৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৩৯ (২)
রুপান্জলি
,,, ক্লাসের সবচেয়ে শেষ বেঞ্চটাতে চার মূর্তিট বসবাস,, এটাই তাদের সার্বক্ষণিক বাসস্থান৷ এদেরকে কেউ কস্মিনকালেও সামনে বসতে দেখেনি এমনকি সামনে বসতে বলার পরেও তারা কোনোদিন সেসব কথার পাত্তা দেয়নি। তাদের মতে পড়ালেখা আর মনোযোগ, এগুলো হচ্ছে নিজের ব্যাপার। মন চাইলে মনোযোগ যেখানে সেখানে থেকেই দেওয়া যায়। ফ্যাক্ট সেটা নয় যে, সামনে বসে রেগুলার ক্লাস করেই ভালো রেজাল্ট করা যায়।ফ্যাক্ট হচ্ছে এটাই,, যে পারে সে সব খানে থেকেই পারে। পারার জন্য শুধু এভিলিটির প্রয়োজন। এইযে অরুন একজন ভালো স্টুডেন্ট, একদম নামকরা, ক্লাসের ফাস্ট বয়।
সে তো সারাদিনি বন্ডামি করে,, করতে না চাইলেও বন্ধু বান্ধবের জন্য করতে হয়। কই তার তো রেসাল্ট খারাপ হয়না? আর অর্পনা!! এই মেয়ে কোনোদিন ক্লাসে মনোযোগ দেয়নি,, স্যারদের কথা মতো চলতেও নাকি তার ইগুতে লাগে,, তাই সে নিজের ইচ্ছা মতো পড়বে,, মন চাইলে নোট করবে নয়তো করবেনা। কই তার রেজাল্ট তো খারাপ হয়না,, ভালোই মার্ক পায়। আর ফ্রেন্ড সারক্যেলে থাকা সবচেয়ে সাদামাটা বিধবা নারী ইরা!! সে ক্লাসে মনোযোগ দিবে কখন? বন্ধু বান্ধবের প্যারা, ঝগড়া ঝাটি,, বন্ডামি সামলাতে সামলাতেই কাহিল হয়ে যায়। এতোকিছু সহ্য করার পরেও তার রেসাল্ট অর্পনার থেকেও কয়েক ধাপ ভালো হয়। আর পাচ মুর্তির মধ্যে সবচেয়ে অলস, সাজুগুজু করা, ন্যাকা মেয়েটা সারাক্ষণ সাজুগুজু করেও পড়ালেখায় অনেক মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করে। স্যারের বলা প্রতিটি কথা সে নোট করে। একবার সাহামদ স্যার তার ছোটবেলার একটা কাহিনি বলেছিলো,, উনি যখন ক্লাস টুতে পড়তেন তখন হঠাৎ করেই পরিক্ষার হলে উনার বাথরুমের চাপ আসে।
প্রথম আওয়্যারে তো কাউকেই বাহিরে যাওয়ার পারমিশন দেওয়া হয়না। স্যার-ম্যামরা আগে থেকেই সতর্ক করে দেয়। স্যার সেই সতর্ক বানীকে এতোটাই সিরিয়াস ভাবে নিয়েছিলো যে চাপ সামলাতে না পেরে ক্লাসেই অঘটন ঘটিয়ে ফেলেছিলেন । বোকা রাত্রি নোট করতে করতে সেই ঘটনাও নোট করে ফেলেছে। সে নিয়ে বন্ধু মহলে তখন হাসির ফোয়ারা,, সবচেয়ে বেশি পচিয়েছিলো অরুন আর পল্লব। ওদের পচানি খেয়ে পাচদিন ভার্সিটিতে আসেনি রাত্রি। তারপর কতো ভুজুংভাজুং দিয়ে ফুসলিয়ে ফাসলিয়ে ভার্সিটিতে এনেছে সেসব ভাবতে গেলেও সবার শরীরে ক্লান্তি চলে আসে। এতো পরিশ্রম করার পরেও বেচারি ভালো রেসাল্ট করতে পারেনা,, কোনোরকম টেনেটুনে পাশ করে। পল্লবের বিষয়টা আবার আলাদা,, সে সারা মাস ঘুরে ফিরে চিল করে পরিক্ষার আগে কয়েকদিন ভালো মতো পড়ালেখা করে, তবুও তার রেসাল্ট ভালো আসে। ওদের পাচজনের এই পাঁচ রকম গুণাবলী দ্বারা এটাই প্রকাশ পায় যে,, পড়ালেখা করতে গেলে ক্লাসে মনোযোগ দেওয়া আবশ্যক না। বন্ডামি করেও জীবনে নাম কামানো যায়, শুধু সুযোগের সৎ ব্যাবহার করলেই হলো।
