হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ২৮
সাবা খান
গোটা ব্ল্যাক ম্যানশনের চারদিকে নিশীথের ঘন অন্ধকার নেমে এসেছে। উঁচু গেটের দুপাশে দাঁড়িয়ে থাকা ল্যাম্পপোস্টগুলো ম্লান আলো ছড়াচ্ছে, যেন আলোও এখানে ঢুকতে ভয় পাচ্ছে। ভিতরে বিরাজ করছে ভারী নিস্তব্ধতা, এই নিস্তব্ধতার মাঝেই ঈশানীর রুমের একপাশের একটা লম্বা ডিভানেই বসে আছে ঈশানী। দুহাত দিয়ে লজ্জায় আরক্তিম হওয়া আদল খানা ঢেকে রেখেছে। রমণী কখনো হালকা হেসে ফেলছে, কখনো লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলছে, আবার কখনো নিজের চুল কানের পেছনে গুঁজে কিছু বলার চেষ্টা করছে,
–“আমি না… আজকে..”
তারপর থেমে যাচ্ছে। একটু পর আবার নিজেই বলছে,
–“ইয়ে মানে… আমি….”
তারপর আবার লজ্জায় চুপসে যায়। এই একই দৃশ্য গত এক ঘণ্টা ধরে চলছে। বিছানার উপর দুই পা ছড়িয়ে বসে আছে সানা, তার চোখে মুখে মুখে স্পষ্ট বিরক্তির ছাপ। আর একটু দূরে সোফায় বসে আছে এসপি, হাত দুটো গুটিয়ে, ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে ঈশানীর দিকে। দুজনেই একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে কিন্তু ঈশানী, সে এখনো “আমি না…”তেই আটকে আছে।
এদিকে সানা আর বসে থাকতে পারছে না, এমনিতেই তার ধৈর্য নামক জিনিসটা একদমই কম তারউপর এত নাটক সহ্য না তোর। রমণী এসপি দিকে তাকিয়ে নাক মুখ কুঁচকে বলে,
–“শালী কালনাগিনীর বাচ্চা, মনে হচ্ছে কেরোসিন তেলের পিঠা খেয়েছে, না হয় আমি ড্যাম শিওর একে ভূতে ঢুকে ধরেছে। এসপি, যাহ, গিয়ে ওঝা না হয় কবিরাজ ডেকে নিয়ে আয়, এর ঘাড় থেকে ভূত তাড়াতে হবে”
এসপি নিজেও কখন থেকে ভাবনায় ডুবে ছিল, সানা কথায় তার দিকে তাকিয়ে সন্দেহজনিত গলায় শুধায়,
–“আমিও বুঝতে পারছি না, মিসেস নাগিনের মাথার কোন তারটা ছিঁড়ে গেল। গত এক ঘন্টা ধরে নিজে নিজেই হাসছে”
তারপর এসপি হাতে থাকা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে একটা হামি তুলে বলে,
–“কটকটি চল, এ এখানে সারারাত থাকুক, আমাদের সংসার আছে, বউ জামাই আছে, আমরা চলে যাই”
সানা তার কথায় মত জানিয়ে উঠে দরজার দিকে যেতেই, ঈশানী তাড়াতাড়ি করে তাদের আটকে দেয়, সানা সাথে সাথে খেঁকিয়ে ওঠে,
–“কালনাগিনীর বাচ্চা, তুই কি বলবি নাকি আমি তোর কানের নিচে এমন বাজান বাজাবো, সারাজীবন বাজতে থাকবে”
ঈশানী একটা ফাঁকা ঢোক গিলে আওড়ায়,
–“আমি না… আমি না…”
–“আমার মা, গত এক ঘন্টা ধরে এটাই বলছিস। আমরা জানি তুই আমিনা না, তুই কালনাগিনী, তার পরের লাইন বল..”
বিপরীতে ঈশানী চোখ বন্ধ করে বলে,
–“আমি না কারো প্রেমে পড়েছি….”
ঈশানীর মুখ থেকে বাক্য বেরোতে দেরি, দুদিক থেকে চিৎকার আসতে দেরি হয়নি,
–“কিহহহহ!!!!!”
