হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ২০
সাবা খান
এই বিভীষিকায় বিষাক্ত রাতটা যেন শেষই হতে চাইছে না। সময় থেমে গেছে কোথাও, ঘড়ির কাঁটা চলছে, কিন্তু মুহূর্তগুলো এগোচ্ছে না। এই রাত যেন প্রতিযোগিতায় নেমেছে, কার জীবন থেকে কতটা ছিনিয়ে নিতে পারে। কারো কাছ থেকে হাসি, কারো কাছ থেকে শান্তি, কারো কাছ থেকে প্রিয় মানুষ। আর সেই দীর্ঘ, বিভীষিকাময় রাতের মধ্যেই হসপিটালের করিডোরে কেটে গেছে টানা দশ ঘণ্টা। দশ ঘণ্টা কিন্তু এসপির কাছে মনে হচ্ছে যেন দশ বছর। সানিতার এখনো জ্ঞান ফিরেনি। তার মা এই ধাক্কা সামলাতে না পেরে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তাকেও অন্য ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়েছে। খুশদিল ফারুকী পত্নীসেবায় লেগে আছেন। সারহাদ কিছুক্ষণ আগেই মহলে গেছে একটু ফ্রেশ হয়ে আবার আসবে। সবাই ক্লান্ত, চোখ লাল হয়ে আছে কিন্তু কারো চোখে ঘুম নেই।
সানিতার কেবিনের ভেতরে এসপি পায়চারি করছে। তার কোলে ছোট্ট মেয়েটা কখনো কাঁদছে, কখনো থেমে যাচ্ছে, আবার কাঁদছে। সে ধীরে ধীরে তাকে দোলাচ্ছে সাথে নরম স্বরে বলে,
–“হুশ… পাপার অ্যাঞ্জেল… প্লিজ কাঁদো না
তোমার মম আসবে, একটু অপেক্ষা করো”
কিন্তু তার এমন স্নেহময় বাক্যতে বাচ্চাটা থামছে না। একটু রাখলেই কেঁদে উঠছে। এসপি আবার তাকে কোলে তুলে নিয়ে ধীরে ধীরে হাঁটতে থাকে রুমের ভেতর। তার চোখ বারবার গিয়ে পড়ছে সানিতার দিকে নিঃশব্দে শুয়ে আছে সে। হঠাৎ তার দৃষ্টি আটকে যায় সানিতার হাতে যেটা হালকা করে নড়ে ওঠেছে। মুহূর্তে এসপি থমকে যায়। সে দ্রুত এগিয়ে আসে বাচ্চাটাকে বুকে জড়িয়ে,
–“সানি..”
সানিতার আঙুলগুলো আবার নড়েচড়ে ওঠে। এবার এসপি পুরোপুরি নিশ্চিত। সে বিচলিত কণ্ঠে শুধায়,
–“সানি… শুনতে পাচ্ছিস?”
