সে আমার বন্দিনী পর্ব ৮
তানিয়া হুসাইন
সেকেন্ডেরও কম সময়ে বিল্ডিংয়ের নিচে আছড়ে পড়ল নিথর শরীর।
চারপাশে ছিটকে পড়ল গাঢ় লাল রক্ত।
তার শরীরের কোনো নড়াচড়া নেই, কোনো শব্দ নেই।
শুধু শূন্যতা।
___কিছুক্ষণ আগে যে মেয়েটি তেজ নিয়ে কথা বলছিল,এতগুলো লোকের সাথে প্রাণ পণে লড়াই করছিল, বোনকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়বার সাহস যুগিয়েছিল,
—এখন সে নিথর, নিস্তব্ধ।
একটা জীবন্ত প্রাণ, এক মুহূর্তের মধ্যে নিভে গেল।
কান ফাটানো চিৎকারে চারপাশ কেঁপে উঠছে
___আপু!!!!! না!!!!!!!!”
ইশায়ার ভেতরের সব কিছু যেন একসাথে চিৎকার করছে।
তার পুরো শরীর কাঁপছে এই ভয়ে সাফার না কোন ক্ষতি হয়ে যায়, মাথার মধ্যে ঘূর্ণিঝড় চলছে,সে এক সেকেন্ডের জন্য ও স্থির থাকতে পারছে না।
_____ইশায়ার চিৎকার, আহাজারি, ছটফটানি এগুলো দেখে বিরক্ত ভীর।
সে মেজাজ হারাচ্ছে,
___ভীর বিরক্তি মুখে সাইনের কাগজটা ডিয়েগোর দিকে ছুড়ে মারে,
এই মেয়ের নাটক আমর আর সহ্য হচ্ছে না,
এটা নিয়ে রাখো।
___আর ওর মুখ বব্ধ করার ব্যবস্থা করো, না হয় আমি কিছু একটা করে ফেলব।
রেগে চিৎকার করে বলে ভীর।
___অন্য সময় হলে ডিয়েগো এই মেয়ের গালে পর পর থাপ্পর বসাত,
কিন্তু এই মেয়েকে নিয়ে ভীরের এতো মনোযোগ দেখে, ডিয়েগো কিছু করার সাহস পাচ্ছেনা।
তাই সে ভীরকে জিজ্ঞেস করে,
_ কি করবো বস।
____ঘুমের ইনজেকশন,
ভীরের ঠান্ডা গলা,সংক্ষিপ্ত উত্তর।
___ডিয়েগোর যা বোঝার বোঝা হয়ে গেছে,
ডিয়েগো মাথা ঝাঁকিয়ে প্রস্থান করে।
__এদিকে ইশায়ার থামার নাম নেই,
সে ছুটে যেতে চাইছে, কিন্তু গার্ডদের শক্ত বাঁধনের সাথে পেরে উঠছে না ছোট্ট নাজুক শরীরটা।
উল্টো সাদা ফকফকে শরীরে মোটা হাতের দাগ, আচড় পড়ছে।
____ইশায়া যখন আর শক্তিতে পেরে ওঠে না, একেবারে আটকে যায় তখন হাত-পা ছোঁড়াছুঁড়ি শুরু করে,
আপু আপু বলে চিৎকার করে যাচ্ছে অনবরত।
___তার লম্বা ঘন কালো চুল গুলো এলোমেলো হয়ে আছে, চোখ দিয়ে অনবরত পানি পড়ছে।
তাদের সুন্দর সাজানো হাসিখুশি জীবনটা কি থেকে কি হয়ে গেল।
___গার্ডরা ঠান্ডা,তাদের কোন অভিব্যক্তি নেই, ওরা শক্ত হাতে ইশায়াকে ধরে রেখেছিল, যেন কিছুই ঘটেনি।তারা যেন যন্ত্র মানব।
যেন তাদের মধ্যে কোন অনুভূতি নেই, ইশায়ার এত কষ্ট ওদের মন গলাতে পারছে না।
____এর মাঝে একজন গার্ড হন্তদন্ত হয়ে এই রুমে ঢুকে বলে।
বস ওই মেয়েটা লাফ দিয়েছে বারান্দা থেকে।
কেউ আটকাতে পারেনি।
___ভীরের মধ্যে কোন প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না,
কে মরলো কে বাঁচলো এতে তার কিছু যায় আসে না।
এরকম হাজারো মৃ*ত্যু হয় তার হাতে প্রত্যেকদিন।
____এই এক লাইন শুনেই ইশায়ার শরীর ঝাঁকুনি দিয়ে উঠলো।
তার চোখ বিস্ফারিত, মাথা ঘুরতে লাগল।
সে কি শুনেছে তার বিশ্বাস হচ্ছে না।
ইশায়া চিৎকার করে উঠে,
—না! না! কে,
কে!কে লাফ দিয়েছে?
