Home স্নিগ্ধবিষ স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৪১

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৪১

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৪১
সানজিদা আক্তার মুন্নী

আজ বারো তারিখ, বহুল প্রতীক্ষিত নির্বাচনের দিন। ঘড়ির কাঁটায় ঠিক দুপুর দুটো। চারদিকে ভোটকেন্দ্রে মানুষের উপচে পড়া ভিড় আর অবিরাম আনাগোনা চলছে। দীর্ঘ এতগুলো বছর পর সাধারণ মানুষ আজ স্বাধীনভাবে নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারছে। সবার চোখেমুখে এক অদ্ভুত তৃপ্তি, চারপাশের পরিবেশে যেন ঠিক একটা বিয়ের বাড়ির মতো উৎসবের আমেজ আর খুশি ছড়িয়ে আছে।
কিন্তু এই উৎসবমুখর পরিবেশের আড়ালে চলছে এক অন্যরকম অন্ধকার তৎপরতা। তৌসির আর তার দলবল এখন চূড়ান্ত দৌড়াদৌড়িতে ব্যস্ত। তাদের একটাই লক্ষ্য যেভাবেই হোক, তন্ময় চাচাকে এই নির্বাচনে জেতাতেই হবে। পরিস্থিতি পুরোপুরি অনুকূলে নয় বুঝতে পেরে তারা আগেই প্রিজাইডিং অফিসারকে কিনে রেখেছে, যেন ভোটের একটা বিশাল অংশ অনায়াসেই তাদের বাক্সে গিয়ে পড়ে। শুধু তাই নয়, পর্দার আড়াল থেকে খোদ নির্বাচন কমিশনারকেও রীতিমতো হুমকি দিয়ে রেখেছে তারা। তৌসিরদের হিসেব খুব পরিষ্কার সুষ্ঠু ভোটে জেতা হয়তো কোনোভাবেই সম্ভব নয়, তাই কারচুপি তাদের করতেই হবে।

বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে তাদের নিজস্ব লোকজন ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। যারা স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার স্বপ্ন নিয়ে এসেছে, তাদের ওপর ভেতরে ভেতরে জোর খাটানো হচ্ছে। বুথের কাছে গিয়ে রীতিমতো ভয় দেখিয়ে, বাধ্য করা হচ্ছে তন্ময় চাচার পক্ষে ভোট দিতে। এক কথায়, সাধারণ মানুষের ওপর জুলুম করে হলেও জয় ছিনিয়ে আনতে হবে আর তৌসিরের বেপরোয়া বাহিনী ঠিক সেই কাজটাই এখন অত্যন্ত সুচারুভাবে করে যাচ্ছে।
দুপুরের খাবার খাওয়ার জন্য বাড়িতে ফেরে তৌসির চারদিক জুড়ে নির্বাচনের আমেজ আর আমেজ। দুপুরের খাওয়া শেষে একটা জরুরি ফোন করার জন্য নিজের ঘরে আসে সে। সকাল থেকেই নাজহার দেখা পায়নি। মনে মনে ইচ্ছে ছিল, নিজের কৈতরী কে এক পলক দেখে ওর সাথে একটু খুনসুটি করবে। কিন্তু তা আর হয়ে ওঠে না নাজহা এখন ওয়াশরুমে গোসল করছে। অগত্যা তৌসির নিজের ফোনটা হাতে নিয়ে বেলকনিতে গিয়ে দাঁড়ায়। একটা নির্দিষ্ট নাম্বার ডায়াল করে ফোন কানে লাগায় সে।

​ওপাশ থেকে কল রিসিভ হতেই শোনা যায়, “বল।”
গলার স্বরটা ওয়াসেমের সম্পর্কে যে তৌসিরের বড় ভাই। হ্যাঁ ওয়াসেম তৌসিরের বড় ভাই বলে রাখি এখানে তাদের নিজেদের মধ্যে কথোপকথনের জন্য তারা পুরোপুরি তামিল ভাষা ব্যবহার করছে, যাতে কেউ আড়ি পাতলেও কিছু বুঝতে না পারে।​ওয়াসেমের গলা শুনে তৌসির তীক্ষ্ণ স্বরে বলে ওঠে, “নির্বাচন তো শেষের দিকে। শেষ হলেই আমার গুজরাটে যাওয়ার কথা। ওরা আমাকে বলেছে তোকে বের করে আনতে। এখন বল, কী করব?”
​কথাটা শুনে ওয়াসেম শব্দ করে হেসে ওঠে তাচ্ছিল্যের সুরে বলে, “আয় তাহলে, চা-নাস্তা করে যা।”
​এই কথায় রাগে ফুঁসে ওঠে তৌসির চাপা আক্রোশে নিয়ে ও বলে, “তোর সাথে এখানে সাউয়া বকতে ফোন দিইনি আমি! সোজা কথায় বল, কী করব? আসব? আসলে আমাদের সব ভাইদের একসাথে শামিল করতে হবে। তারপর একজোট হয়ে লড়তে হবে ওদের সাথে। একটা নিরেট প্ল্যান দরকার আমাদের। আমি ইন্ডিয়াতে পা রাখার সাথে সাথেই কিন্তু ওরা তাণ্ডব শুরু করে দেবে। তুই তো ভালো করেই জানিস, পুরো দেশের সিসিটিভির এক্সেস ওদের হাতে!”