,,, বর্তমানে মৃন্ময় স্যার ক্লাস নিচ্ছেন,, স্যারটা খুব রাগি এবং স্ট্রিক্ট,, ব্যাক্তিত্ব ও স্ট্রং তাই না চাইতেও মৃন্ময় স্যারের প্রতি একটা সম্মান কাজ করে সবার। পল্লব উসখুস করতে করতে একবার স্যারের দিকে তাকাচ্ছে আরেকবার রাত্রির হাতের দিকে পরপর অরুনের হাতের দিকে। তখন ক্যান্টিন থেকে বেড়িয়ে ডিসপ্যান্সারি থেকে পোড়ার মলম কিনে এনেছিলো। কিন্তু ক্লাসে ঢুকতে ঢুকতে স্যার চলে এসেছিলো তাই মলম টা লাগানো হয়ে উঠেনি। যদিও সাথে সাথে পানি ঢালায় ফোস্কা পরেনি কিন্তু জায়গা গুলো লাল হয়ে আছে। এই লাল রং গুলো পল্লবের ভালো লাগছেনা তাই পকেট থেকে মলমটা বের করলো পল্লব। মলমের ক্যাপটা খুলে অরুনের হাত টেনে ধরতেই অরুন বাধা দিয়ে বললো — কি হয়েছে, হাত টানাটানি করছিস কেনো? কালো চামড়ায় এসব দাগ কিছুই না,, যার ফর্সা হাত, সামান্য দাগেও যার এলার্জি তার হাতে মলম লাগিয়ে দে। সে তো আবার কুৎসিত রং পছন্দ করেনা।
হাতে দাগ পরলে হয়তো আমার মতো সেও কুৎসিত হয়ে যাবে।
,,,বার বার অরুনের দেওয়া খোচাগুলো বড্ড পোড়াছে রাতকে,, সে না পারছে বলতে,, না পারছে সহ্য করতে। বন্ধু বান্ধব কিংবা ভালোবাসার মানুষ, তাদের কাছে অন্তত এসব বলা যায়না। অত্যন্ত লজ্জা আর অপমান জনক ব্যাপার, চাইলেই যেমন প্রশ্ন করা যায়না তেমন উত্তর ও প্রকাশ করা যায়না। পল্লব একবার রাত্রির ব্যাথিত চোখ জোড়া দেখে অরুনের হাত টেনে নিয়ে টেবিলের উপর রেখে বললো — মজা মারো শালা? মহিলা মানুষের মতো ন্যাকামি। তদের এতো ন্যাকামি কই থেকে আসে ভাই? আমাকে কখনো এসব করতে দেখেছিস? শুন্যতা কি শুধু তদের জীবনেই আছে? আর কারোর জীবনে নেই?
,,,পল্লবের লাস্ট কথাটা ক্যাচ করে নিলো অর্পনা, ফিসফিস করে বললো — এই মামা!! তর ব্যাপার কিরে? তর আবার শুন্যতা কিসের? বলতো, একটু শুনি।
,,, অরুনের হাতে মলম দিতে দিতে পল্লব বললো — কেনো বলবো? তরা আমাকে বলিস? কি জানি তদের ব্যাপারে? তদের পারসোনাল ম্যাটার থাকলে আমার থাকতে পারেনা? তরা বলিসনা তাই আমিও বলবোনা।
,,, পল্লবের কথায় অর্পনার মুখটা মলিন হয়ে এলো। তার শর্তের কারনেই আজ তাদের বন্ধুত্বের মাঝে এতো দূরত্ব। কেউ কাউকে মন খুলে দুটো প্রশ্ন করতে পারেনা। আর না কোনো উত্তর খুজে পায়। ভেবেই তপ্ত শ্বাস ফেললো অর্পনা। অরুনের হাতে মলম লাগানো শেষ হলে পল্লব অরুনের কাছে মলমটা দিয়ে বললো — রাত্রির হাতে লাগিয়ে দে,, লাল হয়ে আছে।
,,, অরুন মলমটা নিতে চাইলে রাত্রি হাত বাড়িয়ে সেটা নিয়ে বললো — আমারটা আমি ই লাগাতে পারবো, তুই নিজের চিন্তা কর। তর হাত ও অনেকটা পুড়ে গিয়েছে।
,,, বলতে বলতে হাতের আঙুলে একটুখানি মলম নিয়ে বাকিটা পল্লবের দিকে এগিয়ে দিতেই পল্লব সেটা নিয়ে নিলো। রাত্রির অবজ্ঞায় বড্ড রাগ হলো অরুনের। টেবিলের শক্ত জায়গা ঘুষি বসিয়ে বললো — মরিনা কেনো আমি?
