৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৬৪ (২)
রুপান্জলি
ক্যাম্পাসের এক কোণায় মনমরা হয়ে বসে আছে পাঁচটি মাথা। আজ সেভেন্থ সেমিস্টারের রেজাল্ট দিয়েছে। তার মানে অনার্সের আর একটা সেমিস্টার বাকি। অষ্টম সেমিস্টার শেষ হলেই অনার্সের ইতি ঘটবে। তারপর মাস্টার্স করতে মোটে এক বছর। তারপর তো ভার্সিটি লাইফ শেষ। এই আড্ডা, এই মুহূর্ত, এই জীবন আর কখনো ফিরে আসবে না। সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়বে নিজের মতো। এই তো ইদানীং কেমন সবকিছুই পাল্টে যাচ্ছে। ইরাদ নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকে, তাই রেগুলার ভার্সিটিতে আসতে পারে না। ধীরে ধীরে তার ব্যস্ততা আরও বাড়বে। তখন হয়তো আসবেই না। অর্পনা হার্ট ট্রান্সপ্লান্টের পর টুকটাক অসুস্থ থাকে। শরীর উইক হওয়ার কারণে মাঝেসাঝেই মাথা ঘুরে পড়ে যায়। এই কারণে দ্বীপ ওকে খুব একটা ভার্সিটিতে আসতে দেয় না।পল্লবটা ইদানীং একটু বেশিই ছন্নছাড়া হয়ে যাচ্ছে। পড়ালেখায় মন নেই। সারা রাত না ঘুমিয়ে ছাদে বসে থাকে। রাতবিরেতে বেরিয়ে গিয়ে কোথায় কোথায় চলে যায়, ফিরে আসে মাঝরাতে। এসব নিয়ে প্রায়ই ওর বাবার সঙ্গে ঝামেলা হয়। সেদিন অনাহিতা আপু অর্পনাকে কল করে পল্লবের নামে নালিশ করল। সঙ্গে আরও একটা কথা জানাল, যার আশঙ্কা বহুদিন যাবৎ করছে অর্পনা। আশঙ্কা মিলে যাওয়ায় খুব একটা সন্তুষ্ট হয়নি সে। বহুবার ভেবেছে পল্লবের সঙ্গে কথা বলবে, কিন্তু বলা হয়ে ওঠে না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে কিছু কিছু ঘটনা কিংবা অনুভূতি প্রকাশ না করাই ভালো। এতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকে, সম্পর্কগুলো সুন্দর থাকে।
এদিকে অরুণের কী হয়েছে কে জানে! সে ইদানীং রাত্রিকে বিয়ে করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। সে এখন বিয়ে করতে চায়, এখন মানে এখনই। রাত্রিকে ছাড়া একটা মুহূর্তও কাটাতে রাজি না। অলরেডি বাবা-মাকেও জানিয়ে দিয়েছে ব্যাপারটা। প্রথম দিকে অরুণের বাবা-মা নাখোশ হলেও যখন জানতে পারল রাত্রি দ্বীপ জোহান মির্জার শালি, তখন সবকিছু মেনে নিলেন। তারা ছেলের বউ হিসেবে রাত্রিকে মেনে নিতে রাজি। অর্পনা আগেই জানত উনারা রাজি হবেন। মন্ত্রীর বাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক করার মতো সুযোগ অন্তত তাদের মতো ক্ষমতালোভী মানুষরা হাতছাড়া করতে রাজি হবে না। কিন্তু রাত্রি এখন বিয়ে করতে চায় না। সে মাত্রই একজন বাবা পেয়েছে। কয়েকটা বছর সে বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকতে চায়, অন্তত মাস্টার্স কমপ্লিট করার আগ পর্যন্ত। এ নিয়ে দুজনের মাঝে কিছুদিন আগে পর্যন্ত ঝামেলা চলছিল। যার ফলস্বরূপ বিষয়টা নিয়ে পাপ্পার সঙ্গে কথা বলতে বাধ্য হয়েছে অর্পনা।