সানা, এসপি দুজনের চোয়াল ঝুলে পড়ার উপক্রম, চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে গেছে। দুজনে এতটা অবাক হয়েছে, হয়তো তাদের পুরো জীবনেও হয়নি। এসপি নিজেকে সামলে অবিশ্বাসের সুরে বলে,
–“কোন বেকুব নিজের কপাল পুড়িয়ে কালনাগিনীর প্রেমে পড়েছে। ওই বেচারার জন্য আমার ভীষণ দুঃখ হচ্ছে। পৃথিবীতে আর মেয়ে পেল না, যেচে গিয়ে নাগিনের ফাঁদে পড়ল। আহারে, বেচারার জন্য আমার কান্না পাচ্ছে। আচ্ছা সেই হতভাগার নাম বলেন, শালাকে আমি নিজে গিয়ে সতর্ক কর…”
এসপি আর কিছু বলার আগেই সানা ধাম করে একটা লাগিয়ে দিল তার পিঠে। সাথে সাথে এসপির হাত চলে যায় সেখানে, সে চোখ বন্ধ করে ব্যথা সহ্য করে নিয়ে চুপ করে গেল। মুখ ফুটে কিচ্ছু টি বললো না এসপি কেননা সে জানে, এখন কিছু বললেই আরকটা পড়বে পিঠে। সানা চোখে মুখে উচ্ছ্বাস নিয়ে বলে,
–“আবে ইয়ার, এমনিতেই মেয়েটা বিয়ে করতে পারছে না, দিন দিন বুড়ি হয়ে যাচ্ছে, তারওপর এগুলো বলছিস। সেই বেচারা রিকশাওয়ালা হলেও আমরা মেয়ে দিবো। এখন শোন বিটকেল, কাল সকালেই কাজী নিয়ে আসবি, আর কাজীকে বলবি বিয়ে দুটো পড়ানো হবে, তাই ডিসকাউন্ট যেন দেয়”
–“বিয়ে দুইটা!! তুই এই আবার বিয়ে করবি নাকি?”
–“কুত্তা, আমি ভীর আর সিরাতের কথা বলছি। আমি একই খরচে ওদের টাও সেরে ফেলতে চাই”
সিরাতের নাম শুনতে এসপি চমকে উঠে। সে এক লাফে দুই হাত দূরে সরে, দন্ত চেপে বলে,
–“অসম্ভব,, আমি ওই জাওরা কে কোন মতেই বিয়াই মানবো না, আর না আমি মেয়ে বিয়ে দিব। এবার যাই হয়ে যাক না কেন?”
এসপি সানার দিকে চোখ গরম করে তাকালেও বিপরীতে রমণী একদম পাত্তা না দিয়ে নির্বিকার চিত্তে আওড়ায়,
–“তাহলে কাল কাজীর সাথে সাথে উকিল নিয়ে আসবি, আমার আর সানিতার ডিভোর্সের জন্য”
সানা বাক্য উগড়ে দিতে দেরি, এসপির মুখের রং পাল্টাতে দেরি হয়নি। সাথে সাথে তার বুলি ও পাল্টে গেল। সে ঠোঁটে মেকি হাসি টেনে ভিতরে নিজের রাগটাকে গিলে বলে,
–“আরে একজন কাজী কি দুটো বিয়ে পড়াতে পারে? কষ্ট হবে তো বেচারার। আমি বরং দুজন কাজী নিয়ে আসি, কি বলেন মিসেস নাগিন?”