,,, রাত্রি চমকিত হয়ে অরুনের দিকে তাকালো,, সেকেন্ডে চোখে জল ঝমলো,, ঠোট দুটো তিরতির কাপছে,, কন্ঠ ভেঙে এলো। রাত্রি ভাঙা কন্ঠে ধীরে ধীরে বললো– আমি মরলে সব ঠিক হয়ে যাবে,, দোয়া কর যেনো মরে যাই।
,,, রাত্রির কথায় অগ্নি চোখে তাকালো অরুন,, ওদের কথোপকথনের মাঝেই সামনে থেকো শুনা গেলো স্যারের কর্কশ ধ্বনি — এইযে পঞ্চ মূর্তি!! হহ!! আজতো একজন কম মনে হচ্ছে,, সবসময় সাদা জামা পরা মেয়েটা মিসিং। তাও তোমাদের ফিসফিসানো কমছেনা? এরকম চললে ক্লাস থেকে বের করে বাহিরে নিয়ে কান ধরে দাড় করিয়ে রাখবো। সম্মান বাচাতে চাইলে আগে থেকেই এলার্ট হও।
,,, অর্পনা কিছু বলতে নিবে পল্লব ওর কনুই ধরে নিষেধ করলো। এমনিতে ভার্সিটিতে ক্লাস করা কখনোই আবশ্যক নয়, এমনকি ক্লাস ভালো না লাগলে বেড়িয়ে যাবার ও পারমিশন রয়েছে। সেখানে ফোর্থ ইয়ারের এতো বড়ো বডো ছেলে মেয়েদের কানে ধরানোর হুমকি দেওয়াটা লজিকে পরেনা। পল্লবের ইশারা পেয়ে থেমে গেলো অর্পনা। কিন্তু জেদি অর্পনা ইচ্ছা করেই আরও ফিসফিস করতে লাগলো। স্যার বুঝলো পাগল খেপিয়ে দিয়েছে,, এখন এটাকে বের করে দিলেও ভিসি স্যারের মুখোমুখি হতে হবে। এই মেয়ে আবার ভিসি স্যারের বন্ধুর মেয়ে,, শান্তিতে শাস্তিও দেওয়া যায়না।
,,, কোনোরকম সবগুলো ক্লাস শেষ করে চেয়ারে গা হেলিয়ে দিলো অর্পনা। ক্লাস শেষ হওয়ার পরেও অর্পনাকে উঠতে না দেখে ভ্রু নাচালো পল্লব,, নোট খাতায় আঁকিবুঁকি করা কাগজটা হাতের থাবায় নিয়ে দুমরে মুচড়ে টান দিয়ে ছিড়ে বেঞ্চের নিচে ফেলে দিয়ে চুলে বেক ব্রাশ করো অন্যদিকে তাকালো। পল্লবের কান্ডে হেসে দিলো রাত্রি,, অরুন ও হাত বাড়িয়ে অর্পনার নোট খাতাটা নিয়ে সেখানে একটা ডিম একে তাতে চোখ, নাক, মুখ দিয়ে নিচে লিখলো ( দ্বীপ মির্জা) অর্পনা শান্ত দৃষ্টিতে দুজনের দিকে তাকালো,,দ্বীপ মির্জা বানানোর জন্য আর কিছু পেলোনা? শেষ মেশ ডিম? নাহ!! মানসম্মান আর থাকার নয়। অর্পনা খাতাটা টেনে নিয়ে দাতে দাত চেপে বললো — তদের খাস বাংলায় দুটো গালি দিতে পারলে শান্তি পেতাম। শুধু গলা ব্যাথা বলে ছাড়া পেয়ে গেলি।
,,, বলতে বলতে খাতাটা টেনে নিয়ে ডিমের দুদিকে দুটো হাত আর নিচে দুটো পা একে দিয়ে বললো — এতোক্ষণে ঠিক আছে,, তরা কোনো কাজের না।
,, রাত্রি বিরক্তিতে চ সূচক শব্দ করে খাতাটা টেনে নিজের কাছে নিয়ে ডিমের মাথায় দুটো শিং একে, নাকটা আরেকটু উচু করে একে “দ্বীপ মির্জা” নাম কেটে “ডিম মির্জা” লিখে বললো — নাউ পারফ্যাক্ট, রাগী রাগী নাক উচু ডিম মির্জা!!
,,, লেখাটা দেখে সবাই হেসে ফেললো। পল্লব হাসতে হাসতে বললো — দ্বীপ ভাইয়া দেখতে পেলে কি হবে, ভাবতে পারছিস?
,,, অর্পনা সন্তর্পণে খাতাটা নেটে নিয়ে বললো — কিছুই করবেনা,, উনি রাগি হলেও মানুষটা খারাপ না। তদের খুব পছন্দ করেন। বেইলি রোডে রেস্টুরেন্ট বুক করে দিয়েছেন,, আমায় বললো ভার্সিটি শেষে যেনো তদের নিয়ে সেখানে যাই,, মনমাফিক ইনজয় করি। জার্নি করতে কষ্ট হবে বলে মতলিব মার্কেটে অর্ডার দিয়ে আইফোনের হুল সিরিজ আনিয়ে রেখেছে। বলছে, যেটা পছন্দ হয় সেটা নিয়ে গার্ডদের সাথে বাড়ি চলে যেতে। ভাবতে পারছিস, কি আনলিমিটেড কেয়ার করছে?
,,পল্লব মাথা ঝাকিয়ে বললো — বুঝলাম!! এখন কি করবি? বেইলি রোডে যাবি নাকি মতলিব মার্কেটে?
পল্লবের বিপরীতে অরুন বললো — মাথা খারাপ তর? অর্পন!! তুই ঐ দ্বীপ মির্জার একটা টাকাও নিবিনা। ভালোবাসেনা আবার অধীকার দেখাতে আসে,, সেদিনের কথার জন্য তর জামাইয়ের জবান যে কেড়ে নেইনি এটাই অর সাত কপালের ভাগ্য।
,,,অরুনকে রেগে যেতে দেখে অর্পনা ঠোঁটে বক্র হাসি ঝুলিয়ে বললো — আমাকে তদের কি মনে হয় ভাই? যখন যার যেভাবে ইচ্ছা আমাকে ইউজ করবে? আমি যদি এই সো কল্ড যত্নের কাঙাল হতাম তাহলে আদিকে ক্ষমা করে এতোদিনে সংসার সাজিয়ে ফেলতাম। আমি দ্বীপকে কোনোদিন ক্ষমা করবোনা আর না উনার সাথে এই সংসার সংসার খেলাটা খেলবো। তবে এখোনি উনাকে ছাড়বোনা আমি,,, ছাড়বো তখন যখন উনি আমাকে ভালোবেসে ফেলবে। শুন!! অপমান কিংবা অবজ্ঞার পর চুপ চাপ সরে আসা অর্পনার কাম্য নয়,, আমি টিট ফর টেট বুঝি। যাকে উনি সবার সামনে কাজের মেয়ে বলেছিলেন,, সেই কাজের মেয়ের জন্যই একদিন রাস্তায় বসে কাদবেন। জাস্ট ওয়েট!! নিষেধ করেছিলাম আমায় জোর করতে কিন্তু শুনেনি,, বলেছিলাম জীবনটা জাহান্নাম বানিয়ে দিবো,, আমি কখনোই আমার কথার খেলাপ করিনা।
,,, অর্পনার কথাগুলো পছন্দ হলোনা রাত্রির, সে প্রতিবাদ জানিয়ে বললো — তর মাথা খারাপ হয়েছে অর্পনা? দ্বীপ ভাই মানসিক ভাবে ঠিক নয়, তুই এসব করলে যদি আবার আগের মতো পাগল হয়ে যায়?
