Home হৃদয়ের সঙ্গোপনে হৃদয়ের সঙ্গোপনে পর্ব ৪৩

হৃদয়ের সঙ্গোপনে পর্ব ৪৩

হৃদয়ের সঙ্গোপনে পর্ব ৪৩
তোয়া নিধী দোয়েল

বাড়ির প্রবেশদ্বারে মুজাহিদ, আদনান এবং রেজুয়ানের সাথে— অচেনা একটি নারীকে দেখে; স্তব্ধ হয়ে যায় বাড়ির সবাই। হুমাইরা, রচনা রান্নাঘরে ছিলো। তুর্কির ডাকে বৈঠক খানায় এসে উপস্থিত হয়েছে। মুমিনুল- আলামিন নিজেদের মাঝে খোশগল্প করতে-করতে ক্ষণকাল আগে বৈঠক খানায় এসেছে। সকলেই দৃষ্টিতে ভীষণ কৌতূহল নিয়ে তাকিয়ে আছে উপমার দিকে। মেয়েটার সাজ-সজ্জা দেখে মনে হচ্ছে নতুন বধূ! পরনে লাল শাড়ি! গায়ে অলংকার! মাথায় লাল ওড়না!
আদনান হুমাইরার উদ্দেশ্যে বলে—

-মা, বরণ ডালা কই?
আদনানের কথায় উপস্থিত সকলেই আরও অবাক হয়। তবে, এদের মধ্যে সব চেয়ে বেশি অবাক হয় তুর্কি!
গতকাল যখন তুর্কি; উপমাকে সব জানিয়েছিলো, উপমা তখনই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো— ও এই বিয়ে কখনো করবে না। বরং ঐ মেয়েটার জীবন, সম্মান বাঁচাতে হবে। তাই, রাতের মধ্যেই পরিকল্পনা করে; আজ সাইমম আর সোফিয়া বিয়ে সম্পূর্ণ করেছে ওরা। এই কাজে ওদের সাহায্য করেছে আদনান। সাইমম কে যাতাকলে ফেলে রাজি করিয়েছে সে।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

কিন্তু, উপমা তখন তো ওদের কিছু জানাইনি! বা তখনই তো চাইলে ওদের সাথে চলে আসতে পারতো! তাহলে আসে নি কেনো? আর ওরই দেবরের সাথে যে উপমার রিলেশন; কই কোনোদিন তো বলে নি।
এমন হাজারো প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে থাকে তুর্কির মাথায়। ওর ভাবনার সুত ছিঁড়ে মুজাহিদের কথায়—
মুজাহিদ, হুমাইরা উদ্দেশ্যে বলে—
-ভাজিজান, তোমার দ্বিতীয় পুত্রবধূ! ঘরে তোলো! আর কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবো?
কারো মুখে রা নেই৷ দীর্ঘ নীরবতা ভেঙে হুমাইরা কিছু বলার জন্য উদ্যত হয়— তবে তাকে থামিয়ে দিয়ে আলামিন বাজখাঁই কণ্ঠে বলে—

-দ্বিতীয় পুত্রবধূ মানে?
মুজাহিদ জোরে শ্বাস নিয়ে বলে—
-ভাই, রেজু বিয়ে করেছে!
আলামিন ওদের দিকে এগিয়ে এসে বলে—
-বিয়ে করেছে মানে? কার অনুমতি নিয়ে? এত বড় সাহস ও কই পেলো?
এই বলে রেজুয়ানকে চড় মারতে যায়। তবে, তার আগেই মুজাহিদ, আদনান আলামিনের হাত ধরে ফেলে৷ রাগে কিড়মিড় করছে আলামিন। মুজাহিদ, আলামিনের হাত নামিয়ে বলে—
-ভাই ভাই, কী করছো? পাগল হয়ে গেছো? এত বড়…
বাকি কথা শেষ করার আগেই আলামিন ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বলে—

