৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৫২ (২)
রুপান্জলি
,,ইফতার সেরে সবাই মিলে লোকাল বিচে এলো,, এখানে জনমানুষের তীব্র ভির। দ্বীপ, মুখে মাস্ক পরে বেড়িয়েছে,, ঢাকায় সে নরমাল ভাবে চলাফেরা করতে গেলেও ছেলেপুলের ভীর জমে যায় সেখানে কক্সবাজারের মতো একটা পাবলিক প্লেসে নরমাল ভাবে তার ঘুরাঘুরিটা গ্রহণ যোগ্য নই। অর্পনা আর পরশীর মুখেও মাস্ক,, ওড়না গোল করে পেঁচিয়ে দেওয়া। এমন করে দ্বীপ নিজে দিয়ে দিয়েছে। এমন নয় যে পরশী কিংবা অর্পনাকে সবাই চিনে,, মির্জা বাড়ির একটা মেয়ে বউকেও পাবলিক ভালো করে চিনেনা কারন তারা খুব সাধারন,, গাড়ি করে বের হয়,, সাথে গার্ড থাকে,, ডেইলি জীবন পারাপার করে এইটুকুই। কেউ কখনোই রাজনীতিবীদ বিহান- জোহানের বোন কিংবা অর্থমন্ত্রীর মেয়ে,, ছেলের বউ রুপে মিডিয়ার সামনে যায়নি।
তবে বর্তমানে এটুকু করা হয়েছে তাদেরকে ছেলেদের নজর থেকে প্রোটেক্ট করার জন্য। প্রতিবারের নেয় এবারেও অগনিত হাড়ে গার্ড দ্বারা সিকিউর করে রেখেছে দ্বীপ এবার বাকিটা আল্লাহ এর হাতে। পরশীটা বেশ ছটফটে তাই ওকে ডান দিকের বাহুতে আটকে রেখেছে দ্বীপ,, বাম হাতে অর্পনার হাত শক্ত করে ধরে রেখেছে,, রাতের দায়িত্ব নিয়েছে অরুন আর ইরাকে ধরে রেখেছে পল্লব। তারা হাটতে হাটতে মুড়ির দোকান ক্রস করে চলে গেলো,, রাত্রি একবার ঘুরে তাকালো সেদিকে পরপর পল্লবের দিকে তাকালো। তখন রাগ করে সরি চাইলেও রাতের সাথে এখনো কথা বলেনি পল্লব,, এখন মুড়ির দোকান দেখেও তাকে খেতে বললো না,, এনেও দিচ্ছেনা। রাত্রি ঠোঁট উল্টে অরুণের দিকে তাকালো,, অরুন সামনের দিকে তাকিয়ে। কারোর পাত্তা না পেয়ে মন খারাপ করে হাটতে লাগলো। আরও কিছুটা সময় হাটার পর আবারও মুড়ির দোকান সামনে পরলো,, এবারেও পল্লবের দিকে তাকালো,, নো রেসপন্স। রাত্রির চোখ ছলছল করে উঠলো,,
ওর বন্ধুরা কি ওর পছন্দের কথা ভুলে গেলো? আরও কিছুটা পথ আসতেই শক্তি পরীক্ষা করার মেশিন দেখতে পেলো।এটা দেখে লাফিয়ে উঠলো পরশী,, মেয়েটা খুব অল্পতেই খুশি হয়ে যায়,, এইতো একটু আগেই পল্লবের জন্য কাঁদতে নিয়েছিলো এখন এতো মানুষ আর মজার মজার জিনিস দেখে হেসে লুটোপুটি খাচ্ছে। পরশি টেনে দ্বীপকে সেদিকে নিয়ে গেলো,, সে শক্তি মাপাবে,, দ্বীপ মানা করলো না,, পরশী ভাইয়ের অনুমতি পেয়ে বস্তুটাতে ঘুসি বসালো,, শক্তির পরিমান ৪৫৪। অতিরিক্ত ভাব নেওয়া পরশী ঠোঁট উল্টালো,, পরপর একে একে সবাই শক্তি পরিক্ষা করলো। রাতের এলো ৩৯০,, ইরার ৬৬২,, অর্পনার ৫৮৯,, পল্লব আর অরুন ১০০০ ক্রস করে ফেলেছে। এটা নিয়ে তুমুল মাতামাতি করলো দুইজন। মেয়ে পার্টিকে ইচ্ছামতো পেঁচালো তবে রাতের সাথে পল্লব কথা বলেনি। রোজার দিনে কুলফির টেস্ট অন্যরকম,, পাশ দিয়ে কুলফি মালাই যেতে দেখে দ্বীপ দাঁড় করালো সবার জন্য একটা একটা নিলো তবে সে এসব পছন্দ করেনা।
কিন্তু খাওয়ার বেলায় অর্পনা দ্বীপের সাথে শেয়ার করেছে। নিজে দু তিন কামর খেয়ে খেয়ে দ্বীপের দিকে এগিয়ে দিয়েছে। প্রথমে দ্বীপ মানা করতেই অর্পনা চালাকি করে বললো “” বুঝিয়েন,, আমি খাচ্ছি,, আমার লিপ এটা স্পর্শ করছে,, এবার খেলে খান না খেলে আমার কি? “” বিষয়টা অতো তলিয়ে ভাবেনি দ্বীপ কিন্তু অর্পনার কথায় ভাবতে বাধ্য হলো,, এক দুই কামর খেলো। অর্পনা ঠোঁট বাকিয়ে হাসলো,, দ্বীপ মির্জাকে কন্ট্রোল করা বড্ড ইজি। কুলফি খেতে খেতে সবাই কথা বলছিলো,, পল্লব আড় চোখে রাতের দিকে তাকালো,, সে এখনো মুড়ির দোকানের দিকে তাকিয়ে পরপর তার দিকে তাকায়। হাসি পেলো তার,, হাতে যথেষ্ট টাকা আছে,, সুহাসিনী আন্টি দিয়েদিয়েছে,, নিজে কিনে খাক,, তার দিকে তাকায় কেনো? সে কি জনম জনম ধরে ওকে মুরি কিনে দিবার দায় নিয়ে রেখেছে? তখনি রাতের ঠোঁট লেগে থাকা কুলফির অংশ বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে মুছে দিলো অরুন,, রাত মুচকি হাসলো,, একহাতে শক্ত করে অরুনের বাহু চেপে ধরলো।
