Home হ্যালো 2441139 হ্যালো 2441139 পর্ব ৩০

হ্যালো 2441139 পর্ব ৩০

হ্যালো 2441139 পর্ব ৩০
রাজিয়া রহমান

অন্ধকার নেমে এসেছে চারদিকে। দিন এবং রাতের মধ্যকার সেতুবন্ধন হিসেবে প্রকৃতিতে নেমে আসে সন্ধ্যা। এক নরম,কোমল,বিষণ্ণ অন্ধকার বুকের ভেতর হাহাকার তৈরি করে দেয়। তেমনই হাহাকার আজকে রজনীর বুকের ভেতর।
কনফার্ম হওয়া চাকরিটা সে জয়েন হতে পারে নি।
মাঝেমধ্যে কেনো এসব পুরনো স্মৃতি নাড়া দেয় রজনী জানে না।
পিয়াসার মনে পড়ছে বাবা মা’য়ের কথা। বাবা মা’য়ের মধ্যে আন্ডারস্ট্যান্ডিং যে কতোটা গুরুত্বপূর্ণ তা এখন পিয়াসা বুঝতে পারছে।
তার বাবা মা দুজনেই যেনো বলার আগেই একে অন্যের মনের কথা বুঝতে পারে। বুঝতে পারে বলেই তাদের মনের দূরত্ব নেই।তা না হলে সিরাজ আংকেল আর রজনী আন্টির মতো হতো। ফ্যামিলি প্রব্লেম একটা মানুষের জীবনে অনেক বড় প্রভাব ফেলে।
এই যে আষাঢ়কে দেখে,একটা মানুষ সারাক্ষণ চেষ্টা করে কিভাবে দুই পক্ষকে মিলেমিশ করে রাখা যায়।
এই যে একটু আগে আষাঢ় এসেছে পিয়াসার কাছে।
আষাঢ়ের পরামর্শ মতো পিয়াসা তৈরি হয়ে বের হলো। রজনী আন্টি একটা সুতির শাড়ি পরেছে।
পিয়াসা এসে আন্টিকে জড়িয়ে ধরলো। রজনীর গলা জড়িয়ে ধরে বললো, “আন্টি,আসো আমি তোমাকে সাজিয়ে দিই। ”

“এই তো এটুকু পথ,কি সাজগোজ করবো বল?”
“না আন্টি,এই কথা বলো না।আমি তোমাকে একটু সাজিয়ে দিতে চাই।”
রজনী পিয়াসার আগ্রহ দেখে আর অমত করলো না।
পিয়াসা রজনীকে সাজিয়ে দিয়ে বললো, “এবার শাড়িটি চেঞ্জ করে নাও।”
রজনী বাধ্য মেয়ের মতো শাড়ি চেঞ্জ করে একটা সিল্কের শাড়ি পরে নিলো।
বহুদিন পর দুই চোখ ভরে কাজল দিলো,কানে পিয়াসা ফুল গুঁজে দিলো।
এতো যত্ন করে শেষ কবে শাড়ি পরেছে,সেজেছে রজনীর মনে নেই।
দুই গালে মেছতার দাগ পড়ে গেছে। অথচ এক সময় কতো যত্ন করতো নিজের চেহারার।
সংসারের দায়িত্বের যাঁতাকলে পিষে আজ নিজের মুখের দিকে তাকালে মনে হয় পুড়ে যাওয়া রুটি।
এই জীবন এমন কেনো?
এতো শিকলবন্দী জীবন তো রজনী চায় নি।সে তো ছিলো মুক্ত পাখির মতো।
অথচ বন্দী হয়ে গেলো এই তথাকথিত জমিদার বাড়ির রান্নাঘরে।
অবশ্য জমিদার বাড়ির রাঁধুনি হয়েছে, এর মূল্য তো তাকে চুকাতেই হবে।
ভাবতে ভাবতে রজনীর দুই চোখ ভিজে আসে।চোখের কাজল লেপ্টে যায় মুহূর্তে।
বুকের ভেতর থেকে হুহু করে কান্না আসছে।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

