Home হৃদয়ের সঙ্গোপনে হৃদয়ের সঙ্গোপনে পর্ব ৩৪

হৃদয়ের সঙ্গোপনে পর্ব ৩৪

হৃদয়ের সঙ্গোপনে পর্ব ৩৪
তোয়া নিধী দোয়েল

ব্যালকনিতে বসে ‘পরিণীতা’ উপন্যাস পড়ছে উপমা। উপন্যাস টা ওর ভীষণ পছন্দের। কতবার যে পড়েছে তার হিসেব নেই। বিচ্ছেদের পর পুনমিলনের অনুভূতি, পৃথিবীতে সব শ্রেষ্ঠ অনুভূতির মধ্যে একটা !
ডান পা বাঁ পায়ের উপরে রেখে নাড়াচ্ছে। ফোনে শব্দ করে নোটিফিকেশনের আওয়াজ হলে; ডান হাত বাড়িয়ে ফোন হাতে নেয়। সূচির কিছু নোটস দেওয়ার কথা ছিলো। বোধহয় ও-ই এসএমএস করেছে। একবার ভাবলো পড়া শেষ করে তারপর দেখবে। আবার কী মনে হতেই যেনো ফোনের স্কিন অন করে।

ফোনের স্কিনে ভেসে ওঠে একটা পরিচিত নাম্বার থেকে ছোট একটা বার্তা। ‘কাঠগোলাপ’!
রেজুয়ানের এসএমএস চোখে পড়তে, বুকের ভেতর কেমন যেনো করে ওঠে! কিঞ্চিৎ অস্বস্তি বোধ করে। নির্দিষ্ট পৃষ্ঠার শেষ না করেই ;বই বন্ধ করে রেখে দেয়। হোয়াটসঅ্যাপ এর পেজ খুলে রেজুয়ানের আইডিতে প্রবেশ করে। রেজুয়ান অনলাইনে। ও কিছু একটা টাইপিং করে। তবে সেন্ড করাই আগেই তা ডিলিট করে দেয়! দীর্ঘ এক শ্বাস নিয়ে টেক্সট বাদ দিয়ে সরাসরি কল করে।
রেজুয়ান অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে উপমার উত্তরের। তবে, টেক্সট এর বদলে কল বেজে উঠতে ভ্রু কুঞ্জন করে তাকায়। কল কেটে যাওয়ার আগ মূহুর্তে রিসিভ করে। বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে লম্বা করে ডাকে,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

-কাঠগোলাপ!
রেজুয়ানের কণ্ঠস্বর শুনে, দ্বিতীয় বারের মত বুক কেমন যেনো করে উঠে উপমার! তখন অভ্রর কাছ থেকে জানতে পেরেছে;সেই রাতের ঐ ছেলে গুলোর দলের লোকেরা রেজুয়ান কে মেরেছে। কথাটা শোনার পর কিঞ্চিৎ খারাপ লেগেছে ওর। মূলত খবর নেওয়ার জন্যই এসএমএস দিয়েছিলো।
ওপাশ থেকে কোনো উত্তর না পেয়ে রেজুয়ান আবার বলে ওঠে,
– কাঠগোলাপ, কথা বলছো না কেনো?
উপমা শোধবোধ ফিরে পেয়ে গলা পরিষ্কার করে বলে,
– আসসালামু-আলাইকুম। কেমন আছেন?
রেজুয়ান কান থেকে ফোন এনে মুখের সামনে ধরে। এ কী সত্যি কাঠগোলাপ! এত শান্ত কণ্ঠ, এত শান্ত ব্যবহার অসম্ভব! সালামের উত্তর নিয়ে, সন্দিহান মনে বলে,

-তুমি কি সত্যি কাঠগোলাপ?
-না তো। আমি তো মিহি উপমা।
-ধুর! উপমা, প্রতিমা কোনো নাম হলো? তুমি হচ্ছো কাঠগোলাপ। ঐ যে সাদা হলুদ…
-আপনার শরীরের অবস্থা কেমন?
রেজুয়ানের কথা শেষ করার আগেই উপমা ওকে থামিয়ে ওর শরীরের অবস্থা জানতে চায়। রেজুয়ান আরেক দফা চমকায়! এই মেয়ে ওর শরীরের অবস্থা জানতে চাচ্ছে? বিষ্ময়!
-শরীরের অবস্থা তো ভালো। তবে মনের অবস্থা করুণ! তুমি কোন অবস্থা জানতে চাচ্ছো?
উপমা জোরে শ্বাস নিয়ে বলে,
-আপনার ফ্রেণ্ড বললো আপনি নাকি অসুস্থ। হাতে- পায়ে ব্যথা পেয়েছেন? এখন কেমন আছেন?
রেজুয়ান বিস্মিত কণ্ঠে বলে,