​অন্য প্রান্তে ওয়াসেম মদের গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে নির্বিকার গলায় বলে, “আয়, যত দ্রুত সম্ভব আয়। খেলাটা এবার শেষ করি। তবে সাবধান! শিকদাররা যেন কোনোভাবেই ঘুণাক্ষরেও টের না পায় যে আমি তোকে চিনি, বা আমরা ভাইরা একে অপরের সাথে যোগাযোগ রাখছি। ওদের একেকজনকে কুপিয়ে ছিঁড়ে খাওয়ার জন্য আমি একাই যথেষ্ট। শুধু তোদের জন্য অপেক্ষা করছি বলে এখনো নিজেকে সামলে রেখেছি।”
​তৌসির এপাশ থেকে একটা তপ্ত দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলে, “ওরা কিচ্ছু জানবে না। ওদের খেলা আমি ওদের নিয়মেই খেলব। আর তুই যে বলছিস ওদের একাই মেরে ফেলবি, শোন এত ধাপ্পাবাজি করিস না। অতিরিক্ত উত্তেজিত হওয়ার কিছু নেই। ওদের কলিজা ছিঁড়ে খাওয়ার অধিকার আমাদের সবার, শুধু তোর একার নয়। বাবা-মা শুধু তোর একার ছিল না, আমাদের সবার ছিল।”

​কথাটা শুনে রাগে ফুঁসে গিয়ে ওয়াসেম কড়া গলায় জবাব দেয়, “রাখ তোর এসব কাহিনি! এতই যদি দরদ থাকে, তাহলে বাংলাদেশে পড়ে আছিস কেন? আয়, এসে নিজের হাতে মার ওদের!”
তৌসির তপ্ত শ্বাস ছেড়ে বলে , “বিয়ে করলাম, আর বউ-সংসার সামলাতে সামলাতেই সময় চলে গেল। এর মধ্যে আবার ঘাড়ের ওপর নির্বাচন! তুই তো বিয়ে করেছিস, জানিসই তো বউয়ের কত জ্বালা!”
ওপাশ থেকে ওয়াসেম হো হো করে হেসে ওঠে, “আমার কোনো জ্বালা নেই। আমি তো আমার বউকে বউ বলেই মানি না। ওকে উঠতে বললে ওঠে, বসতে বললে বসে। আমার বউ আমার হাতের খেলনা মাত্র।”
তৌসিরে ভ্রু কুঁচকে আসে ও গম্ভীর গলায় বলে, “কিন্তু আমার বউ আমার প্রাণ! ওর খুশির জন্য আমি সব করতে পারি। তোকেও বলি, নিজের স্ত্রীকে একটু সম্মান দে। এভাবে অবহেলা করিস না, পরে হারিয়ে ফেলবি। তোর মা, মানে সিতুজা আন্টিও সেদিন বলছিলেন, তুই নাকি মেয়েটাকে বড্ড অবহেলা করিস! দেখ, আমাদের সবারই অতীত আছে, কিন্তু সেই ট্রমার জের ধরে বর্তমানটা নষ্ট করিস না…..

ব্যাস কথা শেষ হওয়ার আগেই ওপাশ থেকে লাইন কেটে দেয় ওয়াসেম।তৌসির বিরক্তি নিয়ে ফোনটা কান থেকে নামিয়ে রুমে যাওয়ার জন্য ঘুরে দাঁড়াতেই থমকে যায়। দরজার কাছে শান্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে নাজহা! তৌসির এতক্ষণ তামিল ভাষায় কথা বলছিল। নাজহা তামিল বোঝে না ঠিকই, কিন্তু তৌসিরের হাবভাব দেখে সে আজ একটা বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে যায় এই বাড়িতে যার আসল পরিচয় খুঁজতে তাকে পাঠানো হয়েছে, সে আর কেউ নয়, সে তৌসিরই! যদিও পুরোপুরি সুনিশ্চিত সে এখনও হতে পারে না। এদিকে তৌসিরের নিজের ওপরই ভীষণ রাগ হতে থাকে। কোন দুঃখে সে এখানে দাঁড়িয়ে তামিল ভাষায় কথা বলতে গেল! নাজহার এসব শোনা মানেই গলায় নতুন একটা উটকো ঝামেলা ঝুলিয়ে নেওয়া। তৌসির ধীরপায়ে নাজহার সামনে এসে দাঁড়ায়। নাজহা মুখ তুলে তৌসিরের চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে সরাসরি প্রশ্ন করে, “আপনি তামিল ভাষায় কার সঙ্গে, কী কথা বলছিলেন?”
প্রশ্নটা শুনেই তৌসিরের চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। রাগটা চেপে রেখে এক পলক নাজহার দিকে তাকিয়ে কটাক্ষের সুরে বলে, “ক্যান? এটা জাইনা তুমি কী করবা? বাপ-চাচার কাছে খবর পৌঁছাবা?”

