Home হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ২

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ২

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ২
সাবা খান

এয়ারপোর্টের সেই খোলা মাঠ বাইরে থেকে দেখলে ঝকঝকে কৃত্রিম আলোয় ভাসছে, কিন্তু ভিতর থেকে দৌড়ে আসা এক আতঙ্কিত নারীর কাছে সেটা যেন অন্ধকারের থেকেও গভীর, আরও গিলে ফেলা মতো। আলো আছে, অথচ নিরাপত্তা নেই। চারপাশ খোলা, তবু প্রতিটি দিক যেন ফাঁদে ভরা। সানা পিছনে তাকাতেই নজরে আসে একজন মুখোশধারী লোক কাচের ফাঁক গলিয়ে বাহিরের দিকটা দেখছে, কেউ বাহিরে আছে কি না? এটা দেখেই সে একটা কংক্রিট পিলারের পেছনে গিয়ে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। বুক ওঠানামা করছে দ্রুত ছন্দে, গলা শুকিয়ে কাঠ, মাথা ঝিমঝিম করছে তবুও সে শব্দ করার সাহস পায় না। এক হাত স্বতঃস্ফূর্তভাবে চলে যায় নিজের পেটের উপর। সেখানে এখনও স্পন্দন আছে আর সেই স্পন্দনটাই তাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। তার মাথার ভেতর একটার পর একটা স্মৃতি ধাক্কা মারে।

সানা যখন হসপিটালে নেক্সট টাইম জ্ঞান ফিরেছে তখনই মিসেস সাইয়েদা তাকে সবটা বলেছে। তারপর থেকে তার পাগলামি থেমে গিয়েছে। এবং সে সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। একদিকে খুশি অন্য দিকে ভয়, চারদিকে এত এত মানুষের খারাপ নজর তার বাচ্চার উপর। ঠিক তার না, আরজের বাচ্চার উপর। সবাই যেন সোফিয়া ও আরজেকে কিছু করতে না পেরে তারা তার বাচ্চার উপর প্রতিশোধ নিতে চাইছে।
মিসেস সাইয়েদের সাথে এটাও বলেছেন তিনি মার্কান স্টিফেনকে চিনেন। কিন্তু হ্যাঁ, তার ছেলেকে চিনেন না। আর ওটা যে কেউ হতে পারে যে আরজের খুব কাছেই আছে। কেননা তিনি আরজের সাথে যা কথা বলতেন তারা সব জেনে যেত। সানা তখনও পুরোটা বুঝে উঠতে পারেনি, কিন্তু এখন, এই র*ক্তাক্ত রাতের মাঝে দাঁড়িয়ে প্রতিটা শব্দ যেন বিষের মতো সত্যি হয়ে উঠছে। এয়ারপোর্টের ভিতর থেকে এখনো মানুষের চিৎকারের শব্দ ভেসে আসছে।
এই মুখোশধারী মানুষ গুলোর আসল চেহারা কেউ জানে না। তাদের সবচেয়ে বড় বিজনেস হচ্ছে
“প্লাস্টিক সার্জারি”

একজনের মুখ আরেকজনের মতো, চেহারা বদলানো তাদের জন্য খেলনা। ঈশানের সঙ্গে থাকা সেই অচেনা মানুষগুলো, সবাই একই রকম। সবাই মার্কানের লোক ছিল। নাহলে এইরকম ব্যয়বহুল সার্জারী ঈশান বা রুডির পক্ষে সম্ভব ছিল না। কারণ সোফিয়া তাদের মেরে ফেলার পরই তাদের সকল সম্পত্তি নিজের করে নিয়েছে।
এই কারণেই মিসেস সাইয়েদা আগে সানাকে সরিয়ে নিতে চেয়েছিলেন। বাচ্চাসহ নিরাপদে পাঠাতে চেয়েছিলেন। কারণ তারা যদি কোনভাবে জানতে বা বুঝতে পারে বাচ্চাটা বেঁচে আছে তাহলেই সবশেষ। তারপর নিজে খোঁজ করতেন, সত্যিটা বের করতেন। কারণ তিনি জানতেন, তার একটা ছোট ভুল পদক্ষেপ মানেই সানার গর্ভের শিশুর মৃত্যু। কিন্তু তিনি পারেননি, সানাকে বাঁচাতে গিয়ে তিনি নিজেই নিজের জীবন হারিয়েছেন।
এদিকে সানা এখনো পিলারের আড়ালে বসে আছে। সময় যেন থেমে গেছে। প্রায় দেড় থেকে দুই ঘণ্টা সে সেখানেই লুকিয়ে থাকে। এর মধ্যে তার ফ্লাইটের সময় পেরিয়ে গেছে। শরীর ক্লান্ত, মাথা ঘুরছে, চোখ ঝাপসা নিদ্রাহীনতা আর ভয় মিলে তাকে ভেঙে দিচ্ছে, নিজের জন্য? উহু, নিজের সন্তানের জন্য। তবুও সে নড়ে না। কারণ ভেতরে তাকালেই দেখা যাচ্ছে কাঁচের দেয়ালের ফাঁক দিয়ে লোকগুলো এখনও খুঁজছে। একজন একজন করে মানুষের মুখ চেক করছে, মুখোশ খুলছে, যাচাই করছে কেউ যেন বাদ না পড়ে।

সানার গলা শুকিয়ে আসে। যদি তার বাচ্চা না থাকত হয়তো সে নিজেই গিয়ে দাঁড়াত তাদের সামনে বা কোনদিনও এখানে আসতোই না। কিন্তু এখন সে শুধু একজন নারী না, সে একজন মা। আর তার কাছে এখন বেঁচে থাকা মানেই দুইটা প্রাণকে বাঁচানো। হঠাৎ দূরে আলো ঝলসে ওঠে। একটা প্লেন অবতরণ করে। সানা সেদিকে সতর্ক চোখে তাকায়। নজরে পড়ে প্লেন থেকে নামছে তাদের পুরো শুটিং টিম। মুহূর্তেই সানার মনে পড়ে আরজে নিজের শুটিং পিছিয়েছে, কিন্তু সে ছাড়া মুভির বাকি শুটগুলো তারা ততদিনে কমপ্লিট করে ফেলছে। যার জন্য গত বিশ দিন ধরে পুরো টিম সিঙ্গাপুরে ছিল। তার বুকের ভেতর ক্ষীণ একটা আশার আলো জ্বলে ওঠে। হয়তো এদের মধ্যে কেউ তাকে সাহায্য করতে পারবে। সে এক পা সামনে বাড়ায়, কিন্তু পরের মুহূর্তেই থেমে যায়। মাথার ভেতর আবার বাজতে থাকে সেই কথা