-বড় মানে? ওর কয় টাকা রোজগার করার ক্ষমতা আছে? যে ও বিয়ে করে নিয়ে এসেছে? ও নিজেই তো বাপ- মায়ের ঘাড়ে পারা দিয়ে খায়। তাহলে ওর এত বড় সাহস কীভাবে হলো? আরেজনকে বাড়িতে তোলার?
আলামিনের প্রতিটা কথা রেজুয়ান মাথা নিচু করে; চোখ বন্ধ করে হজম করে৷ আদনান এগিয়ে এসে বলে—
-বাবা, ও যতদিন না পর্যন্ত কিছু কর‍তে পারছে; ততদিন পর্যন্ত ওদের সব দায়িত্ব আমার।
আদনানের কথা শেষ হওয়ার সাথে- সাথে মুজাহিদ বলে—
-তুমি চিন্তা করো না, ভাই। আমি আছি ওদের পাশে…
-তুই একদম চুপ থাক। তুই কীভাবে পারলি এই অন্যায় সমর্থন করতে? নিজের জীবনের কাহিনি ভুলে গেছিস? তুই জানিস আমি এই সব পছন্দ করি না। তুই কীভাবে পারলি?

-ভাই….
বিষাক্ত এক অতীতে নাড়া লাগায়— মুজাহিদ দুই চোখ বন্ধ করে ফেলে। স্মৃতির পাতায় ভেসে ওঠে তিক্ত কিছু পাতা। আলামিন আবার বলে—
-আমি কিছুতেই এ বিয়ে মানি না। এক্ষুনি বের হো বাড়ি থেকে। আমি কোনোদিন ও আমার বাড়িতে ওদের ওঠতে দিবো না।
মুজাহিদ চোখ খুলে বলে—
-ভাই, বাড়িটা কিন্তু তোমার একার নয়। আমার ও অধিকার আছে। তুমি এইভাবে বলতে পারো না।
দুই ভাইয়ের বাক-বিতণ্ডতা শুনে ফুঁপিয়ে ওঠে হুমাইরা। রচনা এসে জড়িয়ে ধরে বোনকে। মুমিনুল এগিয়ে এসে বলে

-ভাই, দয়া করে এই সব বলো না। ছোট মানুষ…
আলামিন ঘাড় ঘুরিয়ে বলে—
-কীসের ছোট মানুষ? অন্যায় সবার জন্য সমান। সে ছোট হোক কিংবা বড়৷
তারপর মুজাহিদের দিকে ঘুরে বলে—
-আমি তোকে তো বেরিয়ে যেতে বলি নাই। তুই কেনো এসবের মধ্যে নিজেকে জড়াচ্ছিস?
-অন্যায় তো ও একা করে নাই। আমি নিজে ওকে সমর্থন করছি। তাহলে ওকে চড় মারা তো আমাকে ও মারা হলো। তাইনা?

-কেউ যদি নিজে থেকে চড় খেতে আসে; তাহলে আমার কিছু করার নাই। তবে আমি ওকে কোনোদিন এই বাড়িতে ওঠতে দিবো না। বের হো এখান থেকে। তাড়াতাড়ি বের হো।
মুমিনুল বলে—
-ভাই, তুমি এই দিকে আসো। কী বলছো এই সব? বাড়ি থেকে বের করে দিলে ওরা কই থাকবে?
-আমি কিছু জানিনা। যে এক পয়সা কামাতে পারে না। তার আবার কীসের বিয়ে? সারাজীবন বাপের ঘাড়ে বসে থাকবে?
মুজাহিদ বলে—
-আমি বললাম তো, আমি আছি।
-তুই কোনো কথা বলবি না। নিজের জীবন টাকে শেষ করছস। এখন আবার আমার ছেলের জীবন টা ও শেষ করতে বসেছিস।