রমণীর আঁখিপল্লব ধীরে ধীরে কাঁপতে কাঁপতে খুলে যায়। প্রথমেই ঝাপসা দৃষ্টিতে চারপাশটা পর্যবেক্ষণ করে বুঝার চেষ্টা করে নিজের অবস্থান। তার শ্বাস এখনো ভারী। এতক্ষণ অক্সিজেন মাস্ক পরা ছিল। কিয়ৎকাল আগেই তা খুলে দেওয়া হয়েছে। রমণী একটু কষ্ট করে ঠোঁট নাড়িয়ে বলে,
–“আমার… বাচ্চা…”
তার ফিসফিস করে বলা বাক্যটুকু আর কেউ শুনলো কিনা সন্দেহ? তার দৃষ্টি ঘুরতে ঘুরতে এসপির উপর এসে থামে। বিপরীতে মানব একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। এসপির চোখের কোণটা ভিজে ওঠেছে। সে কিছু না বলে ধীরে ধীরে বাচ্চাটাকে তার দিকে এগিয়ে দেয়। বাচ্চা টাকে দেখেই সানিতার চোখে পানি জমে ওঠে। সে কাঁপা কাঁপা হাতে বাচ্চাটাকে নিজের দিকে টেনে নেয়। স্যালাইনের কারণে হাত নাড়াতে কষ্ট হচ্ছে…
তবুও সে হালকা করে তাকে জড়িয়ে ধরে। মুহূর্তে মাতৃত্বের টানে এতক্ষণ ধরে কাঁদতে থাকা ছোট্ট বাচ্চাটা মায়ের বুকে আসতেই একেবারে শান্ত হয়ে যায়। তার কান্না থেমে যায়। শুধু নরম করে শ্বাস নিচ্ছে। মায়ের গন্ধ পেয়ে চুপ করে যায় সে। সানিতার চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। সে ফিসফিস করে,
–“আমার… বেবি”
এসপি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। সে এগিয়ে এসে বিছানার পাশে বসে রমণীর মাথার কাছে ঝুঁকে পড়ে। সানিতা তখনও আধখোলা চোখে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার বুকের উপর শুয়ে থাকা ছোট্ট মেয়েটার দিকে। তার ঠোঁটে ক্লান্ত একটা হাসি ফুটে ওঠে, চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু চিকচিক করছে। এসপি এক হাত দিয়ে সানিতার হাতটা ধরে। আরেক হাত আলতো করে মেয়েটার মাথায় বুলায়। কিছুক্ষণ কেউ কিছু বলে না। কক্ষে শোনা যায় শুধু নিঃশ্বাসের শব্দ। হঠাৎ এসপির চোখ থেকে নিঃশব্দে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। সে রমণীর হাতে একটা চুমু খেয়ে ফিসফিস করে বলে,
–“সানি, তুই এতটা স্বার্থপর কীভাবে হতে পারলি? ”
সানিতা নিষ্প্রাণ চোখে তার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে। এসপি ফের বলে,
–“তুই… তুই কিভাবে ভাবলি?
কিভাবে আমাকে আর আমাদের মেয়েকে নিঃস্ব করে চলে যাওয়ার কথা ভাবলি, বল?”
শব্দ গুলো যেন বহু কসরতে তার ভিতর থেকে বেরুচ্ছে। তার আঙুলগুলো শক্ত হয়ে যায় সানিতার হাতের উপর। এসপি মাথা নিচু করে বলে,
–“আমি… আমি তোকে ছাড়া সত্যি পারবো না। এক মুহূর্তের জন্যও না”
এসপির এমন স্বীকারোক্তিতে বিপরীতে রমণীর দুচোখ অশ্রুতে ঝাপসা হয়ে আসে। রমণী কষ্ট করে হাতটা একটু তুলে এসপির গালে ছোঁয়ার। কাঁপা কাঁপা স্বরে আওড়ায়,
–“আমি কোথায় যেতাম বলো?
তোমাদের ছেড়ে আমি আর কোথায় যেতাম?
তোমরা যে আমার সব”
রমণীর চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। সে একটু থেমে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে বলে,
–“আমার পৃথিবী জুড়ে শুধু তোমরা দুজন”
এসপি কিছুটা অভিমানী সুরে আওড়ায়,
–“তাহলে কেন এমন করলি?
