হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ১০ (২)
সাবা খান
বাংলাদেশে তখন প্রায় রাতের শেষভাগ চলছে। শহরের আলো ধীরে ধীরে নিভে যাচ্ছে। রাস্তাগুলো ফাঁকা হয়ে এসেছে। মনে হচ্ছে পুরো পৃথিবী ঘুমিয়ে পড়েছে। কিন্তু ঘুমন্ত পৃথিবীর মধ্যেও সিআইডি ব্যুরোর একটা তলা এখনো জেগে আছে। একটা রুমের দরজার ফাঁক দিয়ে আলো বেরিয়ে আসছে। ভিতরে বসে আছে এসিপি সিতারা আদিল। তার সামনে থাকা বড় কাঠের ডেস্কের ওপর ছড়িয়ে আছে, অসংখ্য কাগজ, ফাইল, ক্রাইম রিপোর্ট, ম্যাপ, পুরোনো ডকুমেন্ট, ফটোগ্রাফ।কিছুতে লাল মার্কার দিয়ে দাগ টানা, কিছুতে প্রশ্নবোধক চিহ্ন। রমণীর চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট, মনে হচ্ছে বহুদিন ঘুম হয়নি। সে চুপ করে বসে আছে চেয়ারে হেলান দিয়ে। তার আঙুলের মাঝে একটা পুরোনো ছবি ধরা। ছবিটাতে দুজন হাসি দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, একজন সে নিজে, আর পাশে দাঁড়িয়ে হাসছে তার বড় ভাই,
“তালহা আদিল”
ছবিটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে ওঠে। অজান্তেই চোখের কার্নিশ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে একফোঁটা অশ্রুজল। সে হাত দিয়ে তা মুছে ছবিটার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল।
ছয় বছর, পুরো ছয় বছর হয়ে গেছে। এই ছয় বছরে সে কি করেনি, সে দেশের প্রতিটা বড় শহরের পুলিশ স্টেশনে খোঁজ করেছে, ইমিগ্রেশন রেকর্ড চেক করেছে, বন্দর আর এয়ারপোর্টের সিসিটিভি ফুটেজ ঘেঁটেছে।
পুরোনো ফোন রেকর্ড, ব্যাংক ট্রানজ্যাকশন, সবকিছু বের করেছে, গোপনে আন্ডারওয়ার্ল্ডের ইনফরমারদের সাথেও যোগাযোগ করেছে, মাঝরাতে অচেনা বন্দর এলাকায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে, শুধু কোনো একটা নাম শোনার আশায়। সিতারা আন্তর্জাতিক ক্রাইম ডাটাবেসও ঘেঁটেছে, ইন্টারপোল পর্যন্ত ফাইল পাঠিয়েছে, পাসপোর্ট ডাটাবেসে খুঁজেছে, নকল আইডেন্টিটি, ফেক পাসপোর্ট সব সম্ভাবনা যাচাই করেছে।
কিন্তু কোথাও তালহার নাম নেই আর না মানুষ টা। একটা মানুষের যেন হঠাৎ করে পৃথিবী থেকে মুছে যাওয়া সম্ভব?
কোনো ক্লু নেই, কোনো ট্রেস নেই, কোথায় গেল সে? বেঁচে আছে? নাকি…..
এই প্রশ্নটা ভাবতেই সিতারা চোখ বন্ধ করে নিল। এবার অঝোরে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রুজল। নাহ, সে কখনো এইটা ভাবতে চায় না। তালহা শুধু তার ভাই না, সে তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভরসা ছিল। আর সেই মানুষটাই হঠাৎ একদিন, গায়েব হয়ে গেল। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো তালহা যে কেসটা নিয়ে কাজ করছিল, সারহাদের বাবা ও দাদার খু*নিদের নিয়ে তার সব তথ্য তার কাছেই ছিল, সব নোটস, সব প্রমাণ যা যা সে কালেক্ট করতে পেরেছে, সব গোপন ফাইল। সিতারা সেই কেসটা এগিয়ে নিতে পারছে না। কারণ, পাজলের অর্ধেক অংশটাই নেই। সে হতাশ হয়ে কপালে হাত চাপা দেয়। মনে হয় যেন মাথাটা ফেটে যাবে।। ঠিক তখনই, তার মাথায় আবার ভেসে ওঠে সেই দিনের স্মৃতি, ছয় বছর আগের দিনটা। সেদিন সিতারা গিয়েছিল গিনিতে, তারপর তাকে শহরের বাইরে টান্সফার করে দেওয়া হয়েছে এক মাসের জন্য, সেখান থেকে ফিরেই আর তার ভাই কে সে খুঁজে পায়নি।
তার গিনিতে যাওয়ার উদ্দেশ্য ছিল, একজন মানুষের সাথে দেখা করা,
‘সারহাদ চৌধুরী’
সে যখন সেই বিশাল কম্পাউন্ডের ভেতরে ঢুকেছিল, প্রথমবার দূর থেকে সারহাদকে দেখেই তার বুকটা হঠাৎ কেঁপে উঠেছিল। কেননা, তার চোখের সামনে ভেসে উঠেছিল বহু পুরোনো স্মৃতি।
কলেজ জীবনের কথা, তখন সে ছিল শুধু একজন সাধারণ মেয়ে। আর দূর থেকে সে মাঝে মাঝে তাকিয়ে দেখতো একজন ছেলেকে, যে ছিল চুপচাপ, নির্লিপ্ত, সবসময় একা, সে আর কেউ না ‘সারহাদ’