নাজহার দৃষ্টি একটুকুও সরে না ও শান্ত গলায় জবাব দেয়, “পৌঁছাব কি পৌঁছাব না, সেটা আপনি ভালো করেই জানেন। আমি যখন মেনেই নিয়েছি, তখন আপনার সাথে এসব করতে যাব কেন?” একটু থেমে আচমকা নাজহা আসল কথাটা বলে বসে, “তৌসির, আপনি এই পরিবারের আপন সন্তান নন, তাই না?”
প্রশ্নটা তৌসিরের বুকে তীরের মতো বিঁধে যায়। রাগটা মাত্রা ছাড়িয়ে যায় এবার। ও নিজের রাগ কে সামলিয়ে নাজহার পাশ কাটিয়ে যেতে যেতে বিরক্তি নিয়ে বলে, “আমি এইসব সাউয়া জাতি কথাবার্তা আমি বলতে আগ্রহী না। আশা করি তুমি একই কথা দ্বিতীয়বার রিপিট মারইবা না।”
নাজহাও আর ভনিতা করে না। তৌসির যখন বলতে চাইছে না, তখন জোর করার মতো অবস্থান তার এখনও তৈরি হয়নি। সময় হলে নাহয় জোর খাটানো যাবে। তাই সে পেছন থেকেই বলে ওঠে, “ঠিক আছে, আমি এই প্রসঙ্গে কথা বলব না। আমি হয়তো নিজের অবস্থান থেকে একটু বেশিই অধিকার খাটিয়ে ফেলেছিলাম। আমার এই বোকামির জন্য আমি দুঃখিত।”

তৌসিরের বুকে ছুরি চালানোর জন্য এই কথাগুলোই যথেষ্ট। নাজহা এমনভাবে কথাগুলো বলল, কথার লেশ দিয়েই বুঝিয়ে দিল তৌসিরের ওপর তার কোনো অধিকারই নেই! একেক সময় এমন সব কথা বলে যা সরাসরি না হলেও ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে কলিজা ছিন্ন করে দেয়। তৌসির থমকে দাঁড়ায়। পেছন ফিরে এক ভ্রু উঁচু করে তাকায় নাজহার দিকে, “সবসময় কি কথা এমন জায়গা মতো দাগ কেটে বলতে হয় তোর? আমি একটা বিষয়ে কথা বলতে মানা করেছি বলে তুই সোজা হিসাব মিলিয়ে নিলি যে আমার ওপর তোর অধিকার নেই?”
নাজহা তিক্ত হাসে, “বাদ দিন। আমি এমনিই হয়তো একটু বেশি বুঝে ফেলেছিলাম। তা, নির্বাচনের খবর কী? ভোট কেমন পড়ছে?”
​তৌসির দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, “এই তো, ভালোই।”
​”আর আমার বড় চাচার খবর কী? উনার বক্সে কেমন পড়ছে?” নাজহার বড় চাচাও তন্ময় চাচার প্রতিনিধি হয়ে এই নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন।
​তৌসির কাঠখোট্টা গলায় জবাব দেয়, “খেয়াল করি নাই। আমরা আমাদেরটা নিয়েই ব্যস্ত। পাশ করমু কি না, এই টেনশনেই বাঁচি না!”
​নাজহা টিটকিরি মেরে হেসে ওঠে, “টেনশনের কী আছে? জিতবেন তো আপনারাই। না জিতলে চুরি-ডাকাতি, কারচুপি করে এগিয়ে যাবেন, সমস্যা কোথায়? এসব নিয়েও টেনশন করেন, বাহ!”

অপমানটা গায়ে লাগে তৌসিরের। ধমকে ওঠে সে, “তোমার এই একহাত সাউয় মার্কা থুতনি সামলাও! নয়তো কবে যে ছিঁইড়া রইদে শুকাতে দিয়া দিমু, টেরও পাবা না।”
তৌসির বাজেভাবে কথা বলছে দেখে নাজহাও দমে যাওয়ার পাত্রী নয়। একরাশ ক্ষোভ উগরে দিয়ে সে বলে, “চোরের দল, বেইজ্জতের দল, বেহায়ার দল, চাঁদাবাজের দল! এত বদনাম ঘাড়ে নিয়ে এত বড় বড় কথা মুখ দিয়ে বের করেন কীভাবে? কষ্ট হয় না?”
তৌসিরও কম যায় না। সে এক পা এক পা করে এগিয়ে আসে। একদম নাজহার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলে, “আমরা চাঁদাবাজ হলে তোর বাপ-চাচারা হলো হাদিয়াবাজ। বুঝলি লো ছিনাল?”
রাগে গা জ্বলে যায় নাজহার। তৌসিরকে দূরে সরানোর জন্য ওর দুই কাঁধে ধাক্কা দিয়ে বলে, “টেন্ডারবাজের দল, বেইজ্জত কোথাকার! সরুন বলছি, ছোঁবেন না আমায়!”
তৌসির সরে না গিয়ে বরং নিজের দুই হাত নাজহার কোমরের দুই পাশে শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরে। হাসতে হাসতে বলে, “রাগ করলেই কি এই একটা বুলি ছাড়া মুখ দিয়ে আর কিছু বের হয় না তোর? দু-একটা গালি দে, আর কিছু পারিস আর না পারিস, শুধু ‘ছোঁবেন না আমায়, ছোঁবেন না’ বলে বকিস!”
নাজহা মুখটা অন্যদিকে ফিরিয়ে নিয়ে বলে, “হয়েছে, ছাড়ুন এবার। ছোট চাচা ডেকে গেছেন। আপনি ফোনে ছিলেন তখন। যান নিচে।”
তৌসিরের গলায় এবার দুষ্টুমি, “কৈতরী, একটা চুমু খাই? তারপর যাই?”

