Home হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ২৬ (৪)

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ২৬ (৪)

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ২৬ (৪)
সাবা খান

অন্ধকার সবসময় একদিনে জন্ম নেয় না ধীরে ধীরে, স্তরে স্তরে, ক্ষত থেকে, অপমান থেকে, প্রতিশোধের আগুন থেকে জন্ম নেয়। সেই রাতের পর সোফিয়া আর আগের সেই ভাঙা, ভালোবাসা খোঁজা মেয়েটা রইলো না। সে পাকিস্তানের আকাশে আবারও ফিরে আসে সে লাহোরের বুক চিরে দাঁড়িয়ে থাকা দূরানী হাউসে।
সেখান থেকেই যাত্রা শুরু হয়, সোফিয়া জাওয়ানের। সে সরাসরি যায় তার বাবার পুরনো স্টাডি রুমে। লরেন্সের মৃত্যুর পর শুধু তার বডিটাকে সরানো হয়েছে। নাহয় সব আগের মতোই আছে, লরেন্সের গবেষণার অবশিষ্ট, ফাইল, ডকুমেন্ট, সিক্রেট সার্ভার। সোফিয়া এক এক করে সব খুলে দেখে নজরে আসে, ম্যানবিস্ট ড্রাগসের সম্পূর্ণ ফর্মুলা, টেস্ট সাবজেক্টদের ডাটা, কালোবাজারে বিক্রির নেটওয়ার্ক, এমনকি একটা ডার্ক ওয়েব প্ল্যাটফর্মের ওয়েব সাইট। যেই ওয়েব সাইটের মাধ্যমে লরেন্স ইউরোপে এখনো নিজের প্রভাব টিকিয়ে রেখেছে। তার ঠোঁটে ধীরে ধীরে হাসি ফুটে ওঠে।

পরবর্তী কয়েক সপ্তায় পুরো সিস্টেমটাকে নিজের হাতে নিয়ে নেয় সোফিয়া। লরেন্সের পুরনো লোকদের ডেকে পাঠায়। যারা তার আনুগত্য স্বীকার করে তাদের রেখে দেয়। যারা দ্বিমত পোষণ করে তাদের সরিয়ে পেলে। সে ম্যানবিস্ট ড্রাগসকে শুধু চালুই করে না, এটাকে আরো উন্নত করে। এটার জন্য নতুন ল্যাব তৈরি করে, নতুন ভাবে এক্সপেরিমেন্ট শুরু হয়। মানুষের মস্তিষ্ক, অনুভূতি, ভয় সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করার নতুন ফর্মুলা বানায় সে। ডার্ক ওয়েবের সাইটে সে আরও নতুন নতিন নেটওয়ার্ক চালু করে। যেখানে মানব কেনা বেচা থেকে শুরু করে সকল রকম অপকর্ম শুরু হয়।

আর সেই নেটওয়ার্ক প্ল্যাটফর্মের অদৃশ্য রাণী হলো, “সোফিয়া জাওয়ান”। তার নাম ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে আন্ডারওয়ার্ল্ডে,’দ্য কুইন অব পেইন”। যে মানুষের চিৎকারে শান্তি খুঁজে পায়।
এদিকে ফিরোজ জাওয়ান এসবের কিছুই জানে না। সে এখনো বাবার ব্যবসা, ও বাবার দায়িত্ব নিয়ে ব্যস্ত। সে কদিন পর বিডিতে এসে তৃণাকে নিয়ে লন্ডনে চলে যায়। তার চোখে তৃণার জন্য এতটাই সম্মান আর এতটাই ভালোবাসা ছিল যে তৃণা কে সবসময় ‘আপনি” করে ডাকতো। সে কোনোদিন অন্য নারীর দিকে ফিরে তাকায়নি। তার কাছে তৃণা মানে ছিল তার সমস্ত পৃথিবী। তৃণা কে সে চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করে গেছে।
আর বিপরীতে তৃণা? সে প্রতিনিয়ত তার সাথে অভিনয় করে গেছে ভালোবাসার। লন্ডনে যাওয়ার আগে ফিরোজ ইকাবালের কাছে অনুরোধ করে, যেন এবার অন্তত বাবার ব্যবসায় হাত দেয়। সে একা চারদিক টা সামলাতে পারছে না। ইকবাল দ্বিমত না করে রাজি হয়ে যায়। তারপর ইকবাল চলে যায় আমেরিকা। তার সাথে তার বন্ধুরাও যায়। যেহেতু ইকবাল তীক্ষ্ণ বুদ্ধি সম্পন্ন ছিল তাই অল্প কদিনেই ব্যবসার নতুন ডিল, নতুন পার্টনার সবকিছুই জমে উঠছিল।
এক রাতে তারা নিজেদের সাকসেস উৎযাপনের জন্য যায় নিউ ইয়র্কের বিখ্যাত এক বারে,

“ভেলভেট সিন লঞ্জে”
চারদিকে নিয়ন আলো, মদ আর নারীতে ভরা এক অন্ধকার জগৎ। যদিও আলভী সেখানে প্রথমে যেতে চায়নি কিন্তু বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে শেষ পর্যন্ত যায়। সেই বারের ভেতর সবচেয়ে নজরকাড়া ছিল হলো স্টেজে দাঁড়িয়ে থাকা এক রমণী, অপূর্ব সুন্দরী, ধূসর বর্ণের চোখ জোড়া, মাথা ভর্তি সোনালি চুল আর ঠোঁটে লেগে আছে মায়াবী হাসি। তার নাম, এভেলিন গ্রেস কার্টার। ইনিই হলেন জ্যাকের মা, একজন বারগার্ল।
ইকবাল আর তার বন্ধুদের কুদৃষ্টি শুরুতেই পড়ে তার উপর। সেই রাতে তারা সবাই ড্রাঙ্ক হয়ে এভেলিন কে রে*প করে। তার কান্না, তার অনুনয় কিছুই থামাতে পারেনি তাদের। সেই রাত একটা নারীর জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার রাত হয়ে থাকে।