আমার আপু লাফ দেয়নি!
ও কখনোই এমন করবে না!তোমরা মেরেছ! তোমরা মেরেছ ওকে তাইনা!
বলে ইশায়া আবারও ছুটে যাওয়ার চেষ্টা করে, কিন্তু এবার গার্ডরা আরও শক্ত করে তার হাত মুচড়ে ধরলো।
ঘাড় চেপে ধরে আছে আরেকজন মহিলা গার্ড।
কাঁধে যন্ত্রণার ঢেউ বয়ে গেল, কিন্তু সে সেটা টেরও পেল না।
সে শুধু ছটফট করছে, মুক্ত হতে চাইছে,
তার বুকের ভেতর দম আটকে আসছে, কাঁপা কাঁপা গলায় আবারও বলল,
____আমার আপুকে দাও!ওওও আল্লাহ, ওও আল্লাহ গো আমাকে যেতে দাও!আল্লাহ, আমার আপুকে ফেরত দাও!
ইশায়ার কণ্ঠ ফেটে যাচ্ছিল, শরীর কাঁপছিল তীব্র হাহাকারে,
ভেতরটা খালি হয়ে যাচ্ছিল তার।
তার চিৎকারে পুরো রুম যেনো কাঁপছে।
____কিন্তু কেউ পাত্তা দিল না।ইশায়ার এই আহাজারিতে।
ভীর একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিল।
তার চোখ ছিল বরাবরের মতোই ঠান্ডা, আবেগশূন্য।
ইশায়ার কান্না আর্তনাদ তার জন্য কেবল একটা বিরক্তির কারণ ছাড়া কিছুই না।
___কিন্তু বারবার চিৎকারে সে বিরক্ত হচ্ছে,
তার এত শব্দ পছন্দ না।
ভীর ধীর পায়ে এগিয়ে এলো ইশায়ার কাছে, এত চিৎকার তার বিরক্ত লাগছে,
রাগ উঠছে তার,
ভীর গম্ভীর কণ্ঠে বলে,
__Shut up.
তার কণ্ঠস্বরে যেন ছুরি মিশে ছিল, চারপাশের বাতাসও থমকে গেল মুহূর্তের জন্য।
__কিন্তু ইশায়ার কান্না থামল না।
সে আর্তনাদ করতে থাকে, অঝোরে কাঁদতে থাকে,
___ভীর এবার বিরক্ত হয়ে ওঠে ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না,
তার চোখ চকচক করে ওঠলো রাগে,
ভীর এক ঝটকায় ইশায়ার চুলের মুঠি চেপে ধরে,
___তীব্র ব্যথায় ইশায়ার মুখ থেকে এবার অস্ফুটে শব্দ বের হলো,
তার মাথাটা এক ধাক্কায় পেছনে চলে যায়, চোখ বন্ধ করে ফেলে ব্যাথায়।
ভীর চুল খামছে ধরে ইশায়ার মুখ ওঠায়,
___ব্যথায় ইশায়া নিশ্বাসও নিতে পারছে না।
ভীর ধীরে ধীরে মাথা নামিয়ে ফিসফিস করে বলল,
____I said, shut up.
তার গলায় ছিল নিখাদ হুমকি।
আমার কথা অমান্য করলে জান নিয়ে নিতেও, এক মুহূর্ত ভাববো না,
বুঝেছিস?