এই বলে দুজনে পিছনে ফিরে তাকাতেই দেখে ঈশানীর তাদের কথায় কোন ধ্যান নেই। সে নিজের হাতে থাকা মুঠোফোনের দিকে সম্পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে, স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে কাউকে মেসেজ পাঠাচ্ছে আর মুচকি মুচকি হাসছে। সানা আর এসপি দুজনে এক পলক চোখাচোখি করল, আর মুহূর্তে দুজনে নিজেদের মধ্যে কথা সেরে নিল। সানা এগিয়ে এসে ঈশানী কিছু বোঝার আগেই আকষ্মিক তার হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিয়ে নিল। সাথে সাথে ঈশানী চমকে বলে,
–“আরে আরে ডাইনি, কি করছিস টা কি? ফোন এদিকে দে। দেখ ভালো হবে না কিন্তু”
কে শুনে কার কথা, সানা দিল না, বরং স্ক্রিনে থাকা ইংরেজিতে পেচিয়ে লেখা টাকে পড়ার চেষ্টা করল,
–“কি এটা? হিজিবিজি…”
সে কপাল কুঁচকে ঈশানীর দিকে তাকিয়ে বলে,
–“কি কালনাগিনী, শেষ বয়সে এসে কারো প্রেমে পড়লি? ছেলেটাকে অন্তত ইজি ধরতে পারতিস, কি হিজিবিজি ধরেছিস”
ঈশানী কিছু বলার আগেই এসপি সানার হাত থেকে ফোনটা নিয়ে তার মাথায় একটা টোকা দিয়ে বলে,
–“আবে গাধাী, এ নাকি ছেলে বিয়ে করাবে। এখানে ফোন উল্টো ধরে বসে আছে। এটা কে?
এটাতো রিজভী”
রিজভীর নাম শুনতেই দুজনে আরও বেশি চমকে গেলেও, সানা ঈশানীর দিকে তাকিয়ে কোমরে হাত দিয়ে দন্ত চেপে বলে,
–“একটা কথাও বলবি না। এখন শুরু থেকে শেষ, এ টু জেড সব বলবি। সাথে মারও খাবি আমাদের কাছে লুকানোর জন্য। আমরা এখানে বিয়ে খাওয়ার জন্য আই মিন দুলাভাইয়ের জন্য দিন রাত অপেক্ষা করে বসে আছি, আর তুমি এখানে প্রেম করছ, চুপচাপ সবটা বল”
বিপরীতে ঈশানী আমতা আমতা করে চোখে দুজনের দিকে তাকিয়ে বলে,
–“ইয়ে মানে… আমি তো আজকেই..”
–“ওসব মানে টানে ছাড়, সোজা মানিতে আয়, এতদিন লুকানোর জন্য টাকা বের”
–“আরে না না, এসব আজকে হয়েছে”
–“মানে তুই আজকেই প্রেমে পড়েছিস”
ঈশানী সানার কথার বিপরীতে মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বুঝিয়ে বলে,
–“সত্যি বলছি আজকেই প্রেমে পড়েছি”
–“তাহলে প্রেমে পড়ার জন্য টাকা বের কর”
তার বলা বাক্যটা শ্রবণ হতেই ঈশানীর চোখ দুটো রসগোল্লা হয়ে গেল। রমণী ভ্রু কুচকে বলে,
–“মানে টা কী? লোকে প্রেমে পড়লেও টাকা দিতে হয় নাকি”
–“শুনুন মিসেস নাগিন….”
–“মিস মিস নাগিন….”
সানা তাকে একটা লাগিয়ে চুপ করিয়ে দিল। তারপর বিরক্তি মাখা কণ্ঠে শুধালো,
–“দুদিন পর মিসেস হবি এখন চিৎকার করছিস কেন? আর কে বলছে আমরা টাকা চাইছি, এগুলোতো ট্যাক্স প্রেমে পড়ার। যাহ গিয়ে খাতা কলম নিয়ে আয়। হিসাব করতে হবে”
ঈশানী একটা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে আবারও এদের সাথে বাকবিতন্ডে নেমে পড়ে।