আমি বাইরে দাঁড়িয়ে প্রতিটা সেকেন্ডে মরে যাচ্ছিলাম। আমি ভেবেছিলাম, হয়তো এক্ষুনি দরজা খুলবে আর কেউ এসে বলবে…
দেখো ফারাদ ভাই আমি মা হয়ে গেছি আর তুমি বাবা”
সানিতা স্পষ্ট বুঝতে পারছে তার প্রেমিক পুরুষের অভিমান জমে আছে তার উপর। সে ঠোঁটে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে বাচ্চাটাকে আরও কাছে টেনে নিয়ে এসপির দিকে তাকায়,
–“এখন বলছি তো, ফারাদ ভাই দেখো আমি মা হয়ে গেছি। আচ্ছা এখন তাহলে আমাদের অনেক কাজ তাইনা? আমাদের ছোট্ট রাজকন্যা টাকে একসাথে বড় করব আমরা। ওর প্রথম হাঁটা, প্রথম কথা বলা, সব দেখতে হবে…”
রমণী নিজের মতো করে আরও এটা সেটা বলছে আর এসপি এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। কিন্তু রমণীর মুখ থেকে নিঃসৃত হওয়া একটা বাক্যে এসপি চমকে উঠে,
–“জানো, আমি যখন ভিতরে ছিলাম। আমি শুধু তোমার কণ্ঠ শুনছিলাম। তুমি যেভাবে ওর সাথে কথা বলতে। মনে হচ্ছিল, আমি হারিয়ে গেলে তুমি ওকে সামলে নেবে”
এক মুহূর্ত বিলম্ব না করে সাথে সাথে এসপি মাথা নাড়িয়ে শক্ত কণ্ঠে বলে,
–“না, না আমি কাউকে সামলাতে পারতাম না। তুই না থাকলে… কিছুই করতে পারব না”
সে সামনে ঝুঁকে সানিতার কপালে ঠোঁট ছোঁয়ায়,
–“নেক্সট টাইম এমন কথা বলার আগেই আমার হাতে থাপ্পড় খাবি তুই সানি”
বিপরীতে রমণী হেসে দিল। রুমটা আবার নিঃশব্দ হয়ে যায়। সানিতা মেয়েটাকে বুকে জড়িয়ে ধরে একটু শক্ত করে। এসপি তাদের দুজনকে আলতো করে জড়িয়ে রাখে।
সময় সময়ের মতো করে গড়িয়ে যাচ্ছে, তাকে আটকানোর সাধ্য যে কারো নেই। দুই দিন, পুরো দুইটা দিন কেটে গেছে কিন্তু সময় যেন কারো জন্যই এগোয়নি। প্রতিটা মুহূর্ত কাটছে এখন দমবন্ধ করা অপেক্ষায় আর প্রতিটা সেকেন্ড একটা আতঙ্ক। পুরো শহরটা যেন তছনছ হয়ে গেছে। আরজে এমন কোনো জায়গা রাখেনি যেখানে খোঁজ করেনি। রাস্তা, গলি, পরিত্যক্ত বিল্ডিং, গোডাউন, আন্ডারগ্রাউন্ড নেটওয়ার্ক, এমনকি শহরের বাইরে পর্যন্ত সব জায়গা তন্নতন্ন করে খুঁজে ফেলা হয়েছে। তার চোখ লাল রক্তাক্ত হয়ে আছে। সে সানার কথা মতো সোফিয়া জাওয়ানের কাছেও গিয়েছিল কিন্তু তার কথাতেই আরজে বুঝতে পারে আরভি তার কাছে নেই।
এদিকে সানাও থেমে নেই। সে মিসেস দিলরুবা খানমের সাথে মিলে সব তথ্য, সব সোর্স ব্যবহার করছে। সানার সন্দেহের প্রথম কাতারেই ছিল সোফিয়া জাওয়ান। কিন্তু দিলরুবা খানমের কথায় সে থেমে যায়। তিনি তাকে বলে
”সোফিয়া জাওয়ান এত কাঁচা কাজ কখনো করবে না। আর আমরা ওর প্রতিটা মুভমেন্টের উপর নজর রাখছি। সে এই কাজ করলে আমরা জানতাম”