___এতক্ষণ ধরে চিৎকার করা ইশায়া এবার থেমে গেল, কিন্তু তার শরীর কাঁপছে,
একটা ঢোক গিলে সে কাঁপা কাঁপা হাতে ভীরের পা জড়িয়ে ধরে অসহায় কণ্ঠে মিনতি করল,
__প্লিজ, আমার আপুকে যেতে দিন প্লিজ!! আল্লাহর দোহাই লাগে!
আমরা আপনার কি ক্ষতি করেছি, কেন আমাদের সাথে এমন করছেন। আমাদেরকে যেতে দিন প্লিজ, আমার আপুকে ছেড়ে দিন।
আমার আপুর কি হয়েছে??
___ভীর নিচে তাকিয়ে তাকে দেখল, চোখে তার কোনো করুণা নেই।
তারপর সে পা ঝাড়া মেরে ইশায়াকে সরিয়ে দেয়,
___ইশায়ার ভারসাম্য হারিয়ে মাটিতে পড়ে যায়।
___কিন্তু ইশায়া তবুও উঠে বসে, ভীরের দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়,
মহিলা গার্ডরা ওকে টেনে ধরে পেছন থেকে,
কিন্তু ইশায়া তখনো অনবরত বলতে থাকে,
__প্লিজ,
আমার আপুকে বাঁচতে দাও।
____ইশায়ার এই আহাজারি ভীর আর সহ্য করতে পারছে না,
তার কিরকম একটা লাগছে,
অসহ্যকর হয়ে উঠেছে সবকিছু।
ইশায়ার উপর রাগ টা গিয়ে পরে ওই গার্ডের ওপর,
মুহূর্তের মাঝেই মেজাজ বিগড়ে যায় ভীর এর।
___ওই গার্ড যদি ইশায়ার সামনে এসে না বলতো, তাহলে হয়তো এই মেয়ে এরকম করতো না,
ভীরের ইশায়ার এই চিৎকার চেঁচামেচি কান্নাকাটি বিধ্বস্ত চেহারা এসব সহ্য হচ্ছে না,
সে চাচ্ছে তার মন চাইছে ইশায়াকে যখন সে প্রথম দেখেছিল তখন তার যেমন লেগেছিলো,
ঠিক ঐরকম অনুভূতিটা এসে চাচ্ছে।
যেটার কারনে সে ছটফট করছিলো।
____ভীর এবার তাকাল ওই গার্ডের দিকে,
যে সাফার মৃ*ত্যুর খবর নিয়ে কথা বলেছিল।
তার চোখ শীতল, নিঃসংবেদী।
__গার্ডটা তখনও নির্বিকার মুখে দাঁড়িয়ে।
ভীর ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে গেল, পকেট থেকে ছুরি বের করে বলে,
___You shouldn’t have spoken.
একটা নিঃশব্দ মুহূর্তের পর,
—এক ঝটকায় ছুরিটা গার্ডের গলায় বসিয়ে দেয়।
এক মুহূর্তের জন্য চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে পড়লো।
___তারপর গার্ডের গলা দিয়ে বিকট গড়গড় শব্দ বের হতে লাগে, রক্ত ঝরতে শুরু করে।
সে কাঁপতে কাঁপতে মাটিতে পড়ে যায়, রক্তে ভিজে যায় সবকিছু।
বাকি গার্ডরা আতঙ্কে একপা পেছনে সরে যায়।
ভীরের হঠাৎ এমন আচরণ দেখে।
___এর মাঝে নিকো প্রবেশ করে,
তার চোখে মুখে বিরক্তি, এতো বড় শিকার তার হাত থেকে বেরিয়ে গেছে, এটা ভেবেই তার রাগ উঠছে।
নিকো সামনে এগিয়ে এসে, বিরক্ত মুখে বলে,
__এত নাটক কিসের?
_ভীর এবার তার দিকে তাকায়,
ঠোঁটে বিদ্রুপের হাসি ফুটে ওঠে ।
___This is just the beginning.
____ঠিক তখনই, সাফার নিথর দেহ ওপরে নিয়ে আসা হলো।
ইশায়া যখন দেখে সাফাকে, তখন তার পুরো শরীর জুড়ে কাঁপুনি শুরু হয়।
সে ধপ করে মাটিতে বসে পড়ে, তার চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে এলো।
তার মুখ দিয়ে শুধু বের হলো—
“আপু!
