হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৩০ (৫)
সাবা খান
আজকের আকাশটা যেন সকাল থেকেই অদ্ভুত রকমের অস্থিরতায় ভুগছে। এজন্যই হয়তো রোদ বৃষ্টির লুকোচুরি খেলা চলছে। প্রত্যুষের প্রথম আলো ফুটতেই পূর্ব দিগন্তে একফালি সোনালি রোদ মৃদু উঁকি দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সেই আলো ক্ষণস্থায়ী হতে পারেনি। ক্ষণিকের মধ্যেই কোথা থেকে যেন একদল কৃষ্ণবর্ণ মেঘ এসে পুরো আকাশটাকে গিলে ফেলল সঙ্গে সঙ্গে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে স্যাঁতসেঁতে বিষণ্নতা। গাছের পাতাগুলোও আজ কেমন নিশ্চুপ। মনে হচ্ছে প্রকৃতি নিজেই কোনো অদৃশ্য শোকের ভারে নত হয়ে আছে।
কখনো হালকা বাতাস এসে শুকনো পাতা উড়িয়ে দিচ্ছে, আবার পরমুহূর্তেই চারপাশ এতটাই স্তব্ধ হয়ে যাচ্ছে যেন পৃথিবী নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গেছে। দূরে কোথাও মেঘের গর্জনের তীব্র শব্দটা কেমন শূন্য কবরস্থান জুড়ে প্রতিধ্বনিত হয়ে আবার নিঃশেষ হয়ে গেল। এটাকে ঠিক কবরস্থান বলাও চলে না, কেননা রিয়ানা ছাড়া আর কারো কবর দূরদূরান্ত পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না।
রিয়ানার কবরের চারপাশে সাদা শিউলি ফুল ছড়িয়ে আছে এলোমেলোভাবে যেগুলো কিছুক্ষণ আগে কিয়ান ও কিয়ারা কুড়িয়ে এনেছে তাদের মাম্মামের জন্য। তার কবরের থেকে আর একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল পুরোনো বৃক্ষ। তার শুকনো ডালপালাগুলো অর্ধেক আকাশ ঢেকে রেখেছে যেন বহু পুরোনো কোনো অভিশাপ নিজের কালো বাহু মেলে পুরো পৃথিবীটাকে গ্রাস করে নিতে চাইছে। ঝরে পড়া পাতাগুলো জমে আছে গাছটার নিচে। আর ঠিক সেই গাছটার গোড়ায় বসে আছে সারহাদ। একেবারে নিস্তব্ধ, নিশ্চুপ অবস্থায়। তার হাতে ধরা কালো ডায়েরিটা। যার মলাটের উপর সোনালি অক্ষরে খোদাই করা,
“মি আমর”
শব্দ দুটোতে আজ অদ্ভুত এক উপহাস লেগে আছে। সারহাদ অনেকক্ষণ ধরে শুধু ডায়েরিটার দিকে তাকিয়ে ছিল। খুলবে কি খুলবে না, এই সামান্য সিদ্ধান্তটাই যেন আজ তার কাছে যুদ্ধের মতো কঠিন হয়ে উঠেছে। জীবনে সে অসংখ্য লাশ দেখেছে, রক্তের গন্ধ তার কাছে নতুন না, মানুষের আর্তচিৎকার, মৃত্যুর আগের শেষ নিশ্বাস এসব তার পৃথিবীর খুব পরিচিত দৃশ্য। কিন্তু আজ…এই মৃত নারীর কয়েকটা লেখা পড়ার ভয়েই তার বুকের ভেতরটা কেমন অস্বাভাবিক ভারে ডুবে যাচ্ছে।
শেষমেশ ধীরে ধীরে সে ডায়েরিটার প্রথম পাতা খুলল। পাতাটা খুলতেই প্রথমে তার নাকে এসে বারি খায় শুকিয়ে যাওয়া গোলাপের গন্ধ, একটা মৃত প্রেমের গন্ধ। শুকনো গোলাপের নিচে কাঁপা কাঁপা অক্ষরে লেখা,
“জানেন সারহাদ, আমি এই পাতাটা এই নিয়ে দশবার লিখতে বসেছি। প্রতিবার লেখার পর ছিঁড়ে ফেলে দিয়েছি। প্রতিবার ভেবেছি, আর লিখব না আপনাকে নিয়ে। অথচ আশ্চর্য! কাগজ ছিঁড়ে যায়, শব্দ মুছে যায়, কিন্তু হৃদয়ের ভিতর লেখা অনুভূতিগুলো কিছুতেই মরে না। অথচ আয়ানকে নিয়ে লিখতে গিয়ে আমার শব্দভান্ডারের শব্দই খুঁজে পাইনি।
আমি এই হৃদয় ও মস্তিষ্কের দ্বন্দ্বে রোজ বিষিয়ে যাচ্ছি। একদিকে হৃদয় আপনাকে চাইছে, আর মস্তিষ্ক তার বিপরীতে সুর গাইছে। একদিকে কর্তব্য আমাকে টানে, অন্যদিকে আপনার কৃষ্ণবর্ণ চোখদুটো আমার সমস্ত নীতিবোধ ডুবিয়ে দেয়। বড্ড অদ্ভুত না?
একজন নারী নিজের স্বামীর পাশে শুয়েও অন্য একজন পুরুষের ছায়ায় ধীরে ধীরে ডুবে মরছে…”
সারহাদের দৃষ্টিজোড়া থমকে যায়। তার নিঃশ্বাস কেমন ভারী হয়ে উঠছে। সে ধীরে পরের পাতাটা উল্টায় সেখানে কালো কালিতে লেখা,
“”আপনার চোখ দুটো কি সত্যিই এতটা নিষ্ঠুর ছিল সারহাদ? নাকি আমি-ই বড্ড দুর্বল ছিলাম?
