হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ১৩
সাবা খান
সন্ধ্যা ধীরে ধীরে নেমে এসেছে ঢাকার আকাশে। আকাশের শেষ গোধূলির রঙটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে। সেই সন্ধ্যার অন্ধকারের মধ্যে দূর থেকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল অট্টালিকা,
“ব্ল্যাক ম্যানশন”
বাইরে থেকে দেখলেই বোঝা যায়, এটা কোনো সাধারণ ম্যানশন নয়। উঁচু কালো দেয়াল পুরো প্রাসাদটাকে ঘিরে রেখেছে। দেয়ালের ওপর বসানো ইলেকট্রিক সেন্সর, ইনফ্রারেড ক্যামেরা, মোশন ডিটেক্টর একটা জাল বুনে রেখেছে পুরো এলাকাজুড়ে। প্রধান গেটের সামনে ভারী আর্মারড গেট। দুই পাশে দাঁড়িয়ে আছে সশস্ত্র নিরাপত্তারক্ষী। গেটের উপর লাগানো আছে অটোমেটিক টারেট ক্যামেরা। যে কোনো কিছু সন্দেহ জনিত হলেই সঙ্গে সঙ্গে এলার্ম বেজে ওঠে। চারদিকে সারি সারি সিসিটিভি, প্রতিটা কোণা নজরদারির মধ্যে। এমন ব্যবস্থা যে, একটা পিঁপড়া পর্যন্ত অজান্তে ঢুকতে পারবে না। এই নিরাপত্তা ব্যবস্থা কাকতালীয় না। সবকিছু আরজে নিজে দাঁড়িয়ে থেকে বসিয়েছে। কারণ সে খুব ভালো করেই জানে, তার নিজের মা কেমন?
তার শত্রুরা কেমন?
ঐ মার্কান স্টিফেন কেমন?
আরজে নিজের জীবনে অনেক কিছু সহ্য করেছে। কিন্তু সে একটা জিনিস কখনোই হতে দিতে চায় না, তার সন্তানের জীবন যেন তার মতো না হয়। এই কারণেই, সে নিজে প্রতিটা ক্যামেরা চেক করেছে, প্রতিটা গেট পরীক্ষা করেছে, প্রতিটা সিকিউরিটি লেয়ার।
আজ সন্ধ্যায় একের পর এক গাড়ি ঢুকেছে ব্ল্যাক ম্যানশনের গেটে। সবাই এয়ারপোর্ট থেকে এখানে এসেছে। আরজে মোটেও রাজি ছিল না এসপির এখানে থাকার ব্যাপারে কিন্তু কী করবে ,তার বউ ছেলে দুটোই তাকে বাধ্য করেছে। আরভি তো গো ধরে বসে, ছোট মা তাদের সাথেই যাবে। আরজে না চাইতেও তাকে রাজি হতে হলো। ধীরে ধীরে সবাই নিজেদের রুমে চলে যায়, ভ্রমণের ক্লান্তি সবার শরীরে। কিছুক্ষণের মধ্যেই পুরো ম্যানশন আবার শান্ত হয়ে যায়।
রাত অনেকটা নেমে এসেছে। ব্ল্যাক ম্যানশনের বিশাল জানালার বাইরে চারদিক নীরব।দূরের আলো আর গাছের ছায়া মিলিয়ে পুরো জায়গাটা যেন আরও রহস্যময় হয়ে উঠেছে। ম্যানশনের উপরের তলার সবচেয়ে বড় কক্ষে বসে আছে সানা সোফার এক কোণে। তার সামনে একটা ছোট টেবিল। হাতে একটা পেন্সিল আর খাতা। কিন্তু সে আসলে কিছু লিখছে না। তার দৃষ্টি বারবার চলে যাচ্ছে বাথরুমের দরজার দিকে যেখানে আরজে আছে। মাঝে মধ্যে সে বুঝতে পারে না এই লোক দিনে কতবার শাওয়ার নেয়। এসেই সন্ধ্যায় একবার নিয়েছে, এখন বাজে প্রায় রাত এগারোটার কাছাকাছি, এখন আবার নেওয়ার কী মানে?
আর শাওয়ার নিতে এক ঘন্টা কেন লাগে?
সে মেয়ে হয়েও এতো সময় নেয় না, তাহলে আরজের কেন লাগে?
