হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৬
সাবা খান
ধীরে ধীরে রাত আরও গভীরে হারিয়ে যাচ্ছে। অরোরা গ্র্যান্ড পাভিলিয়ন যেন এখন পুরোপুরি জেগে উঠেছে। পাভিলিয়নের ভেতর তখনও আলো, সংগীত আর মানুষের কোলাহলে মুখর। ভেন্যুর ভেতরে সুরেলা জ্যাজ মিউজিক ধীরে ধীরে ভেসে বেড়াচ্ছে। নরম আলো আর ঝলমলে ঝাড়বাতির নিচে সারা হলজুড়ে মানুষের চলাচল, কেউ ব্যবসায়িক আলোচনা করছে, কেউ হাসাহাসি করছে, কেউ আবার ককটেল হাতে দাঁড়িয়ে গল্পে মেতে আছে। দূরে র্যাম্পের পাশে ক্যামেরার ফ্ল্যাশ একটার পর একটা জ্বলছে। চারপাশে ভেসে আসছে দামি পারফিউমের গন্ধ, সাথে ওয়াইনের মৃদু সুগন্ধ।
খোলা বারের সামনে দাঁড়িয়ে বারটেন্ডাররা একের পর এক গ্লাসে ঢালছে ওয়াইন। ফ্যাশন উইকের প্রথম দিনের উচ্ছ্বাসে পুরো বিল্ডিং যেন এক জীবন্ত শহর। কিন্তু এই সব কোলাহলের মাঝেও যেন একটা জায়গা সম্পূর্ণ স্থির। ভিআইপি বারের সেই কর্নার সোফা। যেখানে বসে আছে আরজে। তার হাতে এখনো রেড ওয়াইনের গ্লাস। তার দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে সামনে। যেখানে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে আছে সেই রমণী ‘সানা’ সে কারও সাথে কথা বলছে আর হালকা হাসছে। তার সামনে দাঁড়ানো লোকগুলোর মুখ আরজের দিক থেকে দেখা যাচ্ছে না, তারা উল্টো ফিরে আছে, কিন্তু সানার মুখ পরিষ্কার। আর সেই হাসি, যেই হাসি একসময় আরজের পৃথিবী ছিল।
আজ তার গায়ে একটা লং ব্ল্যাক গাউন। কোমরের কাছে ফিটেড কাটিং, গাউনের উপর একটা স্টাইলিশ লং ব্ল্যাক কোট।চুলগুলো ঢেউ খেলানো ভাবে পিঠের উপর পড়ে আছে। চোখে গভীর কাজল, ঠোঁটে গাঢ় লাল। আর সেই হাসি, যেটা দেখে আরজের মনে হচ্ছে সময় থেমে গেছে। তার ঠোঁট নড়ল খুব আস্তে,
-“ওয়াইফি…”
অন্য দিকে সানা ঈশানী ও এসপির সাথে হাসাহাসি করছে। ঈশানী ভুলে নিজের একসাইডের চুল কার্ল করেছে আরেক সাইড তাড়াতাড়ির জন্য করতে ভুলে গিয়েছে। এভাবেই তাদের ভ্যালি থেকে শহরে আসতে লেট হয়ে গেছে। সানা আর কিছু না পারুক সাজগোজ করতে পারে। তাই ঈশানী কখন থেকে সানাকে টানছে তার সাথে রুমে যেতে সে ঠিক করবে। কিন্তু সানা আর এসপি তার মজা উড়াতে ব্যস্ত।
আরজে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। যেন চোখ সরালে মানুষটা আবার হারিয়ে যাবে। ঠিক তখনই পাশে এসে দাঁড়ায় কাইলিন। যাকে আরজে কিছুক্ষণ আগে সব খবর নিতে পাঠিয়েছে। সে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে বলে,
-“বস…”
আরজে দৃষ্টি না সরিয়েই প্রত্যুত্তর করে,
-“বলো”
-“সামনে যে মেয়েটা দাঁড়িয়ে আছে…”
জিহবা খসে বাকি বাক্য টুকু বের হওয়ার আগেই সে থেমে গেল আরজের র*ক্তচক্ষু দেখে। কাইলিন তাড়াতাড়ি কথাটা বদলে ফেলল,
-“ম্যাম… ম্যাম ভেলোরার একজন ডিজাইনার”
আরজের তরফ থেকে এবার আর কোন শব্দ এলো না। কাইলিন ফের বলে,
-“ভেলোরা একটা ছোট কোম্পানি, বস। এই ফ্যাশন উইকে তাদের ডিজাইন ষষ্ঠ দিনে দেখানো হবে।”
সে একটু থেমে আরজের দিকে তাকায় যে এখনো চোয়াল শক্ত করে সামনে তাকিয়ে আছে। কাইলিন বলতে থাকে,
-“ম্যামের নাম এখানে সুনেহনা খানম”
আরজের আঙুলের ফাঁকে ধরা গ্লাসটা সামান্য শক্ত হয়ে উঠে,
-“তিনি মিসেস দিলরুবা খানমের মেয়ে। পাঁচ বছর আগে ভেলোরা জয়েন করেছেন। আমরা যতটা খুঁজেছি তার সাথে সানা ম্যামের কোনো মিল পাইনি। কোনো রেকর্ড নেই, কোনো পুরনো ইতিহাস নেই, সবকিছু এমনভাবে সাজানো যেন সে সবসময় বিদেশেই ছিল”
আরজের নয়ন যুগল এখনো সামনে স্থির, তার সামনের রমণী তখনও হাসছে। কাউকে কিছু বোঝাচ্ছে হাত নেড়ে।
কাইলিন আবার বলে,
-“পাঁচ বছর আগে সে চায়নাতে এসেছে নিজের মা দিলরুবা খানমের সাথে। আর একটা অদ্ভুত ব্যাপার আছে বস। মিসেস দিলরুবা খানমের নিজের কোম্পানি ‘জাইফেরা’ বিশ্বের বড় ফ্যাশন হাউসগুলোর একটা। কিন্তু তার মেয়ে সেটা জয়েন না করে…ভেলোরার মতো ছোট একটা কোম্পানি জয়েন করেছে”
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা নেমে এলো দুজনের মধ্যে। তারপর আরজের ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে একটা রহস্যময় হাসি ফুটে উঠে। সে গ্লাসটা টেবিলে রেখে ধীরে ধীরে বলে,
-“ইন্টারেস্টিং…জাইফেরার মতো সাম্রাজ্য থাকতে…মেয়ে ভেলোরায় কাজ করছে?”
সে হালকা মাথা কাত করে কাইলিনের দিকে তাকায়,
-“তুমি এটা বিশ্বাস করো?”