-সত্যি! তুমি কাঠগোলাপ তো! আমার তো বিশ্বাস হচ্ছে না। তুমি আমার শরীরের অবস্থা জানতে চাচ্ছো!
-বললাম তো আমি কোনো গোলাপ-টোলাপ না। আমি উপমা। মিহি উপমা। যা জিজ্ঞাসা করছি তার উত্তর দিন।
কিঞ্চিৎ ক্রোধিত স্বরে বলে উপমা। রেজুয়ান ঠোঁটে বাঁকা হাসি নিয়ে বলে,
-বললাম তো ভালো। তুমি কেমন আছো?
-কীভাবে আঘাত পেয়েছেন?
উপমা জানা সত্ত্বেও আবার জিজ্ঞাসা করে।
-উপমা।
বিদিত কণ্ঠস্বর ভেসে আসতে দ্রুততরে কল কেটে দেয় উপমা। রেজুয়ান পুরো ঘটনা বলার জন্য উদ্যত হয়। কিন্তু, তার আগেই কল কেটে যায়। ও ভেবেছে হয়তো নেট সমস্যা। তাই অপেক্ষা করতে থাকে উপমার কলের!

ঘুম ঘুম চোখে পড়ার টেবিলের সামনে বসে রয়েছে তুর্কি। সাত-সকালে ঘুম বাদ দিয়ে পড়তে বসা; ওর কাছে সব থেকে অসহ্য কাজ। এই সিটি পরীক্ষা নিয়ে এত সিরিয়াস কেনো হতে হবে? অসহ্য! আদনান রুমে ঢুকে দেখে তুর্কি বসে বসে ঝিমাচ্ছে। ও আলমারির দিকে যেতে যেতে বলে,
-আজ এই চ্যাপ্টার শেষ করবে। আর কোনো বাহানা যেনো না শুনি।
তুর্কি আড়চোখে আদনানের দিকে তাকিয়ে মুখ বাঁকায়। কলেজে যাওয়ার জন্য পোশাক বের করে আদনান। তুর্কি ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে আদনান কোন রঙের শার্ট বের করছে।
-কালো শার্ট বের করবেন না।
তুর্কির কথা শেষ হওয়ার আগেই, আদনান মেরুন রঙের একটা শার্ট বের করে বিছানার উপরে রাখে। আনমনে কিছু ভেবে ঘরের বাইরে যায়।

তুর্কি শার্টের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে একটা বদ বুদ্ধি আবিষ্কার করে!
দ্রুত চেয়ার ছেড়ে ওঠে দরজার কাছে যায়। দেখে আদনান আসছে নাকি। আদনান কে কোথাও দেখতে না পেয়ে; দ্রুত বিছানার কাছে গিয়ে শার্ট হাতে তুলে নেয়।
শার্টের টপ বোতাম সহ, তার নিচের বোতাম টা দাঁতের মাধ্যমে আলগা করার চেষ্টা করে! তবে, বোতাম গুলো শক্ত হওয়ায়, ওর দাঁতে কিঞ্চিৎ আঘাত লাগে। ও মুখে হাত দিয়ে শার্ট যেভাবে ছিলো ঐ ভাবে রেখে; পুনোরায় দ্রুত চেয়ারে গিয়ে বসে।
মিনিট পাঁচেক পরে, আদনান রুমে ঢুকে। বিছানার উপর থেকে শার্ট নিয়ে গায়ে জড়ায়। তুর্কি আড়চোখে তাকিয়ে থাকে আদনানের দিকে। অপেক্ষা করেতে থাকে কখন বোতাম গুলো খুলে পড়বে! আদনান শার্টের বোতাম লাগাতে গেলে প্রথম দুই বোতাম খুলে হাতে পড়ে। ও বিরক্তিতে মুখ বিকৃতি করে ‘চ’ সূচক শব্দ করে। কাজ হওয়া মাত্র তুর্কি গলা ঝেড়ে বলে,

