Home হাওয়াই মিঠাই হাওয়াই মিঠাই পর্ব ২৭

হাওয়াই মিঠাই পর্ব ২৭

হাওয়াই মিঠাই পর্ব ২৭
তামান্না ইসলাম শিমলা

“,তেহরাব এসব কি হচ্ছে?”
বাবার কথায় কোনো জবাব দিল না তেহরাব, একমনে খাচ্ছে সে। কিছুসময় চুপ থেকে বলল,
“ তুমি জানো আমি এদের দুজনকে পছন্দ করি না, তারপরেও এরা রয়েছে। সব ঠিক আছে, কিন্তু আমার স্ত্রীকে অপমান করার অধিকার তাদের কে দিয়েছে? খেয়ে দেয়ে বিদায় করো, বাইরে গাড়ি দাঁড় করিয়ে রেখেছি!”
ইউসুফ কিছু বলল না, নিজেই খেতে লাগল। তাসলিমা রান্নাঘর থেকে পানি এনে টেবিলে রাখল, তেহরাব সকালের ঘটনা তাকে বলেছে। সেও বা কি করবে? সম্পর্কে তো সৎ মা, মা মারা যাওয়ার পর রঙমালাকে বিয়ে করে আনে তাসলিমার বাবা। তাসলিমার বয়স তখন বারো, রঙমালা ডিভোর্সি ছিলেন, তার একটা ছেলেও ছিল তেরো বছরের। তাসলিমার বাবার সাথে তার বিয়ের পর আরেকটি ছেলে হয়, তবে রাত্রি তার আগের ঘরের ছেলের মেয়ে। তেহরাবের সাথে বিয়ে দিতে মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন তিনি, তবে মেয়েটার চরিত্র খুব একটা ভালো না বলে তাসলিমা সবসময় কথা এড়িয়ে যেত। আর তেহরাব, সে তো দেখতেই পারত না রাত্রিকে!

“তনয়া কোথায়?”
তেহরাব মাথা তুলে তাসলিমার দিকে তাকায়,
“ঘরে আছে, এই বুড়িদের বিদায় করি তারপর নিচে আনব।”
তাসলিমা খপ করে শ্বাস ছাড়েন, তার ছেলেটা আরেক পাগল।
রঙমালা আর রাত্রি আগেই খেয়ে নিয়েছে, তেহরাব তাদের জিনিসপত্র গুটিয়ে নিচে আসতে বলেছে। অপমানিত বোধ করায় দুজনেই সিদ্ধান্ত নেয় এবাড়ি আর তারা কোনো দিন আসবে, এতে অবশ্য তেহরাবের জন্য ভালো!
কিছুসময় পর নিচে আসে রঙমালা আর রাত্রি, দুজনের চোখে মুখে ক্ষোভ। ইউসুফের খাওয়া শেষ, তেহরাব খেতে খেতে বলে,
“তোমার শাশুড়ীকে বিদায় দিয়ে আসো যাও যাও!”
ইউসুফ একনজর তেহরাবের দিকে তাকিয়ে রাত্রি আর রঙমালাকে নিয়ে বেড়িয়ে যায়। বাইরে অটো দাঁড় করানোই ছিল, দুজনকে অটোতে উঠিয়ে বলে দেয় একদম বাড়ির সামনে পৌঁছে দিতে। যাওয়ার আগে রঙমালা তেহরাবের দিকে তাকিয়ে বলে যান,

“আমিও দেখমুনে যে মাইয়া মানুষের লিগা এত জ্বলন ধরে ওই মাইয়া কত্তদিন থাহে!”
তেহরাব পাত্তা দেয়নি, সবার কথা কানে নিতে নেয় তো!
তেহরাব হাত ধুয়ে উঠে দাঁড়াল, তাসলিমা খেতে বসল,
“তনয়া খেয়েছে?”
তেহরাব তাসলিমার আঁচলে হাত মুছতে মুছতে বলে,
“ খেতে চায়নি, জোর করে খাইয়ে দিয়ে এসেছি।”
“এবার নিচে আসতে বল, ঘরে কতসময় বসে থাকবে?”
তেহরাব টেবিলের উপর থেকে চাবি হাতে নিয়ে বলে,
“ডেকে নিও তুমি, আমি আসছি। দুপুরের আগেই ফিরব, তনয়াকে বলে দিও।”
তেহরাব দৌড় লাগায় দরজার দিকে, তাসলিমা ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,
”,এই দাঁড়া, কই যাচ্ছিস?”
তেহরাব যেতে যেতেই বলে,
“কাজ আছে, আসছি!”
আর কোনো কথা শুনল না তেহরাব, চলে গেল নিজের বাইক নিয়ে। তাসলিমা দীর্ঘশ্বাস ফেলে,এই ছেলে আর শুধরাবে না। কোথায় নতুন বিয়ে করছে, বউকে সময় দেবে, তা না করে আবার ছুটল!