আরশাদ জামান ছোট মেয়েকে সাফ সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, অরুণ যখন চায় তখন তাদের বিয়ে হবে, তবে এখন না। অনার্স কমপ্লিট হওয়ার পর। রাত্রি মেনে নিয়েছে। তার জীবনে পাপ্পা যা বলবে তাই হবে। পাপ্পার ওপর সে একটা কথাও রাখতে চায় না। বিষয়টা অরুণকে জানাতেই, সপ্তাহখানেক আগে বাবা-মাকে আরশাদ জামানের বাড়িতে পাঠিয়েছে। রাত্রির বাবা হিসেবে আরশাদ জামানকে পেয়ে প্রথমে অরুনের বাবা মা প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকালেও যখন অর্পনা জানাল আরশাদ জামান হতে পাওয়া সকল সম্পত্তি সে রাত্রির নামে ট্রান্সফার করে দিয়েছেন, তখন আর কথা বাড়াল না। দুই পরিবার মিলে কথাবার্তা বলে বিষয়টা অনেক দূর পর্যন্ত এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে। আশা করা যায়, ছয় মাসের মাথায় অষ্টম সেমিস্টার শেষ হলেই অরুণ আর রাত্রির বিয়ের কাজটা সেরে ফেলবেন উনারা। এটাই ভালো হবে। অর্পনার মতে, যত দ্রুত অরুণ আর রাত্রির বিয়েটা হয়ে যাবে, ততই মঙ্গল।
সময়টা নভেম্বরের শুরুতে হওয়ায় টুকটাক শীত পড়েছে। যার ফলস্বরূপ রোদে বসে থেকেও খুব একটা খারাপ লাগছে না তাদের। সবাই কেমন চুপচাপ বসে আছে। সবার চুপ থাকার মাঝে অরুণ পল্লবের কাঁধে হাত রাখল। কিছুটা ব্যথিত কণ্ঠেই আওড়াল—
— এমন একদিন সময় আসবে, যেদিন আমাদের দেখা করতে হলেও দিন, তারিখ, সময় ঠিক করে দেখা করতে হবে। জীবন এত দ্রুতগামী হয় কেন? পথ চলাটা আরও দীর্ঘ হলেও পারত।
অরুণের কথার বিপরীতে প্রতিটি মানব-মানবীর মন ভার হয়ে এল। রাত্রির চোখজোড়া ছলছল করে উঠল মুহূর্তেই। নাক টেনে কেঁদে উঠল মেয়েটা। পল্লব জানত এমনটাই হবে। সে বিরক্তিভরা কণ্ঠে ধমকাল—
— থাপ্পড় খাবি? তুই কথায় কথায় এত কাঁদিস কেন, ভাই? এত চোখের পানি কোথা থেকে আসে? আর কে বলে ভার্সিটির গণ্ডি পেরিয়ে গেলে দেখা করতে অতশত ভাবনা ভাবতে হবে? অরুণ তো তোর স্বামী, অর্পনা তোর বোন। ইরাও এখন থেকে ঢাকায় থাকবে। আমি-ও এত দ্রুত মরে যাচ্ছি না। মরতে মরতে খুব দেরি। চাইলেই দেখা করা যাবে, হুটহাট আড্ডা দেওয়া যাবে
পল্লব কথাটা মজার ছলে বললেও অর্পনার বোধহয় কোথাও গিয়ে একটু লাগল। চট করেই তাকাল পল্লবের দিকে। ছেলেটার মনে কী যে চলে, মুখ দেখে কেন বোঝা যায় না? এতটা নিখুঁত অভিনয় জানাটা কি খুব প্রয়োজন? না তো, একদমই না। যেখানে তার মতো একজন উন্নত মানের অভিনেত্রীও দ্বীপ মির্জার কাছে নিজেকে ভেঙে গুঁড়িয়ে ফেলেছে, সেখানে পল্লব কে এমন অভিনেতা? তাহলে কি পল্লবের জীবনেও এমন কাউকে আনা প্রয়োজন, যে পল্লবকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়ে নিজের মতো করে নেবে? তবে সেই মানুষ কোথায় পাবে অর্পনা? পরশী হতে পারত, কিন্তু পরশীর বিষয়ে পল্লব বোন ব্যতীত অন্য কোনো অনুভূতি আনতে পারে না। এ নিয়ে পল্লবের সঙ্গে কথা হয়েছে অর্পনার। কিন্তু ছেলেটা সাফ জানিয়ে দিয়েছে, পরশীকে সে বোন মানে। এরপর আর জোর করা যায় না। ওদিকে পরশীটাও ইদানীং পল্লবের কথা বলা ছেড়ে দিয়েছে। হয়তো বুঝতে পেরেছে, এই পথ তার জন্য নয়। এমনটা হয়। কিশোর বয়সে কিশোরীরা একটু ফ্যান্টাসিতে ভোগে, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মিলিয়ে যায়। রাত্রি দুহাতে গাল মুছে পল্লবের