– স্যার, কোনো সমস্যা?
আদনান তুর্কির দিকে তাকিয়ে বোতাম গুলো দেখায়। তুর্কি ছুটে এসে বলে,
-দিন আমি লাগিয়ে দিচ্ছে।
আদনান বাধা দিয়ে বলে,
-লাগবে না। আমি অন্য আরেকটা পরছি।
তুর্কি আদনানের হাত থেকে বোতাম গুলো নিয়ে বলে,
-একদম না। এইটাই পরবেন। আমি লাগিয়ে দিচ্ছি তো। সুই-সুতা কই?
– কষ্ট করে লাগাতে হবে কেনো। অন্য একটা পরে নিলেই তো হয়।
তুর্কি আদেশ এর স্বরে বলে,
-আমি আম্মুর ঘর থেকে সুই-সুতার বক্স নিয়ে আসছি। আপনি কিন্তু অন্যটা পরবেন না৷ আমি যাবো আর আসবো। পরবেন না কিন্তু।

এই বলে ছুটে চলে যায় তুর্কি। আদনান তুর্কির অপেক্ষায় দরজার দিকে তাকিয়ে থাকে।
ক্ষণকাল পর, প্রজাপতির মত উড়ে চলে আসে তুর্কি। সুই-য়ে সুতা পড়াতে গিয়ে একটু হিমসিম খায়। আদনান তা দেখতে পেয়ে এগিয়ে এসে তুর্কির হাত থেকে সুই-সুতা নিয়ে তা গেঁথে দেয়।
-এত কষ্ট করার কী দরকার?
তুর্কি একটা বোতাম হাতে নিয়ে বলে,
-আপনি বুঝবেন না।
তুর্কি আদনানের মুখোমুখি হয়ে পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে বোতাম লাগাতে থাকে। তবে বার-বার পায়ের পাতা মাটিতে পড়ে। এতে বার-বার ওর কাজে বিঘ্ন ঘটে। পুনরায় ওর কাজে বিঘ্ন ঘটলে, আদনান ও-কে বলে,
-সুই কিন্তু হাতে লাগবে।
তুর্কি আদনানের দিকে তাকিয়ে বলে,
-একটু নিচু হোন। আমি নাগাল পাচ্ছি না।

আদনান আশে পাশে তাকিয়ে দাঁড়ানোর মত কিছু একটা খোঁজে। কিছু দেখতে না পেয়ে; এক হাত বাড়িয়ে তুর্কির কোমড় জড়িয়ে ধরে! যাতে পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে দাঁড়াতে সুবিধা হয়।
আদনানের কাণ্ডে তুর্কি চোখ বড় বড় করে তাকায়। আদনান ওর চাওনি দেখে বলে,
-তাড়াতাড়ি করো।
তুর্কির মন আনন্দে নৃত্য করে উঠে! ও ঠোঁট টিপে হেসে বোতাম লাগানোর কাজ চালিয়ে যায়। বোতাম লাগানো শেষ হলে তুর্কি দাঁত দিয়ে সুতা কাটতে যায়। আদনান বাধা দিয়ে বলে,
-দাঁতে আঘাত লাগবে। অন্য কিছু নিয়ে আসো।
তুর্কি বাধা অমান্য করে বলে,
-আরে কিচ্ছু হবে না।

অতঃপর সুতা কেটে সুই টেবিলের উপর রাখে। আদনান বোতাম লাগাতে গেলে তুর্কি বলে,
-দাঁড়ান! আমি লাগিয়ে দিচ্ছি।
বোতাম লাগানো শেষ হলে তুর্কি আদনানের দিকে তাকায়। আদনান আগে থেকেই তাকিয়ে ছিলো। দৃষ্টি সংযোগ হতে আদনান স্বভাবতঃ তুর্কির নাকে টোকা দিয়ে সরে যায়। তুর্কি টোকা খেয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলে। আদনান প্রয়োজনীয় জিনিস নিতে নিতে বলে,
– চ্যাপ্টার যেনো শেষ হয়।
তুর্কি চোখ খুলে বলে,

– স্যার, আমার নাক এমনিতেই বোঁচা। আপনি টোকা দিয়ে দিয়ে আরও বোঁচা করতেছেন। যদি আমার বাচ্চার নাক বোঁচা হয়, তখন এর দায় কে নেবে? ওদের বাবা?
-বাচ্চার নাক নিয়ে টেনশন করা বাদ দিয়ে, পরীক্ষায় কী ভাবে পাশ করবে সেই চিন্তা করো।
তুর্কি আদনানের দিকে কয়েক পা এগিয়ে এসে বলে,
-জীবনে তো অনেক পরীক্ষায়-ই আছে, স্যার। আপনি কোন পরীক্ষায় পাশ করার কথা বলছেন? যে পরীক্ষায় পাশ করলে আমাদের কিউট-ফিউট পুচকু হতে পারে; সেই পরীক্ষা?
আর কিছু বলার আগেই আদনান রুম থেকে বের হয়ে যায়। তুর্কি ওর যাওয়ার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে,
-এত ভালো একটা প্রশ্ন করলাম। অথচ, পাত্তাই দিলো না। অসহ্য!