পরদিন আবার সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যায়। ইকবাল আর তার বন্ধুরা ফিরে আসে, তাদের মধ্যে না ছিল অনুশোচনা আর না অপরাধবোধ। কিন্তু আলভী তাদের মতো ছিল না। তার চোখে সেই রাতের দৃশ্য ঘুরতে থাকে বারবার। অনুশোচনা তার ভিতর টা যেন কুঁড়ে খাচ্ছে। সে কোনদিনও ডিঙ্ক করেনি। জীবনে প্রথমবার ড্রাঙ্ক হওয়ার পর তার মনেই নেই সে কি করেছে। সে নিজেকে ক্ষমা করতে পারে না। তবে তার অনুশোচনা দেখে বাকিরা তার মজাই উড়িয়েছে। আলভী এভেরিন কে হসপিটালে ভর্তি করিয়ে দেশে ফিরেই বিয়ে করে তার প্রেমিকা সাইয়েদা রহমানকে। যে তার সাথে মেডিকেলে পড়ত।
দেশে ফিরে ইকবাল প্রথমে ভেবেছিল, সে এসে দেখবে সোফিয়া ভেঙে পড়বে, হয়তো কান্নায় ভেঙে যাবে, ভিক্ষা করবে, আঁকড়ে ধরবে তাকে। কিন্তু নাহ, সোফিয়া তার ভাবনার বিপরীত কিছু করছে। আবারও সোফিয়ার বিষয় টা তাকে ভাবিয়ে তুলে। তার কৌতূহল আরও একধাপ বেড়ে যায়। মস্তিষ্কে অদ্ভুত প্রশ্ননা উঁকি দেয়,

-“একজন মানুষ কতদূর ভাঙলে ভাঙে?”
-“একটা মন কোথায় গিয়ে শেষ হয়?”
-“যদি তাকে আরেকটু ঠেলে দিই, সে কি মানুষ থাকবে, নাকি কিছু অন্যকিছু হয়ে উঠবে?”
তার সাইকিয়াট্রিস্ট মাইন্ডে এই প্রশ্ন গুলোর উত্তর ছিল অজানা। আর সোফিয়া তার কাছে ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে এক ‘কেস স্টাডির’ মতো বা একটা জীবন্ত পরীক্ষা।
তারপর থেকে ইকবাল নতুন নতুন মেয়ে দের নিয়ে আসে সেই বাড়িতে। তাদের সাথে হাসি, মদ, সুর সবকিছু যেন ইচ্ছাকৃতভাবে সোফিয়ার সামনে সাজানো হচ্ছে। ইকবাল কখনো ইচ্ছা করে দরজা খোলা রাখে, কখনো ইচ্ছে করেই সোফিয়ার চোখের সামনে দিয়ে চলে যায়। সোফিয়া প্রথম দিকে চুপ করে থাকে। কিন্তু যতবার সে ইকবালের সাথে অন্য কাউকে দেখে ততবার যেন তার সাইকো মস্তিষ্কে আগুন জ্বলে উঠতো। তার মনের প্রতিহিংসার আগুন দাউ দাউ করে জ্বলতো। প্রথম দিকে এসব রাগ নিজেকে আঘাত করেই মিটাতো তারপরও ইকবাল তার সাথেই থাক।
কিন্তু একদিন তার ভেতরের জমে থাকা আগুন টা হঠাৎ বিস্ফোরিত হয়। সে আর সহ্য করতে না পেরে ঐ মেয়েটাকে নৃশংস ভাবে খুন করে ফেলে। তারপর রোজ একইরকম কাহিনি হতে থাকে। ইকবাল নিজের সাথে নিয়ে আসা প্রতিটা মেয়ে ম্যানশনে প্রবেশ করতো কিন্তু আর বের হতো না।
ইকবাল বিষয়টা জেনেও সে ওই মেয়ে গুলোকে নিয়ে আসতো। আর রোজ দূর থেকে দেখতো, সোফিয়া কিভাবে খুন করছে। সোফিয়া কে আবার ভেঙে পড়তে দেখে তার ঠোটর কোণে বাঁকা হাসি ফুটে ওঠে। সোফিয়া রোজ মেয়ে গুলোকে খুন করত আর পাগলের মতো চিৎকার করে বলতো,

–“আমার ইকবালের কাছাকাছি যাওয়ার প্রতিটা মেয়েকে এভাবেই রক্ত ঝরাতে হবে। সবাইকে মে*রে ফেলবো আমি। কাউকে বাঁচতে দিব না। আমি জানি ইকবাল তুমি এগুলো ইচ্ছে করে করছ। তারপরও আমার থেকে তোমার মুক্তি নেই। ইকবাল শুধু আমার, আর কারো না। শুধু আমার”
সে ঐ মেয়ে গুলোকে ছুরি দিয়ে ততক্ষণ আঘাত করতে থাকে যতক্ষণ না সে ক্ষতবিক্ষত করে ফেলতে পারে। ইকবাল কোনদিন সরাসরি দেখতে, কোনদিন অফিসে বসে সিসিটিভি ফুটেজে দেখতো। সে সোফিয়াকে এমন অবস্থায় দেখে কেমন এক ধরনের বিকৃত সন্তুষ্টি অনুভব করত, একটা পৈশাচিক শান্তি তার মধ্যে কাজ করত। তার ঠোঁটের কোনে ফুটে ওঠতো এটা তৃপ্তির হাসি।
আর এদিকে রক্ত, প্রতিশোধ, ভালোবাসা আর মালিকানার এক ভয়ংকর মিশ্রণে সোফিয়া ধীরে ধীরে নিজেকে হারিয়ে ফেলে।

একদিন সোফিয়া জানতে পারে তার শরীরের ভেতরে আরেকটা প্রাণ বেড়ে উঠছে। একটা স্পন্দন, একটা অস্তিত্ব যা তার নিজের। সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল দীর্ঘক্ষণ নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকিয়ে থাকতো যেন নিজেকেই চিনতে পারছে না। চোখে অদ্ভুত এক ঝিলিক ফুটে ওঠে। ধীরে ধীরে তার হাতটা গিয়ে থামে নিজের পেটের উপর। কণ্ঠ থেকে ফিসফিস করে বের হয়,
–“আমি… মা হতে চলেছি…?”
কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে সে এই খবরটা কাউকে জানাল না, এমনকি ইকবাল কেও না। রাতের পর রাত গড়িয়ে যায়, সোফিয়া একা বসে থাকে নিজের কক্ষে। কখনো বিছানায়, কখনো জানালার ধারে। তার হাত বারবার নিজের পেটের উপর চলে যায়। কখনো সে চোখ বন্ধ করে অনুভব করার চেষ্টা করে, এই ছোট্ট প্রাণটা কি সত্যিই তার?
কখনো সে ফিসফিস করে বলে,

