হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ৭
সিনথিয়া ইসলাম সীমা
নিঃস্তব্ধ গভীর রাত। আকাশে আজ তারাদের স্থান নেই। কালো মেঘেদের আড়ালে চাঁদ ঢাকা পড়েছে আগেই। ঘুটঘুটে আঁধারে তলিয়ে আছে চারিপাশ। দিনের কোলাহল থেমে গিয়ে প্রকৃতি এখন রূপ নিয়েছে নির্জনতায়। আশেপাশে জনমানবের কোনো আনাগোনা নেই। হাঁটা চলার শব্দ নেই। শুধু দূর থেকে মাঝে মাঝে ভেসে আসছে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। কখনো বা সামনে এসে পড়ছে জোনাকির দল। থেকে থেকে হাঁক ছাড়ছে নিঃসঙ্গ কুকুর।
শহরের সব ব্যাস্ততাকে এড়িয়ে গাছ পালায় ঘেরা একটা অন্ধকার জায়গায়, বড়ো বট গাছটার সাথে হেলান দিয়ে মাতাল অবস্থায় বসে আছে কৃশান। তার সামনেই ঘাসের উপর মাতাল হয়ে পড়ে আছে রবি, সাইফুল ও অভি। আজকে কৃশানের পাল্লায় পড়ে নিত্যদিনের তুলনায় একটু বেশিই খেয়ে ফেলেছে তারা। যার দরুণ উঠে দাঁড়ানোও কষ্টসাধ্য হয়ে উঠেছে। অথচ কৃশান এখনো থেমে নেই একের পর এক বোতল গিলেই যাচ্ছে সে। তাও যেন ভিতরের আগুন নিভছে না। কোনোমতেই শান্তি মিলছে না। ভিতরের সত্ত্বা যেন আজ আগুনের লাভায় পরিনত হয়েছে। সহসা উত্তপ্ত মাটির সঙ্গে শীতল অম্বরের মিলন ঘটাতে মেঘমালা ভেদ করে শুরু হলো তুমুল বর্ষণ। বৃষ্টির ঠান্ডা পানি শরীর স্পর্শ করতেই সম্বিৎ ফিরলো চার বন্ধুর। মনের দোয়ারে উদয় হলো বাড়ি ফিরার তাড়া। সকলে উঠে দাঁড়ালো টালমাটাল শরীর নিয়ে। ঝাপসা ঝাপসা চোখে চারপাশ পরখ করে কৃশান বলল,
“ ম*রার বৃষ্টিটা কী আজকেই নামতে হলো? ”
“ কী আর করার! চল বাসায় ফিরতে হবে। ”
একসাথে হাটতে লাগলো চার জোড়া পা। প্রত্যেকে এদিক সেদিক হেলে পড়ছে বারংবার। নিঃস্তব্ধ রাস্তায় বৃষ্টির পানির মাঝে শুধু তাদের হাঁটার শব্দই শুনা যাচ্ছে।
সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলেছে হুমায়রার চিন্তা। প্রকৃতির হঠাৎ পরিবর্তনে সেই চিন্তার মাত্রা আরও ভারী হয়ে উঠেছে। এতক্ষনে ঘুমিয়ে পড়ার কথা ছিলো তার। কিন্তু সন্ধ্যায় কৃশানের গালে থাপ্পড় মারার সেই দৃশ্যটা দেখার পর এক দন্ড স্বস্তি পায়নি মেয়েটা। পুরোটা সময় শুধু মানুষটার রাগী মুখটা মানস্পটে ভেসে উঠেছে। রাগের বশে কী না কী করে বসে- সেই ভাবনায়ই কেটেছে প্রতিটা মুহূর্ত। সে জানে কৃশান নিজের দোষেই মার খেয়েছে তবুও কেন যেন ভিতরটা ছটফট করছে তখন থেকে। অথচ কৃশানের ফেরার ভয়ে চুপসে থাকার কথা ছিলো তার। আবারও দেয়ালে টানানো ঘড়িতে সময় চেক করলো। ঘড়ির কাঁটা টিকটিক করে রাত দুটোর ঘর পেরিয়ে গেছে। মনে মনে দোয়া দুরুস পড়তে লাগলো হুমায়রা।
তখনি রুমের দরজা ঢেলে ভেজা শরীর নিয়ে টালমাটাল পায়ে ভিতরে প্রবেশ করলো কাঙ্ক্ষিত ব্যাক্তি। তাকে দেখে যেন দেহে প্রাণ ফিরে পেলো রমনী। তৎক্ষনাৎ বিছানা ছেড়ে নেমে পড়লো। ওয়াশরুমের দরজায় টানানো স্বামীর তোয়ালে নিয়ে এগিয়ে গেলো তার নিকট। দু-কদম এগোতেই কানে এলো কৃশানের প্রবল নিষেধাজ্ঞা,
“ এই মেয়ে এই, দূরে থাক আমার থেকে। ”