পল্লব নজর সরিয়ে নিলো,, অপরদিকে পরশী বার বার আড় চোখে পল্লবকে দেখছে,, মনে মনে অভিমান করছে কিন্তু তার অভিমান দেখার কেউ নেই। পল্লব বুঝতে পারছে তার দিকে দুটো বানবী অভিমানি দৃষ্টিতে তাকিয়ে কিন্তু আজ তার ভাবাবেগ নেই। মির্জা গালিব একবার বলেছিলেন “” একদিন আমিও সবাইকে বলবো,, আমার কখন কোথায় কষ্ট হয় “” তবে পল্লবের কোনো কষ্ট নেই,, সে জীবনে পরিপূর্ণ। অনেকটা সময় ঘুরোঘুরি করলো সবাই ,, একটা বাচ্চা ছেলে আকাশে লাইটিং ধনুক ছুড়েছে যেটা আলো জ্বলে সোজা আকাশে উড়ে যাচ্ছে আবার নিচে নামছে,, পরশী এটা কিনার বায়না ধরলো,, দ্বীপ রাত আর পরশীকে কিনে দিলো। ইরাকে নিতে বললে সে জানালো সে ওদের মতো বাচ্চা নয়,, অরুন পল্লবের ও একই মতামত আর অর্পন তো নিবেই না সে বয়সের তুলনায় বেশি ম্যাচিউর । এক পর্যায়ে তারা মেলায় ডুকলো,, এদিকটায় বেশ খাবার দাবারের দোকান রয়েছে,, চকলেট, আচার, বাদাম, আরও টুকটাক অনেক কিছুর। অর্পনা দায়িত্ব নিয়ে শ্বাশুড়ি, চাচি শ্বাশুড়ি, মেধা, পরশীর জন্য আলাদা আলাদা করে সবকিছুই নিলো, সবার পছন্দ মতো খাবার গুলোতে যার যার নাম লিখে প্যাকেট করে দিলো।
ঈদে ইরা বাড়ি যাবেনা,, অর্পনার বাড়িতে থাকবে বরাবর এটাই হয়ে এসেছে। তবে ঈদের সাত দিন পর ঠিকি বাড়ি যাবে তাই ইরা এবং ইরার বাড়ির লোকেদের জন্য ও নিলো। রাত আর সুহাসীনি আন্টির জন্য ও নিলো। অনাহিতা আপু তাদের সবার প্রিয়,, উনার জন্য সবাই মিলে এক গাদা খাবার এড করলো,, অহমিকা, পল্লবের মায়ের জন্য ও নিলো,, তবে অরুনের বেলায় থমকালো। ওর মম, পাপ্পসর সাথে তাদের তেমন সক্ষতা নেই, একবার শুনেছিলো অর্পনার সাথে অরুন মিশুক এটা তার মা বাবা চায়না। এই নিয়ে অর্পনার সাথে কথাও হয়েছিলো,, অনেক বাজে বিহেভ করেছিলো ওর সাথে কিন্তু ও গায়ে মাখেনি,, অরুনকে ছেড়েও দেয়নি। ওদের মতে ওর মতো লাফাঙ্গার সাথে চলে তাদের ব্রিলিয়ান্ট ছেলে ওর মতো হয়ে যাবে,, মাকে নিয়েও অনেক কথা বলেছে অথচ অরুন তার বাবা মায়ের বিরুদ্ধে গিয়ে অর্পনার সাথ দিয়েছে,, ওর পিছন পিছন ঘুরেছে,, অর্পনা ঘুরতে বাধ্য করেছে। সে অর্পনা, তার আলাদা আলাদা কিছু ক্ষমতা রয়েছে যা সবার থাকতে নেই,, তাকে লাফাঙ্গা বলে আর লাফাঙ্গার লাফামি সহ্য করবেনা, এটা হতেই পারেনা। এর পর থেকে অরুন বাবা মায়ের ততোটাও বাধ্য সন্তান নয়।
মূলত অর্পনা নিজেকে বিষ মনে করে,, যে জেনে পান করবে সেও মরবে আর যাকে জোর করে পান করানো হবে সেও মরবে। অরুনের বাবা মায়ের বেলায় অরুনকে চুজ করতে দেওয়া হলো,, সে মানা করে দিলো৷ তারা এসব খাবেনা,, না খাক,, অর্পনা যার তার জন্য টাইম কিংবা মানি কোনোটাই ওয়েস্ট করেনা। এই সব খাবারের বিল অর্পনা নিজের টাকায় দিয়েছে স্বামীর টাকায় নয়। তারপর গেলো মেয়েদের কসমেটিক্স কালেকশনের দিকে,, ওখানে সবার জন্য আনলিমিটেড অফার রাখলো দ্বীপ,, যে বেশি শপিং করতে পারবে তাকে এক্সট্রা গিফ্ট দেওয়া হবে। সাথে সাথে পরশী, রাত, ইরা কাজে লেগে পরলো,, মেয়েদের এদিকে পল্লবের কাজ নেই,, সে দ্বীপের সাথে দাড়িয়ে রইলো। অরুন রাতকে এটা ওটা পছন্দ করতে সাহায্য করছে,, কখনো চুরি পরিয়ে দিচ্ছে আবার কখনো কানের দুল,, ওদের বন্ডিংটা খুব সুন্দর সাথে ভালোবাসাটাও।
অর্পনা মুগ্ধ দৃষ্টিতে তার স্বামীর দিকে তাকিয়ে,, লোকটা দিনকে দিন দায়িত্বশীল হয়ে যাচ্ছেনা? কারোর ধার না ধারা লোকটা তার ফ্রেন্ডদের কৌশলে নিজের টাকায় টাকায় শপিং করে দিচ্ছে। এমনি নরমাল্লি কিনতে বললে কেউ কিনতে চাইতো না তাই সবাইকে কম্পিটিশনের মাধ্যমে শপিং করার টাস্ক দিলো। অর্পনা দ্বীপের কাছে দাড়িয়ে পা উচিয়ে কানের কাছে মুখ নেওয়ার চেষ্টা করলো কিন্তু পারলো না, দ্বীপ মাস্ক এর আড়ালে হাসলো,, একটু ঝুকে বউয়ের কানের কাছে মুখ এগিয়ে দিলো,, অর্পনা টুপ করে গালে চুমু খেয়ে বললো – আ’ম ইম্প্রেস্ড জান!!