-“যে কেউ হতে পারে…”
যদি এদের মধ্যেই কেউ থাকে?
যদি এদের কেউই নিরাপদ না হয়?
ভয়টা আবার সবকিছু গ্রাস করে নেয়। সে আবার পেছনে সরে গিয়ে লুকিয়ে পড়ে। সময় গুনতে থাকে। এক দুই তিন ঠিক ত্রিশ মিনিট পর আরেকটা প্রাইভেট জেট অবতরণ করে। এইবার সানার চোখ আরও তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে। প্রথমে নামে ইবন মির্জা, তার সঙ্গে তার সেক্রেটারি। কোনো দিকে না তাকিয়ে সরাসরি ভেতরে চলে যায় তারা।
তারপর নামে সারহাদ চৌধুরী। তাকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে সানার বুকের ভেতর যেন আলো জ্বলে ওঠে। তার ঠোঁটের কোণে অজান্তেই একটুকরো প্রশান্তির হাসি ফুটে ওঠে। কারণ মিসেস সাইয়েদা সারহাদের ব্যাপারেও তাকে সত্যিটা বলেছেন। এই ফিল্ডে সন্দেহের বাইরে শুধুমাত্র আছে, চৌধুরীরা।
সানা একবার পিছনে তাকায় লোকগুলো এখনও ভেতরে ব্যস্ত, ধীরে ধীরে তারা বাইরে আসছে। এটাই সুযোগ, সে গভীর একটা নিঃশ্বাস নিয়ে তারপর দৌড় দেয় সামনে। এদিকে সারহাদের পিছনেই নেমে আসে ঈশানী। সানাকে দেখে সে থমকে যায়। চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে ওঠে,

-“ডাইনি…”
সানা আর দাঁড়াতে পারে না। সে ছুটে গিয়ে তাদের সামনে দাঁড়ায়। শ্বাস কাঁপছে, গলা আটকে যাচ্ছে, শব্দ বের হতে চাইছে না। তবুও সে বলতে শুরু করে ভাঙা ভাঙা, এলোমেলো ভাবে যতটুকু পারে। প্রতিটা শব্দের সঙ্গে তার ভয়, আতঙ্ক, যন্ত্রণা বেরিয়ে আসে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে আর নিজেকে সামলাতে পারে না। আর সেখানেই নিজের জ্ঞান হারিয়ে ফেলে।
এদিকে সারহাদ প্রথমে নিজের বিস্মিত নয়ন জোড়াকে বিশ্বাস করাতে পারছিল না, সে সত্যিই সানাকে দেখছে। যাকে দেখার জন্য সে এক মাস ধরে ছটফট করছিল, যাকে দেখার জন্য নিজের অবস্থান আত্মসম্মান সব ভুলে চার-পাঁচ বার ব্ল্যাক ম্যানশনেও গিয়েছিল। কিন্তু আরজে, সে তাকে একবারও ভিতরে যেতে দেয়নি। আজ সে তাকে সামনে দেখছে। পরবর্তীতে সারহাদের প্রাইভেট জেটে করে সানা ঈশানীসহ অন্য দেশে পাড়ি জমায়। এজন্য আরজে কোনরকম কিছু খুঁজে পায়নি। সানা চায়না এসে মিসেস সাইয়েদার ফেন্ডকে খুঁজে পাওয়ার পর তাদের দুজনকে চলে যেতে বলেছে। কিন্তু কেউই যায়নি। এদিকে ঈশানীরও তার ভাইয়ের এত বড় সত্যিটা জেনে তার আর ইচ্ছা করলো না এখানে আবার ফিরে আসতে। সানা সারহাদকে সাফ সাফ বলে দিয়েছে সে নিজের সন্তানের জন্য কোনরকম র*ক্ত চায় না। তাই সারহাদ যেন চলে যায়। কিন্তু দুই রমণীকে অবাক করে সারহাদ বলে, সে নিজের বাবার খু*নিদের মাফ করে দিয়েছে তার মায়ের মতো। তাই বিডিতে নিজেকে এইরকম ভাবে উপস্থাপন করে যে, সে সব কিছু ছেড়ে ইতালি নিজের মায়ের কাছে চলে যাচ্ছে। আর আরজের তো তাকে নিয়ে কখনোই মাথাব্যথা ছিল না সে চলে গেলে আরো ভালো।

তবে আরজের সন্দেহের কাতারে সবচেয়ে প্রথমে ছিল এসপি। কেন জানি তার মনে হয়েছিল, সানা যদি কোথাও যায় তাহলে সর্বপ্রথম এসপির সাথে যোগাযোগ করবে। এমনকি এসপিকেও বারবার চাপ দিচ্ছিল। সানা কোথায় তা বলার জন্য। সানিতাকে কিডন্যাপ করার হুমকিও দিয়েছে। কিন্তু এসপি প্রতিবার এটাই বলেছে, সে জানে না। ওই সময় সে সত্যিই জানত না। সে নিজেও হন্য হন্য হয়ে দুমাস ধরে স্কুল থেকে কলেজ প্রতিটা ফ্রেন্ডের বাড়ি বাড়ি গিয়ে খোঁজ চালিয়েছে। এদিকে আরজে তার এবং সানিতার মোবাইল ফোন থেকে শুরু করে সবকিছুতে নজরবন্দি করে দিয়েছে। তার বাড়ির ভিতর বাহির সব জায়গায় গার্ড লাগিয়ে দিয়েছে। তাকে সারাক্ষণ নিজের চোখে চোখে রাখত। দীর্ঘ দুই মাস পর একদিন সারহাদ খুশদিলের ফোন থেকে এসপিকে সত্যিটা বলে। সাথে সাথে এসপি বলে সে সানাকে দেখতে যাবে। কিন্তু কিভাবে?