আলামিনের কথাটা তীরের মত বুকে বিঁধে মুজাহিদের! ছোট বেলা থেকে এই দুই ভাতিজাকে নিজের আপন ছেলের মত মানুষ করেছে। কখনো কোনো দিন খারাপ চায়নি ওদের। আর আজ নাকি ভাই এই কথা বলছে…!
-ভাই… তুমি এইভাবে বলতে পারলে?
-তুই নিজের জীবন টা-কে দেখেছিস?
-ভাই তখন ঘটনা, সময় সব কিছু অন্য রকম ছিলো। তখন…
-কোনো অন্য রকম না। কামাই ছাড়া কীসের বিয়ে? আমি মানিনা এসব।
মুজাহিদ দীর্ঘ শ্বাস নিয়ে বলে—
-আচ্ছা, ঠিক আছে। এতই যখন সমস্যা হচ্ছে— বেরিয়ে যাচ্ছি ওদের নিয়ে আমি। যে দিন ওকে তোমার যোগ্য বানাতে পারবো সেইদিন আর এই বাড়িতে আসবো।
আদনান ও বলে—

-আমার ও বেরিয়ে যাওয়া উচিত। বড় ভাই হিসেবে আমার তো ওকে শাসন করা উচিত ছিলো। কিন্তু, তা না করে আমি ওকে আরও লাই দিয়েছি।
এর পর তুর্কির উদ্দেশ্যে বলে—
-রেডি হও। ব্যাগ গোছাও।
রেজুয়ান, আদনান-মুজাহিদের উদ্দেশ্যে বলে—
-পাগল নাকি তোমরা? তোমরা কেনো আমার জন্য বাড়ি ছাড়বে? আমি…
-কোনো কথা বলবি না। আমি তোর পালিত বাপ না। আমি যা বলবো তাই শুনবি। আর কোনো কথা না চল…!
হুমাইরা এতক্ষণ সব শুনছিলো। ওদের বাড়ি ছাড়ার কথা শুনে আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। ছুটে চলে এলেন ওদের কাছে। অশ্রুমাখা কণ্ঠে ওদের বলে—
-বাড়ি ছাড়বে মানে? বেশি বড় হয়ে গেছো? ছোট বেলা থেকে তোমাকে আমি মানুষ করেছি। আর আজ আমার সামনে দাঁড়িয়ে এই সব বলছো?

-ভাবিজান…
-হুমু, তুমি থামিও না ওদের। চলে যেতে দেও।
হুমাইরা স্বামীর দিকে তাকিয়ে হুংকার ছাড়ে—
-একদম কথা বলবে না তুমি। এই টুকু একটা ভুলের জন্য তুমি ছেলেকে বের করে দিতে পারলে ও; আমি পারি না। কারণ, আমি মা। কামাই করেল ও আমার ছেলে৷ না করলে ও আমার ছেলে। আমি খুব কষ্ট করে পেটে ধরছি। ওদের কিছু হলে আমার কলিজা কাঁপে।
আলামিন কোনো উত্তর দেওয়ার আগে হুমাইরা আবার বলে—
-আমি যখন এই বাড়িতে এসেছি— তখন তো তোমার মা ছিলেন না। তাতে কি তোমার দুই ভাইকে আমি মানুষ করেনি? তখন কি তাদের কামাই ছিলো? আমি পারতাম না ওদের তখন এতিমখানায় কিংবা কোনো কাজে পাঠিয়ে দিতে? পারতাম না বাড়ি থেকে দূর করে দিতে? করে দিয়েছ? মুমিনুল তো তাও একটু বড়। জাহিদ কে ছোট থেকে মানুষ করেনি? রান্না-বান্না করে খাওয়ানি? কই তখন তো আমি কামাইয়ের কথা বলিনি? তাতে কি ওরা এখন কামাই করে না? তাহলে, আমার ছেলে কেনো বাড়ি থেকে বের হবে? আজ কামাই করে না তাতে কী? দুই দিন পর নিশ্চয়ই করবে।