–“তুমি… আমাকে চিনবে তো?”
আবার পরক্ষণেই তার মুখ আবার শক্ত হয়ে যায়। মাতৃত্ব তার দরজায় কড়া নাড়ছে ঠিকই কিন্তু তার ভিতরের অন্ধকার সেই দরজাটা কে খুলতে দিচ্ছে না। তার কয়েক মাস পর আরজে পৃথিবীতে এলো। সোফিয়া আরজে কে কোলে নিয়েও যেন সম্পূর্ণ অনুভব করতে পারল না। সে রোজ তাকিয়ে থাকে ঘন্টার পর ঘন্টা। আরজের ছোট্ট হাত, তার নিঃশ্বাস, তার চোখ বন্ধ করে ঘুমিয়ে থাকা সবকিছু খুব মনোযোগ দিয়ে দেখত।
আর অন্য দিকে ইকবাল মাঝে মাঝে আসত আরজে কে দেখতে, তবে সে দরজার কাছেই দাঁড়িয়ে থাকত। তার চোখে না ছিল কোনো অনুভূতি, না আনন্দ, না আগ্রহ। সে কখনো আরজেকে কোলে নেয়নি, কখনো কাছে টেনে নেয়নি। এইভাবে মা বাবার অবহেলার ছায়ায় বড় হতে থাকে আরজে। আর সোফিয়া, সে আবার ডুবে যায় তার ক্ষমতার খেলায়। সে ধীরে ধীরে নিজের বাবার সাম্রাজ্যকে পুনর্গঠন করে। লরেন্সের রেখে যাওয়া ড্রাগস নেটওয়ার্ক, আন্ডারগ্রাউন্ড মার্কেট, ডার্ক ওয়েব সবকিছুর উপর একে একে নিজের দখল বসায়।

এর মাঝেই তৃণাকে নিয়ে ফিরোজ ফিরে আসে। তখন তৃণাও সন্তান সম্ভাবনা ছিল। এই খবরটা শুনতেই সোফিয়ার বুকের ভেতরটা হঠাৎ ঠাণ্ডা হয়ে যায়। কেন জানি তার ভিতর একটা সন্দেহ জেগে ওঠে। সে তৃণার বাচ্চা হওয়ার সাথে সাথে তার ডিএনএ টেস্ট করায়। তিন দিন পর সেই রিপোর্ট আসে তার হাতে। কাগজটা খুলতেই তার দৃষ্টি থেমে যায় “ম্যাচ” লেখা টার উপর। চারপাশ টা কেমন ঝাপসা হয়ে আসে তার কাছে। কণ্ঠ থেকে ফিসফিস করে নিঃসৃত হয়,
–“বাচ্চা টা ইকবালের”

সাথে সাথে তার মাথা ঘুরে ওঠে। সে দেয়ালের সাথে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে নিজেকে সামলে তৃণার কেবিনের লুকিং গ্লাস দিয়ে ভিতরে তাকাতেই তার দৃষ্টি থেমে যায়। নজরে আসে ইকবাল তৃণার বাচ্চা টাকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, তার ঠোঁটে হালকা হাসি। এটা দেখেই সোফিয়ার বুকের ভেতরটা যেন ছিঁড়ে যায়।
ধীরে ধীরে তার ভিতরের সাইকো মস্তিষ্ক টা জেগে ওঠে। সে শুরুতে বাচ্চাটাকে মারার প্ল্যান না করলেও যখন দেখতে পাইয় ইকবাল রোজ এসে বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে আদর করে। এটা দেখে তার মনে প্রতিহিংসার আগুন দাউদাউ করে জ্বলে ওঠে। মনের কোণে উঁকি দিচ্ছে অসংখ্য প্রশ্ন,

-“কই, তারও তো বাচ্চা হয়েছে। ইকবাল কেন তাকে কোলেও তুলেনি?
কেন একবার ফিরে তাকাইনি?
তাহলে তৃণার বাচ্চা কে কেন আদর করবে?
তার ওপর সেদিন তৃণা কে হসপিটালে দেখতে যাওয়ায় তৃণা সোফিয়াকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে বলে, ইকবাল তাকে বিয়ে করবে। তাদের সন্তানের নাম দিবে। সোফিয়া কে ডির্ভোস দিয়ে দিবে। ‘ডিভোর্স’ শব্দটা শুনেই সোফিয়ার যেন আত্মাকেঁপে ওঠে। সে ওই মুহূর্তে তৃনার উপর হামলে পড়ে, তার গলা চেপে ধরে। তৃনার শ্বাস-প্রশ্বাস আটকে আসার জোগাড়।
ওই মুহূর্তে ফিরোজ আর ইকবাল এসে তাদের আটকায়। ঐদিন রাতেই সোফিয়া প্ল্যান করে তৃনার বাচ্চাটাকে মেরে ফেলার। যেহেতু ইকবাল তার চারপাশে সিসিটিভি ফুটেজ লাগিয়ে রেখেছে, তার উপর নজরদারি করছে তাই সে এই সম্পর্কে সব জেনে যায় এবং তৃনার বাচ্চাটাকে সোফিয়া লোকেরা মারার আগেই সে আলভী কে দিয়ে সরিয়ে ফেলে যার ব্যাপারে সোফিয়া কিছুই জানতো না।

এদিকে তৃণার বাচ্চা হারানোর পর থেকে তার চোখে সবসময় আতঙ্ক লেগে থাকত। যখনই সে সোফিয়াকে দেখত তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠত, ভয়ে তার হাত পা কাঁপা শুরু করত। সে সোফিয়ার ভয়ে ফিরোজের সাথে আবারও লন্ডনে চলে যায়।
আর এদিকে সোফিয়ার পরিবর্তনের সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে আরজের উপর। যেই বয়সে আরজের মায়ের কোলে মাথা রাখার কথা ছিল, হাসির শব্দে ঘর ভরানোর কথা ছিল, সেখানে সে বড় হতে থাকে ভয় আর শীতলতার মধ্যে। আরজে কাঁদলে সোফিয়া তাকে ধমকে ঔঠতো,
–“কাঁদা দুর্বলদের কাজ”
–“হাসবে না, হাসি মানুষকে দুর্বল করে”
ধীরে ধীরে, আরজে কাঁদা ভুলে যায়, হাসা ভুলে যায়। তার চোখে বয়সের চেয়ে বেশি অন্ধকার জমে ওঠে। এখানেই থেমে থাকেনি সোফিয়া, যে নিজে সেই অভিশপ্ত ড্রাগসের শিকার হয়েছিল, সে নিজের ছেলের মধ্যেও ঢুকিয়ে দেয় সেই বিষ,

“ম্যানবিস্ট ড্রাগস”
সময় নিজের মতো করে গড়িয়ে যায় সাথে একটা শিশু তার শৈশব হারায়, একটা মা তার মানবিকতা হারায়। আরজে ধীরে ধীরে ড্রাগসের উপর নির্ভরশীল হয়ে ওঠে। এর মাঝেই সোফিয়া আবার প্রেগন্যান্ট হয়। যদিও এবারও সে আরজের মতো কাউকে আশা করছিল কিন্তু এবার তার কোল জুড়ে আসে রিয়ানা।
যেদিন রিয়ানা জন্ম নেয় সেই দিন প্রথমবার, ইকবাল তাকে কোলে নেয়। তার ছোট্ট আঙুল, তার নিঃশ্বাস, তার চোখ বন্ধ করে ঘুমিয়ে থাকা সবকিছু দেখে ইকবালের বুকের ভিতরে ধীরে ধীরে পিতৃত্ববোধ জেগে ওঠে। এই প্রথম তার চোখে সত্যিকারের অনুভূতি দেখা যায়। কিন্তু তার মস্তিষ্ক, তার বিকৃত চিন্তাভাবনা, সেগুলো তাকে পুরোপুরি বদলাতে দেয় না। তবুও সে ধীরে ধীরে তার জীবন বদলাতে শুরু করে। ব্যবসা, অপরাধ, অন্ধকার সবকিছু থেকে দূরে সরে গিয়ে তার বাবার কোম্পানি কে নতুন ভাবে তৈরি করে,
“জেবি কোম্পানি”

