হবে তোমাকে, যতদিন না আমার বেবি পৃথিবীতে আসে।
তার কণ্ঠে কঠোরতা…কিন্তু সেই কঠোরতার আড়ালে এখন একটা ভয় লুকিয়ে আছে।ইশায়ার জন্য ভীর সবকিছু করতে শুরু করে যা ডাক্তার বলেছিল, তার একটাও বাদ দেয় না।সে বিভিন্ন ধরনের বই এনে দেয় ইশায়ার জন্য। গল্পের বই, হালকা রোমান্টিক উপন্যাস, এমনকি কিছু বই যা মা হতে যাওয়া নারীদের জন্য লেখা।সে চায় ইশায়ার মন অন্যদিকে ব্যস্ত থাকুক, তার ভেতরের ভয় আর অস্থিরতা যেন কিছুটা হলেও কমে।
প্রতিদিন খাবারের তালিকা বদলানো হয়।
হালকা খাবার, ফল, জুস যেগুলো ইশায়া সহ্য করতে পারে, সেগুলোই দেওয়া হয়।
ভীর নিজে দাঁড়িয়ে থাকে কখনো কখনো জোর করে, আবার এক ধরনের নীরব অনুরোধ নিয়ে।

___একটু খাও…
তার কণ্ঠে আগের সেই আদেশ থাকে না, বরং থাকে অদ্ভুত এক নরমতা।
ইশায়া অনেক সময় মুখ ফিরিয়ে নেয়… অনেক সময় আবার চেষ্টা করে, কিন্তু শরীর সাড়া দেয় না।
তবুও ভীর এবার চুপ থাকে। রাগ, চিৎকার করে না।
সে শুধু তাকিয়ে থাকেতার চোখে স্পষ্ট অস্থিরতা, আর এক ধরনের অসহায় ভালোবাসা।
রাতে যখন ইশায়া ঘুমিয়ে পড়ে, ভীর অনেকক্ষণ বসে থাকে তার পাশে।তার দৃষ্টি কখনো ইশায়ার ফ্যাকাশে মুখে, কখনো তার পেটের দিকে যেখানে তার সন্তানের অস্তিত্ব।একজন ভয়ংকর মাফিয়া,
যে মানুষটা শত শত মানুষের জীবন-মৃ*ত্যু নিয়ে খেলা করে,সে এখন এক অসহায় মানুষের মতো বসে থাকে
দুইটা প্রাণকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য।
তার এই নরম দিকটা কেউ দেখে না, না তার গার্ডরা, না তার শত্রুরা।
এগুলো শুধু ইশায়া আর সেই অনাগত সন্তান এর জন্য।
কিন্তু এই ভালোবাসার মধ্যেও এক অন্ধকার সত্য লুকিয়ে আছে, ইশায়ার মুক্তি নেই এই বন্দী জীবন থেকে ।কারণ যতই যত্ন করুক, যতই নরম হয়ে উঠুক ভীর, ইশায়া তখনও বন্দী।তার প্রতিটা পদক্ষেপ সবকিছুই ভীরের নিয়ন্ত্রণে। ভালোবাসা আর বন্দিত্ব দুটো একসাথে মিশে গিয়ে তৈরি করছে এক ভয়ংকর, নিঃশ্বাসরুদ্ধ করা বাস্তবতা যেখানে যত্নও আছে, আবার শিকলও আছে।
ভীরের ছোটবেলা তার মায়ের সাথে হওয়া সব কিছুই তার ভয়ের কারন।ভীর চায়না এমন কিছু যাতে আর হোক।ইশায়াকে ছাড়া সে কিছু কল্পনাই করতে পারেনা। আর মায়ের মতো ইশায়াকেও হারাতে চায় না সে।
এভাবেই কাটে সামনের দিন গুলো।