ক্লাসের কেউই তার সাথে ঠিকমতো কথা বলতে পারতো না, তার কোনো বন্ধু ছিল না।কেউ বন্ধুত্ব করতে চাইলে, সে নিজেই দূরে সরে যেত। যখন সবাই আড্ডা দিতে ব্যস্ত থাকতো, তখন সারহাদ একা একা বসে ঐ আকাশ টার দিকে চেয়ে থাকতো, আর অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা এক কিশোরীও নিঃশব্দে তাকিয়ে থাকতো।
সারহাদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নাতি হওয়ার দরুন তার চারপাশে সবসময় নিরাপত্তা ছিল। কলেজ ক্যাম্পাসের বাইরে প্রায়ই কালো গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকতো, সিকিউরিটি গার্ডরা ছায়ার মতো তাকে ঘিরে রাখতো। কিন্তু তবুও, সেই মানবের চোখে সবসময় একটা অদ্ভুত নিঃসঙ্গতা ছিল। সিতারা মাঝে মাঝে দূর থেকে তাকিয়ে দেখতো তাকে। কেন জানি তার চোখে সেই নিঃসঙ্গতা দেখে তার মায়া হতো। কখনো কথা বলেনি, কখনো পরিচয়ও হয়নি, শুধু দূর থেকে দেখেছে, এক পুরুষকে। যে সবসময় নিজের চারপাশে অদৃশ্য একটা দেয়াল তুলে রাখতো।
সারহাদ কোন দিকে না তাকিয়ে সোজা নিজের কেবিনে চলে যায়। একজন স্টাফের ডাকে সিতারার ভ্রম ছুটে যায়। সে ধীর কদমে এগিয়ে যায় সারহাদের কেবিনের দিকে। দরজায় নক হতেই সারহাদ একবারও মাথা তোলে না। শুধু শান্ত গলায় বলে,
-“কাম ইন”
দরজা খুলে ভেতরে ঢোকে এসিপি সিতারা আদিল। সে কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থাকে সামনের মানুষটার দিকে তাকিয়ে। বহু বছর আগের সেই কলেজের ছেলেটা, এখন একেবারে অন্য মানুষ দেখাচ্ছে তাকে, আরও কঠিন, আরও নিঃসঙ্গ, আরও দূরের। রমণীর বুকের ধুকপুকানি যেন হঠাৎ করেই বেড়ে গেল। সে অজান্তেই একটা শুকনো ঢোক গিলে। তারপর নিজের ভেতরের সব অনুভূতি শক্ত করে বন্ধ করে দেয়। এখানে সে এসেছে, একজন অফিসার হিসেবে, পুরোনো স্মৃতি নিয়ে নয়। আর সামনে যে মানুষটা দাঁড়িয়ে আছে, সে তার কলেজের সেই নিঃসঙ্গ সাদ নয়। সে এখন, ‘সারহাদ চৌধুরী’
একজন ক্ষমতাবান মানুষ। আর হয়তো একজন অপরাধীও। সিতারা ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় তার দিকে। সারহাদ তখনও নিচের দিকেই তাকিয়ে হালকা গলায় বলে,
-“টেক আ সিট, মিস আদিল”
সিতারা কিছু না বলে সামনে চেয়ারে বসে।
তার চোখ বারবার আটকে যাচ্ছে সারহাদের মুখে। মনে হচ্ছে যেন সে মানুষটাকে পড়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু সারহাদের মুখে কোনো অনুভূতি নেই। একটা দীর্ঘ শ্বাস নিয়ে সিতারা নিজেকে সামলে নেয়। তারপর ফাইল খুলে বলে,
-“মিস্টার সারহাদ চৌধুরী, গত সপ্তাহের মিস্টার ওয়াসিম হায়দারের সেক্রেটারির খু*নের ঘটনাটা নিয়ে আমরা তদন্ত করছি”
সারহাদ এবার ধীরে মাথা তোলে নিরেট দৃষ্টিতে তাকিয়ে ঠান্ডা স্বরে আওড়ায়,
-“দ্য মার্ডার হ্যাজ নাথিং টু ডু উইথ মি”
সিতারা চোখ সরু করে তাকায়,
-“ঘটনাস্থলের কাছেই আপনার কোম্পানির ওয়্যারহাউস। সেই রাতে আপনার কয়েকজন লোকও সেখানে ছিল”
-“ওয়্যারহাউসটা লিজে দেওয়া। ওই রাতে কে ছিল, কে ছিল না, আমি প্রতিটা শ্রমিকের তালিকা রাখি না”
-“ঘটনার রাতে আপনি কোথায় ছিলেন?”
-“ঢাকায়”
-“কার সাথে?”
-“নিজের সাথে”
সিতারা থতমত খেয়ে গেল, এ কেমন উত্তর, নিজের সাথে। তারপর আবারও প্রশ্ন ছুড়ে,
-“কেউ প্রমাণ দিতে পারবে?”
-“আমি কারো কাছে হিসাব দিই না, মিস আদিল”
সিতারা কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে থাকে তার দিকে। তারপর ফাইল বন্ধ করে অন্য প্রশ্নে যায়,
-“আপনার বাবা আর দাদার ব্যাপারে জানতে চাই”
সারহাদের চোখে খুব সামান্য একটা ছায়া নড়ে ওঠে। কণ্ঠ আগের মতো রেখেই শুধায়,
-“তারা একটা এক্সিডেন্টে মারা গেছেন”
সিতারা সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যুত্তর করে,
-“আমরা ওই এক্সিডেন্টের কোনো অফিসিয়াল রিপোর্ট পাইনি”
-“তাহলে হয়তো ভালো করে খুঁজেননি, আরেকবার খুঁজে দেখুন”
ঘরের মধ্যে আবার কয়েক সেকেন্ড নীরবতা নেমে আসে। সিতারা বুঝতে পারছে, এই মানুষটা ইচ্ছা করেই তাকে দেয়ালে ঠেকাচ্ছে। হঠাৎ ভাবনার মধ্যে একটা বিষয় খেলে গেল, কেননা একটা পরীক্ষা করা যাক। সে হঠাৎ কথার মাঝেই বলে ওঠে,
-“মিস্টার সাদ, আপনি কি…..”