আদনান চলে যাওয়ার পর তুর্কি নাচতে নাচতে আয়নার সামনে যায়। ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে আয়নায় নিজেকে দেখতে থাকে। ঠোঁটে মৃদু হাসি ফোটায়। সকাল সকাল ঐ রকম একটা অনুভূতির সাক্ষাৎ পেয়ে পেটের ভেতর অজস্র রঙিন প্রজাপতি উড়তে থাকে।
ও গুন-গুন করে গান গাইতে-গাইতে ড্রেসিং-টেবিলের সামনে থেকে ওঠে আলমারির কাছে যায়। আদনানের নির্দিষ্ট সেল্ফ হাতরে ওর ব্ল্যাক শার্ট বের করে। চোখ বন্ধ করে সেটার ঘ্রাণ নেয়! প্রগাঢ় এক পুরুষালী পারফিউমের ঘ্রাণ টের পায়।

পরনের থ্রি-পিস চেঞ্জ করে আদনানের ব্ল্যাক শার্ট পরে আসে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ডানে বামে মাথা নাড়িয়ে; নিজেকে অবলকন করে। খোঁপা করা চুলের গুচ্ছো মুক্ত করে দেয়। ডান হাতের বাহু নাকের কাছে এনে গভীর ভাবে শ্বাস টানে! সেখান থেকে তীব্র পুরুষালী পারফিউমের ঘ্রাণ ভেসে আসে। তুর্কি ঠোঁটে আঁকা হাসি নিয়ে ওর গাওয়া গান আবার শুরু করে,
‘তুমি মোর জীবনের ভাবনা
হৃদয়ের সুখের দোলা…!’

আদনান বাসায় না থাকায়; পড়া ব্যতীত আর সব কিছুই করছে তুর্কি। একবার নিচে যাচ্ছে তো একবার মোহনার সূচনার ঘরে। তবে এত ঘুরাঘুরি করে ও ভালো লাগছে না। মনে শুধু ‘জামাই জামাই’ করছে! লোকটার সাথে কথা না বলতে পারলে ভালো লাগে না। কাল থেকে ও-ও কলেজ যাবে। কিছু সময় পর পর অন্ততঃ একবার দেখতে যেতে পারবে!
তুর্কি হুমাইরার ঘর থেকে ফোন এনে আদনানকে কল করে। কয়েকবার রিং হওয়ার পর আদনান ফোন তোলে। তুর্কি উৎফুল্ল কণ্ঠে বলে,
– স্যার! কি করছেন?
ওপাশ থেকে রসকষহীন কণ্ঠে জবাব আসে,
-হুম। চ্যাপ্টার শেষ হয়েছে?

তুর্কির প্রফুল্ল ভরা মুখশ্রী ফাটা বেলুনের মত চুপসে যায়। ওর জীবনে এই একটা কথায় আছে যা ওর সব সুখ আনন্দ কেড়ে নেয়! তুর্কি কানে থেকে ফোন এনে একবার মুখের সামনে ধরে। ফের কানে ধরে বলে,
-আপনার বাক্য ভাণ্ডারে, এই একটা বাক্য ছাড়া অন্য কোনো বাক্য নেই?
-কেনো কী হয়েছে?
তুর্কি বেশ বিরক্ত কণ্ঠে বলে,
-ঘোড়া ডিম পেড়েছে! আপনার জন্য ভাজবো নাকি আলু দিয়ে রান্না করবো; সেটা জানার জন্য ফোন দিয়েছি। অনুগ্রহ করে বলুন কীভাবে খেতে চান!
আদনান বেশ রসিয়ে রসিয়ে বলে,