____এর মধ্যে ক্যাটালিনা এস্কালান্তে আর ভীরের গ্র‍্যানি ইলারা আলভারেয আসে প্যালেসে।
ইলারা আলভারেয এর আসা নিয়ে ক্যাটালিনার চোখে স্পষ্ট বিরক্তি । কিন্তু ইলারা আলভারেযের উপস্থিতি তাকে চুপ করিয়ে দেয়।সে জানে, এই বুড়ি যদি ভীরের কানে কিছু উল্টা পাল্টা ঢেলে দেয়, তাহলে পরিস্থিতি তার হাতের বাইরে চলে যাবে।
আর সেটা ক্যাটালিনা কোনোভাবেই হতে দেবে না।
তাই নিজের বিরক্তি গিলে ফেলে, ঠোঁটে কৃত্রিম হাসি টেনে নেয় সে।
প্যালেসে ঢুকেই ক্যাটালিনা প্রথম প্রশ্নটা করে,
___বেলা কোথায়?
তার কণ্ঠে ছিলো অস্থিরতা।
সবাই মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে, কাউকে কোন জবাব দিতে না দেখে,সে সোজা হেঁটে চলে যায় বেলার রুমের দিকে।দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই দেখে সে পুরো রুম ফাকা। কপালে ভাঁজ পড়ে,চোখ দুটো সরু হয়ে আসে সন্দেহে।
___কোথায় গেলো আমার মেয়ে…?নিজের মধ্যেই বিড়বিড় করে ওঠে সে।
রাগ আর অস্থিরতা মিশে গিয়ে তার ভেতরে অদ্ভুত এক ঝড় তৈরি হয়।
ঠিক তখনই সে সামনে পায় কায়রাকে।
ক্যাটালিনা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়,

__বেলা কোথায়?
কায়রা প্রথমে একটু ইতস্তত করে,কিন্তু শেষ পর্যন্ত সব বলে দেয়।কথাগুলো শুনে ক্যাটালিনা মুহূর্তেই স্থির হয়ে যায়।তার চোখে বিস্ময়, তারপর সেটা রূপ নেয় ক্রোধে।
নিকো…তার ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে বের হয় নামটা চাপা, কিন্তু আগুনে ভরা।
দেরি না করে সে দ্রুত পা ফেলে এগিয়ে যায় নিকোর রুমের দিকে বেলা বেলা বলে ডাকতে ডাকতে।
দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই তার চোখ স্থির হয়ে যায়
বেলা সেখানেই নিকোর রুমে।
দৃশ্যটা যেন তার রক্তে আগুন ধরিয়ে দেয়।
___বেলা!
চিৎকার করে ওঠে ক্যাটালিনা, তার কণ্ঠে তীব্র রাগ আর অপমানের ঝড়।তার চোখ জ্বলছে… শ্বাস ভারী হয়ে উঠেছে।
ইসাবেলা বেডে শুয়ে, ক্যাটালিনাকে এই মূহুর্তে এখানে দেখে ঘাবড়ে যায় ইসাবেলা।
ঠিক তখনই ইসাবেলা এগিয়ে আসে।মা তাকে ভুল বুঝবে এজন্য সে শান্ত গলায় সবকিছু বলতে শুরু করে,
কি কি হয়েছে কিভাবে বেলাকে নজরবন্দী করে রাখা হয়েছে।কিভাবে তার ফোন নিয়ে নেওয়া হয়েছে…তার প্রতিটা চলাফেরা নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে।নিকোর তার প্রতি আচরন।প্রতিটা শব্দ ক্যাটালিনার ধৈর্যের সীমা ভেঙে দিচ্ছে।
ইসাবেলার মুখে সব শুনে ক্যাটালিনার ভেতরের আগুন এক ঝটকায় জ্বলে ওঠে। তার চোখে রাগ, ভেতরে ভয়ংকর এক ঝড়। সে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে এসব কথা শুনে।
দাঁত চেপে ক্যাটালিনা বলে,