শরীরে বিন্দুমাত্র জোর নেই ছেলেটার অথচ মুখ দিয়ে এখনো চড়া কথা বেরোনো থামছে না। হুমায়রাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে দুর্বল শরীরটা কাউচের সাথে হেলিয়ে ফ্লোরে বসে পড়লো। হালাত বেগতিক দেখে আগে থেকে বানিয়ে আনা লেবুর শরবতটা টেবিল থেকে নিয়ে তার দিক বাড়িয়ে দিলো হুমায়রা। বলল,
“ এটা খেয়ে নিন, ভালো লাগবে। ”
মানুষটার রক্ত চক্ষু এবার সরাসরি হামায়রার দিকে তাক করলো। অভ্যস্ত চোখ জোড়া এবেলায় ত্রাস সৃষ্টি করতে পারলো না মেয়েটার মনে। ব্যাপারটা বোধ হয় সহ্য হলো না কৃশানের। বাড়িয়ে রাখা গ্লাসটা বিনাবাক্যে হাতে নিলো সে। এতে করে যেই না সামান্য খুশি কুড়াতে যাবে হুমায়রা ওমনিই সেই খুশিতে পানি ঢেলে দিয়ে কাচের গ্লাসটা ফ্লোরের সাথে বাড়ি মেরে ভেঙে ফেললো কৃশান। কয়েকটা ভাঙা টুকরো তার হাতের তালুতে ঢুকে গিয়ে পানির সাথে মিশে রক্তের স্রোত বইয়ে দিলো সাদা ফ্লোরে। চোখ বড়ো বড়ো হয়ে গেলো হুমায়রার। আতঙ্কিত স্বর কণ্ঠনালি থেকে বেরোনোর আগেই গলদেশে একটা লম্বা কাচের টুকরো ঠেকিয়ে ধরলো কৃশান। বলল,
“ মরার খুব ইচ্ছা তোর না? বলেছি না আমার থেকে দূরে থাকতে? কথা কানে যায় না? ফেলে দেই গলাটা? ”
“ দোহায় লাগে, ছাড়ুন আমায়। কেটে যাচ্ছে তো! ”
কৃশানের হাত ধরে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে বললো মেয়েটা। এবার বুঝি সত্যিই নিজের প্রাণ হারাতে যাচ্ছে সে। সামনে থাকা মানুষটা বুঝি আজ ছাড়বে না তাকে। কিন্তু সহসা কোনো কথা ছাড়াই তাকে ছেড়ে দিলো কঠোর মানব। মাথাটা এলিয়ে দিলো কাউচে। হুমায়রা ভীতু চোখে চাইলো তার মুখপানে। বড্ডো ক্লান্ত মনে হলো মানুষটাকে। হাত থেকে এখনো গরগর করে তাজা রক্ত বেরোচ্ছে। নিঃশব্দে উঠে দাঁড়ালো হুমায়রা। ওয়ারড্রপ এর উপর থেকে ফাস্ট এইড বক্স নিয়ে ফিরে এলো ধীর পায়ে। সন্তর্পণে বসলো নেতিয়ে পড়া স্বামীর কাছে। কাটা হাতটা সযত্নে আগলে নিয়ে তুলো দিয়ে মুছতে লাগলো ক্ষত স্থান। এর মাঝেই খানেক নড়ে উঠলো কৃশান। তবে শরীরের দুর্বলতার কারণে বাধা দিতে ইচ্ছে হলো না। কিছুক্ষনের মধ্যেই দক্ষ হাতে ব্যান্ডেজের কাজ শেষ করলো হুমায়রা। পরপর ফাস্ট এইড বক্স যথা স্থানে রেখে আবারও ফিরে এলো আগের জায়গায়। তোয়ালেটা হাতে নিয়ে ভাবতে লাগলো কিছু একটা। এভাবে ভেজা চুলে বেশিক্ষণ থাকলে তো ঠান্ডা লেগে যাবে। মুছতে গেলে যদি আবারও রেগে যায়? কিন্তু না মুছলেও তো হবে না। অগ্যতা সব দেনামোনা সাইডে ফেলে কৃশানের মাথায় হাত রাখলো সে। বিপদের দোয়া পড়তে পড়তেই হাত বুলালো। আলহমাদুলিল্লাহ, এবারও কোনো বাধা এলো না অপরপক্ষ থেকে। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো হুমায়রা। সৃষ্টিকর্তার নিকট শুকরিয়া আদায় করলো। কাজ শেষে হলে সরে আসতে নিলো তখনি ভেসে আসলো কৃশানের অস্পষ্ট স্বর,
“ ছেলেরা একটু বড়ো হলেই মা- বাবারা কেন এমন করে? ”
অপ্রত্যাশিত বাক্যটি কর্ণপাত হতেই থমকে গেলো মেয়েটা। পূর্ণদৃষ্টি নিক্ষেপ করলো সামনের মানুষটার পানে। কী মায়াবী লাগছে এখন মানুষটাকে! মুহূর্তেই কিছুক্ষণ আগের সব ভুলে গেলো। পাশে বসলো স্বামীর। নরম স্বরে জিজ্ঞেস করলো,
“ কেমন করে? ”
একটু সময় নিয়ে ওপাশ থেকে উত্তর এলো,
