Home স্নিগ্ধবিষ স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৫১

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৫১

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৫১
সানজিদা আক্তার মুন্নী

তৌসির বিছানার প্রান্তে দুই পা ঝুলিয়ে বসে আছে। তার ঠিক পেছন ঘেঁষেই বসে আছে নাজহা তাড়াহুড়োয় নিজের ড্রেসটা সে উল্টো করে পরে বসে আছে। তৌসির ঘাড় ঘুরিয়ে কিছুটা ক্লান্ত আর নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে নাজহার দিকে তাকায়। শান্ত স্বরে তৌসির বলে, “এখন আমি শুধু বলব, আর তুই শুধু শুনবি। মাঝখানে কোনো টু শব্দও করবি না!”
নাজহা বাধ্য মেয়ের মতো সুবোধ ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে বলে, “জি, আচ্ছা।”
বুক চিরে একটা ভারী দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে তৌসিরের। তারপর সে শুরু করে তার ফেলে আসা জীবনের গল্প, “আমার জন্ম তামিলনাড়ুর তিরুনাল্লুরে। একসময়ের প্রভাবশালী ইলমাজ পরিবারের সন্তান আমি। আমার বাবা হন তখনকার চিফ মিনিস্টার বাদশা তাওহিদ ইলমাজ। তবে লোকমুখে সবাই তাকে শুধু ‘বাদশা’ নামেই চেনে, আর একডাকে সম্মান করে। ইলমাজ পরিবারের সবচেয়ে ছোট ছেলে আমি, নাজহা। আমি আর আমার জমজ ভাই ইয়াদ যেদিন পৃথিবীর আলো দেখি, সেদিনই আমাদের মা চিরদিনের মতো অন্ধকারে হারিয়ে যান মারা যান তিনি।

আমাদের থেকে আঠারো মাসের বড় আরেক ভাই আছে, ওয়াসেম। আর ভাইদের ওপরে আমাদের তিন বোন। মারিয়াম, মায়ের মৃত্যুর সময় ওর বয়স তখন দশ বছর। মেজো বোন মাইশার বয়স বারো। আর সবচেয়ে বড় বোন ইভা, যার বয়স তখন কেবল চৌদ্দ। মায়ের মুখটা কেমন ছিল, তা আমরা কোনোদিন স্বচক্ষে দেখার সুযোগ পাইনি। এই তিন বোনের বুকেই আমরা বড় হই। বয়সে তারাও তখন নিতান্তই শিশু, তাও বাড়ির কাজের মানুষদের সাথে মিলে যেমন তেমন করে আমাদের বুকে আগলে রাখে। আমাদের কাছে ‘মা’ শব্দটার মানে এই তিন বোনই। তারা ঠিক মায়ের মতোই মমতায় আমাদের বড় করে তুলছে। বাবা আমাদের ভীষণ শান্তিপ্রিয় আর সৎ একজন মানুষ। তার এই সততার কারণেই টানা দুইবার তিনি ক্ষমতায় থাকেন। বংশগতভাবেই আমরা ছিলাম প্রচণ্ড বিত্তশালী। দাদার আমলের কত জায়গা-জমি, কত যে ছড়ানো-ছিটানো প্রপার্টি আছে খোদ বাবাও তার সঠিক হিসেব জানেন না।

বাবা ছিলেন তার বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। কিন্তু ঐ যে কথায় কয় না, এই দুনিয়াটা আসলে ভালো মানুষদের জন্য না? আমাদের বেলাতেও ঠিক তাই হয়। তিরুনাল্লুরে বেশ কিছু বড় এলাকা ছিল যেখানে বাবা নিজের উদ্যোগে স্থানীয় কৃষক আর বস্তির গরিব মানুষদের থাকার ব্যবস্থা করে দেন। কিন্তু কেরালা থেকে আসা খলিল নামের এক জানোয়ার মাফিয়ার নজর পড়ে ওই জায়গাগুলোর ওপর। সে-ও আমাদের মতোই মুসলিম ছিল কিন্তু শুধু নামেই কামে তো একটা জানোয়ার ছিল। সে ওই এলাকায় নিজের ফ্যাক্টরি বসানোর জন্য বাবাকে বারবার প্রস্তাব দিতে থাকে জায়গাগুলো তার কাছে বিক্রি করে দিতে। এতগুলো অসহায় মানুষ চোখের সামনে আশ্রয়হীন হয়ে পড়বে এই কথা চিন্তা করে বাবা মুখের ওপর খলিলের প্রস্তাব সরাসরি ‘না’ করে দেন। কিন্তু খলিলও তো আর ছোটখাটো কেউ নয়, বড় মাপের মাফিয়া। সে দিনের পর দিন বাবাকে নানাভাবে হুমকি দিতে থাকে। এমনকি বাবার পলিটিক্যাল ক্যারিয়ারেও কালিমা লেপনের চেষ্টা করে। কিন্তু আমার বাপ এক কথার মানুষ, আস্ত একটা পাহাড়ের মতো।