“না, খেতে হবে না।”
“একটা মাত্র খামু, খালি একটা!”
নাজহা হাল ছেড়ে দিয়ে অস্ফুট স্বরে বলে, “আচ্ছা।”
সম্মতির সুতোটুকু হাতে পেয়েই তৌসির আরও কিছুটা বেপরোয়া হয়ে ওঠে। নাজহার নরম গালে নিজের মুখ গুঁজে দিয়ে সশব্দে এক দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে সে। তৌসিরের শরীরের সেই নিবিড়, তীব্র উষ্ণতায় নাজহার ভেতরটা কেঁপে ওঠে। অবচেতনভাবেই সে তৌসিরের চওড়া কাঁধে হাত রাখে, আঙুলের শক্ত মুঠোয় খামচে ধরে শার্টের কিছুটা অংশ। তারপর খুব নিচু স্বরে, প্রায় ফিসফিস করে বলে, “তৌসির, আর না। এবার সরুন। নিচ থেকে আপনাকে ডাকছে, যান।”
তৌসির আলতো হাতে নাজহার অবিন্যস্ত চুলগুলো ছুঁয়ে দেয়। স্নিগ্ধ, ভারী গলায় বলে, “গেলাম। ফিরতে ফিরতে রাত হবে।”

“আচ্ছা,” ছোট্ট এক শব্দের উত্তরে সম্মতি জানায় নাজহা।
তৌসির ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরপরই নীরবতা ভেঙে বেজে ওঠে নাজহার ফোন। স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে নওমির নাম। কলটা ধরার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে তার নেই, তবুও একরাশ বিরক্তি চেপে ভারী পায়ে এগিয়ে যায়। বিছানা থেকে ফোনটা তুলে কানে ধরতেই ওপাশ থেকে নওমির গম্ভীর, থমথমে স্বর ভেসে আসে, “কেমন আছিস?”
নাজহা ঠোঁটের কোণে এক চিলতে প্রাণবন্ত হাসি টেনে আনে। বেশ উচ্ছ্বসিত, সাবলীল গলায় বলে, “জি, আলহামদুলিল্লাহ, ভীষণ ভালো আছি। তোমরা কেমন আছো?”
ওপাশে নওমি রীতিমতো হতবাক। আগে ফোন করলেই নাজহা কান্নাকাটি জুড়ে দিত, নয়তো অভিমানী গলায় হাজারটা অনুযোগ করত। কিন্তু আজ তার কণ্ঠে এ কেমন সুর! নওমি নিজেকে সামলে নিয়ে তীক্ষ্ণ, হিসেবি গলায় জানতে চান, “কোনো আপডেট পেলি? তামিল থেকে কে এসেছে, জানতে পেরেছিস? সময় কিন্তু খুব কম। যদি না পারিস, ওরা কী করবে তা তো জানিসই!”

নাজহা মুহূর্তকাল একেবারে নিশ্চুপ থাকে। তারপর ধীর, অথচ অনড় গলায় বলে, “না, আমি জানতে পারিনি। আর হয়তো পারবও না। এসব আর আমার দ্বারা সম্ভব নয়।”
কথাটা শুনে নওমি যেন রাগে ফেটে পড়েন। কর্কশ গলায় হিসহিস করে ওঠেন, “ডানা গজিয়েছে তোমার? সেই ডানা ছেঁটে তোমার হাতে ধরিয়ে দেব। তুমি সংসারে মন দিচ্ছ? মনে রেখো, ওর সাথে কখনোই তোমার কোনো সংসার হবে না। আমি হতে দেব না!”

নাজহার চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। দাঁতে দাঁত চেপে সে স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করে, “যা করার করে নাও। আমি যখন বলেছি তৌসিরের সংসার করব, তার মানে আমি করব। সোজা কথা, এর মধ্যে কোনো প্যাঁচ নেই। আমি সংসার করব, এটাই আমার শেষ সিদ্ধান্ত। যা পারো, করে নাও।” কথাগুলো ছুঁড়ে দিয়েই খট করে লাইনটা কেটে দেয় সে।
অথচ তৌসির আসলে নিচতলায় যায়ইনি। দরজা পেরোনোর সময়ই ফোনের রিংটোন শুনে সে দরজার আড়ালে থমকে দাঁড়িয়েছিল। তার বুকে একটা চাপা, শীতল ভয় ছিল নাজহা হয়তো তামিলনাড়ুর সেই গোপন কথাটা আজ ফাঁস করে দেবে। কিন্তু না, নাজহা কিচ্ছু বলেনি! নাজহা সত্যিই নিজেকে বদলে ফেলেছে। সে মন থেকে তৌসিরের সাথে এই জীবনটা কাটাতে চায়, এই সংসারটা আপন করে নিতে চায়। দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে তৌসিরের ভেতরটা এক অদ্ভুত, অচেনা আনন্দে প্লাবিত হয়। এই প্রাপ্তির গভীরতা এমন যে, নিজে আস্বাদন না করলে কেউ তা উপলব্ধি করতে পারবে না। তৌসির আজ খুশিতে যেন আত্মহারা, দিশেহারা।