আরজে তাকে সম্পূর্ণ কারাগারে বন্দি করে রেখেছে। একবছর পর এসপি সানিতাকে নিয়ে হানিমুনের উদ্দেশ্যে থাইল্যান্ডে যাবে বলে দেশের বাহিরে বের হয়। এতেই কি আরজে থেমে গিয়েছিল? নাহ, তাকে থাইল্যান্ডেও নজরবন্দি করে রেখেছে। সে আরজের গার্ডদের জন্য ভালো করে হানিমুনও করতে পারেনি? এভাবে এসপি যত দেশেই যায় তার পিছু নেয় আরজের লোকেরা। দীর্ঘ আরও একবছর পর যখন দেখল এসপির সাথে সানা কোনরকম যোগাযোগ করেনি। তখন আরজের লোকেরা পরাজিত সৈন্যের মতো ফিরে আসে। অবশেষে এসপি নিজের দুই বছরের বন্দি জীবন থেকে মুক্তি পায়। তারপর সানার কাছে যায় সানিতা সহ।
চীনের এক আধা-আধুনিক, শান্ত গ্রাম নাম “লিনহুয়া ভ্যালি” গ্রামটা পুরোপুরি শহুরে না, আবার পুরোপুরি অজ পাড়াগাঁও না। দূরে দূরে ছড়িয়ে থাকা ঘরবাড়ি, মাঝখানে কাঁচাপাকা রাস্তা, ছোট ছোট দোকান, একটা প্রাইমারি স্কুল, আর চারপাশে সবুজ গাছপালা সব মিলিয়ে নিঃশব্দ কিন্তু জীবন্ত একটা পরিবেশ।
এই গ্রামেই দাঁড়িয়ে আছে তাদের ছোট

“ভীর নিবাস”
বাড়িটা দুই তলা, সাদা রঙের, চারদিকে হালকা নীল বর্ডার দেওয়া, সামনে ছোটখাটো গার্ডেন। নিচ তলায় বড় একটা ড্রয়িং রুম, পাশেই ডাইনিং, আর খোলা কিচেন। উপরে পাঁচটা রুম, সবার আলাদা কক্ষ। সানিতা ছাড়া সবাই কর্মরত। সানা, ঈশানী ও এসপি গ্রাম থেকে দূরে একটু শহরের সাইডে একটা ছোট কোম্পানিতে জব করে। তবে সারহাদ অবিজ্ঞতার দরুন তার ভালো কোম্পানিতে শহরের দিকে থাকে। তবে সত্যিই কি সারহাদ সব ছেড়ে দিয়েছে?
“চায়না, লিনহুয়া একাডেমির” বড় প্রাঙ্গণটা আজ অন্যদিনের তুলনায় অনেক বেশি সাজানো। স্কুলের গেট থেকে শুরু করে ভেতরের মাঠ পর্যন্ত রঙিন ব্যানার, ছোট ছোট পতাকা আর ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে। মঞ্চের সামনে সারি সারি চেয়ার, যেখানে অভিভাবক আর বাচ্চারা বসে আছে। মাইকের হালকা শব্দ, শিশুদের কোলাহল, আর মাঝে মাঝে চাইনিজ ভাষার ঘোষণায় পুরো পরিবেশটা এক ধরনের প্রাণবন্ত উত্তেজনায় ভরে উঠেছে।
কিছুক্ষণ পর একজন শিক্ষক মাইকে এসে অনুষ্ঠান শুরু করে। ধীরে ধীরে চারপাশটা একটু শান্ত হয়ে আসে। তিনি চাইনিজ ভাষায় বলেন,

-“সকলকে স্বাগতম… আজ আমাদের স্কুলের নতুন শিক্ষার্থীদের ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণা করা হবে”
তারপর একে একে কয়েকজন স্যার-টিচার মঞ্চে উঠে বক্তব্য দিতে থাকে শিক্ষার গুরুত্ব, বাচ্চাদের ভবিষ্যৎ, স্কুলের নিয়মকানুন সব কিছু নিয়ে তারা সিরিয়াসভাবে কথা বলছে।
কিন্তু এইসবের কিছুই যেন সানার কানে ঢুকছে না। সে আর এসপি পাশাপাশি বসে আছে, কিন্তু দুজনের মনই অন্যদিকে। সানা হালকা ঝুঁকে ফিসফিস করে,
-“দেখ ওদের সবাই দেখতে প্রায় একরকম লাগে না?”
এসপি চোখ কুঁচকে চারদিকে তাকায়,
-“হুম… এদের চোখ, ফেস কাট সব একই লাগে”
তারা দুজন গভীর গবেষণায় মগ্ন এদিকে পাশে বসে থাকা ঈশানী বিরক্ত হয়ে চোখ উল্টায়,
-“তোমরা দুজন কি সিরিয়াস? এখানে অনুষ্ঠান চলছে, আর তোমরা মানুষ নিয়ে রিসার্চ করছো?”
সানা তার বিপরীতে বলে,

-“লাইভ রিসার্চ…”
-“এটাকে ফিল্ড স্টাডি বলে, মিসেস নাগিন….”
ঈশানী মুহূর্তে চারপাশ কাঁপিয়ে চিৎকার করে,
-“মিস, মিস নাগিন”
-“আচ্ছা, আচ্ছা…”
সবাই ঘাড় নাড়িয়ে একপলক দেখে আবারও নিজেদের মধ্যে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
ওদিকে আরভি, সে সম্পূর্ণ নিজের জগতে।তার ছোট্ট চোখ দুটো চারদিকে ঘুরছে। মাঝে মাঝে সে অন্য বাচ্চাদের দিকে তাকাচ্ছে, কেউ কি করছে দেখছে। তার চোখে ভয় কম, বরং কৌতূহল বেশি। কখনো সে নিজের জুতার দিকে তাকায়, কখনো সামনে মঞ্চের দিকে। আরভির চারদিকে তাকানো দেখে এসপি তার দিকে ঝুঁকে হঠাৎ প্রশ্ন করে বসে,

-“হেই লিটল চ্যাম্প, বলো কোন মেয়ে পছন্দ হয়েছে কিনা? দুই সেকেন্ডে পটিয়ে দেব”
পাশে বসা সানার বাক্যটুকু শ্রবণ হতেই সে নিজের দাঁত খিচিয়ে বলে,
-“বিটকেলের বাচ্চা, ডোন্ট ডেয়ার টু মেক মাই সান লাইক ইউ”
এদিকে সানার মুখে এমন উল্টোপাল্টা ইংলিশ শুনে আরভি মুখ তুলে তার দিকে তাকিয়ে তাৎক্ষণিক বলে,
-“মম, ওটা ‘ডোন্ট ইউ ডেয়ার মেক মাই সান লাইক ইউ’ হবে”
মুহূর্তে সানা হকচকিয়ে ওঠে, কেমন বিচ্ছু ছেলে যে নিজের মায়ের ভুল ধরে। তাই নিজের চোখ মুখ উল্টে অবিশ্বাসের সুরে আওড়ায়,