বলেন, ‘মরব, কিন্তু নিজের নীতি থেকে এক চুলও সরব না।’ আমাদের পৈতৃক সম্পত্তির ব্যাপ্তি থাকে চোখে পড়ার মতো। দিগন্ত বিস্তৃত আবাদি জমি, পুরোনো দিনের রমরমা ব্যবসা আর শহরের ঠিক প্রাণকেন্দ্রে থাকা কয়েকটি অট্টালিকা সব মিলিয়ে এক মেলা বড় সাম্রাজ্য! কিন্তু সম্পদের এই পাহাড় যে একদিন নিজেদের ভেতরেই কালান্তক এক ঝড় তোলে, বাবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তা অনেক আগেই আঁচ করে ফেলেন। তাই মৃত্যুর আগেই তিনি এক নিখুঁত চাল চেলে যান। পরিবারের এই বিপুল সম্পত্তি তিনি ভাগ করে দেন ঠিকই, তবে তৈরি করেন তিনটি সম্পূর্ণ আলাদা দলিল। তিন ভাইয়ের নামে আলাদা তিনটি দলিল। কিন্তু এর ভেতরেই লুকিয়ে থাকে বাবার মাস্টারস্ট্রোক। দলিলে স্পষ্ট উল্লেখ থাকে, এই তিনটি দলিলের কোনোটিরই একক কোনো ক্ষমতা নেই। যেকোনো একটি বা দুটি দলিল দিয়ে এই সম্পত্তির একটা কাঁচের টুকরোও বিক্রি বা হস্তান্তর করা যাবে না। সম্পত্তির ওপর সামান্যতম অধিকার ফলাতে হলেও, তিনটি দলিলকেই এক টেবিলে একসঙ্গে মেলাতে হয়। বাবা আসলে সম্পদের কোনো ভাগই করেন না বরং বিপদের দিনে তিন ভাইকে যাতে এক ছাদের নিচে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় সেই বাধ্যবাধকতার এক অদৃশ্য শেকল তৈরি করে যান বাবা। এই উইল আর দলিল করার সাথে সাথেই বাবা খলিলের সব নোংরা কাজ আর মুখোশ সবার সামনে প্রকাশ্যে আনেন। তাকে ধরার জন্য তার পেছনে লেলিয়ে দেন পুলিশ। আর বাবার সাহসিকতার এই পুরো কাজটায় তাকে সাহায্য করেন তার চাচাতো ভাই সেলিম আর বাবার সবচেয়ে কাছের বন্ধু ইরশাদ সর্দার।”

সময়টা গড়াইয়া যায় আমার আর ইয়াদের বয়স তখন মোটে সাত বছরে পৌঁছায়। বড় আপু ইভার বিয়ে হয়ে যায়, কিন্তু দুলাভাই আমাদের বাড়িতেই থাকে। কারণ, আপুকে চোখের আড়াল করতে চান না বাবা। আপু তখন আট মাসের পোয়াতি, ভারী শরীর নিয়ে ধীর পায়ে হাঁটে। আমাদের জীবনটা একটা সাজানো বাগানের মতো থাকে তিন ভাই, তিন বোন। সারা বাড়ি জুড়ে হাসিখুশি আর আনন্দ। হায়রে! সেই সুখের দিনগুলা এখন ঝাপসা স্বপ্নের মতো লাগে। একদিন রাইত বারোটা। চারদিক সুনসান। সিনেমায় যেমন হঠাৎ ডাকাত পড়ে, আমাদের সাজানো সংসারটায় ঠিক সেভাবেই কালবৈশাখী আছড়ে পড়ে। বাড়ির পালোয়ান আর কাজের মানুষগুলারে চোখের পলকে কাইটা টুকরো টুকরো করে ফেলে খলিলের লোকেরা। মুহূর্তেই আমাদের বাড়ি ভাসতে থাকে রক্তে। সে প্রায় শ খানেক লোক নিয়ে আসে, আর যমদূতের মতো খলিল নিজে হাজির হয় আমাদের সামনে। জানস নাজহা, দুনিয়ায় সবচেয়ে বড় কষ্ট কী?