-“না বস”
আরজের ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি খেলে গেল। সে আবার ও সানার দিকে তাকায়। তার চোখ তখন অদ্ভুত ভাবে জ্বলছে, দাত খিঁচিয়ে বলে,
-“গল্পটা খুব সুন্দর বানানো হয়েছে, নাম বদলেছে, ইতিহাস বদলেছে, পুরো জীবনটাই বদলে ফেলেছে”
তার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে অন্ধকার হাসি ফুটে উঠে। রুক্ষ স্বরে হিসহিসিয়ে আওড়ায়,
-“খুব সুন্দর, খুব চালাক হয়েছ তুমি…ওয়াইফি। ওয়েল ডান, ওয়াইফি। হোয়াট আ গেম, যেটা তুমি শুরু করেছ। কিন্তু শেষটা…”
সে গ্লাস তুলে এক চুমুকে সবটা গলায় ঢেলে শব্দ করে গ্লাসটা রেখে ফিসফিস করে বলে,
-“শেষটা আমি লিখব, ওয়াইফি”
এই বলে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল আরজে। তার চোখ এখনও স্থির সামনে সানার উপর।। যেন চারপাশের সব শব্দ তার কানে পৌঁছাচ্ছে না। তার কাছে শুধু সেই একটাই দৃশ্য সানা দাঁড়িয়ে আছে, কারও সাথে কথা বলছে, মাঝে মাঝে হাসছে, আরজে এক পা এগোল।
তার চোখের দৃষ্টি এতটাই তীক্ষ্ণ যে মনে হচ্ছে সে এই মুহূর্তে পৃথিবীর আর কিছুই দেখছে না। সে নিজের মনে খুব নিচু স্বরে বলে,
-“এবার কোথায় পালাবে… ওয়াইফি?”
সে বার থেকে বেরুতেই হঠাৎ চারদিক থেকে কয়েকজন বড় বড় স্পন্সর আর বিজনেসম্যান এগিয়ে এল,
-“মিস্টার আরজে”
-“স্যার, প্লেজার টু মিট ইউ”
-“ইয়োর ব্র্যান্ড কোলাবোরেশন..”
-“জাস্ট আ মিনিট প্লিজ”
এক মুহূর্তের মধ্যেই তারা আরজেকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। কেউ হাত বাড়িয়ে হ্যান্ডশেক করতে চাইছে। কেউ ব্যবসার প্রস্তাব দিচ্ছে। কেউ তার সাথে দুই মিনিট কথা বলার সুযোগ চাইছে। আরজের কপাল ধীরে ধীরে কুঁচকে গেল। তার চোখে বিরক্তির ছায়া। সে একবারও তাদের দিকে ঠিকমতো তাকাল না।
তার দৃষ্টি এখনও সেদিকেই, যেখানে সানা দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু সেই ভিড়ের জন্য সে ঠিকভাবে দেখতে পাচ্ছে না। সে ঠান্ডা গলায় বলে,
-“মুভ”
কেউ হয়তো বুঝল না তাই আরেকজন আবার বলতে শুরু করল,
-“স্যার, জাস্ট টু মিনিটস…”
তার কথা শেষ হওয়ার আগেই আরজের গার্ডরা দ্রুত এগিয়ে এল,
-“প্লিজ স্টেপ ব্যাক”
-“মেক ওয়ে”
-“ব্যাক অফ”
তারা একে একে সবাইকে সরিয়ে দিতে শুরু করল। কেউ বিরক্ত হয়ে তাকাল। কেউ অসন্তুষ্ট মুখে সরে গেল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পথটা ফাঁকা হয়ে গেল। আরজে এক মুহূর্তও নষ্ট না করে সামনে এগিয়ে গেল।
তার চোখ সোজা সেই জায়গায় কিন্তু সে থেমে গেল। কারণ সেখানে কেউ নেই, সানা নেই। মুহূর্তে তার চোখের দৃষ্টি বদলে গেল। তড়িৎ গতিতে চারদিকে তাকাল, সামনে পিছনে, ডানে, বামে কোথাও নেই।নসে নিচু গলায় বলে,
-“ইম্পসিবল, কয়েক সেকেন্ড আগেও তো এখানেই ছিল”
তার চোখ দ্রুত চারপাশ স্ক্যান করতে লাগল,
মানুষের ভিড়, আলো সব আছে কিন্তু সানার কোনো চিহ্ন নেই। তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠে।
কানে লাগানো ইয়ারপিসে মুহূর্তে আদেশ ছুঁড়ে,
-“জ্যাক…”
ওপাশ থেকে সাথে সাথে জ্যাকের কণ্ঠ ভেসে এল,
-“ইয়েস বস”
-“ফাইন্ড হার, রাইট নাউ….”
-“ওকে বস”
এদিকে আরজে নিজেও দাঁড়িয়ে নেই, সে হাঁটতে শুরু করে। তার চোখ প্রতিটা মুখ স্ক্যান করছে। হঠাৎ সে হালকা হেসে ফেলল, একটা অন্ধকার হাসি,
-“খেলা খেলতে খুব ভালো লাগে তোমার? ঠিক আছে। রান…..”
তারপর ফিসফিস করে যোগ করে,
-“দেখি কতদূর পালাতে পারো”
ভেন্যুর সামনে তখনও আলো, ক্যামেরা আর মানুষের ভিড়ে চারদিক মুখর। বিশাল সেই হলঘরের ভেতরে ঢুকতেই চারদিকে ঝলমলে আলো, কাঁচের ঝাড়বাতির নিচে সাজানো অতিথিরা। ঠিক তখনই ভেতরে প্রবেশ করল ঈশানী আর এসপি। ঈশানী নিজের চুল ঠিক করে এসেছে, শেষ পর্যন্ত সে একাই গিয়েছে। আর এসপি গিয়েছে তার বসের সাথে। এসপি ধীরে বলে,
-“দেখুন মিসেস নাগিন, আমি বসের সাথে….”
এসপি নিজের বাক্য সম্পূর্ণ করার আগেই ঈশানী দন্ত খিঁচিয়ে চিৎকার করে ওঠে,
-“মিস, মিস নাগিন….”
তার এমন চিৎকারে এসপি তড়িঘড়ি করে নিজের কান চেপে ধরল। চারপাশের কয়েকজন তাদের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে, কিন্তু ঈশানী, সে এখনো র*ক্তচক্ষুতে তাকিয়ে আছে এসপির দিকে। বিপরীত প্রান্তের মানব নিচু স্বরে আওড়ায়,
-“আরে আজ না হোক কাল তো আপনি মিসেস হয়ে যাবেন….”
-“কিন্তু ততদিন তোমার মুখ থেকে মিসেস শুনলেই আমি ঠিক তোমার বউয়ের কাছে বিচার দিব উল্টাপাল্টা। বলবো, তুমি মেয়েদের পেছনে লাইন লাগাচ্ছ”
এসপি নিজের নামে এমন মিথ্যা অপবাদ শুনে চোখ বড় বড় করে তার দিকে তাকায়। কিন্তু ঈশানী, সে পাত্তা না দিয়ে সামনের দিকে তাকাতেই নজর আটকায় চারদিকে খুঁজতে থাকা আরজের দিকে। মুহূর্তে তার চোয়াল ঝুলে পড়ার উপক্রম। তার গলা দিয়ে যেন স্বর বেরোতে চাইছে না। তড়িঘড়ি করে কোনোমতে হাতে থাকা পার্স ব্যাগ দিয়ে মুখ ঢেকে এসপির দিকে তাকিয়ে বিস্মিত কণ্ঠে শুধায়,
-“ওএমজি! আরজে..”
এদিকে এসপি অন্যদিকে ব্যস্ত। সে বিরক্তিসূচক দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলে,
-“মিসেস নাগিন, চেঞ্জ ইয়োর হ্যাবিট। এখনো অন্যের হাজব্যান্ডের দিকে নজর…..”
