Home হৃদয় রাঙানো প্রেম হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ২

হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ২

হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ২
সিনথিয়া ইসলাম সীমা

চারদিকে আযানের ধ্বনিতে বরাবরের মতোই ঘুম ভাঙলো হুমায়রার। পিটপিট করে চোখের পাতা খোলে কিছুক্ষণ শুয়ে রইল। তারপর আড়মোড়া ভেঙে উঠে পড়ল বিছানা ছেড়ে। এক পল তাকালো ঘুমে বুদ হয়ে থাকা কৃশানের দিকে। পরপর চলে গেলো ওয়াশরুমে। ফ্রেশ হয়ে ওযু করে নিলো। কৃশানদের বাড়িতে আলাদা নামাজের রুম আছে। আগে যখন এসেছিলো তখন সেখানেই নামাজ আদায় করেছিলো সে। তাই রুম চিনতে অসুবিধা হলো না আর। ওযু করার সময় কনুইয়ের উপরে উঠানো জামার হাতাটা নামিয়ে কব্জি অব্দি ঢেকে নিলো। মাথায় হিজাব জড়িয়ে বেরিয়ে এলো রুম থেকে। নামাজের রুমে এসে নামাজরত অবস্থায় ইয়াসমিন বেগম ও আজমিন বেগমকে দেখতে পেলো। তাদের পাশেই বসে পড়লো সে। কিছুক্ষনের মধ্যেই সেখানে উপস্থিত হলো ইকরা। সেও এসে সবার সাথে নামাজে যোগ দিলো। নামাজ শেষে অভ্যাস মোতাবেক কোরআন তেলাওয়াত করলো হুমায়রা। তেলাওয়াত শেষে তা নির্ধারিত স্থানে রেখে চলে যেতে নিলে পিছন থেকে নামাজ শেষ করে সালাম দিলো ইকরা। সালামের জবাব নিয়ে নিজেও পাল্টা সালাম দিলো হুমায়রা।

“ তুই কী আমার সাথে রেগে আছিস? ”
অনুতপ্ত কন্ঠে বলল ইকরা। উত্তরে সবেগে দু’দিকে মাথা দোলালো হুমায়রা। বলল,
“ নাহ, তোর সাথে কেন রাগ করবো? ”
“ তাহলে একটু বস আমার সাথে। ”
ইকরার কথায় ধীরপায়ে এগিয়ে এসে ইকরার পাশে বসল হুমায়রা। ইয়াসমিন বেগম ও আজমিন বেগম আরও আগেই চলে গেছেন। হুমায়রা পাশে বসতেই ইকরা বলে উঠলো,

“ আমি আম্মু- আব্বুকে অনেক নিষেধ করেছিলাম এই বিয়ের ব্যাপারে। তবে কেউই আমার কথা শুনে নি। সবাই মনে করছে তুই ভাইয়াকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে পারবি। সবার কথা নাহয় বাদই দিলাম আমার নিজেরই বিশ্বাস ইনশাআল্লাহ তুই পারবি। কিন্তু তার আগে তোকে অনেক কষ্ট সহ্য করতে হবে তাই আমি চাইনি তোর সাথে ভাইয়ার বিয়ে হোক। এমনিতেই তোর জীবনে কষ্টের কমতি নেই। কিন্তু এখন যেহেতু বিয়ে হয়েই গেছে সেহেতু আর কিছুই করার নেই। শুধু এইটুকু বলবো ভাইয়া সব দিক থেকে খারাপ হলেও মেয়ে ঘটিত ব্যাপারে তার কোনো খারাপ ঘটনা নেই। মেয়েদের থেকে ওঁ সবসময় দূরে থাকে- এক কথায় মেয়েদের নিয়ে ওঁর এলার্জি আছে বললেই চলে। আর নেশা, মারামারি এসবও ভার্সিটি উঠার পর থেকেই বৃদ্ধি পেয়েছে খারাপ সঙ্গ পেয়ে। আগে থাকলেও তা সিগারেট অব্দি সীমাবদ্ধ ছিল। এখনকার যুগ টাই তো এমন সব ছেলেরাই এখন বাবার টাকায় বসে বসে খায় আর ফুর্তি করে। ভাইয়ার ক্ষেত্রে তাই হয়েছে। ভাইয়ারও বিয়েতে মত ছিলো না, তবে আব্বু বলেছে বাড়ি থেকে বের করে দেবে। তাই বিয়েতে রাজি হয়েছে। বাড়ির বাইরে গিয়ে কাজ করে খাওয়ার ছেলে সে নয়। সবশেষে একটা কথাই বলবো- তুই ভাইয়াকে মেনে নিয়ে… ”