জনবসতিহীন একটি গ্রাম, গ্রামে মানুষজন তেমন থাকে না। চাকরির সুবাদে পাড়ার আশি শতাংশ বাড়ি ছেড়ে মানুষ চলে চলে গিয়েছে, সাত আটটা বাড়ি পরপর একটি বাড়িতে মানুষ থাকে!
তেহরাবের বাইক থামে একটি হাফওয়াল করা পুরোনো পরিত্যক্ত বাড়ির উঠোনে, উঠোন বললে ভুল হবে। আগাছা জন্মে বসবাসের অযোগ্য, বাড়িটা তেহরাবের দাদুরই ছিল। অনেক জায়গা জমির মালিক ছিলেন, এথায় সেথায় বাড়িঘর করে রেখে গেছেন, কিছু জমির বিষয়ে তো তারা জানেও না।
বাড়ির বারান্দায় থাকা গেটের সামনে দাঁড়াল তেহরাব, বাইরে থেকেই ভেতরের ছিটকিনি খুলে ভেতরে প্রবেশ করল। বাড়িতে দুটো রুম, একরুমে এক ভিক্ষুককে থাকতে দিয়েছে তেহরাব, আরেক রুমে? সেখানে প্রবেশ করল তেহরাব, ভেতরে ঘুটঘুটে অন্ধকার।

লোহায় লোহায় বারি খাওয়ার শব্দ আসছে শুধু, ঘরের সোনালী রঙের বাতি জ্বালিয়ে দিল। দৃশ্যমান হলো এক ব্যক্তি, দাঁড়ি চুল সব বড়বড়, ছেঁড়া একটা শার্ট, এক পা শিকলে বাঁধা৷ একহাতে দিয়ে মাথা চুলকাচ্ছে, কতদিন হলো গোসল করে না তারও হিসাব নেই, পাশের রুমে থাকা ভিক্ষুক তো শুধু তেহরাবের কথা মতো দিনে এক বেলা ভাত খেতে দেয়। এই অনেক!
ঘরের সাথেই একটি টয়লেট, শিকলটা বড় হওয়ায় সহজেই যেতে পারে ওতদূর। তবে গোসল করার কথা লোকটার আর মনে থাকে না, সারাদির শুধু বিড়বিড় করে। মাথাটা গিয়েছে কিনা!
তেহরাব ভেতরে গিয়ে লোকটার সামনে গিয়ে বসল, তেহরাবকে দেখেই লোকটা ভয়ে দুপা পিছিয়ে গেল। তেহরাব হাসল,

“ভয় পাচ্ছিস?”
মাথা চুলকাতে চুলকাতে মাথা উপর নিচ দুলায়, হ্যাঁ সে ভয় পায়! অস্বাভাবিক ভাবে চোখ মুখের ভঙ্গিমা, মানসিক ভারসাম্য নেয় যে, সেটা তো হাঁড়িয়ে আরো তিন বছর আগে। এসব অত্যাচার তো ছেলেটা নিতে পারেনি,
“ ভাবছি তোকে এবার ছেড়ে দেব, কি বলিস মাহিম?”
এই তবে সেই মাহিম? মাহিমের চোখ চকচক করে উঠে, ছেড়ে দেবে? সত্যি ছেড়ে দেবে? কত বছর হয় যে বাইরে যায় না, সূর্যের আলো দেখে না। দেখতে পাবে? খুশিতে হামাগুড়ি দিয়ে তেহরাবের পায়ের কাছে আসে, পা ধরে বলে,
“বাইরে, বাইরে, বাইরে সত্যি?”
তেহরাব ঝাড়া দিয়ে নিজের পা সড়িয়ে নেয়, মাহিম পিছিয়ে যায়। বুঝতে পারে তেহরাব রেগে যাচ্ছে। সে তো রাগাতে চায় না, মাহিম নিজের পেটে হাত বুলিয়ে বলে,
“খিদে, অনেক খিদে, একটু একটু খাবার।”
তেহরাব পকেট থেকে একটি বিস্কুটের প্যাকেট বের করে ছুঁড়ে মারে মাহিমের দিকে,মাহিম অভুক্ত সিংহের ন্যায় বিস্কুটের প্যাকেট হাতে নিয়ে গপাগপ মুখে ভরে নেয়। শেষ খেয়েছে কখন? গতকাল সকালে, আর এখন প্রায় দুপুর হয়ে আসে।