ঈশানী তাকে থামিয়ে শক্ত কণ্ঠে বুলি ছুড়ে,
-“সামনে তাকা, বিটকেল। সামনে তাকা”
ঈশানীর কথা মতো এসপি সামনে তাকালো। ব্যাস, আর সে জমে গেল। তার নিজেকে বিশ্বাস করাতে কষ্ট হচ্ছে। মনের পাতায় ভেসে উঠছে সেই দুই বছর, কিভাবে আরজে তার পেছনে পড়েছিল। এখন যদি জানতে পারে তবে সে নিশ্চিত কেল্লাফাত হবে তার, -“আরজে না, বলেন জাওরা, জাওরা”
এসপির মনে হচ্ছে তার মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। একটা ফাঁকা ঢুক গিলে সে সামনের টেবিল থেকে একটা কাটা চামচ তুলে মুখের সামনে ধরে, নাহ, এটা দিয়েও দেখা যাচ্ছে। মুখ থেকে নিঃসৃত হয় বিরক্তিকর শব্দ,
-“ধ্যাততেরি…”
আবার আরেকটা চামচ উঠিয়ে নিল, না, তাতেও কাজ হচ্ছে না। সে তড়িৎ গতিতে পাশে থাকা ঈশানীর হাত থেকে পার্স ব্যাগটা নিয়ে নিজের মুখ ঢেকে নিল। ঈশানীর সাথে সাথে খেঁকিয়ে উঠে,
-“এই মিস্টার বিটকেল, আমার পার্স দাও!”
-“আরে আপনি বুঝতে পারছেন না মিসেস নাগিন, ওই জাওরা আপনাকে দেখলে একটা গুলি মারবে, আর আমাকে দেখলে নিউক্লিয়ার বোম ফাটাবে। আপনি চান সেই বোমাতে চায়না ধ্বংস হোক?
আরে ধুর এসব রাখেন, পালান মিসেস নাগিন, পালান”
ঈশানী নিজের ভ্রু কুছকে প্রশ্ন করে,
-“আমি বুঝতে পারছি না আমরা পালাবো কেন?”
-“আপনি বুঝতে বুঝতে দেখবেন, আপনার আত্মা আর আপনার সাথে নেই সেটা ভূত হয়ে গিয়েছে। ওই জাওরা কে আপনি চিনেন না, ওই জাওরা জীবনেও নিজের বউয়ের দোষ দেখবে না। আমাদেরকে দেখলেই বলবে আমরা তার বউকে গায়েব করেছি। তাই যদি কোনদিনও মিস থেকে মিসেস হতে চান তো পালন”
-“সত্যিই ”
-“প্রমাণ চাইলে এখানেই দাঁড়িয়ে থাকুন আমি তো গেলাম”
এই বলে দুজন দুদিকে দৌড় লাগালো পালানোর জন্য। দুজনেই ভিড়ের মধ্যে দিয়ে হাঁটতে শুরু করে। এসপি এখনো ব্যাগটা নিজের মুখের সামনে ধরে রেখেছে। হঠাৎ ঈশানী একটু দূরে গিয়ে থেমে গেল। নজরে আসে জ্যাক চারদিকে তাকিয়ে কাউকে খুঁজছে,
-“ওহ নো…”
এই বলে আবারও আগের জায়গায় ফিরে আসে। আবারও দুজন ফিরে আসে একই জায়গায়। ঈশানী তড়িঘড়ি করে বলে,
-“আরে ওই দিকে তো জ্যাক দাঁড়িয়ে আছে”
এসপি তার বিপরীতে বলে,
-“আর এদিকে চাইনিজ সান্ডা দাঁড়িয়ে আছে”
ঈশানী এসপির এই উপনাম গুলো সম্পর্কে অবগত না সে ভেবেছে যেহেতু এটা চায়না সেহেতু সত্যি সত্যি কোন জীবন্ত সান্ডা হবে। তাই আর কিছু না ভেবে সে হাত-পা নাড়িয়ে লাফিয়ে ওঠে আতঙ্কিত কণ্ঠে আওড়ায়,
-“কোথায়? কোথায়? সান্ডা কোথায়?”
চারদিকের কয়েকজন তাদের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে। এসপি তড়িঘড়ি করে নিচু স্বরে বলতে থাকে,
-“রিল্যাক্স, আরে সান্ডা মানে ওই কাইলিন, কাইলিন”
ঈশানীর তার কথায় খেয়াল নাই। সে এসপির পিছনে দাঁড়ানো ব্যক্তিকে দেখতে ব্যস্ত। সে পালানোর আগে এসপি দিকে তাকিয়ে শুধু বলে,
-“চায়নার ধ্বংস তো জানি না, কিন্তু তোমার ধ্বংস নিশ্চিত। কেননা তোমার পিছনে দাঁড়িয়ে আছে আরজে। আমি তো গেলাম টাটা, বাই বাই”
এই বলে ঈশানী এর সামনে থাকা মেয়েদের ভিড়ে মিলিয়ে গেল। এদিকে বেচারা এসপি দাঁত কিরমির করে বাক্য ছুড়ে,
-“এই সেলফিস নাগিন দাঁড়ান…”
এটুকু বলতে পিছন থেকে আসে আরজের গম্ভীর কণ্ঠস্বর,
-“এক্সকিউজ মি….”
এসপির চোখ কপালে। সে গলা খাঁকারি দিয়ে না ফিরে পার্স টাকে আরেকটু শক্ত করে ধরে বলে,
-“এক্সকিউজ মি, ইমারজেন্সি কলিং”
বাক্যটুকু উগরে দিয়েই সে আর এখানে নেই।
আরজে নাক সিটকিয়ে তার দুচোখ আবারও সানাকে খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। সে বিশেষ পাত্তা দিলো না। কিন্তু মুহূর্তে মস্তিষ্ক সজাগ হয়ে ওঠে। কণ্ঠ থেকে ফিসফিস করে বের হয়,
-“বারোভাতারী…”
আরজে তড়িৎগতিতে চারপাশে নজর বুলাতে শুরু করে। কিন্তু নাহ, কোথাও তার ছিটেফোঁটাও নেই। আরজে নিশ্চিত, সে এখানে ছিল। ওই কণ্ঠস্বর বারোভাতারী ছাড়া আর কারো হতেই পারে না, এই কণ্ঠস্বর তার মুখস্থ। যেভাবে তার বউয়ের পিছনে পড়েছে সে লাইফেও ভুলবে না। তাই কানে থাকা ইয়ারপিসে চিবিয়ে চিবিয়ে আদেশ ছুঁড়ে,
-“জ্যাক, কাই ওই বারোভাতারিটা এখানে আছে। মনে হচ্ছে, আমার পাখিটার সাথে ছিল। ওকে দেখলেই কোন বাক্য হবে না, আগে শুট করবে। আগে মে*রে দিবে, পরে কথা হবে। দ্যাটস অ্যান অর্ডার”
বিপরীত প্রান্ত থেকে আসে কাইলিনের কণ্ঠস্বর,
-“বস, আগে মে*রে দিলে পরে কথা বলবে কিভাবে?”