,,, জান!! কতোদিন পর এমন নামে ডাকলো অর্পনা সাথে মিষ্টি একটা চুমু। দ্বীপ কিছুক্ষণ থ হয়ে দাড়িয়ে রইলো অথচ অর্পনা বোমা ফাটিয়ে বান্ধবীদের কাছে চলে গিয়েছে। দ্বীপের অবস্থা দেখে হাসলো পল্লব,, লুকিয়ে একটা ছবি তুলে নিলো। অর্পনার ফোনে ছবি পাঠিয়ে টেক্সট পাঠালো — তর ডিম মির্জা চুমু খেয়ে হুস হাড়িয়েছে,, হসপিটালে নিয়ে যাই?
,,, অর্পনা এটিটিউড ইমুজি দিয়ে লিখলো– পাওয়ার আছে ব্রো।
,, পল্লব মিটিমিটি হাসছে, তার মন চাচ্ছে দ্বীপকে প্যাচানি দিতে তবে দ্বীপকে তারা বড্ড সম্মান করে সাথে ভয় ও পায় তাই আপাতত চেপে গেলো। অনেকটা সময় পর মেয়ে জাতির শপিং শেষ হলো৷ এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি শপিং করেছে রাত,, দ্বীপ ওকে পরবর্তীতে গিফ্ট দিবে বলে কথা দিলো। অর্পনা দায়িত্ব নিয়ে মেধা, অনাহিতা, অহমিকার জন্য শপিং করলো তবে নিজের জন্য কিছু নেয়নি বিষয়টা জানতে পেরে কিছুটা শক্ত দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকালো দ্বীপ। নিজের দাম্ভিকতা দূরে সরিয়ে দোকানে প্রবেশ করলো,, সব কসমেটিক্সে একবার করে নজর বুলিয়ে যেটা ভালো লাগলো দেখিয়ে দিলে দোকানদার সেটা প্যাক করে দিলো। অর্পনা এতে আলাদা অনুভূতি খুজে পেলো,, লোকটাকে তার বেশ ভালো লাগছে,, একদম মনের মতো। কক্সবাজারের লোকাল প্লেইসে এসেছে আর সি ফুড খাবেনা এটা অসম্ভব ব্যাপার,, রোড সাইডে দাঁড়িয়ে সবাই সি ফুড খেলো,, দ্বীপ ব্যাতিত।
সে এসব খায়না,, খেলেও রেস্টুরেন্ট থেকে খায় ,, এসব রাস্তায় দাড়িয়ে খাওয়া তার পোষায় না। তবে মালাই চায়ের ব্যাপারে মানা করতে পারলো না, অর্পনা তার কাপ থেকে জোর করে খাইয়েছে,, অবশ্যই তার লিপ্স এর দোহাই দিয়ে,, দ্বীপ ফিরাতে পারেনি। সবশেষে শুটকির দোকানে গিয়ে থামলো অর্পনা,, সে শুঁটকির ঘ্রান একদমি নিতে পারেনা,, এখানে থাকা কেউ ই শুটকির কাছ ঘেষলো না। দ্বীপ অর্পনাকেও মানা করেছে মেয়েটা শুনলো না,, শ্বাশুড়ি আর চাচি শ্বাশুড়ির জন্য মন মাফিক শুটকি নিলো,, মহিলা মানুষ তো এসবি প্রেফার করে তাইনা? দ্বীপ কি বলবে ভেবে পায়না,, অর্পনাকে আজ বউ বউ লাগছে,, এতোটা পারফ্যাক্ট হওয়া কি খুব প্রয়োজন ছিলো? দ্বীপ কখনোই ভাবেনি এমন একটা অভাবনীয় সময় তার জীবনে আসবে৷ এতোকিছু হলো,, এতোকিছুর ভিরে কেউ রাতের পছন্দের মুরির খোঁজ নিলোনা,, ফিরার সময় ও রাত বার বার পল্লবের দিকে তাকিয়েছে,, অভিমান করেছে তবে অভিযোগের রাস্তা নেই,, সব সম্পর্কে অভিযোগ খাটে না।
,,রাতে সবার দেওয়া গিফ্ট আনবক্স করতে বসলো অর্পনা,, দ্বীপ রুমে নেই,, কোথাও একটা গিয়েছে। বাকিরা সব ভিলায় অবস্থান করছে,, ৯ টা পর্যন্ত ঘুরাঘুরি,, খাওয়া দাওয়া শেষে সব ক্লান্ত হয়ে ভিলায় ফিরেছে,, এই মুহুর্তে আড্ডা দেওয়ার মুড কারোরি নেই। অর্পনা প্রথমে বিহানের দেওয়া গিফ্ট টার দিকে তাকালো, উনি একবারও তাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানায়নি তাই অর্পনা একটু রাগ করেছিলো তবে সবার সাথে গিফ্ট দেখে এটাই আগে খোলার কথা ভাবলো। দেখে মনে হচ্ছে রিং বক্স,, অর্পনার ধারনা সত্যি হলো,, ডায়মন্ড এর কাপল রিং দিয়েছে সাথে ছোট্ট একটা চিঠি,, “” জন্মানোর আর সময় পেলে না? ঠিকি আমার ল্যাজ ধরে পৃথিবীতে চলে এলে,, ফালতু বোন টোন “” অর্পনা দাতে দাত চেপে ফোন বের করে বিহানের ফোনে টেক্সট পাঠালো “” আপনি যে একটা গরু, বাদর, লেজ বিশিষ্ট প্রানী, আজ স্বীকার করলেন। ফালতু ভাই টাই “” ফোন রেখে মেধারটা খুললো,, সে গোল্ডের একটা কাটা দিয়েছে,, এটা দিয়ে চুলে খোপা করে।