“কষ্ট হয় তাই না?”
মাহিম উপর নিচ মাথা নাড়ায়, তেহরাবের গলার স্বর নরম হয়।
“জানিস আমারো কষ্ট হয়, যখন আমি আমার এলোকেশীর চোখের দিকে তাকাই। তোকে তো ছেড়ে দিতে ইচ্ছা করে, কিন্তু আমার এলোকেশীকে দেখলে মনে হয় তোকে মেরে ফেলি।”
মাহিম নিজের মাথায় নিজেই থাপ্পড় দিচ্ছে, কাঁদছে বোধহয়।
“মেরে ফেল, মেরে মেরে মরে ফেল। কষ্ট কষ্ট, বাঁচা কষ্ট!”
তেহরাব চোখ বন্ধ করে চেয়ারে হেলান দেয়,
“তাই তো বাঁচিয়ে রেখেছি, কষ্ট দিতেই তো। তোর দাদায় এখনো সুধরায়নিরে মাহিম, তোর বড় ভাইটা তো কদিন আগে নিজের একটা পা হারাল। তাও ওদের বিন্দু মাত্র ভয় নেয়, এখনো কত পাপ করছে।”
মাহিম নিজের গলা নিজেই চেপে ধরে, তার যে বাঁচতে কষ্ট হয়।
“মা,আমার মা? একটু দেখি একটু?”
বাচ্চাদের মতো আবদার করল মাহিম, তেহরাবের মায়া হলো। তবে কি ছেড়ে দেবে? কি জানি!
তেহরাব হাসি মুখে মাহিমের দিকে তাকাল,

“তোর মা ভালো নাইরে মাহিম, তোদের দুই ভাইয়ের শোকে এখনো কাতর। জানিস কালকে আমি বিয়ে করেছি!”
মাহিম কিছু বলল না, নিজেকে নিজে আঘাত করতে ব্যাস্ত। মস্তিষ্কে প্রচুর ব্যথা তার,সব কিছু পচে গিয়েছে বোধহয়! কিছু ভাবতে পারে না, বুঝতে পারে না, শুধু কষ্ট আর কষ্ট।
“জানিস কাকে বিযে করেছি? তনয়াকে, মনে আছে তনয়াকে? নাকি ভুলে গেছিস?”
মাহিম চোখ বড়বড় করে তেহরাবের দিকে তাকায়, নিজের মাথায় দুবার টোকা দেয়। পরছে পরছে নামটা মনে পরছে, এই নামের জন্যই তো তার কষ্ট। কষ্ট, কথাটা মাথায় আসতেই দেয়ালের সাথে মাথা ঠুকলো৷ এটা নতুন নয়, কতবার এভাবে মরতে চেয়েছে, মরতে পারছে না। কি করলে মরবে?
“যেদিন তোর বাপ দাদা তাদের পাপকর্ম শেষ করবে সেদিন তোর মুক্তি হবে, একটা সুযোগ দিলাম তোকে।”
তেহরাব নিজেই হেসে উঠল, সে তো জানে মাহিমের বাপ দাদা এ জন্মে ভালো হবে না, তাই তো মাহিমের মুক্তিও নেয়। তেহরাব সোজা হয়ে বসল, মাথা গরম হচ্ছে, চোখ লাল হচ্ছে, আবার বুঝি রক্ত চেপে বসছে মাথায়? হবে হয়ত!