সে ধীরে ধীরে সন্তানদের দিকে মনোযোগ দিতে শুরু করে। কিন্তু ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। সোফিয়া তখন আর আগের সেই মানুষ না। যেগুলো সোফিয়া একসময় ইকবালের উপর রাগ করে করতো এখন তা হয়ে গেছে অভ্যাস, যা একসময় ছিল প্রতিশোধ এখন তা হয়ে গেছে নেশা। মানুষের আর্তনাদ গুলো এখন তার কাছে এখন সঙ্গীত হয়ে গেছে। সে ক্ষমতার দিকে আরো ঝুঁকে পড়ে। আরজেও ধীরে ধীরে মায়ের প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। তার চোখে সেই একই শূন্যতা, আচরণে সেই একই নিষ্ঠুরতা।

ইকবাল এবার সত্যিই ভয় পেতে শুরু করে।সে বুঝতে পারে সোফিয়া কে বিয়ে করে নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল করেছে। সে ছেলের জন্য আলভী ও বহু বছর পর সানার বাবার কাছেও যায় কিন্তু তাতে কোনই লাভ হয় না। এর মধ্যেই ফিরোজ আবার ফিরে আসে তৃণাকে নিয়ে সাথে তাদের ছোট মেয়ে নাতাসা। তৃণাকে দেখার সাথে সাথে সোফিয়ার চোখে পুরনো আগুন জ্বলে ওঠে। সেই রাতেই ম্যানশনের ভেতর আবার রক্ত ঝরে।
পরদিন তৃণা আর নেই, সবকিছু দেখার পর ইকবাল আরও ভেঙে পড়ে। সে বুঝতে পারে সোফিয়াকে এবার থামানো দরকার। এরজন্য সে খোঁজ নিতে শুরু করে লরেন্সের অতীত সম্পর্কে, তার বিশ্বাস ছিল, যার হাত ধরে একটা সোফিয়া গড়ে ওঠতে পেরেছে সেই হাতেই এই সোফিয়া শেষ ও হতে পারে। অনেক ঘাটাঘাটির পর ইকবাল জানতে পারে লরেন্সের আরেকটা ছেলে আছে। যে কখনো পাকিস্তানে আসেনি। যে দূরে ব্রাজিলে লরেন্সের ফেলে আসা কিছু বিজনেস নিয়ে আছে, তার নাম মার্কান। ইকবাল সোফিয়া কে থামানোর জন্য তার সাথে ডিলে যায়।

এদিকে সোফিয়া হয়ে ওঠেছে অপ্রতিরোধ্য। দেশের প্রতিটা বড় ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তের পেছনে, প্রতিটা বড় কর্পোরেট বোর্ডরুমে, রাজনীতির টেবিলে, ক্ষমতার চুক্তিতে, বড় বড় টেন্ডারে যেখানে টাকা, ক্ষমতা আর প্রভাব আসে সেখানেই একটাই নাম আসে,
“সোফিয়া জাওয়ান”
ঢাকার আকাশচুম্বী ভবনগুলো থেকে শুরু করে, চট্টগ্রামের বন্দর, সিলেটের রিসোর্স, এমনকি দেশের আন্ডারওয়ার্ল্ডের প্রতিটা লেনদেন, সবকিছুর সুতো এসে মিশে যায় এক জায়গায়, সোফিয়ার কাছে। কিন্তু সে এখানেই থেমে থাকেনি। ভারতের আন্ডারগ্রাউন্ড, দিল্লির রাজনৈতিক লবিং, পাকিস্তানের করাচি পোর্ট সব জায়গায় ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে তার শিকড়। তারপর মধ্যপ্রাচ্যেও একটা অদৃশ্য সাম্রাজ্য তৈরি হতে থাকে। ধীরে ধীরে সে লরেন্সের পথে চলতে শুরু করে।
ঠিক এই সময় একটা উড়ন্ত খবর তার কানে আসে, “ইকবাল তাকে সরিয়ে দিতে চায়”। প্রথমে সোফিয়া বিশ্বাস করতে পারেনি। কিন্তু যথাযথ প্রমাণ থাকায় পরে বিষয় টা সত্যি প্রমাণিত হয়। সোফিয়া তখনও তাকে ঘৃণা করতে পারেনি। সে শুধু চোখ বন্ধ করে একটা দীর্ঘ শ্বাস ছাড়ে। সবকিছুর পরেও, সব বিশ্বাসঘাতকতার পরেও সে এখনও তাকে ভালোবাসে।
সোফিয়া ইকবালের সাথে সাথে মার্কানের ব্যাপারেও জানতে পারে। মার্কান লরেন্সের ছেলে এটা শুনেই তার মাথা আগুন জ্বলে উঠে। সাথে সাথে সে মার্কান কে মারার জন্য উঠে পড়ে লাগে। কেননা সে চায় না লরেন্সের আর কোন বংশধর পৃথিবীতে বেঁচে থাকুক। তবে হ্যাঁ, সে থমাসের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানতো না। কেননা মার্কান তার বাবার শত্রুদের কারণে ছেলের পরিচয় গোপন করে রেখেছে।

এদিকে মার্কান ও তার স্ত্রী মেথেরিও মিলে ব্রাজিলে প্লাস্টিক সার্জারির নামে একটা বিশাল অবৈধ ব্যবসা চালাত। মানুষের চেহারা বদলে দেওয়া, অপরাধীদের পরিচয় মুছে ফেলা এগুলো সবকিছু তার হাতে ছিল।
মার্কান ইকবালের সাথে প্ল্যান করে তার প্রেগন্যান্ট বউকে নিয়ে এই দেশে আসে। কালকেই সে ইকবালের সাথে প্ল্যান করে সোফিয়া কে পৃথিবী থেকেই সরিয়ে দিবে। সোফিয়াকে সরানোর পিছনে মার্কান আর ইকবাল দুজনেরই স্বার্থ ছিল। ইকবাল তার সন্তান দের নিয়ে সোফিয়ার ক্যামেরার সামনের বিজনেস গুলো তার হবে আর মার্কান সোফিয়ার ক্যামেরার পিছনের সবকিছু দখল করে নিবে। এমনটাই ডিল হয়েছে তাদের দুজনের মধ্যে। কিন্তু তার আগেই সোফিয়া ঐ রাতেই মার্কানের কাছে পৌঁছে যায়।