আমি বহুবার নিজেকে বোঝাতে চেয়েছি, আপনি আমার জন্য না। আপনি আগুন আর আগুন কখনো কারো হয় না, সে সব পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়। তবুও কেন জানি, আমি প্রতিরাতে নিজের সমস্ত প্রার্থনার শেষে আপনার নামটাই উচ্চারণ করি। কখনো কখনো মনে হয়, আপনি মানুষ নন, আপনি এক গভীর কালো সমুদ্র। যেখানে ডুবে যাওয়ার পর আর কোনো তীর খুঁজে পাওয়া যায় না। কি অদ্ভুত তাই না?
যে মানুষটা আমাকে চায়নি, আমি তাকেই আমার সমস্ত অস্তিত্ব দিয়ে চেয়েছি”
পাতাটা শেষ হওয়ার সাথে সাথেই সারা কবর জুড়ে একটা ঠান্ডা হাওয়া বয়ে গেল সাথে সারহাদের বুকের ভিতরেও যেন একইভাবে ভারী হয়ে উঠল। সে আরেকটা পাতা উল্টায়, নজরে আসে পাতার কোণে শুকিয়ে যাওয়া পানির দাগ। হয়তো অশ্রু হবে। সেখানে লেখা,
“”আজ আয়ান আমার জন্য নিজ হাতে রান্না করেছে। মানুষটা আমাকে অসম্ভব রকম ভালোবাসে, যে মাঝে মাঝে নিজের কাছেই অপরাধী মনে হয়। তার চোখে আমি পুরো পৃথিবী দেখি। কিন্তু আফসোস জানেন?
আমার হৃদয়ের আকাশে এখনো এক শ্যাম পুরুষের ছায়া ঝুলে আছে।
আমি ভেবেছি, বিয়ে করলেই হয়তো আপনাকে ভুলে যাব। আর সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু বিয়ের পর মনে হচ্ছে, আমি আয়ানে সাথে অনেক বড়অন্যায় করছি। আমি নিজেকে ঘৃণা করি সারহাদ, ভীষণ ঘৃণা করি। কেননা আমি একজন ভালো স্ত্রী হতে পারিনি। আয়ান আমার শরীর পেয়েছে, কিন্তু আমার আত্মাটা আজও আপনার অন্ধকারে বন্দি””
সারহাদ ধীরে ধীরে পরের পাতাটা উল্টায়, নজরে আসে,
“আজ বৃষ্টির রাতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলাম।
চারপাশে ঝড় হচ্ছিল। হঠাৎ মনে হলো, আপনি যদি আজ একবার এসে বলতেন,
–“চলো রিয়ানা, যাই বহুদূর…”
আমি হয়তো সব ছেড়ে আপনার সঙ্গে চলে যেতাম। এই সংসার, সম্পর্ক, ধর্ম, হ্যাঁ, এমনকি নিজের পাপবোধটাকেও। কেননা ভালোবাসা মানুষকে সবচেয়ে বেশি পাপী বানায। এখানে মানুষ ধীরে ধীরে নিজের কাছ থেকেই হারিয়ে যায়”
নিচে আবার লেখা,
“ভালোবাসা কি সত্যিই এত ভয়ংকর?
এখানে মানুষ ধর্ম ভুলে যায়, সম্পর্ক ভুলে যায়, পাপ পুণ্যের হিসাবটুকু পর্যন্ত ভুলে যায়। শুধু একটা মানুষকে চাইতে চাইতে সে নিজেকেই হারিয়ে ফেলে”
সারহাদের গলাটা শুকিয়ে এলো। সে অনুভব করছে বুকের ভিতর কোথাও অদ্ভুত ব্যথা ছড়িয়ে পড়ছে। তারপর আরেকটা পাতাতে যায়,
“আপনি জানেন সারহাদ?
আমি মাঝে মাঝে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে প্রশ্ন করি, আমি কি খারাপ নারী?
কেননা আমি স্বামীর নামের পাশে থেকেও অন্য একজন পুরুষের জন্য নিশ্বাস ফেলি। তারপর নিজের গালে নিজেই চড় মারি। তবুও কেন জানি, আপনার নামটা মন থেকে মুছে ফেলতে পারছি না।৷ আপনি আমার কাছে কোনো মানব নন, আপনি এক সুন্দর, নির্মম, রক্তাক্ত এক অভিশাপ…যাকে ভুলতে গিয়ে আমি প্রতিদিন একটু একটু করে মরে যাচ্ছি”
“সারহাদ, আজ ভোরে ঘুম ভাঙতেই জানালার পাশে একটা মৃত প্রজাপতি দেখলাম। তার ডানাগুলো ভেজা ছিল শিশিরে, অথচ মনে হচ্ছিল, ও বুঝি উড়তে উড়তেই ক্লান্ত হয়ে মারা গেছে। জানেন সারহাদ?
হঠাৎ নিজেকে ওই প্রজাপতিটার মতো মনে হলো। আমিও বোধহয় প্রতিদিন আপনার দিকে উড়তে উড়তে ভেতরে ভেতরে মরে যাচ্ছি। মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে নিজের হৃদয়টা ছিঁড়ে ফেলি। কারণ এই হৃদয়টা এখন আর আমার কথা শুনে না, বহু আগেই সেটা আপনার কৃষ্ণবর্ণ চোখের ভেতর হারিয়ে গেছে”
ধীরে ধীরে সারহাদ শেষ পাতাটায় এসে থামে,
“ইউ নো সারহাদ, আজ আয়ান আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল,
–” কল্পবাসিনী, আপনি কি আমাকে পেয়ে সুখী?”