অর্পনা কিছুটা হতাশ হলো,, বড়োলোকদের বড়ো সড়ো ব্যাপার। পরশী দিয়েছে ওয়াচ,, অর্পনার এটা বেশ পছন্দ হয়েছে। পরপর তার বন্ধু মহলের গিফ্ট বক্সটা নিলো,, সে জানে হারামি গুলো এমন কিছু দিবে যা দেখলে তার রাগ বাড়বে তবুও সে উচ্ছাসের সহিত সেটা খুললো। যা ভেবেছিলো আংশিক সত্যি হয়েছে,, দুটো বই দিয়েছে যার নাম উচ্চারন না করাটাই ব্যাটার সাথে কয়েকটা বেবিদের ড্রেস আর খেলনা। এগুলো দেখে আরও বেশি বিরক্ত হলো অর্পনা। তার বেবি পছন্দ না। এইসবের মাঝে একটা ছোট্ট বক্স পেলো,, তীব্র অনিহা নিয়ে খুললো সেটা। তবে খোলার সাথে সাথে চমকে গেলো,, একটা ছোট সুপিচ যেখানে একটা মেয়ে গিটার হাতে গান করছে,, গিটারটা অসম্ভব সুন্দর, অর্পনা সেটা ছুয়ে দিলো,, নাড়াচাড়া করতেই বুঝলো এটা খোলা যায়। অর্পনা গিটারটা খুলে হাতে নিতেই বুঝলো এটা রুপোর তৈরি। অর্পনা অনুভব করলো বার্থডেতে পাওয়া সেরা গিফ্ট এটা,, সে গান প্রেমি মানুষ, আর তার বন্ধুরা তাকে সেই প্রেম গিফ্ট করেছে,, এর থেকে ভালো আর কি হতে পারে? সর্বশেষ একটা বেনামি গিফ্ট বক্স পেলো,, এটা কে দিয়েছে? জানা নেই। গিফ্ট বক্সটা বেশ বড়ো আর ভারি। অর্পনা টেনে নিজের কাছে আনলো,, কেচি দিয়ে পুরো রেপিং প্যাপারটা কাটলো,, তবে বক্সটা বেশ আটসাট করে ফিলাপ করা তাই কোন দিক দিয়ে খুলবে বুঝতে পারছেনা। তখনি রুমের দরজা বন্ধ করার শব্দ হলো,, দ্বীপ এসেছে। অর্পনা ওর দিকে না তাকিয়েই গিফ্ট বক্স খোলার চেষ্টা করতে করতে বললো — একটু হেল্প করবেন?
,,, দ্বীপ এগিয়ে এলো, বক্সটা ঘুরিয়ে ঠিক জায়গায় এনে খুলে দিলো,, ঘরের উজ্জ্বল আলোয় চকচক করে উঠলো ভিতরে থাকা জিনিসটা,, অর্পনা বোকা বনে তাকিয়ে রইলো। এটা একটা গিটার আর সেই গিটার থেকে তার ফ্যাভারিট স্মেল আসছে। অর্পনা তাড়াহুড়ো করে গিটারটা তুলে নিলো,, উজন বেশ ভারি। তার পারশোনাল গিটারের থেকেও এক কিংবা দের কেজি বেশি হতে পারে। অর্পনা খুটিয়ে খুটিয়ে দেখলো গিটারটা,, গিটারের একপাশে নিখুঁত আকারে খোদাই করে লিখা “” Rockster Pritha Jaman “” অর্পনা তাজ্জব বনে গেলো,, সে এতোটাও আশা করেনি। আর সে এতো বড়ো সিঙ্গার কিংবা ব্যান্ড নিয়ে গান করেনা যে তার নামের আগে রক শব্দটা ইউজ করবে। তার আর বুঝতে বাকি নেই এই বেনামি গিফ্টটা কার? সে গিটারটা নাকের কাছে নিয়ে শ্বাস টানলো। আগর কাঠের ঘ্রান,, কেমন পাপ্পা পাপ্পা ঘ্রাণ আসছে,, অর্পনা প্রান ভরে নিশ্বাস নিয়ে বিমোহিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো — এটা কি আগর কাঠ দিয়ে তৈরি?
,,, দ্বীপ মাথা নাড়িয়ে শায় জানালো,, মৌখিক উত্তর না পেয়ে দ্বীপের দিকে তাকালো অর্পনা। আচরন দেখে মনে হলো দ্বীপ ঠিক নেই। কেমন ঘন ঘন নিশ্বাস নিচ্ছে আর হাসফাস করছে। বাহিরে মেঘলা দিন,, ভিতরে ফ্যান চলছে তবুও কেমন ঘেমে যাচ্ছে। অর্পনা গিটার রেখে দ্বীপের কাছে এগিয়ে এলো,, গালে মুখে হাত বুলিয়ে বললো — কি হয়েছে আপনার? শরীর খারাপ লাগছে? ঔষধ খাননি?
,,,, দ্বীপ মাথা নাড়িয়ে না বুঝালো,, অর্পনা তাড়াহুড়ো করে বিছানা থেকে নেমে ট্রলি থেকে ঔষধ বের করে পানি সমেত এগিয়ে এলো। দ্বীপের মুখে দিয়ে কিছুটা শাসনের স্বরে বললো– ঠিক মতো ঔষধ না খেলে এমন তো হবেই,, আপনি কি বাচ্চা? যে প্রতিবেলায় আমি বাচ্চা ভুলানোর গল্প শুনিয়ে ঔষধ খায়িয়ে দিবো?
,,, দ্বীপ অর্পনাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো,, অর্পনার ছোট বুকে মুখ গুজে মিশে রইলো। দ্বীপ বিছানার এক কোনায় বসে, অর্পনা ঠিক তার সামনে দাড়িয়ে দ্বীপের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। এরকমটা সচারাচর হয়না,, পারশোনাল মোমেন্ট ব্যাতিত কখনোই স্বামীরা স্ত্রীর বুকে মাথা রাখেনা বরং সির দাড়া সোজা রেখে তারাই স্ত্রীকে বুকে আগলে রাখে। অথচ তাদের বেলায় বিপরীত,, অর্পনার সির দাড়া শক্ত,, শক্ত বলেই হয়তো একজন পাগলকে সুস্থ করতে পেরেছে,, একটা পাগলকে সুস্থ করার গল্পটা যতো সহজ বাস্তবতা তার থেকে বহুগুন কঠিন। তার এই আগলে রাখাটাই দ্বীপকে বাধ্য করেছে অর্পনাকে নিয়ে ভাবতে,, ভসলোবাসতে। অর্পনা দ্বীপের মুখ তুলে উড়না দিয়ে ঘাম মুছে দিতে দিতে বললো — খুব খারাপ লাগছে?