তৌসিরের ফোন কেটে দিয়ে এক মহা অশান্তি তে ভুগছে ওয়াসেম তৌসিরের বলা শেষ কথাগুলো বিষাক্ত তীরের মতো বিঁধে আছে ওয়াসেমের মগজে “এত অবহেলা করিস না, পরে হারিয়ে ফেলবি।” কথাটা বাতাসের ঝাপটার মতো বারবার ফিরে আসছে আর ওয়াসেমকে কেমন অপরাধবোধে বিদ্ধ করছে। অবহেলা করার অনুশোচনা কি সে সত্যিই অনুভব করছে? নাকি তৃষ্ণা কে হারানোর ভয়টা এখন তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গেছে? কে জানে।
ওয়াসেম কারখানায় দাঁড়িয়ে আছে তার কারখানায় তপ্ত পরিবেশে আজ বড় এক অস্ত্রের চালানের প্রস্তুতি চলছে। গুজরাট থেকে করাচি যাবে এই মরণাস্ত্রের স্তূপ। ওয়াসেম নিজেই কাজগুলো তদারকি করছিল, কিন্তু আজ তার সেই চিরচেনা মনোযোগ কোথায় একটা হারিয়ে গেছে। অবচেতন মন বারবার ছুটে যাচ্ছে বাড়ির দিকে তৃষ্ণার কাছে। মনের এক কোণে জেদ আর অন্য কোণে তৃষ্ণার ওই মায়ামাখা মুখটার প্রতি এক আলাদা টান। ওয়াসেম বুঝতে পারছে কি করবে সে? কি হয়ে গেল তার এই হঠাৎ? সে আর থাকতে পারল না। তার নিজের যাওয়ার কথা ছিল বর্ডার অবধি, কিন্তু অর্ডারটা রেডি করে নিকের কাঁধে দায়িত্ব সঁপে দিয়ে সে একরকম পালিয়েই চলে এল বাড়িতে। স্রেফ একটা বার তৃষ্ণাকে নিজের চোখের সামনে দেখার তৃষ্ণায়।

বাড়িতে এসে ঘরে প্রবেশ করে কিন্তু তৃষ্ণার দেখা পায় না। তৃষ্ণা তো সচরাচর রান্নাঘরের দেয়ালের আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে রাখতেই অভ্যস্ত। ওয়াসেম ঘরে থাকলে তো কথাই নেই, সে সময় তে ও এক অদৃশ্য ছায়া হয়ে যায়। ওয়াসেমের প্রয়োজনীয় সব গুছিয়ে দিয়ে তৃষ্ণা উধাও হয়ে যায় নিঃশব্দে। ঘামে শরীরটা চটচট করছে, সাথে মগজের ভেতর তৌসিরের কথার সেই অস্বস্তিকর গরম। লুঙ্গি আর তোয়ালে নিয়ে বাথরুমে ঢুকে ঠান্ডা পানির নিচে দাঁড়ায় ওয়াসেম। শরীরের ক্লান্তি ধুয়ে গেলেও মনের অস্থিরতা কোনোমতেই শান্ত হতে চাইছে না। যতক্ষণ না ওই মুখটা দেখছে, ততক্ষণ এই জ্বালা মিটবে না। গোসল সেরে ভেজা চুলে ঘরে ঢুকতেই ওয়াসেমের চোখে পড়ে এক অভাবনীয় দৃশ্য। তৃষ্ণা সোফায় বসে আছে। সচরাচর যা হওয়ার কথা ছিল না, আজ তাই হয়েছে তৃষ্ণা তাকে ঘরে রেখেও সোফায় বসে আছে মানে এখনো সে ওয়াসেমের উপস্থিতি টের পায়নি।

ওয়াসেম এক নজর তাকায় তার দিকে। তৃষ্ণার চোখদুটো কেমন ঘোলাটে, ভেজা ভেজা লাগছে। ঠোঁট দুটো শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে, তৃষ্ণার চেহারায় এক চরম ফ্যাকাশে ভাব দেখা যাচ্ছে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে ওয়াসেমের সে কোনো এক ঝড়ের কবলে পড়া ক্লান্ত পাখি।তৃষ্ণা ঠিকমতো সোজা হয়ে বসে থাকার শক্তিটুকুও পাচ্ছিল না। শরীরের ভেতরটা আগুনের চুল্লি হয়ে গেছে, জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে। সেই সাথে অসহ্য বমিভাব আর পেটের ভেতর এক অদ্ভুত মোচড়ানি। মাথাটা ঝিমঝিম করছে, চোখের সামনে সব তার ঝাপসা হয়ে আসছে। কিন্তু ওয়াসেমের উপস্থিতি টের পেতেই সে তার সবটুকু জড়তা আর অসুস্থতাকে একপাশে ঠেলে দিয়ে এক লাফে উঠে দাঁড়ায়। শরীর টলমল করলেও সে নিজেকে সামলে নেয়। অপরাধবোধ মেশানো কণ্ঠে থমকে থমকে জিজ্ঞেস করে,”আ… আমি দেখিনি আপনি এসেছেন। আ-ভাত নিয়ে আসব?”