-“দেখেছিস এসপি, নয় মাস পেটে রাখলাম আমি, আর বের হতেই বাপের মত আমার ভুল ধরে”
-“মম আমার ড্যাড কে নিয়ে কিছুই বলবে না”
সানা যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করাতে পারছে না, ছেলেকে তীক্ষ্ণ চোখে অবলোকন করে। এটা বিষয় না ছেলের সামনে তার সম্মান জলে ভেসে গেল, কথা এটা, বিষয় এটা, কথা দিয়ে নিজের ভুল ঢাকতে হবে, শাক দিয়ে মাছ ঢাকার মতো। তাই চোখে পানি না থাকা সত্ত্বেও হাত দিয়ে তা মুছে মেকি সুরে আহাজারি করে ওঠে,
-“উপরওয়ালা গো, এইসব কি দেখছি আমি..”
পাশে বসা এসপি এদিকে হেসে কুটিকুটি। সানার যে সম্মান নিজের ছেলের সামনে পুরোটা গিয়েছে, এটা দেখে তার ইচ্ছা করছে খুশিতে হারপিক খেয়ে উদযাপন করতে। তাই তাকে আরো জ্বালানোর জন্য বলে,
-“একটু চেষ্টা করে যদি চোখের পানিটা বের করতে পারিস, তাহলে এক্টিংটা একটু রিয়েল লাগত আরকি”
মুহূর্তে রমণী কটমট করে তার দিকে তাকায়। এসপি তার তোয়াক্কা না করে ফের বলে,
-“ব্যাস ব্যাস আমার মা এবার ওভার এক্টিং হয়ে যাচ্ছে। একটা ভালো বুদ্ধি দেই, তোর ছেলের সাথে তুইও পড়াশোনা স্টার্ট ক…”

এসপি নিজের বাক্যটুকু সম্পন্ন করার আগেই ‘ধরাম’ করে তার পিঠে পড়ে যায়, ‘তালের বড়া’। শব্দটা এত জোরে হয়েছে ঈশানী তাড়াতাড়ি তার দিকে তাকায়,
-“এই ডাইনি এত জোরে কিসের শব্দ হয়েছে, কোথাও আরভি পড়ে যায়নি তো?”
এসপি নিজের পিঠ ঢলতে ঢলতে বলে,
-“আমার পিঠের তালের বড়া পড়েছে”
-”তালের বড়া!! কিন্তু চায়নাতে তালের বড়া কোথা থেকে আসবে?”
-“আরে এই তালের বড়ার, চায়না বাংলাদেশ কিছুই লাগে না, কটকটির হাতে সব জায়গাতেই পাওয়া যায়”
-“ওই ডাইনির হাতে তালের বড়া কোথা থেকে আসবে?”
এসপি সানার দিকে তাকিয়ে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে,
-“এই কটকটি একেও একটা তোর হাতের স্পেশাল তালের বড়া লাগা?”

মুহূর্তে ঈশানী বুঝে যায় এসপি কিসের কথা বলছে। সে চোখ বড় বড় করে আরো এক চেয়ার দূরে চলে যায়। এদের সাথে বিশ্বাস নেই। কখন কি করে বসে এরা। এমনিতেই তার টেনশনে মাথা ফেটে যাচ্ছে কখন যে রেজাল্ট দিবে। কিন্তু এই দুই আল্লাহর বান্দাকে দেখলে মনে হবে যে, এদের টেনশন বলে কিছু আছে। কি সুন্দর বিন্দাস গল্প গুজব করছে। মনে হচ্ছে সব টেনশন ঈশানীকেই দিয়ে দিয়েছে এরা।
হঠাৎ করে স্কুলের মাঠের বাইরে হালকা একটা শব্দ শোনা যায়। সবাই প্রথমে তেমন গুরুত্ব দেয় না, কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা কালো গাড়ি ধীরে ধীরে গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ে। মাঠের ভেতর থাকা কয়েকজন অভিভাবক কৌতূহলী হয়ে তাকায়। গাড়িটা খুব বেশি জাঁকজমকপূর্ণ না। গাড়ি এসে থামে একটু দূরে, যেখানে সাধারণত কেউ গাড়ি নিয়ে ঢোকে না।
সামনের দরজাটা ধীরে খুলে বের হয় মানব। সে চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নেয়, যেন জায়গাটা স্ক্যান করছে। তারপর ধীরে ধীরে হেঁটে এসে দর্শকদের বসার সারির একপাশে গিয়ে বসে পড়ে। তার চোখ এক মুহূর্তের জন্য থামে, সানাদের দিকে। কিন্তু সে কিছু না বলে শুধু বসে থাকে।
এদিকে আরভির চোখ হঠাৎ থেমে যায় তার ওপর। মুহূর্তে তার মুখটা উজ্জ্বল হয়ে চিৎকার করে ওঠে,

-“বড় পাপা…”
চারপাশের কয়েকজন মানুষ চমকে তাকায়। আরভি আর এক মুহূর্তও দেরি করে না সে দৌড়ে সোজা ওই লোকটার দিকে ছুটে যায়। সানা আর এসপি দুজনেই চমকে উঠে একসাথে ঘুরে তাকায়,
-“আরভি….”
কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে। ছোট্ট আরভি দৌড়ে গিয়ে লোকটার সামনে দাঁড়ায়, আর এক লাফে তার গায়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। মানবের ঠোঁটের কোণে একটা চেনা, উষ্ণ হাসি ফুটে ওঠে। সে দুই হাতে আরভিকে ধরে সহজেই কোলে তুলে নেয়। নরম গলায় শুধায়,

-“এই তো আমার চ্যাম্প….”
সানা আর এসপি তখন পুরোপুরি ঘুরে তাকিয়েছে। এসপি নিচু স্বরে বলে,
-“ব্রো, এত লেট করে এসেছে…”
সানা কিছু না বলে না আবারও সামনে তাকায়। সারহাদ একগাল হেসে বসে আছে, যেন কিছুই হয়নি। আরভি তার গলায় হাত জড়িয়ে বলে,
-“তুমি এতদিন পরে আসলে কেন? আমি তোমাকে মিস করেছি”
সারহাদ হেসে তার চুল এলোমেলো করে,
-“আমার ছোট্ট হিরো আমাকে মিস করেছে নাকি?”
-“অনেক”
-“কতটা?”
আরভি হাত দুটো ছড়িয়ে,
-“এতটা………”
সারহাদ হেসে ফেলে,
-“ওহ এতটা”