,,, তাতে? তাতে কি রাত? উনি পাগল হবেন বলে সাত খুন মাফ? তাহলে আদ্রিয়ানের দোষ কোথায়? মানছি আদ্রিয়ানের অপরাধ অনেক বেশি ছিলো,, তার জন্য আমার অনেক ক্ষতি হয়েছে কিন্তু দ্বীপ মির্জাও আমায় ছেড়ে কথা বলেনি রাত। সে অকারনেই আমায় সবার সামনে ছোট করেছে,, সেদিন আমার কতোটা লেগেছিলো জানিস? খুব লেগেছিলো কিন্তু কাউকে বলতে পারিনি,, এসব বলা যায়নারে,, আমি পারিনা। সবাই ভাবে আমি মনে হয় পাথর,, পাথরদের কোনো কষ্ট থাকতে হয়না,, যা কষ্ট সব পাগলদের হয় কারন তারা পাগল। তাদের জন্য সবার মায়া হয় কারন তাদের কষ্টটা বাহির থেকে দেখা যায়,, অথচ যাদের মনের ভিতর কষ্টের পাহার জমে থাকে,, প্রতিদিন ধুকে ধুকে মরে তাদের খোজ কেউ রাখেনা। আজ আমার হাত কেটে যাক,, দ্বীপ মির্জা ছুটতে ছুটতে এসে কোলে তুলে নিবে,, হাতে বেন্ডেজ করে শো- খানিক চুমু ও খাবে। অথচ আমার মনের মাঝে যে জখম হয়ে আছে, একটাবার সেই জখমের খোজ করতে আসেননি। উনি হয়তো ভাবে আমার বাহিরের শরীরটাই আসল, যা ব্যাথা পাওয়ার বাহিরেই পাই,, আমার কোনো মন নেই তাই একবারো মনের খোজ করার চেষ্টা করেননি।
,,, বলতে বলতে অর্পনার চোখ জোড়া ছলছল করে উঠলো। রাত্রি বুঝতে পেরে নির্দিষ্ট চেয়ার ছেড়ে অর্পনার কাছে এসে ওর গাল আকরে ধরে বললো — সোনা, কাদছিস কেনো? আল্লাহ!! তকে কান্না মানায় নাতো, এটা আমার কাজ,, ভাগ বসাস না প্লিজ!!
,,, রাত্রির কথায় হেসে ফেললো অর্পনা,, চোখ মুছে বললো– জাস্ট ইগনর ইট,, ইরাকে একটা কল দে,, ওর সাথে কথা আছে আমার।
,,, অরুন ইরার মোবাইলে কল ঢুকাতেই ওপাশ থেকে কল ধরলো ইরা। অর্পনা ফোনটা নিয়ে ইরার উদ্দেশ্য বললো — কই তুই মামা? তকে খুব মিস করছি। আজকে একটু বসুন্ধরা যাবো,, ফোন কিনবো,, তদের ট্রিট দিবো,, তুই ছাড়া হবেনা। প্লিজ আয়, তর পারসোনাল কাজ তুই পরে করিস।
,,, ওপাশ থেকে ইরার হাসির শব্দ ধেয়ে এলো,, সে বললো — তরা চলে আয়, আমি বসুন্ধরাই আছি।
,,, খুশি হয়ে গেলো সবাই,, কথা হলো অর্পনারা যমুনা ফিউচারের গিয়ে ইরাকে কল দিবে,, ইরাও রাজি হলো। ওর সাথে কথা শেষ করতেই রাত্রি উৎফুল্ল কন্ঠে বললো — তাহলে চল যাওয়া যাক,, আজ সারাদিন ঘুরে একেবারে রাতে বাড়ি ফিরবো।
,,, অর্পনা হতাশ কন্ঠে বললো — বাহিরে গার্ডরা বসে আছে।
,,, এখন উপায়? ( রাত্রি)
,,, পল্লব বললো — উপায় আর কি? ইরা তো বসুন্ধরায় ই আছে,, আমি আর অরুন নিজেদের বাইক নিয়ে ভার্সিটির পিছনে রোডে আসছি, তরা পুরোনো একাডেমিক ভবনের করিডর দিয়ে গিয়ে, সংকীর্ণ শিরি পেড়িয়ে,, পিছন দিক দিয়ে বের হয়ে সোজা ভার্সিটির উল্টো রাস্তায় চলে যা। তাহলেই তো সব মিটমাট হয়ে যায়।
,,, অর্পনা বললো– কিছু মিটমাট হয়না, ধুর!! তরা বের হলেই গার্ডরা আমাকে খোজাখুজি শুরু করে দিবে। না পেলে তদের আটকে দিবে পরে এসব প্লান ট্লান সব মাঠে মারা যাবে। এতোদিন পর বাহিরের দুনিয়ায় পা রেখেছি, একটু উড়াউড়ি না করে আমি বাড়ি ফিরে যাবো? ইম্পসিবল!! তরা আমার সাথে যেতে চাইলে আয় না যেতে চাইলেও আয়। আমি ব্যাতিত তদের কোনো অপশন নেই, মাথায় ঢুকিয়ে নে।
,,, অরুন বললো– তাহলে কি করবি? কিভাবে যাবি?