আরজে রুক্ষ স্বরে বলে,
-“তুমি ওকে শুট করবে, না হয় আমি তোমাকে শুট করব। চয়েজ ইজ ইউরস”
-“ওকে বস”
ভেন্যুর ভেতরে তখনও আলো, সংগীত আর মানুষের কোলাহল মিশে এক অদ্ভুত আবহ তৈরি করেছে। বাইরে ফ্যাশন শোর প্রস্তুতি, ক্যামেরার ফ্ল্যাশ, অতিথিদের কথাবার্তা সব মিলিয়ে যেন এক বিশাল উৎসবের রাত।
কিন্তু সেই কোলাহল থেকে অনেকটা দূরে, ভেন্যুর ভেতরের এক নিরিবিলি করিডোর দিয়ে দ্রুত হেঁটে যাচ্ছে মিসেস দিলরুবা খানম তাঁর সঙ্গে সানা। সানা একটু অবাক হয়েই তার দিকে তাকিয়ে হাঁটছে। করিডোরের শেষে একটি নির্জন রুমে ঢুকে দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিলেন মিসেস খানম। এবার বাইরে থেকে ভেসে আসা মৃদু সঙ্গীত ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। সানা এবার আর নিজেকে আটকাতে পারল না। সে বিস্মিত কণ্ঠে শুধালো,
-“মিসেস খানম… আপনি এখানে? আপনি তো কারো সামনে আসেন না। এত বছর ধরে নিজেকে আড়াল করে রেখেছেন। তাহলে আজ…?”
মিসেস দিলরুবা খানম কয়েক সেকেন্ড চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন,
-“হ্যাঁ… আমি সাধারণত সামনে আসি না। কিন্তু আজ আমাকে আসতেই হয়েছে”
-“কেন?”
মিসেস খানম গভীর নিঃশ্বাস ফেলে শুধালেন,
-“কারণ তুমি ঠিক বলেছিলে,
-“কোন ব্যাপারে?”
-“তুমি বলেছিলে… আমাকে সাইয়েদার খোঁজ আগে নেওয়া উচিত ছিল”
তিনি এক মুহূর্ত থেমে তারপর নিচু গলায় বললেন,
-“আমি আজ খবর নিয়েছি”
-“কি খবর?”
মিসেস খানমের কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে, যেন ভিতরে থাকা শব্দ গুলো বেরুতে চাইছে না। তবে সত্যিটা সানাকে বলতেই হবে,
-“ওরা… তাকে মে*রে ফেলেছে”
শব্দগুলো যেন ঘরের বাতাস কেটে বেরিয়ে এল। মুহুর্তে সানা স্থির হয়ে গেল। তার চোখ বড় হয়ে যায়। কণ্ঠে অগাধ বিস্ময়ে মিশেলে আওড়ায়,
-“কি…?”
সে দুই কদম পিছিয়ে গেল,
-“না… না এটা হতে পারে না…”
তার শ্বাস হঠাৎ দ্রুত হয়ে উঠল। মনে হচ্ছিল বুকের ভেতর বাতাস আটকে যাচ্ছে। তার চোখের কোণে পানি জমে উঠছে। ডক্টর সাইয়েদা, যে মানুষটাকে সে মায়ের মতোই দেখেছে। যে তাকে নিজের সন্তানের মতো আগলে রেখেছিল,
-“না… আপনি ভুল শুনেছেন… উনি… উনি ঠিক আছেন”
সে ভেঙে পড়ার আগেই মিসেস দিলরুবা খানম দ্রুত এগিয়ে এসে তাকে ধরে ফেলে,
-“লিসেন, লিসেন মেরি বাচ্চি। এটা ভেঙে পড়ার সময় নয়। এটা সত্যিটা বের করার সময়”
সানা চোখ ভেজা অবস্থায় তাকিয়ে রইল। মিসেস খানম ধীরে ধীরে বললেন,
-“এই কারণেই আমি সামনে এসেছি। আমি নিজে দেখতে চাই, সোফিয়া, মার্কান আর তাদের লোকদের”
বিপরীত পাশের রমণী ফিসফিস করে বলে,
-“রানভীর….”
মিসেস খানম তাড়াতাড়ি বলেন,
-“হ্যাঁ… আরজেও”
সানা অবাক হয়ে তাকায় তার দিকে,
-“কি?”
-“শোনো সানা যতক্ষণ না সত্যটা বের হচ্ছে,
আমার সন্দেহের তালিকায় সবাই থাকবে।
আরজে, সোফিয়া, মার্কান স্টিফেন, আর মার্কানের ছেলে থমাস স্টিফেন”
সানা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল,
-“কিন্তু… রানভীর…”
মিসেস দিলরুবা খানম তাকে থামিয়ে দিলেন,
-“আরজেও একজন মাফিয়া। তুমি তো সেটা নিজেই জানো”
সানা চুপ করে গেল, হ্যাঁ সেটাতো সে অনেক আগেই জানে। মিসেস খানম ধীরে ধীরে বললেন,
-“তুমি কোনভাবেই তোমার পরিচয় সামনে আনতে পারবে না, কারো সামনেই না।
তিনি একটু থেমে ফের বলেন,
-“এমনকি… আরজের সামনেও না”
সানা ভ্রু কুঁচকে তাকায়,
-“কেন?”
-“ডক্টর সাইয়েদার শেষ রিপোর্টে কি ছিল জানো?”
বিপক্ষে রমণী চুপ করে রইল। তিনি বলতে লাগলেন,
-“গত এক বছরে প্রায় লক্ষাধিক শিশু গায়েব হয়েছে। হাজার হাজার নারী পাচার হয়েছে, অবৈধ অস্ত্র, ড্রাগস সব চলছে। এই সব কিছুর সাথে কয়েকটা নাম বারবার উঠে আসছে।”
একটা নাম, জেবি,
দ্বিতীয় নাম মার্কান
আর জেবির সাথে সম্পর্ক আছে, সোফিয়া আর আরজে দুজনেরই”
সানা স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। সে কোন শব্দ খুঁজে পাচ্ছে না বলার জন্য। মিসেস খানম তার চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন,
-“তাই যতক্ষণ না সত্যটা বের হচ্ছে…কে এই সব করছে, কে ডক্টর সাইয়েদাকে খু*ন করেছে, ততক্ষণ তুমি তোমার পরিচয় লুকিয়ে রাখবে। কারো কাছে প্রকাশ করবে না, একদম না”
তিনি ধীরে ধীরে বললেন,
-“নাহলে সবচেয়ে বড় বিপদে পড়বে, আরভি”
সানার বুক কেঁপে উঠে,
-“আমার ছেলে….!”
-“হ্যাঁ…”
-“আমার সোর্স বলছে, মার্কানের লোক এখানে এসে গেছে, তারা যদি তোমাকে দেখে…চিনে ফেলতে এক সেকেন্ডও লাগবে না”
ঘরে কয়েক সেকেন্ডের নীরবতা নেমে এল।
তারপর তিনি আবারও বলেন,
-“তাই আজ থেকে, আমি তোমাকে সবার সামনে আমার মেয়ে হিসেবে পরিচয় করাব। যেহেতু তারা তোমাকে দেখেই ফেলেছে। আজ থেকে সানা নামে কেউ নেই, তুমি শুধু…
‘সুনেহনা খানম”
সানা দ্বিধায় পড়ে গেল। সে মাথা নাড়িয়ে বলে,
-“না… মিসেস খানম, আমি শুরুতেই বলেছি,
আমি এই সবের ঊর্ধ্বে থাকতে চাই। আমি আর আমার ছেলে…..”
মিসেস খানম তাকে থামিয়ে দিলেন, চোখে গভীর কঠোরতা আওড়ান,
-“তুমি শুধু নিজের ছেলের কথাই ভাবছো। যে বাচ্চাগুলো তোমার ছেলের সমান বয়সী, যাদের প্রতিদিন গায়েব করে ফেলা হচ্ছে, তাদের কথা একবারও ভাবছো না?”