রাত ধীরে ধীরে গভীরের দিকে ঢলে পড়েছে। এই গভীরতার মাঝেই ম্যানশনের প্রধান ফটক খুলে ভেতরে ঢোকে আরজের গাড়ির কনভয়। কাইলিন দরজা খুলতেই সে সোজা ভিতরে চলে যায়। তার মুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট, আর ভেতরে জমে থাকা অদৃশ্য এক অস্থিরতা। আজ সে একটু বেশিই দেরি করে ফেলেছে। সোফিয়া না থাকায় তাকে সবটা একা দেখতে হচ্ছে। প্রথমেই সে চলে যায় আরভির রুমের দিকে। দরজাটা হালকা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই দেখতে পায়, ছোট্ট আরভি বিছানায় গুটিসুটি মেরে ঘুমিয়ে আছে। তার ঘুমন্ত নিষ্পাপ মুখ টা কী শান্ত দেখাচ্ছে। আরজের ঠোঁটের কোণে হালকা একটুকরো হাসি ফুটে ওঠে। সে এগিয়ে গিয়ে খুব আস্তে করে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে ফিসফিস করে বলে,
–“গুড নাইট, মাই বয়”
তারপর ললাটে একটা চুমু একে ধীরে দরজাটা বন্ধ করে বেরিয়ে আসে। ছেলের কক্ষ থেকে বেরুতেই তার ক্লান্ত আদলে নেমে আসে এক ঝলক প্রশান্তির চাপ। কিন্তু সেই শান্তিটা বেশিক্ষণ দীর্ঘস্থায়ী হলো না। নিজের রুমের দরজা খুলে রমণী কে না দেখেই তা উধাও হয়ে যায়। বিছানা অগোছালো না, লাইট জ্বলছে না, কোথাও সানার উপস্থিতি নেই। এক মুহূর্তে তার চোয়াল শক্ত হয়ে যায়। মাথার ভেতর যেন কেউ আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। সে দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ, তারপর ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করে একটা দীর্ঘ শ্বাস ছাড়ে। কিন্তু নাহ, রাগটা কমছে না। কমবে কীভাবে?
সে রোজ অফিস যাওয়ার আগে এই মেয়েটাকে বলে যায়, সানা যেখানেই থাকুক, আরজে আসার সাথে সাথে যেন তাকে রুমে দেখতে পায়। কিন্তু রমণী তার কথা শুনলে তো? সে চলবে নিজের মর্জি মতো। একদিনও সে বাহির থেকে এসে সানাকে দেখতে পায় না। আরজে দন্ত চেপে নিজের মনে বিড়বিড় করে,
–“প্রতিদিন বলি… প্রতিদিন… আমার আগে রুমে থাকতে”
তার কণ্ঠে স্পষ্ট বিরক্তি, অসন্তোষ, আর অদ্ভুত এক অধিকারবোধের চাপ। সে খুব ভালো করেই জানে, এই মুহূর্তে সানা কোথায়। জ্যাক যেহেতু বাড়িতে আছে, তাই ইবেলিনার রুমে যাওয়ার প্রশ্নই আসে না। তাহলে ঈশানী অথবা এসপির রুমে হবে হয়তো। তার চোখে হালকা বিদ্যুৎ খেলে যায়। এক মুহূর্তও দেরি না করে সে ঘুরে দ্রুত পায়ে করিডোর পেরিয়ে সোজা চলে যায় ঈশানীর রুমের সামনে।
ভেতর থেকে হাসির শব্দ ভেসে আসছে। আরজের মুখটা আরও শক্ত হয়ে ওঠে। দরজাটা না নক করেই সে এক ঝটকায় খুলে ফেলে। ভেতরে ঈশানী, সানা আর এসপি বসে গল্পে মশগুল। ঈশানী এদের সাথে লেনদেনের হিসাব চুকিয়ে তাদের রিজভীর কথা বলছে। এদিকে সানা কিছু একটা বলতে বলতে হেসে উঠছে, ঈশানী লজ্জায় মাথা নিচু করে বসে আছে, আর এসপি কিছু একটা বলে মজা নিচ্ছে।
এদের কেউই দরজার কাছে দাঁড়ানো অগ্নি দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা আরজেকে খেয়াল করেনি। এক ন্যানো সেকেন্ড দেরি না করে আরজে কারো দিকে না তাকিয়ে না সোজা এগিয়ে আসে সানার দিকে। সানা চোখ তুলে তাকে দেখে চমকে উঠে কিছু বলার আগেই,
–“রানভীর আমি…”
রমণী কথাটা শেষ করার সুযোগই পেলো না। তার আগেই এক ঝটকায় আরজে তাকে কোলে তুলে নেয়। সানার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে যায়,
–“এই, এই কি করছেন?”