__ওই নিককে আমি ছাড়বো না।কিছুতেই না।ওর সাহস কি করে হয় তার কণ্ঠে এমন এক দৃঢ়তা, যেন এই মুহূর্তে সে নিকোকে ধ্বংস করে দিবে।
ক্যাটালিনা আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়ায় না। ইসাবেলার হাত শক্ত করে ধরে টান দিয়ে বলে,
তুমি এই মুহূর্তে চলো আমার সাথে। এখানে আর এক সেকেন্ড না।
ঠিক তখনই ওয়াশরুমের দরজা খোলার শব্দ হয়।
দুজনেই ঘুড়ে তাকায় সেই শব্দে।
সদ্য শাওয়ার নিয়ে বেরিয়ে আসে নিকো।তার শরীরে শুধু একটা কালো টাওজার, ভেজা পানির ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছে বুক, কাঁধ, বাহু বেয়ে। ভেজা চুল কপালে লেগে আছে, ক্যাটালিনা কে এখানে এই মূহুর্তে দেখে অবাক হয় নিক।
তার ক্লিন শেভ মুখের শক্ত চোয়ালটা ক্যাটালিনাকে দেখেই আরও কষে ওঠে।
নিকো নির্লিপ্ত ঠাণ্ডা গলায় বলে,

___ক্যাটালিনা এস্কালান্তে… এখানে? আমার রুমে?
তার কণ্ঠে বিস্ময়ের চেয়ে বেশি ছিল বিরক্তি।
ক্যাটালিনা যেন বিস্ফোরিত হয়।রাগে গমগম করতে করতে সে বলে,
__You bastard! তোমার সাথে আমার কোনো কথা নেই। যা কথা হবে, ভীরের সামনে হবে।
বলেই সে আবার ইসাবেলার হাত টেনে দরজার দিকে এগোয়।
ঠিক তখনই নিকোর গম্ভীর, ভারী কণ্ঠ ভেসে আসে,
___বেলার হাত ছাড়ুন।
নিকোর কথায় ক্যাটালিনা থেমে যায়। কপাল কুঁচকে তাকিয়ে বলে,
___What?
ইসাবেলা নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে, শুধু দুজনের দিকে তাকিয়ে আছে। তার বুকের ভেতরটা ধুকপুক করছে।
নিকো ধীর পায়ে এগিয়ে আসে। তার দৃষ্টি গিয়ে থামে ক্যাটালিনার হাতে যেখানে সে ইসাবেলাকে শক্ত করে ধরে রেখেছে।
তার কণ্ঠ ঠাণ্ডা, কিন্তু তাতে লুকানো হুমকি স্পষ্ট,

___বেলা কোথাও যাবে না। এখানেই থাকবে। এটাই ওর রুম।
একটু থেমে, চোখ তুলে সরাসরি ক্যাটালিনার দিকে তাকিয়ে বলে,
__You can leave.
এই একটুকু কথাতেই যেন আগুনে ঘি পড়ে।
ক্যাটালিনা তীব্র গলায় বলে ওঠে,
___আমার মেয়েকে আমি নিয়ে যাবোই! আটকে দেখাও তুমি!
বলেই সে জোরে টান দেয় ইসাবেলার হাতে।কিন্তু এর আগেই নিকো ইসাবেলার হাত চেপে ধরে। এক ঝটকায় তাকে নিজের দিকে টেনে নেয়।ইসাবেলার শরীর এসে ধাক্কা খায় তার বুকের সাথে।
নিকো নিচু গলায়, দাঁত চেপে বলে,

__আমার সাথে বাড়াবাড়ি করতে আসবেন না।
তার চোখে তখন অদ্ভুত এক অন্ধকার।
আমি ভীর না… যে সম্পর্কের খাতিরে ছেড়ে দেব।এক্কেবারে শেষ করে ফেলব আমি।
ক্যাটালিনা নিকোকে কিছু বলতে যাবে।ঠিক তখনই নিকো গা*ন বের করে তার দিকে তাক করে ধরে।এক সেকেন্ড,শুধু এক সেকেন্ডেই পরিস্থিতি পুরো বদলে যায়।
ইসাবেলা ঘাবড়ে যায়। তার চোখ বড় হয়ে ওঠে।
সে মায়ের দিকে যেতে চায় কিন্তু নিকো তার পেট চেপে ধরে তাকে আটকে রাখে, নিজের শরীরের সাথে শক্ত করে ।
ক্যাটালিনা স্থির দাঁড়িয়ে, রক্তচোখে তাকিয়ে আছে নিকোর দিকে।
দুজনের মাঝে নিঃশব্দে যুদ্ধ চলছে।ইসাবেলা কাঁপা কাঁপা গলায় বলে ওঠে,