সানার চোখ নিচু হয়ে গেল। মিসেস খানম আবার বললেন,
-“যে মায়েরা প্রতিদিন নিজের সন্তান হারাচ্ছে,
তাদের কথা ভাবছো না?
তুমি জানো আমি তোমাকে কার পরিচয় দিয়েছি? যে আমার মেয়ের মত ছিল, যাকে আমি আমার স্বামীর অনুপস্থিতিতে নিঃসঙ্গতার জন্য নিয়ে এসেছি। সেও বাবার মত দেশসেবা করতে গেল, আমার হাজারটা নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে। ব্যাস, আবারও একদিন আমার কাছে আরেকটা কফিন এলো। ও আমার নিজের পেটের সন্তান না হয়েও আমি শেষবারের মতো কফিন খুলে দেখতে পারিনি। তাহলে ওই মা গুলোর কি অবস্থা, যারা নিজের সন্তান প্রতিনিয়ত হারাচ্ছে? তুমি একবারও ওদের জায়গায় নিজেকে বসিয়ে দেখো। ওদের জায়গায় যদি আরভি…”
সে আর বাকিটা বলার আগেই রমণী বলে ওঠে,
-“না, আমি থাকতে আমার ছেলের কিছুই হবে না”
বিপরীত প্রান্তের ভদ্রমহিলার ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি ঝুলিয়ে বলে,
-“দেখেছো? সবাই নিজের সন্তানের কথাই ভাবে। তুমিও ভাবছো, তাই তো আরজেকে ছেড়ে এসেছ”
এদিকে সানা বুঝতে পারছে না সবকিছু ঠিক থেকে আবারো কিভাবে উল্টে গেল। মন একদিকে টানছে, তো মস্তিষ্ক বিপরীত দিকের গান গাইছে। ভদ্রমহিলা তার অবস্থা বুঝে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তার গালে স্নেহের হাত রেখে নরম কণ্ঠে শুধায়,
-“দিস ইজ দ্য লাস্ট টাইম, বেটা। যদি আমরা হেরে যাই তাহলে ওই পশুগুলোকে আটকানোর আর কেউ থাকবে না। ওরা জিতে যাবে। তাই এটুকু সময় ধৈর্য ধরতে হবে। ওই ওয়েবসাইট “ম্যান বিস্ট” ওটা বন্ধ করতে হবে। আর সাইয়েদার সিক্রেট ইমেইলে এটাও ছিল থমাস আরজের সবচেয়ে কাছে। ওটা জ্যাক বা কাইলিনও হতে পারে। আই এম নট শিওর, তাই এখন আরজের সামনে তোমার না যাওয়াই ভালো”
ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠল, সানা দ্বিধায় পড়ে গেল। মনে পড়ছে ছোট ছোট শিশুদের মুখ, মনে পড়ছে ডক্টর সাইয়েদার কথা।
মিসেস খানম ধীরে বললেন,
-“এই মিশন শেষ না হওয়া পর্যন্ত, তোমার পরিচয় গোপন থাকবে। যতদিন না আমরা ডক্টর সাইয়েদার খু*নিদের খুঁজে পাই”
দীর্ঘ নীরবতার পর সানা ধীরে মাথা তুলে।
সে ধীরে বলে,
-“ঠিক আছে…আমি রাজি”
মিসেস খানম গভীরভাবে তার দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘ শ্বাস ছাড়লেন তার কাছেও আর উপায় নেই, সত্যি টা বের করতে হলে তাকে এটা করতেই হবে ঐ নিষ্পাপ বাচ্চা ও মেয়েদের জন্য।
ভেন্যুর ভেতরে তখন আলো, সঙ্গীত আর মানুষের কথাবার্তায় চারদিক ভরে আছে। ক্যামেরার ফ্ল্যাশ মাঝেমধ্যে ঝলসে উঠছে। বিশাল হলরুমে নানা দেশের ডিজাইনার, মডেল, স্পন্সর, বিজনেসম্যান সবাই নিজেদের মতো করে মিশে আছে। এই ভিড়ের মাঝেই মিসেস দিলরুবা খানম ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এলেন। তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে সানা।
তিনি সামনে আসতেই আশেপাশে থাকা কয়েকজন বড় বিজনেসম্যান তাকে লক্ষ্য করল। মুহূর্তেই তারা এগিয়ে এসে একজন বিস্মিত কণ্ঠে বলে,
-“মিসেস দিলরুবা খানম, আপনি?’
আরেকজন হেসে উঠে,
-“ওয়াও… ইটস আ সারপ্রাইজ। আমরা তো ভেবেছিলাম আপনি কখনো পাবলিক ইভেন্টে আসেন না”
মিসেস খানম ঠোঁটে শান্ত হাসি ফুটিয়ে প্রত্যুত্তর করে,
-“সবসময় না, তবে কখনো কখনো সামনে আসতে হয়”
আরেকজন এগিয়ে এসে হাত বাড়িয়ে দিল তার দিকে,
-“আমি রিচার্ড লি। আমরা বহুদিন ধরে জাইফেরার সাথে কাজ করতে চাইছি”
মিসেস খানম হাত মিলিয়ে ঠোঁটে হাসি টেনে বলেন,
-“গুড টু মিট ইউ….”
চারদিকে তখন আরও কয়েকজন জড়ো হয়ে গেছে। একে একে শুরু হয় প্রশ্নের পালা,
-“ম্যাম, আপনি কি আবার জাইফেরার নতুন কোনো প্রজেক্ট নিয়ে কাজ শুরু করেছেন?”
-“শুনেছি জাইফেরা আবার গ্লোবাল মার্কেটে বড়ভাবে ফিরছে। এটা কি সত্যি?”
-“ম্যাম, আপনি তো অনেক বছর ধরেই লো প্রোফাইলে ছিলেন। হঠাৎ করে আজকে এই ফ্যাশন উইকে আসার কারণ?”
মিসেস খানম খুব স্বাভাবিক গলায় উত্তর দিতে লাগলেন,
-“ব্যবসার জগতে সবসময়ই কিছু নতুন পরিকল্পনা থাকে”
চারপাশে লোকজন মাথা নাড়ল। এইসব কথাবার্তার মাঝেই সানা দাঁড়িয়ে আছে তাদের একটু পাশে। কিন্তু তার ভেতরে যেন অন্য এক ঝড় বইছে। এই বিশাল ভিড়, এই অচেনা মানুষের ভিড়, এই আলো, এই ক্যামেরা সবকিছু মিলিয়ে তার ভীষণ অস্বস্তি লাগছে। মনে হচ্ছে আরভির সাথে একটু সময় কাটালে ভালো লাগত, কিন্তু আরভি তো তার রুমে সানিতার সাথে, সানা তাকে নিয়ে আসেনি কেননা এতবড় পার্টিতে যদি কোথাও চলে যায় আবার মার্কানের লোক গুলোত আছেই। সে অস্থির হয়ে চারদিকে তাকাতে লাগল। একবার ডানদিকে, একবার বামদিকে। তার বুকের ভেতর অকারণে একটা চাপা অস্বস্তি জমে উঠছে।
হঠাৎ সে সামনে তাকায়, আর ঠিক সেই মুহূর্তে
তার চোখ স্থির হয়ে গেল। তার মুখের রঙ এক মুহূর্তে ফ্যাকাশে হয়ে গেল। সে অবচেতনভাবে এক কদম পিছিয়ে যায়। মুহূর্তেই মিসেস দিলরুবা খানম তার হাত ধরে ফেললেন,
-“কি হলো বেটা?”