কথার মাঝেই তাকে থামিয়ে হুমায়রা শান্ত কন্ঠে বলল,
“ যার নামে সৃষ্টিকর্তার বিধান মেনে তিন কবুল উচ্চারণ করেছি আমি- তাকে মেনে না নেওয়ার স্পর্ধা আমার নেই। পুরো দুনিয়ার কাছে তিনি নেশাখোর, বখাটে হলেও আমার স্বামী হন তিনি। আর স্বামীর মর্যাদা সম্পর্কে তো তোকে বলতে হবে না। তুই এসব চিন্তা বাদ দিয়ে শুধু দোয়া কর আমি যেন ধৈর্য্য নিয়ে উনাকে সুপথে আনতে পাড়ি। ”
“ শুকরিয়া আমার প্রিয় সখি। যাই হোক আমি কিন্তু তোকে ভাবী হিসেবে পেয়ে ভীষন খুশি। ”
“ আচ্ছা এখন নিচে চল। ”
বলেই উঠে দাঁড়ালো হুমায়রা। সাথে ইকরাও উঠে পড়ল। তারপর দুই বান্ধবী এক সাথে হাঁটা ধরলো।

রান্না ঘরে এসে ইয়াসমিন বেগম ও আজমিন বেগমের উদ্দেশ্যে সালাম দিলো হুমায়রা। সালামের জবাব দিয়ে দুজনেই অমায়িক হাসি উপহার দিলো তাকে।
“ বড়ো আম্মু, আম্মু আজকে কী রান্না করতে হবে বলুন আমি করছি। ”
হুমায়রার বিনয়ী স্বরে বরাবরের মতোই মুগ্ধ হলো তারা। দুজনেই সন্তুষ্ট হলো। ইয়াসমিন বেগম নিজের পুত্রবধূর উদ্দেশ্যে বললেন,
“ এই তো এলে আমাদের বাড়িতে। এখনি কাজ করতে হবে না আম্মু। একসময় তোমাকেই সব করতে হবে। ”
“ আম্মু আজকে আমি আর ভাবী রান্না করি। আজকে তোমাদের ছুটি। ”
ইকরার কথায় হেসে উঠল দুই জা। আজমিন বেগম নিজের ছোটো জা এর উদ্দেশ্যে বললেন,
“ ইয়াসমিন চলো আমরা আজকে ছুটিই কাটাই। আজকে নাহয় আমাদের মেয়েরাই রান্না করুক। ”
“ আচ্ছা আপা চলুন। কিন্তু আগে একটু ওঁদের সবকিছু গুছিয়ে দিয়ে যাই। ততক্ষনে হুমায়রা গিয়ে কৃশানকে জাগাও নয়তো সে ছেলের ঘুম ভাঙবে না। ”
শাশুড়ির কথায় বাধ্য মেয়ের মতো মাথা দোলালো হুমায়রা। বলল,
“ ঠিক আছে আম্মু। ”

শাশুড়ির কথায় বাধ্য মেয়ের মতো রুমে তো এসে গেলো হুমায়রা। তবে কৃশানকে ডাকতে ভয় করছে তার। কাল রাতে যেভাবে কথা বলেছে এতে যেটুকু সাহস তার মধ্যে ছিলো সেটুকুও উধাও হয়ে গেছে। কিন্তু না ডেকেও কোনো উপায় নেই। অগ্যতা কৃশানের শিয়রের কাছে এগিয়ে আসলো সে। সৃষ্টিকর্তার নাম নিয়ে মনে সাহস যোগালো। অথচ সেই সাহস মরে গেলো আরেক নতুন চিন্তায়; কৃশানকে কী বলে ডাকবে সে? নাম ধরে তো কখনোই না। তাহলে কী বলা যায়? অনেকক্ষন দেনামোনা করে মিহি সুরে ডেকে উঠল,
“ শুনছেন? ”
কৃশানের তরফ থেকে কোনো আওয়াজ এলোনা। সে জে কতটা গভীর ঘুমে তলিয়ে আছে সেটা তার মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে।
“ এইযে শুনছেন? ”