তার ভ্রম ছুটিয়ে কয়েক মুহূর্ত পর বাথরুমের দরজা খুলে যায়। আরজে শাওয়ার নিয়ে বেরিয়ে আসে। ভেজা চুল থেকে এখনও পানির ফোঁটা পড়ছে।। সে এক হাতে তোয়ালে নিয়ে চুল মুছতে মুছতে সামনে হাঁটে। রুমের আলোতে তার ভেজা চুল আর কাঁধের উপর পড়ে থাকা পানির ফোঁটা চকচক করছে। সে একবার স্বাভাবিকভাবেই পিছনের দিকে তাকায় দৃষ্টি আটকায় সানাতে। রমণী দ্রুত চোখ নামিয়ে খাতার দিকে তাকায়, যেন সে খুব মন দিয়ে কিছু লিখছে। পেন্সিলটা খাতার উপর দ্রুত ঘুরছে। কিন্তু আরজে একটু আড়চোখে তাকাতেই বুঝে যায়, সানা কিছুই লিখছে না। সে একই রেখার উপর বারবার পেন্সিল ঘুরিয়ে যাচ্ছে। আরজের ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে ওঠে। সাথে সাথে হিসাব মিলে যায় এতক্ষণ ধরে সানা আসলে তার দিকেই তাকিয়ে ছিল।
হঠাৎ তার মস্তিষ্ক একটা দুষ্ট বুদ্ধি আসে বউ জ্বালানোর। আরজে ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে তার দিকে এগিয়ে আসে। সানা প্রথমে খেয়াল করেনি, হঠাৎ মাথা তুলে তাকাতেই দেখে, আরজে একদম তার সামনে দাঁড়িয়ে। সে এতটা কাছে এসে গেছে যে সানা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে, যার কারণে সে পিছনে সরে যায়। আর একদম সোফার ব্যাকরেস্টের সাথে গিয়ে ঠেকে।আরজে দুই হাত সোফার দুই পাশে রেখে ধীরে ধীরে সামনে ঝুঁকে পড়ে। এখন সে একদম সানার খুব কাছে। তাদের মধ্যে দূরত্ব প্রায় নেই বললেই চলে। দুজনের নিঃশ্বাস একে অপরের মুখে আঁচড়ে পড়ছে। সানার বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দ বাড়তে থাকে। সে ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে আরজের কাঁধে হাত রাখবে, ঠিক তখনই আরজে হঠাৎ তার পিছনে হাত বাড়িয়ে সোফার পিছন থেকে নিজের ঘড়িটা তুলে নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। সানা তার এমন ব্যবহারে থতমত খেয়ে মুখ ঘুরিয়ে অন্য দিকে তাকায়। আরজে একবার সানার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট কামড়ে হেসে কিছু না বলেই ঘুরে দাঁড়ায়। হাঁটতে হাঁটতে বলে,
-“আরভির কাছে যাচ্ছি”
এই বলে সে দরজা খুলে আরভির রুমের দিকে চলে যায়। এদিকে রুমে একা বসে থাকে সানা। কয়েক সেকেন্ড সে স্থির হয়ে থাকে। তারপর রাগে, লজ্জায়, অপমানে তার মুখ লাল হয়ে ওঠে। তার ইচ্ছা করছে এখন এই লোকের সবগুলো চুল ছিঁড়ে ফেলতে। সে হঠাৎ সোফা থেকে একটা কুশান তুলে নিয়ে দরজার দিকে ছুড়ে মেরে চিৎকার করে বলে,
-“কু*ত্তা…..”
কুশনটা গিয়ে দরজায় লেগে মেঝেতে পড়ে যায়। সানা দাঁত চেপে বসে থাকে। তার মনে হচ্ছে, যদি এখন আরজে সামনে থাকত, তাহলে সে তাকে নিশ্চয়ই মেরে ফেলত। পর মুহূর্তে দরজা খুলে বেড়িয়ে পড়ে।
আরজের পাশের রুমটাই আরভির। আরজে রুমে ঢুকতেই নজরে পড়ে বিছানার মাঝখানে গুটিসুটি মেরে ঘুমিয়ে আছে তার ছোট্ট অংশটা, আরভি। রুমের হালকা ডিম লাইটের আলোয় কী নিষ্পাপ দেখাচ্ছে তার ছোট্ট মুখটা, তারপর আবার মাথা নাড়িয়ে ভাবে, নিষ্পাপ-ই তো সে। আরভির সমান বয়স থাকতেই তার মা তার হাতে বন্দুক ধরিয়ে দিয়েছিল, তার হাতে র*ক্ত মাখা ছুরি ছিল, তাকে অন্ধকার সেলে থাকতে হয়েছে, তার খেলনা গুলোকে নিজ হাতে আগুনে পোড়াতে হয়েছে। এটুকু বয়সেই তার অনুভূতি গুলেকে মেরে ফেলা হয়েছে। সে কথা বলতে ভুলে গিয়েছিল, এজন্য আরজে চায়, তার ছেলে বেশি করে কথা বলুক, ঠিক সানার মতো। তার মতো যেন একাংশও না হয়।