,,, অর্পনা নিরুত্তাপ ভঙ্গিতে বললো — পালাবো!! মানে আমি, তুই, রাত্রি, পল্লব চারজন একসাথে পল্লবের বলা রাস্তা ধরে পালাবো। এরপর রিকশা নিয়ে বিজয় সরনী তারপর সোজা বসুন্ধরা।
,,, অর্পনার কথায় তিনজন ভ্রু কুচকে বললো — সিরিয়াস?
,,,অর্পনা মাথা ঝাকিয়ে বললো — ইয়াপ ব্রো!!,
,,, ভার্সিটির পিছনে আসতেই অর্পনা দাড়িয়ে গেলো। ওকে দাড়াতে দেখে রাত্রি ওর হাত ধরে বললো — দাড়িয়ে পরলি কেনো? যাবিনা?
,,, অর্পনা মুখে বিরক্তি ভাব ফুটিয়ে বললো — আমরা কি ঘুড়তে যাচ্ছি? আমরা তো পালাচ্ছি। এবাবে হেটে হেটে কে পালায় ভাই, চল দৌড়াই।
,,, রাত্রি শায় জানিয়ে অর্পনার হাত শক্ত করে ধরতে চাইলে অর্পনা হাত ছেড়ে বললো — আমি পল্লবের সাথে পালাবো, এই অরুন ওকে নিয়ে ছুট।
,,, কোনো বাধা ছাড়াই ছুট লাগালো চারজন, পল্লব ছুটতে ছুটতে অর্পনার দিকে তাকিয়ে বললো — ভাই পিছনে তো কেউ নেই, ছুটে মজা পাচ্ছিনা।
,,,, অর্পনা ছুটতে ছুটতে পিছনে তাকাতেই দুটো কুকুর দেখতে পেলো যারা তাদের পিছনেই ছুটছে। নিশ্চিত ওরা ছুটছে বলেই পিছন পিছন আসছে। কুকুর দেখে আত্মা ছলকে উঠলো অর্পনার। সে কুকুরে খুব ভয় পায়। পৃথিবীতে এই একটি প্রানি আছে যাকে অর্পনা জমের মতো ভয় পায়। সহসাই অর্পনার পায়ের গতি বেড়ে গেলো, হাপাতে হাঁপাতে পল্লবকে বললো — কুকুর আসছে, পালা!! ধরতে পারলেই ১৪ টা ইনজেকশন!!
,,,, কুকর আর ইনজেকশনের কথা শুনে রাত্রি আর অরুন ও পিছনে তাকালো। যদিও রাত্রি কুকুরে তেমন ভয় পায়না তবুও ওদেরকে শত্রু পক্ষ মনে করে অরুনের হাত শক্ত করে ধরে পায়ের জোর বাড়িয়ে দিলো। দৌড়াতে দৌড়াতে রাত্রির মুখপানে চেয়ে রইলো অরুন। মেয়েটা তার দিকে তাকায়নি,, একবারো তাকায়নি,, মুখটা কেমন কালো করে রেখেছে,, নিশ্চয়ই সে হাত ধরেছে বলে মুখটা এরকম করে রেখেছে। রাত্রি তো সেদিন বললো বন্ধু আছিস বন্ধুর মতো থাক তাহলে পল্লব, অর্পনার সাথে হাসে, কথা বলে,, তার বেলায় ব্যাতিক্রম কেনো? সব অন্যায় তার বেলায় ই কেনো প্রযোজ্য? রাস্তায় এসে হাফ ছাড়লো চারজন। পল্লব হাত উচিয়ে অর্পনার সাথে হাইফাইভ করলো। অরুন বেখেয়ালে রাত্রির দিকে হাত বাড়ালেও রাত্রি হাত গুটিয়ে রেখেছে। পাশে একটা রিকশা দাড়ানো দেখে সবাই একে অপরের দিকে তাকালো। চোখে চোখে ইশারা করে আবারও ছুটে গেলো রিকশার পানে। রিকশা ওয়ালাকে কিছু বলতে না দিয়েই চারজন রিকশায় উঠে বসলো। পল্লব আর অরুন উপরে বসেছে,, অরুন আর রাত্রিকে একসাথে দেওয়ার উদ্দেশ্যে অর্পনা পল্লবের নিচে বসে পরলো। জায়গা না পেয়ে তাড়াহুড়োর মাঝে রাত্রি অরুনের নিচেই বসলো। ওদের এভাবে বসতে দেখে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে রিকশা ওয়ালা। ব্যাচারা পেসেন্জার না পেয়ে রিকশায় বসে বসে ঝিমাচ্ছিলো। ওদের হুটোপুটিতে ঘুম ভেঙে গিয়েছে,, রিকশাওয়ালা ওদের দিকে চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে বললো —
,,,, কি বেপার মামা? এইভাবে উইঠা বসলেন কেন? কই যাইবেন না যাইবেন কিছুই তো কইলেন না।
,,, অরুন রিকশার প্যাডেলে উকি মেরে বললো — এটা মটর রিকশা না?