সে আরভিকে একটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। আরভি সত্যিই সবচেয়ে বেশি ফ্রি তার সাথে তার চোখে কোনো ভয় নেই, কোনো সংকোচ নেই, শুধু খাঁটি আনন্দ।
সবার অপেক্ষার অবসান হয় অবশেষে। মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে একে একে নাম ডাকা শুরু করে শিক্ষকরা। চারদিকে এক ধরনের চাপা উত্তেজনা, কারো চোখে দোয়া, কারো মুখে নার্ভাস হাসি। আরভি নিজের ছোট্ট হাত দুটো শক্ত করে ধরে বসে আছে। মাঝে মাঝে সানার দিকে তাকাচ্ছে, আবার কখনো সারহাদের দিকে।
-“নাম্বার ওয়ান…”
মাঠ যেন হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে যায়,
-“রিশভীর জাওয়ান”
মুহূর্তেই চারদিকে হাততালি পড়ে যায়। আরভি প্রথমে বুঝতেই পারে না। তারপর যখন সবাই তার দিকে তাকিয়ে হাসতে থাকে, সে লাফিয়ে উঠে,
-“বড় পাপা, আই ডিড ইট”
সারহাদ হেসে তাকে কোলে তুলে নেয়,
-“আমি জানতাম, তুমি পারবে”
সানা দূর থেকে ভ্রুক্ষেপহীন তাকিয়ে থাকে নিজের ছেলের দিকে। তার চোখে গর্ব, ভালোবাসা আর এক অদ্ভুত ব্যথা মিশে আছে। এসপি খুশিতে বলে,

-“দেখছিস? আমাদের আরভি ফার্স্ট”
ঈশানী তো প্রায় লাফাচ্ছে,
-“অবশ্যই হবে, আমি পড়িয়েছি কাকে?”
সে গিয়ে আরভির গালে একটা চুমু দিয়ে বলে,
-“এইটা আমার স্টুডেন্ট”
কিন্তু এত সবকিছুর মধ্যেও সারহাদের চোখ বারবার সরে গিয়ে থামে এক জায়গায়, সানার উপর। সে আজ শাড়ি পরেছে। খুব সাধারণ, কিন্তু তবুও আলাদা। চোখে হালকা কাজল, চুলগুলো খোলা। এই ছয় বছরে অনেক কিছু বদলেছে, কিন্তু সানার কিছু জিনিস একদম আগের মতোই রয়ে গেছে।
সারহাদ তাকিয়ে থাকে একটু বেশিই সময় ধরে। তার বুকের ভেতর কোথাও হালকা একটা চাপ অনুভব হয়। সে চোখ সরিয়ে নেয়, নিজের মনকে বুঝায়,
“সে অন্যের স্ত্রী, তোর জন্য হারাম”
কিন্তু বেইমান চোখ আবার কিছুক্ষণ পর নিজে থেকেই তাকায়। যেন চোখ তার কথা শুনছে না। অনুষ্ঠান শেষ হয় ধীরে ধীরে। মানুষজন একে একে বের হতে শুরু করে। এই সময়, আরভি হঠাৎ করে সারহাদের গলা জড়িয়ে ধরে বসে পড়ে,

-“আমি বড় পাপার সাথে যাবো”
সানা তার জন্য হাত বাড়িয়ে বলে,
-“না ভীর, স্যার অফিসে যাবে”
-“না, আমি বড় পাপার সাথেই যাবো”
পাশ থেকে এসপি বলে,
-“আচ্ছা ব্রো, অফিস যাওয়ার আগে ওকে দিয়ে যেও”
দুই রমণী আর কী বলবে সারহাদ আচ্ছা বলার পর তিনজনই নিজেদের গাড়ির দিকে এগিয়ে যায়।
সারহাদ দাঁড়িয়ে থাকে, এক হাতে আরভিকে শক্ত করে ধরে রাখা। আর তার চোখ স্থির হয়ে থাকে সানার চলে যাওয়া পথের দিকে। কিছু না বলে সারহাদ তাকিয়ে থাকল যতক্ষণ সেই মায়াবিনীকে দেখা যায়। কেন জানি, পূরণ হবে না জেনেও মনের কোণে একটা সুপ্ত অভিলাষ উঁকি দিল,
“একবার ফিরে তাকাবে পাথর মানবী”
নাহ তাকালো না। সারহাদ তাচ্ছিল্য হেসে মনে মনে আওড়ায়,
-“কে বলেছে ভালোবাসা দ্বিতীয়বার হয় না?”
সে হালকা হেসে ফেলে, কিন্তু সেই হাসিতে কোনো উষ্ণতা নেই,
-“তাহলে তোমার হলো না কেন, সানাম?
কেন তুমি এখনও শুধু তোমার রানভীরকেই ভালোবাসো? লোকে বলে ভুলে যেতে, নতুন করে শুরু করতে…..
ওদের কে গিয়ে বলো, যে মেয়েটা নিজের এক বছরের ভালোবাসা ভুলতে পারলো না,
আমি কীভাবে ভুলবো আমার এক যুগের ভালোবাসা?”
সে আকাশের দিকে তাকায়,

-“বারোটা বছর, সানাম,
সে হালকা মাথা নেড়ে ফের বলে,
-“না, না এখন তো আঠারো বছর, তুমি জানোও না কতবার নিজেকে থামাতে চেয়েছি, কতবার বলেছি ‘শেষ আর না’ হয়তো ভালোবাসা হলে শেষ হয়ে যেত কিন্তু যখন মানুষ মায়ায় পড়ে যায় সেটা আর শেষ হয় না। মায়া যে বড়ই ভয়ঙ্কর, বুঝতেই চায় না, তুমি কোনদিনও আমার হবে না”
সারহাদ আর দাঁড়ায় না, আরভির হাত ধরে গাড়ির দিকে এগিয়ে যায়। ঠোঁটের কোণে এখনো লেগে আছে তাচ্ছিল্যের হাসি,
-“তুমি এমন এক অমূল্য রত্ন,
যার মূল্য আমি কোনোদিনই শোধ করতে পারলাম না। তুমি অন্যের হয়েও এত সুন্দ, যদি আমার হতে…
তবে হয়তো আমি আর নিজেকে খুঁজে পেতাম না, পুরোটাই তোমাতে হারিয়ে যেতাম”
এদিকে সানা গাড়ির কাছে এসেই বলে সে নাকি ড্রাইভ। তার কথাটা যেন বোম ফাটালো বাকি দুজনের মধ্যে। এসপি একবারেই না। ঈশানীতো আরও আগে। সে সাফ সাফ বলে দিয়েছে,