জানেন, তার প্রশ্ন শুনে আমি হেসে দিলাম, খুব সুন্দর করে হাসলাম। কেননা, নারীরা কাঁদতে কাঁদতেও হাসতে জানে। আয়ান আমার সেই হাসি দেখে ভীষণ খুশি হয়ে গেল। কিন্তু জানেন সারহাদ, ওই মুহূর্তে আমার বুকের ভেতরটা এমন ব্যথা করছিল যেন কেউ ধীরে ধীরে ছুরি চালাচ্ছে। সুখী?
মানুষ কি সত্যিই সুখী হতে পারে, যখন তার আত্মা অন্য কারও কাছে বন্দি থাকে?
কী ভয়ংকর সত্য তাই না?
একজন মানুষ আমাকে নিঃশর্ত ভালোবাসছে,
আর আমি প্রতিদিন নিঃশব্দে তাকে প্রতারণা করে যাচ্ছি। আল্লাহ হয়তো কোনোদিন আমাকে ক্ষমা করবেন না। এই ভয়ে, অনেকবার চেষ্টা করেছিলাম আপনাকে ভুলে থাকতে। নিজের সব পুরোনো ছবি পুড়িয়ে ফেলেছি, আপনার নাম লেখা কাগজগুলো ছিঁড়ে ফেলেছি। এমনকি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে শপথ করিয়েছি,
‘আজ থেকে সারহাদ বলে কেউ আর আমার জীবনে নেই’
কিন্তু জানেন, রাত খুব নিষ্ঠুর জিনিস। দিনের সমস্ত অভিনয় সে খুলে দেয়। এই নিস্তব্ধ রাতেই আকাশের দিকে তাকিয়ে মাঝে মাঝে ভাবি, এই একই আকাশের নিচে আপনিও কি কোথাও জেগে আছেন?
আপনারও কি কখনো আমার কথা মনে পড়ে?
তারপর নিজের প্রশ্ন শুনেই হেসে ফেলি। কেননা আমি খুব ভালো করেই জানি, আমি আপনার গল্পের গুরুত্বপূর্ণ কোনো চরিত্র ছিলাম না। আমি ছিলাম কেবল একতরফা ভালোবাসার এক নীরব কবর…যেখানে প্রতিদিন আমি নিজেই নিজেকে দাফন করেছি”
ডায়েরির শেষ পাতাটা পড়ার পর সারহাদ আর কোনো শব্দ খুঁজে পেল না। তার চারপাশটা কেমন নিঃশব্দ হয়ে গেল। না, শুধু নিঃশব্দ না, মনে হচ্ছিল পুরো পৃথিবীটাই যেন হঠাৎ থেমে গেছে। দূরে কোথাও মেঘ গর্জে উঠছিল ক্ষীণস্বরে। কবরস্থানের পুরোনো গাছগুলো মাথা নত করে দাঁড়িয়ে ছিল ঠিক শোকাহত মানুষের মতো। অথচ এই সমস্ত কিছুর মধ্যেও সারহাদের কানে যেন কিছুই পৌঁছাচ্ছিল না। সে স্থির হয়ে বসে আছে, হাতে ধরা কালো মলাটের ডায়েরিটা এখনো খোলা। সারহাদ চোখ বন্ধ করে ফেলে। তার মাথার ভিতর কেমন শূন্যতা ঘুরপাক খাচ্ছে। মনে হচ্ছে রিয়ানার লেখা প্রতিটা শব্দ ধারালো কাঁচের টুকরোর মতো এসে বিঁধছে তার ভিতরে।একটা মৃত নারী, যাকে সে কখনো নিজের করে চায়নি, যাকে সে কখনো আশাও দেয়নি, সেই নারীটা নিজের সমস্ত অস্তিত্ব নিঃশেষ করে তাকে ভালোবেসেছিল। কেন?
কেন এতটা?
সারহাদ নিজের অজান্তেই একটা দীর্ঘ, ভারী নিঃশ্বাস ফেলল। তারপর হঠাৎই সে অনুভব করল, টুপ করে একফোঁটা উষ্ণ জল পড়েছে ডায়েরির পাতার উপর। সারহাদ থমকে গেল। কিছুক্ষণ সে বোঝারই চেষ্টা করল না। তারপর ধীরে ধীরে হাত তুলে নিজের চোখ ছুঁতেই টের পেল, তার চোখ ভিজে গেছে। অশ্রুটা তার চোখ থেকেই পড়েছে। সারহাদ হতবাক হয়ে রইল। কত বছর পরে সে তার সানাম ছাড়া অন্য কারো জন্য কাঁদল। আদৌ কখনো অন্য কারো জন্য কেঁদেছিল কি?
তার তো মনে পড়ে না। সে তো বরাবরই নিজেকে পাথর বানিয়ে রেখেছে। তাহলে?