-বাহ্! পড়ার পাশাপাশি রান্না ও শিখছো। গুড জব! আলু দিয়ে রান্না করো। ডিম আলুর তরকারি আমার খুব পছন্দের। আর যদি সেটা ঘোড়ার ডিম হয়, তাহলে তো আর কোনো কথাই নেই!
তুর্কি এবার বেশ চিটে যায়। বউ কল করেছে, কই ভালো মত কথা বলবে তা না। সব সময় খ্যাঁক খ্যাঁক! তুর্কি রাগমিশ্রিত কণ্ঠে বলে,
-অসভ্য লোক! বউ কল করেছে; কই বউ-এর সাথে মিষ্টি করে ভালোবেসে কথা বলবেন। তা না সব সময় খ্যাঁক খ্যাঁক, আর পড়তে বসো। এই একটা কথা ছাড়া আর কিছু পারেন আপনি? কিচ্ছু বলতে হবে না। কলেজ থেকে আসার সময় একটা ভ্যানিলা ফ্লেবারের আইস-ক্রিম নিয়ে আইসেন।
এক নাগারে কথা গুলো বলে মুখের ওপর কল কেটে দেয় তুর্কি। ফোন নিক্ষেপ করতে গিয়ে ও থেমে যায়। ফোনটা তো ওর না! হুমাইরার। ভেঙে গেলে!
এই ভেবে বেশ শব্দ করে টেবিলের উপর ফোন রাখে। রাগে ফুঁসতে থাকে। ঐ ফাজিল লোকের সাথে আর কথা বলবে না। এক নাম্বারের অসভ্য লোক!

রাতে খাওয়ার সময় দেখা যায় না তুর্কিকে। আদনান আপন মনে খুঁজেতে থাকে তুর্কি কে। প্রতিদিন, যতবারই আদনান খেতে বসে; ততবারই তুর্কি ওর পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। এটা ওটা এগিয়ে দেয়। মাঝে মাঝে কেউ না থাকলে আদনানকে বলে, এক লোকমা ও-কে ও খাইয়ে দিতে!
তবে আজ কলেজ থেকে আসার পর তেমন কথা হয় নি। শুধু, যে আইস-ক্রিম আনতে বলে ছিলো, সেটা নিয়ে কই যেনো চলে গেছে। খাওয়ার মাঝে হুমাইরা আদনানকে বলে ও তুর্কিকে কিছু বলেছে নাকি। মেয়েটা দুপুরে ও খেতে আসি-নি। শরীর নাকি ভালো লাগছে না। তাই পরে খাবে।
আদনান খাওয়া শেষে তুর্কির জন্য খাবার সাজিয়ে রুমে ঢুকে। তুর্কি চেয়ারে বসে বিছানায় পা যুগল রেখে নাড়াচ্ছে। কোলে একটা বই। সাথে মোটা একটা চানাচুরের বয়াম। তুর্কি এক মুঠো চানাচুর মুখে পুরে আবার বইয়ের দিকে তাকায়।

আদনান গলা ঝেড়ে ভিতরে ঢুকে। তুর্কি আড়চোখে একবার আদনানকে দেখে। পরপরই দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয়। এই লোকের সাথে আজ কিছুতেই কথা বলবে না। আদনান খাবার প্লেট বিছানায় রেখে ওর পাশে বসে বলে,
-মা বললো, দুপুরে নাকি খাও নি। রাতে ও তো খেতে নামলে না। কী হয়েছে?
তুর্কি বয়ামের মুখ আটকিয়ে ভরাট কণ্ঠে বলে,
-কিছু না।
-রাগ করেছো?
তুর্কি একটু তেজী স্বরে বলে,
-তখন ঝগড়া করে এখনি ভুলে গেলেন?
আদনান প্লেট এগিয়ে নিয়ে এসে বলে,
-তাই বলে, রাগ করে খাবার খাওয়া বন্ধ করবে!
-তাতে আপনার কী?
আদনান কপালে ভাঁজ ফেলে বলে,
-সারাদিন এই সব খেয়েছিলে?
তুর্কি কণ্ঠে ক্রোধ ঢেলে বলে,

– হ্যাঁ! ভাত খেতে ভালো লাগছে না। সরুন।
এই বলে তুর্কি বয়াম নিয়ে উঠে যায়। আদনান দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে প্লেটের দিকে তাকিয়ে ভাবলো হয়তো রাগ হয়েছে বলে খায়-নি। ও তুর্কির উদ্দেশ্যে বলে,
-ওকে, চলো তাহলে কাচ্চি খেয়ে আসি। যেহেতু ভাত খাবে না। তো কাচ্চি, তো খাওয়া যেতেই পারে! কী বলো..?
আদনান কথাটা বলে তুর্কির দিকে তাকায়। তবে তুর্কি সেখানে উপস্থিত নেই! আদনান বিছানা ছেড়ে ব্যালকনিতে যায়। না সেখানে ও নেই!
ও রুমে ঢুকে চমকে যায়! তুর্কি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে স্কার্ফ বাঁধছে! এত তাড়াতাড়ি তুর্কি কে তৈরি হতে দেখে; হতভম্ব হয়ে যায়!