ঘড়ির কাঁটা যখন গভীর রাত ছুঁয়েছে তখন একটা কালো গাড়ি এসে থামে সেই মার্কানের নির্জন ফ্ল্যাটের সামনে। গাড়ি থেকে নামে সোফিয়া। তার পাশে আরজে। সাথে সোফিয়ার গার্ডরা। তারা সবাই ফ্ল্যাটে ঢুকে পড়ে। ঐদিন রাতেই মার্কান ও তার স্ত্রী কে মেরে ফেলে সোফিয়া। নিজের অনাগত সন্তানের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতেই মার্কান আরভির পিছনে পড়েছিল। কেননা ঐদিন তার স্ত্রীর বুকে গুলি চালিয়ে ছিল আরজে। অবশ্য তার পিছনেও কারণ ছিল। মার্কানের স্ত্রী মেথেরিও সোফিয়া কে গুলি করতে গিয়েছিল। কিন্তু তার বন্দুক থেকে গুলি বের হওয়ার আগেই আরজের গান থেকে গুলি চলে যায়। মেথেরিও একটা চাপা চিৎকার করে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে। তার হাত নিজের পেটের উপর চলে যায় যেখানে একটা নতুন জীবন ছিল। মার্কান পাগলের মতো চিৎকার করে ওঠে,

–“নোওও”
সে তার স্ত্রীর দিকে ছুটতে যাচ্ছিল কিন্তু তার আগেই সোফিয়া তার সামনে দাঁড়িয়ে ধীরে একটা ছুরি বের করে নিচু হয়ে তার কানে বলে,
–“তোর বাপ, আমার জীবন শেষ করেছিল,
আজ আমি তার বংশ শেষ করব”
তারপর ছুরি টা চালিয়ে দিল তার পেটে, একটার পর একটা আঘাত হানতে থাকে। মার্কানের চিৎকারে পুরো ফ্ল্যাট কেঁপে ওঠে। তার শরীর ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে যায়। সবকিছু আবার নিস্তব্ধ হয়ে যায়। রক্তে ভেসে যায় পুরো ফ্ল্যাট। আরজে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকে। তার মুখে কোনো অনুভূতি নেই আর না কোন অভিব্যক্তি।
কাজ শেষে সোফিয়া আরজে কে নিয়ে চলে যায়। তাদের গাড়ি গুলো দৃষ্টিগোছর হতেই আরেকটা গাড়ির বহর এসে থামে সেই নির্জন ফ্ল্যাটের সামনে। গাড়ি থেকে নেমে আসে ইকবালের লোকজন। তারা দ্রুত ভিতরে ঢুকেতেই তাদের চোখ থেমে যায় সেই রক্তাক্ত দৃশ্যে, মেঝেতে পড়ে আছে মার্কান। তার শরীর ক্ষতবিক্ষত, শ্বাস প্রায় বন্ধ হয়ে আসছে তবুও একটু একটু করে বুক উঠানামা করছে। ইকবালের লোকেরা সাথে সাথে তাকে হসপিটাল নিয়ে যায়।
তিনদিন অজ্ঞান থাকার পর মার্কান বাঁচলেও তার স্ত্রী আর অনাগত সন্তান বাঁচেনি। ঐদিন-ই থমাস তার বাবার কাছে আসে এবং সে সবটা জানতে পেরে ইকবাল জাওয়ানের অগোচরে তার আর তৃণার ছেলে আসল রওনাক কে সরিয়ে তার জায়গায় নিজে চলে আসে। এই ব্যাপারে না ইকবাল জানত আর না কেউ কিচ্ছুটি। এদিকে মার্কান বাঁচলেও তার শরীরের অবস্থা খুব খারাপ ছিল। ডাক্তার রা বলে দিয়েছে সুস্থ হতে বছর খানেক লাগবে।

তবে সে বিছানায় থেকেই ইকবালের সাথে মিলে আরেকটা চাল চালায়। মার্কান লরেন্সের থেকে দূরে থাকলেও তার সাথে যোগাযোগ ছিল। এজন্য সে মারহাবের ব্যাপারেও সবটা জানতো। তারা দুজন মিলে মুসাব কে বিডি তে নিয়ে আসে। ইকবাল জাওয়ানই মুসাবকে মারহাবকে মারার ভিডিও ও ছবি গুলো মার্কান কে দেয় এবং মার্কান সেগুলো মুসাবকে দেয়। কিন্তু তারা সবাই মিলে সোফিয়ার কিচ্ছু টি করতে পারে না কেননা সে ততদিনে হয়ে ওঠেছে বেপরোয়া ও অপ্রতিরোধ্য সাথে সেই কুখ্যাত আলফা টিমও বানিয়ে ফেলেছে।
এভাবে সময় গড়িয়ে যায় আরো দুই বছর। এই দীর্ঘ সময়ে ইকবাল সোফিয়া কে মারার জন্য আর কোন প্ল্যানই বাকি রাখেনি। আর বিপরীতে সোফিয়া তার সবটাই জেনেও চুপ করে ছিল। সোফিয়ার ভাবনাটা ছিল এমন যে, একদিন এই সাম্রাজ্য, ক্ষমতা সব কিছু ইকবালের হাতে তুলে দিলে হয়তো সে সোফিয়া কে কাছে টেনে নিবে, হয়তো তাকে একটু ভালোবাসবে।

কিন্তু সোফিয়া হয়তো কোনদিনই ভাবতে পারেনি, নিষ্ঠুর ইকবাল তাকে কোনদিনই ভালোবাসবে না। এর মধ্যে সানার বাবা মারা যাওয়ার সাথে সাথে আরজে তার বাবাকে বাধ্য করে, সানাকে তার লাগবে। একসময় ইকবাল ছেলের ব্ল্যাকমেইলের কারণে সানাকে আরজের সাথে বিয়ে দিয়ে দেয়। তবে ইকবাল এটা যতটা না ছেলের জন্য করেছে তার থেকে বেশি করেছে সোফিয়ার বিরুদ্ধে যাওয়ার জন্য। ভেবেছিল আরজের বিষয়ে এতবড় সিদ্ধান্তের জন্য হয়তো সোফিয়া তাকে ডিভোর্স দিয়ে দিবে, কিন্তু সোফিয়া তা করেনি। এর জন্য ইকবাল আরেক টা নোংরা খেলা খেলে, এবার সে সোফিয়া কে সরানোর জন্য আরজে কে ব্যবহার করে। সে মুসাবের মাধ্যমে বিয়ের পর রাতেই সানাকে মারার জন্য লোক পাঠায়। যাতে আরজে তাদের দেখে সোফিয়া কে ভুল বুঝে। আরজে মুসাব কে দেখে সত্যিই তার মাকে ভুল বুঝে। আর সোফিয়া তার সবটাই জানতো কিন্তু তখনও সে চুপ ছিল। তবে হ্যাঁ, সে ভালোবেসে যেই ভুল করেছে সেটা যেন আরজেও না করে সেজন্য পরে সানাকে সরিয়ে দিতে চেয়েছিল।
আরজের বিয়ের পর একমাস পর্যন্ত ইকবাল অপেক্ষা করে। ঠিক এক মাস পরে সে নিয়ে নিল এক কঠিন সিদ্ধান্ত। সে আর সোফিয়ার বেড়াজালে কাটাতে চায় না, নিজের মতো করে চায়। সেজন্য সে সোজা চলে যায় সোফিয়ার কক্ষে। রিয়ানা পৃথিবীতে আসার পর থেকে তার সোফিয়ার কক্ষও আলাদা হয়ে গেছে। এত বছরে সে একবারও সোফিয়ার কাছাকাছি যায়নি।