শব্দটা বের করে আবার নিজেই ইচ্ছা করে থেমে যায়। সারহাদ তখন নিচের দিকে তাকিয়ে ছিল। সিতারা তাড়াতাড়ি বলে,
-“সরি… মিস্টার সারহাদ চৌধুরী”
সে সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকায় কিন্তু নাহ, সারহাদের মুখে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে না। সে যেন কিছুই শোনেনি। সিতারার বুকটা হালকা কেঁপে ওঠে। তার মানে, সে তাকে চিনতে পারেনি? সিতারা নিজের ফাইল গুছিয়ে নেয়।কণ্ঠ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে বলে,
-“ধন্যবাদ আপনার সময় দেওয়ার জন্য”
সারহাদের তরফ থেকে কোনো জবাব আসে না। সে আবার নিচের ফাইলের দিকে তাকিয়ে থাকে। সিতারা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। তার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা শূন্যতা জমে ওঠেছে। সে ঘুরে দরজার দিকে হাঁটা শুরু করে। মনে হচ্ছে যেন একটা পুরোনো স্মৃতির দরজা নিঃশব্দে বন্ধ হয়ে গেল, তার এত বছরের অপেক্ষার কী হবে?
সে দরজার হাতলে হাত রাখতেই পিছন থেকে আসে গম্ভীর পুরুষালি স্বর,
-“মানুষের চোখ পড়া পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজ”
সিতারার পা থেমে যায়। ধীরে ধীরে পিছনে তাকায়। সারহাদ তখনও চেয়ারে বসে। কিন্তু এবার তার চোখ সোজা সিতারার দিকে। সে ফের বলে,
-“তবুও আমি মানুষের চোখ পড়তে পারি।
তাই একটা পরামর্শ দিই, এসিপি সিতারা আদিল। কারো জন্য অপেক্ষা করবেন না”
সিতারার চোখ বড় হয়ে যায়। তার বুকের ভেতর হঠাৎ ধাক্কা লাগে। তার মানে, সারহাদ তাকে চিনেছে পেরেছে। সিতারা কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকে তার দিকে। সারহাদ দৃষ্টি ফিরিয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে আওড়ায়,
-“অপেক্ষা তখনই সুন্দর,
যখন তার শেষ প্রান্তে পূর্ণতা থাকে।
নয়তো অপেক্ষা ধীরে ধীরে
মানুষকে ভেতর থেকে ভেঙে দেয়”
রুমে আর কোন শব্দ হলো না, সিতারা কিয়ৎকাল তাকিয়ে থেকে তারপর কিছু না বলে দরজা খুলে বেরিয়ে যায়। কিন্তু বেরিয়ে যাওয়ার সময় তার মনে শুধু একটা কথাই ঘুরতে থাকে,
“সারহাদ চৌধুরী তাকে ভুলে যায়নি”
আরজে সানাকে নিয়ে যাওয়ার পর কক্ষে ভারী নীরবতা নেমে এলো। তবে তা স্থায়ী হলো মাত্র কয়েক ন্যানো সেকেন্ড। কেননা এসপি বেশ ভালো মতো বুঝতে পারছে, আরজে হুমকি গুলো তাকে দিয়ে গেছে। মানে জাওরা বাপ হওয়ার পরও তার পিছু ছাড়বে না। তাই সে দাঁত কিরমির করে বলে,
-“শা*লা জাওরা, বুঝলাম বাপ হওয়ার আনন্দে আছিস। তাই বলে বউয়ের সাথে আলাদা করে উৎসব মানাতে হবে, একটু লজ্জা টজ্জা আছে ওর? নাহ, সবকিছু ছুটি দিয়ে দিয়েছে?”
তার বিপরীত পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কাইলিনের সহ্য হলো না কথাটা। এই দুই দিনের পুঁচকে তার বসকে নিয়ে এত বড় কথা বলছে। তাই সেখান থেকে চোখ গরম করে বলে,
-“এই পুঁচকে বসকে নিয়ে….”
তার বাক্য সম্পন্ন করার আগেই তাকে হাত উঁচিয়ে থামিয়ে দিল এসপি,
-“ব্যাস, তুই চাইনিজ সান্ডা, এখানে একদম নাক গলাবি না। যখন কথা হয় বড়দের ব্যাপারে, তখন ছোটরা চুপ থাকে। এটুকু ম্যানার্স নেই তোর মধ্যে?”
এসপির কথা শুনে কাইলিনের চোয়াল ঝুলে পড়ার উপক্রম। দুই দিনের পুঁচকে তাকে বলছে ছোট! তার ভাবনার মধ্যে এসপি আবারও বলে,
-“আমরা সবাই বিবাহিত। আমাদের একটা লেভেল আছে ইয়ার। তার ওপর বাচ্চার বাপ মানে প্রোম্যাক্স লেভেলের প্লেয়ার, আর তুই ফিল্ডের ধারে কাছেও নাই। তাই আগে আমাদের লেভেলে আয়, তারপর তোর কথা শুনা হবে”
বিপরীতে কাইলিন বাকরুদ্ধ হয়ে গেল এবার। মানে টা কি এদের? তার বিয়ে হয়নি বলে, যে পারছে এসে তাকে অপমান করে চলে যাচ্ছে। কালকে জ্যাক বলেছে, আর আজকে এই হাঁটুর বয়সী ছেলে। তাহলে তো কালকে,,
সে বিছানায় থাকা আরভির দিকে তাকিয়ে ভাবে,
কালকে জুনিয়র বসও তাকে বিয়ে নিয়ে খোঁটা দেবে। তীব্র অপমানে মূর্ছে যাওয়া চেহারা নিয়ে মুখ খুলে কিছু বলার আগে এসপি ঈশানীকে জিজ্ঞেস করে,
-“কি বলেন মিসেস নাগিন?”
