স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৫৩
সানজিদা আক্তার মুন্নী
কেটে গেছে এক মাসেরও বেশি সময়। শিকদার বাড়ির আঙিনায় এখন বইছে শান্তির হাওয়া। চারপাশের সবকিছু ধীরে ধীরে গুছিয়ে উঠছে আপন ছন্দে।তৌসির নাজহা চুটিয়ে সংসার করছে। কিন্তু প্রকৃতির চিরন্তন নিয়মে বড় কোনো ঝড়ের আগে যেমন চারপাশের বাতাস একদম থমকে থাকে, ঠিক তেমনি এই রহস্যময় নিস্তব্ধতার আড়ালে একটু একটু করে ঘনিয়ে আসছে এক ভয়ঙ্কর কালবৈশাখী। আর সেই সর্বনাশা ঝড় যখন প্রবল বেগে আছড়ে পড়ছে, তখন শিকদার বাড়ির প্রতিটি মানুষ নিজেদের অজান্তেই দিশেহারা হয়ে পড়ছে তার ভয়াবহ তাণ্ডবে।
ঝড়ের সূত্রপাত তৌসিরকে কেন্দ্র করে। তৌসির একটা কাজে জিন্দাবাজর গিয়েছিল একাই। আর খলিলের লোকেরা জিন্দাবাজারের ব্যস্ত মোড় থেকে দিনদুপুরে আচমকা তৌসিরকে তুলে নিয়ে যায়। তৌসিরি যে বদশার ছেলে খবরটা খলিলের কান পর্যন্ত পৌঁছায় তালুকদারদের মাধ্যমে। কিন্তু তালুকদারদের কাছে শিকদার বাড়ির এই গোপন খবর কে পাচার করে, সেটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। আর তার উত্তর সহজ সেটা নাজহা সে নিশ্চয়ই তার বাপ চাচা কে এটা জানিয়েছে।
ইয়াদ আর ওয়াসেমে এসেছিল আজ বাংলাদেশে আর এসেই এই খবর শুন যে তাদের ভাই কে বন্দী করা হয়েছে। তারা আর শিকদার বাড়িতে না প্রবেশ করে সেই আস্তানায় যায়। আস্তানার ঠিকানা সেই লোকরাই বলে দিয়েছে তারা বিবিজান কে ফোন দিয়ে হুমকি দিয়েছে সেইখানে দললি নিয়ে যেতে।
তৌসিরকে বাঁচাতে ইয়াদ আর ওয়াসেম কালবিলম্ব না করে মুহূর্তের মধ্যে ছুটে যায় সেই আস্তানার দিকে। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর তারা যা দেখে, তাতে বিস্ময়ে তাদের চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে। তারা দেখতে পায়, তৌসির তার সমস্ত শক্তি উজাড় করে দিয়ে একাই খলিলের অর্ধেক লোককে খেয়ে দিয়েছে ওদের রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে ফেলেছে! তবে এই খেয়ে দেওয়ার সাহসিকতার মূল্যও তাকে দিতে হয়েছে অত্যন্ত কঠিনভাবে। তার পেটের কাছে জ্বলজ্বল করছে গভীর ছুরিকাঘাতের এক বীভৎস ক্ষত, যেখান থেকে ফিনকি দিয়ে অবিরাম বের হচ্ছে তাজা লাল রক্ত। তার পরনের সাদা শার্ট আর লুঙ্গী ততক্ষণে রক্তে সম্পূর্ণ ভিজে এক কালচে বীভৎস আকার ধারণ করেছে সে তো মারামারি মধ্যেও বলছিল, ‘ এই খানকির পোলারা আমার শার্টে টান দিছ না ছিঁইড়া যাইব তিন বছরও পড়ি নাই নয়া শার্ট আমার। ”
ইয়াদ আর ওয়াসেম দ্রুত তাকে ঐ মৃত্যুপুরী থেকে উদ্ধার করে আনে। আর সেই আধমরা খলিলের লোকদের ওপর প্রচণ্ড মারধরের পর একে একে বের হয়ে আসে আসল সত্য যে তালুকদার রা খললি কে খবর দিয়েছেন। আর তালুকদার দের কে বলবে অবশ্যই নাজহা।
এই অকাট্য সত্য শোনার পর তাদের মনে আর বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ থাকে না। তৌসির যে নাজহাকে তাদের অতীতের সমস্ত কথা অন্ধের মতো বিশ্বাস করে খুলে বলবে বিশ্বাসের যোগ্য কিনা পরিক্ষা করবে, সে কথা বিবিজান, ইয়াদ, ওয়াসেম, নাযেম এবং রুদ্র সকলেরি জানা আর এর এই পরিক্ষার রেজাল্ট হলো যদি আবার নাজহা তাদের বিশ্বাসঘাতকতা করে, তবে তার পরিণাম হবে কল্পনাতীত ভয়াবহ। তাদের শর্ত একদম স্পষ্ট ও ধারালো। হয় নাজহাকে চিরতরে শেষ করে দেওয়া হবে নয়তো ওর চোখের মৃত্যুর নির্মম স্বাদ গ্রহণ করতে হবে তার প্রিয় তালহা কিংবা মাস্টার চাচ্চুকে। কারণ গাদ্দারির শাস্তি তাকে পেতেই হবে।
রুদ্রকে হাসপাতালে তৌসিরের পাহারায় রেখে ইয়াদ আর ওয়াসেম ঝড়ের বেগে ফিরে আসে শিকদার বাড়িতে। তৌসির এখন সম্পূর্ণ অচেতন, তার পেটের গভীর ক্ষতে তখনো চলে চিকিৎসকদের নিঃশব্দ সেলাই।
শিকদার বাড়িতে পা রাখতেই ইয়াদ আর ওয়াসেমের কানে এসে পৌঁছে এক বিভীষিকাময় খবর। তারা জানতে পারে বিবিজান বাড়িতে নেই। তিনি তীব্র আক্রোশে অন্ধ হয়ে নাজহাকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে সোজা চলে যান সেই অন্ধকার শিকদার কুঠিরের দিকে।কুঠিরের সেই নরখাদকের ঘরে যার স্যাঁতস্যাঁতে চার দেয়াল যুগে যুগে কত নিরীহ মানুষের আর্তনাদ আর কত অবিচার ও রক্তের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
স্যাঁতস্যাঁতে, ঘুটঘুটে অন্ধকার এবং নরখাদকের সেই পচা গন্ধমাখা আবদ্ধ কক্ষে তখন চলতে শুরু করে পৈশাচিক তাণ্ডব। বিবিজানের নির্মম ও নিষ্ঠুর আক্রোশের সামনে নাজহা তখন মার খেতে খেতে প্রায় আধমরা অবস্থায় মেঝেতে পড়ে আছে। তার ক্লান্ত, রক্তাক্ত ও যন্ত্রণাক্লিষ্ট ছোট্ট মাথাটায় তখন শুধু একটাই প্রশ্ন বারবার ঘুরপাক খাচ্ছে। সে অবুঝের মতো বোঝার চেষ্টা করে, তার অপরাধটা ঠিক কী? তৌসিরকে মনে-প্রাণে ভালোবাসার চেষ্টা করে যে নিজের বাপ চাচার বিরুদ্ধে গিয়ে নতুন করে সংসার পাতে, সে-ই কেন তাদেরই গোপন খবর শত্রুদের কাছে পাচার করবে? ঠিক কোন যুক্তিতে বা কোন স্বার্থে সে এমন আত্মঘাতী কাজ করে? কিন্তু বড়ই আফসোসের বিষয় হলো, তাকে কেউ বিশ্বাস করে না। তার তৌসিরও এখানে নেই যে তাকে বুকে টেনে ধরবে।
নাজহার নাক আর ফাটা ঠোঁট বেয়ে অনবরত গড়িয়ে পড়ে তাজা লাল রক্ত। তার স্পর্শকাতর শরীরে নির্মমভাবে ঢেলে দেওয়া হয় গরম পানি। চামড়া ঝলসে যাওয়ার অবর্ণনীয় ও তীব্র যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে সে আর সহ্য করতে পারে না নাজহা তার অনেক কষ্ট হয় এত মার সে কখনোই খায়নি। একপর্যায়ে নাজহা বিবিজানের পায়ের কাছে অসহায়ের মতো লুটিয়ে পড়ে ডুকরে কেঁদে ওঠে এবং মিনতি করে বলতে শুরু করে, “আমি বলিনি কিছু! আমি কিচ্ছু বলিনি! বিশ্বাস করুন অন্তত একবার বিশ্বাস করুন আমায়।”
তার এই করুণ মিনতি শেষ হওয়ার আগেই বিবিজানের লোহার মতো শক্ত হাতের এক প্রচণ্ড চড় সজোরে এসে আছড়ে পড়ে নাজহার ফর্সা গালে। সেই চড়ের আঘাতে সে বিদ্যুতের গতিতে ছিটকে গিয়ে নরখাদকের খাঁচার শক্ত লোহার রডে সজোরে বাড়ি খায় এবং সাথে সাথে মাটিতে আছড়ে পড়ে। তার মনে হয়, তীব্র যন্ত্রণায় মাথাটা মনে হচ্ছে তখনই ধড় থেকে ছিঁড়ে আসতে চাচ্ছে।
বিবিজান রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বাঘিনীর মতো গর্জে ওঠেন এবং চিৎকার করে বলেন, “তুই বেইমানি করবি মাগিগিরি আর আমি সেটা বোকার মতো বিশ্বাস কইরা নেব? তুই আমার নাতিকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতে চাস? তোর এত বড় সাহস কোথা থেকে আসে খা****।এ মাগি তুই গাদ্দার জেনেও তোর সাথে আমার নাতি ভালোবেসে সংসার করতে চায়, আর তুই তার এই প্রতিদান দিস? আইজ যদি আমার নাতিকে ওরা ওখানে মেরেই ফেলত, তখন কী হইতো? এ মাগি ক আমারে, কী হইতো তখন?”