“চলে যাই বুঝলি, তোকে দেখলে আমার খু*ন করতে ইচ্ছা করে, এর থেকে ভালো চলে যাই!”
মাহিম তেহরাবের পা ধরে কেঁদে উঠল,
“মুক্তি, একটু মুক্তি, কষ্ট হয়!”
তেহরাব চোখ বন্ধ করে, এক ঝটকায় ভেসে উঠে কিছু ঘটনা। চোখে খুলে দ্রুত বেড়িয়ে যায়, দরজা আটকে দেয় যাওয়ার আগে। বিড়বিড় করতে থাকে,
“তোর শাস্তি তো আল্লাহ্ নিজেও দেবে, তোর মুক্তি নাই মাহিম। তোর মুক্তি নাই, তুই পাপ করেছিস, তোর মুক্তি নাই।”

ড্রয়িং রুমে বসে আছে তনয়া, তাসলিমা ও ইরা। কিছুসময় আগেই ইরা ও সাহিল চলে এসেছে তাদের বাড়ি, অবশ্য ইরার শাশুড়ি আসতে দিতে চাননি, তবে ইরা কি শোনার পাত্রী?
“আচ্ছা তোরা থাক, রান্না শেষ হয়েছে, খাবার বারি গিয়ে.।”
তাসলিমার কথা শুনে তনয়া মাথা তুলে বলে,
“আমি সাহায্য করি?”
তাসলিমা মুচকি হাসে,
“কোনো দরকার নেয়,তোরা গল্প কর আমি আর বুয়া করে নেব!”
তাসলিমা চলে যেতেই ইরা এক লাফে তনয়ার পাশে এসে বসে, ইরা শাড়ি পরে এসেছে। তনয়ার পরনে সুতি থ্রিপিস, শাড়ি সামলাতে পারে না সে!
“এইযে তনয়া,থুরি ভাবি! এত চুপচাপ কেন হুম? আমার উপর রাগ করেছো নাকি সেদিনের জন্য? “
তনয়া ইরার দিকে তাকিয়ে তৎক্ষনাৎ মাথা নাড়ে,
“না না কি বলছেন, রাগ কেন করব।”

“তাহলে কথন কেন বলছো না? যায়হোক, কালকে বাসর কেমন কাটলো হুমমম? “
শেষ কথাটা দুষ্টু হেসে বলে ইরা, তনয়া লজ্জা পায়। এ কেমন প্রশ্ন!
“এই মেয়ে লজ্জা পাচ্ছো কেন? এত লজ্জা পেলে কাজ হবে না, আমি তোমার একটা মাত্র ননদ।”
তনয়া নিচের নখ কামড়ে ইরার দিকে তাকায়,কথা ঘুরানোর জন্য বলে,
“স সাহিল ভাইয়া কোথায় গিয়েছে?”
ইরা দরজার দিকে তাকিয়ে বলে,
“বলল তো দোকানে যাচ্ছে, আছে আশে পাশে কই আর যাবে। তুমি এখন আমার কথার জবাব দাও, আমার ভাইটা তোমাকে বেশি জ্বালাইনা তো? জ্বালালে আমাকে বলবে, একদম চুল ছিড়ে ফেলব।”
তনয়া হেসে উঠে, ইরাও হাসে।
“ আঙ্কেল আসবে না?”
ইরার কথায় তনয়া হাসি থামিয়ে বলে,

“ এখন আসবে না, কয়েকদিন পর আমাকে আর তেহরাব ভাইকে যেতে বলেছে। আমার তো পরিক্ষা, ওই সময়টাতো ওখানেই থাকতে হবে।।”
ইরা হ্যাবলাকান্তের ন্যায় মুখ করে বলে,
“কি বললে? তেহরাব ভাই? আমার ভাই তোমার ভাই হয় কি করে? স্বামী হয় তোমার!”
তনয়া ভরকে যায়, ইশ কি বলে ফেলল সে। এতদিনে অভ্যেস যে, তাই তো ভাই এসে পরে। কিন্তু ডাকবে কি বলে? তেহরাব? নাহ নাহ অসম্ভব, তার থেকে লোকটা বয়সে বড়, তাকে নাম ধরে ডাকে কি করে।
ইরা তনয়ার হাতের উপর হাত রাখল,
“আমি বিকেলে চলে যাব, আমার শাশুড়ীটা দুনিয়ার বজ্জাত। ওটাকে টাইট দিতে হবে, তোমার শাশুড়ী কিন্তু একের বুঝলে, ভালো মতো থাকবে।”
তনয়া স্মিত হাসে, সে সব সময় কথা কম বলে৷ বিয়ের আগেও তো কখনো কোথাও যেতো না, বন্ধুরা কত জোর করত তবুও না। তনয়ার এই ঘরকুনো স্বভাবের জন্য অনেকে তো বাজে কথাও বলত। এখনো কি বলবে?
“ আপু আমি রান্নাঘরে যাই, মা একা একা কাজ করছে।”
তনয়া উঠতে নিলে ইরা হাত টেনে ধরে,