এদিকে ঈশানী মাত্র আরভির দিকে যাচ্ছিল। কিন্তু এসপির মুখে ‘মিসেস’ শুনে মাত্রই তার পায়ের র*ক্ত মাথায় চড়ে গিয়েছে। সে দিনকাল ভুলে চিৎকার করে বলে,
-“মিস, মিস নাগিন”
তার চিৎকারে কাইলিন নিজেও দু’কদম পিছিয়ে গেছে। এসপি বুকের বাম পাশে হাত রেখে তড়িঘড়ি করে বলে,
-“আচ্ছা বাবা আচ্ছা, মিস, মিস, কুল কুল। আপনার চিৎকারে আরভির ঘুম ভেঙে গেল। ওই জাওরা আমাকে উপরে পাঠাবে, আর আপনাকে আফ্রিকার জঙ্গলে, তারপর আপনার আর মিস থেকে মিসেস হয়ে ওঠা হবে না ডিরেক্ট মিস্টার ইন্ডিয়া হয়ে যাবেন”
ঈশানী আরভির দিকে তাকিয়ে নিজেকে একটু সামলে নিল। এসপি কিয়ৎকাল কিছু একটা ভেবে ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি ঝুলিয়ে বলে,
-“আচ্ছা মিসে.. মানে মিস নাগিন, তার থেকে বলি কি, আপনি এই সান্ডাকে বিয়ে করে নিন। তাহলে আমার আর মিসটেক হবে না। ইয়ে মানে, চাইনিজ সান্ডার কপালেও বউ জুটলো, আর আপনিও মিস থেকে মিসেস হলেন আর কি…”
এসপির বলা বাক্যটুকু যেন বোমা ফাটালো কক্ষে। সে বলতে দেরি দু’দিক থেকে চিৎকার আসতে দেরি হয়নি দুজনের,
-“কিহহহহহ…”
এসপি আড়চোখে দুজনের রাগে লাল হওয়া মুখ দেখে মিনমিনিয়ে বলে,
-“ভেবে দেখুন, দুদিক থেকেই কিন্তু দুজনের জন্যই লাভ, মাঝখান দিয়ে আমরা ফ্রীতে বিয়ে খাব আর……”
এসপি আর কিছু বলার আগেই ঈশানী দিক্বিদিক ভুলে সোফা থেকে একটা কুশান নিয়ে তাকে ধুমধাম লাগিয়ে দিল কয়েকটা। দাঁত খিচিয়ে বলে,
-“বিটকেলের বাচ্চাআআ, ছাড়বো না আমি তোকে। তোর বউয়ের কাছে আমি উল্টোপাল্টা সব বিচার দিয়ে দেবো, মেয়েদের পেছনে লাইন মারিস বলবো….”
অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা কাইলিন এই দৃশ্য দেখে একটা ফাঁকা ঢোক গিলে নিল। সে একটু আগে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, সে বিয়ে করবে কালকে। কিন্তু ঈশানীকে দেখে মনে হচ্ছে সেই কাল তার জীবনের ‘কাল’ হয়ে দাঁড়াবে। সেই কাল যে কবে আসবে, সে নিজেও জানে না। মনের কোণে ফুটে ওঠা বিয়ের ফুলটাকে একটানে মনে মনে ছিঁড়ে ফেলে দিল।
তাদের শব্দে আরভি একটু নড়েচড়ে ওঠে। মুহূর্তে জ্যাক গম্ভীর স্বরে বাক্য ছুঁড়ে,
-“এনাফ, নো মোর সাউন্ড। আদারওয়াইজ…”
এই বলে সে কোমরে গুঁজে রাখা পিস্তলটা বের করতেই সব যেন স্ট্যাচু হয়ে গেল। ঈশানী চুপচাপ কুশানটা রেখে সোফায় বসে পড়ে। জ্যাক সবার দিকে একবার তাকিয়ে তার দুপাশে দাঁড়িয়ে থাকা এসপি ও কাইলিনের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি বুলিয়ে আদেশ করে,
-“বোথ অফ ইউ আউট, রাইট নাউ”
দুইপাশের দুই মানব শুনলো না তার কথা। তারা ঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকল, মুখের ভাব এমন যেন কিছুই শুনতে পাচ্ছে না। জ্যাক কিছু না বলে গানের সেফটি লক খুলতেই দুজনে চোখ বড় বড় হয়ে গেল। এক ন্যানো সেকেন্ডও দেরি না করে সুরসুর করে বেরিয়ে পড়ে দুজনেই। জ্যাক একটা দীর্ঘ শ্বাস ছাড়ে। সে বুঝতে পারে না মাঝে মাঝে, কাইলিন সব জায়গায় ঠিক থাকলেও এসপির সাথে এসে এমন বাচ্চামো করে কেন? একটা বাচ্চা ছেলের সাথে ঝগড়া করে সে কি মজা পায়?