,,, অনেক, দম বন্ধ হয়ে আসছে, মাথার পিছনটা খুব ব্যাথা করছে আর বুকের ভিতরটা শুকনো ক্ষরার ন্যায় চৌচির হয়ে আছে।
,,, অর্পনা জানে এটা নেশা না করার ফল,, সে লোকটাকে কয়েকবার বলেছিলো রিহ্যাব সেন্টারে গিয়ে কয়েক মাস থেকে আসতে কিন্তু উনি তাকে ছাড়া একদিন ও থাকতে পারবে না। গেলে ওকেও সাথে যেতে হবে,, অর্পনা একবার ভেবেছিলো যাবে কিন্তু ওখানকার পরিবেশ সাস্থকর নয়,, এর চেয়ে ব্যাটার বাড়িতে থেকেই চিকিৎসা করা। অর্পনা যখন দ্বীপকে পায় তারপর থেকেই দ্বীপ নেশা ছেড়ে দিয়েছিলো ,, তখন থেকেই পুরো দমে তার নেশার বিপরীতে চিকিৎসা চলতো৷ মাঝে যা খেয়েছে,, যা করেছে সবটা ইচ্ছা করে করেছে,, এখন ভুগছে,, ভালো হয়েছে,, আরও ভুগুক। আরও ভুগুক ভাবতে গিয়েও ভাবতে পারলো না রমনি। এটা তার হাসবেন্ড, ভালোবাসার জিনিস, সে মরে গেলেও খারাপ চাইতে পারেনা। অর্পনা খানিক ভেবে তোয়ালে ভিজিয়ে আনলো,, দ্বীপ হাঁসফাঁস করতে করতে শার্টের বোতাম খুলে ফেললো,, অর্পনা হেল্প করলো বাকিটা। তোয়ালে দিয়ে মনোযোগ সহকারে শরীর মুছে দিতে লাগলো। অর্পনার এই রুপটা দ্বীপ যখনি দেখে অবাক হয়। এই মেয়েটাকে বাহির থেকে দেখলে কেউ বিশ্বাস করতে চাইবে না যে মেয়েটা কারোর এতোটা খেয়াল রাখতে পারে। দ্বীপ ধীরে ধীরে কেমন করে যেনো এই রমনির উপর নির্ভরশীল হয়ে পরেছে,,, এখন অর্পনাকে ছাড়া কিছু ভাবতে পারেনা। এক পা চলতে পারেনা,, তাকে মায়ায় বাধার জন্য এই যত্নটুকুই বোধহয় প্রথম ধাপ ছিলো। অর্পণা এমন একজন স্ত্রী যার কাছে দ্বীপ নিজেকে খোলা বইয়ের মতো প্রকাশ করতে পারে,, আলাদা কোনো মুখস পরতে হয়না। অর্পনা শরীর মুছতে মুছতে প্রশ্ন করলো — এখন কিছুটা ব্যাটার লাগছে?
,,, দ্বীপ শায় জানালো,, সত্যি ই ব্যাটার লাগছে। অর্পণা দ্বীপের গালে, মুখে হাত বুলিয়ে দিয়ে ছোট ছোট চুমু খেয়ে বললো — আমার জন্য আপনাকে কতো কষ্ট করতে হচ্ছে,, আমায় ছেড়ে দিচ্ছেন না কেনো? কি আছে আমার মাঝে?
,,, অসুস্থ অবস্থায় ই মুচকি হাসলো দ্বীপ,, বললো– আফিমের নেশা,, যেটা পৃথিবীর সকল নেশাকে হাড় মানায়।
,,, দ্বীপের উন্মুক্ত বুকে হালকা চামর মারলো অর্পনা– আপনি সত্যি ই একটা পাগল। শুয়ে পরুন,, আমি এগুলো গুছিয়ে রেখে আসছি।
,,, আরও একবার মুখ, গলা, শরীর মুছে দিয়ে সরে এলো অর্পনা। দ্বীপ যেদিকে বসে আছে সেদিকের মাথায় বড়ো কুসন রেখে তার উপর ছোট কুসন রেখে দিলো। লোকটা কোনো দিক বিবেচনা করে ঘুমায়না। উনাকে যেদিকেই জায়গা দেওয়া হোক,, সেই ওর উপরেই চলে আসবে। ব্যাস্ত ভঙ্গিতে বিছানা গুছাতে থাকা অর্পনার উড়না টেনে ধরলো দ্বীপ। অর্পনা ছেড়ে দিলো,, দ্বীপ হতাশ। বরাদ্ধকৃত বালিশে মাথা হেলিয়ে বললো– আমায় পাগল করে পালিয়ে যাওয়াটা তোমার স্বভাব নাকি ইচ্ছা করেই করো?
,,, অর্পনা পাত্তা দিলোনা,, গিফ্টগুলো গুছিয়ে রেখে গিটারটা হাতে নিলো,, এটা রাখতে ইচ্ছা করছে না। সে আবারও প্রান ভরে নিশ্বাস নিলো। লোকটা তাকে এতো বড়ো একটা উপহার দিবে সে ভাবতেও পারেনি। তার পারশোনাল গিটারটা বেশ পুরোনো,, আগে পাপ্পা গান পছন্দ করতো না তাই লুকিয়ে লুকিয়ে টাকা জমিয়ে ওটা কিনেছিলো। তারপর যখন সে ট্রমাটাইস্ড হয়ে গেলো তখন আরশাদ জামান নিজে থেকেই মেয়ের হাতে গিটার তুলে দিলেন। এখন ভাবছে ঐ গিটারটাকে আপাতত মুক্তি দিবে,, বড্ড বয়স হয়েছে তার। দ্বীপের মাথায় খুব যন্ত্রনা হচ্ছে,, সে একহাতে মাথা ডলতে ডলতে অর্পনার দিকে তাকিয়ে রইলো। অর্পনা গিটারটা বিছানার একপ্রান্তে রেখে দ্বীপের কাছে এলো,, মাথা থেকে দ্বীপের হাত সরিয়ে টিপে দিতে দিতে বললো,,
,,, আপনার পছন্দের রং কি?