,,,, রিকশাওয়ালা মাথা ঝাকালো মানে মটর রিকশাই। পল্লব তাড়া দিয়ে বললো — দ্রুত রিকশা ছাড়েন মামা, বিজয় সরনীর দিকে যাবেন। ভাড়া নিয়া ভাববেন না,, আপনার যত আসে দিয়ে দিবো।
,,, রিকশা চালক দ্বিমত না করে প্যাডেল চেপে এগিয়ে গেলেন। রিকশার গতি, সামনে-পিছন থেকে ছুটে আসা বাতাসে রাত্রির খোলা চুল গুলো উড়ে অরুনের চোখে মুখে বাড়ি খাচ্ছে,, উপর নিচ করে বসার দরুন অরুনের বুকে বার বার রাত্রি মাথা বারি খাচ্ছে। রাত্রি যতই দূরে সরে থাকার চেষ্টা করুক না কেনো, রাস্তার উচু নিচু পথ দিয়ে রিকশা চলার সময় নিমিসেই দুজনার দূরত্ব গুচে যাচ্ছে। এতে বার বার কেপে উঠছে রাত্রি,, তার খুবি অস্বস্তি লাগছে। যত চাচ্ছে অরুনের থেকে দূরে সরতে ততোই যেনো কাছে চলে আসছে। রাত্রি অরুনের দিকে তাকিয়ে খুবি ক্ষিন স্বরে বললো — একটু পিছনে যা অরুন,, আমার অস্বস্তি হচ্ছে।
,,, অরুনের রাগ হলো,, আগে যখন সে ছুয়ে দিতো,, পায়ের উপর পা রাখতো, হাতের আঙুলে আঙুল গুজে দিতো,, কপালে কিংবা গালে চুমু খেতো, নিজের সাথে শক্ত করে আটকে রাখতো তখন তো এতো দ্বীমত করেনি, উল্টো অনুভব করেছে। আর এখন সামান্য ছোয়াতেই তার গা জ্বলে যাচ্ছে? আগের অরুন আর এখনকার অরুনের মাঝে তফাৎ কোথায়? যদি গায়ের রঙে সত্যি ই সমস্যা থেকে থাকে তাহলে আগে কেনো এই সমস্যাটা হয়নি? এখন কেনো হচ্ছে? জেদি অরুন মুখ ফুরে একটি কথাও বললো না বরং রাত্রির থেকে আরেকটু পিছিয়ে গেলো। রিকশার উপরের দিকে বসার জায়গাটা খুব চিকন থাকে এটা জানে রাত্রি,, সে তো অরুনকে একটু দূরে যেতে বলেছে কিন্তু অরুন বেশি বুঝে অনেকটা পিছিয়ে গিয়েছে। ছেলেটা এমন কেনো? ওর সাথে রাগ করে সবসময় নিজের ক্ষতি করে,, এখন যদি পরে যায়? রাত্রির মনে ভাবনা আসতে দেরি রিকশায় ঝাকুনি লাগতে দেরি হয়নি। হিতাহিত জ্ঞান হাড়িয়ে রাত্রি অরুনের বাহু জড়িয়ে ধরে আতঙ্কিত স্বরে ডাকলো — অরুন!!
,,,গাড়ির ঝাকুনিতে পড়ার আসঙ্কা থাকলেও অরুন শক্ত হয়ে বসেছিলো কিন্তু রাত্রি আচমকা বাহু জড়িয়ে ধরায় সামনে থেকে টান লেগে রাত্রির দিকে ঝুকে গেলো অরুন। নিজেকে বাচাতে রাত্রির কাধ শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো,, মুখ ঠেকলো রাত্রির মাথায়,, সুযোগ হাতছাড়া করলো না অরুন, সন্তর্পণে চুলের ভাজে কয়েকটা চুমু খেয়ে নিলো। বিষয়টা বুঝতে পেরে রাত্রি দূরে সরতে নিলে অরুন শক্ত করে ওর গলা জড়িয়ে নিজের সাথে মিশিয়ে রেখে ফিসফিস করে বললো —
,,, এখন সরতে চাইলে আমি আরও পিছিয়ে যাবো,, তারপর পরে মরে গেলে খুশি হবি নিশ্চয়ই? স্বাভাবিক!! ভালো তো বাসিস না। আমার স্পর্শে ঘৃনা আসে তর,, কালো তো। মরে গেলে আর কেউ এরকম জোর করে স্পর্শ করবেনা,, সারা জীবনের জন্য মুক্তি পেয়ে যাবি। যাবো পিছনে? বল, যাবো?