তুর্কি স্কার্ফ বাঁধা শেষ করে আদনানের দিকে তাকায়। ভ্রু কুঞ্জন করে বলে,
– কী হলো? সং এর মত দাঁড়িয়ে আছেন কেনো? তৈরী হোন। বেশি রাত হলে আবার রেস্টুরেন্টে বন্ধ হয়ে যাবে। তাড়াতাড়ি করুন। আমার খুব খিদে পেয়েছে।
তুর্কির কথা শুনে আদনান শোধবোধ ফিরে পায়। ভাগ্য করে একটা বউ পেয়েছিলো! কখন কোন মুডে থাকে সৃষ্টিকর্তা ভালো জানেন। বউয়ের মুড সুইং ধরা পৃথিবীতে অন্যতম কঠিন কার্য!
-আর শুনুন!
তুর্কির ডাক শুনে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় আদনান।
-সাথে আরও কিছু খাবো ওকে। সারাদিন হাবিজাবি খেয়ে খিদে কিছুই মেটিনি! আর ব্ল্যাক শার্ট পরবেন। তাড়াতাড়ি করুন।
আদনান শার্ট বের করতে করতে বলে,

– ব্ল্যাক শার্টে না আমাকে আবুল এর মত লাগে!
-আমি পাশে না থাকলে, ব্ল্যাক শার্টে আবুল এর মত লাগে! যেহেতু এখন আমার সাথে বের হচ্ছেন, সেহেতু ব্ল্যাক শার্টেই পরবেন। তাহলে আপনাকে বেশি মানাবে। বুঝেছেন?

বাইরে এসে তুর্কির মন ফুরফুরে হয়ে যায়। দু’জনে অনেক সময় ব্যয় করে বাইরে। খাবার খায়। কোলাহলময় রাতের পরিবেশ উপভোগ করে। হাঁটাহাঁটি করে। আদনানের প্রতি যত রাগ বিদ্বেষ জমে ছিলো, সব উবে যায়!
ফুলের দোকান থেকে কিছু ফুল কিনে ফুটপাত দিয়ে হাঁটছে দু’জন। তুর্কির হাতে অনেক গুলো লাল, হলুদ আর হালকা গোলাপি বর্নের গোলাপ। ও এক হাত দিয়ে আদনানের বাহু শক্ত করে চেপে ধরেছে। আর অর অন্য হাতে ফুল গুলো নাকের কাছে নিয়ে ঘ্রাণ নিচ্ছে। কিছুক্ষণ হাঁটার পর, আদনান একটা রিকশা ডাকে। রিকশা কাছে আসলে আদনান আগে ওঠে। তারপর তুর্কির দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়। যাতে ভালোভাবে ওঠতে পারে। তুর্কি হাত ধরে উঠে বসে। রিকশা ছাড়ে গন্তব্যের দিকে।
কোলাহলময় পরিবেশ ছেড়ে যেতেই আদনান জিজ্ঞাসা করে,

-রাগ কমেছে?
তুর্কি ফুল থেকে দৃষ্টি সরিয়ে আদনানের দিকে তাকিয়ে বলে,
-একটুখানি বাকি আছে। তবে, ঐ-টুকু এ যাত্রায় শেষ করবো না!
আদনান তুর্কির দিকে ঘাড় কিঞ্চিৎ বাঁকিয়ে বলে,
-এইটা ভালো। সব রাগ দূর করতে নেই। কিছু রাগ অবশিষ্ট রেখে দিতে হয়। কারণ কিছু রাগ নৈকট্যের সূচনা ঘটায়!
-আমার কোনো কিছু সূচনা ঘটাতে হবে না। শুধু রাগের উসিলায় মাঝে মাঝে এই রকম ঘুরে-বেড়াতে পারলেই শান্তি!
তুর্কির কথা শুনে আদনান ঠোঁট চেপে হাসে। ও তো এই কথাই বললো! ও রাগ করেছিলো বিধায়-ই তো ওকে নিয়ে ঘুরতে বের হলো। এক সাথে দীর্ঘ মূহুর্ত কাটালো! আদনান বাকি হাসি টুকু চেপে রেখে বলে,
-তোমার আর আমার কথার মাঝে পার্থক্য হলো কী?
– স্যার, কৃষ্ণচূড়া!