-“তোরা বিয়ে করেছিস, আমারও বিয়ে করার অধিকার আছে। আমি বিয়ে না করে উপরে যেতে চাই না”
-“এসপি তুই আমাকে বিশ্বাস করিস তাই না”
-“আমার মা, সামনেই আমি বাপ হবো, মেয়ের মুখটা দেখে মরতে চাই আমি”
সানা তেরচা চোখে শুধু দুই বিশ্বাস ঘাতক কে দেখলো শুধু। তারপর মুখ বাকিয়ে গাড়িতে উঠে পড়ে।
এসপির গাড়ি এসে থামে গ্রামের লোকাল মার্কেটের ভিতরে। আজকে আরভি ফার্স্ট হয়েছে তার জন্য ঈশানী ও এসপি সানার কাছে ট্রিট চেয়েছিল। সানা বলতেই রাজি হয়ে যায়। প্রথমে দুজনেই অবাক হয়ে গেছে তার মত কিপটা মহিলা নাকি তাদের ট্রিট দেবে। পরমুহূর্তে সানা বলে দুজনকে পাঁচ টাকার আইসক্রিম খাওয়াবে। এতেও তারা দুজন রাজি হয়ে যায়। কেননা সানার পকেট থেকে পাঁচ টাকা বেরিয়েছে এটাই তো অনেক। তবে আগে সে তাদেরকে একটা জায়গায় নিয়ে যাবে। তারা তিনজন গিয়ে থামে একটা ক্লিনিকের সামনে। ভেতরে প্রবেশ করতে দুজন কমবয়সী মেয়ে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করে,

-“আমরা কি হেল্প করতে পারি”
সানা এগিয়ে গিয়ে নিচু স্বরে বলে,
-“আমরা বিডি থেকে এসেছি, মিসেস খানমের সাথে দেখা করার জন্য”
মেয়ে দুজন কিয়ৎকাল মুখ চাওয়া চাওয়ি করল নিজেদের মধ্যে। তারপর কিছু না বলে তাদের ভিতরে পাঠিয়ে দিল একটা গোপন দরজার মাধ্যমে। ঈশানী সানার কানে কানে জিজ্ঞেস করে,
-“ডাইনির বাচ্চা পাঁচ টাকার আইসক্রিম খাওয়াবি বলে এ আমাদের কোথায় নিয়ে এসেছিস?”
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এসপিও দন্ত চেপে তার উত্তরের অপেক্ষায় তাকিয়ে আছে। সানা দুদিকের ক্ষ্যাপা ষাড় গুলোর দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে বলে,
-“আরে ইনি হচ্ছেন মিসেস দিলরুবা খানম, ইন্টারন্যাশনাল এজেন্ট মিসেস সাইয়েদার ফ্রেন্ড। ইনি তো আমার সকল ডেটা ডিলিট করে দিয়েছেন, সাথে তোদেরও”
-“আরে ডিরেক্ট বলনা তোকে পৃথিবী থেকে ডিলিট মেরে দিয়েছে”
-“কথা এইটা না ডিলিট করে দিয়েছে, কথা হল তুই এখানে কেন নিয়ে এসেছিস?”
-“ভিতরে চল দেখাচ্ছি কেন নিয়ে এসেছি”

বাংলাদেশের রাত আজ আলোর ঝলকে অন্যরকম হয়ে উঠেছে। ঢাকার অভিজাত কনভেনশন সেন্টারের চারদিকে বিশাল গেট, লাল কার্পেট বিছানো প্রবেশপথ, মাথার উপর ঝাড়বাতির মতো ঝুলছে হাজারো লাইট। বাইরে মিডিয়ার ক্যামেরার ফ্ল্যাশ যেন থামতেই চাইছে না। একের পর এক গাড়ি এসে থামছে, নামছে দেশের নামকরা তারকারা।
ভিতরে প্রবেশ করলেই যেন আরেক জগৎ বড় স্টেজ, বিশাল এলইডি স্ক্রিনে ভেসে উঠছে সিনেমার ক্লিপ, দর্শকদের আসনগুলো ভরা তারকা, প্রযোজক, ব্যবসায়ী, মিডিয়া পার্সনালিটিতে। হালকা মিউজিক বাজছে, ওয়েটাররা ঘুরে বেড়াচ্ছে ড্রিংকস নিয়ে।
ঘোষকের কণ্ঠ ভেসে ওঠে,

-“লেডিস অ্যান্ড জেন্টলম্যান, ওয়েলকাম টু দ্য মোস্ট প্রেস্টিজিয়াস অ্যাওয়ার্ড নাইট অফ দ্য ইয়ার”
চারদিকে তালির শব্দ ভেসে ওঠে। হঠাৎ বাইরে একটা কালো লম্বা গাড়ি এসে থামে। ক্যামেরার ফ্ল্যাশ একসাথে সেই গাড়ির দিকে ঘুরে যায়। ড্রাইভার নেমে দরজা খুলে দেয়। ধীরে ধীরে গাড়ি থেকে নামেন,
“সোফিয়া জাওয়ান”
কালো জামদানী শাড়ি, চুল পিছনে খোপা করা, ঠোঁটে গাঢ় লিপস্টিক। সে নামতেই,মিডিয়ার লোকজন চিৎকার করে ওঠে,
-“সোফিয়া ম্যাম এখানে প্লিজ”
-“লুক হিয়ার ম্যাম’
সোফিয়া একচিলতে রহস্যময় হাসি দেয়। তার চোখে সেই চেনা ঠান্ডা আত্মবিশ্বাস যেন সে জানে, এই পুরো জায়গাটার কেন্দ্রবিন্দু এখন সে-ই। ধীরে ধীরে লাল কার্পেট ধরে এগিয়ে যায় ভিতরে। কানে ভেসে এলো চারদিকের ফিসফিস,

-“ওই তো মেইন স্পনসর…”
-“ওনাকে ছাড়া এই ইভেন্ট সম্ভবই না”
সোফিয়া ঠোঁটে সন্তুষ্টের হাসি ঝুলিয়ে ভিতরে চলে যায়।
সেন্টারের বাইরের পরিবেশ তখনও ক্যামেরার ঝলকানিতে উত্তপ্ত, ঠিক সেই মুহূর্তে একের পর এক কালো, চকচকে বিলাসবহুল গাড়ি এসে থামতে শুরু করে। মাঝখানে ধীরে ধীরে এসে থামে একটা কালো রোলস রয়েলস। গাড়িটা থামতেই চারপাশে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা নেমে আসে। মিডিয়ার ক্যামেরাগুলো একসাথে সেই দিকেই ঘুরে যায়, ফ্ল্যাশ লাইট যেন হঠাৎ আরও দ্রুত ঝলসে উঠতে থাকে। কাইলিন নেমে এসে দরজাটা খুলে দেয়। গাড়ি থেকে নামে আরজে।
কালো স্যুট, ভেতরে ডার্ক শার্ট, গলার বোতাম খোলা, চুলগুলো একটু এলোমেলো, চোখে সেই পরিচিত ঠান্ডা আগুন। তার মুখে আগের বক্সিংয়ের আঘাতের হালকা দাগ এখনো স্পষ্ট চোয়াল শক্ত, চোখে ক্লান্তি নেই, আছে শুধু নিয়ন্ত্রণহীন এক গভীর অন্ধকার।
সে নামার সাথে সাথেই চারপাশ চিৎকারে ভরে যায়,