এবারও কোনো সাড়া পাওয়া গেলো না কৃশানের। সাড়া না পেয়ে কৃশানের দিক কিয়ৎক্ষণ তাকিয়ে রইল হুমায়রা। রাতের অগুছালো শার্ট নিয়েই ঘুমিয়ে আছে সে। মুখ জুড়ে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। এলো মেলো ক’গাছি চুল ললাট অতিক্রম করে ঘন ভ্রু তে এসে লেগেছে। কতদিন চুল কাটে না আল্লাহ মালুম! তবুও মায়াবী লাগছে লোকটাকে। এ যেন এক অন্য কৃশান। ঘুমন্ত অবস্থায় এতো নিষ্পাপ লাগে বুঝি কোনো পুরুষকে?
ঘুমের মাঝেই নিজের কাছে কারো অস্তিত্ব টের পেলো কৃশান। নারীসুলভ ঘ্রাণ নাকে ভিড় জমাতেই তড়িৎ চোখ মেলে তাকালো সে। ভরকে গেল হুমায়রা। কৃশানের লালিত চোখ দেখে ভয়ে অন্তরাত্মা সুদ্ধ কেঁপে উঠল তার। মুখ খোলে কিছু বলতে নিবে তার আগেই শুয়া থেকে উঠে তার মুখ চেপে ধরলো কৃশান। তার হাত থেকে আসা এলকোহলের উৎকো গন্ধে নাড়িভুঁড়ি বেরিয়ে আসার উপক্রম হলো মেয়েটার। প্রাণপণ চেষ্টা চালালো কৃশানের হাত থেকে ছাড়া পাওয়ার।

“ সকাল সকাল আমার ইজ্জত লুটানের চেষ্টা করলি তুই। আবার তুই ঐ চিৎকার করতে যাস? মেয়ে মানুষ অভিনয়ের জন্য সেরা রে! ”
হুমায়রার দিক তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল কৃশান। কিন্তু হুমায়রার চোখে পানি দেখে হাসি বন্ধ হয়ে গেলো তার। তৎক্ষনাৎ ছেড়ে দিলো তাকে। ছাড়া পেতেই বড়ো বড়ো শ্বাস নিলো হুমায়রা। বমির ভাব আসছে তার। অবস্থা বেগতিক দেখে টেবিলে থাকা বোতল তার দিকে ছুঁড়ে দিলো কৃশান। বোতল নিয়ে পানি খেতে লাগল হুমায়রা। পুরোটা সময় তার দিক বিরক্তি নিয়ে তাকিয়ে রইল কৃশান। হুমায়রার পানি খাওয়া শেষ হতেই বলল,
“ নেক্সট টাইম আমার কাছে ঘেঁষবি তো পুঁটলি বানিয়ে যমুনায় ফেলে আসবো তোকে। ”
“ আপনি যা মনে করছেন তা নয়, আম্মু আপনাকে ডাকতে বলেছিল। তাই আপনার নিকট এসেছিলাম আমি।”
মিহি স্বরে মাথা নত করে বলল হুমায়রা। তার কথার পরিপ্রেক্ষিতে কৃশান বলল,
“ ডাকতে হলেও তিন মাইল দূর থেকে ডাকবি। এখন যা রুম থেকে। ”
বলেই ওয়ারড্রপ থেকে নিজের প্যান্ট শার্ট বের করে ওয়াসরুমে দিক হাঁটা ধরলো কৃশান। এর মাঝেই কোনোরূপ কথা ছাড়া রুম ত্যাগ করলো হুমায়রা। সেদিকে একবার তাকিয়ে কৃশান বলে উঠল,
“ নাজুক মেয়ে জাতি কোথাকার! থাপড়ে গাল লাল করতে মন চায় এইগুলার। ”