আরভির ছোট বুকটা ধীরে ধীরে উঠছে নামছে। ঘুমের মধ্যেই মাঝে মাঝে তার ঠোঁট একটু নড়ছে, যেন কোনো স্বপ্ন দেখছে। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আরজে অনেকক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে থাকে। তার মুখের সেই চিরচেনা কঠিন ভাবটা ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসে। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে বিছানার পাশে বসে। একটা দীর্ঘ সময় শুধু তাকিয়েই থাকে ছেলের মুখের দিকে। এই ছোট্ট মুখটা, এই নির্ভেজাল ঘুম, এই একটাই জিনিস তার ভেতরের সমস্ত অন্ধকারকে কিছুক্ষণের জন্য থামিয়ে দেয়। আরজে ধীরে হাত বাড়িয়ে আরভির কপালের উপর পড়ে থাকা এলোমেলো চুলগুলো সরিয়ে তারপর খুব আস্তে করে ছেলের কপালে একটা চুমু খায়। নিচু গলায় ফিসফিস করে বলে,
-“তোমার ড্যাড থাকতে কেউ তোমার দিকে হাত বাড়াতে পারবে না। কেউ না… একদম কেউ না। তোমাকে কেউ কষ্ট দিতে পারবে না”
তার আঙুলগুলো আলতো করে আরভির গালে ছুঁয়ে যায়। আরজে ফের ধীরে ধীরে বলতে থাকে,
-“তুমি কোনদিনও তোমার ড্যাডের মতো হবে না।তোমার শৈশবটা আমার মতো হবে না। আমি ছোটবেলায় কী দেখেছি, তুমি সেটা কখনো জানবে না। র*ক্ত, বিশ্বাসঘাতকতা, ব*ন্দুক, ড্রাগস, সেল, ক্ষমতার লড়াই, এইসব জিনিস তোমার জীবনে কোনোদিন ঢুকতে দেব না। আমি তোমার মমকে কথা দিয়েছি,
তোমাকে আমি কখনো র*ক্তের উপর দাঁড়ানো সাম্রাজ্যের মালিক বানাবো না। এই সাম্রাজ্য, এই ক্ষমতা, এই অন্ধকার পৃথিবী। সব আমার সাথে শেষ হবে”
আরজের ঠোঁটের কোণে একটা তিক্ত হাসি ফুটে ওঠে নিজের ভয়ংকর অতীত ভেবে,
-“তুমি অন্যরকম জীবন পাবে, স্কুলে যাবে, বন্ধু বানাবে, ঝগড়া করবে, হাসবে, খেলবে। তোমার জীবন হবে আলোয় ভরা, অন্ধকারে না। ঠিক তোমার মায়ের মতো”
আরজে আবার ছেলের কপালে হাত রেখে নরম স্বরে আওড়ায়,
-“সব পাপ থেকে দূরে রাখবো তোমাকে। আমার সব পাপ, আমার ভেতরের সব অন্ধকার, সব আমি একাই বইবো। কিন্তু তোমার গায়ে একটা আঁচও লাগতে দেব না।। এটা তোমার ড্যাডের কথা”
আরও কিছুক্ষণ সে চুপ করে বসে থাকে।তারপর ধীরে উঠে দাঁড়ায়। একবার শেষবারের মতো ছেলের দিকে তাকায়। ঠিক তখনই হঠাৎ তার মাথায় অন্য একটা কথা আসে, সানার কথা। তার ঠোঁটের কোণে একটু দুষ্টু হাসি ফুটে ওঠে। মনে মনে ভাবে,
-“আজকে মনে হয় একটু বেশি করে ফেলেছি মেয়েটার সাথে, ব্যাস… আর না। রাগ করলে করবে, আজকে আর ছাড়ছি না’
আরজে ঠোঁট কামড়ে হেসে একহাতে ঘাড় ঘষে ফের আওড়ায়,
-“অনেক ছাড় দিয়ে ফেলেছি,আর না। আমার এখনই বউ লাগবে, মানে… এখনই। আজকে আমি একটুও ধৈর্য ধরতে পারবো না।”
সে দরজা খুলে বেরুতে বেরুতে নিচু স্বরে আওড়ায়,
-“এই মেয়েটা আমাকে একদিন পাগল বানিয়ে ছাড়বে”
আরজে আরভির রুমের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা গার্ডদের দিকে তাকায়। তার মুখ মুহূর্তে আবার কঠিন হয়ে যায়। রুক্ষ স্বরে আদেশ ছুঁড়ে,
-“লে আ ফিঙ্গার অন দিস ডোর, অ্যান্ড ইউ’ল পে ফর ইট উইথ ইয়োর ব্লাড”
গার্ডরা মাথা নাড়িয়ে বলে,
-“ওকে বস”
আরজে করিডোর ধরে নিজের রুমের দিকে হাঁটতে থাকে। কিন্তু দরজা খুলে ভিতরে ঢুকেই সে থেমে যায়। নজরে আসে রুম ফাঁকা, সোফায় কেউ নেই, সানা নেই। এক মুহূর্তে তার চোয়াল শক্ত হয়ে যায়। হাত মুষ্টিবদ্ধ করে ফেলে সে, চোখে সেই ঠান্ডা আ*গুনটা আবার জ্বলে ওঠে। সে খুব ভালো করেই জানে, সানা কোথায় গেছে। সে দাঁত চেপে ফিসফিস করে,
-“এই মেয়ে টাকে তো আমি…..”