এই কথাগুলো বলেই বিবিজান আর এক মুহূর্ত দেরি না করে, হাতের চামড়ার চাবুক দিয়ে সজোরে আঘাত করতে থাকেন নাজহার এলোমেলো ও ক্ষতবিক্ষত শরীরে। চাবুকের প্রতিটি নির্দয় আঘাতে কুঠিরের ভারী বাতাস আরও বেশি ভারী হয়ে ওঠে নাজহার গগনবিদারী ও বুকফাটা চিৎকারে। ফোঁটায় ফোঁটায় তাজা রক্ত ছিটকে পড়ে কুঠিরের স্যাঁতস্যাঁতে মেঝেতে।
এদিকে হাসপাতালের সাদা বিছানায় শুয়ে যখন তৌসিরের জ্ঞান ফেরে, তখন ঘোলাটে চোখে চারপাশটা একবার দেখেই তার বুকটা অজানা আশঙ্কায় ধক করে ওঠে। সে লক্ষ করে তার পাশে ইয়াদ আর ওয়াসেম নেই। মুহূর্তের মধ্যেই সে পরিষ্কার বুঝে যায়, ওরা ঠিক কোথায় যায় আর এতক্ষণে কী করতে শুরু করেছে।
নিজের শরীরের এই ভয়াবহ ও মুমূর্ষু অবস্থাতেও তৌসির পাগলপ্রায় হয়ে ওঠে। সে আর এক মুহূর্তও শুয়ে থাকতে পারে না, নিজের হাতে গেঁথে থাকা স্যালাইনের নিডল এক ঝটকায় টেনে ছিঁড়ে ফেলে এবং রক্তাক্ত হাতেই বিছানা ছেড়ে উঠে বসে। রুদ্র তাকে বাধা দিতে এলে তাকে এক প্রচণ্ড ধাক্কায় দূরে সরিয়ে দেয় এবং কোনো কিছুর পরোয়া না করে সে পাগলের মতো ছুটতে শুরু করে কুঠিরের দিকে।
তার দুর্বল শরীর বিন্দুমাত্র সায় দিচ্ছে না তাকে। পেটের তাজা সেলাইগুলো টান লেগে প্রায় ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম হচ্ছে। প্রতিটি পদক্ষেপে সে অনুভব করছে অসহ্য ও তীব্র যন্ত্রণা। কিন্তু তা সত্ত্বেও সে থামে না, সে ক্রমাগত দৌড়ে চলে। তাকে দেখে মনে হবে এক উন্মাদ ঘোড়া অন্ধের মতো ছুটে চলে জ্বলন্ত আগুনের দিকে। কারণ তার মন খুব ভালো করেই জানে, ওরা আজ কোনোভাবেই নাজহাকে বাঁচতে দেয় না।
পাগলের মতো ছুটতে ছুটতে অবশেষে কুঠিরের সেই বিভীষিকাময় কক্ষে ঢুকেই তৌসির একেবারে থমকে দাঁড়ায়। তার পা দু’টো মুহূর্তের জন্য মাটির সঙ্গে গভীরভাবে শিকড় গেড়ে বসে যায়। সে মনে মনে ঠিক যেই পরিণতিটার ভয় পাচ্ছিল, চোখের সামনে ঠিক সেই ভয়ংকর দৃশ্যটাই দেখতে পায় সে।
বিবিজানের নির্মম ও পাশবিক অত্যাচারে নাজহা এখন মৃত্যুর দোরগোড়ায় পৌঁছে প্রায় শেষ। মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ে রক্ত আর গরম পানির এক বীভৎসতা দেখেই তৌসিরের বুক কাপতে শুরু করে। নাজহার শরীরটা এক কোণে পড়ে থাকে প্রায় নিথর অবস্থায়। তৌসির এক মুহূর্তও দেরি না করে নাজহার দিকে ছুটে যেতে চায়। কিন্তু ঠিক তখনই ইয়াদ আর ওয়াসেম দুই দিক থেকে তাকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে ফেলে এবং চিৎকার করে বলে ওঠে, “তুই কোনোভাবেই যাবি না তৌসির! ওরে আজ ওরা মেরেই ফেলুক, তাতে আমাদের কিছু যায় আসে না! ছাড় ওরে!
ঠিক এই মুহূর্তে নাজহার অর্ধমৃত চোখ গিয়ে পড়ে তৌসিরের দিকে। রক্ত আর পানি মাখামাখি হয়ে থাকা তার কালচে সবুজ সেই চোখ দু’টোয় হঠাৎ করেই বাঁচার এক টুকরো নতুন আলো জ্বলে ওঠে। সে অনেক কষ্ট করে হাঁটু গেড়ে বসে এবং ছোট অসহায় বাচ্চাদের মতো হাউমাউ করে কেঁদে উঠে বলতে শুরু করে, “তৌসির! বিশ্বাস করুন আমি কাউকে কিচ্ছু বলিনি। আমি সত্যিই কিচ্ছু বলিনি। এরা আমাকে অকারণে এভাবে কেন মারে? আমি কী করি তৌসির? আমাকে বলুন, আমি কী করি?”
তার সেই হৃদয়বিদারক আর্তনাদে কুঠিরের কঠিন পাথুরে দেয়ালও মনে হবে বেদনায় কেঁপে ওঠেছে। তৌসির আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। সে সবার সমস্ত বাধা এক ঝটকায় ছিন্নভিন্ন করে দিয়ে ছুটে যায় নাজহার সামনে এবং হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে তার পায়ের কাছে। এই দৃশ্য দেখে বিবিজান বিরক্তিতে নিজের হাতের রক্তমাখা চাবুকটা সজোরে ছুড়ে ফেলেন ওয়াসেমের দিকে। এরপর ঠোঁট বাঁকিয়ে তাচ্ছিল্যের সুরে তিনি বলে ওঠেন,
“দেখ তোরা, সবাই মিলে কাহিনি দেখ্যা! জানোয়ারনি কেমন ন্যাকা কান্না চুদায়!”