-“আরজে, আরজে এখানে”
-“লুক হিয়ার”
-“ওয়ান স্মাইল প্লিজ”
কিন্তু বিপরীত পাশের মানব একবারও তাকায় না। যেন এইসব কিছুই তার কাছে অপ্রাসঙ্গিক। তার চারপাশে থাকা গার্ডরা দ্রুত এগিয়ে এসে ভিড়কে দুই পাশে সরিয়ে দেয় একটা পরিষ্কার পথ তৈরি হয় তার জন্য।
লোকজন ঠেলে পিছিয়ে যায়, ক্যামেরা উঁচু হয়ে ওঠে। কোনো পোজ নয়, কোনো হাত নাড়া নয়, কোনো সৌজন্য না। লাল কার্পেট শেষ করে সে সোজা সেন্টারের দরজার ভেতর ঢুকে যায়।
সেন্টারের বিশাল দরজা পেরিয়ে ভিতরে ঢুকতেই আরজেকে যেন গিলে নেয় আলো আর শব্দের এক অদ্ভুত দুনিয়া। ভেতরে ঝাড়বাতির সোনালি আলো ছড়িয়ে আছে চারদিকে। সে প্রবেশ করতেই যেন পুরো হলের পরিবেশ বদলে যায়। এক মুহূর্তে কথাবার্তা থেমে যায়। সবার চোখ ঘুরে আসে এক দিকেই।
“আরজে”
কিন্তু মানবের সেদিকে কোন খেয়াল নেই সে একমনে হেঁটে নিজের জন্য বরাদ্দ করে রাখা সিটের দিকে যায়। সামনের সারি থেকে উঠে দাঁড়ায় সোফিয়া। সে এগিয়ে আসে, ঠোঁটে মৃদু হাসি এনে বলে,

-“রনো…..”
শব্দটা পুরোপুরি শেষ হওয়ার আগেই আরজে তার পাশ দিয়ে চলে যায়। একবারও তাকায় না, আর না একটুও থামে। যেন সে সেখানে ছিলই না। সোফিয়ার মুখের হাসিটা এক সেকেন্ডে জমে যায়, তার চোখে অবিশ্বাস, তারপর ধীরে ধীরে সেই জায়গা নেয় অপমান। সোফিয়া দাঁতে দাঁত চেপে ফেলে। তার আঙুলগুলো মুঠো হয়ে আসে নখগুলো প্রায় হাতের তালুতে ঢুকে যায়। মুখটা ধীরে ধীরে লাল হয়ে ওঠে অপমানে। সে আর কিছু বলে না শুধু ঘুরে গিয়ে নিজের সিটে বসে পড়ে।
আরজে গিয়ে বসে পড়ে তার জন্য নির্ধারিত ভিআইপি আসনে। পেছনে হেলান দিয়ে, এক হাত আর্মরেস্টে, চোখ সামনে স্থির। এই বছরের সবচেয়ে প্রতীক্ষিত মুহূর্ত অবশেষে এসে উপস্থিত হলো। বিশাল হলঘরের আলো ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসে, স্পটলাইট গিয়ে থামে মঞ্চের মাঝখানে। চারপাশে নিস্তব্ধতা শুধু ক্যামেরার ক্লিক আর মানুষের দম বন্ধ করা অপেক্ষা। ঘোষকের কণ্ঠ ভেসে পৌঁছে যায় সবার কানে,

-“এই বছরের সেরা অ্যাক্টর…
কিছুক্ষণ থেমে ফের বলে,,
-“আরজে……”
মুহূর্তের মধ্যে পুরো হল কেঁপে ওঠে করতালিতে। কেউ দাঁড়িয়ে যায়, কেউ শিস দেয়, কেউ আবার অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। আরজে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। তার চোখে কোনো উচ্ছ্বাস নেই, নেই হাসি শুধু এক অদ্ভুত শীতলতা। সে মঞ্চের দিকে এগিয়ে যায়, চারপাশের শব্দ যেন তার কানে পৌঁছাচ্ছে না। যেন সে এই ভিড়ের মধ্যে থেকেও একা।
আরজে এওয়ার্ডটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ সেটার দিকে তাকিয়ে থাকে, যেন এটা কোনো অর্জন না, বরং একটা নিছক বস্তু। মাইক্রোফোন সামনে এগিয়ে আসে সে, মিডিয়ার প্রশ্ন শুরু হয়,
-“এই অ্যাওয়ার্ড পেয়ে কেমন লাগছে?”
-“আপনার পরবর্তী প্রজেক্ট কী?”
-“এই সফলতার রহস্য কী?”
আরজে কিছু প্রশ্নের উত্তর দেয়, কিছু এড়িয়ে যায়। তার কণ্ঠ স্থির, নির্লিপ্ত। হঠাৎ একটা প্রশ্ন ভেসে আসে জনতার ভিড় থেকে,

-“স্যার, আপনার ওয়াইফ কি অন্য কারো সাথে পালিয়ে গেছে?”
এইরকম প্রশ্নে এক মুহূর্ত পুরো হল জমে যায়। আরজে থেমে যায়। তার চোখ স্থির হয়ে যায়, শ্বাস ধীর হয়ে আসে। যেন সেই এক প্রশ্ন তার ভেতরের সবকিছু ছিঁড়ে ফেলেছে। চারপাশের মানুষ আতঙ্কিত হয়ে ওঠে অনেকেই। চোখাচোখি করে এই প্রশ্নটা আগেও কেউ করেছিল… আর তার ফল কী হয়েছিল, সেটা সবাই জানে।
কিন্তু প্রশ্ন করা লোকটা নতুন। সে বুঝতে পারেনি সে কী আ*গুনে হাত দিয়েছে। আরজে কিছু না বলে, সে ধীরে নিজের ঘাড়ে হাত বুলায়, চুলগুলো এলোমেলো করে। হাতে থাকা অ্যাওয়ার্ডটা অন্য হাতে নিয়ে দু-তিনবার চাপ দিয়ে দেখে যেন ওজন মাপছে।