আরজে আর এক ন্যানো সেকেন্ড অপেক্ষা না করে উল্টো ঘুরে করিডোর ধরে হাঁটা শুরু করে।
ব্ল্যাক ম্যানশনের দ্বিতীয় তলার করিডোরের আরেক প্রান্তে ঈশানীর রুম। রুমের ভেতর আলো জ্বলছে, আর সেখানে বসে আছে তিনজন, সানা একা একটা সোফা জুড়ে, ঈশানী বিছানায় আর এসপি আরেকটা সোফা জুড়ে। একটু আগেই সানা জরুরি তলব করে মিটিং ডেকেছে। এসপি সানিতাকে রুমে রেখে এসেছে সিয়ার সাথে, যদিও সানিতা এতক্ষণে ঘুমিয়ে পড়েছে।
তিনজনে গভীর চিন্তায় ডুবে, কেননা সানার রুমে ঢুকেই বলে দিয়েছে,
-“ভীষণ সিরিয়াস টপিক। আমিও প্রোম্যাক্স লেভেলের সিরিয়াস। কারো হাতে মোবাইল বা চিপসের প্যাকেট দেখলে মাইর একটাও মাটিতে পড়বে না”
এসপি তারপরও লুকিয়ে একটু ফোনটা হাতে নিয়েছিল। সাথে সাথে পিঠে পড়ে গেছে তালের বড়া। তাই সে এখন ভালো ছেলের মত বসে আছে পিঠে এক হাত দিয়ে। কিন্তু এসপি বা ঈশানী কেউই বুঝতে পারছে না সানা তাদের কি জন্য ডেকেছে। শুধু বলেছে
‘আরজে নাকি তাকে অপমান করেছে’
কিন্তু কি অপমান করেছে সেটা বলছে না। তবে সানার মুখটা দেখে বোঝা যাচ্ছে সে বেশ চিন্তায় আছে। সে সোফার কিনারায় বসে আঙুল দিয়ে নিজের হুডির দড়িটা পাকাচ্ছে আর ভাবছে। ঈশানী আড়চোখে চিপসের প্যাকেটের দিকে তাকাচ্ছে। আর এসপি নিজের ফোনের দিকে। দুজনে একটু একটু করে হাত বাড়াচ্ছে, সানা দুজনের দৃষ্টি বুঝে গলা খাঁকারি দিয়ে বলে,
-“ওই কু*ত্তার নাটক এক মাস ধরে দেখছি, আর সহ্য হচ্ছে না। এখন কি করা যায় বল?”
দুজনে তড়িঘড়ি করে নিজেদের হাত গুটিয়ে নিজ। এসপি কিছু বলার জন্য মুখ খোলার আগেই সানা তাকে থামিয়ে সতর্ক করে দিল,
-“একটাও যদি উল্টোপাল্টা বলিস, কানের নিচে এমন বাজাবো, বাপ হওয়ার আগ পর্যন্ত বাজতে থাকবে”
বেচারা এসপি গিলে নিল বাকি কথাটুকু। ঈশানী কিছু একটা ভেবে বলে,
-“দেখ, আমার মতে একটা সারপ্রাইজ দে, রোমান্টিক কিছু কর। লাইক, ক্যান্ডেল লাইট, ডিনার… এইসব তারপর সরি বলে দেয়”
এসপি তাচ্ছিল্যের মতো হাত নেড়ে উড়িয়ে দিল ঈশানীর কথাটুকু। তার বিপরীতে বলে,
-“মাঝরাতে গাঞ্জা খেয়ে এসেছে মিসেস নাগিন”
-“মিস, মিস নাগিন”
-“হা হা, মিস নাগিন, কিন্তু ঐ গাঞ্জা খেলে লালন ফকিরেরটাই খাবেন। ওটা একদম এক রিয়েল। খেলে আপনি মিস না মিসেস বুঝতেই পারবেন না”
ঈশানী তার বাক্যটুকু শ্রবণ হতেই তেরছা চোখে তার দিকে তাকিয়ে সন্দেহজনিত গলায় শুধায়,
-“তুমি খেয়েছ নাকি? আমি এক্ষুনি সানিতাকে বলবো”
ঈশানী উঠে যাওয়ার আগে এসপি তড়িঘড়ি করে তাকে আটকে করে দিল,
-“আরে দাড়ান, কেন শুধু শুধু আমার সংসারের পিছনে পড়ে আছেন? আমি শান্তিতে আছি, সেটা আপনাদের ভালো লাগছে না? এমনিতেই ওই খুশদিলের মেয়ের মেজাজ সারাক্ষণ খিটখিটে হয়ে থাকে। এক ঘন্টা আমার সাথে কথা বললে তিন ঘন্টা আমার উপর চিৎকার চেঁচামেচি করে”
সানা ঈশানীর দিকে তাকিয়ে বলে,
-“এবার বুঝতে পারছিস তো ও গাঞ্জা কেন খায়?
অল্প বয়সে ছেলেটার উপর বউয়ের এত চাপ”
এসপি তাদের কথা পাত্তা না দিয়ে আবারো সোফায় বসে বলে,
-“দেখুন মিসেস নাগিন, এই কটকটি সরি বলার পাত্রী নয়। দুনিয়া উল্টে গেলেও এই কটকটি সরি বলবে না, আমি ওকে খুব ভালো করে জানি?”