তৌসির চারপাশের কারো কোনো কথায় বিন্দুমাত্র কান দেয় না। সে অতি আলতো করে রক্তাক্ত ও ক্ষতবিক্ষত নাজহাকে দুই হাতে শক্ত করে টেনে নেয় নিজের বুকের মাঝে। নাজহার গাল বেয়ে এখনো ফোঁটায় ফোঁটায় রক্ত ঝরে পড়ছে আর তা সরাসরি এসে মিশে যায় তৌসিরের গায়ে থাকা হাসপাতালের সাদা শার্টে। চাবুকের গভীর ক্ষত আর গরম পানিতে ঝলসে যাওয়া নাজহার শরীরের এই অসহ্য উত্তাপ তৌসির নিজের বুকেই খুব স্পষ্টভাবে অনুভব করছে। তার মনে হচ্ছে নাজহার শরীরে থাকা প্রতিটি ক্ষতের তীব্র জ্বালা তার নিজেরই।
নাজহা যন্ত্রণায় তৌসিরের শার্টটা দুই হাতে মুঠো করে শক্তভাবে খামচে ধরে। এরপর কাঁপা কাঁপা গলায় ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে সে বলে ওঠে, “আমি সত্যি বলছি, আমি কাউকে কিচ্ছু বলিনি। আপনি অন্তত বিশ্বাস করবেন তো আমায়? এই পৃথিবীতে শুধু আপনিই তো আমার আপনজন হয়ে আছেন।”
নাজহার এই অসহায় কান্নায় তৌসিরের চোয়াল রাগে ও আবেগে শক্ত হয়ে ওঠে। সে তাকে আরও শক্ত করে নিজের বুকের মাঝে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে। তার আলিঙ্গন দেখে মনে হয়, তাকে একটু ছেড়ে দিলেই সে চিরতরে হারিয়ে যাবে। এই আবেগঘন দৃশ্যটা দেখে ওদের মনে অন্তত এক মুহূর্তের জন্য হলেও এই বিশ্বাস জন্মে যায় যে, এই মেয়েটিকে শাস্তি দেওয়া তৌসিরের পক্ষে কোনোভাবেই আর সম্ভব হয় না। সবাই ভাবতে শুরু করে, ভালোবাসার কাছে হয়তো আজ হার মেনে যায় শিকদার বাড়ির রক্তের কঠিন নিয়ম। তবে এই ধারণা একেবারেই ভুল। বেশ কিছুক্ষণ নাজহাকে নিশ্চিন্তে বুকে জড়িয়ে রাখার পর, তৌসিরের মুখাবয়ব হঠাৎ করেই জাদুমন্ত্রের মতো বদলে যেতে থাকে। সে ধীরে ধীরে নিজের মাথা তোলে এবং স্থির দৃষ্টিতে ইয়াদ ও ওয়াসেমের দিকে তাকায়। ধারালো বরফের ফলার মতো নিষ্ঠুর গলায় তৌসির নির্দেশ দেওয়ার সুরে বলে ওঠে,
“একে এভাবে মারা যাবে না। তোরা অন্য পদ্ধতি রেডি কর।”
কথাটা শুনে ইয়াদের চোখ দুটো হিংস্র জানোয়ারের মতো চকচক করে ওঠে। সে পৈশাচিক উল্লাসে হেসে উঠে বলে, “আমি জানতাম তোর দ্বারা তোর বউকে নিজ হাতে শাস্তি দেওয়া সম্ভব হবে না। তাই আসল প্রস্তুতি নেওয়াই আছে।”
তৌসির রক্তাক্ত, ক্ষতবিক্ষত নাজহাকে পাঁজকোলা করে কুঠিরের বাইরে নিয়ে আসে। নাজহার অবশ মস্তিষ্ক এখনো এক অন্ধ মোহে ডুবে আছে। সে ভাবে, হয়তো শেষ মুহূর্তে তৌসিরের ভেতরে লুকিয়ে থাকা স্বামীসত্তা জেগে উঠেছে হয়তো সে তাকে বাঁচানোর জন্যই এই নরক থেকে বাইরে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু না, এই আশা যে কত বড় মরীচিকা, তা বুঝতে তার আর কয়েক মুহূর্তই বাকি। কুঠিরের খোলা উঠোনের ঠিক মাঝখানে এনে নাজহাকে নিজের পায়ে দাঁড় করিয়ে দেয় তৌসির। চারপাশে এখন কালবৈশাখীর উন্মত্ত আস্ফালন। শোঁ শোঁ বাতাসে ওড়ছে শুষ্ক ধুলো, ঘন কালো মেঘ চিরে হঠাৎ হঠাৎ ঠিকরে পড়ছপ বিদ্যুতের নীলচে আলো। সেই ভৌতিক আলোয় চারপাশটা এক মৃত্যুপুরীর মতো দেখাচ্ছে।
নাজহার বুকটা ছ্যাঁত করে ওঠে। সে দেখতে পায়, সামনে একটা কাঠের চেয়ারে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় একজন মানুষ বসে আছে। লোকটার মাথা হেলে আছে বুকের ওপর, আর মুখটা ঢাকা একটা কালচে কাপড়ের মুখোশে। চিরে নাজহার পাশে এসে দাঁড়ান বিবিজান। তৌসির কোনো কথা না বলে নাজহার হাত ছেড়ে দেয়, আর বিবিজান ওর হাতটা নিজের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরেন। ইয়াদ বিকৃত হাসতে হাসতে এগিয়ে যায় সেই চেয়ারে বাঁধা অসহায় মানুষটার দিকে। ইয়াদের হাতের চকচকে, ধারালো অস্ত্রটা বিদ্যুতের আলোয় একবার ঝিলিক দিয়ে ওঠে। পরক্ষণেই কোনো রকম দ্বিধা ছাড়াই তা বসে যায় লোকটার গলার নরম মাংসে। তার গলা কেটে ফিনকি দিয়ে ছুটে আসা তপ্ত রক্তের ধারায় মিশে যায় কালবৈশাখীর ঠান্ডা হাওয়া। বাতাস মুহূর্তে ভারী হয়ে ওঠে কাঁচা রক্তের বুনো গন্ধে। নাজহা আতঙ্কে, অবিশ্বাসে দুই চোখ বিস্ফারিত করে চিৎকার করে ওঠে, “কী করছেন আপনি এটা!”
সে কাঁপা, ভাঙা গলায় তৌসিরের দিকে তাকিয়ে আকুতি করে বলে, “কী কী হচ্ছে এসব তৌসির? কে উনি? কেন মারছেন ওনাকে?”
তৌসিরের ঠোঁটের কোণে এখন ফুটে ওঠে এক নিষ্ঠুর, ক্রূর হাসি। তার চোখের দৃষ্টিতে একবিন্দু মায়া নেই, বরং সেখানে জ্বলছে প্রতিহিংসা। সে নাজহার কানের খুব কাছে মুখ নিয়ে, বিষাক্ত সাপের মতো ফিসফিস করে বলে
“এটা হইলো আমার লগে গাদ্দারি করার স্পেশাল সারপ্রাইজ শুধু তোর জন্য।”
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই ইয়াদ মৃতপ্রায় লোকটার মুখের বাঁধন আর রক্তে ভেজা কালো মুখোশটা এক প্রবল টানে ছিঁড়ে ফেলে। আর সেই মুখটা উন্মুক্ত হতেই বিদ্যুতের আলোয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে একটা চেনা অবয়ব। সেই মুহূর্তেই নাজহার পায়ের নিচ থেকে পুরো পৃথিবীটা সরে যায়। মাথার ভেতরের শিরা-উপশিরাগুলো একযোগে ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম হয় ওর। চোখের সামনে পুরো জগৎটা এক গাঢ়, জমাট বাঁধা অন্ধকারে ঢেকে যায়,”মাস্টার চা…….চ্চু”
নাজহার গলা থেকে মানুষের স্বরের বদলে বেরিয়ে আসে এক হাড়হিম করা আর্তনাদ। এ আর্তনাদ মনে হয় জবাই করা কোনো পশুর কণ্ঠনালি চিরে বেরিয়ে আসা এক বুকফাটা বিলাপ। নাজহার মাস্টার চাচ্চু কে তারা টার্গেট করেছে নাজহা আর তালুকদার পরিবার কে শাস্তি দিতে কারণ তৌসির জানে নাজহার সবচেয়ে প্রিয় ওর মাস্টার চাচ্চু আর তালহা ভাই। ওয়াসেম এগিয়ে গিয়ে চেয়ারটায় সজোরে একটা লাথি মারে, আর মাস্টার চাচ্চুর নিথর, রক্তাক্ত দেহটা ধুলোয় লুটিয়ে পড়ে। মাটিতে পড়ে শেষবারের মতো দু’হাতে শিকদার বাড়ির মাটি খামচে ধরেন তিনি। তার ঘোলাটে হয়ে আসা চোখ দুটো নাজহার দিকে স্থির থাকে। নাজহা পাথর হয়ে যায়। তার বুকের ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে যায়, আর শ্বাস আটকে আসে। যার সাথে সে সংসারের সপ্ন বুনছিল যাকে সে নিজের অন্ধের যষ্টি ভাবছিল, সেই তৌসির যে তার এত বড় সর্বনাশ করতে পারে এটা সে দুঃস্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেনি। তৌসির এতটা নিষ্ঠুর কবে হইলো তার প্রতি?
অঝোর ধারায় চোখের পানি গড়িয়ে পড়ে তার রক্তমাখা গাল বেয়ে। সে তৌসিরের দিকে তাকায় , ভাঙা গলায়, ডুকরে কেঁদে ওঠে বলে,
“আপনি আপনি আমার সাথে এমন করতে পারলেন তৌসির? আমার চাচ্চুক আমার চাচ্চুকে এভাবে মারতে পারলেন?”