“ ছেলেকে বোঝা মনে করে, কাজ না করলে একটুও ভালোবাসে না। ”
“ তাহলে কাজ করলেই তো হয়। ”
“ কাজ করতে কষ্ট হয়। ”
“ আপনি এখন পূর্ণাঙ্গ যবুক। এই সময়ে শরীরে সবচেয়ে বেশি শক্তি থাকে। তারপরেও যদি আপনার কাজ করতে কষ্ট হয় তাহলে ভাবুন তো আপনার বয়স্ক বাবার কাজ করতে কতোটা কষ্ট হয়? সেই যুবক বয়স থেকে কাজ করতে করতে কতোটা কষ্ট ভোগ করেছেন তিনি। তবুও তো আপনাদের খরচ চালাতে পিছুপা হয়নি। এখন আপনি উপযোক্ত হয়েছেন। আপনার মাধ্যমে একটু নিজেকে স্বস্তি দেওয়ার আশা করাটা কী তার অন্যায়? এতো কষ্টের পরিবর্তে বাবাকে সাহায্য করে তাকে একটু বিশ্রাম দেওয়াটা কী ছেলের উচিত নয়? ”
কোনো উত্তর এলো না ওপাশ থেকে। হুমায়রার কথা গুলো মনে ধরেছে কৃশানের। ভিতরে থাকা আগুনটা নিভে গেলো অজান্তেই। এতগুলো মদের বোতল শেষ করেও যেই আগুন নিভানো গেলো না সেই আগুন সামান্য কিছু কথার সাথেই ধুয়ে মুছে গেলো। এবার শান্তি অনুভব হচ্ছে তার।
“ কিছু বলছেন না যে? ”
এবারও উত্তর দিলো না কৃশান। অকস্মাৎ বসা থেকে উঠে বিছানার দিক যেতে যেতে বলল,
“ তুই বেশি কথা বলিস হুজুরনী। সর আমি ঘুমাবো। ”
কেন যেন হাসি পেলো মেয়েটার। মুচকি হেসে বলে উঠলো,
“ দয়া করে কাপড় গুলো পাল্টে ঘুমান। নয়তো শরীর খারাপ করবে। ”
কথা শুনলো না সে। ধপ করে গিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লো। কিছুক্ষণ বিছানার দিক তাকিয়ে রইলো মেয়েটা। পরপর ফ্লোরে কাচ গুলো পরিষ্কার করে ফ্লোর মুছতে লেগে পড়লো। কাজ শেষে ময়লা গুলো রুমের ঝুড়িতে ফেলে এসে শুতে নিবে এর আগেই বিছানা ছেড়ে ওয়াশরুমে ঢুকতে দেখা গেলো কৃশানকে। ভেবেছিলো এভাবেই ঘুমিয়ে পড়বে তবে শরীর কেমন যেন ম্যাচম্যাচ করছে। সহ্য করতে না পেরে বাধ্য হয়েই কাপড় পাল্টাতে হলো। কোনোমতে কাপড় গুলো গায়ে জড়িয়ে এসে পুনরায় বিছানায় গা এলিয়ে দিলো। অতঃপর হুমায়রাও রুমের লাইট অফ করে শুয়ে পড়লো।
ঘণ্টা খানেক বাদেই ফজরের আযান পড়লো মসজিদের মাইকে। আযানের ধ্বনি কানে পৌঁছাতেই ঘুম ভেঙে গেলো হুমায়রার। ভালো ঘুম না হওয়ায় চোখের পাতা গুলো ভারী হয়ে উঠেছে। বহু কষ্টে আঁখি যুগল মেলে তাকালো মেয়েটা। অলসতা ঝেড়ে আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসলো। পরপর পা বাড়ালো ওয়াশরুমের দিক। ফ্রেশ হয়ে ওযু করে চলে গেলো নামাজঘরে। সেখানে গিয়ে দেখা মিললো কাঙ্ক্ষিত তিনটি মানুষের। ইকরা মাত্রই এসেছে এখনো নামাজে দাঁড়ায়নি সে। হুমায়রাকে দেখতেই মুচকি হেসে সালাম চুকলো।
হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ৬
সালামের জবাব দিয়ে উল্টো সালাম দিলো হুমায়রাও। তারপর কথা না বাড়িয়ে নামাজে বসলো দুই বান্ধবী। দেখতে দেখতে সকলের নামাজ আদায় থেকে শুরু করে কোরআন তেলাওয়াতের পর্ব শেষ হয়ে গেলো। একে একে সকলে ত্যাগ করলো নমাজঘর। শুধু রয়ে গেলো একজন রমনী। প্রতিদিনের মতোই স্বামীর হেদায়েতের জন্য আলাদা নফল নামাজের সিজদায় মাথা ঠেকালো সৃষ্টিকর্তার নিকট। তার স্বচ্ছ চোখের পানিতে ভেজলো জায়নামাজ। সেই কান্নার একমাত্র সাক্ষী রইলো তার সৃষ্টিকর্তা।