“আরে বসো তো, মায়োর সাথে খালাতো আছেই। আচ্ছা ভাইয়া কোথায় গিয়েছে?”
তনয়ার মুখখানা চুপসে গেল, লোকটা কোথায় সেও জানে না। একটা বার বলেও বের হয়নি, অভিমান হলো তনয়ার। ইরার সামনে স্বাভাবিক ভাবেই বলল,
“কি একটা কাজ আছে বলল, এসে পরবে একটু পর।”
“ভাইয়া আর ভালো হলো না, এখনো ঘর ছেড়ে বাইরে টুটু করা।”
তনয়া কিছু বলল না, মাথা নিচু করে বসে রইল,
“সাহিলকে কল কর, খাবার তৈরি!”
তাসলিমা রান্নাঘর থেকে কথাটা বলল, ইরা ফোন হাতে নিল,
“ আচ্ছা বলছি, ভাবি একটু বসো আসছি।”
বলেই ইরা ফোন নিয়ে বাড়ির বাইরে চলে গেল। তনয়ার ভালো লাগছে না, লোকটা কেমন, কি করে না বলেই চলে গেল। লোকটার সাথে কোনো কথা বলবে না, মনে মনে পন করল তনয়া। হঠাৎ অস্বস্তি লাগতেই চট করে উঠে দাঁড়াল তনয়া, ওড়না খামচে দ্রুত দৌড় লাগাল ঘরে।

রাত আটটা, দুপুরে আর তেহরাবের ফেরা হয়নি। কিছু কাজে আটকে গিয়েছিল, সোহেলের বাবা তেহরাব, ফাহিমকে ডেকে পাঠিয়েছিল। পুলিশে কেস করবে বলে ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করতে চেয়েছিল, তাতে এক বালতি জল ঢেলে তেহরাব নিজেই সোহেল ও বতার বাবার নামে কেস করে চলে এসেছে। বেচারা বাপ ব্যাটা দুটোই ফেসে গিয়েছে, একজন হাসপাতালে আরেকজন পুলিশের ভয়ে পালিয়েছে। এ ব্যপারটা নিয়ে তেহরাব আর ফাহিম হাসতে হাসতে অবস্থা কাহিল।
বাড়ি ফিরতে ফিরতে তেহরাবের রাত হলো, এসেই খাবার টেবিলে গিয়ে বসল। দুপুরে খাওয়া হয়নি তার, তাসলিমা ড্রয়িং রুমে টিভি দেখছে। তেহরাব কখনযে তার সামনে দিয়ে গিয়েছে সে বলতেও পারবে না,
“আম্মু খেতে দাও তো, খিদে পেয়েছে। আর তনয়া কোথায়? “
তেহরাবের কন্ঠ পেয়ে তাসলিমা চমকায়,
“তুই কখন আসলি, দুপুরে কই ছিলি?”
তেহরাব বেসিন থেকে হাত ধুতেধুতে বলে,
“বুঝবে না, তারাতারি খেতে দাও তো আর তনয়া কোথায়?”
তাসলিমা টিভি ছেড়ে তেহরাবের দিকে এগিয়ে আসে,
“মেয়েটা দুপুর থেকে না খাওয়া, আর তুই কেমন স্বামী হয়েছিস? নতুন বউ রেখে বেড়িয়ে গেলি, কেমন স্বভাব তোদের বাপ ছেলের?”

তনয়া খায়নি, কথাটা কর্ণপাত হতেই ভ্রু কুঁচকে উঠে দাঁড়ায় তেহরাব। রাগ হচ্ছে, মেয়েটা না খেয়ে আছে কেন?
“খায়নি কেন?”
“কি জানি, কতবার খেতে আসতে বললাম আসল না। বলল শরীর ভালো লাগছে না!”
তেহরাব কিছু না বলে যেতে নেয়,
“খেয়ে যা।”
“পরে খাব, বউয়ের সাথে দেখা করে আসি!”
বলেই গটগট করে উপরে চলে গেল তেহরাব, নিজের রুমের সামনে এসে দাঁড়াল। দরজা চাপানো, তেহরাব আলতো হাতে দরজা খুলে ঘরে আসে, বিছানার উপর উল্টো পিঠ হয়ে গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে তনয়া। ঠিক যেন একটি বিড়াল ছানা, তেহরাব দরজা বন্ধ করে তনয়া কাছে আসল। দরজা আটকানোর শব্দ পেয়ে তনয়া দ্রুত পিছন ফিরে তাকাল, তেহরাবকে দেখে তার অভিমানের পাল্লা ভারী হলো।
তেহরাব তনয়ার সামনে দাঁড়িয়ে তনয়ার কপালে হাত দিল, কই কপাল তো ঠান্ডা। জ্বর তো আসেনি, তাহলে কি হয়েছে?