স্বামীকে চুপ করিয়ে হুমাইরা আদনানের দিকে ঘুরে। ওর দিকে এগিয়ে এসে বলে—
-বেশি বড় হয়েছিস? আমি বেঁচে থাকতে উচ্চারণ করিস— বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাবি? এত সাহস কে দিলো? ভাইকে বিয়ে করিয়ে আনতে পেরেছো; আর এখন বাড়িতে তুলতে হিমশিম খাচ্ছো? কেমন ভাই তুমি?
আদনান কোনো কথা বলে না। হুমাইরার কথায় তুর্কির একটু হাসি পায়। ওর এই একটা বাজে স্বভাব— সিরিয়াস মূহুর্তে শুধু হাসি পায়। ও খুব কষ্ট করে হাসি চেপে রাখে।
হুমাইরা মুজাহিদের সামনে এসে একই ভাবে শাসন করে। তারপর রচনার উদ্দেশ্যে বলে— মিষ্টি আনতে। নতুন বউকে ঘরে তুলতে হবে। রচনা মিষ্টি নিয়ে উপস্থিত হয়। হুমাইরা যাবতীয় নিয়ম শেষ করে। তুর্কি ছুটে এসে উপমার হাত ধরে। বড় বউয়ের মত বলে— হুমাইরাকে সালাম কর‍তে। রেজুয়ান, উপমা দুইজনই হুমাইরা কে সালাম করে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে।

আদনান, মুজাহিদ দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বাড়িতে ঢুকে। ভাগ্য করে একটা মা পেয়েছিলো!
হুমাইরা, তুর্কিকে বলে উপমাকে ঘরে নিয়ে যেতে। তুর্কি, উপমার হাত ধরে উপরে নিয়ে যেতে থাকে। মুজাহিদ-আদনান আগে-আগে হাঁটে। মাথায় হাজারো চিন্তা নিয়ে ওদের পিছু-পিছু আসে রেজুয়ান। কীভাবে কী করবে। তাই ভেবে চলেছে।
আলামিন বউয়ের উপরে আর কথা বলার সাহস পায় নি। তাই, সোফায় গিয়ে নীরবে বসে।
তুর্কি, উপমাকে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠার সময় বলে—

-আপু, তুমি এত বড় বেইমানি কীভাবে করলে? তুমি আমাকে আগে কেনো বললে না, আমার দেবরের সাথে তোমার প্রেম? তাহলে বিয়েটা আরও অনেক আগেই করিয়ে দিতে পারতাম।
তুর্কির কথার জবাব দেয় না উপমা। মূলত, ওর মাথায় ঘুরছে আলামিনের কথা গুলো। বিয়েতো হয়ে গেলো; এখন কী করবে তাই ভাবছে। যে ভাবেই হোক, রেজুয়ানের পাশে দাঁড়াতে হবে।
এমন হাজারো ভাবনার মাঝে নিচ থেকে ভেসে আসে বিদিত কণ্ঠস্বর। যে উপমার নাম ধরে ডাকছে। চলন্ত পা যুগল থেমে যায় উপমা-তুর্কির। আদনান, মুজাহিদ আর রেজুয়ান ও পুরুষালী কণ্ঠস্বর শুনে দাঁড়িয়ে যায়। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। আলামিন-মুমিনুল বৈঠক খানায় বসে ছিলো। সদরদরজায় কারো কণ্ঠস্বর শুনে তাঁরা ও তাকায়।
ফারুক এসেছে। সাথে দুইজন পুলিশ ও নিয়ে এসেছে। সে উচ্চকণ্ঠে ডাকছে উপমার নাম ধরে৷ আলামিন দাঁড়িয়ে অবাক কণ্ঠে বলে—