যখন আপন মানুষ পেছন থেকে বুকে ছুরি মারে! যেই সেলিম চাচারে আব্বা নিজের রক্তের ভাইয়ের চেয়েও বেশি বিশ্বাস করেন, জান দিয়ে ভালোবাসেন সেই বেইমান সেলিম চাচাই কালসাপ হয়ে ওদের রাস্তা দেখাইয়া আনে। আমাদের ছোট্ট তিন ভাইরে টাইনা-হিঁচড়া আইনা শক্ত করে চেয়ারের সাথে বাঁধে। বাবাকেও বাঁধে। ওরা চায় মারার আগে আমাদের চোখের পানি দেখে পৈশাচিক উল্লাস করতে। কিন্তু সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা তখনো বাকি থাকে আমাদের দুলাভাই, যার সন্তানের মা হতে যাচ্ছে আমার আপু, সেও ওদের সাথে গিয়া দাঁড়ায়! ঠোঁটে শয়তানের হাসি নিয়া। এরচেয়ে বড় ধাক্কা কি হইতো পারে? বাবা তো এক কথায় বাকরুদ্ধ হয়ে শুধু দেখছিলেন। আমার জন্মদাতা বাবার সামনে, আমাদের কচি চোখের সামনে ওরা আমার কলিজার টুকরা দুই বোন ইভা আর মাইশারে চুল ধরে টাইনা হিঁচড়ে নিয়ে আসে। বাবার পায়ের কাছে ছুঁড়ে ফেলে ওদের। শুরু হয় ধর্ষণ করা জানোয়ারের দল ঝাঁপিয়ে পড়ে আমার বোনগুলোর ওপর। আট মাসের পোয়াতি একটা মেয়ে, পেটে তার একটা জ্যান্ত বাচ্চা ওরা একটুও দয়া করে না! ওদের শরীর থেকে শুধু কাপড় না, সম্মান আর চামড়া হিংস্রভাবে টেনে ছিঁড়ে নিতে থাকে ওরা।বাবা হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন। যেই মানুষটারে কখনো মাথা নোয়াতে দেখিনি যে মরে যাবেন কিন্তু নীতি থেকে সরবেন না, সেই বাবা ডুকরে কেঁদে ওঠেন,

“বাবারা, আমারে তোরা টুকরো করে কেটে ফেল আমার সব ধন-সম্পদ নিয়া নে! তাও আমার মা-গুলারে ছেড়ে দে, ওদের গায়ে হাত দিস না!”
কিন্তু খলিল শয়তানের মতো হেসে বলে,
“সম্পদ তো নিবই রে, কিন্তু তার আগে তোর চোখের সামনে একটু আসল মজাটা নিয়া নেই!”
নিজের চোখের সামনে নিজের স্ত্রীর এমন সর্বনাশ হচ্ছে, আর আপুর স্বামী দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে! বল, এই দৃশ্য কোনো মানুষ সইতে পারে? আমার বোনগুলার শরীর থেকে বুকের স্তন থেকে লজ্জাস্থান হতে তখন ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটতে থাকে। ব্যথায়, কষ্টে আর অপমানে ওদের গগনবিদারী চিৎকার একটু পর গোঙ্গানিতে রূপ নেয়। হায়রে আমার বোনগুলার সেই গোঙ্গানি বাবা বলে চিৎকার! জানস নাজহা, এত বছর পার হয়ে গেছে কিন্তু আমার আজও রাইতে ঘুম হয় না। চোখ বন্ধ করলেই দেখি ইভা আপু আর মাইশা আপু রক্তমাখা হাতে আমার দিকে হাত বাড়িয়ে আছে, বাঁচার আকুতি জানাচ্ছে। ওদের সেই ভাঙা গলার আর্তনাদ আজও আমার কানের ভেতর বাজতে থাকে রে। আমার বুকের ভেতরটা জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে যায়, কিন্তু আমি কিচ্ছু করতে পারি না কিচ্ছু না!

আমার চোখের সামনেই সব ঘটতেছে! যেই সেলিম চাচারে আমরা বাবার মতো দেখতাম, সেও আজ জানোয়ারের রূপ নিয়ে। সেও নোংরা উল্লাসে মেতে ওঠে আমার বোনগুলোর ওপর। আমার আট মাসের পোয়াতি বড় আপু ওরা আপুর ওপর এমন পৈশাচিকতা চালাইতেছে যে, আমার আপুটা আর সহ্য করতে পারে না। ওর গর্ভের জ্যান্ত বাচ্চাটাকে ওরা ওর লজ্জাস্থানে হাত ঢুকিয়ে টেনে ছিঁড়ে বের করে আনে। এনে ওর মাথা আর ধড় ধরে ছিঁড়ে প্রাণরাকে নির্মমভাবে শেষ করে দেয়, আর আমার মায়ের মতো বড় আপুটা একটা বিকট চিৎকার দিয়া চিরকালের মতো স্তব্ধ হইয়া যায়। আমার আপুটা মারা যায়, কিন্তু জানোয়ারগুলার থাবা থামে না। একটা লাশের ওপর ওরা যে কতবার হামলায় পড়ছে, তার কোনো হিসেব নাই!