__না!
আমার আপুর সাথে এটা হতে পারেনা।
এক সেকেন্ড পরই,
—ইশায়া উন্মাদের মতো চিৎকার করে উঠল।
___মাটিতে লুটিয়ে থাকা সাফার নিথর শরীর,
ইশায়া দৌড়ে গিয়ে ঝাপটে ধরে তাকে।
রক্তে ভেজা ফ্লোর, এক পাশে পড়ে থাকা গার্ডের লাশ।
আর এককোণে পড়ে থাকা ইশায়া—পাগলের মতো কাঁদছে।
__তার শরীর কাঁপছে, হাত-পা শক্ত হয়ে আসছে, মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে।
তার চোখ এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না, যে মানুষটাকে সে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসত, সেই মানুষটা এখন….!
___তার কণ্ঠ থেকে শুধু একটাই শব্দ বের হচ্ছে—
“আপু! আপু! প্লিজ উঠো… আমার সাথে কথা বলো… প্লিজ…
আমাকে এভাবে একা ফেলে যেও না, আমি কি করবো, আমি কিভাবে লড়াই করব আপু।
__কিন্তু সাফা আর কোনোদিন কথা বলবে না।
তার শরীর শক্ত হয়ে যাচ্ছে, ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।
ইশায়া কিছু না বুঝেই সাফার মুখটা হাতে চেপে ধরে, দুহাতে তাকে আগলে ধরে।
গালে কপালে পাগলের মতো হাতরাচ্ছে,
তার গলা ফেটে যাচ্ছে কান্নায়।
___আমি তোমাকে আমায় ছেড়ে কোথাও যেতে দিব না! শোনো না! ওঠো না! আল্লাহ, আমার আপুকে ফেরত দাও!!!
চারপাশে কেউ কোনো কথা বলছে না।
কেবল ইশায়ার কান্নার শব্দ।
ইশায়ার গলা ভেঙে এসেছে।
পিপাসায় তার জান যায় যায় অবস্থা তারপর সে অঝোরে চিৎকার করে যাচ্ছে কান্না করে চলেছে,থামার জো নেই।
ভীর ইশায়া থেকে চোখ সরিয়ে তার গার্ডদের বলে,
____ Get the plan ready,
we are leaving.
___তারপর নিকোর দিকে তাকিয়ে বলে,
আরেকটা বডির ব্যবস্থা করো,
তারপর দুটো বডি একটা দূরের জায়গায় নিয়ে পুড়িয়ে দাও,
লোকজন ভাববে এই মেয়ে দুটো কোন দুর্ঘটনায় বা এক্সিডেন্টে পুড়ে মারা গেছে।
তখন আর কেউ ওদের খুঁজবে না।
মরার কারণ যা কিছুই হোক না কেন ওরা যাতে সবাই বোঝে এই মেয়েগুলো মারা গেছে,শেষ।
___নিকো একপাশে দাঁড়িয়ে বিরক্ত মুখে বলে,
আরেকটা বডি এখন আমি কোথায় পাবো এই মেয়ের মতো।
___নিকোর বলতে দেরি হয়েছে,
ভীর তৎক্ষণাৎ তার একটা লেডি গার্ড কে শুট করে।
ইশায়া ভয়ে কান চেপে ধরে।
___বাকিরা জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়ায়,
কারণ তারা জানে যে মুখ থেকে আওয়াজ বের করবে সে শেষ।
____ভীরের নিখুঁত নিষ্ঠুর পরিকল্পনা শুনে আর তার নির্মম কাজ দেখে অন্তর আত্মা কেঁপে ওঠে ইশায়ার।
___নিকো বিরক্ত হয়ে বলে,
আর এই মেয়েটাকে কি করবে?