-তুমি এখানে?
ফারুক, আলামিন কে দেখে চরম ভাবে বিস্মিত হয়! সে ও অবাক কণ্ঠে বলে—
-আলামিন..!
সিঁড়িতে দাঁড়ানো মুজাহিদ ও চরম ভাবে বিস্মিত হয় ফারুককে দেখে। অতীতের বিষাক্ত পৃষ্ঠা জ্বল-জ্বল করে স্মৃতিতে! ক্ষীণ স্বরে বিড়বিড় করে— ‘উনি এখানে…!’
আদনান বিরক্ত কণ্ঠে বলে— হাজির হইছে। তখন তো মা সামলালো। এখন কে সামলাবে?
ফারুককে দেখে আলামিন, ক্ষণ-মূহুর্ত থমকালে ও পরপরই বাজখাঁই কণ্ঠে বলে—
-এখানে কী চাই? এখানে কেনো এসেছো?
ফারুক কিছুটা বিস্মিত, কিছুটা ক্ষিপ্ত হয়ে বলে—

-আমার বোনটা-কে মেরে শান্তি হয়নি? এখন আমার মেয়ের দিকে ও হাত বাড়িয়েছো? আমার মেয়ে কই?
-ও…ও তোমার মেয়ে!!
ফারুক পুলিশ দু’জনের উদ্দেশ্যে বলে—
– স্যার, এরাই আমার মেয়েকে অপহরণ করেছে। আপনারা প্লিজ কিছু করুন।
আলামিন এগিয়ে এসে বলে—
-ফালতু কথা বলবে না। অপহরণ করা হয়নি। বলো, আমার ছেলের সাথে পালিয়ে এসেছে।
ফারুক কপালে ভাঁজ ফেলে বলে—
-বাহ্! এই কথা আবার জোর গলায় উচ্চারণ করছল? লজ্জা লাগে না?
আলামিন ব্যঙ্গ করে হেসে বলে—
-লজ্জা পাওয়ার কী হলো, বেয়াই সাহেব? এত ভারী আনন্দের কথা!
এর পর উচ্চ কণ্ঠে হুমাইরা কে ডাকে—
-কই হুমু? কই গেছো? দেখো কে এসেছে। তাড়াতাড়ি মিষ্টি-টিষ্টি নিয়ে আসো।
-আলামিন!

ধমকের স্বরে বলে ফারুক। আলামিন তাঁর ধমকের উপেক্ষা করে বলে—
-আরে রেগে যাচ্ছো কেনো? শান্ত হও। আমি যদি জানতাম; আমার ছেলে তোমার মেয়েকে নিয়ে আসবে তাহলে— বিয়েটা আমি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে দিতাম। এমনকি বধূবরণ ও আমিই করতাম!
ঐ দিন আমার ভাই যে কাজটি পারেনি; আজ আমার ছেলে তা করে দেখিয়েছে। আমার বাঘের বাচ্চা। কই হুমু…!
আলামিনের কথা শুনে রাগে কিড়মিড় করতে থাকে ফারুক। আদনান-রেজুয়ান অবাক দৃষ্টিতে তাকায় মুজাহিদের দিকে। আদনান অস্পষ্ট কণ্ঠে উচ্চারণ করে—
-জাহিদ মাস্টার, এই সেই আমাদের না হওয়া চাচির কুখ্যাত ভাই!
মুজাহিদ কিছু বলে না। সে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ফারুকের দিকে। কী হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছে না! মনের গহীনে থাকা ক্ষত গুলো পুনোরায় তাজা হয়ে উঠেছে। বুকের ভেতর তিক্ত ব্যথায় মচোড় দিয়ে ওঠলো। চোখের তারা চিকচিক করে উঠে।
দু’জন পুলিশের মধ্যে একজন পুলিশ আলামিনের উদ্দেশ্যে বলে—