তৌসির বিন্দুমাত্র বিচলিত হয় না। সে পাথরের মতো স্থির দাঁড়িয়ে, তীক্ষ্ণ ও শীতল গলায় জবাব দেয়,”তুই যদি বারবার আমার বিশ্বাস ভাঙতে পারিস, তবে তোর অস্তিত্বকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার অধিকারও আমার আছে।”
নাজহার বুকফাটা কান্নার শব্দে ভারী হয়ে ওঠে শিকদার কুঠিরের বাতাস, কিন্তু সেই হাহাকার কালবৈশাখীর গর্জনে ঢাকা পড়ে যায়। সে তো কোনো বিশ্বাসঘাতকতা করেনি! সে তো কাউকেই কিছু বলেনি! তবে কেন কেন তাকে দেওয়া হয় এমন অমানবিক, কলিজা-ছেঁড়া শাস্তি? এরিমধ্যে আকাশ ভেঙে নামতে শুরু করেছে অবিশ্রান্ত বৃষ্টি। মনে হচ্ছে প্রকৃতি নিজেও আজ কাঁদছে নিঃশব্দে, অঝোরে। কিন্তু সেই বৃষ্টির শব্দও চাপা পড়ে যাচ্ছে নাজহার বুকফাটা আর্তনাদের নিচে। চোখের সামনে নিজের পিতৃতুল্য চাচাকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে দেখে নাজহার ভেতরের পৃথিবীটা কাচের মতো ঝনঝন করে ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। এমন পৈশাচিক, এমন নিষ্ঠুর দৃশ্য সহ্য করার ক্ষমতা তার নরম স্নায়ুর নেই, কোনোদিন ছিলও না। মাস্টার চাচ্চুর কাটা গলা থেকে ফিনকি দিয়ে ছুটছে তাজা, টকটকে লাল রক্ত ঠিক কোনো অভিশপ্ত ঝর্ণার ন্যায়, যা থামতে জানে না। বিবিজান নিজের হাতের বাঁধন আলগা করে দেন তার ঠোঁটের কোণে তৃপ্তির ছায়া খেলে যায়। তিনি নাজহা কে ছেড়ে দেন যাতে নাজহার বুকফাটা আর্তনাদ ছটফটানি, অসহায়ত্ব আরও বেশি উপভোগ্য করতে পারেন সবাই।
ছাড়া পেতেই নাজহা ছিটকে পড়া তীরের মতো ছুটে যায়। এক লাফে আছড়ে পড়ে মাস্টার চাচ্চুর নিথরপ্রায় দেহের ওপর। তার দুই হাঁটু কাদায় ডুবে যায়, ভেজা ওড়নার আঁচল লুটিয়ে পড়ে রক্তের সরোবরে। মাস্টার চাচ্চুর গলার প্রধান ধমনিগুলো ততক্ষণে দ্বিখণ্ডিত উষ্ণ, তাজা রক্ত ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে এসে ভিজিয়ে দিচ্ছে চারপাশের বৃষ্টিতে ভেজা কাদা মাটিকে। এত রক্ত দেখে দিশেহারা নাজহা কোনো উপায় খুঁজে না পেয়ে বন্য, আহত প্রাণীর মতো নিজের কম্পিত দুই হাত দিয়ে মাস্টার চাচ্চুর কাটা গলা চেপে ধরে। সে নিজের শরীর দিয়ে, নিজের রক্ত দিয়ে তার মাস্টার চাচ্চুর ক্ষত বুজিয়ে দিতে চাচ্ছে। চেপে ধরতেই ওর আঙুলের ফাঁক গলে গরম রক্ত গড়িয়ে পড়ে তার কব্জি বেয়ে, কনুই বেয়ে প্রায় মাস্টার চাচ্চুর জীবনটাই ফোঁটায় ফোঁটায় তার হাত থেকে পিছলে যাচ্ছে।
একবুক হাহাকার নিয়ে নাজহা চিৎকার করে কেঁদে ওঠে,
“চা………চ্চু ও মাস্টার চাচ্চু! তোমার কিচ্ছু হবে না, একদম কিচ্ছু হবে না! তোমার নাজহা আছে তো আমি আছি তো! আমি কিচ্ছু হতে দেব না, কিচ্ছু না! তুমি একটু চোখটা খোলো, শুধু একটাবার!”
উন্মাদনা আর অস্থিরতায় হাঁপাতে হাঁপাতে সে নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে মাস্টার চাচ্চুর গায়ের সাদা শার্টটা টেনে ছিঁড়ে নিয়ে কাঁপা কাঁপা হাতে সেই কাপড় ক্ষতস্থানে শক্ত করে পেঁচাতে থাকে, রক্তপাত বন্ধ করার অন্ধ, পাগলপারা আশায়। কিন্তু প্রকৃতির নিয়ম যে বড্ড নিষ্ঠুর, বড্ড বেশিই নির্মম! গলার দুপাশের প্রধান রগগুলো কেটে যাওয়ায় রক্তের অবিরাম ধারা সেই সাদা কাপড়কে মুহূর্তেই গাঢ় লাল করে দেয়। কাপড়টা ভিজে চুপচুপে হয়ে যায়, মনে হচ্ছে সেই কাপড়ও এই মুহুর্তে কাঁদছে রক্তের অশ্রুতে।
মাস্টার চাচ্চুর গলা দিয়ে কোনো স্বর বেরোয় না, শুধু শোনা যায় এক ক্ষীণ, ভাঙাচোরা ঘড়ঘড় শব্দ। উনার ফুসফুসের শেষ অক্সিজেনটুকু ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে আসছে। তিনি কাতর, ঝাপসা, করুণ দৃষ্টিতে তাকান বিধ্বস্ত নাজহার দিকে। চোখের কোণে জমে ওঠে শেষ অশ্রুবিন্দু, কিন্তু সেই অশ্রু গড়িয়ে পড়ে না। তার আদরের নাজহার তার মেয়েটার আজ কী মরণাপন্ন দশা! ফর্সা গালে থাপ্পড়ের কালশিটে নীল দাগ মনে হচ্ছে কেউ ফুলের পাপড়িতে কালি ছিটিয়ে দিয়েছে। ঠোঁট কেটে জমাট বেঁধে আছে কালচে রক্ত। নাজহার চুলগুলো, যেগুলো তিনি নিজের হাতে শততবার আদরে ঠিক করে দিয়েছেন, আজ সেগুলো নির্মমভাবে টেনে এলোমেলো করে দেওয়া হয়েছে, যা এখন কাদায় মাখামাখি আর রক্তে জড়ানো।
আজ বড্ড অপরাধবোধে দগ্ধ হন তিনি। বুকের ভেতর একটা প্রশ্ন বারবার ঘুরপাক খায়, কেন? কেন তিনি এই অভিশপ্ত বিয়েটা হতে দিলেন? কেন হতে দিলেন? এই অপরাধবোধ মৃত্যুর চেয়েও যন্ত্রণাদায়ক, রক্তক্ষরণের চেয়েও তীব্র। উনার সময় ফুরিয়ে আসছে, তিনি বুঝতে পারেন। তার কাঁপতে থাকা, রক্তমাখা হাতটা অশেষ কষ্টে বাড়িয়ে দেন। অতি যত্নে, কোনো ভঙ্গুর কাঁচের পুতুলকে স্পর্শ করছেন ঠিক সেভাবে নাজহার এলোমেলো চুলে শেষবারের মতো আলতো করে হাত বুলিয়ে দেন। সেই স্পর্শে সারাজীবনের জমিয়ে রাখা সমস্ত আদর, সমস্ত স্নেহ, সমস্ত ভালোবাসা ঢেলে দেন।
তিনি নাজহা কো ভাইয়ের মেয়ে নয়,ওকে তিনি নিজের সন্তান হিসেবে অনেক যত্নে বড় করেছেন। প্রথম পা ফেলা শিখিয়েছেন, প্রথম অক্ষর চেনাতে শিখিয়েছেন, ভয় পেলে বুকে টেনে নিয়েছেন। মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার ঠিক আগ মুহূর্তে নিজের মেয়েটাকে এভাবে রক্তে ভেজা মাটিতে ডুকরে কাঁদতে দেখে এই বাবার কলিজা এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে যাচ্ছে। মৃত্যুর চেয়েও নাজহার এই আর্তনাদ এই কঠিন যন্ত্রণায় তার হৃৎপিণ্ড ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে।
নাজহা এবার তৌসিরের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়, এক অসহায়, জখম হরিণীর মতো তাকায়। তার চোখে এখন অহংকার নেই, আর জেদ নেই, আর কোনো অভিমান নেই, আছে শুধু এক বুক হাহাকার, এক সমুদ্র মিনতি। ভেজা চোখের পাপড়ি বেয়ে গড়িয়ে পড়ে নোনা পানি যা মিশে যায় চাচ্চুর তাজা রক্তের সঙ্গে। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে, কাঁপা কাঁপা ঠোঁটে সে আকুতি করে বলে
“আমার মাস্টার চাচ্চুকে বাঁচান না, তৌসির! আপনার পায়ে পড়ি, আপনার। আমি সব ভুলে যাব, সব, সবকিছু। আপনার সব অন্যায়, সব নিষ্ঠুরতা কিচ্ছু মনে রাখব না, কসম! শুধু আমার চাচ্চুকে বাঁচান দয়া করুন একটাবার।”