এই ভয়ংকর দৃশ্য দেখে আমার বাবার বুকটাও ফেটে যায়। চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে হঠাৎ উনার শরীরটা আছড়ে পড়ে মাটিতে। হার্ট অ্যাটাক করে আমাদের চোখের সামনেই আব্বা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। নিজের মেয়েদের কে এভাবে ধর্ষিত হতে দেখছেন তাও নিজের পায়ের কাছে নিজের চোখের সামনে দেখে আর বেঁচে থাকা সম্ভব? বাবাও চলে যান আর আমরা তিন ভাই? শক্ত রশিতে বাঁধা অবস্থায় আমরা শুধু হু হু করে কাঁদতেছি। আমাদের চোখের সামনে আমাদের দুনিয়া ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, আর আমরা কিচ্ছু করতে পারতেছি না কিচ্ছু না!
আমার মেজো আপুর সাথে তখনও চলছিল এসব ত্রিশ জনেরও বেশি নরপশু মিলে ওর ওপর হামলে পড়ে। আমার হাসিখুশি বোনটারে ওরা তিলে তিলে ছিঁড়েখুঁড়ে খায়। তারপর একটা চেয়ার ভেঙে তার পায়া নিয়ে আমার আপুর লজ্জাস্থানে প্রবেশ করিয়ে দেয় এক ধাক্কায়, সাথে সাথে আপু ইয়া আল্লাহ বলে মুখ দিয়ে এক কুলি রক্ত ফুরর করে বের করে দেয়। শেষ হয়ে যায় সেও আমার সেজো আপুটাও আর বাঁচার সুযোগ পায় না। মেঝের ওপর আমার বোনটার ছিন্নভিন্ন শরীর, আমার বোনদের কামড়ে ছিড়ে নেওয়া স্তন চামড়া আর তাজা রক্ত পড়ে থাকে, আর আমরা শুধু ফ্যালফ্যাল করে দেখতে থাকি। আমাদের চোখের পানি শুকাইয়া পাথর হয়ে গিয়াছিল ঐদিন।

আমরা শুধু তাকাইয়াছিলাম। সেই রাতে আমাদের ছোট বইন মারিয়াম ওর এক বান্ধবীর বাসায় আর এসময় ইরশাদ আংকেল দৌড়াইয়া গেছিলেন মারিয়ামরে আনতে। ঠিক ওই সময়ডাতেই কই থেইকা জানি খবর দিছে উনারে, খলিল আইসা পড়ছে! সাক্ষাৎ যমদূতের মতোন খলিল! খবর পাইয়াই আংকেল তড়িঘড়ি কইরা পুলিশ ফোর্স রেডি কইরা নিয়া আসলো। কিন্তু আফসোস! ওনারা আসতে আসতে আমাদের দুনিয়াটা ভাইঙ্গা চুরমার হয়া গেল। সব শেষ! খলিলের পালিত কুত্তাগুলা আমাগোরে কিন্তু মাইরা ফেলে নাই। কারণ একটাই, ওই সম্পত্তির দলিলগুলা! সব তো আমাগো নামে। ওদের আসল মতলব আছিল আমাদের জ্যান্ত তুইলা নিয়া যাওয়ার। কিন্তু তার আগেই তো পুলিশ আইসা পড়ে। কিন্তু ওই পুলিশ? ওরাও আছিল খলিলের কেনা গোলাম! শুধু ডিউটি করার একটা ভান, একটা লোক-দেখানো স্বচ্ছতা বজায় রাখতেই ওরা সাইরেন বাজাইয়া আসছিল। আমি নিজের এই দুই চোখে, একদম স্পষ্ট দেখছি পুলিশের একদম গা ঘেঁষেই খলিল বুক ফুলাইয়া হাইটা বাইর হইয়া গেছিল। অথচ তারা টু-শব্দটাও করেনি! উল্টা, পুলিশের কমিশনার চোখের ইশারায় খলিলরে বুঝায়া দিছে, “পরিস্থিতিটা এখন একটু শান্ত হইতে দে, এইগুলারে আমরা ঠিকই তোর হাতে তুইলা দিমু।” শুধু খাড়ায়া খাড়ায়া দেখলাম, কিন্তু কিছুই করার আছিল না।

আমাদের তিনজনের অবস্থা তখন একদম শোচনীয়, জ্যান্ত লাশের মতো। ইব্রাহীম পাটোয়ারি আর ইরশাদ সর্দার আংকেল আমাগোরে কোনোমতে টাইনা-হিঁচড়ে নিজেদের বাড়িতে নিয়া গেলেন। সকাল হইতেই দেখি চারদিকে খবর রটায়া দিছে রাইতে নাকি ডাকাত দল আইসা আমাদের বাড়ি লুটপাট করছে আর সবাইকে কোপায়া মাইরা ফেলছে! পুলিশ আর মিডিয়া মিইলা পুরা ঘটনাটা ক্যামনে যে এত সুন্দর কইরা সাজাইয়া ফেললো, আমরা বুঝতেই পারলাম না। বাবা আর বড় দুই বোনের লাশটা একটু যে শেষ দেখা দেখমু, একটা চিহ্নবিহীন লাশ হিসেবে তাগোরে মাটির নিচে চাপা দিয়া দেয় ওরা। আমরা একটু মন ভইরা কাঁদারও সুযোগ পাইলাম না। বুকটা যে ক্যামন দুমড়ে মুচড়ে যাইতেছিল, সেইটা কাউরে বুঝান যাইব না!