,,, দ্বীপ চোখ বুঝে হালকা স্বরে বললো– তোমার স্কিন টোন এন্ড ইউ লাইক্স ব্লাক।
,,, অর্পনা অবাক হলো– বাহ!! এটাও জানেন?
,, তোমার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সবটা আমার জানা।
,,, আপনার ফেভারিট প্লেইস? যেখানে গেলে আপনার মন ভালো হয়ে যায়?
,,, তোমার বুকে মাথা রাখলে সব ভুলে যাই আমি।
,,, ফেভারিট হবি?
,,, তোমাকে পারমানেন্টলি নিজের করে পাওয়া।
,,, ফেভারিট স্মেল?
,,, তোমার চুলের ঘ্রাণ।
,,, ফেভারিট খাবার?
,,, তুমি!!
,,, এই প্রতিটা উত্তর অর্পনার মাথায় রাগ চরিয়ে দিয়েছে কিন্তু লাস্টের এটা কি ছিলো? সে উনার প্রিয় খাবার?তাকে কোন দিক থেকে খাবারের মতো দেখায়? লোকটা কি নেশা টেশা করে এসেছে নাকি? অর্পনা মুখ নামিয়ে দ্বীপের বুকে, মুখে ভালো করে গন্ধ শুকলো,, নাহ নেশা করেনি। পরিক্ষন শেষে মুখ তুলে সরে আসতে চাইলে দ্বীপ আটকে দিলো, অর্পনা ঘবড়ালো না। নিজের হাসবেন্ডের কাছে ঘাবড়ানোর মতো ন্যাকামিটা তার দ্বারা সম্ভব না। সে আরেকটু এগিয়ে গিয়ে দ্বীপের মুখের কাছে ঝুকলো। কনুই রাখলো দ্বীপ কাধের বাপ পাশের বালিশে,, মুখে আছ্তে করে ফু দিলো। দ্বীপ ঠোঁট টিপে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো — তুমি রিতিমতো আমাকে টিজ করো,, আচ্ছা!! তুমি সত্যি মেয়ে তো? আমার ডাউট হচ্ছে।
,,, অর্পনা ডন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে বললো– ওটা পরে জানবেন,, আগে বলুন সব কিছুতে আমি ই কেনো?
,,, আপাতত তোমায় ছাড়া কিছু ভাবতে পারিনা।
,,, অর্পনা ভ্রু উচিয়ে মাথা ঝাকালো যেনো বিশ্বাস হলোনা কথাটা– অতি ভক্তি চোরের লক্ষণ
,,, দ্বীপ মুখ উচিয়ে অর্পনার নাকে চুমু খেলো — ওহুম!! তোমার প্রতি ভক্তি প্রেমে পরার লক্ষন।
,,, অর্পনা হেসে ফেললো,, দ্বীপের কপালে পরা চুলগুলো সরিয়ে দিতে দিতে বললো — আমায় এতো বিশাল একটা গিফ্ট দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ,, অনেক কস্ট পরেছে তাইনা? কাস্টোমাইজ করে বানিয়েছেন?
,,, দ্বীপ শায় জানিয়ে অর্পনা গাল ছুয়ে কপালে চুমু খেয়ে বললো — কস্ট টা ম্যাটার করেনা,, আমি শুধু তোমায় হেপি দেখতে চাই।
,,, অর্পনা পুলকিত হলো, লাইট নিভিয়ে দ্বীপের বুকে মাথা রেখে উপরে সম্পূর্ণ ভার ছেড়ে দিলো। বুকে আঁকিবুঁকি করতে করতে বললো — আপনি আমায় এতো বড়ো একটা উপহার দিলেন আর আমি কিছুই দিলাম না,, বিষয়টা কেমন হলো না? কি চান আপনি?
,, তুমি ব্যাতিত অন্য কিছু চাওয়ার নেই।
,,, আমি তো আপনারি,, আর কি চান?
,,, ওয়াদা করো যাই হোক আমাকে ছেড়ে যাবেনা।
,,, আপনায় ছেড়ে আমি কোথায় যাবো? আমার আর কেউ আছে? জানেন ই তো সবটা,,
,,, কেউ থাকলে চলে যেতে নাকি?
,,, যেতে চাইলে দিবেন?
,,, মেরে, কেটে, এসিডে চুবিয়ে সমুদ্রে ভাসিয়ে দিবো।
,,, অর্পনা শব্দ করে হেসে ফেললো — এসবি করেন?আমি যদি পুলিশের কাছে গিয়ে সব বলে দেই?
,,, আমিও বলে দিবো, তুমি পাঁচটা খুন করেছো।
,,, এতে ফায়দা কি?
,,, দুজন কারাগারে যাবো,, যাবত জীবন কারাবাস হবে তারপর ওখানে গিয়ে বিনা টাকায় সংসার করবো সাথে বাসর ও।
,, আহাগো, সোনাগো আমার। আপনার আর আপনার বউকে বাসর করতে দিবে বলেই তো থানার উৎপত্তি,, এখনো যাচ্ছেন না কেনো? কালকেই গুছগাছ করে নিবেন,, কেমন?
,,, দ্বীপ নিজেও শব্দ করে হেসে ফেললো অর্পনাকে বেগের সাথে শক্ত করে চেপে ধরলো। এই মেয়েটার মাঝে এতো শান্তি কেনো? মেয়েটা তার বউ বলে নাকি মেয়েটা আগা গোড়া পুরোটাই শান্তি। দ্বীপ আবদার করলো– একটা গান শুনাবে?