আরজে ঐ সময় সানাকে যেই রুমে নিয়ে গিয়েছিল সেই রুমটার ভেতরে ঢুকলে প্রথমেই মনে হবে এটা যেন কোনো মানুষের থাকার ঘর না, বরং সদ্য ঘটে যাওয়া কোনো ধ্বংসযজ্ঞের পরিত্যক্ত স্থান। মেঝের ওপর ছড়িয়ে আছে ভাঙা কাঁচের টুকরো। একটা ভারী টেবিল উল্টে পড়ে আছে পাশের দিকে।দেয়ালে ঝোলানো বড় ছবিটা নিচে পড়ে ফ্রেম ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। কার্পেটের ওপর ছড়িয়ে আছে কাগজ, ভাঙা শোপিস, ভাঙা ল্যাম্পের অংশ। মনে হচ্ছে যেন এই ঘরের ভেতর দিয়ে কয়েক মিনিট আগে একটা ঝড় বয়ে গেছে।
দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে সানা। তার বুকটা ধীরে ধীরে ওঠানামা করছে। মুখে ক্লান্তি, চোখে অদ্ভুত এক চাপা আতঙ্ক। আর তার থেকে একটু দূরে জানালার সামনে দাঁড়িয়ে আছে আরজে। ভোরের আলো তখন ধীরে ধীরে ফুটে উঠছে। জানালার ফাঁক গলিয়ে আসা সেই ফ্যাকাশে আলো এসে পড়েছে তার চেহারায়। সেই আলোয় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, তার চোয়াল শক্ত হয়ে আছে, চোখের মণি অদ্ভুতভাবে স্থির। মুখের প্রতিটা রেখায় যেন জমে আছে হিং*স্র ক্রোধ। মনে হচ্ছে সামান্য কিছু হলেই সে আবার বিস্ফোরিত হবে। সানা অজান্তেই একটা ফাঁকা ঢোক গিলে। তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে কিছুক্ষণ আগের ঘটনাটা।
আরজে তাকে রুমে এনে এক ঝটকায় তার দুই বাহু ধরে টেনে নিয়ে গিয়েছিল দেওয়ালের দিকে। এতটা শক্ত করে ধরেছিল, মনে হচ্ছিল তার আঙুলের নখ যেন সানার বাহুর মাংসের ভেতর ঢুকে যাবে। তার চোখ তখন রক্তবর্ণ হয়ে গিয়েছে। সে রমণীকে দেওয়ালের সাথে চেপে ধরে গর্জে উঠে,
-“কেন আমাকে বলা হয়নি?”
আরজে সানাকে আরও শক্ত করে ঝাঁকিয়ে বজ্র কণ্ঠে শুধালো,
-“আমার একটা ছেলে আছে, আর আমি সেটা ছয় বছর ধরে জানি না?
তুমি কি ভেবেছিলে, আমি জানব না?
তুমি কি ভেবেছিলে আমার র*ক্তকে লুকিয়ে রাখবে আমার কাছ থেকে?
আরজের শ্বাস ভারী হয়ে উঠেছে, তার এতদিনের জমিয়ে রাখা রাগ যেন এক ঝটকায় বেরুতে চাইছে। নিজের দন্ত চেপে ফের বলে,
-“কেন চলে গিয়েছিলে তুমি?
আমি কি মরে গিয়েছিলাম?
না কি তুমি ভেবেছিলে আমি এতটাই অযোগ্য যে নিজের সন্তানের খবরও জানার অধিকার নেই?
টেল মি সামথিং ড্যাম ইডিয়ট,
তুমি আমাকে এতটা ঘৃণা করো?”
বিপরীত পাশের রমণীর কাছ থেকে প্রথমে কোনরূপ প্রত্যুত্তর আসে নি। সানা শুধু চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল আরজের দিকে তাকিয়ে। সে ভেবেছিল, কোনো উত্তর দেবে না। কিন্তু আরজের কথাগুলো ধীরে ধীরে তার বুকের ভেতর জমে থাকা সব ক্ষত খুলে দিতে লাগল। সে কি ইচ্ছা করে গিয়েছিল নাকি?
আরজে আবারও চিৎকার করে ওঠে,
-“তুমি আমাকে সবকিছু থেকে বঞ্চিত করেছ।আমার সন্তানের প্রথম কান্না, প্রথম হাঁটা, প্রথম কথা বলা…সবকিছু। সবকিছু থেকে আমাকে দূরে রেখেছ তুমি”
তারপর হঠাৎ সে গর্জে উঠে আরও জোরে,
-“কোন অধিকার নিয়ে?”
এই বাক্যটা যেন বজ্রপাতের মতো আঘাত হানলো রমণীর বুকে। তৎক্ষণাত সে মাথা তুলে তাকায় অগ্নি দৃষ্টিতে। সে এক ঝটকায় আরজের বুকের ওপর হাত রেখে তাকে ধাক্কা সরিয়ে চিৎকার করে ওঠে,
-“অধিকার?
কেন বলব আমি আপনাকে?
যেখানে আপনার মা আমাকে তখনই বলে দিয়েছিল, আমার ছেলে পৃথিবীতে আসার আগেই, ছেলেটা হবে ওনার, আমার না। ছেলে হওয়ার পর দিনই আমি যেন আপনাকে ছেড়ে চলে যাই নাহয় ওনার সরাতে এক সেকেন্ড ও লাগবে না”
ঘরের ভেতর নিস্তব্ধতা নেমে আসে ব্যাস কয়েক পলকের জন্য তারপর সানা আবারও তীব্র কণ্ঠে বলে যেতে থাকে,
-“আপনার হাজার হাজার শত্রু চারদিকে মুখ উঁচিয়ে থাকে। একটা সুযোগ পেলেই ব*ন্দুক তুলবে, আমার সন্তানের দিকে, তাকে মা*রার জন্য। ওই লরেন্সের ছেলে মার্কান, সে আমার ছেলের পিছনে লেগে আছে।
কেন জানেন?