দিকে তাকাল। চোখে তীব্র অভিমান। চোখ সরিয়ে নিল পল্লব। এই মেয়ের অভিমান-অভিযোগের খেলাগুলো বড্ড বিরক্তিকর। এসব অরুণকে দেখাক, তার সঙ্গে কী? সে কি কখনো এরকম কোনো প্রশ্রয় দিয়েছিল এই মেয়েকে? না তো, দেয়নি। নেহাতই ন্যাকাটা কাঁদলে পল্লবের বিরক্ত লাগে। কানটা ধরে আসে, আর কোথায় কোথায় যেন কেমন লাগে। সেসব মনে মনেও প্রকাশ করতে চায় না সে। এসব প্রকাশ করলেই বিপদ। পল্লবের ধমক শুনে চুপসে গেল রাত্রি। অনেক ভাবাভাবির পর নাক টেনে বলল—
— আই হ্যাভ আ বেটার প্ল্যান।
সবাই কেমন উৎসুক দৃষ্টিতে রাত্রির দিকে তাকাল, যেন জানতে চায় মেয়েটা কী এমন প্ল্যান বানিয়েছে, যার মাধ্যমে চাইলেই পাঁচজন একসঙ্গে থাকা যায়।সবার চাহনিতে ভরসা পেল রাত্রি। বিজ্ঞের ন্যায় গলা খাঁকারি দিয়ে বলল—
— চল, অষ্টম সেমিস্টারটা সবাই মিলে ড্রপ দিই। পাঁচজন একসঙ্গে ফেল করব। এই বছর ফেল করব, পরের বছর ফেল করব, করতেই থাকব, করতেই থাকব। এভাবেই সারা জীবন একসঙ্গে এই ভার্সিটিতে কাটিয়ে দেব।
রাত্রির বলা এত মনোমুগ্ধকর প্ল্যানে আত্মা জুড়িয়ে এল সবার। এত ভালো প্ল্যান বোধহয় এর আগে কেউ ঘুণাক্ষরেও আবিষ্কার করতে পারেনি। চার মূর্তি আবেগে আপ্লুত হয়ে কী থেকে কী করবে ভেবে পাচ্ছে না। অগত্যা রাত্রির পিঠে ধাম করে কিল বসাল ইরা। মুহূর্তেই কেমন কেঁপে উঠল পল্লব, সঙ্গে রাত্রিও ব্যথায় চিৎকার করে উঠল। অরুণ তখনও পল্লবের কাঁধ পেঁচিয়ে রেখেছিল। পল্লবকে কেঁপে উঠতে দেখে ভ্রু কুঁচকাল অরুণ। সন্দেহভরা দৃষ্টিতে তাকাতেই পল্লব দ্রুত পরিস্থিতি সামলে ইরার উদ্দেশে বলল—
— ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম তো ভাই। বলে-কয়ে মারবি না? এবার ঠিক আছে। আরেকটা মার, আমার ভাগেরটাও দে।
ইরা সত্যি সত্যিই মারল। তবে এই পর্যায়ে কিছুটা আস্তে মারল। অরুণের দৃষ্টি এবার স্বাভাবিক। তখনই ক্যান্টিন থেকে ছুটে এল সজল। হাতে পাঁচটা ক্যান আর আরেকটা চিরকুট। অর্পনা তা দেখে ভ্রু কুঁচকাল। সজলকে টাকা পরিশোধ করে চিঠির দিকে ইশারা করে শুধাল—
— এটা কী?
ছোট্ট সজল লাজুক হেসে বলল—
— চিঠি। ওই আপুটা পল্লব মামাকে দিয়েছে।
বলেই আঙুল তাক করল ক্যান্টিনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটির দিকে। সঙ্গে সঙ্গে পল্লব ব্যতীত সবাই মেয়েটির দিকে তাকাল। মেয়েটা বেশ সুন্দর, সুশ্রী, কান্তিময়। দেখে ভদ্র-সদ্রই মনে হচ্ছে। মেয়েটা বোধহয় ফার্স্ট ইয়ারের। তাই সুদর্শন যুবক ওয়াসিম জায়িনকে দেখে অনুভূতি সামলাতে পারেনি। এরকমটা আজ নতুন নয়। সুন্দর যুবক সঙ্গে নিয়ে ঘোরার অপরাধে প্রায়ই তাদের হাতে এরকম চিঠির আগমন ঘটে। অর্পনা চিঠিটা নিয়ে পল্লবের দিকে এগিয়ে দিল। পল্লব সেটা নিতে চাইলে হুট করেই সেটা টেনে ধরল রাত্রি। অকারণেই ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলল ভাঁজ করা কাগজখানা। তীব্র আশ্চর্য হলো সবাই। কিছু বলার আগেই রাত্রি পল্লবের চোখে চোখ রেখে উচ্চস্বরে বলে উঠল—
— আরও একটা মেয়ের মন ভাঙার পাঁয়তারা না? ক্যারেক্টারলেস। কদিন পরপর…