-দেখুন, আমাদের কাছে বেশি সময় নেই। আসল ঘটনা খুলে বলুন আমাদের।
ফারুক বলে—
-কী বলবে? আমি বলছি এরা আমার মেয়েকে ছলেবলে কৌশলে কোথাও লুকিয়ে রেখছে।
আলামিন হাস্যোজ্জ্বল চিত্তে বলে—
-লুকিয়েছি মানে? আমার ছেলের বউ সে। আর সে কোথাও যাবে না। আমি যেতে দিবো না।
-আলামিন!
ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বলে ফারুক। নিচের ঘটনা সুবিধাজনক না দেখে; দ্রুত উপর থেকে নেমে আসে উপমা। তুর্কি এসে আদনানের পাশে দাঁড়ায়। ফিসফিসিয়ে বলে—

– স্যার, কী হচ্ছে এখানে?
আদনান, তুর্কির দিকে ঝুঁকে বলে—
-কথা বলো না। চুপচাপ দেখে যাও।
উপমা দ্রুত পুলিশের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। ফারুক উপমার দিকে তাকিয়ে বলে—
– স্যার, এই যে আমার মেয়ে। মা…!
উপমা বাবার কথায় পাত্তা না দিয়ে পুলিশ দু’জনের উদ্দেশ্যে বলে—
– স্যার, আমি বাচ্চা নই; যে আমাকে কেউ অপহরণ করবে। আমি অ্যাডাল্ট। এবং, আমি নিজের ইচ্ছায় আমার ভালোবাসার মানুষের সাথে পালিয়ে এসেছি। এতে এই পরিবারের কিংবা কারো কোনো দোষ নেই।
উপমার মুখে অকপটে ভালোবাসা উক্তি শুনে; রেজুয়ান চোখ বন্ধ করে ফেলে। এই একটা কথা ও কত বার শুনতে চেয়েছে; কিন্তু উপমা কখনো স্বীকার করেনি। আজ পরিস্থিতি এমন না হলে ও কী যে করতো তা ওর জানা নেই!
ফারুক ধমকের স্বরে বলে—

– উপমা…!
– স্যার, আপনাদের অযথা সময় নষ্ট হচ্ছে। আপনারা আসতে পারেন। আমি আবারও বলছি আমি নিজে থেকে এসেছি। তাই, আমার শ্বশুর বাড়ির লোকদের অযথা হেয় করবেন না। তাহলে আমি ও আইনি ব্যবস্থা নিবো।
-যেহেতু অভিযোগ উঠেছে আমরা আবার তদন্তে আসবো।
উপমা বলে—
-ঠিক আছে। আমি ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে গিয়ে স্বীকার উক্তি দিয়ে আসবো। যাতে এই মামলা পুরোপুরি ভাবে শেষ হয়।
একজন পুলিশ বলে—
-পরে নয়। আগামীকাল-ই আমাদের সাথে যাবেন। আমরা আবার আসবো।
এই বলে পুলিশ দু’জন চলে যায়।
ফারুক উপমার দিকে তেড়ে আসলে আলামিন ঢাল হয়ে দাঁড়ায়। শাসিয়ে বলে—

-উঁঃ! এক দম এগোবে না। তোমার মেয়ে অপেক্ষা এখন আমার পুত্রবধূ বেশি। তাই আমার সামনে— আমার পুত্রবধূ কে কিছু বলতে আসলে; আমার থেকে খারাপ কেউ হবে না। ভেবো না সেই দিন কিছু বলিনি বলে আজ ও বলবো না।
আলামিনের কথা শুনে উপমা সহ উপস্থিত সবাই যেনো আকাশ থেকে পড়ে! এই তো একটু আগে ওদের বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার জন্য উঠে-পড়ে লাগলো। আর এখন! ফারুক বাড়তি কিছু না বলে রাগে কিড়মিড় করতে করতে বলে—
-দেখে নেবো তোমাদের!
-দেখো। ভালো করে দেখো। তোমার বোন না হোক; তোমার মেয়ে আজ আমার বাড়ির বধূ! আর শোনো— কাল আমার বাড়িতে অনুষ্ঠান হবে। আমার ছেলের বিয়ের অনুষ্ঠান করবো আমি। তোমাদের বাড়ির সকলের দাওয়াত রইলো। আশাকরি আসবে।
ফারুক আর কিছুই বলে না। রাগে কিড়মিড় করতে কর‍তে জায়গা ত্যাগ করে৷ আলামিন উচ্চ কণ্ঠে ডাকে—