কারণ আপনার মা ওর ছেলেকে মে*রে ফেলেছে, ওর পুরো ফ্যামিলিকে মে*রে ফেলেছে।
আমার সন্তান তখনও জন্মায়নি, আমার পেটে ছিল। আর তখনই আমাকে গুলি করা হয়েছিল”
সে নিজের বুকের দিকে ইশারা করে ফের বলে,
-“ভাগ্যের জোরে বেঁচে গেছে সে। তাহলে আমি কেন থাকব এখানে? যেখানে আমার সন্তান এক সেকেন্ডের জন্যও নিরাপদ নয়”
সে আবার আরজের বুকের ওপর ধাক্কা দিয়ে গলা ফাটিয়ে বলে,
-“বলুন, আপনার সামনেই তো আমাকে গুলি করা হয়েছিল, আপনি তখন কি করছিলেন?”
বলুন, তাহলে আমি কেন থাকব?
কেন বলব আমি আপনাকে?”
আরজে আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা না করে আবার সানাকে শক্ত করে ধরে। রুক্ষ স্বরে হিসহিসিয়ে উঠে,
-“কেননা, আমি তার বাবা। আমার তার উপর সম্পূর্ণ অধিকার আছে”
বিপক্ষে রমণীর ঠোঁটের কোণে হঠাৎ তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে ওঠে। সে সামনের মানবের দিকে বিমূঢ় দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তীব্র বিদ্রূপ করে ওঠে,
-“অধিকার….
আপনারা শুধু এই শব্দটাই জানেন।
কিন্তু দায়িত্ব, সুরক্ষা, একটা মায়ের ভয়, ওগুলো আপনারা বোঝেন না”
সে তিক্ত স্বরে ফের বলে,
-“আপনারা শুধু যুদ্ধ করতে জানেন, র*ক্ত ঝরাতে জানেন, তারপর সেই র*ক্তের ভেতর একটা শিশুকে ফেলে দিয়ে বলেন, ওটা আমার অধিকার, যেটা আপনার মা আপনার সাথে করেছিল, যেটা আপনার মা রিয়ানার সাথে করেছিল, তাহলে আমি কীভাবে বিশ্বাস করব, আমার সন্তান নিরাপদ থাকবে….”
আরজের চোখে তখন আ*গুন জ্বলছে, তার কণ্ঠস্বর থেকে কিছু বেরুতে গিয়েও থেমে যায় তার বুক দ্রুত ওঠানামা করছে, তার হাত শক্ত করে মুষ্টি বদ্ধ হয়ে গেছে। আর পরের মুহূর্তে সে হঠাৎ ঘুরে দাঁড়ায়। তারপর একটা ভারী চেয়ার তুলে ছুড়ে মারে দেয়ালের দিকে।
রমণী চমকে ওঠে, নিজের বিস্ফোরিত নয়ন জোড়া নিক্ষেপ করে তার উপর, কিন্তু আরজের সেদিকে খেয়াল নেই আর না সে থামছে। ল্যাম্পটা ছুড়ে ফেলে দেয়, দেয়ালের ছবিটা ছিঁড়ে ফেলে মেঝেতে আছাড় মারে। ঘরের ভেতর একটার পর একটা ভাঙচুরের শব্দ উঠতে থাকে। মনে হচ্ছে, সে জিনিসপত্র না, নিজের ভেতরের অসহায় রাগটা ভাঙছে। শেষে হাঁপাতে হাঁপাতে দাঁড়িয়ে থাকে সে। তার বুক ওঠানামা করছে। চোখ দুটো অদ্ভুতভাবে লাল রয়েছে।
ভাঙা কাঁচের ওপর দিয়ে ভোরের ফ্যাকাশে আলো এসে পড়ছে। জানালার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা আরজে হঠাৎই অনুভব করতে পারছে তার ভেতরের অন্ধকার দানবটা আবার জেগে উঠতে চাইছে, রাগটা অস্বাভাবিকভাবে বাড়ার কারণে। তার বুকের ভেতর যেন কিছু একটা ছটফট করছে মুক্তি পাওয়ার জন্য। সে ধীরে ধীরে হাত দুটো মুষ্টি বদ্ধ করে, আবার ছেড়ে দেয়, আবারও মুঠো করে। তারপর চোখ বন্ধ করে গভীর শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করে। যেভাবেই হোক নিজেকে এখন সংবরণ করতে হবে, অবশ্যই করতে হবে। কারণ সে জানে, এই অবস্থায় যদি সে নিয়ন্ত্রণ হারায়, তাহলে সে কি করে ফেলবে তা সে নিজেও জানে না। তার চোখ ধীরে ধীরে র*ক্তবর্ণ হয়ে উঠছে। সে নিজের উপর বিরক্ত হয়ে বারবার মাথা নাড়িয়ে হাত দিয়ে ঘাড় ঘষতে থাকে। আরজে অন্য হাতে পকেট হাতড়ে দেখে, কোন ঔষধ নেই। মনে পড়ে রিজভীর দেওয়া সেই মেডিসিনগুলো, যেগুলো তাকে এই অন্ধকার অবস্থায় নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে, কিন্তু সেগুলো তো অন্য রুমে। এখন সানার সামনে সে হঠাৎ করে ওষুধ নিতে পারবে না। সানার চোখে পড়ে গেলে সে আরও প্রশ্ন করবে। আর এখন প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ার মতো অবস্থায় নেই সে।