___মম… প্লিজ… তুমি যাও…তার চোখে পানি টলমল করছে।তুমি চলে যাও এখান থেকে,আমি তোমার সাথে পরে কথা বলবো… প্লিজ যাও।
তার কণ্ঠে অনুরোধ, ভয় আর লুকানো অসহায়তা।
ক্যাটালিনা কিছু বলতে যায় কিন্তু ইসাবেলার চোখের ইশারা তাকে থামিয়ে দেয়।মেয়ের চোখে সে এমন কিছু দেখে যা তাকে এই মুহূর্তে থামতে বাধ্য করে।
একটা ভারী নিঃশ্বাস ফেলে, দাঁত চেপে সে আর কিছু না বলে ঘুরে দাঁড়ায়।তার হাই হিলের শব্দ গমগম করতে করতে রুম থেকে বেরিয়ে যায়।দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দটা পুরো ঘরে প্রতিধ্বনি তোলে।
নিকো কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর ধীরে মুখ নামিয়ে আনে ইসাবেলার ঘাড়ের কাছে। ভেজা চুলের ফোঁটা গড়িয়ে পড়ে তার ত্বকে ঠান্ডা, অথচ ভেতরে জমে থাকা আগুনটা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
নিক ঘাড়ে মুখ ডুবিয়ে, নিচু স্বরে, শান্ত কণ্ঠে বলে,

___কি ম্যাডাম… মা কে ডেকে এনে কি ভাবছেন ছেড়ে দিবো আপনাকে?
তার নিঃশ্বাস গরম হয়ে লাগছে ইসাবেলার ত্বকে।
এতো সহজ নিকের হাত থেকে বাঁচা?
কথা শেষ হতেই আচমকা নিক দাঁত বসিয়ে দেয় বেলার ঘাড়ের নরম মাংসে।
____আহ…
একটা চাপা কোকানো শব্দ বেরিয়ে আসে বেলার মুখ থেকে। শরীরটা কেঁপে ওঠে, হাত দুটো শক্ত হয়ে যায়।
নিক মুখ সরায়, কিন্তু তার চোখের দৃষ্টি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত, নিয়ন্ত্রণহীন ছায়া।
সে ঠান্ডা গলায় বলে,
___আমি যাই নি তোর কাছে… তুই এসেছিস, তোর ইচ্ছায়।
বেলাকে তার দিকে ঘুড়িয়ে একেবারে কাছে আনে,
হিসহিসিয়ে বলে,

__আর ওটাই তোর শেষ ইচ্ছা ছিলো।
ইসাবেলার বুক ধড়ফড় করছে। সে কিছু বলার আগেই নিকো আবার বলে ওঠে,।এর পর যা হবে… সব আমার মর্জিতে হবে।তারপর এক ঝটকায় বেলাকে ধাক্কা দেয়।
ইসাবেলা ভারসাম্য হারিয়ে সোজা গিয়ে পড়ে বিছানার উপর। নরম ম্যাট্রেসেও আঘাতটা কম লাগে না,
তারপর। সে আলমারির দিকে যায়, নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে একটা শার্ট বের করে পরে নেয়।
দরজার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে থামে এক সেকেন্ড। এক ঝলক তাকায় বেলার দিকে সেই দৃষ্টিতে স্পষ্ট হুমকি।তারপর দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে যায়।
বের হওয়ার আগে দরজাটা বাইরে থেকে বন্ধ করে দেয়।