-“তাহলে ও কি করবে?”
এসপি কিয়ৎকাল ভাবল, কিন্তু কোন সুরাহা মিলাতে পারছে না। তারপর কিছু একটা ভেবে উচ্ছ্বাসভরা কণ্ঠে আওড়ায়,
-“শোন কটকটি, ভালো বুদ্ধি দেই। ওই জাওরা টাওরা কে ছাড়, আমরা তোকে আরেকটা বিয়ে দিয়ে দিব। একদম ভালো ছেলে দেখে, যে তোর কথায় উঠবে আর বসবে….”
এসপির বাক্য খানা উগড়ে দিতে দেরি পরপর দুইটা গুলির শব্দে পুরো রুম কেঁপে উঠতে দেরি হয়নি। এসপির কানের পাশ দিয়ে দুইটা উত্তপ্ত বুলেট শোঁ শোঁ করে বেরিয়ে গিয়ে পিছনের দেয়ালে গিয়ে লাগে। সাথে সাথে দেয়ালের প্লাস্টার ঝরে নিচে পড়ে। বুলেটের উত্তাপে তার কানের পাশটা হালকা জ্বলে উঠে। এক মুহূর্তের জন্য পুরো রুম স্তব্ধ হয়ে যায়। সবাই ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে দরজার দিকে তাকাতেই তাদের বুক ধড়ফড় করে উঠে। কেননা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে আরজে। তার চোখ দুটো র*ক্তবর্ণ হয়ে আছে। হাতে ধরা বন্দুক থেকে এখনও ধোঁয়া উঠছে। সে ধীরে ধীরে বন্দুকটা নামিয়ে দন্ত চেপে চিৎকার করে উঠে,
-“বারোভাতারির বাচ্চাআআআ… আজকে তোর কলিজা বের করে দেখব আমি”
আরজের গলার আওয়াজে যেন পুরো রুম কেঁপে উঠেছে। এসপির চোয়াল ঝুলে পড়ার উপক্রম, এই জাওরা আসলো কখন তাও আবার তাদের ব্যক্তিগত মিটিংয়ে। যেই লেবেলে রেগে আছে এখন একে কে বুঝাবে সে এমনিই বলেছে। আর দুই রমণী কপাল চাপড়াচ্ছে। তাদের কানে আবারও আসে আরজের হুংকার,
-“কু*ত্তারবাচ্চা, তোর এত বড় সাহস?
আমার বাড়িতে দাঁড়িয়ে, আমার বউকে দ্বিতীয় বিয়ের পরামর্শ দিচ্ছিস। তুই আর বাপ হতে পারবি না”
কথাটা বলেই সে সোজা এসপির দিকে এগিয়ে গেল বন্দুক তুলে, আবারও গুলি ছুঁড়ে। এসপি কোনমতে সড়ে যায়, আর গুলি গিয়ে বিধে যায় সোফার কুশানে। এসপি এক সেকেন্ডও দেরি করল না,
-“কটকটি, তোর জাওরা কে আটকা। এই শা*লা গাঞ্জা খেয়ে পাগল হয়ে গেছে মাঝরাতে”
এই বলে এক লাফে সোফা টপকে উঠে দৌড় লাগায়। রুমের ভেতর মুহূর্তেই শুরু হয়ে গেল বিশৃঙ্খলা। এসপি টেবিলের পাশ দিয়ে দৌড়ে গেল। আরজে ঠিক তার পিছনে বন্দুক নিয়ে। সে দন্ত চেপে বাক্য ছুঁড়ে,
-“আজকে তোকে গুলি করবই”
এসপি চিৎকার করে বলে,
-“আব্বে ইয়ার মুখ ফসকে বের হয়েছে”
-“মুখ না থাকলে আর বেরুবেই না”
এসপির জবাব দেওয়ার সময় নেই সে এদিক ওদিক দৌড়াচ্ছে। কখন সোফার উপর দিয়ে লাফ দিচ্ছে, কখন টেবিল ঘুরে আবার বিপরীত দিকে ছুটছে। আরজে তার পিছনে পিছনে তেড়ে যাচ্ছে। এদিকে ঈশানী বলেই যাচ্ছে,
-“আ.. আরজে প্লিজ স্টপ, ও দুদিন পর বাপ হবে”
কিন্তু বিপরীত পাশের মানব যেন কিছুই শুনছেই না। ঈশানী সানার দিকে তাকিয়ে বলে,
-“ডাইনি, যা গিয়ে আটকা ওকে”
এদিকে মুখে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, সে বুঝতেই পারছে না কী থেকে কী হয়ে গেল। ঈশানীর ধাক্কায় সে বাস্তবে ফিরে। তড়িঘড়ি করে বলে,
-“কীভাবে আটকাবো সেটাতো বল?”