আরজে আবার গভীর শ্বাস নিয়ে নিজেকে সংবরণ করার চেষ্টা করে। কিন্তু কাজ হচ্ছে না। তার বুকের ভেতরটা যেন দমবন্ধ হয়ে আসছে। ঠিক তখনই, তার চোখ পড়ে অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা সানার ওপর। সানা তখনও দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। আরজের চোখ দুটো হঠাৎ অদ্ভুতভাবে স্থির হয়ে যায়। তার শ্বাস ভারী হয়ে ওঠে। এই মুহূর্তে নিজেকে থামানোর একটাই উপায় আছে, সানা।
সে ধীরে ধীরে ভারী পদক্ষেপ ফেলে তার দিকে হাঁটা শুরু করে। রমণীর সেটা নজরে আসা মাত্রই সে কয়েক কদম পিছিয়ে যায়। আর শেষে একদম দেওয়ালের সাথে গিয়ে সিটিয়ে দাঁড়ায়। আরজে একদম তার সামনে এসে দাঁড়ায়। এক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকে সে। তারপর হঠাৎ দুই হাতে সানার বাহু ধরে তাকে নিজের একদম কাছে টেনে আনে। সানা চমকে তাড়াতাড়ি তার হাত সরাতে চেষ্টা করে বলে,
-“ছাড়ুন আমাকে…”
কিন্তু আরজে আরও শক্ত করে তাকে চেপে ধরে। তারপর হঠাৎ সে নিজের মুখটা ডুবিয়ে দেয় সানার গলায়। গভীরভাবে লম্বা লম্বা শ্বাস নিতে থাকে। মনে হচ্ছে যেন সে কোনো অক্সিজেন খুঁজছে, নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করছে। তার গরম নিঃশ্বাস আঁচড়ে পড়ছে সানার গলায়। রমণী বারবার তাকে ধাক্কা দিতে থাকে,
-“রানভীর….”
-“রানভীর….”
কিন্তু বিপরীত পাশের মানব যেন কিছুই শুনছে না। সে শুধু তার গলায় মুখ ডুবিয়ে গভীর শ্বাস নিচ্ছে, বারবার। সেই কাচা গোলাপের সুবাস যেন তাকে শান্ত করছে।
কিছুক্ষণ পরে সানার ধাক্কা দেওয়ার শক্তিও ফুরিয়ে যায়। তার হাত দুটো নিস্তেজ হয়ে নিচে ঝুলে পড়ে। ঘরের ভেতর নেমে আসে এক অদ্ভুত নীরবতা। তার মধ্যে দুই কপোত-কপোতী স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। শুধু আরজের ভারী শ্বাসের শব্দ শোনা যায়। ধীরে ধীরে তার শ্বাস স্বাভাবিক হতে শুরু করে সাথে তার হাতের চাপও একটু ঢিলে হয়। কিছুক্ষণ পর সে ধীরে মুখ তুলে তাকায় সানার দিকে। তার চোখে তখনো র*ক্তবর্ণ ছাপ। কিন্তু আগের সেই উন্মত্ততা নেই। সে সানার চোখের দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে আওড়ায়,
-“কেন…
কেন তুমি এমনটা করেছ, ওয়াইফি?
রমণী কিছুক্ষণ চুপ থেকে তার চোখে চোখ রেখে প্রত্যুত্তর করে,
-“কারণ…আমি আমার সন্তানকে র*ক্তের স্তুপের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা একটা সাম্রাজ্যের মালিক বানাতে চাই না”
আরজের চোখ স্থির হয়ে যায় তার উপর, সানা একপলক তাকিয়ে বলে যেতে থাকে,
-“আপনারা সবাই পাপী। খু*ন, প্রতিশোধ, র*ক্ত, এইসবের মধ্যে আমি আমার সন্তানকে বড় করতে চাই না। আমি ওকে পাপ থেকে দূরে রাখতে চেয়েছি”
-“তাহলে…ছয় বছর পর মিস সুনেহনা খানম হওয়ার নাটক কেন?”
বিপরীতে রমণীর থেকে কোন শব্দ আসে না, তার মনে পড়ে মিসেস দিলরুবা খানমের কথা, ওই প্রতিশ্রুতি, ওই সতর্কতা, সবকিছু। এখন সবটা বলা ঠিক হবে না। সে চোখ নামিয়ে চুপ করে থাকে। আরজে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে তার দিকে। তারপর হঠাৎ সে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে। সে মাথা নাড়িয়ে বুলি আওড়ায়,
-“এত বছর পরও আমার ওপর তোমার এক ফোঁটা বিশ্বাস নেই। তুমি এখনো আমাকে সেই মানুষটাই ভাবো, যে শুধু র*ক্ত আর ক্ষমতা বোঝে”
সানা তখনও চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে আছে মলিন দৃষ্টিতে। আরজে ধীরে দরজার দিকে হাঁটা শুরু করে। দরজায় হাত রাখতেই পেছন থেকে সানার কণ্ঠ ভেসে আসে,
-“আপনার মনে একবারও সন্দেহ জাগেনি?