,,, রাত্রি মাথা নাড়িয়ে না করলো, এক হাতে শক্ত করে জড়িয়ে রাখলো অরুনের হাত। অরুন রাত্রিকে জড়িয়ে রেখে মাথার উপরে থুতনি ঠেকালো। কতোগুলো দিন রাতের থেকে দূরে ছিলো সে? পাঁচ দিন,, এই পাঁচ টা দিন তার কাছে পাঁচ যুগ মনে হয়েছিলো। বুকটা অশান্ত হয়েছিলো,, এখন একটু শান্তি লাগছে। রাত যদি একবার বুঝতো সে ছাড়া অরুন কতোটা অসহায় তাহলে কখনোই এতোটা দূরে সরিয়ে দিতে পারতো না।
পল্লব কোনা চোখে একবার রাত্রি আর অরুনকে দেখে নিলো, রাত্রির চোখ টলমল করছে,, কেদে দিবে নিশ্চয়ই? কাদারি কথা, ভালোবাসার মানুষের সান্নিধ্যে পেলে সবাই কাদে। ওদের থেকে চোখ সরিয়ে পিচ ঢালা রাস্তায় নজর স্থির করলো। অর্পনা পল্লবের ফোন নিয়ে এফবি স্ক্রলের কথা বলে লুকিয়ে লুকিয়ে ম্যাসেন্জার চেক করছিলো। কয়টা মেয়ের সাথে কথা বলে,, কি কথা বলে,, এসবি আরকি। বরাবর মেসেন্জারে মেয়েদের আইডি দেখলেও কখনো মেসেজ চেক করা হয়নি। এখন চেক করতেই আশ্চর্য হলো অর্পনা। কয়েকজন মেয়ে আছে লিস্টে, সবগুলোকেই বোন পাতিয়ে রেখেছে এই ছেলে। তাহলে কি এখন আর প্রেম ট্রেম করেনা? অর্পনাকে মেসেঞ্জার চেক করতে দেখে চুল টেনে ধরার প্রয়াস করতে নিয়েও থেমে গেলো পল্লব । অর্পনার চুলে কোনো এক কালে টান দিয়েছিলো সে, তারপর মেয়েটার টানা দুদিন মাথা বেথা করেছে। তাই চুল না ধরে কান টেনে ধরতেই অর্পনা ব্যাথাতুর শব্দ করে বললো — ছাড় কুত্তা!! আল্লাহ!! ব্যথা পাচ্ছিতো।
— পল্লব কান ছেড়ে দিয়ে বললো — হারামি!! মেসেঞ্জার থেকে বের হো। তকে বিশ্বাস করে মোবাইল দিলাম আর তুই কিনা আমার পারসোনাল বিষয় নিয়ে ঘাটাঘাটি করছিস?
,,, অর্পনা কান ঢলতে ঢলতে মেসেন্জার থেকে বের হয়ে বললো — পারসোনাল কিছু তো পেলাম না, যে কয়জন আছে সবগুলাই তো তর বোন। প্রেম ট্রেম করিস না এখন আর?
,,, পল্লব রাত্রির দিকে তাকিয়ে বিরবির করে বললো — কোনোদিন করেছিলাম নাকি?
,,, বিরবির করে বলায় অর্পনা পল্লবের কথাটা ক্যাচ করতে পারেনি তাই পল্লবের হাটুতে ঘুষি মেরে বললো — মনে মনে কি বলিস? কিছুই বুঝিনা, জোরে বল।
,,, পল্লব কথা ঘুরাতে এদিক ওদিক তাকাতেই রাস্তার পাশে দাড়িয়ে থাকা মুড়ি ওয়ালা মামার দিকে নজর আটকালো। রাত তো মুরি খেতে অনেক পছন্দ করে,, একদম মুরি বলতে অজ্ঞান যাকে বলে। মোট কথা, এই মুড়ির ঠোঙার জন্যই তো রাতকে বন্ধু মহলে পেয়েছিলো তারা। পল্লব তারাহুরো করে রিকশাওয়ালা মামাকে রিকশা থামাতে বললে রিকশাওয়ালা রিকশা থামিয়ে দিলো। ওর কান্ডে তিনজন ভ্রু কুচকে তাকালে পল্লব জ্বীব দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে চুলে বেক ব্রাশ করে হাসলো। পল্লবের সৌন্দর্যের মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় হচ্ছে ওর এই নাম করা হাসি। এই হাসি দেখলে যে কেউ ফাসতে রাজি। অর্পনা পল্লবের পেটে আছতে করে কনুই মেরে বললো — হাসিস না হারামি, আমি বিবাহিত আর রাত্রি সেটেল্ড, ইরা খ্রিস্টান। তাই তর এই ক্রাস খাওয়ানো হাসি ক্যাম্পাসের মাঝখানে দাড়িয়ে দিস, দাম পাবি।
,,, অরুন বললো — এসব কথা বাদ, তুই রিকশা থামাতে বললি কেনো এটা বল। এখন অন্তত এটা বলিস না যে এডভেঞ্চারের জন্য বাকি পথ আমরা পায়ে হেটে যাবো।
,,, পল্লব দুদিকে মাথা নাড়িয়ে বললো — নাহ!! এজন্য নয়,, এইযে রাত টাত এলাচি,, অরুনের হৃদ স্পন্দন মাপা শেষ হলে একবার বাম পাশে তাকা। তর ফেভারিট মুড়ি তকে ডাকছে।
,,, মুড়ির কথা শুনে বামদিকে তাকালো রাত্রি। সহসা উদাশ মনটা ফুরফুরা হয়ে গেলো। সে অতিরিক্ত খুশিতে পল্লবের হাটুর উপর রাখা হাতটা ধরে মিষ্টি করে হেসে বললো — থ্যাংক ইউ! থ্যাংক ইউ! থ্যাংক ইউ দোস্ত। আমি তো খেয়ালই করিনি। চল তাড়াতাড়ি যাই, মুভিগুলো আমার পেটে যাওয়ার জন্য কান্না করছে। আমি একটু ওদের খেয়ে ওদের মনের কষ্টগুলো কমাতে চাই।