তারপর তিনি সানার দৃষ্টি বরাবর তাকালেন। আর তখনই নজরে আসে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে আছে আরজে। আর তার দৃষ্টি সোজা সানার উপর, তীক্ষ্ণ, স্থির, গভীর দৃষ্টি। তার চোখ একদম নড়ছে না। মুহূর্তেই সানার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। মনে হলো যেন কেউ তার বুকের ভেতর হঠাৎ একটা ভারি হাতুড়ি মেরে বসেছে। ছয় বছর, পুরো ছয়টা বছর, এই ছয় বছরে সে কতবার ভেবেছে যদি আবার কখনো তার সামনে দাঁড়াতে হয়?
তখন সে কি করবে?
আরজেকেই বা কী জবাব দিবে?
এই প্রশ্ন গুলোর উত্তর তার মাথায় কোনদিনও আসে নি। কিন্তু সেই কল্পনা আর বাস্তব এক নয়। এই মুহূর্তে তার মনে হচ্ছে, তার শ্বাস আটকে যাচ্ছে। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। তার চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে, তার অতীত। যে মানুষটাকে সে ভুলতে চেয়েছিল। যে মানুষটাকে সে ভালোবেসেছিল। যে মানুষটাকে সে ঘৃণা করতেও গিয়েও তার দ্বারা হয়ে ওঠেনি।
বিপরীতে থাকা আরজে, তার হাত কাঁপতে শুরু করে। সে দ্রুত নিজের আঙুলগুলো শক্ত করে মুষ্টিবদ্ধ করে নিজেকে সংবরণ করে নিল।
কিন্তু সানার বুকের ভেতরের ধুকপুকানি যেন থামতেই চাইছে না। মিসেস দিলরুবা খানম তার কানের কাছে ঝুঁকে ফিসফিস করে বললেন,
-“নিজেকে সামলাও, আরজে মানুষ পড়তে পারে। তোমার চোখে যদি কিছু দেখে ফেলে… সব শেষ”
কিন্তু সানার গলা যেন শুকিয়ে গেছে, তার ঠোঁট কাঁপছে। সে চোখ বন্ধ করল এক মুহূর্তের জন্য। নিজেকে শক্ত করে তারপর ধীরে ধীরে চোখ খুলে। আর তখনই নজর আটকায় আরজে ঠিক তার সামনে দাঁড়িয়ে।সে কখন এত কাছে চলে এসেছে সে বুঝতেই পারেনি। মিসেস দিলরুবা খানম দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে এক পা সামনে এগিয়ে এলেন। তিনি হাত বাড়িয়ে বললেন,
-“হ্যালো, মিস্টার আরজে… ”
কিন্তু আরজে একবারও তার দিকে তাকাল না। তার চোখ এখনও স্থির সানার উপর। সেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, সেই ঠান্ডা চোখ। যেন সে তাকে ভেতর পর্যন্ত পড়ে ফেলতে চাইছে। এদিকে সানার বুকের ভেতর তোলপাড় চলছে। তার ঠোঁট শুকিয়ে যাচ্ছে বারবার। মনে হচ্ছে যেন তার হৃদস্পন্দন এত জোরে হচ্ছে যে চারপাশের মানুষও শুনে ফেলবে। মিসেস খানম তড়িঘড়ি করে বললেন,
-“মিট মাই ডটার,
‘সুনেহনা খানম’
এক মুহূর্ত নীরবতা, তারপর ধীরে ধীরে আরজের ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা হাসি ফুটে উঠে, যেন সে জানত এটাই হবে। সে হাত বাড়িয়ে দিল সানার দিকে। তার চোখে অদ্ভুত এক ঝিলিক। ঠান্ডা স্বরে আওড়ায়,
-“হ্যালো…,
মিসেস জাওয়ান”
শব্দটা শুনে সানার চোখ বড় বড় হয়ে গেল। তার নিঃশ্বাস যেন থেমে গেল এক মুহূর্তের জন্য। মিসেস দিলরুবা খানম কিছু বলার জন্য মুখ খুলতে যাচ্ছিলেন কিন্তু তার আগেই আরজে আবারও বাঁকা হেসে বলে,
-“ওহ… সরি, মিস খান”
এক সেকেন্ড থেমে আবারও ঠোঁটের কোণের হাসি চেপে বলে,
-“ওপস…এখন তো মিস খানম,
রানভীর, আম রানভীর জাওয়ান”
সানা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখ এখনও বিস্ময়ে ভরা, যেন বিশ্বাস করাতে পারছে না নিজের বিস্ফোরিত নয়ন জোড়াকে। তার সামনে বাড়িয়ে রাখা আরজের হাতের দিকে সে তাকিয়ে আছে। বুঝতে পারছে না, সে কি করবে? হাত বাড়াবে? নাকি না? তার মাথায় যেন হাজারটা চিন্তা ঘুরছে।
এটা কি সত্যি?
সত্যিই কি তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে তার অতীত?
মিসেস দিলরুবা খানম রমণীর অবস্থা বুঝে তিনি কিছু বলতে যাচ্ছিলেন কিন্তু তার আগেই হঠাৎ আরজে সানার একটু বাড়িয়ে রাখা হাত ধরে এক ঝটকায় তাকে নিজের দিকে নিয়ে আসে। আর পরের মুহূর্তেই সানা তার বুকের উপর আঁচড়ে পড়ে। সাথে সাথে আরজে তাকে শক্ত করে বুকের সাথে চেপে ধরে, এতটা জোরে যেন পাঁজর বেদ করে বুক পিঞ্জিরায় ঢুকিয়ে ফেলবে। সে যেন নিজের এতদিন পুড়তে থাকা বুকটাকে একটু শান্ত করতে চাইছে। বিষয় টা এত দ্রুত ঘটে গেল যে, কেউ বুঝে উঠতে পারল না। সানা নিজেও বুঝে ওঠার আগে হঠাৎ করে তার বুকের সাথে ধাক্কা খেল। আরজে অন্য হাতে শক্ত করে চেপে ধরেছে তার কোমর। এত শক্ত যেন তার আঙুলের নখ ঢুকে যাবে। সানার মুখ থেকে বেরিয়ে এল ব্যাথাতুর শব্দ,
-“আহহ…..”
আরজে চোয়াল শক্ত করে এমনভাবে তাকিয়ে আছে যেন এই মুহূর্তেই তাকে চোখ দিয়ে গিলে খাবে। মিসেস দিলরুবা খানম তার দৃষ্টি দেখে চমকে উঠলেন। তিনি তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে সানাকে টানতে লাগলেন,
-“মিস্টার আরজে, লিভ মাই ডটার….”
বহু কসরতে পাঁচ মিনিট পর তিনি সানাকে আলাদা করলেন। কিন্তু আরজে নিজেই ধীরে ধীরে তাকে ছেড়ে দিল। তার চোখ এখনও র*ক্তচক্ষুর মতো লাল। ছয় বছরের জমে থাকা আ*গুন যেন তার দৃষ্টিতে জ্বলছে।মিসেস খানম শক্ত কণ্ঠে বললেন,
-“এটা কি ধরনের বেয়াদবি? তুমি আমার মেয়ের সাথে…..”