তারপর হঠাৎ সে মঞ্চ থেকে নেমে আসে।। সবাই থমকে যায়। সে সোজা গিয়ে দাঁড়ায় সেই সাংবাদিকের সামনে। এক সেকেন্ডের জন্যও থামে না সদ্য পাওয়া এওয়ার্ডটা দিয়েই পেটানো শুরু করে। প্রথম আঘাতেই লোকটা পড়ে যায়। দ্বিতীয় আঘাতে চিৎকার ভেসে ওঠে। তৃতীয় আঘাতে চারপাশে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ে।
মানুষ ছুটোছুটি শুরু করে। কেউ চিৎকার করছে, কেউ ভিডিও করছে, কেউ পালাচ্ছে। এই বিশৃঙ্খলার মাঝেও আরজে থামে না, তার চোখে তখন শুধু রাগ না, বরং জমে থাকা বছরের পর বছর না বলা যন্ত্রণা। ঠিক তখনই জ্যাক আর কাইলিন দৌড়ে এসে তাকে ধরে ফেলে। গার্ডরা দ্রুত চারপাশ ঘিরে ফেলে। বহু কসরতে তাকে সরিয়ে আনা হয়।
আরজে নিজেও জানে কাল প্রতিটা সোশাল মিডিয়া থেকে শুরু করে প্রতিটা স্ক্রিনে ভেসে ওঠবে তাকে নিয়ে সমালোচনার ঝড়। কিন্তু তবুও এতে তার জনপ্রিয়তা কি কমেছে?
নাহ, বরং দ্বিগুণ হয়েছে। তার প্রতিটা কনসার্টে জমে ওঠে উপচে পরা ভিড়। লোকেরা তাকে এখন ‘ব্যাড বয়’ বলে। তার রাগ, তার সহিংসতা সবকিছুই যেন মানুষের কাছে আরও আকর্ষণীয় করেছে। কারণ মানুষের সবসময় নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতিই ঝোঁক থাকে বেশি।

ফাংশন দ্রুত বন্ধ করে দেওয়া হয়। চারদিকে বিশৃঙ্খলা, আতঙ্ক, দৌড়ঝাঁপ। গার্ডরা তাকে ঘিরে ফেলে, দ্রুত বাইরে নিয়ে আসে। কালো গাড়ির দরজা খুলে তাকে ভেতরে বসানো হয়।
আরজে গাড়িতে উঠতেই চারপাশটা যেন মুহূর্তেই নিস্তব্ধ হয়ে আসে। বাইরে এখনো ক্যামেরার ফ্ল্যাশ ঝলসে উঠছে, কিন্তু গাড়ির দরজা বন্ধ হতেই যেন সে সবকিছু থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নেয়, একদম নিজের অন্ধকার, শীতল জগতে। গাড়ির ভেতরে বসে থাকে আরজে চোখ বন্ধ। হাতে এখনো শক্ত করে ধরা সেই অ্যাওয়ার্ড। মনে হচ্ছে এখনো তার ভিতরের আগুনটা ঠান্ডা হয়নি।
সামনে বসা আছে জ্যাক ও কাইলিন। কিয়ৎকাল পর জ্যাক গাড়ি স্টার্ট করে। নীরবতা কাটিয়ে কাইলিন নিচু স্বরে বলে,

-“বস, এখনো মিসেস সাইয়েদার ব্যাপারে কোনো কনফার্ম তথ্য পাওয়া যায়নি। আমরা যতটা ভেবেছিলাম, ব্যাপারটা তার চেয়েও অনেক বেশি জটিল”
আরজের তরফ থেকে কোনো প্রত্যুত্তর আসে না। তার দৃষ্টি সামনের কাঁচের বাইরে স্থির, যেন সে শুনছে, কিন্তু প্রতিক্রিয়া দেখানোর প্রয়োজন মনে করছে না। কাইলিন আবার বলে,
-“তবে একটা গুরুত্বপূর্ণ লিড পেয়েছি… মিসেস সাইয়েদার সাথে কাজ করা একজন ইন্টারন্যাশনাল এজেন্টের খোঁজ পাওয়া গেছে। যিনি তার সাথে সিক্রেটভাবে কয়েকবার যোগাযোগ করেছেন”
এইবারও আরজে চুপ। কিন্তু তার আঙুলের হালকা নড়াচড়া দিয়ে ইশারা করে বুঝায় বলতে। কাইলিন এবার বলতে থাকে,

-“ওনার আসল নাম ‘মিসেস দিলরুবা খানম’ কিন্তু এটাই তার একমাত্র পরিচয় না। এই নারী একেক দেশে একেক নামে পরিচিত। একেক জায়গায় একেক রূপ, একেক পরিচয়। কেউ তাকে ব্যবসায়ী ভাবে, কেউ কূটনীতিক, আবার কেউ বলে সে এক ছায়া, যাকে ধরা যায় না। তার পরিচালিত একটি আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক আছে, নাম
“জাইফেরা গ্লোবাল সিন্ডিকেট”
বাইরে থেকে এটা একটা লিগ্যাল, কনসালটেন্সি আর ট্রেডিং কোম্পানি। কিন্তু আন্ডারগ্রাউন্ডে তারা ইনফরমেশন ট্রাফিকিং, আইডেন্টিটি ম্যানিপুলেশন আর হাই-লেভেল ডিলিংয়ের সাথে জড়িত”
এইবার আরজে ধীরে মাথা তোলে। তার চোখদুটি সরাসরি কাইলিনের দিকে স্থির হয় তীক্ষ্ণ, ভেদ করা দৃষ্টি। কাইলিন সেই দৃষ্টি বুঝে নিয়ে ধীরে বলে,
-“আমাদের সোর্স অনুযায়ী… সে এখন চায়নাতে আছে, কোনো গ্রামে”
গাড়ির ভেতরে নিস্তব্ধতা এতটাই ঘন হয়ে ওঠে, যেন শ্বাস নিলেও শব্দ হবে। তারপর আরজের ঠোঁট নড়ে ওঠে। খুব ধীরে, প্রায় ফিসফিস করে,

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ১

-“চায়না…”
জ্যাক ফ্রন্ট মিররে তারদিকে তাকিয়ে বলে,
-“বস, আমি ইন্ডিয়াতে একবার…..”
তাকে থামিয়ে আরজে মাথাটা সিটে এলিয়ে দিয়ে আওড়ায়,
-“যেতে পারো, আর কাই ঐ এজেন্টের ইগ্‌জ্যাক্ট লোকেশন আমার চাই”

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৩