,,, আপনি সাথ দিলে শুনাবো।
,,, ভালো লাগছেনা ভেলোরা, অন্য কোনোদিন একসাথে গাইবো।
,,, তাহলে ঘুমান,অন্য কোনোদিন ই শুনাবো।
,,, হাড় মানলো দ্বীপ — গিটারটা নিয়ে আসো।
,,, অর্পনা উঠে দাড়ালো, লাইট জ্বালালো না। অন্ধকারে থাকতে থাকতে অন্ধকার তার মুখস্থ। সে গিটার আনতেই দ্বীপ বালিশ সোজা করে হেলান দিয়ে বসলো, অর্পনা গিটার নিয়ে দ্বীপের বুকে হেলান দিয়ে বসলো। দ্বীপ অর্পনার পেট পেঁচিয়ে ধরে গিটারে টুংটাং শব্দ করলো। সে গিটার বাজাতে জানে, গান ও পারে তবে কখনো তেমন করে গাওয়া হয়নি। দ্বীপের আঙুলের সাথে সাথে অর্পনাও আঙুল মিলালো,, শব্দটা যে আহামরি ভালো আসছে এমন নয়। তবে দুজনের মধ্যকার অনুভুতিটা প্রখর,, অর্পনার ফোনে লাইভ চলছে,,,
আমি শুনেছি সেদিন তুমি
সাগরের ঢেউয়ে চেপে
নীলজলের দিগন্ত ছুঁয়ে এসেছো
আমি শুনেছি সেদিন তুমি
নোনা বালি তীর ধরে
বহুদূর বহুদূর হেঁটে এসেছো
আমি কখনো যাইনি জলে,,
কখনো ভাসিনি নীলে,,,
কখনো রাখিনি চোখ ভরা ঢেউ গাঙচিলে
আবার যেদিন তুমি,,, সমুদ্র স্নান-এ যাবে
আমাকে ও সাথে নিও,,
নেবে তো আমায় বল,, নেবে তো আমায়
রাত ১২ টা বেজে ২৮।
,,, তীব্র পানি পিপাশা পাওয়ায় বোতল হাতরে পানি না পেয়ে বিরক্ত হলো রাত্রি,, পাশে শুয়ে থাকা ইরার দিকে তাকাতেই দেখলো মহারানি কার সাথে যেনো চ্যাট করছে। গতোকাল ও দেখেছে রাত জেগে কোনো একজনের সাথে একনাগারে চ্যাট করে গিয়েছে। তখন বিষয়টা পুরোপুরি পাত্তা না দিলেও আজ কিছুটা সন্দেহ হলো। সে গলা খাকারি দিয়ে ইরার মনোযোগ পেতে চাইলো অথচ এই সামান্য শব্দেই হকচকিয়ে উঠলো মেয়েটা। চমকানোর দরুন ফোনটা হাত থেকে সোজা নাকের উপর ছিটকে পরলো। ব্যাথায় ককিয়ে উঠলো ইরা তবুও ফোন ছাড়লো না। তাড়াহুড়ো করে ফোন লুকিয়ে রাতের দিকে তাকিয়ে বললো — এভাবে কেউ গলা খাকারি দেয়? ভয় পেয়েছি তো।
,,, রাত্রি চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে বললো — তুই প্রেম ট্রেম করছিস নাকি? সারা রাত জেগে কার সাথে অতো কথা বলিস?
,,, ইরা কিছুটা ঘাবরে গেলো,, আমতা আমতা করে বললো — প,,প্রেম! প্রেম কেনো হতে যাবে? আর কে বললো আমি রাত জেগে কথা বলি? এইতো মাত্রই মেসেজের রিপ্লাই দিলাম।
,,, প্রেম তো তুই করছিস ই কিন্তু আমাদের বলতে চাসনা। বহুদিন ধরেই দেখছি কিছু একটা লুকাচ্ছিস। মাঝে তিন সপ্তাহ ভালো করে ভার্সিটিতে আসিস নি, কই কই ঘুরেছিস। জিজ্ঞেস করলে বলিস, পারশোনাল। তদের এতো কি পারশোনাল থাকে বোন? বুঝে পাইনা।
,,, ইরা এবার সিরিয়াস হলো,,কাটকাট গলায় বললো– পারশোনাল প্রবলেম তো তর ও ছিলো রাত,, আমরা কখনো কিছু বলেছি?
,,, ইরার কাট কাট জবাবটা পছন্দ হলো না রাতের,, বন্দু মহলের বন্ধু গুলো কেমন পালটে যাচ্ছে। সে অভিমানি কন্ঠে বললো– নাহ!! বলিসনি,, জানতেও চাসনি। তবে এখন তো জেনেছিস,, আমার যে বাবা নেই এটা জানিস না?
,,,, রাত্রিকে অভিমান করতে দেখে নরম হলো ইরা। দুহাতে জড়িয়ে ধরলো ওকে — রাগছিস কেনো রাত? সোনা আমার!! রাগিস না। আমায় একটু সময় দে,, আমি সবটা জানাবো তদের। আমার ময়না পাখি,, তকে না আমি কত্ত ভালোবাসি? রাগ করেনা।
,,, ইরার গদগদ বচনে গলে গেলো রাত্রি,, ইরার হাত টেনে তাতে মাসাজ করতে করতে বললো — এতোই যখন ভালোবাসিস তখন নিচ থেকে এক বতল পানি এনে দে,, পানি আনতে ভুলে গিয়েছি। প্রচুর পানি পিপাসা পেয়েছে।
,,,রাতের পানি পিপাসা পেয়েছে জেনে উঠতে চাইলো ইরাদ, তখনি ফোন ভাইব্রেট করে উঠলো। বুঝাই যাচ্ছে, অনেক্ক্ষণ যাবত রিপ্লাই না পেয়ে ওপাশে থাকা ব্যাক্তি কল করছে। ইরা ফোন কেটে উঠে বসতেই আবারও কল এলো। বিরক্ত হলো রাত,, বোতল হাতে সেই বিছানা ছাড়লো। ধুপধাপ পা ফেলে যেতে যেতে বললো — তোমার পেয়ারের মানব তোমাকে চোখে হাড়াচ্ছে,, তার সাথেই কথা বলো।
,,, ইরাদ হতাশ হলো,, দ্রুত ম্যাসেন্জারে ঢুকতেই দেখলো এইটুকু সময়ে ২৮ টা মেসেজ পাঠিয়েছে। ঠোঁট কামরে হাসলো সে,, লোকটা এতো অধৈর্য হলো কবে থেকে? পাগল নাকি?