ওয়াসেম কোনো জবাব দেয় না, শুধু তার ওই ক্লান্ত আর অসুস্থ মুখটার দিকে অপলক তাকিয়ে থেকে ভেজা চুল মুছতে মুছতে ধীর পায়ে তৃষ্ণার দিকে এগিয়ে আসে ওয়াসেম। আড়চোখে তাকে তীক্ষ্ণভাবে পরখ করে আচমকা প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়, “ভাত তো খাব, কিন্তু আগে বল, তুই কি অসুস্থ?”
​ওয়াসেমের মুখে এমন উদ্বেগ দেখে তৃষ্ণা আকাশ থেকে পড়ে! ওয়াসেম তার সুস্থতা নিয়ে ভাবছে এও কি সম্ভব? বিস্ময় লুকিয়ে মাথা নিচু করে সে আমতা আমতা করে জবাব দেয়, “না একটু মাথা ধরেছিল। আচ্ছা, আমি ভাত নিয়ে আসছি।”

কথাটুকু শেষ করেই দরজার দিকে পা বাড়ায় তৃষ্ণা। কিন্তু শরীরটা আজ তার বশে নেই। জ্বরের ঘোরে একটা জরাজীর্ণ টুলের মতো থরথর করে কাঁপছে তার অবয়ব। মাথাটা পাথরের মতো ভারী হয়ে গেছে। শুধু মনের জোরে, অবচেতন মস্তিষ্কের তাগিদে সে পা ফেলছে। চারপাশের পৃথিবীটা ক্রমশ ঘোলাটে হয়ে আসছে, চোখের সামনে গাঢ় অন্ধকারের পর্দা নেমে আসছে। শরীর আর এক কদম ফেলারও অনুমতি দিচ্ছে না তাকে। হঠাৎ ভারসাম্য হারিয়ে সশব্দে দরজার চৌকাঠের কাছে লুটিয়ে পড়ে তৃষ্ণা।

চোখের সামনে দৃশ্যটা দেখে ওয়াসেমের বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে ওঠে। হন্তদন্ত হয়ে সে ছুটে যায় তৃষ্ণার দিকে। মেঝেতে পড়ে থাকা তৃষ্ণা এখনো প্রাণপণ চেষ্টা করছে দুই হাতে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়াতে। কিন্তু দুর্বল শরীরটা বারবার হার মানছে। ওয়াসেম দ্রুত পাশে হাঁটু গেড়ে বসে তাকে টেনে তুলে বসায়। তৃষ্ণার চোখ-মুখে তখন রাজ্যের আতঙ্ক। তার একটাই ভয় এমন অদ্ভুত আচরণের জন্য, পড়ে যাওয়ার অপরাধে ওয়াসেম হয়তো এখনই তাকে প্রচণ্ড মারবে। ভয়ে তার চোখ বুজে আসতে চায়, শরীর গুটিয়ে যায়। ওয়াসেম অস্থির হয়ে তৃষ্ণার গালে মৃদু চাপড় দিতে দিতে বলে, “এই! কী হয়েছে তোর? কথা বল, কী হয়েছে?”
কথা বলতে বলতেই তৃষ্ণার কপাল আর গলায় হাত ছুঁইয়ে দেয় ওয়াসেম। আর পরক্ষণেই ছ্যাঁকা খেয়ে হাত সরিয়ে নেয়। জ্বরে গা একেবারে পুড়ে যাচ্ছে তৃষ্ণার! অথচ তৃষ্ণা তা বলল কি না, শুধু তার মাথা ধরেছে! ওয়াসেম তৃষ্ণার গলায় এক হাত আর গালে আরেক হাত রেখে ব্যাকুল কণ্ঠে বলে ওঠে, “পাগল, জানোয়ার, বেহায়া একটা! শালি জানোয়ার তুই তো বললি তোর শুধু মাথা ঘোরাচ্ছে। কিন্তু তোর শরীর তো জ্বরে খা খা করছে! আমাকে আগে বলিসনি কেন?”