তারপর থেকে দুজনে খুঁজা শুরু করে দিয়েছে অন্যান্য জায়গায়।
এদিকে সারহাদও নিজের সব গোপন সোর্স নামিয়ে দিয়েছে। তার নেটওয়ার্ক শহরের প্রতিটা কোণায় ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু কোথাও খুঁজ মিলছে না। আর এসপি, সে তো হসপিটাল আর বাড়ির মাঝেই দৌড়াদৌড়ি করছে। সে বাইক নিয়ে পাগলের মতো ছুটছে এক লোকেশন থেকে আরেক লোকেশনে। তার চোখে ঘুম নেই, শুধু খোঁজ, শুধু দৌড় কিন্তু কোথাও কিছু নেই, একটা ট্রেসও না, একটা ক্লু না।
অন্যদিকে আরজের কাছে সেই প্রথম দিনের প্রাইভেট নাম্বার থেকে কল আসছে বারবার। প্রতিবার তাকে নতুন নতুন লোকেশন পাঠায়। প্রথম দিন সে পাগলের মতো ছুটেছে। একটার পর একটা লোকেশনে গিয়ে দেখেছে, কিন্তু কিছুই মিলেনি সব খালি, শূন্য। যেন একটা ঠাট্টা। এখন সে থেমে গেছে সাথে এটাও বুঝতে পারছে কেউ তাকে খেলাচ্ছে ইচ্ছা করে। সে গোপনে ইনভেস্টিগেশন শুরু করে দিয়েছে। কিন্তু এই প্রাইভেট নাম্বারটা ট্র্যাক করা সহজ না। কারণ এই নাম্বারগুলো সাধারণ না। এগুলো মধ্যে মাল্টি লেয়ার মাস্কিং সিস্টেম ব্যবহার করা হয়। যেখানে কলগুলো বিভিন্ন দেশের সার্ভার ঘুরে আসে। ভিওআইপি ব্যবহার করে ফেক আইডেন্টিটি তৈরি করা হয়। আইপি অ্যাড্রেস বারবার পরিবর্তন হয় যার কারণে রিয়েল লোকেশন ট্রেস করা প্রায় অসম্ভব হয়ে যায়। একটা লোকেশন ধরতে গেলেই সিগন্যাল আরেক জায়গায় শিফট হয়ে যায়। পুরো আটচল্লিশ ঘণ্টা পর কাইলিন অবশেষে তিনটা লোকেশন বের করে। রুমের ভেতর বড় ডিজিটাল স্ক্রিনে সেই ম্যাপ গুলোর সামনেই দাঁড়িয়ে আছে ‘জেবি কিং’। কাইলিন তার পাশে দাঁড়িয়ে বলে,
–“বস, আমি তিনটা লোকেশন পেয়েছি। প্রথম লোকেশন, ঢাকার বাইরে একটা পরিত্যক্ত ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন। দ্বিতীয় লোকেশন, চট্টগ্রামের একটা পুরনো ডকইয়ার্ড। আর লাস্ট লোকেশন..”
সে স্ক্রিনে জুম করে বলে,
–“বঙ্গোপসাগরের মধ্যে, একটা বিলাসবহুল জাহাজ “ড্যাসেল”। জাহাজ টা প্রায় ভারতের বর্ডারের কাছাকাছি”
তার বলার পর রুমে নীরবতা নেমে আসে।আরজে হাত মুষ্টি বদ্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে স্ক্রিনের সামনে। তার দৃষ্টি স্থির সামনে। সে একটার পর একটা লোকেশন স্ক্যান করছে। তার আঙুল ম্যাপের উপর ধীরে ধীরে ঘুরছে হঠাৎ তার আঙুল এক জায়গায় স্থির হয়। রুক্ষ স্বরে হিসহিসায়,
–“হি ইজ রাইট দেয়ার”
কাইলিন পিছন থেকে অবাক হয়ে বলে,
–“কে বস… থমাস?”