তাকে থামিয়ে আরজে ধীরে ঘাড় কাত করে তার দিকে তাকাল, তার ঠোঁটে ঠান্ডা হাসি ঝুলিয়ে বলে,
-“মিসেস, সেকেন্ড মাদার ইন ল….”
মিসেস খানমের চোখ কঠিন হয়ে গেল।
আরজে একটু হেসে আবার বলে,
-“ওপস….মিসেস খানম। আমি কি নিজের ওয়াইফ আই মিন আপনার মেয়ের সাথে একটু কথা বলতে পারি?”
আরজে সামান্য ঝুঁকে হিসহিসিয়ে আওড়ায়, -“প্রাইভেটলি”
মিসেস খানম সাথে সাথে বলেন,
-“নো, এটা সম্ভব নয়”
কিন্তু তখনই আরজে মাথা ঘুরিয়ে জ্যাকের দিকে তাকায়, চোখ দিয়ে কিছু একটা ইশারা করতেই মুহূর্তের মধ্যেই কয়েকজন বিজনেসম্যান এগিয়ে এল,
-“মিসেস খানম, আমরা আপনার সাথে একটু কথা বলতে চাই”
-“জাইফেরার নতুন প্রজেক্ট নিয়ে”
-“আমরা একটা প্রোপোজাল দিতে চাই…”
তারা চারদিক থেকে তাকে ঘিরে ফেলল। ধীরে ধীরে তাকে অন্যদিকে নিয়ে যেতে লাগে। তিনি বিরক্ত হয়ে বলেন,
-“এক্সকিউজ মি…”
কিন্তু তারা কথা বলতে বলতে তাকে নিয়ে যাচ্ছিল। না চাইতেও তাকে যেতে হলো। তিনি বুঝতে পারেন ঐ সময় তিনি আরজে কে যেভাবে ব্যাস্ত করেছিলেন, আরজেও তার সাথে একই খেলা খেলছে। তিনি আরজের দিকে তাকাতেই দেখে আরজে তাকে হাত দিয়ে টাটা দেখাচ্ছে। যাওয়ার আগে তিনি দ্রুত সানার কানের কাছে ঝুঁকে বললেন,
-“মনে রাখবে, তুমি এখন সানা নও। তুমি সুনেহনা খানম, সেই অনুযায়ী বিহেভ করবে।
প্লিজ… সানা”
ভেন্যুর ভেতরে তখনও পার্টির আবহ পুরোপুরি জমে উঠেছে। নরম জ্যাজ মিউজিক ধীরে ধীরে ভেসে আসছে চারপাশে। বিশাল হলরুমের ছাদ থেকে ঝুলে থাকা ক্রিস্টাল ঝাড়বাতিগুলো সোনালি আলো ছড়িয়ে দিয়েছে পুরো পরিবেশে। কোথাও ক্যামেরার ফ্ল্যাশ, কোথাও হাসির শব্দ, কোথাও ব্যবসায়িক আলোচনার গম্ভীর গুঞ্জন। বিভিন্ন দেশের ডিজাইনার, মডেল, স্পন্সর আর বড় বড় বিজনেসম্যানরা নিজেদের মতো করে ব্যস্ত। কিন্তু এই বিশাল ভিড়ের মাঝেও একটা দৃষ্টি যেন সবকিছু ছাপিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, আরজের দৃষ্টি। সে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখ একটুও সরছে না। সোজা সানার উপর, তীক্ষ্ণ, গভীর, প্রখর। যেন সে তার ভেতরটা ছিঁড়ে পড়ে ফেলতে চাইছে। এদিকে সানার বুকের ভেতর যেন ঝড় বইছে। আরজের সেই দৃষ্টি তাকে ভীষণ অস্বস্তিতে ফেলে দিচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন তার শ্বাস ধীরে ধীরে ভারী হয়ে যাচ্ছে। সে অস্থির হয়ে চারদিকে তাকাতে লাগল। তার চোখ দ্রুত মানুষের ভিড়ের মধ্যে কাউকে খুঁজতে লাগল, এসপি আর ঈশানীকে। নাহ, কোথাও দেখা যাচ্ছে না। সে একবার ডানদিকে তাকাল, একবার বামদিকে। কিন্তু কোথাও তাদের দেখা নেই। তার চোখে ক্ষোভ জমে উঠে, মনে মনে দাঁত চেপে আওড়ায়,
“বিশ্বাসঘাতকের দল…নিশ্চয়ই ওরা আগেই রানভীরকে দেখে ফেলেছে। আর আমাকে এখানে রেখে পালিয়েছে। এই স্বার্থপরগুলো নাকি আমার বন্ধু। বন্ধু না… বন্ধু নামের কলঙ্ক।”
সানা কয়েকবার আড়চোখে তার দিকে তাকিয়ে ছিল আরজের দিকে। প্রতিবারই নজর আটকায় আরজে কেমন তীক্ষ্ণ চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। মনে হচ্ছে এখনই গিলে খেয়ে ফেলবে। সানার সামনে নজর ঘুরাতে একঝলক পড়ে এসপির উপর যে তাকে দূরে দাঁড়িয়ে ঠোঁটে আঙুল রেখে চুপ দেখাচ্ছে। তারপর আবারও মিলিয়ে গেল। এভাবে সে ঈশানীকেও দেখেছে। দুটোই যে আরজের হাত থেকে পালাচ্ছে সেটা ভালোমতোই বুঝতে পারছে সানা।
এদিকে ঈশানী আর এসপির হালাত খারাপ। সব এক্সিট গেটে আরজের লোক দাঁড়ানো। না তারা বের হতে পারছে, না কোন দিকে যেতে পারছে। শুধু মানুষের ভিড়ে ভিড়ে হাঁটছে কখন যে দুটো ধরা পড়ে সেই ভয়ে তারা ইন্তেজার।
সানা আবার চারদিকে তাকাতে যাচ্ছিল ঠিক তখনই হঠাৎ তার শরীর কেঁপে উঠে। কারণ সে বুঝতেই পারেনি কখন আরজে তার একদম কাছে চলে এসেছে। এতটাই কাছে যে তার গরম নিঃশ্বাস এসে লাগছে সানার কানের পাশে। আরজে ধীরে ধীরে ঝুঁকে একটা গভীর শ্বাস টেনে নিল। যেন বহুদিন পর সেই চিরচেনা সুবাসটা বুকভরে নিতে চাইছে। একটা মুহূর্তের জন্য তার চোখ বন্ধ হয়ে গেল। তারপর তার ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটে উঠে। সেই সময়ই সানার কানে ভেসে এলো পুরুষালী গম্ভীর কণ্ঠস্বর,
-“ইউ লুক… লাইক মাই ওয়াইফ”
সানা চমকে উঠে, মুহূর্তে তার চোখ বড় হয়ে গেল। আরজে মনে মনে বাঁকা হেসে সাথে সাথে আবার বলে,
-“উফস…সরি, এখন তো এক্স ওয়াইফ”
এক্স শব্দটা শুনে সানার চোখ যেন বিষফড়িত হয়ে গেল। তার বুকের ভেতর যেন কিছু একটা ধসে পড়ল। মনে হলো সে যেন ভুল শুনেছে। হয়তো সে ভুল শুনেছে। ঠোঁট থেকে ফিসফিস করে বের হয়,
-“এক্স…”
সে ভেবেছে হয়তো আরজে ভুল বলেছে কিন্তু তার সেই আশাকে মুহূর্তেই ভেঙে দিয়ে আরজে আবার বলে,
-“হুম এক্স, ইউ নো…”
সে ধীরে ধীরে তার চারপাশে এক পা ঘুরে দাঁড়াল। তার চোখ এখনও সানার মুখে স্থির। সে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে,
-“ছয় বছর আগে সে বলেছিলে, সে আমাকে কখনো ছেড়ে যাবে না”
এক সেকেন্ড থেমে সে আবার বলে,
-“আর তারপর… একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখলাম, সে নেই, ওখানে ডিভোর্স পেপারস ছিল”
তার চোখে ক্ষণিকের জন্য অন্ধকার নেমে এলো,
-“আই ফাইনালি সাইনড দেম”
মুহূর্তেই সানার বুকের ভেতর যেন সবকিছু থেমে গেল। তার মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল। সে তো ভেবেছিল, সে সাইন করেছে কিন্তু আরজে কখনোই সাইন করবে না। সে তো ভেবেছিল, আরজে এই সম্পর্কটাকে বাঁচিয়ে রাখবে, কিন্তু সে সাইন করেছে। এই একটা সত্য যেন তার বুকের ভেতরটা ছিন্নভিন্ন করে দিল। তার শ্বাস ভারী হয়ে উঠে।
কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে হালকা একটা হাসি ফুটে উঠে, একটা মেকি হাসি। যাতে সামনের মানব বুঝতে না পারে, তার ভেতরে কি চলছে। আরজে সেই হাসিটা লক্ষ্য করল। তার চোখ সরু হয়ে এল। সে ধীরে মনে মনে বলল,
-“ওয়াও…নো রিয়েকশন?