-“আরে তোর হাসবেন্ড আমি কীভাবে বলব, ওকে ধর””
এই বলে সানাকে ধাক্কা দিয়ে সামনে পাঠায়, সানা ওকে’ বলে তাদের পিছনে ছুটে যায়। আরজে আরেক বার গুলি করার জন্য বন্দুক তুলতেই এসপি এক চিৎকার করে উঠে,
-“শালা, পাগল হয়ে গেছে”
বলেই এক লাফে ঈশানীর পিছনে চলে যায়। রমণী হকচকিয়ে গেল। কেননা সামনেই আরজে বন্দুক তাক করে দাঁড়িয়ে, ঠিক নিশানায় সে। মুহুর্তে ভয়ে তার গলা শুকিয়ে আসছে। কণ্ঠস্বর থেকে যেন কথা বেরুচ্ছে না। তারপরও তোতলাতে তোতলাতে বলে,
-“আ..আ..আরজে, আমার এখনো বি…বি…বি…
পিছন থেকে এসপি বাকিটা বলে,
-“বিয়ে হয়নি”
-“হ্যাঁ, আমার বিয়ে হয়নি, আমি বি…বি..বি…”
-“বিয়ে করতে চাই”
-“হ্যাঁ, বিয়ে করতে চাই। আর বি…বি…বি…”
-“বিয়ে করা ছাড়া”
-“হ্যাঁ, বিয়ে করা ছাড়া উপরে যেতে চাই না। আমি কালকেই বি..বি…বি”
এসপি বিরক্ত হয়ে পিছন থেকে আবারও বলে,
-“বিয়ে করব সান্ডাকে”
-“হ্যাঁ, কালকেই বিয়ে করব সান্ডাকে.. না না সান্ডাকে বিয়ে করব না”
আরজের রাগে সারা শরীর কাঁপছে, সে নিজের দন্ত পাটি পিষে আওড়ায়,
-“চুপচাপ বেড়িয়ে আয়, না হয় দুজন কেই গুলি মেরে দিব”
আরজে ট্রিগারে হাত রাখতেই সানা দ্রুত এগিয়ে এসে তার হাত ধরে টেনে সরিয়ে নিল। সে এতক্ষণ ওদিকে আটকে ছিল আরজের পিছু নিতে গিয়ে। রমণী তাড়াতাড়ি ওকে টেনে নিয়ে যেতে থাকে,
-“রানভীর, আরে ও এভাবেই বলেছে”
কিন্তু আরজে যেন শুনছেই না। সে আবারও বলে,
-“আজকে একে আমি গুলি করবই”
এবার রমণী রেগেমেগে শক্ত কণ্ঠে শুধালো,
-“আপনি আসবেন নাকি আমি রুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দেব”
মুহূর্তে আরজে বন্দুক নামিয়ে তার দিকে ভ্রু কুচকে তাকায় নজরে আসে রমণী বুকে আড়াআড়ি ভাবে হাত বেধে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। সানা আড়চোখে তাকিয়ে একটা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে বলে,
-“আরে আমি আরেকটা কেন করব, যখন একটা করে জীবন তেজপাতা হয়ে গিয়েছে”
এই বলে সানা আবারও তার হাত ধরে টানতে থাকে।
করিডোর ধরে সানা প্রায় টেনে হিঁচড়ে আরজেকে নিজেদের রুমে নিয়ে আসে। দরজা বন্ধ করে সে ঘুরে দাঁড়ায়। আরজের বুক তখনও দ্রুত উঠানামা করছে। তার চোখে সেই একই রাগের আ*গুন। দুই হাত বারবার মুষ্টিবদ্ধ হচ্ছে, আবার খুলছে।মনে মনে বলছে,
কত বড় সাহস ঐ বারোভাতারির, তার বউ দ্বিতীয়…..”
না, মা সে আর বাকিটা ভাবতে পারছে না। এদিকে সানা এক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে বিরক্ত গলায় বলে ওঠে,
-“আপনি একদম পাগল হয়ে গেছেন নাকি?”
আরজের তরফ থেকে কোনরূপ প্রত্যুত্তর আসে না। সে শুধু দাঁড়িয়ে আছে, চোয়াল শক্ত করে। বুঝা যাচ্ছে না, রমণীর বলা কথা গুলো সে আদোও শুনতে পেয়েছে কিনা?
সানা ফের বলতে থাকে,
-“এসপি তো এমনিই বলেছে, ওর মুখে তো সবসময়ই উল্টোপাল্টা কথা বের হয়। তাই বলে আপনি গুলি চালাবেন?
আপনি এত রিয়েক্ট কেন করেছেন?
আর যদি সত্যিই কিছু হয়ে যেত?
আপনার মাথা ঠিক আছে…..