সে ডায়েরিটা বন্ধ করে। কিয়ৎকাল নিঃশব্দে বসে থাকে। মাথার ভিতর কেমন বিশৃঙ্খলা ঘুরপাক খাচ্ছে। রিয়ানার প্রতিটা লেখা, প্রতিটা স্বীকারোক্তি, প্রতিটা অপূর্ণ ভালোবাসা যেন তার নিঃশ্বাস বন্ধ করে দিচ্ছে।
সারহাদ হঠাৎ উঠে দাঁড়ায়, তার পা দুটো ভারী হয়ে এসেছে। তবুও ধীরে ধীরে হাঁটতে লাগল রিয়ানার কবরের দিকে। একদম কবরটার সামনে গিয়ে থেমে গেল সে। সামনে সাদা পাথরের ফলক,
“রিয়ানা জাওয়ান”
নামটার দিকে কিছুক্ষণ স্থির তাকিয়ে থাকল সারহাদ। তারপর খুব নিচু স্বরে বলে উঠে,
–“কেন করলেন এমনটা?”
ফাঁকা কবরস্থানে তার প্রশ্নের বিপরীতে নীরবতা ছাড়া আর কিছু ভেসে এলো না। আসবে না, তা সারহাদও জানে। তাই তার ঠোঁটে একটা মৃদু হাসি খেলে গেল, তবে সেই হাসিতে কোনো প্রাণ ছিল না, ছিল শুধু ক্লান্তি। একটা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে ফের বিড়বিড়ায়,
–“আমি তো শুরু থেকেই নিজেকে ক্লিয়ার রেখেছিলাম, রিয়ানা…একদম শুরু থেকেই। আমি তো আপনাকে কখনো স্বপ্ন দেখাইনি, কখনো বলিনি যে “আপনাকে চাই”। বরং প্রতিটা মুহূর্তে দূরে সরিয়েছি। বলেছি, সারহাদের জীবনে একজনই আছে,
“আমার সানাম…” বাকি সব মিথ্যা”
সারহাদ চোখ বন্ধ করে ফেলে। সঙ্গে সঙ্গে সানার মুখটা ভেসে ওঠে চোখের সামনে। তারপর আবার রিয়ানার ডায়েরির লাইনগুলো,
“আপনি এক সুন্দর নিষ্ঠুর অভিশাপ”
সারহাদ সাথে সাথে চোখজোড়া খুলে ফেলে। মাথাটাকে সামান্য নিচু করে আবারও বলে,
–“তাহলে কেন এতটা ডুবলেন আমার মাঝে? কেন নিজেকে শেষ করে দিলেন? কেন থামলেন না?
আমি তো আপনার চোখের ভাষা বুঝেছিলাম, রিয়ানা। অনেক আগেই বুঝেছিলাম, সেই জন্যই তো আপনাকে থেমে যেতে বলেছিলাম। কারণ আমি জানতাম, এই পথের শেষে শুধু ধ্বংস আছে”
সে কবরটার দিকে তাকিয়ে প্রায় ফিসফিস করে বলে,
–“আপনি তো জানতেন… আমি কোনোদিনও আপনার হবো না। তাহলে কেন আমাকে এমন এক আফসোসের ভিতর ফেলে গেলেন?”
হঠাৎ সারহাদের পাশ দিয়ে বাতাসটা একটু জোরে বয়ে গেল। কবরের উপর পড়ে থাকা শুকনো ফুলগুলো উড়ে গিয়ে ছড়িয়ে পড়ল চারপাশে। সারহাদের চোখ দুটো ইতিমধ্যে লাল হয়ে উঠেছে। সে ধীরে ধীরে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে কবরটার সামনে। তারপর খুব নিচু, ভাঙা গলায় বলে ওঠে,
–“ক্ষমা করবেন আমাকে, হয়তো আমি আরেকটু কোমল হতে পারতাম, হয়তো আপনার চোখের কষ্টগুলোকে এতটা অবহেলা করা উচিত হয়নি, হয়তো আপনাকে আরো কঠিনভাবে দূরে ঠেলে দেওয়া উচিত ছিল, তাহলে আজ এই কবরটার সামনে দাঁড়াতে হতো না। বাট টাস্ট মি, আপনার প্রতি আমার প্রেম ছিল না, রিয়ানা, কিন্তু সম্মান ছিল। আপনি আমাকে নিজের কাছে এতটা অপরাধী বানিয়ে দিলেন যে ক্ষমা চাইলেও কম মনে হবে। তবে দুঃখিত, চমি আপনাকে ভালোবাসতে পারি নি, পারছি না, হয়তো পারবও না”
সারহাদ মাথা নিচু করে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। হাতে ধরা ডায়েরিটাকে শক্ত করে চেপে ধরে। এই মুহূর্তে তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসছে মনে হচ্ছে চারপাশটা কেমন দমবন্ধ লাগছে, এই কবরস্থান, এই আকাশ, এই বাতাস, এই স্মৃতি সবকিছু। সে ধীরে ধীরে উল্টো দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে ফাঁকা দৃষ্টিতে সামনে তাকিয়ে খুব নিচু স্বরে আওড়ায়,
–“আজ রাতেই সবকিছুর শেষ হবে”
বাক্যটা বলেই আর এক মুহূর্ত বিলম্ব না করে সে হাঁটতে শুরু করে। কবরস্থানের বিশাল লোহার ফটকটা ঠেলে বাইরে বেরিয়ে গেল সারহাদ। আর পেছনে পড়ে রইল রিয়ানার কবর, ঝরে পড়া শিউলি ফুল, আর একতরফা ভালোবাসার নিঃশব্দ সমাধি।
হাসপাতালের সেই ব্যক্তিগত কক্ষটা যেন বাইরের পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন এক ছোট্ট প্রশান্তির দ্বীপ হয়ে উঠেছে দুই কপোত-কপোতীর জন্য। দুধসাদা দেয়ালজুড়ে নরম আলো পড়ে কক্ষটাকে আরও শান্ত, আরও কোমল করে তুলেছে। জানালার ভারী পর্দাগুলো অর্ধেক সরানো। বাইরে মেঘলা আকাশের আলো কাচ ভেদ করে ভেতরে এসে পড়ছে। দূরে কোথাও বৃষ্টি হয়েছে হয়তো, কারণ বাতাসে হালকা ভিজে মাটির সোঁদা গন্ধ মিশে ভেসে আসছে। এসির শীতল বাতাসে সানার খোলা চুলের গোছা বারবার উড়ে এসে গাল ছুঁয়ে যাচ্ছিল। রমণী বিছানার উপর আধশোয়া হয়ে বসে আছে। তার ঠোঁটের কোণে লজ্জিত হাসি।
আর ঠিক তার পাশেই বসে আছে আরজে। চোখেমুখে এমন উচ্ছ্বাস যেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ধন সে আজ নিজের হাতে পেয়েছে। বারবার সে সানার উদরের দিকে তাকাচ্ছে। সেখানটায় ছুঁয়ে কানপেতে শুনছে। আর সামনে বসা রমণী আরজের এমন কর্মকান্ড দেখেই মিটমিটিয়ে হাসছে। সানার ভাবনার মধ্যেই কানে আসে আরজের কণ্ঠস্বর,
–“ওয়াইফি… ক্যান ইউ ইম্যাজিন, আওয়ার বেবি ইজ হিয়ার নাউ….”