ঈশানী আর হতবাক হয়ে যায়। পর মুহূর্তে আবার নিজেদের সামলে নেয় কেননা এগুলো নতুন কিছু না। আরজে এসে সানা কে কোথাও দেখলে এভাবেই নিয়ে যায়।
এদিকে সানা ছটফট করে শক্ত কণ্ঠে বুলি ছুড়ে,
–“রানভীর, আমাকে নামান। কুত্তাআআআ…”
আরজে তার কথায় বিন্দু পরিমাণ কর্ণপাত করলো না বরং চলে গেল নিজের কক্ষের দিকে। আর সানা তার গলা জড়িয়ে ধরে রাগে ফুঁসছে।
আরজের রুমের মাঝখানে কিং সাইজের বিছানার এক কোণে মুখ ফুলিয়ে বসে আছে সানা। ঠিক যেমনটা তাকে রেখে গিয়েছিল আরজে ঈশানীর রুম থেকে তুলে এনে। না সে নড়েছে, না কিছু বলেছে। ঠিক তখনই বাথরুমের দরজা খুলে আরজে বেরিয়ে আসে। ভেজা চুল, শরীর থেকে এখনও ঠান্ডা পানির ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছে। হাতে তোয়ালে নিয়ে চুল মুছতে মুছতে সে একবার তাকায় সানার দিকে। এক ঝলকেই বুঝে যায় সে এখনো রাগ করে বসে আছে। আরজে তোয়ালেটা পাশে ফেলে দিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে। সামনে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে থাকে রমণীর দিকে। তারপর নরম গলায় শুধালো,
–“এখনো রাগ করে বসে আছো?”
সানা উল্টো দিকে মুখ ঘুরিয়ে নেয়,
–“আমি রাগ করিনি, শুধু আপনার সাথে কথা বলতে ইচ্ছা করছে না”
আরজে ভ্রু তুলে তাকায়,
–“কেন?”
–“আপনি আমাকে কেন সত্যিটা বলেননি”
তার বিপরীতে আরজে চুপ করে গেল। একটা ভারী নীরবতা নেমে আসে কক্ষে। আরজে অনেক আগেই জানতে পেরেছে সানা আজ সোফিয়ার সাথে দেখা করতে গেছে। আর সানা এখন কোন কোন সত্যির কথা বলছে সেটাও বুঝতে পারছে সে। আরজে এবার তার পাশে বসে জিজ্ঞেস করে,
–“কোন সত্যি?”
সানা একপলক চোখ বন্ধ করে সোফিয়ার বলা কথা গুলো ভেবে তার চোখে পানি চলে আসে। সে আরজের দিকে তাকিয়ে বলে,
–“আপনার মায়ের জীবনের সত্যিটা, আপনি সব জানতেন তাও কিছু বলেননি কেন?”
আরজে গভীর শ্বাস টেনে নিয়ে আওড়ায়,
–“আমি তোমাকে সেদিনই বলেছিলাম,
‘তুমি জানো তুমি কার বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছো?”
–“হ্যাঁ… কিন্তু তখন আমি কিছুই জানতাম না। আমি ভাবতেও পারিনি কারো অতীত এতটা ভয়ংকর হতে পারে”
আরজে চুপচাপ শুনে তারপর নিচু স্বরে বলে,
–“আমি জানতাম তুমি বুঝবে না…তাই বলিনি আর মম নিজেও চায়না তার দুর্বলতা কেউ জানুক”
–“মানে?
–“মানে চায় না কেউ তার অতীত জানুক। কেউ ড্যাড কে নিয়ে কটুক্তি করুক, কেউ ঘৃণা করুক। এজন্য মম নিজে ড্যাডের সকল অপকর্ম মিটিয়ে দিয়েছে। মম চায় মানুষ তাকে ঘৃণা করুক, মমের মতে, সে এর বেশি কিছু পাওয়ার যোগ্য না”
সানার চোখের কার্নিশ বেয়ে উষ্ণ অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। সে জড়িয়ে আসা কণ্ঠে বলে,
–“কেন…?”