___ভীর মৃদু স্বরে বলে,
একে নিয়ে যাবো আমি।
এটা আমার কাছে থাকবে।
স্পষ্ট ভাষায় বলে ভীর।
____ওদের কথা শুনে ইশায়া আর চুপ থাকতে পারেনি।
আদরের বোনের এই পরিণতি সে কিছুতেই মানতে পারবেনা।
ভীরকে অনুরোধের স্বরে কাঁদতে কাঁদতে বলে,
___প্লিজ আমার আপুর সাথে এরকম করবেন না।
কি ক্ষতি করেছি আমরা,
দয়া করুন! আমার আপুকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিন প্লিজ।
___ভীর কোন কথা বলে না,
সে শুধু তাকিয়ে রইলো ইশায়ার দিকে।
ভীরের চোখ ধীরে ধীরে ঘোলাটে হয়ে উঠে,
সে জানেনা কি আছে এই মেয়ের মাঝে,
প্রথম দিন থেকেই অদ্ভুত কিছু একটা অনুভব করছে সে, যা তার সাথে আর কখনো হয় নি।
ভীরের চোখের দৃষ্টি হিমশীতল।
তারপর সে ঠাণ্ডা গলায় আদেশ দেয়,
_এই মেয়েকে নিয়ে যাও।
মহিলা গার্ডরা এগিয়ে এলো।
___ইশায়া তখনো সাফাকে আঁকড়ে ধরে আছে।
জোরে ধরে রেখেছে যাতে তাদের কেউ আলাদা না করতে পারে,
___তারা ইশায়ার হাত মুচড়ে ধরে, টেনে তুলল মাটি থেকে।
ইশায়া জোরে চেঁচিয়ে উঠল,
__না! না!আমাকে যেতে দাও!আমি আমার আপুর কাছে থাকবো!
__কিন্তু কেউ শোনেনি।
ওরা ওকে জোর করে নিয়ে যেতে চাইলো।
ইশায়ার হাত বাঁধা হয়, মুখ চেপে ধরে,
___ভীর তাকিয়ে ইশায়ার দিকে,
তার দৃষ্টি ইশায়াতে স্থির,
কিন্তু অন্য কারো সাহস নেই ইশায়ার দিকে চোখ তুলে তাকানোর।
___ইশায়া ছটফট করতে থাকে কিন্তু তার শরীরে একটুকুও শক্তি ছিল না।
___সে শুধু দেখছে, তার আপু এখনো নিথর হয়ে পড়ে আছে।
সাফার কাছে ছুটে যেতে চাইছে ইশায়া।
____তারপর ভীরের নির্দেশে একজন মহিলা গার্ড তার হাতে ইনজেকশন পুশ করে,
__ধীরে ধীরে তার শরীর অবশ হয়ে যেতে লাগল।
চোখের সামনে সব ঝাপসা হয়ে যায়।
___তারপর, অন্ধকার।
___ভীর ডিয়েগোর দিকে তাকিয়ে বলে,
সব কাজ হয়ে গেলে, নিশ্চিত হয়ে জানাবে।
___ডিয়েগো মাথা ঝাঁকাল।
একটা নিখুঁত ছক কষা হয়েছে।
একটা মেয়ের মৃতদেহ সহ সাফার দেহ পোড়ানো হবে,
___অজ্ঞাত মেয়েটার পুরো শরীর ঝল*সানো হবে আগুনে,
যাতে কে বোঝার উপায় না থাকে।
সাফার মুখটা একটু বোঝা যায় এমন ভাবে ওকে ও পোড়ানো হবে।
যেন সাফাকে চেনা যায়।
কারন সাফাকে চিনলে সবাই বুঝবে সাফার সাথের মেয়েটা ইশায়া।
কারণ দুই মেয়ে একসাথে নিখোঁজ হয়েছে।
সবাই যাতে বোঝে নিখোঁজ দুটি মেয়েই মারা গেছে।
ওদের কেসটা মৃত বলে ক্লোজ হয়ে যাবে।
___ইশায়া নামের মেয়েটা পৃথিবীর বুকে আজীবনের মতো মৃত হয়ে যাবে।
তার অস্তিত্ব মুছে যাবে এই দুনিয়া বুকে।
___সাফাকে চিনলে তার সাথে পুড়ে যাওয়া শরীর দেখলেই সবাই ধরে নেবে, এটা ইশায়া।।
এটাই ভীরের উদ্দেশ্য। সে এটাই চায়।