ওই বাচ্চাটা অন্য কারোও হতে পারত”
ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে যায়। আরজে পা থামিয়ে ঘুরে তাকায় রমণীর দিকে। ঠোঁটের কোণে একটুকরো হাসি ফুটিয়ে বলে,
-“যেখানে বিশ্বাসটা প্রগাঢ় হয়, সেখানে সন্দেহ নিছক একটা শব্দ মাত্র। আর দূরত্ব…
দূরত্ব কোনো মূল্য রাখে না।
আর র*ক্তকে চেনার জন্য ডিএনএ লাগে না, হৃদয়ই যথেষ্ট”
সানার চোখ হঠাৎ ভিজে ওঠে। সে না চাওয়া সত্ত্বেও অবাধ্য অশ্রু গড়িয়ে পড়ে গাল বেয়ে। ভাঙ্গা স্বরে বলতে থাকে,
-“কেন আমাকে এতটা ভালোবাসেন?
নাকি দয়া দেখাচ্ছেন?
আমার মা-বাবা নেই বলে?
নাকি আমি অনাথ বলে?”
রমণীর মুখে এই বাক্যটা শোনার সাথে সাথে
আরজের চোখে অন্ধকার নেমে আসে। শান্ত থাকা মস্তিষ্ক যেন আবারও বিগড়ে যায়। সে এগিয়ে এসে এক ঝটকায় সানার কবজি ধরে তাকে টেনে নিজের কাছে নিয়ে আসে। পরের মুহূর্তেই জোর করে তার অধর যুগল দখল করে নিল। এত জোরে যেন সে নিজের সব রাগ, সব যন্ত্রণা ওই এক মুহূর্তে ঢেলে দিচ্ছে। কিছুক্ষণ পরে সে হঠাৎ সানাকে ছেড়ে অগ্নি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে হিসহিসিয়ে আওড়ায়,
-“তুমি আমার সবকিছু বলে।
এই পৃথিবীতে হাজার হাজার মানুষ আছে,
কিন্তু আমার পৃথিবীটা শুরু হয় তোমাকে দিয়ে
আর তোমাতেই শেষ হয় বলে…..”
আর পরেরবার নিজেকে অনাথ বলার আগে
আমার কথা একশবার ভাববে”
এরপর সে এক ঝটকায় সানাকে ছেড়ে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে যায়। সানা তখনো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অশ্রুসিক্ত নয়নে সে দরজার দিকে তাকিয়ে থাকে, যেদিক দিয়ে আরজে চলে গেছে। তারপর ধীরে ধীরে চোখ মুছে সেও বেড়িয়ে পড়ে।
আরজের কক্ষটা অস্বাভাবিকভাবে শান্ত।ভোরের আলো ধীরে ধীরে পর্দার ফাঁক গলে ভেতরে ঢুকছে। সে আসার পর পরই ঈশানী ও জ্যাক চলে গিয়েছে। আরজে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল সানার অপেক্ষায়, রমণী কিয়ৎকাল পর আসার সাথে সাথে আরজে কিছু না বলে দরজা আটকে নিজের ছেলের কাছে চলে যায়।
বিছানার মাঝখানে ছোট্ট শরীর নিয়ে গভীর ঘুমে ডুবে আছে আরভি। মাঝে মাঝে ছোট বুকটা হালকা উঠানামা করছে। বিছানার একপাশে বসে আছে সানা। রমণীর মনের কোণে একটা অদ্ভুত অস্বস্তি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠেছে। সে চোখ তুলে সরাসরি না তাকিয়ে বরং আড়চোখে বারবার তাকাচ্ছে আরজের দিকে। আরজে বিছানার অন্য পাশে বসে আছে। কিন্তু সে একবারও সানার দিকে তাকায়নি। তার পুরো দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে আরভির ওপর। মনে হচ্ছে পৃথিবীতে এই মুহূর্তে তার কাছে আর কিছুই গুরুত্বপূর্ণ না।
আরভির ছোট্ট একটা হাত ধরা আছে আরজের বড় হাতের মধ্যে। সে সেই হাতটা খুব মন দিয়ে দেখছে। ধীরে ধীরে সে নিজের হাতের তালুর ওপর তুলে রাখে ওটা। ছোট্ট আঙুলগুলো তার আঙুলের পাশে অদ্ভুতভাবে ছোট দেখাচ্ছে। সে নীরবে তাকিয়ে থাকে। তার চোখে এক অদ্ভুত বিস্ময়,যেন সে এখনও বিশ্বাস করতে পারছে না, এই ছোট্ট হাতটা, এই ছোট্ট মানুষটা, তারই র*ক্ত, তারই সন্তান।ধীরে ধীরে সে অন্য হাতটা বাড়িয়ে আরভির কপালের ওপর পড়ে থাকা সিল্কি চুলগুলো খুব সাবধানে সরিয়ে দেয়, যেন ঘুমটা ভেঙে না যায়। তারপর আবার তাকিয়ে থাকে ছেলের মুখের দিকে। কতক্ষণ ধরে সে এভাবেই বসে আছে, সে নিজেও জানে না।
হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ১০
সানার বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে কেঁপে ওঠে। সে আবার আড়চোখে তাকায় আরজের দিকে। তার মনে হচ্ছে এখন হয়তো আরজে তার দিকে তাকাবে। কিন্তু নাহ, আরজে একবারও তার দিকে তাকায় না। তার চোখ এখনো আরভির মুখেই আটকে আছে। সানার বুকের ভেতর একটা হালকা ব্যথা ওঠে। সে মুখ ফিরিয়ে নেয়। ঘরের ভেতর আবার ভারী নীরবতা নেমে আসে।
কিয়ৎকাল পর আরভির শরীরটা একটু নড়ে ওঠে সাথে তার চোখের পাতা কেঁপে ওঠে।আরজে সঙ্গে সঙ্গে সোজা হয়ে বসে। আরভি ধীরে ধীরে চোখ পিটপিট করে তাকায়। আরজে ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে বলে,
-“গুড মর্নিং, মাই বয়…”