____দুপুরের আলোটা ব্যালকনি পেরিয়ে ঘরে এসে পড়ছে।ইশায়া নিঃশব্দে তাকিয়ে আছে সেদিকে। এই আলোতেও যেন কোনো উষ্ণতা নেই।
ইশায়া বিছানার এক কোণে গুটিয়ে বসে আছে দু’হাতে জড়িয়ে রেখেছে নিজের শরীরটাকে, যেন নিজেকেই শক্ত করে ধরে না রাখলে ভেঙে পড়বে। তার চোখদুটো ফাঁকা নিষ্প্রাণ তার ভেতর থেকে সব অনুভূতি শুকিয়ে গেছে।
একসময় যে চোখে ছিলো হাসি, দুষ্টুমি, প্রাণ আজ সেখানে শুধু ক্লান্তি আর অদ্ভুত এক শূন্যতা।
ইশায়া ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করে, লোকটা কাল আসে নি না চাইতেও তার মনে চিন্তা আসছে,কেন আসলো না কাল।সকাল
ইশায়া চায় না মনে করতে।ভুলে যেতে চায় সব কিছু,এই নি*কৃষ্ট লোক ভালোবাসার যোগ্য না।
ইশায়া একটা দীর্ঘ শ্বাস নিয়ে চোখ বন্ধ করে,কিন্তু চোখ বন্ধ করতেই আবারো ভীরের মুখটা ভেসে উঠে সামনে ।
সেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, গভীর কণ্ঠ, আর সেই স্পর্শ ।
ইশায়া চোখ খুলে ফেলে, হাঁপাতে লাগলো সে।

___না… না… ফিসফিস করে উঠে সে। আগে সবকিছু কত সহজ ছিলো।ভীর মানেই ছিলো তার কাছে ভয়… ঘৃণা… একটা দমবন্ধ করা কারাগার।কিন্তু এখন এখন সেই মানুষটার জন্যই তার বুকের ভেতর অদ্ভুত এক যন্ত্রণা।এই অনুভূতিটা সে মানতে পারে না,বুঝতেও পারে না।ভীরকে ঘৃণা করার কথা,তাকে ঘৃণা করা উচিত।তার উপর রাগ হওয়া উচিত,তাকে শেষ করতে হবে।কিন্তু কেন কেন চোখ বন্ধ করলেই তার মুখটা এভাবে সামনে চলে আসে।কেনো এই দম বন্ধ করা অনুভূতি তাকে জেকে ধরে।কেন সে কাছে না থাকলে ভেতরটা এতো ছটফট করব।ইশায়ার বুক ওঠানামা করতে শুরু করে।
সে নিজের বুক চেপে ধরে ভেতরের সেই অস্থিরতাকে থামাতে চায়।

___আমি… আমি এমন কেন হচ্ছি,তার গলা কাপে,
তার মনে হচ্ছে
সে যেন দুই দিক থেকে টান খাচ্ছে।একদিকে তার অতীতভয়ের, ঘৃণার, অপমানের স্মৃতি।অন্যদিকে একটা অজানা টান যেটা তাকে ধীরে ধীরে ভীরের দিকেই ঠেলে দিচ্ছে।এই দ্বন্দ্বটাই তাকে শেষ করে দিচ্ছে।ইশায়ার চোখ দিয়ে নিঃশব্দে পানি গড়িয়ে পড়ে।
সে আর চিৎকারও করতে পারছে না,কাঁদতেও পারছে না ঠিকমতো…শুধু নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়।
মনে হচ্ছে বুকের ভেতর কেউ শক্ত করে চেপে ধরেছে।
দুপুরের নিস্তব্ধতা এখনও আছে রুমজুড়ে।
ইশায়া আগের মতোই বিছানার এক কোণে,
ঠিক তখনই নিঃশব্দে দরজা খুলে রুমে ঢুকে ভীর।
রুমে পা রাখতেই তার চোখ সোজা গিয়ে থামে ইশায়ার উপর।এক মুহূর্ত শুধু এক মুহূর্তের মধ্যেই তার বুকের ভেতরটা হালকা হয়ে আসে।