কেউ আর খুঁজবে না।
কেউ জানতে পারবে না, এই মেয়েগুলোর আসল পরিণতি কী হয়েছিল।
এভাবেই রাজভীরের তৈরি পৃথিবীতে সত্যকে মিথ্যা আর মিথ্যাকে সত্য বানানো হয়।
____ডিয়েগো আর গার্ডরা দ্রুত কাজ শুরু করল।
শরীর পোড়ানোর জন্য জায়গা ঠিক করে নিকো।
___প্রথমে মহিলা গার্ডটির শরীর পু*রানো হয়। এমন ভাবে পুরানো হয় যাতে বুঝা যায় না কে এই মেয়ে,
তারপর সাফার সাথেও একই কাজ করা হয়।
___এক মুহূর্তে সবকিছু পুড়ে ছাই হয়ে গেল।
এখন আর কোনো প্রমাণ নেই।
শুধু ভয়ঙ্কর স্মৃতি ছাড়া।
ওদিকে ইশায়ার পরিবার আর সাফার পরিবার পাগলের মতো তাদের খুঁজছে।
সারারাত কেটে গেছে, মেয়েদের কোনো খোঁজ নেই।
পুলিশ, সাংবাদিক, মন্ত্রী—সব জায়গায় তারা দৌড়াচ্ছে।
কিন্তু কিছুই পাওয়া যাচ্ছে না।
সাফার মা ফারজানা আহমেদ বারবার ফোন করছে, বারবার কাঁদছে।
“আমার মেয়ে কোথায়? কেউ বলো! কেউ কিছু বলো!
ইশায়ার বাবা আদনান রহমান পুলিশের কাছে বসে আছেন, মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে।
তারা বারবার একই উত্তর পাচ্ছে—
“আমরা খুঁজছি, একটু সময় দিন।”
কিন্তু সময় দেওয়ার মতো ধৈর্য কারও নেই।
___আদ্রিয়ান মাত্র বাড়ি ফিরেছে একটা কাজে,
এত কিছু করেও তারা কোন ক্লু পাচ্ছে না।
তার মাথার মধ্যে একটা বিশাল শূন্যতা।
একটা তীব্র অস্থিরতা।
তার চোখে একফোঁটাও ঘুম নেই।
সে শুধু তাকিয়ে আছে ফোনের স্ক্রিনে।
তার মনে হচ্ছে, সে কিছু করতে পারছে না, অথচ সব কিছু তার হাতের সামনে থেকে চলে যাচ্ছে।
আদ্রিয়ান কপালে হাত দিয়ে বসে পড়ে, চোখ বন্ধ করে,
আর কি করবে সে।
সব জায়গায় যাওয়া শেষ,
এতো কিছু করার পরেও ওদের কোন খোঁজ পায়নি।
আদ্রিয়ানের পরনে এখনো কালকের এনগেজমেন্টের সাফার পছন্দ করা পাজামা পাঞ্জাবি।
আদ্রিয়ান নিজেকেই প্রশ্ন করে,
আমি কি আমার ভালোবাসার মানুষকে চিরতরে হারিয়ে ফেললাম।
তোমার সাথে কি আমার সংসার করা হবে না সাফা।
আদ্রিয়ানের চোখ বেয়ে একফোঁটা পানি গড়িয়ে পরে।
___আর কখনো কি আমার বোনকে দেখতে পারবো না।
____ওদিকে, ভীরের বিশাল প্রাসাদের ভেতরে,
একটা মেয়ের নিথর দেহ বিছানায় পড়ে আছে।
তার হাত-পা শিথিল, মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই।
সে যেন একটা নিস্তেজ পুতুল হয়ে গেছে।
রাজভীর ধীর পায়ে এগিয়ে এলো, তার দিকে তাকাল।
তার ঠোঁটের কোণে একটুখানি নির্মম হাসি ফুটে ওঠে,
সে আমার বন্দিনী পর্ব ৭
___তারপর সে নিচু হয়ে ফিসফিস করে বলল,
এখন তুই মৃত পৃথিবীর বুকে,
রাত আরও গভীর হলো।
আর ইশায়ার জীবনের সব আলো সারাজীবন এর মতো চলে গেলো।
অন্ধকার গ্রাস করে নিলো তাকে পুরোপুরি।