আষাঢ় এসে পাঞ্জাবীর কোণা দিয়ে মায়ের চোখের কাজল মুছে দিলো।ধবধবে সাদা পাঞ্জাবীতে কাজলের কালো লেগে গেলো।অথচ আষাঢ় সেটা নিয়ে ভাবে নি।
এক মুহূর্তে পিয়াসার মনে হলো এই বন্য মানুষটা অতটাও মন্দ না বোধহয়।
সিরাজুল ইসলাম মহুয়া বেগমের রুমে গেলেন।মহুয়া বেগম ছেলেকে দেখেই বিরক্ত হয়ে বললো, “রজনী কোথায়?এখনো আমার নাশতা আনলো না ক্যান?”
সিরাজুল ইসলাম হেসে বললো, “রজনী এখন নাশতা বানাতে পারবে না মা।ও আমার সাথে ঘুরতে যাচ্ছে। আমরা লম্বা একটা ট্যুর দিচ্ছি।অনির্দিষ্টকালের জন্য বাসায় থাকবো না।
প্রায় ৩০ বছর ধরে এই সংসারের জোয়াল রজনী বইছে,ওর এবার বিশ্রাম দরকার। আমি অনেক অন্যায় করেছি মা,মা এবং বউয়ের মধ্যের ব্যাপারটা আমি কখনোই বুদ্ধিমানের মতো হ্যান্ডেল করতে পারি নি।আজ যখন নিজের ছেলে দেখিয়ে দেয় আমার ভুল,আমি লজ্জিত হই মা।আমার মাটির সাথে মিশে যেতে ইচ্ছে করে। মাঝেমাঝে ভাবি আমার ছেলের মতো বুদ্ধিমান আমি কেনো হতে পারলাম না মা?
পরমুহূর্তে মনে পড়ে, আমার মা মহুয়া বেগম আর আষাঢ়ের মা রজনীগন্ধা।
আমার মা আমাকে শিখিয়েছে কিভাবে স্ত্রীকে শাসন করা যায়,কিভাবে স্ত্রীকে পায়ের জুতার মতো ব্যবহার করা যায়।
কিন্তু রজনী তার ছেলেকে শিখিয়েছে স্ত্রী মাথার তাজের মতো। তাকে যদি তুমি রানী করে রাখতে পারো তাহলে তুমি ও রাজার মতো সম্মান পাবে।

অনেক দিনের জমানো ক্ষোভ,অভিমান বুকে জমিয়ে রজনী যখন আমার সাথে হাসিমুখে কথা বলে, আমার তখন নিজেকে ভীষণ অপরাধী মনে হয়। শিক্ষিত হয়েছি,বড় চাকরিজীবী হয়েছি,মায়ের সুযোগ্য পুত্র হয়েছি,সন্তানের পিতা হয়েছি কিন্তু স্ত্রীর কাছে হিরো হতে পারি নি।
জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে আজ ইচ্ছে করছে একবার স্ত্রীর কাছে হিরো হতে হবে।”
মহুয়া বেগমের মুখে যেনো আষাঢ়ের মেঘ জমেছে। এতো বড় সিদ্ধান্ত তাকে না জানিয়ে নিয়েছে!
তাহলে কি তার গুরুত্ব শেষ হয়ে গেছে পুরোপুরি?
সিরাজুল ইসলাম বের হলেন।
আষাঢ় গাড়ি বের করে। তারপর গাড়ি থেকে নেমে গাড়ির দরজা খুলে পিয়াসাকে বললো, “উঠো।”
পিয়াসার আবারও বাবার কথা মনে পড়ে গেলো। বাবা ও তো এভাবেই তাকে যত্ন করে।
সিরাজুল ইসলাম আষাঢ়ের দেখা দেখে রজনীকে গাড়ির দরজা খুলে দিলো।রজনী অবাক হয়ে স্বামীর দিকে তাকায়। কবে এভাবে সিরাজুল ইসলাম তার প্রতি ভালোবাসা দেখিয়েছে তা রজনীর মনে পড়ছে না।
পিয়াসার কেমন বুক কাঁপছে। তাকে কেনো এই মানুষটার পাশে বসে যেতে হচ্ছে!
এক বুক অস্বস্তি নিয়ে পিয়াসা আষাঢ়ের পাশে বসে।

গাড়ি চলছে এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে। খোলা জানালা দিয়ে বাতাস এসে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে পিয়াসার খোলা চুল।
আষাঢ় মুগ্ধ হয়ে তাকায়।
এই মেয়ে কি তাকে মুগ্ধ করতে করতে শেষ করে ফেলবে?
সে কি জানে না,তার প্রতিটি নিশ্বাসে আষাঢ় মুগ্ধ হয়?
জানবে না কখনো।
এয়ারপোর্টে এসে রজনী প্রথম বারের মতো চমকায় যখন পিয়াসা আর আষাঢ় দুজনেই বললো, “আল্লাহ হাফেজ আন্টি,আংকেল।আপনাদের ভ্রমণ আনন্দদায়ক হোক।”
রজনী হতবিহ্বল হয়ে তাকিয়ে রইলো। সিরাজুল ইসলাম স্ত্রীর পাসপোর্ট বের করে বললো, “এই ট্যুর একা আমার না,আমাদের দুজনের। এই ট্যুরের স্পন্সর তোমার ছেলে।”

হ্যালো 2441139 পর্ব ২৯

রজনী অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকায়। আষাঢ় পিয়াসার হাত ধরে টেনে নিয়ে যেতে লাগলো।
পেছন থেকে তাকিয়ে রজনীর হঠাৎ করে মনে হলো, এই হাতটা যদি আষাঢ় আজীবন ধরে রাখতো।
কিন্তু তা কি হবে?
পিয়াসার সবকিছু জানার পর কি কেউ মেনে নিবে কখনো?

হ্যালো 2441139 পর্ব ৩১