নাজহার কণ্ঠস্বরে যে আর্তি, যে অসহায়ত্ব, তা পাথরকেও গলিয়ে দিতে পারে। তৌসির এক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়ায়। সে ঠোঁট নাড়িয়ে কিছু বলতে যাচ্ছিল,ঠিক তখনি বিদ্যুতের গতিতে ইয়াদ নিজের পিস্তল বের করে আনে। কালো ধাতব নলটা মুহূর্তে তাক করে মাস্টার চাচ্চুর বুকের ঠিক মাঝখানে,
“তোদের মতো গাদ্দারদের ক্ষমা করার কোনো মানে হয় না। মৃত্যুটাই একমাত্র শাস্তি।”
আর তারপর পিস্তল চালিয়ে দেয় উনার বুক বরাবর বুলেট বিদ্ধ হওয়ার সাথে সাথে মাস্টার চাচ্চুর বুক থেকে নতুন করে ছিটকে ওঠে রক্তের ফোয়ারা, উনার শরীর একবার মৃদু কেঁপে ওঠে। তিনি শেষবারের মতো একটা দীর্ঘ, ক্লান্ত নিঃশ্বাস ছাড়েন, যে নিঃশ্বাসে মিশে আছে অজস্র অপূর্ণ স্বপ্ন, অসংখ্য না-বলা কথা, একরাশ ভালোবাসা, এক বুক ক্ষমাপ্রার্থনা। প্রাণপাখি চিরতরে উড়ে যায় তার গন্তব্যে। নাজহার মাথায় রাখা উনার স্নেহের হাতটা, যে হাত একদিন তাকে অক্ষর চেনিয়েছিল, অংক শিখিয়েছিল, মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়িয়েছিল, সেই হাতটা ধপাস করে আছড়ে পড়ে নাজহার রক্তভেজা কোলে। নিথর নিস্পন্দ হয়ে চিরতরে। এই দৃশ্য দেখে নাজহার পৃথিবী এক পলকে স্তব্ধ হয়ে যায়। সময় থেমে যায় ওর জন্য।তার নিজের হৃদস্পন্দন থেমে যায়।
তারপর এক মুহূর্ত পরেই গলার শিরা ফুলিয়ে এক তীব্র, পশুর মতো আর্তনাদ বেরিয়ে আসে ওর বুক চিরে, এমন এক আর্তনাদ যা এক মা-হারা, বাবা-হারা সন্তানের অস্তিত্বের শেষ চিৎকারের আর্তনাদের ন্যায় যন্ত্রণাদায়ক।
মাস্টার চাচ্চুর নিথর, ঠান্ডা হাতটা সে দুই হাতে আঁকড়ে ধরে। ঝাঁকাতে থাকে। বারবার, অবিরত, পাগলের মতো ঝাঁকাতে থাকে। নাজহার মনে হয়, কেউ তার সযত্নে সাজানো ছোট্ট পৃথিবীটাকে নির্মম পায়ে মাড়িয়ে দিয়েছে। তার শৈশব, তার নিরাপত্তা, তার আশ্রয়, তার ভরসার মানুষটা, সব এক পলকে ধুলোয় মিশে গেছে। বুকের ভেতর এক অবর্ণনীয়, ভাষাহীন যন্ত্রণা দুমড়ে-মুচড়ে ওঠে। ওর কাছে মনে হয় ওর পাঁজরের হাড়গুলো একটা একটা করে ভেঙে গুঁড়িয়ে যাচ্ছে।ওর হৃৎস্পন্দন থমকে গেছে নাজহার মনে হচ্ছে নিজেও চাচ্চুর সাথে চলে যেতে। দাঁতে দাঁত চেপেও সে কান্না আটকাতে পারে না।
ওর প্রিয়তম মানুষটা, ওর পিতৃতুল্য চাচা আর নেই!
ঝুম বৃষ্টির মধ্যে উনার গাঢ় লাল রক্ত ধীরে ধীরে উঠোনের কাদা মাটির সাথে ধুয়ে মিশে যাচ্ছে। প্রকৃতিও উনাকে নিজের বুকে টেনে নিচ্ছে। মাটিও আজ পান করছে এক নির্দোষ মানুষের শেষ রক্তবিন্দু। পুরোপুরি শোকাচ্ছন্ন, দিগ্বিদিকশূন্য, উন্মাদপ্রায় নাজহা উনার নিথর দেহটা ধরে অবিরাম ঝাঁকাতেই থাকে। আকাশের বুক চিরে যাওয়া বিজলির চকিত আলোয় ওর চোখের সামনে মাস্টার চাচ্চুর রক্তমাখা মুখটা ক্ষণে ক্ষণে আলোকিত হয়ে ওঠে,
বিজলির গর্জনের সাথে তাল মিলিয়ে নাজহা প্রলাপ বকতে শুরু করে,
“মাস্টার চাচ্চু ও মাস্টার চাচ্চু! তুমি ওঠো না, প্লিজ ওঠো! এভাবে শুয়ে থেকো না, আমার ভয় লাগে! ও চাচ্চু, কেন কথা শুনছ না আমার? কেন? আমি তোমার ছোট্ট নাজহা না? একটাবার চোখ খোলো, শুধু একটাবার! তুমিই তো বলতে, আমি নাকি তোমার মা! মায়ের কথা ছেলে শুনবে না বুঝি? আগামী মাসেই তো আমার ফাইনাল এক্সাম, মাস্টার চাচ্চু! তুমি ছাড়া কে আমায় পড়াবে বলো? তুমি না পড়ালে তো আমি পাস করতে পারব না! আমি ফেল করে যাব, মাস্টার চাচ্চু! আল্লাহর কসম, আল্লাহর কসম খেয়ে বলছি মাস্টার চাচ্চু, তুমি যদি এই একটাবার চোখটা খোলো, আমি আর কোনোদিন তোমার অবাধ্য হব না। মন দিয়ে পড়াশোনা করব, আর কখনো জেদ করব না।
ওঠো না, প্লিজ ওঠো! এই ছেলে, ওঠো! এই যে শুনছ? ওঠো বলছি! ও মাস্টার চাচ্চু… ওঠো না মাস্টার চাচ্চু… ওঠো.
নাজহার কণ্ঠস্বর ক্রমে ক্ষীণ হয়ে আসে। প্রলাপ মিশে যায় ফোঁপানিতে। ফোঁপানি মিশে যায় বৃষ্টির শব্দে। বৃষ্টির শব্দ মিশে যায় এক নিঃসীম, অসীম শূন্যতায়।
উঠোনের কাদা মাটিতে, রক্তের সমুদ্রে, এক বাবা সমান চাচার নিথর দেহ জড়িয়ে এক মেয়ে পড়ে থাকে।
নাজহার এই আর্তনাদ ঝমঝমিয়ে নামা বৃষ্টির জল্লাদ-পর্দা ভেদ করে হঠাৎই এক বুকফাটা আর্তনাদ আকাশ আর বাতাসকে চিরে দুভাগ করে দেওয়া আর্তনাদের ন্যায়। এমন তীক্ষ্ণ হাহাকার শুনলে পাষাণ পাহাড়ও বুঝি গলে পানি হয়ে যাবে। কিন্তু নাজহার এই প্রলয়ংকরী কান্না শুনে সাড়া দেওয়ার মতো আর মাস্টার চাচ্চু বেচে নেই। মাস্টার চাচ্চু, আর শ্বাস ফেলছেন না। উনার প্রশস্ত বুকটা চিরতরে স্থির হয়ে গেছে। উনার যে ঠোঁট দুটো এতদিন আদর শাসন স্নেহের কথা বলেছে, সেগুলো আজ মৃত্যুর কঠিন তালা মেখে চিরমৌন হয়ে আছে।
নাজহা উনার নিথর এবং বরফের মতো ঠান্ডা দেহটার বুকে কপাল ঠেকিয়ে পাথরের মূর্তির মতো বসে। মনে হচ্ছে কেউ তার জ্যান্ত দেহ থেকে আত্মাটাকে নির্মমভাবে ছিনিয়ে নিয়ে গেছে এবং কাদার ওপর ফেলে রেখে গেছে এখানে বসা শুধু এক রক্ত-মাংসের শূন্য খোলস। একহাতে সে মাস্টার চাচ্চুর রক্তভেজা শার্টের কাপড় খামচে ধরে নেয়। অন্যহাতে সে ভেজা কাদা-মাটি খামচে ধরে। সে এখন এই মাটিটাকেই শাস্তি দিতে চায়, কেন এই মাটি তার মাস্টার চাচ্চুর শরীরের এতগুলো তাজা রক্ত শুষে নিল। পাগলের মতো, এক বিকারগ্রস্ত উন্মাদিনীর মতো চিৎকার করতে থাকে,
“মাস্টার চাচ্চু, ওঠো! ও মাস্টার চাচ্চু, একবার ওঠো! তুমি ওঠো, আমি এখনই, এই এক্ষুনি তোমার সাথে চলে যাব। মাস্টার চাচ্চু একটিবার শুধু চোখ মেলো! তোমার রুমটা আমি নিজের হাতে গুছিয়ে দেব রোজ। তোমার সব কাজ আমি করে দেব। তুমি দেরি করে বাড়ি ফিরলে আমি গেট খুলে দাঁড়িয়ে থাকব তোমার অপেক্ষায়। ওঠো না, মাস্টার চাচ্চু, আর একটিবার, মাত্র একটিবার কথা বলো আমার সাথে! ওরা তোমায় কেন মারল কেন মারক? আমার কলিজাটা ছিঁড়ে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে তোমায় এভাবে দেখে। ওঠো না, আমার মাস্টার চাচ্চু।”
নাজহা ডুকরে কেঁদে ওঠে এমনভাবে মনে হচ্ছে যে তার বুকের পাঁজরগুলো একটা একটা করে সশব্দে ভেঙে পড়ছে। তার চোখ গড়িয়ে নামা অশ্রু ফুটন্ত লাভা হয়ে গাল পুড়িয়ে দিচ্ছে। সে কাঁপা কাঁপা রক্তমাখা হাতে উনার কপালে আলতো করে হাত বুলিয়ে দেয়, ঠিক যেমনটা মা তার ঘুমন্ত শিশুকে মায়ায় আদর করে। ভাঙা এবং ফাটা গলায় সে ফিসফিস করে বলতে থাকে,