,,, ঘুমে ঢুলতে ঢুলতে ফিল্টার থেকে পানি ভরছিলো রাত্রি,, হঠাৎ পিছনে কারোর পায়ের শব্দ শুনে সেদিকে তাকালো। পল্লব মাত্রই বাড়িতে ঢুকেছে,, কেমন অগোছালো দেখাচ্ছে,, বাতাসের সাথে সিগারেটের স্মেল আসছে। রাতের তাকিয়ে থাকার মাঝেই চোখাচোখি হলো দুজনের। রাতকে দেখে দাড়িয়ে রইলো পল্লব,, মেবি কিছু বলবে তবে রাত শুনবে না। আপাতত সে পল্লবের সাথে রাগ করেছে,, ইফতারের আগে সবাই মিলে রাগ ভাঙানোর পরেও তার দেমাগ কমেনা। এতো দেমাগ দেখালে তারো ওর মতো বন্ধুর সাথে কথা বলার প্রয়োজন নেই। বোতল ভর্তি হতেই ফিল্টার বন্ধ করে ফিরে যাবার জন্য পা বাড়ালো রাত্রি,, পিছন থেকে ডাকলো পল্লব — রাত!!
,,, না চাইতেও দাড়ালো রাত, — কিছু বলবি?
,,,পল্লব এগিয়ে এসে একটা মিডিয়াম সাইজের পলিথিন ভর্তি মুড়ি মাখা ওর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললো — ইরাদ মেবি জেগে আছে,, পরশিকে নিয়ে খাস।
,,, রাত্রি আড় চোখে মুড়ির দিকে তাকালো,, খেতে ইচ্ছা করছে কিন্তু সে রেগে আছে। পল্লব যতক্ষন না সরি বলবে সে খাবেনা এটা। সবার সাথে যেমন ধারা অভিমান করে তেমনি অভিমানি স্বরে বললো — পরশীকে দেওয়ার হলে রুমে গিয়ে দিয়ে আয়,, আমার এসবের প্রয়োজন নেই।
,,, পল্লবের কেনো যেনো রাগ হলো,, সে কিছুটা ধমকের স্বরে বললো — ঘড়ির দিকে তাকা,, রাত সারে বারোটা বাজে। এতো রাতে হাড়িকেন দিয়ে খুজলেও বিচে একটা মুরি ওয়ালা মামাকে খুজে পাওয়া যাবেনা। তবুও বহু খুজে বাড়িতে গিয়ে এটা জোগাড় করে এনেছি,, নাটক করিস না।
,,, তকে কেউ আনতে বলেছিলো?
,,,, নিবি নাকি নিবিনা? ওইটা বল।
,,, নিবো না।
,,, ফেলে দিবো?
,,,, দে।
,,, বাড়াবাড়ি করছিস না? অরুনকে ডাকবো?
,,, ডাকলে কি হবে? ওকে ভয় পাই আমি?
,,, ভালো তো বাসিস,, ওর কথা শুনবিনা?
,,, শুনবো,, ও কিছু দিলে নিবো ও কিন্তু,,,
,,, রাত কথা শেষ করার আগেই দাতে দাত চেপে বললো পল্লব — আমি দিলে নিবিনা তাইতো? ওহ হে!! আমি তো আপনার জীবন নষ্ট করার জন্য বসে আছি। সরি মেডাম, মাফ করবেন। আপনার জন্য এসব আনাই আমার ভুল হয়েছে।
,,, বলতে বলতে সত্যি ই মুরির থলিটা নিচে ফেলে দিয়ে তাতে লাত্থি মারলো। রাত্রির চোখে পানি জমা হলো,, অভিযোগের স্বরে বললো — তর ব্যাবহার খুব খারাপ,, সামান্য একটা কথা বলায় সকাল থেকে কি ব্যাবহারটা করে যাচ্ছিস? এটুকু বলায় তর কোনো ক্ষতি হয়েছে? মহাভারত অশুদ্ধ হয়েছে?
,,,কয়েক পা এগিয়ে এলো পল্লব, রাতের সামনাসামনি দাড়িয়ে শক্ত কন্ঠে বললো– কি করছি তরে আমি? ধমক দিছি? বকছি? মারছি? কি করছি? বল।
,,, রাতের চোখ থেকে কয়েক ফোটা পানি গড়ালো, বন্ধু গুলো সত্যি ই পাল্টে যাচ্ছে। সে ফের অভিযোগের স্বরে বললো — তুই পাল্টে যাচ্ছিস পল্লব,, তুই এমন ছিলি না। আমার সামান্য কথায় অসামান্য রাগ দেখাচ্ছিস। দেখিস, আর কখনো কথা বলবো না তর সাথে। ওসব মুরি টুরি কখনো ছুয়েও দেখবো না।
,,,বলে সামনের দিকে হাটা দিলো। পল্লব অন্যদিকে ফিরে মাথার চুল টেনে ধরে বললো — খরচ করার মতো অতিরিক্ত টাকা আছে তো তাই টাকার মূল্য বুঝিস না। বাপের হোটেলে খাই, সামান্য এইটুকু টাকা পেতে হলেও বাপের হাজারটা খোটা শুনতে হয়। তুই কি বুঝবি?খোটা তো আর তকে শুনতে হয়না।
৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৫২
,,, রাত্রি দাড়িয়ে পরলো, ফিরে এসে পল্লবের লাত্থি দেওয়া মুরিটাই নিলো। সামনের দিকে আবারও হাটা দিয়ে বললো — বাপ নেইতো তাই শুনতে হয়না,, থাকলে হয়তো শুনার ভাগ্য হতো। আমার জন্য আর কখনো টাকা খরচ করিস না তুই, সম্মানে লাগলো খুব।
,,, ঘাড় বাকিয়ে শক্ত দৃষ্টিতে তাকালো পল্লব,, ওকে টাকার খোটা দিয়েছে সে? ব*লদের বাচ্চা!! কোনোকিছু বুঝনা, বুঝতেও চায়না। এটাকে খুন করতে পারলে দু-দন্ড শান্তি মিলতো।