সোফিয়া তখন নিজের কক্ষে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে নিজের একান্ত বাগান টার দিকে তাকিয়ে আছে। তার চোখে একটা অদ্ভুত শূন্যতা, যেন অনেক কিছু দেখেও আর কিছু দেখার বাকি নেই। ঠিক তখনই ধীরে ধীরে দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করে,
“ইকবাল জাওয়ান”
তার হাতে একটা ফাইল। সোফিয়া প্রথমে তার দিকে না তাকিয়ে নিস্তেজ কণ্ঠে বলে,
–“অবশেষে তুমি আমার রুমে আসলে ইকবাল। আমি ভেবেছি, আমার মৃত্যুর পরও হয়তো একেবারে আমার লাশ দেখতে আসবে”
বিপরীতে কোন শব্দ নেই। সোফিয়া ঘুরে তার চোখে চোখ রেখে বলে,

–“আচ্ছা ইকবাল, এই নিষ্ঠুর পৃথিবী কেন আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। যারা মরতে চায় কেন তাদের মৃত্যু দেরিতে আসে। আমি…আমি মরে গেলে রনো মুক্তি পাবে, তুমি মুক্তি। কিন্তু দেখো ভাগ্য হয়তো চায় না তোমরা মুক্ত হও সেজন্যই হয়তো আমি এখনো বেঁচে আছি তাই না?”
ইকবাল কোনো উত্তর দেয় না। তার সামনে থাকা ভেঙে যাওয়া নারীর হৃদয়বিদারক কথা গুলো তার পাথর মনকে গলাতে পারছে না। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে ফাইলটা টেবিলের উপর রাখে। তারপর ঠোঁটের কোণে এক টুকরো অদ্ভুত হাসি নিয়ে বলে,
–“তুমি একটা জিনিস জানো না, সোফিয়া”
সোফিয়া ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করে,
–“কি?”
ইকবাল একটু ঝুঁকে আসে। তার চোখ দুটো সরাসরি সোফিয়ার বাদামী চোখে নিবদ্ধ করে এক নিঃশ্বাসে বলে,

–“আমার… আর তৃণার সন্তানটা বেঁচে আছে। এখন আমি সব ছেড়ে আমার আর তৃণার সন্তানের সাথে বাকি জীবন টা কাটাতে চাই। হ্যাঁ, রিয়ানা আর আরজের সাথে আমার যোগাযোগ থাকবে”
এক মুহূর্তে সময় যেন থমকে যায়। সোফিয়ার চোখ হঠাৎ বিস্ফোরিত হয়ে ওঠে। তার মাথার উপর যেন আকাশটা ভেঙে পড়েছে। সে কয়েক পা পিছিয়ে যায়। তার কণ্ঠ থেকে কাঁপা কাঁপা স্বরে বের হয়,
–“কি…?
আমি… আমি তো..”
তার কথা জড়িয়ে আসছে। তার মনে পড়ছে ঐদিন তার লোকেরা স্পষ্ট বলেছে ঐ বাচ্চা টাকে মেরে ফেলেছে, তাহলে…?
ইকবালের ঠোঁটের কোণে হাসি আরো গভীর হয়। সে এগিয়ে এসে শুধায়

–“তুমি তো তৃণার মতো ওকে মেরে ফেলতে চেয়েছিলে তাই না?”
–“তুমি… আমাকে মিথ্যে বলছো?”
ইকবাল মাথা নাড়িয়ে আওড়ায়,
–“না, সে বেঁচে আছে। আর আমি এখন তাকে সবার সামনে আনতে চাই। আমার ছেলে হিসেবে…নাহ, আমার আর তৃণার সন্তান হিসেবে। তাই….”
সে টেবিলের উপর রাখা ফাইলটা ঠেলে দেয় সোফিয়ার দিকে,
–“আমার ডিভোর্স চাই”
‘ডিভোর্স…’ শব্দটা যেন ছুরি হয়ে এসে বিঁধে যায় সোফিয়ার বুকে। মস্তিষ্কে বজ্রাঘাতের মতো আঘাত হানে। তার চোখ আবারও বড় হয়ে যায়, সাথে শ্বাসও আটকে আসছে। সে আজ পর্যন্ত ইকবালের সব সহ্য করেছে শুধু মাত্র এই সবটা না শোনার জন্য। আর আজ ইকবাল সেই তৃণার সন্তানের জন্য তার সামনে সেই শব্দটাই উচ্চারণ করছে। সোফিয়ার গলা শুকিয়ে আসছে। তবুও আস্তে করে বের হয়,

–“না…ডি…”
তারপর হঠাৎ সে ছুটে এসে ইকবালের হাত চেপে ধরে এক নিঃশ্বাসে বলতে থাকে,
–“না না…ইকবাল ডিভোর্স না…তুমি ক্ষমতা চেয়েছিলে তাই না, দেখো আমি এই সব কিছু দিয়ে দিব। কিন্তু আমি তোমাকে ডিভোর্স দিব না…কখনোই না”
ইকবাল বিরক্ত হয়ে হাতটা ঝটকা দিয়ে ছাড়িয়ে নিয়ে বলে,
–“আই ওয়ান্ট ডিভোর্স, সোফিয়া। রাইট নাও”
সোফিয়ার শরীর কেঁপে ওঠে। সে মাথা নাড়িয়ে বারবার বলতে থাকে,
–“না… না… না…ডিভোর্স না…”
সে আবার এগিয়ে এসে ইকবালকে জড়িয়ে ধরে তাড়াহুড়ো করে বলে,
–“ঠিক আছে…আমি ওই ছেলেটাকে মেনে নিব, আমি সানাকেও মেনে নিব। কিন্তু তুমি…তুমি আমাকে ছেড়ে যেও না। প্লিজ ইকবাল, প্লিজ”
ইকবাল জোর করে সোফিয়াকে নিজের থেকে সরিয়ে দিয়ে বিরক্ত সূচক কণ্ঠে বুলি ছুড়ে,