হঠাৎ তার কথা থেমে যায়, কেননা ঠিক সেই মুহূর্তে আরজে ধীরে ধীরে চোখ তুলে তার দিকে তাকায়। সানার কথা মাঝপথেই আটকে যায়। তার বুকের ভেতরটা কেমন কেঁপে ওঠে।আরজের চোখ দুটো অস্বাভাবিক লাল, রাগে অস্থিরতায়, আর তার ভেতরে যেন অন্যরকম একটা আগুন জ্বলছে। সানা অজান্তেই একটা ফাঁকা ঢোক গিলে ফেলে। সে কিছু বলতে যাবে ঠিক তখনই হঠাৎ আরজে এক টানে তাকে নিজের দিকে টেনে এনে এক ঝটকায় তাকে বিছানার উপর ফেলে দেয়। রমণী অবাক হয়ে উঠে বসতে যাবে, কিন্তু আরজে ইতিমধ্যে বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে গেছে। তার শ্বাস ভারী হয়ে ওঠেছে, বুক দ্রুত উঠানামা করছে। রুমের নীরবতার মধ্যে তার শ্বাসের শব্দ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। সানা একটু অস্থির ভাবে প্রশ্ন করে,
-“কি হয়েছে আপনার?
এভাবে তাকাচ্ছেন কেন?”
বিপরীত পাশ থেকে কোন প্রতুত্তর আসে না সে ধীরে ধীরে নিজের শার্টের উপরের বোতাম খুলতে থাকে। তার আঙুলগুলো দ্রুত কাজ করছে, কিন্তু ঘোর লাগা দৃষ্টি এক মুহূর্তের জন্যও সানার দিক থেকে সরে না। সানা একটু উঠে বসে ফের জিজ্ঞেস করে,
-“আপনি… এমন করছেন কেন?”
আরজে শার্টের আরেকটা বোতাম খুলতে খুলতে নেশালো কণ্ঠে শুধায়,
-“আই ওয়ান্ট আ প্রিন্সেস, ওয়াইফি”
সানা প্রথমে বুঝতে পারল না, এই রাতে কোথা থেকে প্রিন্সেস আনবে সানা। তাই ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,
-“মানে?”
কয়েক সেকেন্ড পরে হঠাৎ তার মাথায় কথাটার মানে ঢুকে যায়। মুহূর্তে তার চোখ বড় হয়ে যায়। সে চিৎকার দিয়ে বিছানা থেকে উঠে অন্য দিকে নামতে যায়,
-“না না না…”
কিন্তু তার আগেই আরজে ঝট করে তার পা ধরে ফেলে। এক টানে তাকে আবার নিজের দিকে টেনে আনে,
-“অনেক পালিয়েছো বেইবি…”
সানা ভারসাম্য হারিয়ে আবার বিছানার উপর পড়ে যায়,
-“রানভীরের বাচ্চাআআ…”
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই আরজে ঝুঁকে রমণীর অধর যুগল আঁকড়ে ধরে। সানার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে যায়। প্রথমে সে ছাড়ানোর চেষ্টা করে। কিন্তু আরজের হাত ইতিমধ্যেই তার কাঁধ আর কোমর জড়িয়ে ফেলেছে গ্রিপ শক্ত করে। কয়েক সেকেন্ড পর ধীরে ধীরে সানার হাতও আরজের শার্ট আঁকড়ে ধরে। মুহূর্তে দুই কপোত-কপোতীর শ্বাস ভারী হয়ে ওঠে।
গভীর নিশুতি অন্ধকার রাত, চারদিক এমন নিস্তব্ধ যেন পৃথিবী থেকে সব শব্দ হারিয়ে গেছে। আকাশে চাঁদ নেই, তারা নেই শুধু কালো মেঘের ভারী স্তর আকাশটাকে ঢেকে রেখেছে। হালকা ঠান্ডা বাতাস বইছে চারদিকে, সেই বাতাসে শুকনো পাতার খসখস শব্দ শোনা যায় স্পষ্ট। এই অন্ধকারের মধ্যে দূর থেকে একটা বিশাল ছায়া দেখা যায়। ঢাকার অভিজাত এলাকায় দাঁড়িয়ে থাকা হায়দার পরিবারের পেন্টহাউস,
‘স্কাই পেন্টহাউস’
উঁচু কাঁচের দেয়াল, কালো মার্বেলের গেট, আর চারপাশে উঁচু লোহার বাউন্ডারি। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় শান্ত, বিলাসবহুল একটা জায়গা। কিন্তু ভিতরের পরিবেশ সম্পূর্ণ অন্য রকম। কেননা এই মুহূর্তে সেই পেন্টহাউসের ভিতর থেকে ভেসে আসছে, আর্তচিৎকার। গলা ফাটানো গগন বিধারী চিৎকার,
-“আআআআআ……”
চিৎকারগুলো এমনভাবে কাঁপছে যেন কারো বুকের ভেতর থেকে ছিঁড়ে বের হচ্ছে। এই গভীর রাতে সেই শব্দগুলো আরও ভয়ংকর শোনাচ্ছে। দেয়ালে প্রতিধ্বনি হয়ে যেন আবারও ফিরে আসছে। কিয়ৎকাল পর একটা তীব্র আর্তনাদ। তারপর হঠাৎ সব চুপ,
নিস্তব্ধতা। যেন কিছুই হয়নি। ঠিক তখনই, পেন্টহাউসের সামনে অন্ধকার রাস্তার উপর একটা বড় কালো ছায়া এসে থামে। মানব ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে আসে। তার গায়ে কালো লম্বা জ্যাকেট, মাথায় টানা টুপি। মুখের অর্ধেক ছায়ায় ঢাকা। গেটের সামনে আলোয় ঢুকতেই দেখা যায়, তার সারা গায়ে র*ক্ত।জ্যাকেটের হাতা থেকে টপটপ করে র*ক্ত পড়ছে, চোখ দুটো অস্বাভাবিক লালচে। যেন কয়েক ঘন্টা ধরে আ*গুনে জ্বলছে। গেটের কাছে পৌঁছাতেই ভিতর থেকে চার পাঁচজন লোক দ্রুত বেরিয়ে আসে। তাদের হাতে বন্দুক। একজন তার দিকে তাকিয়ে গর্জে ওঠে,
-“এই! দাঁড়া, কে তুই?”