–“নো, মাই সান”
রুমের বাতাস যেন ভারী হয়ে আসে। সবাই একসাথে আরজের ইশারা করা লোকেশনে তাকিয়ে আছে। পরমুহূর্তেই আরজে ঘুরে দরজার দিকে যেতে যেতে বজ্র কণ্ঠে আদেশ ছুঁড়ে,
–“অল ফোর্স রেডি করো…অল গার্ড, অল ইউনিট, অল উইপন এভরিথিং। দিস ইজ দ্য এন্ড গেম”
বাক্যখানা উগড়ে দেওয়ার সাথে সাথে আরজের চোখে ফুটে ওঠে শুধু রাগ না একটা বাবার উন্মাদনা। তারপর কালবিলম্ব না করে ঝড়ের মতো বেরিয়ে যায়। কাইলিন এক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থাকে তারপর দ্রুত কমিউনিকেশন ডিভাইস অন করে আদেশ ছুঁড়ে,
–“অল ইউনিটস, কোড রেড, মুভ আউট”
এই বলে সেও আরজের পিছনে চলে যায়। স্ক্রিনে এখনো জ্বলছে সেই লোকেশন, বঙ্গোপসাগরের উপর ভাসতে থাকা
“ড্যাসেল জাহাজ”
বঙ্গোপসাগরের বুক চিরে দাঁড়িয়ে আছে দানবের মতো একটা বিলাসবহুল জাহাজ, “ড্যাসেল”
যেটা দূর থেকে দেখলেই বোঝা যায়, এটা সাধারণ কোনো জাহাজ না। কালো গাঢ় রঙের মাল্টি লেভেল ডেক, চারপাশে সশস্ত্র গার্ড পাহারত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। উপরে কাঁচের কেবিনগুলোতে হালকা আলো জ্বলছে।
ঠিক তখনই দূরের বাতাস চিরে নেমে আসছে একটা কালো হেলিকপ্টার। ভেতরে বসে আছে আরজে। তার চোখ স্থির জাহাজ টার দিকে। ঠোঁট শক্তভাবে চেপে আছে, চোয়াল এতটাই টাইট যেন ভেঙে যাবে। দৃষ্টি দেখলেই বুঝা যায় চোখের ভেতর কেমন আগুন জ্বলছে। হেলিকপ্টার টা জাহাজ থেকে কিছু দূরে থামে। এক সেকেন্ডও দেরি না করে আরজে নেমে পড়ে। নিচে অপেক্ষা করছে তার জন্য স্পিডবোট। সে এক ঝটকায় স্টিয়ারিং ধরে ইঞ্জিন স্টার্ট করে। আরজের পিছনেই পর পর এসে থামে আরও কয়েক টা হেলিকপ্টার যেগুলো থেকে তার গার্ডরা নেমে আসে।
সমুদ্রের বুক চিরে আরজের স্পিডবোট ছুটছে পাগলা ঘোড়ার ন্যায়। ঢেউগুলো একের পর এক আছড়ে পড়ছে বোটে কিন্তু তার গতি থামছে না। তার সিল্কি চুলগুলো বাতাসে উড়ে কপালের উপর এসে পড়ছে বারবার। কিন্তু মানবের সেদিকে কোন ভ্রূক্ষেপ নেই। কালো শার্টের গোটানো হাতার ভেতর থেকে দৃশ্যমান শিরাগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। হাতের গ্রিপ এতটা শক্ত যেন স্টিয়ারিংটাই ভেঙে ফেলবে। আরজে দৃষ্টি সামনে রেখে দন্ত চেপে হিসহিসিয়ে আওড়ায়,
–“আজ দেখাবো, একজন বাবা কতটা ভয়ংকর হতে পারে”
এদিকে চারদিক থেকে অন্ধকার ভেঙে উঠে আসছে ছায়ার মতো একটা না, দুইটা না ডজনের পর ডজন কালো স্পিডবোট। সবগুলো একই গতিতে ছুটছে। সবগুলো একই টার্গেট ওই জাহাজ ‘ড্যাসেল’। কিছুক্ষণের মধ্যেই জাহাজটাকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে তারা। উপরে থেকে দেখলে মনে হবে সমুদ্রের উপর কালো ছায়ার মতো একটা বৃত্ত তৈরি হয়েছে। প্রতিটা বোটে দাঁড়িয়ে আছে আরজের গার্ডরা, হাতে হাই গ্রেড অস্ত্র।