বলেই সে আবার নিচু হয়ে সানার পেটের কাছে কান নিয়ে গম্ভীর গলায় বলে ওঠে,
–“লিটল প্রিন্সেস, ডোন্ট ওরি। ইউর পাপা ইজ অলরেডি রিচ অ্যান্ড হ্যান্ডসাম। তুমি শুধু বলবে….”
সানা সঙ্গে সঙ্গে তার কথা কেটে বলে ওঠে,
–“আপনি আবার শুরু করেছেন?”
আরজে কিয়ৎকাল সানার দিকে তাকিয়ে চুপ করে থাকল। সানা নিজেও বুঝল না এই নীরবতার মানে। সে ভ্রু কুঞ্চিত করে কিছু বলার আগেই আরজে ধীরে ধীরে সানার হাতটা নিজের হাতে নিয়ে ফিসফিস করে বলে,
–“ইউ নো ওয়াইফি… আমি যখন ঐ বদ্ধ, অন্ধকার সেলে বন্দী থাকতাম, তখন কখনো ভাবিনি আমারও এমন একটা পরিবার হবে। তুমি, রিশ, আমাদের বেবি…..”
বলতে বলতে তার কণ্ঠটা কেমন ভারী হয়ে আসে। বিপরীতে রমণীও মৃদু হেসে তার গালে হাত রেখে কিছু বলার পূর্বেই শব্দ করে দরজা খুলে যায়। হঠাৎ দরজা খুলে যাওয়ার শব্দে দুজনেই পিছনে তাকায়। নজরে আসে, দরজা ঠেলে ভিতরে প্রবেশ করে এসপি। আর তার পিছন পিছন প্রায় দৌড়ে ঢুকে আসে সানিতা। রমণীর ফর্সা আদলটা কেমন ফ্যাকাশে হয়ে আছে, সাথে চোখ মুখ কান্নায় ফুলে আছে, চুল এলোমেলো। সে ভিতরে ঢুকেই হাঁপাতে হাঁপাতে বলে ওঠে,
–“সানা সিস….”
তার আতঙ্কিত গলার স্বর এমন যেন পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর কিছু ঘটে গেছে। মূলত সানা অজ্ঞান হয়ে গেছে শুনেই সে একরকম কান্নাকাটি করে এসপির সাথে চলে এসেছে। এসপি ব্ল্যাক ম্যানশনে গিয়েছিল কিয়ান আর কিয়ারাকে রাখতে। আর তখনই সানিতা শোনার পর তার এই অবস্থা। সে যেভাবেই হোক তার সানা সিসকে দেখবে। এসপি প্রথমে একদমই রাজি ছিল না। কিন্তু নিজের বউয়ের কান্না আর জেদ সহ্য করতে না পেরে শেষমেশ নিয়ে আসতেই হয়েছে। তবে আসার সময় ছোট্ট সিরাতকে সঙ্গে আনেনি। ঈশানীর কাছে রেখে এসেছে। বাচ্চা মেয়েটা এমনিতেই দুর্বল। তারউপর এত যানযটে জার্নি করানো ঠিক হবে না। আরভিও ঈশানীর কাছেই আছে। অবশ্য তাকে কিছু বলা হয়নু সানার ব্যাপারে। নাহয় হয়তো সেও চলে আসতো।
এদিকে এসপিকে দেখার সাথে সাথে আরজের এতক্ষণকার হাসিখুশি মুখটা মুহূর্তে গম্ভীর হয়ে গেল। যেন কেউ তার আনন্দের উপর এক বালতি ঠাণ্ডা পানি ঢেলে দিয়েছে। সানিতা অবশ্য কিছুই টের পেল না। সে মুখে বিশাল হাসি টেনে হাত নাড়তে নাড়তে বলল,
–“হ্যালো আরজে….”