আরেকজন টর্চের আলো তার মুখে ফেলতে যায়। ঠিক তখনই, কালো জ্যাকেট পরা মানব হঠাৎ সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। প্রথম লোকটার গলা এক ঝটকায় চেপে ধরে। এক মোচড়,’খট্’ করে শব্দ হয়ে ঘাড় ভেঙে যায়। লোকটা নিথর হয়ে মাটিতে পড়ে। দ্বিতীয় লোকটা বন্দুক তুলতে যায়, কিন্তু ততক্ষণে সেই মানব তার হাত মুচড়ে ধরে, হাড় ভেঙে যাওয়ার শব্দ। তারপর এক ঘুষি, এত জোরে যে লোকটার মুখ র*ক্তে ভেসে যায়। পরের জনকে এক ঝটকায় ছু*রি বের করে সোজা বুকের মধ্যে ঢুকিয়ে দিতে থাকে বারবার যেন নিজের ভিতরে থাকা আগুন টাকে শান্ত করছে। লোকটা মরে গেছে কবেই কিন্তু মানব যেন থামছেই না। তার এমন নৃশংসতা দেখে চতুর্থ লোকটা ভয়ে পিছিয়ে যায়। কাঁপা কাঁপা স্বরে আওড়ায়,
-“পাগল, এইটা পাগল”
এই বলে সে ঘুরে দৌড় দিতে যায়। কিন্তু কালো জ্যাকেটের মানব তার কলার ধরে টেনে আনে। তারপর মাথাটা দেয়ালের সাথে বারি মারতে থাকে বারবার, র*ক্ত ছিটকে দেয়ালে লাগে, সাথে তার মুখেও। পঞ্চম জন বন্দুক তুলে কিন্তু তার গুলি বের হওয়ার আগেই একটা তীক্ষ্ণ ছু*রি বাতাস চিরে সোজা তার গলায় গিয়ে ঢুকে। সাথে সাথে গগন বিদারী চিৎকার দিয়ে সে ধীরে ধীরে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। চারপাশ আবার নিস্তব্ধ, রক্ত মাটিতে গড়িয়ে পড়ছে। কালো জ্যাকেটের মানব স্থির দাঁড়িয়ে আছে। তার বুক ধীরে ধীরে উঠছে-নামছে। হঠাৎ সে সামনে তাকিয়ে এক মুহূর্তের জন্য থেমে যায়।কারণ পেন্টহাউসের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক নারী, তার হাতে সার্ভিস পিস্তল,
“এসিপি সিতারা আদিল”
তার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেছে। সে সামনে দাঁড়ানো র*ক্তে ভেজা মানুষটার দিকে তাকিয়ে তার গলা শুকিয়ে আসছে। ধীরে ধীরে ঠোঁট নাড়িয়ে ফিসফিস করে,
-“সাদ…?”
শব্দটা গলা দিয়ে বহু কসরতে বের হলেও সে যেন নিজের চোখকেই বিশ্বাস করাতে পারছে না। সামনের মানব কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে।তারপর ধীরে ধীরে নিজের জ্যাকেটের টুপিটা মাথা থেকে নামায়। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টগুলোও পড়তেই তার মুখটা একদম স্পষ্ট হয়, র*ক্তমাখা মুখ, ঠোঁটে একটা ঠান্ডা বাঁকা হাসি, সারহাদ। সিতারার বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে। কণ্ঠনালী ছিড়ে বহু কসরতে ফের নিচু স্বরে বের হয়,
-“সারহাদ চৌধুরী, আ..আ…আপনি?”
হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ১২
কিন্তু বিপরীত পাশের মানব থেকে কোনরূপ প্রত্যুত্তর এলো না। ধীরে ধীরে তার ঠোঁটের কোণের হাসিটা চওড়া হয়। তারপর সারহাদ খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে পিছনের কোমর থেকে পিস্তলটা বের করে। সিতারা বন্দুক তুলতে যায় কিন্তু ততক্ষণে রাতের নিস্তব্ধতা ভেদ করে পরপর দুইটা গুলির শব্দ ছুটে যায় সামনে সারহাদের বন্দুক থেকে,
-“ঠাস
ঠাস…..”
