Home হাওয়াই মিঠাই হাওয়াই মিঠাই পর্ব ৫

হাওয়াই মিঠাই পর্ব ৫

হাওয়াই মিঠাই পর্ব ৫
তামান্না ইসলাম শিমলা

আজ কলেজ বন্ধ, আকাশটাও আজ পরিষ্কার। সকালের নাস্তা শেষ করে সবাই বসে আছে বারান্দায়, বসে বসে আড্ডা দিচ্ছে।
তনয়া কামরাঙা চাক চাক করে কাটছে, তানহা বায়না ধরেছে কামরাঙা মাখা খাবে, ছোট বোনের আবদার মেটাতে বটি নিয়ে বসেছে সে।
পাশেই বসে আছে তানিয়া আর সালমা, দুজনে নিজেদের মধ্যে কথা বলছে। অপরদিকে তানহা বারবার গেটের দিকে তাকাচ্ছে অপেক্ষায় আছে বাবা আর শিহাবের। দুজনে গিয়েছে বাজারে, আর তানহা অস্থির হচ্ছে বসে বসে।

“ এতো অস্থির না হয়ে রান্নাঘর থেকে লবন নিয়ে আয়, যাহ!”
তনয়ার কথায় তানহা গাল ফুলিয়ে বলে,
“ শিহাব্বা আসে না ক্যান? বা*লডায় কি আমাদের নিয়ে ঘুরতে যাবে না?”
তনয়া বিরক্ত হয়, কিঞ্চিৎ রাগও হয়,
“ আম্মু শুনলে পিঠের হাড় একটাও আস্ত থাকবে না, গালি দিচ্ছিস কেন!”
তানহা মুখ ভেঙিয়ে বলে,
“ শুনবে না, অত জোরে বলেছি নাকি!”
তানহা উঠে গিয়ে রান্নাঘর থেকে নুন নিয়ে এসে তনয়ার কাছে দেয়, হঠাৎ কিছু একটা মনে আসতেই তানহা বলে,
“ আপু তোর ব্যাগে নুপুর দেখলাম, ওগুলো কার?”
তনয়া চমকে উঠল, তানহা নুপুর গুলো দেখে ফেলেছে? ঠিক এই ভয়টাই পাচ্ছিল তনয়া, এখন কি বলবে? তনয়া অগ্নিদৃষ্টি নিয়ে তানহার দিকে তাকায়, দাঁতে দাঁত চেপে মৃদু কন্ঠে বলে,

“ তোকে বলেছি না আমার ব্যাগে হাত দিবি না!”
তানহা ভ্রু উচিয়ে হাসে,
“কি ব্যাপার বেহেনা? কে দিয়া হে?”
তনয়া তানহার মাথায় হালকা চড় মারে, নিজের কাজে মনোযোগ দিয়ে বলে,
“ ওইটা আমার না, প্রীতির। খুলে আমার ব্যাগে রেখেছিল, নিতে মনে নেই বোধহয়!”
তানহা আফসোসের ন্যায় শ্বাস ফেলল, কোথায় ভেবেছিল তার বোনটা অবশেষে প্রেম ট্রেম করছে। তার একটা দুলাব্রো হচ্ছে, তা না ছাই!
তনয়া আড় চোখে একবার তানহার দিকে তাকিয়ে শস্তির নিঃশ্বাস ফেলল, তানহা বিশ্বাস করেছে। বিশ্বাস না করারও কিছু নেই, তানহা জানে তার বোন কখনো মিথ্যা বলে না। নিজের কথার জন্য নিজেরই রাগ হচ্ছে তনয়ার, এই তেহরাবের জন্য আর কত মিথ্যে কথা বলতে হবে তাকে! আশ্চর্য!
ইতিমধ্যে শফিক ও শিহাব বাড়ি চলে এসেছে, দুজনের হাতেই বাজারের ব্যাগ। তানিয়া এগিয়ে গেল শফিকের কাছে, ইলিশ মাছ এনেছে সাথে ছোটমাছ।