রাস্তার পাশে বড় একটা কৃষ্ণচূড়ার গাছ। তাতে থোকা থোকা রক্ত লাল কৃষ্ণচূড়া ফুটে আছে। ল্যাম্পপোস্টের সাদা আলো ছড়িয়ে পড়েছে গাছের এক পাশে। তা দেখে তুর্কির পাগল মন জেগে ওঠলো। সে দ্রুত কণ্ঠে বলে ওঠলো,
-মামা রিকশা থামান। (আদনানের দিকে তাকিয়ে) স্যার, আমাকে একটা কৃষ্ণচূড়ার ডাল এনে দিন।
রিকশা থামে। আদনান গাছেটাকে পরখ করতে করতে বলে,
-এত বড় গাছ! ডাল ভাঙবো কীভাবে!
-জানিনা। তবে, আমার চাই। (একটু করুণ কণ্ঠে)
-আরে পাড়া যাবে না।
তুর্কি আঙুল উঁচিয়ে বলে,

– স্যার, ঐ যে ডান দিকের ডালটা একটু হেলে পড়েছে। ঐ টা থেকে পাড়া যাবে।
আদনান হেলে পড়া ডাল দেখে; রিকশাওয়ালা কে বলে ঐখানে যেতে। ডালটার নিচে এসে আদনান তুর্কিকে রিকশা থেকে নামতে বলে। তুর্কি রিকশা থেকে নামলে; আদনান খুব সাবধানে রিকশার বসার সিটে ওঠে দাঁড়ায়। রিকশাওয়ালা আদনানকে বলে,
-আপনে নামেন ভাই। আমি পাইড়া দেই।
আদনান বাধা দিতে বলে ও একাই পারবে।
হাত বাড়িয়ে ডাল ভাঙতে নেয়। তবে একটুর জন্য নাগাল পায় না। আরও কয়েকবার কয়েকদিক থেকে চেষ্টা করে। তবে তাতে ও কাজ হয় না। একটা ছোট লাঠি থাকলে ভালো হতো। আদনান তুর্কির দিকে তাকিয়ে বলে,
-দেখো তো আশে পাশে কিছু আছে নাকি।
তুর্কি ভ্রু কুঞ্জন করে রাগান্বিত সরে বলে,

-শার্টের বোতাম লাগাতে গেলে আপনার নাগাল পাইনা। অথচ এই টুকু ডাল ভাঙতে পারছেন না? অসহ্য!
-ডালটা কত উঁচায় দেখেছো!!
রিকশাওয়ালা খুঁজে খুঁজে আশে পাশে থেকে একটা মাঝামাঝি আকৃতির লাঠি নিয়ে আসে। আদনান সেটা দিয়ে ডালটাকে আরেকটু নিচের দিকে নামিয়ে; থোকা থোকা রক্ত লাল কৃষ্ণচূড়ার একটা ডাল ভাঙে।
হাতের লাঠি ফেলে কপালের ঘাম এক হাত দিয়ে মুছে তুর্কির দিকে এগিয়ে যায়। তুর্কি ফুলের ডাল নেওয়ার আগে ব্যাগ থেকে একটা টিস্যু বের করে, আদনানের ঘর্মাক্ত মুখশ্রী মোছার জন্য উদ্যত হয়। আদনান ওর হাত থেকে টিস্যু নিয়ে ডালটা ওর হাতে দেয়। মুখ মুছতে মুছতে বলে,

-হ্যাপি?
তুর্কি মুখে চমৎকার হাসি ফুটিয়ে উপরে নিচে মাথা নাড়ায়। ফের আবার রিকশায় উঠে বাড়ির উদ্দেশ্যে।
তুর্কি ডাল থেকে একটা ছোট ফুল ছিঁড়ে আদনানকে বলে,
– স্যার, এইটা আমার মাথায় স্কার্ফের পিন এর সাথে লাগিয়ে দিন।
আদনান বিনাবাক্যে ফুলটা নিয়ে ওর মাথার পিন এর সাথে যুক্ত করে দেয়। যুক্ত করা শেষ হলে তুর্কি আদনানের দিকে ফিরে বলে,
– স্যার, চলুন একটা পিক ক্লিক করি। ফোন বের করুন।
আদনান ফোন বের করে তুর্কির হাতে দেয়। তুর্কি ফোন হাতে নিয়ে জিজ্ঞাসা করে,
– পাসওয়ার্ড?
– পাসওয়ার্ড লাগবে না। অন করো।
তুর্কি পাওয়ার বাটনে বৃদ্ধা আঙুল স্পর্শ করাতেই ফোনের স্কিন অন হয়ে যায়! তুর্কি অবাক চোখে আদনানের দিকে তাকায়। ওর ফিঙ্গার ম্যাচ করলো কীভাবে!