তৃষ্ণা এখন ঘোরের মাঝে। জ্বরের ঘোরে তার কণ্ঠস্বর শোনায় একদম নিস্তেজ, কিন্তু তাতে লুকিয়ে থাকে পাহাড়সম অভিমান আর ক্ষোভ, “আপনি তো চানই আমি মরে যাই। তাহলে আপনাকে বলে কী করব? আমি মরে গেলে তো আপনি এতে আরও খুশিই হতেন।”
কথাটা শেষ করে সে আর কিছু বলতে যায়, কিন্তু তার আগেই এক অকল্পনীয় ঘটনা ঘটে যায়। পেটের ভেতরের সবটুকু উথলে উঠে আসে। কোনো নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই ওয়াসেমের বুকের ওপর এক গাল বমি করে দেয় তৃষ্ণা। একনাগাড়ে পিচ্ছিল, দুর্গন্ধযুক্ত বমিতে ওয়াসেমের শার্ট পুরোপুরি ভিজে একাকার হয়ে যায়। হাঁপিয়ে ওঠে তৃষ্ণা। বমি করার পর তার প্রথম অনুভূতি ক্লান্তি নয়, বরং এক ভয়াবহ আতঙ্ক। ভয়ে সে একেবারে কুঁকড়ে যায়। এই ভুলের জন্য ওয়াসেম আজ তাকে মেরেই ফেলবে! থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে ভাঙা গলায় তৃষ্ণা উচ্চারণ করে, “আ… আ… আমি ইচ্ছে করে করিনি। আমাকে মাফ করে দিন… আমাকে মারবেন না… আমি সত্যিই ইচ্ছে করে করিনি।”

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, ওয়াসেমের ভেতর কোনো ক্রোধ জন্মায় না। বমির দুর্গন্ধে তার গা ঘিনঘিন করার কথা, কিন্তু সে বিন্দুমাত্র বিরক্তি অনুভব করে না। বরং, আলতো হাতে তৃষ্ণার দুই বাহু ধরে রাখে সে। তৃষ্ণার এই কুকড়ে যাওয়া, ভয় পাওয়া রূপটা দেখে ওয়াসেমের বুকের ভেতরটা যন্ত্রণায় তিরতির করে কাঁপতে থাকে। মনে হচ্ছে, কেউ মনে হয় তার কলিজাটা খুবলে নিচ্ছে। সে অত্যন্ত মোলায়েম স্বরে তৃষ্ণাকে শান্ত করার চেষ্টা করে, “এভাবে বলিস না। আমি মারব না তোকে। কী হয়েছে তোর? এভাবে বমি করছিস কেন? কী হলো তোর, তৃষ্ণা… বল না আমাকে!”
তৃষ্ণা তখন আর নিজের হুঁশে নেই। শারীরিক কষ্ট আর জমিয়ে রাখা মানসিক যন্ত্রণায় সে প্রায় বেহুঁশ অবস্থার দ্বারপ্রান্তে। দু’চোখ বেয়ে অঝোরে জল নামতে থাকে তার। কান্নায় ভেঙে পড়ে সে বলে ওঠে, “দেখুন না, এত অসুস্থ হলাম, তাও তো মরছি না! আমি মরব না? আচ্ছা, আমার কি মৃত্যু হবে না? আমি কি মারা যাব না? আমি কি এতটাই খারাপ যে আমার রবও আমাকে ঘৃণা করেন, তাই নিজের কাছে টেনে নিচ্ছেন না? আপনার কাছে তো পিস্তল আছে ওয়াসেম, আমাকে মেরে ফেলুন না ওটা দিয়ে! আমি আর এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে বাঁচতে চাই না। যে পৃথিবীতে আমার কেউ নেই, সেখানে আমি কী করব? আর কত অবহেলা, কত অবজ্ঞা সহ্য করব? আর কত হলে নিস্তার পাব বলুন না আমায়? বলুন, আমি জানতে চাই…

কথাগুলো বলতে বলতে হু হু করে কেঁদে ওঠে তৃষ্ণা। একপ্রকার সম্পূর্ণ বেহুঁশ হয়ে যায় সে। তার এই হৃদয়বিদারক আক্ষেপ শুনে ওয়াসেমের বুকটা বড্ড বেশি কাঁপতে থাকে। সবকিছু এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে ওয়াসেমের। একটা মানুষ কতটা যন্ত্রণায় দগ্ধ হলে এত তীব্র আফসোসের সাথে নিজের মৃত্যু কামনা করতে পারে! ওয়াসেম বুঝতে পারে, এই করুণ পরিণতির জন্য সে নিজেই দায়ী। দিনের পর দিন তার করা নিষ্ঠুর আচরণের পর তৃষ্ণার এমন কথা একেবারেই বেমানান নয়।চরম ঘোরের মধ্যে থাকা তৃষ্ণাকে আলতো করে মেঝেতে শুইয়ে দেয় ওয়াসেম। দ্রুত নিজের গায়ের বমিমাখা শার্টটা খুলে একপাশে সরিয়ে রাখে। কিন্তু শার্ট রেখে আবার যখন সে তৃষ্ণার দিকে ঘোরে, আতঙ্কে ওয়াসেমের চোখের মণি স্থির হয়ে যায়। তৃষ্ণার ফ্যাকাশে নাক আর মুখ দিয়ে অনবরত লাল রক্ত গড়াচ্ছে। মেয়েটা একেবারে নিস্তেজ হয়ে পড়েছে। আর তার সেই নিষ্প্রাণ প্রায় ঠোঁট জোড়া কেবল ঘোরের ঘোরে বিড়বিড় করে একটাই কথা আউড়ে চলেছে,”মৃত্যু এসেছে মৃত্যু, এসেছে অবশেষে, সে এসেছে। আমার ডাক পড়েছে। আমি মুক্তি পেতে চললাম। মৃত্যু এসেছে মৃত্যু এসেছে!
চোখের সামনের দৃশ্যটা ওয়াসেমের মগজকে যেন মুহূর্তেই অসাড় করে দেয়। এসব কী হচ্ছে! তৃষ্ণার ফ্যাকাশে নাক-মুখ বেয়ে ওভাবে অবিরাম লাল রক্ত কেন ঝরছে? এত রক্ত… এত তরতাজা রক্ত একটা মানুষের শরীরে থাকে কী করে?