“তনয়া কি হয়েছে তোর? দুপুরে খাসনি কেন?”
তনয়া মুখ ঘুরিয়ে নিল, জবাব দিল না। ভ্রু কুঁচকাল তেহরাব,
“এই তাকা আমার দিকে, কি হয়েছে?”
তেহরাবের গম্ভীর কন্ঠে শুনে এবার তনয়ার রাগ হলো, এসেই বকা ধমকানো করল!
“কিছু হয়নি আমার, খিদে নেয় তাই খাইনি!”
তেহরাব বসল তনয়ার পাশে, তনয়ার গাল ধরে নিজের দিকে ঘুরিয়ে বলল,
“হ্যাঁ তাই তো, না খেয়ে থাকবি৷ তারপর আমি ছুঁয়ে দিলেই জ্ঞান হারাবি, আর যত দোষ এসে পরবে তেহরাবের ঘাড়ে তাই না?”
তনয়া চোখ মুখ কুঁচকে নেয়, তেহরাব আবারও শুরু করেছে। এর মুখে কি স্বাভাবিক কথা নেই?
“উফ সড়ুন তো,সবসময় বাজে কথা কেন বলেন?”
তেহরাব তনয়ার দিকে কিছুটা ঝুঁকে বলে,
“বাজে কথা আর কই বলতে পারলাম,সুযোগটা তুই দিলি কবে? আর আজ রাতে তোকে আমার জন্য প্রস্তুত থাকতে বলেছিলাম, আর তুই কিনা না খেয়ে শরীরে যতটুকু শক্তি ছিল তাও শেষ করে দিচ্ছিস। লাভ নেই জান, আজ তোর ছাড় নেই!!”

তনয়া হালকা করে ধাক্কা মারে তেহরাবের বুকে, চোখটা তার ছলছল করছে।
“আপনি অনেক খারাপ,আমি সারাদির আপনার অপেক্ষায় ছিলাম আর আপনি? একবার আমার খোঁজটাও নেননি, আমাকে না বলেই চলে গেলেন।”
তেহরাব হাসে, তারমানে তনয়া রানী রাগ করেছে?
এই ব্যাপার!তেহরাব আলতো করে তনয়ার ঠোঁটে চুমু খায়,
“সত্যি দরকারী কাজ ছিল, তোকে জানাতে পারিনি। আর ফেরার পথে নতুন আরেক সমস্যা হলো, সেগুলো মিটমাট করতে করতেই রাত হয়ে গিয়েছে।”
তনয়া মুখ গোমড়া করে বলে,
“কি সমস্যা হয়েছিল?”

তেহরাব সোহেল ও তার বাবার বিষয়টা বলল, তনয়া শুনল। সে তো জানেই তেহরাব সবসময় এসব কাজেই ব্যস্ত থাকে, কিন্তু তার যে এসব ভালোলাগে না।
“আর রাগ করে থাকিস না জান, তাও যদি রাগ করে থাকিস তবে তা ভাঙানোর জন্য অন্য পথ বেছে নিতে হবে!”
শেষ কথাটা তেহরাব বাঁকা হেসে তনয়ার আরেকটু কাছে এসে বলে, তনয়া আরো মিশে যায় বিছানার সাথে।
“স সড়ুর, ফ ফ্রেশ হয়ে আ আসুন!”
তনয়ার আমতা আমতা করে বলা কথা তেহরাবের কানে গেল না, সে তনয়ার ঠোঁটে ঠোঁট ডুবাল। নেশালো কন্ঠে বলল,

“একটুপর দুজনে একসাথেই ফ্রেশ হবো, এখন আমাকে একটু শান্ত কর। আমি নিজেকে সামলাতো পারছি না তনয়া, দেখ বুকের ভেতর বুলডোজার চলছে!”
তনয়া কেঁপে উঠে, তেহরাবের কন্ঠে অন্যরকম মাদকতা। কেমন অস্থির দেখাচ্ছে তাকে, তেহরাব ঘামছে, নিজেকে সামলানো যে দায় হয়ে পরছে তার কাছে। তেহরাব চট করে তনয়ার উপরে উঠে পরে, তনয়ার দুহাত মাথার উপর চেপে ধরে নিজের ডান হাত দিয়ে। হামলে পরে তনয়ার পাতলা গোলাপের ন্যায় ঠোঁটে, তনয়া ছটফট করছে, তাতে কি তেহরাব থামবে।
তেহরাব যে নিজের নিয়ন্ত্রণ হাড়চ্ছে হারাচ্ছে, নিজের উত্তেজনা মাত্রারিক্ত বেড়ে চলছে। তেহরাব তনয়ার ঠোঁট ছেড়ে সোজা হয়ে বসে, শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে বলে,