“ তানহা, ছোটমাছ গুলো কেটে দে!”
মায়ের ফরমাশ শুনে নাক ছিটকাল তানহা, চোখ মুখ কুঁচকে বলে,
“ এহ, আমি পারব না! আমি এখন পড়তে বসব।!”
তানিয়াকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে তানহা ড্যাং ড্যাং করতে করতে ঘরে চলে গেল, তানিয়া রাগে কটমট করে তাকাল। বিড়বিড় করল,
“ কামচোর একটা, শশুর বাড়ি গিয়ে তো সবই করবি।”
তানহা যেতেই সালমা এগিয়ে আসল,
“ ছোট মাছ আমাকে দে কেটে দিচ্ছি, চল কলপারে।”
“ আরে না আপা, আপনার তো কোমড় ব্যথা। তনয়া সাহায্য করে দেবে, আপনি থাকেন!”
সালমা জোর করে ছোট মাছের ব্যাগটা নিয়ে যেতে যেতে বলে,
“ আমার ভাইয়ের বাড়ি, তুই বললেই আমি শুনব নাকি?”
তানিয়ারও আর কি করার, সেও পিছু পিছু কলপারে চলে গেল৷ শফিক আবারও বাড়ি থেকে বেড়িয়ে গেল, শিহাবের হাতের ব্যাগটা শিহাব বারান্দায় রাখল। তনয়ার কামরাঙা মাখা শেষ, সে ব্যাগটা নিয়ে রান্নাঘরে রেখে আবারো ফিরে আসল। দেখতে পেল শিহাব এখনো আগের জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে।
তনয়া কৌতুহল বসত জিজ্ঞেস করল,

“ কিছু লাগবে ভাইয়া?”
শিহাব তনয়ার দিকে তাকিয়ে স্মিত হেসে সাথা নাড়ল,
“ না লাগবে না, বিকেলে ঘুরতে যাচ্ছ তো?”
তনয়া একটি বাটিতে শিহাবের জন্য কামরাঙা তুলে তার দিকে এগিয়ে দিল,তানহার ঘরের দিকে ইশারা করে বলল,
“না গিয়ে উপায় আছে? তানহা তো রাত থেকেই পাগল হয়ে গেছে, ও পারলে এখনি চলে যেত!”
শিহাবও হাসে, তনয়া বাটি নিয়ে নিজের ঘরে চলে যায়। এমন সময় কল আসে শিহাবের, হাতের বাটিটা বারান্দায় রেখে ফোন রিসিভ করে৷ সাথে সাথে ওপাশ থেকে ওর বন্ধু বলে উঠে,
“ শিহাব্বা তুই তো ফাস্ট ক্লাস পেয়ে সেকেন্ড হয়েছিস গোটা কলেজে! ভাবতে পারছিস ইয়ার?”
শিহাব চমকালো, আজ তার মাস্টার্সের রেজাল্ট দেওয়ার কথা ছিল সে তো ভুলেই গিয়েছিলো৷ তবে এই মুহুর্তে এইরকম খুশির সংবাদ পেয়ে শিহাবের মন মেজাজটাই ভালো হয়ে গিয়েছে। এত বছরের পরিশ্রম। তবে হুট করে হাসি মুখটা চুপসে গেল, ওপাশে থাকা বন্ধুকে জিজ্ঞেস করল,

“ আর প্রথম কে হয়েছে?”
“ প্রথম? ওইযে ওই ছেলেটা যার সাথে কলেজের প্রথম দিনই তোর সাথে ঝামেলা লেগেছিল!”
শিহাব চমকায়, সাথে অবাকও হয়। কলেজেরে প্রথম দিনটাে ভোলার মতো ছিল না, মাস্টার্সে ভর্তি হওয়ার পর প্রথম কলেজ যেদিন যায় সেদিন এক ছেলের সাথে বিনা কারনেই ঝামেলা লেগে যায় শিহাবের, অবশ্য দোষটা ওই ছেলেরই ছিল। “রাস্তায় দেখে শুনে চলতে পার না?” ধাক্কা লাগাই শুধু শিহাব একুটুই বলেছিল, অথচ ছেলেটি তার কলার ধরে ঝামেলা শুরু করে। পরে শিহাবের বন্ধুরা মিলে পরিস্থিতি ঠান্ডা করে, এর পর থেকে ওই ছেলেকে আর দেখাও যায়নি কলেজে৷ শিহাব ভেবেছিল অন্য কলেজের হবে হয়ত!
যাই হোক সেসব, তবে ওই ছেলে যে প্রথম হবে কল্পনার বাইরে, প্রথম দর্শনেই গুন্ডা টাইপ লেগেছিল!
যাক এখন আর এসব ভেবে লাভ নেই, যোগ্যতা ছাড়া নিশ্চয় কেউ কিছু পায় না। শিহাব কল কেটে দিল, ছুটল কলপারের উদ্দেশ্যে৷ সুখবরটা তো মাকে জানাতে হবে!