ইব্রাহিম আর ইরশাদ আংকেল ভালো কইরাই বুইঝা গেছিলেন, তামিলনাড়ুতে আমাদের আর এক মুহূর্ত থাকাও নিরাপদ না। থাকলে আমাদেরও গুম কইরা দিব। তাই ইরশাদ আংকেল আমার ভাই ইয়াদ, আমি আর মারিয়ামরে নিয়া সোজা চইলা আসলেন উত্তর প্রদেশে। আর ইব্রাহিম আংকেল আমার আরেক ভাই ওয়াসেমরে নিয়া সোজা গুজরাটে চইলা গেলেন। ইব্রাহিম আংকেলের নিজের কোনো পোলাপান ছিল না, তিনি বাবা হইতে পারতেন না। তাই তিনি ওয়াসেমরে নিজের বুকের মাঝে টাইনা নিলেন, নিজের সন্তান পরিচয় দিয়াই বড় করতে লাগলেন। পরে আমার ভাই ইয়াদরে ইরশাদ সর্দার নিজের কাছেই রাইখা দিলেন। আর আমি হতভাগা এবং আমার বোন মারিয়ামরে আমাগো মামা আইসা বাংলাদেশে নিয়া আসলেন, কারণ আমার মা ছিলেন বাংলাদেশি। চোখের সামনে ভাইগুলা আলাদা হইয়া গেল, কিছুই করবার পারলাম না।

আমাদের তিন ভাইয়ের নামে থাকা তিনটা দলিল তিনজন আলাদা মানুষের কাছে গচ্ছিত রাখা হইলো। ইয়াদেরটা রাখলেন ইরশাদ আংকেল, ওয়াসেমেরটা পাটোয়ারি আংকেল আর আমার দলিলটা থাকলো আমার বোন মারিয়ামের কাছে। চাইলে তো তারা এই সব সম্পত্তি খুব সহজেই মাইরা দিয়া নিজেরা খাইতে পারতেন। কিন্তু তারা তা করেন নাই! তারা আসলেই আমার বাবার রক্তের চাইতেও আপন, সত্যিকারের বন্ধু ছিলেন।
বাংলাদেশে আসার পর চোখের পলকে ক্যামনে একটা বছর কাইটা গেল। টুকটাক বাংলা ভাষাটাও আমি আয়ত্ত কইরা ফেললাম। মামা আমাদের অনেক আদর-যত্ন কইরাই বড় করতেছেন। মামি অবশ্য আমাগোরে দুই চোখে একদমই দেখতে পারে না, কিন্তু মামার ভয়ে মুখের ওপর কিছু বলবারও সাহস পায় না। আমরা ভাইবোন স্কুলেও ভর্তি হইলাম।
আমার বোনটার বয়স তখন সবে ষোলতে পড়ছে। ওইটুকুন একটা মেয়ে, অথচ এই বোনটাই এখন আমার পুরা দুনিয়া, আমার সবচেয়ে আপনজন। ওর কোলেই আমি মাথা রাইখা ঘুমাই, ও নিজের হাতে আমারে লোকমা তুইলা খাওয়ায়া দেয়, গোসল করায়ে দেয়। মনে হয় আমার মরা মা-টাই আমার বোনের রূপ ধইরা ফিরে আসছে। প্রথম প্রথম বাবা, বড় আপু আর মেজো আপুর কথা মনে পইড়া খুব কানতাম, রাইত বিরাইতে চিল্লায়া উঠতাম। কিন্তু তারপর ধীরে ধীরে মানতে শুরু করলাম। বাচ্চা মন তো, তাই হয়তো মাইনা নিতেও পারছি। দিনের বেলা সব ঠিকঠাকই লাগে। কিন্তু রাইত হইলেই ভয়ংকর স্মৃতিগুলা, রক্তের দাগগুলা ট্রমা হইয়া ঠিকই আমারে তাড়া কইরা ফিরে। ঘুমের ঘোরে এখনো মনে হইতো খলিল বুঝি দরজা ভাইঙ্গা ঢুকল৷ কিন্তু হায় আফসোস
হতভাগ্য মানুষদের কপালে কি আর সুখ জোটে রে নাজহা! আমি এমন এক হতভাগা, যার সুখের স্বাধ নেওয়ার সামর্থ্য কখনোই হয়নি। মামা মারা যান, আর শুরু হয় আমাদের ওপর মামির অকথ্য অত্যাচার। তুই জিজ্ঞেস করস না নাজহা, আমি কেন টাকার ব্যাপারে এত কিপ্টামি করি! জানস এই খাওয়ার জন্য করি। খিদের জ্বালায় প্রতিদিন চাতক পাখির মতো কাঁদতাম তখন, কিন্তু মামি এক মুঠো ভাত দিত না। রাস্তায় ফেলে দেওয়া বাসি ভাত খুঁইজা খুঁইজা খাইতাম। শেষমেশ ঐ দু-টো টাকা আর চার-মুঠো ভাতের জন্য মামি আমার বইনরে বাসার পাশের আবাসিক এলাকায় কাজে লাগায়ে দেয়। সব জাইনাও মামি এত নিষ্ঠুর কাজটা করে! আমাদের মামি সাফ বইলা দেয় “টাকা নিয়া আইলে ভাত পাবি, নয়তো নাই।”