“এত ছটফট কেন করছিস?”
তনয়ার চোখ মুখ লাল হয়ে আছে, চোখের কোণে পানি। মিনমিন করে বলল,
“আজ না প্লিজ, আমাকে সময় দিন কয়েকদিন।”
তেহরাব নিজের শার্টটা ছুঁড়ে মারল মেঝেতে, তনয়ার গলায় মুখ ডুবাল,
“হুঁশশ, কথা বলিস না জান!”
তেহরাবের স্পর্শ ধিরে ধিরে হিংস্র হচ্ছে, দাঁতের চিহ্ন বসিয়ে দিচ্ছে গলায়, ঘাড়ে, ঠোঁটে। তনয়া কিছু বলতেও পারছে না, তেহরাবকে ছাড়াতেও পারছে না।
তেহরাব আবারো উঠে বসল, তনয়ার ওরনা ফেলে দিল বুক থেকে, দৃশ্যমান হলো বক্ষদ্বয়। তেহরাব শুকনো ঢোক গিলে তাকিয়ে রইল সে দিকে, কামিজের গলায় হাত দিতেই তনয়া শব্দ করে কেঁদে উঠল,
“প্লিজ তেহরাব ভাই, আজ না।”
তেহরাব তনয়ার চোখের দিকে তাকাল, তনয়া তেহরাবেন হাত আঁকড়ে ধরল।
“কেন এমন করছিস? বুঝতে পারছিস না আমার কষ্ট হচ্ছে, দেখ আমাকে। মরে যাচ্ছি আমি, আর তুই আজ না আজ না বলে চলছিস।”

তনয়া ফুপিয়ে ফুপিয়ে বলে উঠে,
“প্লিজ তেহরাব ভাই, আজ না। পাঁচটা দিন সময় দিন!”
তেহরাবের মেজাজ গরম হলো, এক ঝটকায় তনয়ার হাত থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে তনয়ার গাল চেপে ধরল। অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল,
“চাসটা কি তুই তনয়া? আমাকে এই অবস্থায় দেখে তোর শান্তি লাগছে, আমাকে কষ্ট দিতে ভাল্লাগে তোর? এখন তুই আমার বিয়ে করা বউ, অধিকার আছে আমার। কাল দিয়েছিনা সময়, আজ কেন চাইছিস? দেখতে পাচ্ছিস না আমি সহ্য করতে পারছি না, কষ্ট হচ্ছে আমার!”
তনয়া ব্যথা পাচ্ছাে, উত্তেজনার বসে তেহরাব তনয়াকে শক্ত করে চেপে ধরেছে।
“ব্যথা পাচ্ছি আমি!”
তনয়ার আর্তনাদ শুনে তেহরাব দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
“আমিও পাচ্ছি, বুকে হাত দিয়ে দেখ কেমন লাগছে আমার। কেন এমন করছিস, তুই কি আমাকে চাস না? তাহলে বিয়ে কেন করলি? আমার স্পর্শ খারাপ লাগে তোর কাছে? কি হলো জবাব দে?”
তেহরাবের হাতের বাঁধন আলগা হতেই তনয়া আবারও শব্দ করে কেঁদে উঠে, নিজের চোখজোরা বন্ধ করে বলে উঠে,