আই থট ইউ মাইট বি শকড”
আরজে আবারও ঝুঁকে ঠিক তার মুখের সামনে এলো, আবারও তার আঘাত গুলোকে পুনরুজ্জীবিত করতে ফের বলে,
-“মিসেস সরি মিস খানম,
শি সেইড, নো গুডবাই, নো এক্সপ্লানেশন, নাথিং”
তারপর আবার ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে,
-“সো… আই থট, মেবি শি ওয়ান্টেড দ্যাট ডিভোর্স”
সানার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।
সে কোনমতে বলে,
-“ক..কনগ্র্যাচুলেশন”
আরজে হঠাৎ শব্দ করে হেসে দিল,
-“ওহ থ্যাঙ্ক ইউ”
এদিকে সানার বুকের ভেতর তখন যেন সব বাঁধ ভেঙে পড়ছে, ‘ডিভোর্স’ এই একটা শব্দ তার মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। তার মনে হচ্ছে সে যেন দম নিতে পারছে না। তার পৃথিবী যেন ঘুরে উঠছে। সে কোন ভাবেই আরজের থেকে এমন কোল্ড বিহেভ আশা করেনি। তবু সে ঠোঁটে হাসি ধরে রাখল। আরজে সেই হাসি দেখেই বুঝতে পারছে, সে লড়ছে, ভেঙে পড়ছে কিন্তু দেখাচ্ছে না। আরজের চোখে ধীরে ধীরে এক অদ্ভুত তৃপ্তি ফুটে উঠে। সে গভীরভাবে সানার দিকে তাকিয়ে আছে। তার প্রতিটা রিয়েকশন লক্ষ্য করছে।
এদিকে সানার ছোটবেলার অভ্যাস, বেশি ঘাবড়ে গেলে হাত কচলানো। সেই অভ্যাস সম্পর্কে আরজে নিজে অবগত। সে কিয়ৎকাল লক্ষ্য করলো বিষয়টা। তারপর ঠোঁটের কোণে হাসি চেপে আরেকটু ঝুঁকে এসে ফিসফিস করে বলে,
-“ইউ নো মিসেস জাওয়ান, নো, সরি, মিস খানম। আমার ওয়াইফ… এগেইন মিসটেক এক্স ওয়াইফ, ও নার্ভাস হলে এই রকম করতো”
রমণী তার চোখের দিকে তাকিয়ে নিজের হাতের দিকে তাকায়, তড়িঘড়ি করে নিজের হাত থামিয়ে একটু সরে গেল তার থেকে।অবশেষে সানা আর পারল না। সে ধীরে বলে,
-“এক্সকিউজ মি”
আরজে সাথে সাথে একপাশে সরে দাঁড়াল।
তার হাত দিয়ে পথ দেখিয়ে বলে,
-“ইয়েস…প্লিজ..”
সানা একবার আড়চোখে তার দিকে তাকাল। তারপর নিজের গাউনটা সামলে দ্রুত পায়ে হাঁটতে লাগল, ওয়াশরুমের দিকে। তার পায়ের শব্দ ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। আর ঠিক তখনই আরজে শব্দ করে হেসে উঠে, তার ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে ধীরে বলে,
-“ফাইনালি…আফটার আ লং টাইম আই গট আ ইন্টারেস্টিং গেম”
তার চোখে অদ্ভুত আগুন জ্বলছে। সে ফিসফিস করে বলে,
-“লেটস প্লে আ সুইট গেম, ওয়াইফি,
ছয় বছর আমি পুড়েছি, এবার তোমার পালা।
তোমাকেও পুড়তে হবে। ততটুকু.. যতটুকু হলে তুমি আর আমাকে ছেড়ে যাওয়ার কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারবে না”
তার চোখে তখন অন্ধকার ঝিলিক ফুটে ওঠে। সে ফের নিজের ঠোঁট কামড়ে বলে,
-“তুমি অভিনয় করবে, তুমি আমাকে চেনো না। আর আমি দেখব কতক্ষণ তুমি নিজের হৃদয়কে মিথ্যা বলতে পারো।
দেখি তো, তোমার অভিনয় আগে ভাঙে নাকি আমার ধৈর্য। আর একবার আমার ধৈর্য ভেঙে গেলে সারা জীবনের মতো তুমি বন্দী।
সো লেটস বিগিন দিস লিটল গেম ইউ ওয়োন্ট ফরগেট।
তুমি ভান করো তুমি আমাকে চেনো না, আর আমি ধীরে ধীরে তোমাকে মনে করিয়ে দেবো তুমি আসলে কার। আর এই খেলাটা যত দীর্ঘ হবে তত বেশি মজা হবে, তোমাকে আবার আমার করে নেওয়ার মুহূর্তটা।
এন্ড ট্রাস্ট মি মাই লাভ, আই এম গোয়িং টু এনজয় দিস গেম ভেরি মাচ”
এই বলে সে ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করল।
ওয়াশরুমের দিকেই। হাঁটতে হাঁটতেই সে কানে থাকা ইয়ারপিসে আদেশ ছুঁড়ে,
হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৫
-“জ্যাক…”
ওপাশ থেকে সঙ্গে সঙ্গে উত্তর এলো,
-“ইয়েস বস”
-“পুরো ওয়াশরুম এরিয়া…খালি করো, রাইট নাউ। আর হ্যাঁ ওই বারোভাতারিটাকে তাড়াতাড়ি খুঁজে বের কর। আই এম ড্যাম শিওর ওই আমার পাখিটাকে এখানে এনেছে। আমি একটু ক্লাস নিয়ে আসি ম্যাডামের”