কথাটা অত্যন্ত স্বাভাবিক হলেও তা শেষ হওয়ার আগেই পিছন থেকে এসপি দাঁত কিরমির করে চিবিয়ে চিবিয়ে বলে উঠে,
–“যা না, গিয়ে কোলে গিয়ে একদম বসে পড়”
ব্যাস, সানিতার মুখটা মুহূর্তেই ফাটা বেলুনের মতো চুপসে গেল। ঠোঁটের হাসিটাও মিলিয়ে গেল নিমিষেই। সে আজও আরজের বিশাল বড় ফ্যান। এক বাড়িতে থাকা সত্ত্বেও আজ পর্যন্ত একটা ঠিকঠাক অটোগ্রাফ পর্যন্ত নিতে পারেনি শুধুমাত্র এই লোকের জন্য। যে তাকে আরজের ধারেকাছেও ঘেঁষতে দেয় না। এদিকে আরজেও এমন ভাব করল যেন এসপি বলে কোনো প্রাণী পৃথিবীতে অস্তিত্বই রাখে না। সে নির্বিকারভাবে সামনে তাকিয়ে বসে রইল। বিপরীতে এসপিও তাকে বিশেষ পাত্তা দিল না। সোজা হেঁটে এসে সানার পাশে রাখা চেয়ারটায় বসতে যাবে তার আগেই আরজে বিদ্যুৎগতিতে উঠে গিয়ে ‘ধপ’ করে সেই চেয়ারে বসে পড়ল। আচমকা এমন হওয়াতে এসপি থমকে গেল। সে এমন কিছু মোটেও আশা করেনি। তারপর ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে আরজের দিকে তাকায়। নজরে আসে আরজে নির্বিকার চিত্তে ঠোঁটের কোণে ক্রুর হাসি ঝুলিয়ে উল্টো পা তুলে আরাম করে বসে পড়েছে।
এসপি নিজেকে যথেষ্ট সংবরণ করে এবার বেডের একপাশে বসতে যাবে। তার আগেই আরজে আবার নিজের পা তুলে সেই জায়গাটাও দখল করে নিল। এবার এসপির রাগ যেন সপ্তাকাশ ছুঁয়ে ফেলল। চোয়াল শক্ত হয়ে উঠে ডার। কয়েক সেকেন্ড সে শুধু আরজের দিকে রক্তচক্ষুতে তাকিয়ে রইল। কিন্তু বিপরীতে মানব একদম নিরেট, নির্বিকার যেম কিছুই হয়নি। এসপি একপলক সানা আর সানিতার দিকে তাকিয়ে গভীর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে এসে দাঁড়াল সানার পায়ের কাছে।
এদিকে সানিতা দ্রুত উল্টো পাশে গিয়ে বসে পড়ল আরজের বিপরীত পাশে। সাথে সাথেই শুরু করে দিল রমণীর প্রশ্নবাণ,
–“সানা সিস তুমি ঠিক আছো তো?”
কি হয়েছিল?”
কিভাবে পড়ে গেলে?
ডক্টর কি বলেছে?
তোমার মাথা ঘুরছে?”
সানা তার বিচলিত প্রশ্নের বিপরীতে হেসে তাকে শান্ত করতে লাগল। এক এক করে সব প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে। অন্য দিকে আরজে আর এসপির মধ্যে চলছে চোখে চোখে নীরব যুদ্ধ। দুজনেই এমনভাবে তাকিয়ে আছে যেন সুযোগ পেলেই একে অপরকে গিলে খাবে।
আরজে পাশের টেবিল থেকে একটা আপেল তুলে নিল। তারপর এসপির দিকে তাকিয়ে এমনভাবে কামড় বসিয়ে চিবোচ্ছে যেন আপেল না, এসপিকেই চিবুচ্ছে।
এসপি ঠাণ্ডা চোখে তাকিয়ে রইল। তারপর সানার পায়ের কাছে রাখা একটা জুসের বোতল তুলে নিয়ে মুখে দিল। ঠিক তখনই তার কানে আসে সানার হালকা হেসে সানিতাকে বলা বাক্যটা,
–“আই এম প্রেগন্যান্ট”
ব্যাস! পরমুহূর্তেই ‘বুহহহহহ…” সবেমাত্র দেওয়া এসপির মুখভর্তি জুস সোজা ফোয়ারা হয়ে বেরিয়ে এলো। তার কিছু অংশ গিয়ে সরাসরি পড়ল সানার বেডের উপর রাখা আরজের পায়ের উপর। দুই সেকেন্ড, পুরো রুম একেবারে নিস্তব্ধ। তারপর আরজে নিজের পায়ের দিকে তাকিয়ে মুখটা ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে ওঠে। তার টগবগ করে ওঠা মস্তিষ্ক যেন মুহূর্তে দাবানলে পরিণত হলো। সে হাত মুষ্টিবদ্ধ করে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। সে এক কদম এগিয়েও গেল এসপির দিকে। কিন্তু ঠিক তখনই এসপির বিস্মিত গলা ভেসে এলো,
–“কিহহহ”
সে এমনভাবে চিৎকার করল যেন পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য দেখে ফেলেছে। তারপর আরজের দিকে আঙুল তুলে চরম অপমানিত ভঙ্গিতে বলে উঠে,
–“এই জাওরা সেকেন্ড বারও উইনার হতে যাচ্ছে। আর আমি বারো ভাতারি হয়েও পাঁচ বছরে সবে মাত্র একটা পয়দা করলাম?”