– ও হুমু কই গেলে? আয়োজন করো সব। লোকজনকে দাওয়াত করো। আর এই সব টাকা আমি নিজে দিবো।
সবাই বিস্ময়ের চরম পর্যায়! একে তো এত তাড়াতাড়ি কী ঘটলো তা বুঝতে পারছে না কেউ! তার উপর আলামিনের মত কিপটে মানুষ নাকি ছেলের বিয়ের অনুষ্ঠান করবে! তাও আবার যে ছেলেকে সে একটু আগে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিতে চেয়েছিলো!
তুর্কি অবাক দৃষ্টি নিয়ে আদনানের দিকে তাকায়। আদনান ও থ মেরে তাকিয়ে আছে বাপের দিকে। শুধু থেমে গেছে মুজাহিদের সময়। সে আর কোনো দিকে না তাকিয়ে; আর কিছু না ভেবে জায়গা ত্যাগ করে নিজের ঘরে চলে যায়।
আলামিন নিচ থেকে রেজুয়ানকে ডাকে—
-মীম…এই দিকে আয়!
আদনান, রেজুয়ানকে ধাক্কা মেরে বলে—

-তাড়াতাড়ি যা।
রেজুয়ান ভীষণ ঘাবড়ে গিয়ে ধীর পায়ে হেঁটে সিঁড়ি থেকে নেমে আসে। আলামিনের কাছে আসলে আলামিন ওর এক হাত ধরে৷ অন্য হাতে উপমার হাত ধরে মিলিয়ে দিয়ে বলে—
– তুই নিজের পায়ে দাঁড়ানো না পর্যন্ত; তোর আর বউমার সব দায়িত্ব আমার। চিন্তা করিস না। যা বউমা কে নিয়ে যা। কোনো সমস্যা হলে আমাকে জানাবি।
রেজুয়ান কী বলবে ভেবে পায় না! শুধু অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে বাবার দিকে৷ আলামিন ওদের ছেড়ে হুমাইরা কে ডকাতে যায়। হুমাইরা অনেক আগেই রান্নাঘর ছেড়ে এখানে উপস্থিত হয়েছিলেন। আলামিন তাঁর দিকে এগিয়ে এসে বলে—

-যাও, তোমাদের কার কী লাগবে; কার কোন শাড়ি লাগবে সব আজই নিয়ে আসো৷ আমি আর মুমিনুল গিয়ে সবাইকে দাওয়াত দিয়ে আসি। কালই আমার ছেলের অনুষ্ঠান।
মুমিনুল এগিয়ে এসে বলে—
– ভাই, তুই ঠিক আছিস তো? কি বলছিস ভেবে বলছিস তো?
-আরে হ্যাঁ-হ্যাঁ। চল তুই চুপ-চাপ।
হুমাইরা কিছু বলে না। শুধু স্বামীর যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে। রচনা এগিয়ে এসে বলে—
-ও আপা। ভাই কি সত্যি-সত্যি অনুষ্ঠান করবে?

হৃদয়ের সঙ্গোপনে পর্ব ৪২

হুমাইরা কিছু বলে না।
তুর্কি আদনানের দিকে তাকিয়ে বলে—
– স্যার, কী হলো এই সব?
আদনান তুর্কির হাত ধরে বলে—
-রুমে চলো। সব বলছি!

হৃদয়ের সঙ্গোপনে পর্ব ৪৪+৪৫