সমুদ্রের বুক জুড়ে ছড়িয়ে থাকা সেই ভয়ংকর নীরবতা হঠাৎ করেই ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। বিলাসবহুল জাহাজটার উপরের ডেক খুলে একটার পর একটা হেলিকপ্টার আকাশে উঠতে শুরু করে। পর পর পাঁচ ছয়টা যুদ্ধ হেলিকপ্টার আকাশে ভেসে ওঠে। প্রতিটা হেলিকপ্টারের দুপাশে বসে আছে দু’জন করে শুটার, হাতে ভয়ংকর আধুনিক হেভি মিনিগান যেটা মিনিটে হাজার খানেক গুলি ছুঁড়তে পারে। কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর জিনিসটা তাদের মুখ। সবাই একই রকম, একই চোয়াল, একই চোখ, একই ঠোঁট, মাথায় কোন চুল নেই, চোখে কালো সানগ্লাস। যেন একই মানুষকে কপি পেস্ট করা হয়েছে। প্লাস্টিক সার্জারিতে তৈরি একটা নিখুঁত, অনুভূতিহীন, ভয়ংকর মুখ। যেখানে কোনো আবেগ নেই, কোনো ভয় নেই, কোনো দ্বিধা নেই। এক সেকেন্ডও দেরি না করে তারা ট্রি*গার চাপায়। মেশিনগানের শব্দে কেঁপে ওঠে সমুদ্র। উপর থেকে ঝড়ে পড়ে গুলির বর্ষন আরজের গার্ডদের উপর। আরজের গার্ডরা মুহূর্তেই ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। কেউ বোটের আড়ালে লুকানোর চেষ্টা করছে, কেউ গুলি চালাচ্ছে, কেউ সোজা পানিতে পড়ে যাচ্ছে।
চারদিকটা ভরে ওঠে চিৎকার, র*ক্ত, আর বিস্ফোরণের শব্দে। সব মিলিয়ে এক ভয়ংকর বিশৃঙ্খলা। কিন্তু এই বিশৃঙ্খলার মাঝেও এক মানব নির্বিকার চিত্তে দাঁড়িয়ে আছে। সে ধীরে মাথা তুলে আকাশের দিকে তাকায়।চারদিকটা একবার ঠাণ্ডা মাথায় স্ক্যান করে। তার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে একটা বাঁকা হাসি ফুটে ওঠে তারপর কানে থাকা ইয়ারপিসে আদেশ ছুঁড়ে,
–“কাই, প্ল্যান বি”
–“ওকে বস”
পর মুহূর্তেই তার সকল গার্ডরা একসাথে পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। একটার পর একটা কালো ছায়া পানির নিচে মিলিয়ে যায়। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সব স্পিডবোট ফাঁকা। শুধু মাঝখানে একটা বোটে দাঁড়িয়ে আছে আরজে, একা, পুরোপুরি একা। মাথার
উপরে থাকা সবগুলো হেলিকপ্টার ঘুরে তার উপর এসে থামে। সবগুলো বন্দুক একসাথে তার দিকে তাক করা। আরজে ধীরে মাথা তোলে অগ্নি দৃষ্টিতে তাদের দিকে তাকায়। ধীরে ধীরে সে নিজের পকেট থেকে বন্দুক টা বের করে সেটার দিকে এক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকে তারপর পানিতে ফেলে দেয়। মুহূর্তে বন্দুকটা ঢেউয়ের নিচে হারিয়ে যায়। উপরে থাকা শুটাররা একে অপরের দিকে তাকায়। চোখের ইশারায় তারা নিজেদের মধ্যে বাক্যলাপ সেরে কিছু না বলেই হেলিকপ্টারগুলো ধীরে ধীরে ঘুরে যায়। একটার পর একটা আবার জাহাজের ভেতরে ঢুকে পড়ে। চারদিকটা আবার নিস্তব্ধ হয়ে যায়। এই নিস্তব্ধতার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে শুধু সমুদ্র, ঢেউ আর একটা স্পিডবোট। আরজে একা দাঁড়িয়ে আছে। তার ঠোঁটের কোণে আবারও সেই বাঁকা হাসি ফুটে ওঠে। সে স্পিডবোটের স্পিড বাড়িয়ে দেয়, বোট ছুটে যায় জাহাজের দিকে।