–“কি আশ্চর্য…আমি এত কিছু করার পরও তুমি কেন আমার পিছু ছাড়ছো না?”
–“তুমি কেন এমন করছো আমার সাথে? আমি কি করিনি তোমার জন্য?
দেখো, আমি তো এই সবকিছু বানিয়েছি তোমার জন্য”
–“তুমি কিছুই করনি আমার জন্য, সোফিয়া। সবকিছু করেছো নিজের জন্য। আমার জন্য কিছু করলে, তুমি ঐদিন রাতে তৃণাকে এভাবে খুন করতে পারতে না”
সোফিয়া ইকবালের মুখে বারবার তৃণার নাম শুনে তার পায়ের রক্ত শিরশির করে মাথায় চড়ে যায়। সে চিৎকার করে ওঠে,
–“তৃণা, তৃণা, তৃণা, একে ছাড়া তোমার চোখে….”
ইকবাল তাকে থামিয়ে তার দ্বিগুণ শব্দে বলে,

–“হ্যাঁ, আমার চোখে শুধু তৃণাই থাকবে। কেননা তৃণা ভালোবাসতে জানে আর তুমি জানই না ভালোবাসা কী?”
বিপরীতে সোফিয়া তার দিকে কিয়ৎকাল মলিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। মনে মনে ভাবে, সত্যিই তো সে ভালোবাসতে জানে। কীভাবে জানবে? সে তো কোনদিনই ভালোবাসা পায়নি। ধীরে সে আবার তার সামনে এসে দাঁড়ায়। তার দুই হাত জোড় করে ধরে বলে,
–“আমাকে একটু ভালোবাসবে, ইকবাল।
কেউ কোনোদিন আমাকে ভালোবাসেনি, তাই আমি সত্যিই জানি না, ভালোবাসা কীরকম হয়। শুধু তোমার… একটু ভালোবাসা লাগবে আমার”
একটা দীর্ঘ নীরবতা কাটিয়ে ইকবাল চিৎকার করে ওঠে,
–“আর আমার তোমার থেকে মুক্তি লাগবে”
তার বাক্য টুকু শ্রবণ ইন্দ্রিয় হতেই সোফিয়া কেঁপে ওঠে। সে আবার মাথা নাড়িয়ে বলতে থাকে,
–“না…আমার থেকে যে তোমার মুক্তি নেই,
না জীবিত…আর না মৃত”
ইকবাল বিরক্ত হয়ে নিজের দন্ত পাটি পিষে আওড়ায়,
–“তুমি একটা সাইকো, সোফিয়া। যার সাথে না থাকা যায় আর না সংসার করা যায়। এখন চুপচাপ ডিভোর্স পেপারে সাইন করো”
সে ফাইলটা তুলে নিয়ে একটা কলম তার হাতে গুঁজে দিয়ে বলে,

–“সাইন করো, রাইট নাউ”
সোফিয়ার হাত কাঁপছে,
–“না…আমি সাইন করব না”
ইকবাল জোর করে তার হাত চেপে ধরে বলে,
–“সোফিয়া ডু ইট ফাস্ট”
হঠাৎ সোফিয়া তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয়। তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে গেছে। তার সাইকো মস্তিষ্ক টা যেন আবার জেগে ওঠেছে। তার চোখে মুখে ফুটে ওঠে উন্মত্ততা। পরের মুহূর্তে সে নিজের কোমর থেকে একটা বন্দুক বের করে সোজা ইকবালের দিকে তাক করে। এটা দেখে ইকবালের ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে ওঠে। সোফিয়া শক্ত কণ্ঠে আওড়ায়,

–“ইকবাল শেষ বারের মতো বলছি বলো,
তুমি আমাকে ভালোবাসো। নাহয় আমি গুলি চালিয়ে দিব”
ইকবাল এগিয়ে এসে তার বন্দুকের নলের সামনে দাঁড়িয়ে নির্ভীক কণ্ঠে শুধালো,
–“তোমার বন্দুকের সামনে দাঁড়িয়ে বলছি, তোমার সাথে থাকার থেকে, তোমার বন্দুকের গুলি আমার জন্য ভালো”
সোফিয়ার চোখ থেকে গড়গড় করে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। সে নিজের বিগড়ে যাওয়া মস্তিষ্ক কে সংবরণ করতে পারছে না। তারপরও বহু কসরতে ফের প্রশ্ন করে,
–“ইকবাল, প্লিজ বলো, ভালোবাসি”
ইকবাল চিৎকার করে প্রতুত্তর করে,
–“আই হেট ইউ মোস্ট ইন দ্য ওয়ার্ল্ড”
–“আমি কিন্তু গুলি মেরে দিব সত্যি সত্যি। বলো, ভালোবাসি সোফিয়া”
–“মেরে দাও”
–“বল… তুমি আমাকে ভালোবাসো”
ইকবাল ধীরে ধীরে আরও কাছে এগিয়ে আসে। বন্দুকের সামনে দাঁড়িয়ে তার চোখে চোখ রাখে।তারপর খুব ঠাণ্ডা কণ্ঠে বলে,
–‘আমি তোমাকে ভালোবাসি না। তোমার মতো সাইকোকে কেউ ভালোবাসতে পারে না।
শুধু ঘৃণা করা যায়”
সে ধীরে ধীরে ঝুঁকে এসে কানের কাছে বলে,

–“লিসেন কেয়ারফুলি, আই হেট ইউ, মিস সোফিয়া দূরানী। তুমি আমার জন্য আমার পুরো লাইফে একটা ঠুনকো কৌতুহল ছাড়া কিছুই না আর…..”
তার জিহবা খসে বাকি বাক্য টা বের হওয়ার আগেই সোফিয়ার গান থেকে গুলি বের হয়ে যায়। ইকবাল থমকে যায়। তার চোখে বিস্ময়। সে ধীরে ধীরে নিচের দিকে তাকায় নজরে আসে তার বুকের মাঝখান থেকে রক্ত গলগল করে বের হচ্ছে। সে যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না। সে তো ভেবেছিল, সোফিয়া বাধ্য হয়ে সাইন করে দিবে, কিন্তু এটা….তার কল্পনাও ছিল না।
তারপর ইকবাল ধীরে ধীরে চোখ তুলে তাকায় সামনে দাঁড়িয়ে আছে সোফিয়া। তার হাত কাঁপছে, বন্দুক এখনো তার দিকে তাক করা, চোখ বন্ধ সাথে ঠোঁট কাঁপছে। সে এখনো এক মনে বিড়বিড়াচ্ছে,
–“আমি ডিভোর্স দিব না… আমি দিব না… আমি দিব না”
পরের মুহূর্তেই তার কানে ভেসে আসে ইকবালের শরীরটা ভারী শব্দে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ার শব্দ। সেই শব্দটা যেন বজ্রপাতের মতো আঘাত করে সোফিয়ার কানে। সে চমকে উঠে চোখ খুলে ফেলে।।তার দৃষ্টি নিচের দিকে নামতেই সবকিছু যেন ঘুরতে শুরু করে। মেঝেতে পড়ে আছে ইকবাল আর তার বুক থেকে রক্ত গলগল করে বের হচ্ছে। সোফিয়া চিৎকার করে ওঠে। সাথে সাথে বন্দুকটা তার হাত থেকে পড়ে যায়। সে দু’হাতে মাথা চেপে ধরে পিছিয়ে যায় কয়েক কদম। মাথা নাড়িয়ে বলতে শুরু করে,