,,, পল্লবের উৎফুল্ল চোখ মুখ শীতল হয়ে এলো, সে রাত্রির হাত থেকে সন্তর্পণে হাত সরিয়ে বললো — প্রেমিক পুরুষের হৃদপিণ্ডের ধুকপুকানি মাপলে চারপাশে নজর থাকবেনা, এটাই স্বাভাবিক।
,,, পল্লবের কথাটা স্বাভাবিক হলেও অর্পনার কেনো যেনো স্বাভাবিক মনে হলোনা,, অরুনকে নিয়ে বার বার কথা বলায় রাত্রি হাসফাস করে উঠলো। অর্পনাকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে থেকে মাথায় গাট্টা মারলো পল্লব পরপর তাড়া দিয়ে বললো — রিকশাওয়ালা মামাকে কি মাগনা পেয়েছিস? নাম তারাতাড়ি, মুড়ি নিয়ে আবার ফিরতে হবে তারপর সারাদিন ঘুরাঘুরি।
,,, পল্লবের কথায় শায় জানিয়ে চারজন তাড়াহুড়ো করে নেমে পরলো। ২০ টাকার ২০ টাকার করে মুড়ি নোওয়ার কথা উঠলে অর্পনা নিষেধ জানিয়ে একসাথে ১০০ টাকার মুড়ি নিয়ে নিলো। সে আর রাত্রি নিচে বসায় নিজেদেরটা খেতে পারলেও অরুন আর পল্লব পারবেনা কারন ঢাকার রাস্তায় যথেষ্ঠ জ্যাম আর ভাঙা চুড়া রয়েছে। সেসবের কারনে খাওয়া আর হয়ে উঠবেনা। তাই ঠিক করলো অর্পনা নিজেই তিনজনকে খাইয়ে দিবে। অগত্যা পলিথিনে করে ১০০ টাকার মুড়ি নিয়ে আবারও রিকশায় চড়ে বসলো চারজন, আলাদা করে রিকশাওয়ালা মামার জন্য ও এনেছিলো। সেটা উনাকে দিতেই তিনি রিকশার হেন্ডেলে রেখে দিলেন। ওনাকে রেখে দিতে দেখে অরুন জিজ্ঞেস করলো — রেখে দিলেন কেনো মামা? খাবেন না? খেয়ে নেন, তারপর নাহয় যাবোনে।
,, রিকশাওয়ালা পেডেল চেপে রিকশা ছুটিয়ে বললো — আমার বাড়ি বিজয় সরনীর কাছে ওই, দুপুরে খাইনাই, বাড়ি গিয়া খামু। যামুই যখন তুংগো মামির লাইগা নিয়া যাই,, খুশি হইবো।
,,, রিকশাওয়ালা কথা শুনে পল্লব বললো — মামায় দেখি মামিকে বহুত ভালোবাসেন। আহা!! এমন ভালোবাসা আজকাল দেখাই যায়না, এই অরুন শিখ কিছু। বিয়ের পর নিজে না খেয়ে রাতকে খাওয়াবি, বাহির থেকে আসার সময় এক পোটলা মুড়ি নিয়া যাবি, তর বউতো মুড়ি পাগলি।
,,, রাত্রি নাক ফুলিয়ে শাসিয়ে বললো — তর কপালেও একটা মুড়ি পাগলি ঝুটবে, তুই ও শিখে নে।
,,, পল্লব ঠোঁট বাকিয়ে হেসে বললো — বিয়েই করবোনা, আর এমনিতেও এসব মেয়ে মানুষের ন্যাকামি সহ্য করার সময় নেই আমার। কে কি পছন্দ করলো না করলো তার খোঁজ রাখতে পারবোনা।
,,, অর্পনা বললো — রাতের টা যেভাবে রেখেছিস সেভাবেই রাখবি।
,,, পল্লব বললো — মাথা খারাপ তর? হঠাৎ নজর আটকে গিয়েছে তাই দাড় করালাম। নয়তো রাত পা*দ কি খায় না খায় সেসব নজর রাখার সময় আছে নাকি পল্লবের।
,,,নিজের নামের সাথে এরকম একটা শব্দ এড করায় ক্ষেপে গেলো রাত্রি। পল্লবের হাটুতে ধুপধাপ ঘুষি মেরে বললো — কুতা বাছা!! তকে খুন করবো আমি। রাতের সাথে টাত বলার হলে বলবি পা*দ কি হা? নামটাকে পুরো খেয়ে দিলো, সয়তান কোথাকার।
,,, ওদের ঝগড়া করতে দেখে অর্পনা বললো — তরা ঝগড়া করতে করতে মরে যা,, আমি একাই মু্ড়ি খাই।
,,, বলতে বলতে মুড়ি নিয়ে মুখে তুলতে নিলেই অরুন অর্পনার হাত ধরে মুড়িটা মুখে ঢুকিয়ে নিলো। অর্পনা রাগি রাগি চোখে অরুনের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললো। হাসছে সবাই, অর্পনা নিজে বেশি খাচ্ছে আর ওদেরকে অল্প অল্প করে দিচ্ছে। এটা নিয়ে তুমুল ঝগড়া বাধালো চারজন। এই ছোট ছোট নক্ষত্রদের মিষ্টি মিষ্টি ঝগড়াগুলো দেখে রিকশাওয়ালা শব্দ করে হাসলেন। হাসতে হাসতে গান ধরলেন—
৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৩৯
,, রঙের মানুষ রঙিলারে,,
এই দুনিয়ার বাজারে,,
,,,ভালোবাসার সন্ধানে
যতই ঘুরো দোকানে,,
প্রানের মানুষ পাবেনা রে,,,,
,,,ভালোবাসার সন্ধানে
যতই ঘুরো দোকানে,,
প্রানের মানুষ পাবেনা রে,,,,