“তুমি তো আমার সন্তানের মতো মাস্টার চাচ্চু! আমি তো তোমায় কোনোদিন নিজের চাচা ভাবিনি। আমি তো তোমায় নিজের পেটের ছেলে মনে করতাম, ঠিক যেমন তুমি আমায় তোমার নিজের কন্যাসন্তান ভাবতে। ওঠো না, মাস্টার চাচ্চু! তালুকদার বাড়ির কত মানুষের এখনো তোমার থেকে অক্ষর চেনার বাকি। ওঠো না, চাচ্চু, ওঠো না! আমি তোমার পায়ে পড়ি, একবার ওঠো। ওঠো মাস্টার চাচ্চু।
নাজহা এখন পুরোপুরি উন্মাদ, অবশ এবং বোধশূন্য। তার শরীরের প্রতিটি স্নায়ু একসাথে ডুকরে কাঁদছে। তার মাস্টার চাচ্চু তো একজন চাচা ছিলেন না, তিনি ছিলেন তার জীবনের শ্রেষ্ঠ আশ্রয়। ছোট্ট ছোট্ট পায়ে স্কুলে যাওয়ার পথ চেনানো থেকে শুরু করে কলেজের চৌকাঠ পার করা পর্যন্ত প্রতিটি কদমে এই মানুষটা তার ছায়াসঙ্গী হয়ে ছিলেন। ছোট বেলার কথা বাদি দেওয়া যায় বড় হওয়ায়র ছোট্ট দুধের শিশুর মতো আগলে রেখে নিজের হাতে তাকে ভাত মেখে খাইয়ে দিতেন তিনি।এই স্বার্থপর দুনিয়াতে এমন নিঃস্বার্থ চাচা কি আর একটাও আছে? সারা পৃথিবী খুঁজলেও কি এমন কাউকে পাওয়া যাবে?
বিয়ের দিনের কথা মনে পড়ে যায় তার। কাজী সাহেবের সামনে সই করতে গিয়ে যখন নাজহার হাতটা থরথর করে কাঁপছিল, অজানা ভবিষ্যতের আশঙ্কায় বুকটা দুরুদুরু করছিল এবং চোখের কোণে জমে উঠছিল লুকানো পানি। তখনও এই মাস্টার চাচ্চুই স্নেহে তার মাথায় ভরসার হাতটা রেখে বলেছিলেন, ভয় কী রে? তোর মাস্টার চাচ্চু তো আছেই। উনার ভালোবাসার গভীরতা মাপার মতো কোনো দাঁড়িপাল্লা এই দুনিয়ায় তৈরি হয়নি এবং হবেও না কোনোদিন।
ছোটবেলার সেই দুপুরগুলোর কথা মনে পড়ে। পাশে বসে ভাত খাওয়ার সময় যখন অবুঝ শিশু নাজহা খেলার ছলে চাচ্চুর প্লেটে নিজের ছোট্ট পা তুলে দিত, তিনি একটুও রাগ করতেন না। বরং আলতো হেসে পা-টা সরিয়ে দিয়ে অবলীলায় সেই ভাত মুখে তুলে নিতেন। নাজহার নিজের জন্মদাতা বাবাও তাকে কোনোদিন এতটা ভালোবাসেননি। যতটা মমতায় বুকের মধ্যে আগলে রেখেছেন তার মাস্টার চাচ্চু। দুনিয়ার কোন চাচা ভাতিজির জন্য নিজের সমস্ত জীবন এভাবে হাসি মুখে উৎসর্গ করে দেয়? কেউ দেয় না, কেউ না!
নাজহা যেদিন কলেজে যেত, এই মানুষটা ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকিয়ে অভিভাবকদের কামরায় চাতক পাখির মতো বসে থাকতেন। এক প্রহর, দুই প্রহর, তিন প্রহর পার হয়ে যেত। নয়তো ক্লান্ত পা টেনে টেনে টাউনের অলিতে-গলিতে চক্কর কেটে বেড়াতেন। ছুটি হওয়ার পর তাকে নিজের সাথে নিয়ে তবেই বাড়ির পথ ধরতেন। তিনি এসব করতেন ওকে একা যেতে দিতেন না বলতেন,
“আমার নাজহা একা লোকাল গাড়িতে আসতে গেলে যদি ভয় পায়? যদি ভিড়ে পথ গুলিয়ে ফেলে? যদি কেউ আমার মেয়ের দিকে বাজে নজরে তাকায়? না না, চাচ্চু থাকতে এসব হতে দেব না।”
নাজহার কোনো ছোট্ট আবদার মাস্টার চাচ্চু কোনোদিন ফিরিয়ে দিয়েছেন, এমন একটিও নজির এই জীবনে নেই। ছোটবেলায় শপিংয়ে গিয়ে সে যা ছুঁয়ে দিত, যেদিকে চোখ পড়ত, তা-ই যত্নে তার ঝুলিতে এসে পড়ত। পকেটে টাকা না থাকলে অপরিচিত মানুষের কাছেও মাথা নিচু করে ঋণ করতেন। তবু ভাতিজির মুখের একটুকরো মলিনতা তিনি সহ্য করতে পারতেন না। আর আজ সেই মাস্টার চাচ্চু কে নিজের চোখের সামনে ধুঁকে ধুঁকে রক্তস্রোতে ভেসে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে দেখে নাজহার কলিজাটা কি আর আস্ত আছে? না নেই। সেট টুকরো টুকরো হয়ে এই জঘন্য কাদা-জলে মিশে গেছে।
উপস্থিত সবাই এই রোদনমত্ত শ্রাবণের প্রবল ধারার মাঝে পাথরের মূর্তির মতো নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে। তারা দেখছে এক জীবন্ত লাশের বুকফাটা হাহাকার। কারো গলায় কথা নেই, চোখে পলক নেই, মনে আছে তৃপ্তি। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো আকাশের অশ্রু হয়ে নাজহার কাঁধে ঝরে পড়ছে। প্রকৃতিও তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার কোনো ভাষা খুঁজে পাচ্ছে না।
উপস্থিত সবাই খুশি হলেও তৌসিরের বুকের ভেতরটা এখন এক জ্বলন্ত কয়লার চুল্লি। সে ভেতরে ভেতরে দাউদাউ করে পুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছে, অথচ তার বাইরের চেহারায় এক বরফশীতল মুখোশ আঁটা ধরে রেখেছে। নাজহার ওপর তার প্রচণ্ড রাগ এবং এক তীব্র অভিমান-মাখা ক্ষোভ ফুঁসছে ঠিকই। কিন্তু ওর এই বুকফাটা চিৎকার তৌসিরের নিজের কলিজাটাকেও তীক্ষ্ণ ছুরি দিয়ে কেটে কুচি কুচি করে দিচ্ছে।
নাজহা টলমল পায়ে শরীরের শেষ সঞ্চিত শক্তিটুকু বাজি রেখে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। কিন্তু তার শরীর আজ ভীষণ অবাধ্য। হাত-পা থরথর করে কাঁপছে ঠিক ঝড়ের মুখে পড়া শুকনো পাতার মতো। তীব্র মানসিক আঘাত আর শারীরিক ধকল সইতে না পেরে তার ফর্সা নাকের ছিদ্র দিয়ে টপটপ করে তাজা লাল রক্ত ঝরে পড়তে শুরু করেছে। সেই রক্তের ফোঁটাগুলো বৃষ্টির স্বচ্ছ পানি মিশে গোলাপি রং তৈরি করে কাদায় হারিয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে প্রকৃতিও তার এই ভয়ংকর বেদনার সাক্ষী হয়ে অঝোরে রক্তাশ্রু ফেলছে।
এই বিধ্বস্ত, রক্তাক্ত এবং ভগ্নপ্রায় অবস্থাতেই নাজহা হেঁচড়াতে হেঁচড়াতে গিয়ে দাঁড়ায় তৌসিরের ঠিক মুখোমুখি। শূন্য এবং প্রাণহীন চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে আচমকা পাগলিনীর মতো সজোরে তৌসিরের কলার দু’মুঠোয় চেপে ধরে সে। তারপর এক বীভৎস বিকারগ্রস্ত উন্মাদিনীর মতো হু হু করে হেসে ওঠে,
“তোদের খুব আনন্দ হচ্ছে, তাই না? খুব শান্তি পাচ্ছিস বুকের ভেতর? আমার সন্তান-সমান চাচাকে চিবিয়ে চিবিয়ে খেয়ে তোদের বুকে খুব উল্লাস হচ্ছে, না রে? আমার চাচ্চু কে কেড়ে নিয়ে তোরা কী এমন রাজ্য জয় করলি বল তো? কী এমন প্রতিশোধ নিলি? আমার দিকে তাকা, তৌসির শিকদার। আমার এই রক্তাক্ত মুখের দিকে একবার তাকা।”
তৌসির পাথরের মূর্তির মতো ভাবলেশহীন মুখে দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু তার কণ্ঠস্বরটা এবার তার সাথেই বিশ্বাসঘাতকতা করে বসে। নিজের অজান্তেই তার গলা কেঁপে ওঠে। সে রুক্ষ এবং কর্কশ গলায় জবাব দেয়,
“হ্যাঁ, হচ্ছে! আনন্দ হবে না কেন? আর এই সবকিছুর জন্য ছিনাল তুই-ই দায়ী! তোর জিভ্বার অসংযমের জন্যই আইজ এই পরিণতি! মাগি গিরি করতাছোস এখন? কান্না চু***দাও?”