একের পর এক তনয়াকে কল করেই যাচ্ছে তেহরাব, তবে তনয়ার ফোন বন্ধ। বিরক্ত, চিন্তা, রাগ সব মিলিয়ে মিশ্র অনুভূতি গুলো রক্ত গরম করে তুলছে তেহরাবের।
“ আজ না তোর রেজাল্ট দেওয়ার কথা? পাস করেছিস তো? নাকি ফেইল?”
তাসলিমা চায়ের কাপ নিয়ে সোফায় তেহরাবের পাশে বসে কথাটা বলে, তবে তেহরাব তা নিয়ে প্রতিক্রিয়া করে না। চোখ মুখ কুঁচকে টি টেবিলের উপর থেকে বাইকের চাবিটা নিয়ে বাড়ির বাইরে বের হতে নিলে তাসলিমা পিছন থেকে ডেকে উঠে,
“ ওই দাঁড়া, যাচ্ছিস কোথায়? রেজাল্ট কি বলে যা!”
তেহরাব থামে না, একবার পিছন ফিরে তাকায়ও না। যেতে যেতে বলে,
“ পরে বলব!”
তাসফিয়া বিরক্তিকর শ্বাস ফেলে, ছেলেটা একদম বাবার মতো হয়েছে। ঘাড় ত্যাড়া যাকে বলে, সাথে উৎশৃংখলও। তেহরাব বেরিয়ে যেতেই তাসলিমা বিরক্ত নিয়ে বিড়বিড় করে,
“ পরে বলব! নিশ্চয় ফেইল করেছে, তাই তো মুখ চোখের এই অবস্থা। পাসই বা করবে কি করে? কলেজে ভর্তি হওয়ার পর একটা দিন ক্লাস করেছিল নাকি? ভুলেও না!”

তেহরাব বাইক নিয়ে চৌহাট বাজারে এসে থামে, চকপাড়া এখন যাবে কিনা যাবে না সেটাই ভাবছে। কিন্তু নিজের মনটাকেও তো স্বাভাবিক করতে পারছে না, তেহরাব চেয়েছিল আজ রেজাল্ট জানার পর সে প্রথমেই তনয়াকে জানাবে, অথচ তনয়াকে ফোনেও পাচ্ছে না। সব মিলিয়ে মেজাজ খারাপ হয়ে যাচ্ছে তার, বাইক থেকে নেমে চায়ের দোকানে বসল,
“ কাকা চা দাও!”
এই বাজারে মতিন মিয়ার চা অনেক নাম করা, দিনে রাতে ভালো বেচাকেনা হয় তার। আর এই দোকানটাও তেহরাব দিয়ে দিয়েছিল, তাই প্রতিবার তেহরাব এখানে আসলে মতিন মিয়া তার জন্য স্পেশাল ভাবে চা বানিয়ে দেয়।
দোকানে অনেক মানুষ বসে আছে, তেহরাবও বসল। মেম্বরের ছেলে হিসেবে কম, গ্রামে ঝামেলার মাঝে সবার আগে তেহরাবের নাম থাকায় সবাই তাকে ভালো করেই চেনে! জেঠাইলের এক মুরুব্বিও দোকানে বসে চা খাচ্ছিল, তেহরাবকে দেখে জিজ্ঞেস করে,
“ হুনলাম তুমি নাহি ভোটে দাঁড়াইবা? তোমার আব্বাতো সক্কলবারে জিতে, তুমি দাঁড়াইলে প্রথম দফাতেই নাম ডুবাইবা!”

সবেই চা-টা হাতে নিয়েছিল,মুরুব্বি কথা শুনে বিগড়ে যাওয়া মেজাজটা আরো গরম হলো। তবে কিছু বলল না, বলতে ইচ্ছে করল না। মুরুব্বি আবারও বলে উঠে,
“নাম ডুবার আর বাহি কি রাখছে? পাশেে গেরামে তো ইউসুফ সাহেবরে ঢুকবার দেয় না, তাও পুলার লাইগা। সারাদিন মারামারি করলে কেনই বা নাম ডুবব না!”
বলেই লোকটা হাসতে লাগল, তেহরাব শান্ত।
এমন না যে কথাটা তার গায়ে লেগেছে, তবে সে তো বিনা কারনে কিছু করে না। মেজাজ শান্ত করে ঠান্ডা মাথায়ই কথার সঠিক জবাব দিল তেহরাব,
“ শুনলাম আপনার ছেলে নাকি এক বিবাহিত বাচ্চা ওয়ালী মহিলাকে নিয়ে ভেগেছে, তা চাচা আপনার ছেলেও তো আপনার নাম ডুবিয়েছে। আমিও নাহয় আমার বাবার নাম ডুবাই!”
তেহরাব হাসে, অতঃপর আবার চেহারায় গম্ভীরতা ভর করে। তেহরাবের জবাবে চুপ হয়ে গিয়েছে মুরুব্বি, তেহরাব চা শেষ করে একশো টাকার নোট মতিন মিয়ার দিকে এগিয়ে দিল।প্রতিবারের ন্যায় এবারো নিতে চাইলো না সে। তেহরাব জোর পূর্বক টাকাটা দিয়ে বলল,