–“আমি… আমি এটা করিনি… আমি… আমি না…”
হঠাৎ যেন সে বাস্তবে ফিরে আসে। সে দৌড়ে ইকবালের দিকে গিয়ে মেঝেতে বসে পড়ে, কাঁপা হাতে ইকবালের মুখটা তুলে ধরে। তার গালে চাপড় মেরে বারবার বলতে থাকে,
–“ইকবাল… ইকবাল… ওঠো… প্লিজ ওঠো। প্লিজ… কথা বলো… দেখো… তুমি তো আমাকে ঘৃণা করো, তাই না?”
তার চোখ বেয়ে অঝোরে পানি পড়ছে। গলা জড়িয়ে আসার কারণে শব্দ গুলোও বের হতে পারছে না। তারপরও বলে,
–“আচ্ছা ঠিক আছে… আমি কিছু বলবো না। আমি কিছুই বলবো না। তুমি… তুমি ওই মার্কানের সাথে মিলে আমাকে মেরে ফেলো। তুমি তৃণার ছেলেকে নিয়ে আসো। প্লিজ… কিন্তু আমাকে ছেড়ে যেও না। ইকবাল প্লিজ”
তার হাত কাঁপছে, সে ইকবালের মুখে হাত বুলিয়ে যাচ্ছে,
–“দেখো… আমি ভুল করেছি। আমার মাথা কাজ করছিল না। আমি কী করেছি নিজেই জানি না। উঠো, প্লিজ উঠো, আমার দিকে তাকাও… একবার তাকাও”
তার এত নাড়াচাড়ার মাঝে হঠাৎ ইকবালের চোখের পাতা সামান্য কেঁপে ওঠে। সোফিয়া থমকে যায়। ধীরে ধীরে ইকবালের ঠোঁট নাড়িয়ে আওড়ায়,

–“পৃথিবীর… সবথেকে… বেশি… ঘৃণা করি… আমি… তোমাকে… সোফি….”
বাক্যটা আর সম্পন্ন হলো না তার আগেই একটা দীর্ঘ, ভাঙা নিঃশ্বাস। তারপর সবকিছু থেমে যায়। সোফিয়ার হাতের মধ্যে ইকবালের শরীরটা নিথর হয়ে পড়ে থাকে।তার আঙুলগুলো ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে ঠান্ডা হয়ে যায়। সোফিয়া কিছুক্ষণ পর বোঝতেই এক বিকট আওয়াজে চিৎকার করে,
–“না… না… না”
সে ইকবালকে জড়িয়ে ধরে বলতে থাকে,
–“না, ইকবাল, তুমি কোথাও যেওনা। আমি সব মেনে নিবো, তোমার ঘৃণাও মেনে নিবো, তুমি শুধু থাকো। দেখো তোমার সোফিয়া তোমাকে ছাড়া থাকতে পারবে না। বলেছিলে না, আমাকে বিয়ে করা তোমার ভুল, তাহলে ঠিক করে নাও, প্লিজ ”

তার কণ্ঠে এখন ভাঙা হাসি আর কান্না একসাথে মিশে গেছে। সে পাগলের মতো বলতে থাকে,
–“আমি ভালো হয়ে যাবো, আমি আর কাউকে মারবো না, আমি সব ছেড়ে দেবো।
শুধু তুমি একবার বলো, তুমি আমাকে ভালোবাসো’
সে ইকবালের বুকে মাথা ঠুকে কাঁদতে থাকে,
–“একবার বলো না, একটা বার… আমি শুনে মরে যাবো… কিন্তু শুনতে তো দাও”
তার হাত কাঁপতে কাঁপতে ইকবালের বুকের ক্ষত ছুঁয়ে যায়। সেখান থেকে বেরুলো লাল তরঙ্গে ভিজে যায় তার আঙুল। সে সেই রক্ত নিজের মুখে মেখে বিড়বিড়ায়,
–“কেন তুমি কখনো আমাকে ভালবাসলে না? “আমাকে একটু ভালোবাসা” এতটাই কি কঠিন ছিল তোমার জন্য, ইকবাল?
চোখ মেলে একটু দেখো না, আমি তোমার জন্য এই পুরুো সাম্রাজ্য বানিয়েছি। তারপরও আমি কিভাবে হেরে গেলাম?”
সে ধীরে ধীরে ইকবালের বুকের উপর মাথা রেখে দেয় যেখানে সে নিজেই গুলি করেছিল।
নিশ্চুপ কণ্ঠে বলে,

–“কেন… কেন তুমি সারা জীবনে একবারও আমাকে ভালোবাসলে না, ইকবাল?
তুমি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমাকে ঘৃণা করে গেলে। আমাকে একটাবার ভালোবাসলে কি খুব ক্ষতি হয়ে যেত। ইকবাল, কেন বললে না তুমি ভালোবাসি?
কেন তুমি আমার হলে না?
আমি পৃথিবী জিতে নিয়েছি অথচ তোমার কাছে এসেই হেরে গেলাম”
তারপর সে সেভাবে থেকেই হঠাৎ পাগলের মতো হেসে ওঠে,
–“সোফিয়া হেরে, এক ফোঁটা ভালোবাসার জন্য। সবাই দেখো সোফিয়া কাঁদছে…..”

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ২৬ (৩)

তার কণ্ঠ ধীরে ধীরে থেমে যায়। ধীরে ধীরে সে ইকবালের নিথর দেহ টার উপর জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। ঘরটা আবার নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে। শুধু রক্তের গন্ধ আর নিথর শরীরের ভারী নীরবতায় চেয়ে যায় চারপাশ।
এটুকু বলেই থেমে যায় সোফিয়া। তার কণ্ঠস্বর থেকে আর বাক্য বেরুচ্ছে না। ধীরে ধীরে সে মাথা তোলে তাকায়। তার দৃষ্টি সামনে গিয়ে থামে ফ্লোরে বসে থাকা সানার দিকে যার চোখ থেকে অঝোরে পানি ঝরছে। সে নিঃশব্দে কাঁদছে একটা জীবন্ত দুঃস্বপ্নের সাক্ষী হয়ে।

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ২৭