নাজহা তৌসিরের কলার আরও শক্ত করে মুচড়ে ধরে। মনে হয় সে এই মুঠোতেই সমস্ত পৃথিবীর প্রতি তার জমানো ঘৃণা ঢেলে দেবে। এবার সে ডুকরে কেঁদে ওঠে এমনভাবে যেমন করে একটা মা তার মৃত সন্তানের লাশের ওপর আছড়ে পড়ে অন্তিম আর্তনাদ করে,
“আমি কাউকে বলিনি! খোদার কসম, আমি কাউকে কিচ্ছু বলিনি! আমি বললাম তো একশোবার, হাজারবার। আমি কাউকে কিচ্ছু বলিনি! আমি তো এবার সত্যি সত্যিই অতীতের সব গ্লানি ভুলে, সব অপমান গিলে আপনার মতো একটা পশুর সাথে নতুন করে সংসার পাততে চেয়েছিলাম। সব কষ্ট চেপে আপনার ঘর আলো করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আপনি? আপনি তো একটা পশুর চেয়েও অধম, পশুরাও আপনার চেয়ে ভালো! আপনি একটা আস্ত জানোয়ার, একটা রক্তচোষা শয়তান!”
তৌসিরের চোখ দুটো এবার গনগনে আগুনের মতো লাল হয়ে ওঠে,
“তুই না বললে আমাদের এই গোপন কথা আর কে বলবে তোর বাপ চাচা কে? নাটক চুদাইস না। ”
নাজহা কাঁদতে কাঁদতেই অগ্নিগিরির মতো ফেটে পড়ে। তার গলা থেকে রক্তমাখা জ্বলন্ত শব্দ বেরিয়ে আসে,
“আপনি আমার আত্মাকে মেরে ফেলেছেন, তৌসির! আপনি আজ আমাকে জ্যান্ত কবর দিয়েছেন! আমি আমার চাচ্চুর খুনিকে এই পারে কি পরপারেও মাফ করব না। আপনি চাইলেই পারতেন উনাকে বাঁচাতে। কিন্তু আপনি বাঁচাননি, ইচ্ছে করে বাঁচাননি! তাই আমিও আপনার সবচেয়ে প্রিয় জিনিসটাকে এই পৃথিবীর মুখ দেখতে দেব না।”
কথাটা শেষ হতে না হতেই নাজহা আবারো এক আহত বাঘিনীর মতো গলা ফাটিয়ে আকাশ-পাতাল কাঁপিয়ে চিৎকার করে ওঠে,
“আমার বাপ আর ফুফু, হ্যাঁ, ওরাই এসব নোংরা ষড়যন্ত্র করেছে, আমি মানি! কিন্তু খোদার কসম, আমি ওদের কিচ্ছু বলিনি, একটা অক্ষরও বলিনি, একটা বর্ণও না! তোরা আমার ওই পাপী জন্মদাতাকে আমার বাপ শয়তান কেন মারলি না, বল? তোরা যদি আজ আমার ওই অমানুষ বাপটাকে মেরে ফেলতি, আমার বুকে এতটা ব্যথা হতো না, তৌসির শিকদার! একটুও হতো না! আমার কলিজা পুড়ে দগ্ধ ছাই হয়ে যাচ্ছে তোদের এই পৈশাচিক নিষ্ঠুরতা দেখে। তোরা আমার সন্তানকে মারলি! না না, তুই, তুই-ই মেরেছিস উনাকে।। তাই আমিও তোর রক্তের বীজকে দুনিয়ার আলো দেখতে দেব না। আমার গর্ভে তোর মতো এক জানোয়ারের যে নিষ্পাপ অস্তিত্ব ধুকধুক করে স্পন্দিত হচ্ছে, তা আমি আর এক মুহূর্তও রাখব না! তোর সন্তানকে আমি আমার এই পেটের মধ্যেই পিষে পিষে মেরে ফেলব!”
‘সন্তান’, মাত্র এই একটি শব্দ তৌসিরের কানে আছড়ে পড়ে বজ্রপাতের মতো। তার মাথার ভেতরে কেউ মনে হচ্ছে একসাথে হাজারটা মৃত্যুঘণ্টা বাজিয়ে দিল। তার সারা শরীর রি রি করে কেঁপে ওঠে। মনে হচ্ছে কেউ তাকে হাজার ভোল্টের বিদ্যুতের তারে ছুঁয়ে দিয়েছে। তৌসির আতঙ্কে, কাঁপা কাঁপা থরথরে হাতে নাজহার রক্তাক্ত নাকের ওপর থেকে গড়িয়ে পড়া রক্তের ধারাটা মুছে দিতে যায় কিন্তু নাজহা ওর থেকে মুখ সরিয়ে নেয়। তৌসির কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করে,
“স সন্তান? তু-তুই তুই মা হতে চলেছিস? নাজহা, সত্যি কথা ক?”
নাজহা এবার এক উন্মাদিনী পাগলিনীর মতো ভয়ংকর অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে। সেই হাসিতে কোনো সুখ নেই, কোনো আনন্দ নেই। সেখানে আছে শুধু এক অন্তহীন নরকযন্ত্রণার আর্তনাদ
“হ্যাঁ! হ্যাঁ আমি প্রেগন্যান্ট! শুনলি? আবার বলব? আমি প্রেগন্যান্ট, আমার পেটে তোর সন্তান বেড়ে উঠছে! কিন্তু বিশ্বাস কর তৌসির শিকদার, আজ এই কসম খাচ্ছি। তোর এই পাপের ফসলকে, এই অভিশপ্ত বীজকে আমি কোনোদিন, কোনোদিন পৃথিবীর আলো দেখতে দেব না! এই কীটকে আমি আর এক মুহূর্তও বাড়তে দেব না আমার গর্ভে। আমি তোর সন্তানকে নিজের হাতে হত্যা করব, নিজের নখ দিয়ে আঁচড়ে আঁচড়ে বের করব। তোর মতো একটা পশুর, একটা খুনির রক্ত আমি আমার পেটে বয়ে বেড়াব না, কখখনো না! এই পাপ, এই অভিশাপ আমি আমার ভেতরেই কবর দেব। তুইও আমার মতো সন্তান-শোকে রাত-দিন কাতরাবি, তৌসির শিকদার! একদিন তুইও ঠিক কাতরাবি! যখন তোর নিজের সন্তানের নিষ্পাপ অস্তিত্ব লাল রক্ত হয়ে আমার পা বেয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে মাটিতে মিশে যাবে, তখন তুইও এই মাটির বুকে বসে আমার মতো হাউমাউ করে কাঁদবি, বুক চাপড়াবি, চুল ছিঁড়বি। আর আমি দূর থেকে স্থির দাঁড়িয়ে তোর সেই ধ্বংসযজ্ঞ দেখে, তোর সেই হাহাকার দেখে পৈশাচিক আনন্দে উল্লাসে মাতব!”