এসপির বলা বাক্যটা শ্রবণ ইন্দ্রিয় হতেই আরজে ঠোঁট বাঁকিয়ে ফিসফিস করে,
–“সবাই আরজের মতো হার্ডওয়ার্কিং হয় না”
কথাটা আরজে ফিসফিস করে বললেও এসপি তা স্পষ্ট শুনতে পেয়েছে। সে এক পলক আড়চোখে আরজের দিকে তাকায়,
–“হার্ডওয়ার্কিং!!!!….”
অতঃপর মনে মনে ভাবলো, “না, আরজেকে এইবার জিততে দেওয়া যাবে মা। নাহয় এই জাওরা তাকে প্রতি পদে পদে খোঁচাবে” এই ভেবে এসপি সানিতার দিকে তাকিয়ে বলে,
–“সানি চল”
–“কোথায়?”
–“আমি এই জাওরার আগে বাবা হব। তাই এখন থেকেই প্রসেসিং শুরু করতে হবে। কটকটি ঠিক বলেছি কিনা বল?”
সানিতা মুহূর্তে চোখ বড় বড় করে ফেলল। তার মুখও লজ্জায় লাল হয়ে উঠেছে। পর মুহূর্তে সানিতার মুখটা শক্ত হয়ে গেল। তার ইচ্ছা করছে, এই মুহূর্তে যদি তার হাতে কিছু থাকত, সে সেটা ছুড়ে মেরে এসপির মাথা ফাটিয়ে দিত। তার প্রবল ইচ্ছা করছে সানার মগে এসপির কানের নিচে এমন এক থাপ্পড় বসাতে যেন সে সোজা গিয়ে আইসিইউতে ভর্তি হয়।
আরজে এসপির বিপরীতে কিছু বলতে যাবে তার আগেই সানার রক্তচক্ষুর দিকে তাকিয়ে থেমে গেল। তারপরও নিচু গলায় বিড়বিড়ায়,
–“একজন আছে, যে নিজে বাপ হতে না পেরে অন্যের বউয়ের পিছনে লাগে”
এসপি সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যুত্তর করে,
–“আর একজন আছে, যে নিজের বউ নিয়া এত ইনসিকিউর যে পাশে দাঁড়াইলেও হার্টবিট বেড়ে যায়”
আরজে নিজের দন্ত চেপে আওড়ায়,
–“শালা এক গুলিতে তোর হার্টটাই আমি বন্ধ করে দেব”
এদিকে সানা এবার ভীষণ বিরক্ত হয়ে দুজনের দিকেই তাকাল। এদের দুজনের যে কী সমস্যা সে আজ পর্যন্ত বুঝে উঠতে পারেনি। রমণী নিজের দন্ত পাটি পিষে খেঁকিয়ে উঠে,
–“আপনারা দুজন কি বেরুবেন, নাকি আমি দুজনের কানের নিচে এমন বাজান বাজাবো, বাচ্চা হওয়ার আগ পর্যন্ত বাজতেই থাবকে”
বিপরীতে দুই মানব কিছু পলের জন্য থেমে তার দিকে তাকাল। পর মুহূর্তে এসপি কিছু একটা ভেবে সানার পাশে বসতে বসতে বলে,
–“পেস্ট্রি শুন, আমি ভাবছি কী…..”
এসপি নিজের বাক্যটুকুও সম্পন্ন করতে পারল না। কেননা আরজের আর এক সেকেন্ডও সহ্য হলো না। সে তড়াক করে উঠে দাঁড়িয়ে কেউ কিছু বুঝে উঠার আগেই এক টানে সানাকে কোলে তুলে নিল। রমণী চমকে ওঠে,
–“আরে, আরে, পাগল নাকি, কি করছেন?”
আরজে তার বিপক্ষে কিছুই বলার প্রয়োজন বোধ করল না। সে চোয়াল শক্ত করে ভারী ভারী কদম ফেলে বাইরে চলে গেল। তারা বেরুতেই এসপি হো হো করে হেসে সানিতার দিকে তাকিয়ে বলে,
–“সানি, দেখছিস? এই জাওরা কতটা জেলাস?”
সানিতা এসপির দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে দুষ্ট হাসি ফুটিয়ে, চোখে মুখে উচ্ছ্বাস নিয়ে আওড়ায়,
–“একদম আমার ড্রিমবয়”
ব্যাস, সানিতার এই বাক্যটুকুই যথেষ্ট ছিল এসপির হাসি থামানোর জন্য। মুহুর্তে তার চোখে মুখে অন্ধকার নেমে এলো। সে হাত মুষ্টি বদ্ধ করে দাঁতে দাঁত চেপে রুক্ষ স্বরে হিসহিসিয়ে উঠে,
–“কী বললি খুশদিলের মাইয়া, আবার বল?”
এই বলে সে সামনে তাকাতেই দেখে সানিতা কথা উগড়ে দিয়েই দৌড়ে পালাচ্ছে। কেননা সে খুব ভালো মতেই জানে, এসপি এখন ক্ষ্যাপা ষাড়ের মতো রেগে যাবে। এসপিও তার পিছু যেতে যেতে হাঁক ছুঁড়ে,
–“সানির বাচ্চা দাঁড়া, তোর কলিজা কত বড় আমিও দেখতে চাই। কে তোর ড্রিম বয় আবার বলললল?”