খিদের জ্বালায় আমার বইনটা দেহব্যবসা শুরু করতে বাধ্য হয়। সারাদিন নোংরা বিছানায় নিজের শরীর বিকাইতো সে, আর আমি সেই পল্লীর গেইটে বইসা থাকতাম সকাল থাইকা বিকাল পর্যন্ত। সারাদিন একটার পর একটা পুরুষ মানুষের নিচে শোইতো আমার বইন, আর তার বদলে প্রতিদিন তারে দেওয়া হতো মাত্র দুইশো টাকা। সেই টাকা আইনা মামিরে দিলে মামি আমাদের খাইতে দিত, রাইতে ঘরের কোণায় ঘুমাইতে দিত। মাত্র দুইশো টাকার লাইগা, মাত্র এক মুঠো ভাতের লাইগা আমার বইনটা শরীর বেচত রে নাজহা। আর এজন্য আমি এখন টাকা খরচ করতে পারি না রে, আমার কলিজায় দেয় না। তখন এমনি কইরা তিন মাস কাটে। মাইনষে আমারে দেইখাই কয়, “ঐ দেখ, বেশ্যা মাগির ভাই যায়!” আমার বইনটা দেখতে খুব সুন্দর, তাই দূর-দূরান্ত থাইকা মাইনষে আসে ওর কাছে। ওর লগে শুইতে আসতো লালসায়।

এমনভাবেই একদিন আমি গেইটের কাছে বইসা অপেক্ষা করতাছি, কখন আপু বের হইবো আর আমরা ভাত খামু। সারাদিনে তো আমরা ঐ এক বেলাই ভাত খাই। হঠাৎ শুনি ভেতর থাইকা আপুর বিকট চিল্লানি আর ভাঙচুরের আওয়াজ। আমি দৌড়ায়ে গেইট টপকাইয়া ভেতরে যাই। গিয়া দেখি, আমার বইনরে জ্যান্ত কাইটা টুকরা করা হইতাছে! একটা সাইকো নিজের রাগ মিটাইতে আমার বইনরে কুড়াল দিয়া কোপাচ্ছে। তারপর জ্যান্ত শরীরটায় কেরোসিন ঢাইলা আগুন ধরাইয়া দিচ্ছে! চারপাশের সবাই দেখি খালি চাইয়া চাইয়া দেখে, কেউ কিচ্ছু করে না। আর ঐ সাইকোটা দাঁড়ায়ে দাঁড়ায়ে হাসে।

আগুনে দগ্ধ হইয়া আমার বইনটা চিৎকার করছে আমি ওর কাছে ছুইটা যাইতে চাই, কিন্তু ঐখানের মাসি আমারে জাপটে ধইরা আটকায়। আমি চিল্লাইয়া কই, “আমার বইনটারে বাঁচান!” ঐ মহিলা কয়, “তোর বইনরে তো আর বাঁচানো যাইব না! মরতে দে, মরলে এই সাইকো নিজেরে বাঁচাতে যে টাকা ঢালবো তার অর্ধেক তুই পাবি।”
আমি প্রাণপণে ছুটি আমার বইনের দিকে, কিন্তু পারি না। ওরা দুইজন আমারে শক্ত কইরা ধইরা রাখে, আর আমার চোখের সামনে আমার বইনটা আগুনে পুড়ে ছাই হতে থাকে। আমি শুধু আসমানের দিকে তাকাইয়া চিল্লাই, “আল্লাহ, বৃষ্টি দাও! আল্লাহ, আমার আপুর গায়ের আগুন নেভাও!” আমার আর্তনাদ মনে হয় আল্লাহ শোনেন। প্রচণ্ড ঝড় আসে, তুফান ওঠে, ঝুম বৃষ্টি নামে। কিন্তু তার আগেই আমার বইন মইরা যায়। যার বুকে মাথা গুজতাম, দুনিয়ায় আমার একমাত্র আশ্রয়টাও পুইড়া কয়লা হয়ে যায়। আমি আপুর পোড়া লাশটার কাছে বসি। ওর গলে যাওয়া চামড়াগুলো হাতে নিয়ে ঐ বৃষ্টির মাঝে হু হু করে কাঁদতে থাকি। বৃষ্টির পানিতে আপুর গলে যাওয়া শরীরটা ধুয়ে যেতে থাকে। ছোট্ট আমি কাদার মাঝে বসে আপুর শরীর হতে গলে যাওয়া মাংসগুলো হাতের মুঠোয় নিয়ে জোড়া লাগানোর চেষ্টা করি কিন্তু মাংস তো আর জোড়া লাগে না রে নাজহা। আর লাগে না!
কিছুক্ষণ পর সেখানে এসে পৌঁছান ঐ পল্লীর মালিক, মানে বিবিজান। উনি আমার সম্পর্কে সব জাইনা আমাকে টেনে মামির কাছে নিয়ে যান। কিন্তু ঐ পাষাণ জানোয়ার মামি তখনও বলে দেয় যে সে আমাকে নিজের কাছে রাখবে না। বিবিজান তখন আমার চোখের দিকে তাকাইয়া কন, “আমার লগে যাবি? আমার সিংহ হয়ে বাঁচবি? তোরে আমি বাঘ বানামু!”