–“কেনবা সে কখনো ভালোবাসা পায়নি, আর যাকে ভালোবেসেছিল। সে তাকে ধ্বংস করেছে”
কিয়ৎকালের নীরবতা কাটিয়ে সানা বলে,
–“আমি ভুল করেছি, রানভীর, আমি ওনাকে না জেনে ঘৃণা করেছি, না জেনে তার বিচার করেছি। আজ তাকে ওই অবস্থায় দেখে আমার নিজেরই ঘৃণা লাগছে”
আরজে তার দিকে তাকিয়ে নরম গলায় শুধায়,
–“এখন বুঝতে পেরেছো এটাই অনেক”
সানা মাথা নাড়িয়ে বলতে শুরু করে,
–“না না রানভীর, আমি ওনাকে এখানে নিয়ে আসতে চাই, কাল সকালেই আপনি ওনাকে নিয়ে। ডক্টর বলেছে ওনার হাতে বেশি সময়…”
আরজে হঠাৎ তার গালে হাত রেখে বলে,
–“রিল্যাক্স ওয়াইফি, আমি মম কে নিয়ে আসবো কালকেই”
সানা শান্ত হয়ে যায়। তারপর আবার কিছু একটা ভেবে ফের বলে,
–“মিসেস দিলরুবা খানম বলেছে এটা সম্ভব না”
আরজে তার প্রতুত্তরে হালকা হেসে মাথা কাত করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে তার চোখের দিকে। তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে সানাকে নিজের দিকে টেনে নিয়ে বলে,
–“সবটা আমার উপর ছেড়ে দাও…”
রমণীর ভিতর থেকে একটা স্বস্তির নিশ্বাস বেড়িয়ে আসে। ধীরে ধীরে মাথাটা এলিয়ে দেয় তার বুকে। রুমের ভেতরে তখন এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে আসে। আরজের হাতটা তার কাঁধে, শক্ত করে ধরা যেন ছেড়ে দিলে হারিয়ে যাবে। হঠাৎ আরজে কিছু একটা ভেবে থেমে যায়। তার চোখের দৃষ্টিও বদলে যায়। ঠোঁটে বাঁকা হাসি টেনে বলে,
–“ওয়াইফি..”
–“হুম’
–“জাস্ট থিঙ্ক, আমি যদি ড্যাডে মতো হতাম তাহলে তুমি কী করতে?”
সানা ধীরে মাথা তোলে তার দিকে তাকায়। তার চোখে একরাশ বিস্ময় খেলে যায়। সে ধীরে ধীরে হাত তুলে আরজের গলায় জড়িয়ে ধরে ধারালো কণ্ঠে শুধালো,
–“মিস্টার জাওয়ান, তাহলে আপনার মা যেই গুলিটা আপনার বাবাকে না জেনে, না বুঝে সবকিছুর শেষে মেরেছিল….”
সানা একটু থেমে তার চোখে চোখ রেখে বলে,
–“আমি সেই গুলিটা জেনে বুঝে একদম শুরুতেই মেরে দিতাম। আর একটা না, বন্দুকে যত গুলো থাকতো সব গুলো মেরে দিতাম”
এক মুহূর্তে রুমটা আরও ভারী হয়ে ওঠে। আরজের চোখে এক ঝলক আগুন খেলে যায়। পরমুহূর্তে তার ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসির রেখা ফুটে ওঠে। মনে হচ্ছে রমণীর এমন জবাবে সে ভীষণ খুশি হয়েছে। সানা কিয়ৎকাল পর এবার একটু ঝুঁকে ফিসফিস করে,
–“নাউ ইটস মাই টার্ন, আমি যদি আপনার বাবার মতো হতাম, তখন আপনি কি করতেন?”