একটা অদৃশ্য চাপ যেন সরে যায়,এতক্ষণ পর্যন্ত যেন তার জানটা গলার কাছেই আটকে ছিল।খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছাড়া আজকাল সে বাইরে যায় না খুব একটা।
তার সমস্ত মনোযোগ সব কিছু শুধু ইশায়ার।আশেপাশেই সীমাবদ্ধ।ভীর ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় তার প্রানের কাছে।
ইশায়া তখনও একইভাবে বসে আছে।
রুমে কারো উপস্থিতি তার মধ্যে কোনো নড়াচড়া আনে না।কিন্তু ভীরের পারফিউমের কড়া, পরিচিত গন্ধটা বুঝে সে কে এসেছে।কিন্তু তার মুখের অভিব্যক্তি একটুও বদলায় না।
ভীর এসে বসে বিছানায় ইশায়ার পাশে।কিছু না বলে এক হাত বাড়িয়ে দেয় ইশায়ার চুলের পেছন দিয়ে গিয়ে তার ঘাড়ে চেপে ধরে আস্তে করে নিজের দিকে টেনে আনে তাকে। আর তারপর একটা চুমু আকে তার ঠোঁটে।কোনো কোমলতা নেই তাতে।কোনো প্রশ্ন নেই শুধু নিজের মতো করে ছুঁয়ে নেওয়া।
পরক্ষণেই সরে আসে সে হাতটাও সরিয়ে নেয় ইশায়ার ঘাড় থেকে।ইশায়া কিছুই বলে না।শুধু চোখদুটো আস্তে বন্ধ করে নেয়।ভীর তাকিয়ে থাকে তার দিকে।এই ফ্যাকাশে মুখ, নিস্তেজ দৃষ্টি এই ইশায়াকে সে চায় না।সে চায় আগের সেই মেয়েটাকে যার চোখে আগুন ছিল, প্রাণ ছিল কিন্তু যতই চায়।সে তাকে আর খুঁজে পায় না।এই অদৃশ্য হারিয়ে যাওয়া জিনিসটাই তাকে ভেতর থেকে পুড়িয়ে দিচ্ছে।
তবুও নিজেকে সামলে নেয় ভীর।আর কয়টা মাস…

শুধু অপেক্ষা তারপর সব আবার আগের মতো হয়ে যাবে,এই বিশ্বাসেই নিজেকে সামলে রেখেছে।
ভীর ব্যাগ থেকে একটা ছোট বক্স বের করে।
ইশায়ার সামনে ধরে।কিন্তু ইশায়া তাকায়ও না সেদিকে।ভীর চুপ করে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ।
কিছু বলে না নিজেকে সে এখন খুব নিয়ন্ত্রণ করে চলে।
ধীরে ধীরে বক্সটা খুলে,ভেতর থেকে বের করে আনে ডায়মন্ডের নুপুর।সাদা হীরেগুলো আলোয় ঝিকমিক করে ওঠে।
ভীর একটা নুপুর হাতে নেয়।নিচু হয়ে এসে ইশায়ার পায়ের দিকে হাত বাড়াতেই।ইশায়া নিজের পা সরিয়ে নেয়। মুহূর্তেই
ভীরের মুখের ভঙ্গি শক্ত হয়ে যায়।তার হাতের মুঠো শক্ত হয়ে ওঠে।চোয়াল কেঁপে ওঠে। ভীর কিছু না বলে জোরে ইশায়ার পা টেনে নেয় নিজের দিকে।

__আহহ!
হঠাৎ এমন করায় ব্যথায় চাপা স্বরে কেঁপে ওঠে ইশায়া।
ভীর থামে না।কোনো কথা না বলে,
নুপুরটা পরিয়ে দেয় তার পায়ে।অন্য পায়ে পড়ানোর সময়,ইশায়া আর কিছু বলে না।শুধু নিঃশব্দে সহ্য করে যায়।নুপুর পরানো শেষে ভীর ইশায়ার চোয়াল শক্ত করে চেপে ধরে।তার চোখদুটো ভয়ানক ঠান্ডা, আর কণ্ঠটা নিচু,
___আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নিও না।
ইশায়ার গালে তার আঙুলের চাপ আরও গভীর হয়।

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৮৩

___শান্ত আছি… থাকতে দাও।
তার চোখ সরাসরি ইশায়ার চোখে গেঁথে যায়
আমাকে রাগালে… সেটা তোমার জন্য ভালো হবে না, এটা মনে রেখো।
এর মাঝে দরজায় শব্দ হয়।

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৮৫