আমি বিন্দুমাত্র না ভেবে বলি, “যাব। যদি ঐ মাসি আর ঐ সাইকো লোকটারে সবার সামনে আমারে মারতে দেন।”
বিবিজান সাথে সাথে হেসে ওঠেন, “খাঁটি মাল পাইছি তাহলে! আয়, মার।”
এই বলে উনি আমাকে আবারও সেখানে টেনে নিয়ে যান। ঐ মহিলা আর ঐ সাইকোটাকে আমার আপুর লাশের পাশে হাত-পা বেঁধে চিৎ করে শোয়ানো হয়। আমার হাতে তুলে দেওয়া হয় কুড়াল। আমিও মনের যত রাগ, যত কষ্ট, সব ওদের উপর ঝাড়ি। ওদের বুকের উপর উঠে একের পর এক কোপ দিতে থাকি। কোপাইতে কোপাইতে কলিজা, ফুসফুস পর্যন্ত বের করে আনি, টাইন্যা ছিঁড়ি, তাও মন ভরে না! সাড়ে আট বছর বয়সে আমি প্রথম খুন করি। তারপর শুরু হয় আমার খুনের অধ্যায়। সব মিলিয়ে প্রায় দেড়শ মানুষ খুন করি আমি বারো বছর বয়সের ভেতরেই। সেদিন বিবিজান আপুর পোড়া শরীরটাকে কবর দিয়ে আমাকে বলেন, “তোকে তৈরি হতে হবে। প্রতিশোধের জন্য।”

আমিও সেই কথা মগজে গেঁথে নিই। আমায় এনে স্কুলে ভর্তি করানো হয়। আমার জন্ম ১৯৯৫ সালে, কাগজে-কলমে সেটাকে তিনি করেন ১৯৯২। আমার আসল বয়স এখন একত্রিশ। ওরা আমাকে নিজেদের সন্তানের মতো বড় করে, সাথে বানায় পাপের সাম্রাজ্যের রাজা। ধর্ষণ বাদে এমন কোনো পাপ নাই যা আমি তৌসিরের হিস্ট্রিতে নাই।
তবে হ্যাঁ, ওরা আমায় এতটা খারাপ বানায় নাই আমি খারাপ নিজ থাইকা হইছি! আর তুই জানস, তোরে এই বাড়িত কার কথায় পাঠানো হইছে? খলিল তোর বাপ-চাচারে হাত করছে। কারণ ও জানে, এই শিকদার বাড়িতেই আমি আছি, কিন্তু কেডা আমি, সেটা কেউ চিনে না। আর আমারে ধরার লাইগাই তোর বাপ-চাচা তোরে এখানে পাঠাইছে। আমারে ধরতে পারলে আমার ভাইগোরেরও পাইবো, আমাদের তিনটা দলিলই ওর বড় প্রয়োজন। তোর বাপ-চাচা ইন্ডিয়ার বর্ডারে চোরাকারবার করে, আর খলিলের লগে তাগো সম্পর্ক খুব গাঢ়, তাই টাকাও খাইছে বহুত। এই বাড়িতে কে তামিলনাড়ুর, সেইটা জানতে আর নিজেদের শক্ত অবস্থানে রাখতেই তোরে বিয়া দিছে। আর তালহারে বিষ তো এ জন্য খাওয়াইছে।”

তৌসির এর কথাগুলো একেকটা ভারী পাথর হয়ে নাজহার বুকের ওপর আছড়ে পড়ে। ও পাথরের মতো জমে যায়। ঠোঁট ফাঁক হয়ে থাকে, কিন্তু গলা দিয়ে একটা শব্দও বের হয় না। বুকের ভেতরটা হু হু করে ওঠে, কেউ মনে হয় খাবলে খাবলে কলিজাটা টেনে ছিঁড়ে নিচ্ছে। চোখের কোণ বেয়ে নোনা পানি গাল গড়িয়ে নামছে অনবরত, থামার কোনো নামি নাই।
নিজেকে আর কোনোভাবেই সামলাতে পারে না নাজহা। হাঁপাতে হাঁপাতে ঝটকা মেরে উঠে দাঁড়ায়, তারপর প্রায় ছুটে গিয়ে ঢুকে পড়ে ওয়াশরুমে। দরজাটা ধাম করে লেগে যায় পেছনে। তৌসির স্থির চোখে ওর যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘ, তপ্ত নিঃশ্বাস বুক চিরে বেরিয়ে আসে। মনে মনে বিড়বিড় করে সে,
“সব ব্যথা আইজ তোর সামনে ঝাইড়া দিলাম রে নাজহা। এইবার দেখুম, তুই আদৌ আমার এই সংসারের যুইগ্য কি না।”