“আপনি ভুল বুঝছেন আমাকে, আমি অসুস্থ!”
তেহরাব ভ্রু কুঁচকে উঠে বসে,
“ অসুস্থ মানে? কি হয়েছে তোর?”
“আমার পিরি*য়ড চলছে!”
বলেই দুহাতে মুখ ঢেকে আবারো কাঁদতে থাকে তনয়া, তেহরাব ধপ করে বসে পরে তনয়ার পাশে। মাথার চুল চেপে বিরক্তি নিয়ে বলে,
“শিট, পিরিয়ড হওয়ার আর সময় পেলো না!”
তেহরাব ধপ করে শুয়ে পরল তনয়ার পাশে, চোখজোড়া বন্ধ করে বড় বড় করে শ্বাস নিল কয়েকবার। নিজের ভেতরে থাকা পুরুষালী চিত্তটাকে দমানোর চেষ্টা করছে সে, পেছন থেকে তনয়াকে জড়িয়ে ধরল তেহরাব।
“সরি!”
তনয়া চমকায়, তেহরাব তাকে সরি বলল? তেহরাব তনয়াকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিজের উদাম বুকের সাথে মিশিয়ে নিল, ধীরে ধীরে কমে আসল তনয়ার কান্নার গতি।

“সরি জান, তখন নিজের মধ্যে ছিলাম না আমি। কবে থেকে চলছে পিরিয়ড?”
তনয়া নাক টেনে বলে,
“আজকেই!”
“পেট ব্যথা করছে? গরম পানি করে আনব? আর এই অবস্থাতেও না খেয়ে আছিস কেন সারাদিন?”
তনয়া জবাব দিল না, আরেকটু মিশে গেল তেহরাবের বুকের সাথে।
“উঠ খেতে চল, আর কিছু লাগলে বল এনে দিচ্ছি!”
তনয়া দুদিকে মাথা নেড়ে মিনমিন করে বলে,
“লাগবে না, আমি নিয়ে এসেছিলাম।”
তেহরাব তনয়ার চুলে হাত বুলিয়ে চুমু খায়,
“ এখন খেতে চল, আমার খিদে পেয়েছে। দুপুরে খাইনি কিছুই!”
তনয়া উঠে বসে, ওড়নাটা মেঝে থেকে তুলে ভালো মতো মাথায় পেচিয়ে নেয়৷ তেহরাবও বিছানা থেকে নামে, শার্টটা তুলে কাউচের উপর রাখে। তনয়া তাকায় তেহরাবের উদীয়মান লোমহীন ফর্সা বুকের দিকে, লোকটা সবসময় ঢিলেঢালা শার্ট গেঞ্জি পরে থাকে বলে বোঝায় যায় না তার এই পেশিবহুল পুরুষালী কাঠামো দেহ।

“আমাকে টিজ করছিস? আম্মুকে বলে দেব কিন্তু!”
তনয়া ভরকে যায়, তেহরাবের মুখের দিকে তাকাতেই দেখে তেহরাব চোখ মুখ কুঁচকে গেঞ্জি পরছে।
“হাত মুখ ধুয়ে নিচে চল, কেঁদে নেয়ে কি অবস্থা করেছিস। ঝটিকা!”
তনয়া বাঁকা চোখে তেহরাবের দিকে তাকাল, তেহরাব মুখ ভেঙিয়ে তনয়ার হাত ধরে ওয়াশরুমে নিয়ে গেল। দুজনেই হাত মুখ ধুয়ে বেরিয়ে আসল, মুখ মুছে তনয়ার সামনে এসে দাঁড়াল। স্নিগ্ধ হাসল তেহরাব, তনয়ার কোমর টেনে নিজের কাছো নিয়ে আসল, তনয়া হাত রাখল তেহরাবের বুকে,
“তনয়া। এই তেহরাবটা বড্ড বেপরোয়া, এই জনমটা একটু সহ্য করে নিস?”
তনয়া কিছু সময় তাকিয়ে থাকে তেহরাবের দিকে, অতঃপর বলে,
“পরকালেও যেন আপনার পাগলামি গুলো সহ্য করতে পারি দোয়া করবেন, এই পাগল, বেপরোয়া, উশৃঙ্খল তেহরাব সরকারকে যে আমার আজীবনের জন্য চাই৷ এভাবেই ভালোবাসবেন তো আমায়?”

হাওয়াই মিঠাই পর্ব ২৬

“উহু!”
তেহরাবের তৎক্ষনাৎ জবাবে কপালে ভাজ পরে তনয়ার,
“উহু মানে?”
তেহরাব তনয়ার নাকের সাথে নাক ঘষে বলে,
“আরো বেশি ভালোবাসব, ঠিক ততটা যতটা তুই কল্পনাও করতে পারবি না। সবার ভালোবাসার সীমা যেখানে শেষ হয়, আমার ভালোবাসার গভীরতা সেখান থেকে শুরু। শুধু তোর জন্য, আমার এলোকেশীর জন্য, ভালোবাসি জান!”

হাওয়াই মিঠাই পর্ব ২৮