সমুদ্রের বুক চিরে ছুটে আসা আরজের স্পিডবোট টা ধীরে ধীরে থামে বিশাল, দানবীয় জাহাজটার পাশে। ইঞ্জিন বন্ধ হতেই চারদিক আবার অস্বাভাবিক নীরবতায় ঢেকে যায়। আরজে এক মুহূর্তও বিলম্ব না করে বোট থেকে পা রাখে জাহাজের মেটালিক ডেকে। চারদিক নিঃশব্দ, কিন্তু সেই নীরবতার মাঝেও লুকিয়ে আছে অদৃশ্য চোখ যারা তার প্রতিটা পদক্ষেপ পরখ করছে। যেটা আরজে নিজেও অনুমান করতে পারছে। হঠাৎ ছায়ার মতো করে চারদিক থেকে বেরিয়ে আসে কয়েকজন। সেই একই প্লাস্টিক সার্জারি করা ব্যক্তি গুলো। তারা কোনো কথা না বলে এগিয়ে এসে ঘিরে ফেলে আরজেকে। একজন সামনে দাঁড়িয়ে একটা কালো কাপড় তোলে আর মুহূর্তের মধ্যেই আরজের চোখ বেঁধে দেওয়া হয় সেটা দিয়ে। কিন্তু এতে বিপরীত পাশের মানব একটুও প্রতিরোধ করল না আর না চেষ্টা। তার চোয়াল শক্ত হয়ে আছে, হাত মুষ্টি বদ্ধ। কেননা আরভি এদের কাছেই আছে। তার একটা পদক্ষেপ হিতে বিপরীত হতে পারে। তারা তার হাত সহ বেঁধে ফেলে পিছনে নিয়ে। আরজের কানে ভেসে আসে কারো ঠাণ্ডা কণ্ঠস্বর,
–“চেক”
পরক্ষণেই তারা তার পুরো শরীর তল্লাশি শুরু করে। কাঁধ, কোমর, পকেট, বুট প্রতিটা জায়গা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে। আরজে দাঁত চেপে সব সহ্য করছে। তার বুকের ভেতর আগুন জ্বলছে কিন্তু বহু কসরতে নিজেকে সংবরণ করছে। মনে মনে শুধু একটা কথাই ঘুরছে, “রিশ, তার একমাত্র অংশ”
সামনে থাকা লোকগুলো আবার বলে,
–“ক্লিয়ার এভরিথিং”
তারপর দুইজন তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে হাত ধরে টান দেয়। আরজে তাদের সাথে হাঁটা শুরু করে, চোখে কাপড়ের পট্টি বাঁধা যার কারণে সে কিছুই দেখতে পারছে না। কিন্তু আরজের মাথার ভেতর পুরো পথটা যেন ম্যাপ হয়ে যাচ্ছে। প্রথমে সোজা, তারপর বাঁদিকে একটা টার্ন। মেঝের শব্দ বদলে যায়, মেটাল থেকে নরম কার্পেট। সে গুনতে থাকে প্রতিটা পদক্ষেপ। উপরে উঠলো? না নিচে নামলো? সে বুঝতে পারছে প্রথমে দুই ফ্লোর নিচে নামানো হয়েছে তারপর আবার উপরে একটা গোলকধাঁধা। মানে তারা ইচ্ছা করেই তাকে ঘোরাচ্ছে। যাতে সে এখান থেকে বেরুতে না পারে কোনমতে।
আরও কিয়ৎকাল হাঁটার পর একটা ভারী দরজা খুলে তাকে ভেতরে ঢুকানো হয়। কয়েক সেকেন্ডের নীরবতার মাথায় তার চোখের বাঁধন খুলে ফেলা হয়। হঠাৎ আলো এসে তার চোখে লাগে। আরজে একটু চোখ কুঁচকে সামনে তাকায়। আর পরের মুহূর্তেই সে স্তব্ধ হয়ে যায়। শ্বাস এক মুহূর্তের জন্য থেমে যায় কেননা সামনে মেঝেতে পড়ে আছে জ্যাক আর রওনাক। দুজনের শরীর চিনে নেওয়াটাই কঠিন। পুরো শরীর র*ক্তে ভেজা। জ্যাকের বুক ওঠানামা করছে কষ্টে, মনে হচ্ছে প্রতিটা শ্বাস যেন বুক ছিঁড়ে বেরিয়ে আসছে। তার ঠোঁট ফেটে গেছে, চোখের নিচে জমে থাকা কালচে দাগ। মুখের কোণ দিয়ে শুকনো রক্ত জমে আছে।