শাওয়ার নিয়ে একেবারে ভার্সিটির জন্য তৈরি হয়ে নিচে নেমে এলো কৃশান।ততক্ষনে সকালের নাস্তা বানানো হয়ে গেছে হুমায়রা ও ইকরার। কৃশানকে দেখেই ইয়াসমিন বেগম বললেন,
“ খেয়ে যা। ”
কপাল কুঁচকে গেলো কৃশানের। শেষবার কবে ঘরে খেয়েছিলো সে ঠিক মনে করতে পারলো না। এসব ঘরের ভাত, রুটি মোটেও পছন্দ নয় তার। সবসময় বাইরে খেয়ে অভ্যস্থ সে। প্রথম প্রথম ইয়াসমিন বেগম ঘ্যান ঘ্যান করলেও একসময় হার মেনে দমে গিয়েছিলেন তিনি। এরপর থেকে আর বিরক্তও করেনি কৃশানকে। আজ আবার কি হলো?
“ আমি যে ঘরের খাবার খাই না সেটা ভূলে গেছো নাকি তুমি? ”
কপাল কুঁচকে বলল কৃশান। উত্তর করলেন আজমিন বেগম,

“ আজকে তোর বউ রান্না করেছে…”
কথা সম্পূর্ণ করতে পারলেন না ভদ্রমহিলা। এর আগেই কৃশান বলে উঠলো,
“ বউ রান্না করেছে বলে কী খাবার মউ হয়ে যাবে নাকি! ”
” তুই কী ভালো করে কথা বলতে পারিস না? ”
রেগে বললেন ইয়াসমিন বেগম। মায়ের রাগে কিছুই এসে গেলো না কৃশানের। সে গা ছাড়া ভাব নিয়ে বলল,
“ নাহ ভালো আচরনের অ্যাপস ডাউনলোড হয়নি এখনো আমার ভিতর। ”
“ মানুষ হবি না তুই আর। ”
“ জানোই যেহেতু কথা বাড়াতে আসো কেন? সবাই মানুষ হলে সমাজ চলে না। ”
“ তোর যা ইচ্ছা তাই কর। তুই ঘরে না খেলে তোর বউয়েরও খাবার নেই। ”
ছোটো জা এর হাত ধরে রেখে আজমিন বেগম কাটকাট গলায় বলে উঠলেন। তার কথায় রেগে গেলো কৃশান। বলল,

“ কী বউ বউ শুরু করেছো! ঐ মেয়েকে কী আমি শখ করে বিয়ে করে এনেছি নাকি! ”
“ যেভাবেই এসেছে সেটা দেখার বিষয় নয়। যা বলেছি তাই হবে। ”
“ তোমাদের যা ইচ্ছা তাই করো, খেতে দিলে দাও নয়তো না খাইয়ে মেরে ফেলো এতে আমার কিছু যায় আসেনা। আমার কাছে এসব বলবে না। ”
কথাগুলো বলে এক দন্ডও আর সেখানে দাঁড়ালো না সে। ধুপধাপ পা ফেলে বেড়িয়ে এলো বাড়ি থেকে। তার যাওযার পানে ব্যার্থ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন দুই জা। ইয়াসমিন বেগম বড়ো জা এর উদ্দেশ্যে বললেন,
“ এটা কেন বলতে গেলেন আপা? ”
“ ভেবেছিলাম বউয়ের কথা শুনলে হয়তো মানবে। ”

হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ১

অনুতপ্ত স্বরে উত্তর করলেন তিনি। এর মাঝেই ড্রয়িং রুমে উপস্থিত হলেন খলিল মির্জাও জলিল মির্জা। দুভাই এতক্ষন ছাদে ছিলেন। তাই কোনোকিছুই টের পাননি তারা। তাদের দেখতেই স্বাভাবিক হয়ে তাদের খাবার খেতে দিলেন দুই জা। এসব বিষয়ে আর কোনো কথা বাড়িয়ে অশান্তি সৃষ্টি করতে চাইলেন না কেউই।
রান্নাঘর থেকে কৃশানের প্রত্যেকটা কথাই শুনেছে হুমায়রা। চোখ দিয়ে গড়িয়ে পরলো দু’ফোঁটা অশ্রুকণা। তবে তা কারো কাছে প্রদর্শিত হওয়ার আগেই মুছে ফেলল সন্তর্পনে।

হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ৩