আসলে তৌসির আজ ইচ্ছা করেই সব সত্যিটা নাজহার সামনে উগরে দেয়। এ তো এক কঠিন পরীক্ষা। সে দেখতে চায় নাজহা কি তৌসিরের বলা এই কথাগুলো নিজের বাপ-চাচার কাছে গিয়ে ফাঁস করে দেয়, নাকি বুকের ভেতর চেপে রেখে মেনে নেয় সব। নাজহার জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষাটা শুরু হলো ঠিক এই মুহূর্ত থেকেই।
ওদিকে ওয়াশরুমের ভেতর নাজহার অবস্থা ভয়াবহ। বেসিনের কলটা পুরো ছেড়ে দিয়ে অঞ্জলি ভরে ভরে পানি নিয়ে মুখে ঝাপটা মারছে সে। একবার, দুবার, তিনবার কিন্তু কিছুতেই ভেতরের আগুনটা নিভছে না। ও চোখে-মুখে পানির ঝাপটা দিতে দিতেই ফুঁপিয়ে ওঠে বারবার। নিজেকে শান্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা করেও পুরোপুরি ব্যর্থ হয় ও। তৌসিরের একেকটা কথা বিষমাখা তীর হয়ে এসে বিঁধে বুকের ঠিক মাঝখানে। ভেতর থেকে শেষ হয়ে যাচ্ছে নাজহা, একদম শেষ হয়ে যাচ্ছে।

কিছুক্ষণ পর ধীর, কাঁপা কাঁপা পায়ে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসে সে। ভেজা মুখ, লাল হয়ে ফুলে ওঠা চোখ, এলোমেলো চুলে কোনোমতে এসে দাঁড়ায় তৌসিরের সামনে। তৌসির একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে নাজহার কান্নাসিক্ত, রক্তজবার মতো লাল চোখ দুটোর দিকে। নাজহা কিছুক্ষণ মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকে। কথা বলার ভাষা তো সে হারিয়ে ফেলেছে। নিজের পরিবারের এতবড় জঘন্য কীর্তি, আর সব না জেনে নিজের হাতেই করে ফেলা গাদ্দারি, আর তৌসিরের বুকের ভেতর এতদিন ধরে চেপে রাখা এই ভয়ংকর ক্ষত সব মিলিয়ে নাজহার মাথার ভেতরটা ফাঁকা ফাঁকা ঠেকছে। হাত-পা থরথর করে কাঁপছে তার। ভেজা চোখে তৌসিরের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে নাজহা। কিছু একটা বলতে চায়, ঠোঁট নড়ে ওঠে, কিন্তু গলা দিয়ে শব্দ বের হয় না। আর ঠিক তখনই
হঠাৎ করে মাথাটা ঘুরে ওঠে ওর। চোখের সামনে সব ঝাপসা হয়ে আসে তার। পা দুটো আর শরীরের ভার ধরে রাখতে পারে না। তার চারপাশটা তার চোখে দুলে ওঠে
টাল সামলাতে না পেরে তৌসিরের সামনেই টাশ করে হেলে পড়ে নাজহা। পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই ওর মাথাটা সজোরে গিয়ে ঠোক্কর খায় খাটের পাশের শক্ত কাঠের খাটপাশীর কোণায়। আর মুহূর্তের মধ্যে নাজহার মাথা ফেটে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরিয়ে আসে।

মাথা থেকে লাল রক্ত গড়িয়ে নামে কপাল বেয়ে, ভিজিয়ে দেয় ওর চোখের পাশটা, কান, গলা সব। তৌসির কয়েক সেকেন্ডের জন্য পাথর হয়ে বসে থাকে। মাথার ভেতর সব এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে ওর চোখের সামনে ঝট করে ভেসে ওঠছে অতীতের সেই ভয়ংকর দৃশ্যগুলো রক্তে ভেজা মাইশা, নিথর হয়ে পড়ে থাকা ইভা, আর মারিয়ামের জলন্ত মুখ। এক এক করে সব ভ্রম জীবন্ত হয়ে ওঠছে ওর চোখের সামনে।আর এদিকে নাজহা ধীরে ধীরে অচেতন হয়ে আসে। ওর চোখের পাতা দুটো ভারী হয়ে নেমে আসে নিচে, ঠোঁট ফাঁক হয়ে যায়। ওর তাজা রক্ত ছড়িয়ে পড়তে থাকে মেঝেতে। তৌসির একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে অবশ, নিথর হয়ে নাজহার ন্যায়।

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৫০

কিন্তু ঠিক তার পরের মুহূর্তেই ভেতরের জমে থাকা সব শক্তি, সব আতঙ্ক, সব ভালোবাসা এক করে বুক চিরে গগনবিদারী চিৎকার করে ওঠে তৌসির
“বিবিজান! ও বিবিজান!! আমার নাজহারে বাঁচাও!! বিবিজাআআআন!!”

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৫২

4 COMMENTS

  1. অনেক অপেক্ষা করি গল্পটার জন্য। নেক্সট পার্ট তাড়াতাড়ি দিও আপু প্লিজ❤️

Comments are closed.