তার থেকে একটু দূরে থাকা রওনাকের অবস্থা আরও ভয়াবহ। তার এক হাত অদ্ভুতভাবে মোচড়ানো, মনে হচ্ছে হাড় ভেঙে গেছে। ঠোঁট ছিঁড়ে গেছে, শ্বাস নিতে গেলেই গলা দিয়ে কাঁপা কাঁপা শব্দ বের হচ্ছে। দুজনেই বেঁচে আছে কিন্তু মৃত্যুর একদম কাছাকাছি দাঁড়িয়ে। নিভু নিভু চোখে তারা তাকিয়ে আছে আরজের দিকে। জ্যাক ঠোঁট নাড়িয়ে ফিসফিস করে,
–“বস”
রওনাক কষ্টে মাথা নাড়ায়, কেননা তার কথা বলার শক্তিটুকুও নেই। ঘরের ভেতর কয়েক সেকেন্ডের নীরবতা নেমে আসে। আরজে একদম স্থির দাঁড়িয়ে থাকে। তার যেই বাদামী চোখজোড়ায় এতক্ষণ বিস্ময় ছিল সেখানে এখন ঠান্ডা একটা আগুন জ্বলে উঠে। সে স্পষ্ট বুঝতে পারছে, এটা ফাঁদ। তারপর ধীরে ধীরে ঠোঁটের কোণ বেঁকে একটা শীতল হাসি বের হয়ে আসে।
পরের মুহূর্তেই এক টানে তার পেছনে বাঁধা দড়িটা এক ঝটকায় ছিঁড়ে ফেলে। এতক্ষণ ধরে হাঁটতে হাঁটতে সে এটাকে ঢিলে করে নিয়েছে। মার্কানের গার্ডরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই সবকিছু ঘটে যায় কয়েক সেকেন্ডে।
আরজে হাত ঘুরিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক গার্ডের কোমর থেকে পিস্তলটা এক নিমিষে কেড়ে নিয়ে সামনের দিকে ট্রি**গার চাপে। পরপর তিনটা গুলি ছুটে যায় তার বন্দুক থেকে। আর গুলি গিয়ে বিধে সামনে থাকা দুই ব্যক্তির একজনের বুকে। একটা চাপা গোঙানি শোনা যায় চারদিকে। আর সেই শব্দ আবার মিলিয়ে যায় রক্তমাখা নীরবতার মধ্যে। আরজে ধোঁয়া উঠা বন্দুকটা মুখের কাছে নিয়ে ফু দিয়ে নামায়। তারপর মাথা একটু কাত করে মেঝেতে পড়ে থাকা দুজনের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে সেই পরিচিত নিষ্ঠুর হাসি। গম্ভীর স্বরে বাক্য ছুঁড়ে সে,
–“এক ফাঁদে পাখি নিজেও দ্বিতীয়বার পড়ে না, আর ব্ল্যাক হান্টার তো অনেক দূরের ব্যাপার”
ধীরে ধীরে আরজের ঠোঁটের হাসিটা চওড়া হয়ে যায়, সে মাথা ঝুঁকিয়ে হিসহিসিয়ে আওড়ায়,
–“খেলা তুই শুরু করেছিস কিন্তু শেষ টা সবসময় আমারই লেখা থাকে। তুই সেমিফাইনাল জিতেছিস কিন্তু আমি ফাইনাল”
সে আবার সোজা হয়ে দাঁড়ায়। চোখে মুখে ফুটে ওঠেছে তীব্র হিং*স্রতার ঝিলিক। চোখ দুটো ভয়ংকর অন্ধকারে ডুবে যায়,
হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ১৯
–“ভুল জায়গায় ভুল শিকার বেছেছিস। হয়তো ভুলে গেছিস, আমি শিকার না। আমি সেই জানোয়ার যে ফাঁদ ভেঙে শিকারকেই গ্রাস করে।
মাই ডিয়ার স্টেপ ব্রাদার”
হঠাৎ সামনে থাকা থমাস এক ঝটকায় উঠে দাঁড়িয়ে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে। তাচ্ছিল্যের স্বরে বলে,
–“স্টেপ ব্রাদার….”