​ওয়াসেমের বুকের খাঁচাটা মনে হয় তীব্র এক যন্ত্রণায় চুরমার হয়ে যাচ্ছে। অনুভূতিটা এমন, যে কেউ নিপুণ হাতে প্রথমে তার হৃৎপিণ্ডটায় পরম মমতায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে, আর পরক্ষণেই তীক্ষ্ণ নখ বসিয়ে পুরো কলিজাটা শরীর থেকে ছিঁড়েখুঁড়ে টেনে বের করে আনছে। হতবিহ্বল ওয়াসেম কাঁপতে থাকা দুই হাতে তৃষ্ণার নিস্তেজ হয়ে আসা বাহু দুটো জড়িয়ে ধরে। ​তৃষ্ণার শরীরটা প্রবল কাশির দমকে কেঁপে কেঁপে ওঠে। প্রতিবার কাশির সাথে ওর মুখ থেকে গলগল করে বেরিয়ে আসে তাজা রক্তের দলা, ভাসিয়ে দেয় ওয়াসেমের হাত। যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে সে ঘোলাটে, মৃতপ্রায় চোখ দুটো তুলে তাকায় ওয়াসেমের দিকে। এই মুমূর্ষু অবস্থাতেও অতিকষ্টে, কাঁপা কাঁপা রক্তমাখা ঠোঁটে সে বলে ওঠে, “আপনি তো আমার মৃত্যুই চাইতেন, তাই না? এবার আপনি খুশি তো? এই দেখুন… আমি মরে যাচ্ছি। আমার মৃত্যু এসে গেছে।”

​কথাগুলো বলে সে আবারো কাশতে থাকে। কাশির ফাঁকেই হাঁপাতে হাঁপাতে, অসীম এক ক্লান্ত গলায় বলে, “এই নিষ্ঠুর পৃথিবী আমায় শুধু অবহেলা আর অবজ্ঞাই দিয়েছে। তাই আজ এক আকাশ অভিমান আর এক বুক অভিযোগ নিয়েই আমাকে বিদায় নিতে হচ্ছে।”
​কথাটা শেষ হতেই তৃষ্ণার চোখের পাতাগুলো ধীরে ধীরে বোঁজা হয়ে আসে। পৃথিবীর সমস্ত কোলাহল ছাপিয়ে সে চিরতরে মৃত্যুর শীতল, শান্ত কোলে ঢলে পড়ে।

​কিছু বলার, এমনকি কিছু বোঝার আগেই ওয়াসেমের চারপাশের পৃথিবীটা যেন এক নিমিষে তছনছ হয়ে যায়। সে ঠিক পাথরের মূর্তির মতো স্থির হয়ে বসে থাকে। মুখ দিয়ে টুঁ শব্দটুকুও বেরোয় না তার; বলার মতো কোনো ভাষা, কোনো শব্দই আজ আর অবশিষ্ট নেই। সেই ছোটবেলায় অত্যন্ত নৃশংসভাবে নিজের পুরো পরিবারকে হারিয়েছে সে। সেই ভয়াবহ শোক, সেই রক্তপাত তাকে তিলে তিলে একরকম পশুর মতোই অনুভূতিহীন আর নিষ্ঠুর করে তুলেছে। আর আজ… আজ তার চোখের সামনেই হারিয়ে যাচ্ছে তৃষ্ণা! তৃষ্ণাকে সে ভালোবাসে না, একটুও না। তবুও আজ কেন তার বুকের ভেতরটা এমন খাঁখাঁ করছে? কেন মনে হচ্ছে তার বেঁচে থাকার চাকাটা বুঝি আবারো থমকে গেল? তৃষ্ণা তাকে আক্ষরিক অর্থেই আজীবনের জন্য এক ভয়ংকর তৃষ্ণায় ভাসিয়ে দিয়ে চলে যায়। ওয়াসেমের নিয়তি যেন বরাবরই তার কাছ থেকে সব কেড়ে নেওয়ার জন্যই মুখিয়ে থাকে কেবল বুকচেরা শূন্যতাই যেন তার একমাত্র পাওনা।

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৪০

​স্তব্ধতার সেই জমাট ঘোর কাটতেই ওয়াসেমের পুরো সত্তায় এক অসীম হাহাকার আছড়ে পড়ে। সে তীব্রভাবে অনুভব করে তৃষ্ণা নেই, তার বুকের কাছে পড়ে থাকা এই নিথর শরীরটায় তৃষ্ণা আর নেই!​শোকের জমাট পাথর ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। বুক চিরে বেরিয়ে আসা এক আকাশভেদী আর্তনাদ আর বুকফাটা কান্নায় ওয়াসেম চিৎকার করে ওঠে, “তৃষ্ণা…!”

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৪২

8 COMMENTS

Comments are closed.