কথাগুলো বলতে বলতে নাজহা আর নিজের শরীরের ভারসাম্য রাখতে পারে না। তার চিৎকারের শেষ শব্দটা, সেই অভিশাপের শেষ অক্ষরটা তার গলাতেই চিরতরে থেমে যায়। আটকে যায় রুদ্ধ কণ্ঠনালীতে। তার কালচে সবুজ চোখের মণি দুটো ধীরে ধীরে উল্টে যেতে থাকে এবং পলকগুলো বড্ড ভারী হয়ে আসে। তারপর এক টুকরো বাতাসে কাটা কলাগাছের মতো, এক প্রাণহীন ছেঁড়া পুতুলের মতো সে নিঃশব্দে ঢলে পড়ে অন্ধকারের কোলে। বৃষ্টির জমা ঘোলা জলে সজোরে আছড়ে পড়ে জ্ঞান হারায় নাজহা। তার রক্তাক্ত মুখটা কাদায় মিশে যায় এবং ভেজা চুলগুলো পানি ওপর ভাসতে থাকে এক ছিন্নভিন্ন রক্তাক্ত স্বপ্নের মতো।
তৌসির পুরোপুরি স্তব্ধ, নিথর এবং নিস্পন্দ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। মনে হচ্ছে কেউ তাকে এক জাদুমন্ত্রে পাষাণ পাথর বানিয়ে দিয়েছে। ওর মনে হচ্ছে ওর মাথার ওপরের আকাশটা ভেঙে চুরমার হয়ে তার মাথায় পড়ছে। পায়ের নিচের শক্ত মাটিটা সরে সরে যাচ্ছে কোনো এক অজানা অন্ধকার গহ্বরে। তার সাজানো-গোছানো, এত যত্নে গড়া সুন্দর সংসারটা আজ এক নিমেষেই, এক চোখের পলকে শ্মশান-ভূমি হয়ে গেল! যে স্বপ্নের অট্টালিকা সে রাতের পর রাত জেগে তিল তিল করে গড়ে তুলেছিল, তা আজ ধুলোয় গুঁড়িয়ে ছাই হয়ে গেল।
সে তো ঠিক এই দিনটার ভয়েই, এই ভয়ংকর মুহূর্তটার আতঙ্কেই এতদিন বুকের ভেতর কুঁকড়ে ছিল, কাঁটা হয়ে ছিল। আর আজ তার সেই সাধের, যত্নের সুখের সংসারটাই এক ভয়ানক অভিশাপ হয়ে, এক বিকট রক্তচক্ষু দানব হয়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে এবং দাঁত খিঁচিয়ে হাসছে। সে জানে, সে হাড়ে হাড়ে জানে, নাজহা তাকে এই জীবনে তো নয়ই পর পারেও হয়তো ওকে মাফ করবে না। এই ক্ষতের কোনো মলম দুনিয়ার কোনো হাকিম তৈরি করতে পারবে না।
কিন্তু তৌসিরই বা কী করত, কী করার ছিল তার? বারবার যে মেয়েটার কাছে সে বিশ্বাস ভেঙেছে, আঘাত পেয়েছে এবং প্রতারিত হয়েছে, তাকে সে আবার কোন সাহসে, কোন ভরসায় বিশ্বাস করত? অথচ আজ তৌসিরের বুকের ভেতরটা এক তীব্র অনুশোচনায়, এক অসহ্য জঘন্য অপরাধবোধে চৌচির হয়ে ফেটে যাচ্ছে। তার অন্তরাত্মা চিৎকার করে, গলা ফাটিয়ে তাকে ধিক্কার দিয়ে বলছে, নাজহা সত্যি কাউকে কিছু বলেনি রে, তৌসির! তুই অন্ধ, তুই বধির! যদি বলতই, তবে অতীতের অন্য সব দোষের মতো এটাও সে বুক ফুলিয়ে, গর্বের সাথে তোর মুখের ওপর স্বীকার করে নিত। কারণ নাজহা ধরা পড়ে গেলে শিকার করে নিত। তৌসিরের একবার মনে হয় নাজহা বিশ্বাস ভেঙেছে আবার মনে হয় ভাঙ্গেনি ও বলেনি।
আকাশছোঁয়া হাহাকার আর বুকভাঙা আর্তনাদে তৌসির হাঁটু ভেঙে কাদা-মাটির বুকে ধপ করে বসে পড়ে। কাঁপা কাঁপা হাতে বৃষ্টির কাদার মাঝ থেকে নাজহার অচেতন, কাদামাখা শরীরটাকে আলতো করে কোলে তুলে নেয়। ঠিক যেমন কেউ মায়ায় ভাঙা কাচের পুতুলকে তোলে নেয়। নিজের বুকের সাথে নাজহাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে যায়। বিবিজান কড়া গলায় ওকে নির্দেশ দেন, “এই বিশ্বমাগিকে ভেতরে নিয়া যা! ওর কাপড় বদলে দে, আমি ডাক্তার আনতেছি। দেখি, সত্যি সত্যি ও প্রেগন্যান্ট কি না! আর যদি কথাটা মিথ্যে হয়, তাহলে আজ সারারাত ওরে ধরে ঠা*** দেখবি মাগি এমনিই প্রেগন্যান্ট হইয়া যাইব একটা বাইচ্চা এখন তোর প্রয়োজন। অনেক হইছে, ওর প্রতি আর কোনো করুণা না ও অনেক বিশ্বাস নিয়া খেলছে!”
তৌসির কোনো কথা বলে না। একদম পাথরের মতো নিশ্চুপ হয়ে একবার ইয়াদ আর ওয়াসেমের দিকে তাকায়। ওর নিশ্চল দৃষ্টি আর্তনাদ করে বলতে চায়, ‘তোরা আমার সুখটা কেড়ে নিলি রে! আমার এক চিমটি সুখ ছিল, সেটাও তোরা শেষ করে দিলি!’
কিন্তু ওর মুখ দিয়ে টুঁ শব্দটিও বের হয় না। ও চুপচাপ নাজহাকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ির ভেতরে চলে যায়।
এরপর বিবিজান ইয়াদ আর ওয়াসেমের দিকে ফিরে বলেন, “তোরা এখানে দাঁড়িয়ে থেকে কী করবি? তাড়াতাড়ি ঘরে আয়। বৃষ্টি থামলেই এর লাশটা পোড়াতে হইবো।”
কেমন হতে চলেছে তাদের আগামী পর্বটা?
নাজহার অবস্থাই বা শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?
স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৫২
সে কি সত্যিই তাদের বাচ্চাটাকে পৃথিবীর আলো দেখাবে, নাকি পরিস্থিতি তাকে অন্য কোনো সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করবে?আর এই পুরো ঘটনার মধ্যে আপনাদের কাছে সবচেয়ে বেশি দোষী কাকে মনে হয়েছে? যদি রেসপন্স না আসে তাহলে আগের মতো লেট লতিফ হয়ে যাব। তাই আপনাদের হাতে সব তাড়াতাড়ি পরের পর্ব অবশ্যই দিব যদি রেসপন্স পাই

Ata k korece. Amr mone hoina nazha korece.. Doya kore apu plsssss sad ending diyenna. Apnr pa dore bolci
Plsss sad ending diyen na nitw parbona sad ending
Next part please
Apu nest part ta taratari diyen plz 😭🙏🏻
Taratari next part deo plz plz plz
next part taratari diben please
Apu sob Thik kore den pls.pls pls
প্লিজ আপু একটু তারা তারি দেও পরের পর্বটা কেমন জানি লাগছে বাচ্চা কে সত্যি পৃথিবীর মুখ দেখতাতে দিবে না নাজহা 🥺
পরের পর্বের জন্য অপেক্ষা আছি। তাড়াতাড়ি দিয়েন আপু।
আপু তুমি নিজেই ও জানো এই একটা পর্বের জন্য কতো অপেক্ষা করি প্লিজ তাড়াতাড়ি দাও আর হ্যাঁ আপু আজকে আমার পরিক্ষা তারপর ও পরেছি তাহলে ভাবো আমার কতো প্রিয় এই উপন্যাস
বিবিজান এর, প্লিজ আপু তৌসির আর নাযহার সুন্দর একটা সংসার হোক, তৌসির এর জীবনটা কষ্টে ভরপুর তাকে বাবা ডাক টা শুনতে দেও
Plzz nextt 🥲🥲🥲
Apnk e sobceye besi doshi mne hoiece….ebave bashh ta na dileo parten…..tobe taratarii porbo gula duiyen..😐🙂
Ekta somporke biswas thakata khub joruri kintu ekane tausir najhake onek bar biswas korechilo kintu najha sei biswas bhenge diyechilo . Kintu ei bar najha kichu koreni kintu eto bar biswas bhangar por hoyto tausir at najhake biswas korte pareni . Amar mone hoy tausir er dik theke hoyto or eta bhaba sabhabik . Kintu najhar songe prothom theke ja hoyeche segulo bhul chilo.
অনেক ভালো
আপু তৌসির এর ভুল বেশি
Apu plz next part taratari daw plzzzz apu🥹
Plzz next apuuu plzzz…🥹
apu please next Part taratari dibea🤌🤌
Nowmi e bolse maybe
Are apu ektu taratari diye den na…
sad ending diyo na api nite parbo na.. ei porbo dekhe e obostha kharap hoye geche 🙂💔
Amar mone hoy najaha bacca ta ke mere tousir ke bujiye dewk apon jon haranur koto ta kosto 🙂