আরজে ধীরে ধীরে তাকে আরও কাছে টেনে নেয়। তার আঙুলগুলো সানার পিঠে আরও শক্ত করে চেপে বসে যেন নখ গুলো চামড়া বেদ করে এখনি ঢেবে যাবে। তার মুখ সানার খুব কাছে নিয়ে তীব্র অধিকার বোধের সাথে হিসহিসিয়ে আওড়ায়,
–“মম ড্যাড কে মারার পর কাঁচের বক্সে রেখে দিয়েছে। আর আমি তোমাকে… জীবিত অবস্থায় রেখে দিতাম”
একটু থেমে আরও ঝুঁকে আসে এবার তার ঠোঁট প্রায় ছুঁয়ে যাচ্ছে সানার,
–“তোমাকে মেরে ফেললে তো শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু তোমাকে বাঁচিয়ে রাখলে, প্রতিটা মুহূর্তে তুমি শুধু আমারই থাকবে, মাই লাভ”
সানা তড়াক করে একটু দূরে সরে তার দিকে তাকায়। রমণী বোঝার চেষ্টা করছে, আরজের হাবভাব। কেন জানি তার দৃষ্টি কিছুতেই ভালো ঠেকছে না। কেমন অদ্ভুত লাগছে আরজে কে তার কাছে। আরজে তার দৃষ্টি বুঝে হঠাৎ হেসে ফেলে। তার খসখসে পুরুষালী হাতটা সানার গালে ছুঁইয়ে আওড়ায়,
–“কিডিং, সুইটহার্ট, তুমি এত সিরিয়াস হয়ে গেলে কেন?”
সানা চোখ সরু করে তাকায়,
–“এসব কী ধরনের মজা, রানভীর?”
আরজে তার প্রতুত্তর না করে। তার চোখে চোখ গেঁথে উল্টো প্রশ্ন করে,
–“তুমি জানো… আমি তোমার সাথে কি করতে পারি?”
–“কি?”
আরজে ধীরে ধীরে তার গাল ছুঁয়ে বলে,
–“তোমাকে এমনভাবে নিজের করে রাখতে পারি, যেখান থেকে তুমি কখনো বের হতেও পারবে না”
সানার বুকটা ধক করে ওঠে। এই মুহূর্তে আরজে কে ঠিক সোফিয়ার মতো দেখাচ্ছে। যখন সোফিয়া ইকবালের কথা বলে তখন তার দৃষ্টি আর আরজের দৃষ্টি মিলে যাচ্ছে সম্পূর্ণ। সানার মনে প্রশ্ন জাগে, কোথাও রানভীরও তার মায়ের মতো অসুস্থ ভালোবাসায় আক্রান্ত না তো?
সে মুখ ফুটে কিছু বলার আগেই আরজে তার ঠোঁটে হাত রেখে বলে,
–“হুশশশ…”
সে ধীরে ধীরে ঝুঁকে আসে। তার দৃষ্টি সোজা সানার ঠোঁটে। দুই কপোত-কপোতীর মধ্যে আরও দূরত্ব কমে আসে। তাদের অধর প্রায় ছুঁই ছুঁই ঠিক তখনই হঠাৎ আরজে মুঠোফোনটা শব্দ করে বেজে ওঠে। সানা তড়াক করে তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয়,
–“ফোন ধরুন”
আরজে বিরক্ত হয়ে চোখ বন্ধ করে রাগে গিজগিজ করে বলে,
–“ড্যাম ইট…”
সে ধীরে সানাকে ছেড়ে পাশের টেবিল থেকে ফোনটা তুলে নেয়। স্ক্রিনে তাকাতেই তার ভ্রু কুঁচকে যায়। কণ্ঠ থেকে বেড়িয়ে আসে,
হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ২৭
–“ডক্টর রাঘব…”
সে এক সেকেন্ড দেরি না করে ফোন কানে তোলে। কিন্তু বিপরীত পাশের কথা শুনেই তার মুখের রঙ বদলে যায়। চোখ স্থির হয়ে যায় সাথে শ্বাস ধীরে ধীরে দ্রুত হয়ে ওঠে,
–“ওকে আম কামিং”
তারপর সে আর কিছু না বলেই ফোনটা কেটে দেয়। সানা এগিয়ে এসে কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই আরজে তড়িঘড়ি করে তার হাত ধরে বলে,
–“মম…লেটস গো”
সানা আর কিছু না বলে তার সাথে বেরিয়ে যায়। বাইরে রাত আগের মতোই অন্ধকার। এই অন্ধকার ছিঁড়ে ম্যানশন থেকে তেজি ঘোড়ার ন্যায় বেড়িয়ে পড়ে আরজের কালো মার্সিডিজ টা।