“দ্রুত রাখো কাকা, কাজ আছে, যেতে হবে।”
তেহরাব টাকা দিয়ে আবারও বাইকের কাছে আসে, তনয়ার নাম্বারে কল করে, এবার রিং হচ্ছে। তেহরাবের মনটা কিছুটা শান্ত হলো, প্রথমবার রিং হয়ে কেটে গেল। তেহরাব আরেকবার কল করল,নাহ এবারও ধরল না।
তেহরাবের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গিয়েছে, ইচ্ছে তে করছে এখুনি তনয়াদের বাড়ি গিয়ে তনয়ার গালে ঠাস ঠাস দুটো চড় বসিয়ে দিতে। এই মেয়ের বোধহয় তাকে জ্বালা না দিলে শান্তি লাগে না।হঠাৎ কিছু একটা মাথায় আসতেই বাঁকা হাসল তেহরাব। কে জানে কি ভাবল, শুধু বিড়বিড় করে বলল,
“ এখুনি আসছি এলোকেশী, আমি আসছি!”

বাড়িতে আজ খুশির ফোয়ারা, সব থেকে বেশি খুশি যেন তানিয়া। শিহাবের রেজাল্টের কথা শুনেই সে ছুটেছে রান্নাঘরে, শফিককেও বাজারে পাঠিয়েছে মিষ্টি আনতে। তানিয়া আর সালমা মিলে পায়েশ বানাচ্ছে, বাড়িতে যেন ঈদ লেগেছে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই মিষ্টি নিয়ে বাড়ি আসে শফিক,
“ তনয়া মিষ্টি গুলো প্লেটে বেরে রাখ,শিহাবকে আগে দে।”
তনয়া অন্যমনস্ক, শফিকের বলা কথা শুনল কি শুনল না। তাহনা খুশিতে এগিয়ে আসল, মিষ্টির প্যাকেট নিজের হাতে নিল। শফিক তানহার হাতে দিয়ে বলল,
“আমার স্কুলে যেতে হবে, হেড স্যার ডেকে পাঠিয়েছে। আসি!”
শফিক আবারও ছুটল বাড়ির বাইরে, তনয়া নিজের ঘরে টেবিলের সামনে বই খুলে বসে আসে আনমনে। তানহা বারান্দায় দাঁড়িয়ে জানালা দিয়ে তনয়াকে ডাকল,
“ ওই আপুর এদিকে আয়, মিষ্টি খাবি না?”
তনয়া শান্ত দৃষ্টিতে তানহার দিকে তাকাল, তবে তার মনযোগ অন্য কোথাও। তানহা ভ্রু কুঁচকে আবারও ডাকল,
“ ওই কই হারালি, ডাকছি না!”
তানহার সম্পূর্ণ কথা শেষ হওয়ার আগেই তনয়া জানালা লাগিয়ে দিল, তার বিরক্ত লাগছে। সব কিছুই বিরক্ত লাগছে!

জানালা বন্ধ করে তনয়া বিছানায় এসে বসল, হাঁটুর উপর ভর দিয়ে মাথা রেখে টেবিলের উপর চার্জে রাখা ফোনটার দিকে তাকিয়ে রইল। যেখানে কিছু সময় আগেও তেহরাব কল করছিল, কিন্তু তনয়া কল রিসিভ করেনি৷
তনয়ার শরীর খারাপ লাগছে, ইদানীং মাথা ঘোরায়। ঠিক মতো খাওয়া দাওয়া হচ্ছে না, তার উপর পড়াশোনার চাপ, আর সবথেকে বড় জায়গা জুরে তো তেহরাবের প্রভাব। সব মিলিয়ে জীবনটা কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে, এলোমেলো আকার ধারন করছে।

হাওয়াই মিঠাই পর্ব ৪

কে জানে এর শেষটা কোথায়, কেমনই বা হবে শেষটা! জীবনের তেহরাব মানুষটা না আসলে হয়ত এমন অশান্ত ঝড় তৈরিও হতো না। সে ঠিক যেন সমুদ্রের গর্জন—কখনো প্রশান্ত, কখনো উত্তাল এক মিশ্র ব্যক্তিত্বের ব্যক্তি! মাঝে মাঝে মানুষটার জন্য তার দিন রাত দিশেহারা লাগে, যা সে কখনো চায়নি।
“শেষটা কোথায়, কে জানে? কিন্তু তার ঢেউ আমাকে যেদিকে নিয়ে যাচ্ছে, সেদিকে কি আদও কূল কিনারা আছে?”
তনয়া চোখ বন্ধ করে বসে রইল, কিছুই ভালো লাগছে না। এই পথ সে পারি দিতে চায় না!

হাওয়াই মিঠাই পর্ব ৬