সন্ধ্যাটার বুকে সেদিন এক অদ্ভুত বিষণ্নতা জমাট বেঁধে ছিল। পশ্চিম দিগন্তে সূর্যের শেষ রক্তিম আভাটুকু মিলিয়ে যাওয়ার বহুক্ষণ পরও আকাশ যেন সম্পূর্ণ রাত্রির কাছে আত্মসমর্পণ করতে পারছিল না। চারদিকে ঘন কালো মেঘের স্তর এমনভাবে জমে উঠেছিল, যেন প্রকৃতি নিজেই কোনো অশুভ পূর্বাভাস নিজের অন্তরে লুকিয়ে রেখেছে। দূরের বৃক্ষরাজির মাথাগুলো কালচে ছায়ার মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
এই গাঢ় অন্ধকারের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা সারহাদের “রোজ হাউস” যেন অন্য এক জগতের অংশ। পুরো বাড়িটার বহির্ভাগ ঝলমল করছে অগণিত সোনালি ফেরি লাইটে। গোলাপ গাছগুলোর চারপাশে জড়িয়ে দেওয়া ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আলোগুলোকে দূর থেকে দেখলে মনে হচ্ছে, রাত্রির বুকে হাজারো জোনাকি একসাথে আশ্রয় নিয়েছে। গোলাপের পাপড়িতে জমে থাকা শিশিরবিন্দুগুলো আলোয় চিকচিক করছিল, যেন কান্নাভেজা মুক্তো।
কিন্তু যতটা আলোকোজ্জ্বল রোজ হাউসের বাহির, তার অন্তরটা ঠিক ততটাই নিঃসঙ্গ, অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে আছে। ভিতরের বিশাল হলরুমে কোনো বাতি জ্বলছে না। জানালার ফাঁক গলে প্রবেশ করা সামান্য আলো মেঝের উপর দীর্ঘ ছায়া এঁকে দিচ্ছে। সেই আধো অন্ধকারে ধীরে ধীরে ভেসে উঠল এক দীর্ঘদেহী পুরুষের অবয়ব।
সেই অবয়বটা আর কেউ না সারহাদ। কালো ওভারকোটে মোড়ানো দেহটা যেন অন্ধকারের সাথেই মিশে গেছে। মাথায় কালো হ্যাটটা চোখের অনেকখানি ঢেকে রেখেছে। তবুও ছায়ার আড়াল থেকেও তার মুখের গভীর ক্লান্তি স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। যেন বহু রাত্রি ধরে না ঘুমানো এক মানব নিজের সমস্ত অনুভূতিকে কবর দিয়ে হাঁটছে। সারহাদ ধীরে ধীরে দরজার কাছে এসে থামে। তার হাত দরজার নব স্পর্শ করতেই হঠাৎ দৃষ্টি ঘুরে যায় পাশের টেবিলটার দিকে। সেখানে নিঃশব্দে পড়ে আছে কালো মলাটের সেই ডায়েরি। ডায়েরিটার উপর সোনালি অক্ষরে লেখা,
“মি আমর”
নামটা চোখে পড়তেই সারহাদের কয়েক মুহূর্ত সে স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল ডায়েরিটার দিকে। মনে হচ্ছে, নিস্তব্ধ ঘরটার প্রতিটি দেয়াল যেন রিয়ানার লেখা শব্দগুলো পুনরাবৃত্তি করছে।
“আমি শেষ নিশ্বাসের আগ পর্যন্ত এক শ্যাম পুরুষের অপেক্ষায় ছিলাম গো ধরণী…”
সারহাদের চোয়াল ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে ওঠে। আঙুলের গাঁট সাদা হয়ে আসে। অথচ সেই কঠোরতার আড়ালে কোথাও এক অসহ্য দহন জ্বলছিল। সে দরজাটা খুলে বাইরে বেরিয়ে যায়। বাহিরের শীতল বাতাস ওভারকোটের প্রান্ত উড়িয়ে দিল।
সারহাদ কয়েক কদম এগিয়ে গিয়েও থেমে যায়। তারপর হঠাৎ আবার ফিরে তাকায় রোজ হাউসের দিকে। কয়েক সেকেন্ড স্থির দাঁড়িয়ে থাকার পর ধীরে ধীরে আবার ভিতরে প্রবেশ করে। পুরো হলরুমটা তখনও একইরকম নিস্তব্ধ। ফেরি লাইটের ক্ষীণ আলো জানালার কাঁচ ভেদ করে মেঝেতে পড়ছে। সেই আলোয় টেবিলের উপর পড়ে থাকা ডায়েরিটা আরও বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। সারহাদ এবার ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে। তার দৃষ্টি স্থির হয়ে থাকে কালো মলাটটার উপর। মনে হচ্ছিল, ওই ডায়েরির প্রতিটি পৃষ্ঠা তার বিরুদ্ধে হাজারো অভিযোগ জমা করে রেখেছে। কিছুক্ষণ পর সে ডায়েরিটা তুলে নেয়। তারপর অন্য হাতটা ধীরে ধীরে পিছনে যায়।
হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৩০ (৪)
ওভারকোটের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে কালো ধাতব বস্তুটা। অন্ধকার আলোতে বন্দুকটার ঠান্ডা ধাতব অংশ চিকচিক করে ওঠে। সারহাদ নির্বিকার মুখে সেটাকে কোমরের পিছনে গুঁজে রাখে। এক হাতে শক্ত করে চেপে ধরে ডায়েরিটা। তারপর আর একবারও পিছনে না তাকিয়ে ধীরে ধীরে বেরিয়ে যায় রোজ হাউসের বাহিরে। দূরের ফেরি লাইটগুলো তখনও জ্বলছিল। আর এদিকে কালো ওভারকোটে মোড়ানো মানুষটা ধীরে ধীরে ম্যানশনের ঘন অন্ধকারে মিলিয়ে যাচ্ছে যেন রাত্রি নিজেই তাকে গিলে ফেলছে।