– স্যার, আমার ফিঙ্গার ম্যাচ করলো কীভাবে?
-বাসায় প্রায় চলে এসেছি৷ তাড়াতাড়ি পিক ক্লিক করো।
তুর্কি মনে বিষ্ময় ধরে রেখে ক্যামেরা অন করতে নেয়। ফোনের ওয়ালপেপারের দৃষ্টি পড়তে আরেক দফা চমকায়! ওয়ালপেপার একটা মেয়ের হাফ সাইড পিক! যার পরনে লাল শাড়ি! উপরে বেইজ রঙের স্কার্ফের আবরণ! মেয়েটার দৃষ্টি ও দূর কমলা আকাশের দিকে। যেথায় সারাদিনের ক্লান্ত সূর্য অর্ধেক ডুব ডুব!
তুর্কি এবার আগের থেকে অধিক বিষ্ময় নিয়ে আদনানের দিকে তাকায়। অবাক কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করে,
-এইটা কে স্যার?
আদনান ভাবলেশহীন হয়ে বলে,
-হবে কারো এক ব্যক্তিগত পাগলি!
– ব্যক্তিগত পাগলি!
– তাড়াতাড়ি পিক নেও। এসে পড়লাম তো।
তুর্কি ওয়ালপেপার আরেকবার দেখে বলে,
-শাড়ি তো চেনা চেনা লাগে। মনে তো হয় এইটা আমি! কিন্তু, আপনি আমাকে পাগল বললেন কেনো? আমাকে কি আপনার পাগল মনে হয়?
আদনান ঘাড় বাঁকিয়ে তুর্কির দিকে তাকিয়ে বলে,
-উঁহু! তুমি পাগল না? ব্যস্ লোকে তোমাকে পাগল ভাবে! এখন কথা না বাড়িয়ে পিক ক্লিক করো।
তুর্কি দাঁতে দাঁত চেপে বলে,

-এমনিতে বউয়ের সাথে রোমান্টিক কথা বলতে মন চায় না। বউ বললে ও পাত্তা দেন না। অথচ ওয়ালপেপারে ঠিকই বউয়ের পিক দিয়ে রাখেন!!
এই বলে তুর্কি মুখ ঘুরিয়ে ছবি তোলার জন্য পোজ নেয়। মাথা একটু আদনানের দিকে ঝুঁকিয়ে মুখে ফোটায় দীর্ঘ হাসি। তবে আদনান বুকে হাত গুঁজে তাকায়। আদনানের পোজ দেখে তুর্কির কপালে ভাঁজ পরে। ও ক্যামেরা থেকে দৃষ্টি সরিয়ে আদনানের দিকে তাকিয়ে বলে,
-এই ভাবে রোবোটের মত বসেছেন কেনো? হাত নামান।
আদনান হাত নামিয়ে আবারও রোবোটের মত তাকায়। এইবার ও তুর্কির গা জ্বলে ওঠে। এই লোক এত খবিস কেনো সৃষ্টিকর্তাই জানেন! তুর্কি মুখের ভঙ্গি বিকৃতি করে বলে,
-মাথাটা আরেকটু ঝুঁকিয়ে আমার মাথার পাশে আনা যায় না? সব কি শিখিয়ে দিতে হয়? অসভ্য লোক!
আদনান তুর্কির দিকে তাকিয়ে ওর পিঠের পাশ দিয়ে হাত নিয়ে ওর কাঁধে রাখে। ও-কে নিজের বাহুর মধ্যে আবদ্ধ করে। মাথা আরেকটু ওর মাথার দিকে ঝুঁকিয়ে বলে,

হৃদয়ের সঙ্গোপনে পর্ব ৩৩

-নেও ক্লিক করো।
আদনানের বাহুতে আবদ্ধ হয়ে তুর্কি অবাক চোখে তাকায়! ওর দৃষ্টি দেখে আদনান ও ওর দিকে তাকায়। দু’জনের দৃষ্টি মিলিন হতেই; তুর্কির হাতের চাপ লেগে অজান্তে একটা পিক ক্লিক হয়ে যায়!
আদনান ভ্রু নাচিয়ে ইশারা করে পিক তুলতে। তুর্কি আদনানের থেকে দৃষ্টি সরিয়ে ক্যামেরায় তাকায়। আদনান ও তাই করে। দু’জনের পজিশন ঠিক হলে, তুর্কি ওর বত্রিশ পাটি বের করে। আর আদনান মৃদু হেসে।

হৃদয়ের সঙ্গোপনে পর্ব ৩৫