রাত্রির কথা ফুরানোর আগেই ধমকে উঠল অরুণ— রাত! তোকে এক কথা কতবার বলতে হবে? পল্লব কখনো কারও সঙ্গে প্রেম-ভালোবাসায় জড়ায়নি। ধীরে ধীরে বড় হচ্ছিস। এবার নিজের মাঝে কিছুটা ম্যাচিউরিটি আন।
রাত্রির হাসিখুশি মুখটা কেমন স্থির হয়ে এল। নিষ্পাপ, নিষ্প্রভ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল অরুণের দিকে।অর্পনা এবার অরুণকে ধমক দিল—
— কী শুরু করেছিস? সামান্য একটা ঘটনা। রাত, ছেঁড়া কাগজটা আমার হাতে দে। এরপর থেকে আর কখনো এসব করবি না। এগুলো ব্যাড ম্যানার্স।
রাত্রি যেন মুহূর্তেই ম্যাচিউর হয়ে গেল। ছেঁড়া কাগজটা অর্পনার হাতে দিয়ে পল্লবের দিকে তাকিয়ে বলল— সরি। আর কখনো এমন কিছু বলব না।
পরপরই উঠে দাঁড়াল। হনহন করে চলে গেল যেদিকে চোখ যায়। ইরা ঠাস করে অরুণের মাথায় থাপ্পড় মেরে রাত্রির পিছু পিছু যেতে বলল। অরুণও অপেক্ষা করল না। প্রেয়সী অভিমান করেছে, ভাঙাতে হবে যে।
পল্লব বিরক্তিভরা দৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়েই বলল—
— এই পাগল-ছাগল নিয়ে সংসার করবে কীভাবে? নাদান কোথাকার!
ইরা চট করেই বলে ফেলল— অথচ এই নাদানের জন্যই কেউ কেউ নিশ্বাস আটকে মরে যাচ্ছে।
ইরার কথায় থতমত খেয়ে গেল পল্লব। জীবনে প্রথম বোধহয় তোতলালো ছেলেটা—ক, কে? কে মরে যাচ্ছে? কা… কার কথা বলছিস?
ইরার চোখেমুখে বিষাদ। বুকের এক প্রান্তে হাহাকার। বন্ধু মহলে এরকম পরিস্থিতি কোনোদিন আসবে, তা ভাবাটাও বড্ড অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যাপার। পল্লবের তোতলানো দেখে অর্পনা কথা কাটাতে বলল—
— কার আবার? অরুণের। দোস্ত, চল একটু ক্যান্টিনে যাই। এবার কফি খাব, মাথা ধরেছে। এই ইরা, তুই নাদান আর নাদানের জামাইকে কল দিয়ে ক্যান্টিনে আসতে বল। আজ আবার আরাফাতকে নিয়ে তেজগাঁও যেতে হবে। বাইক চলে এসেছে।
বলতে বলতে উঠে দাঁড়াল। ইরা আর পল্লবও উঠে দাঁড়াল ততক্ষণে। অরুণ আর রাত্রি তাদের জন্য আনা ক্যানটা এখানেই ফেলে গিয়েছে। ইরা সেগুলো হাতে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বলল—
— আমরা কিন্তু আরাফাতের থেকে একটা ট্রিট পাওনা।
— চল তবে। (অর্পনা)
— না রে জান, বিকালেই প্রোডাক্ট ডেলিভারি দিতে হবে। (ইরাদ)
— তাহলে পল্লব, তোরা চল। (অর্পনা)
পল্লব মাথা ঝাঁকিয়ে সায় জানাল— আসব। তোরা কিনে বের হয়ে কল দিস। আমাকে আজ একটু নীলক্ষেত যেতে হবে। অহমিকা একটা বইয়ের আবদার করল, অনাহিতা আপুর জন্যও নিতে হবে। নয়তো দুজন মিলে আমার চুল ছিঁড়ে খিচুড়ি পাকাবে।
— পল্লবের কথায় হেসে ফেললো দুজন, ইরা সুধালো– কে কে যাচ্ছিস?
— আমি আর অরুণ। অরুণের বউও হয়তো যাবে। (পল্লব)
ইরাদ কেমন মলিন হাসল।অর্পনা বলল—
— তাহলে চল, আমিও যাচ্ছি।
পল্লব বাধা দিয়ে বলল— একদমই না। অসুস্থ শরীর নিয়ে এই রোদে হাঁটাহাঁটি ইম্পসিবল। অরুণ আছে তো। আমি আর ও ঘুরে ঘুরে নিয়ে আসব। তোদের কিছু লাগবে?
ইরা মাথা ঝাঁকিয়ে না করল। সে বই পড়তে খুব একটা ভালোবাসে না। একাডেমিক বইগুলো পড়ার ক্ষেত্রে একটা মোটিভ থাকলেও অন্যান্য বইয়ের ক্ষেত্রে সে খুব একটা আকর্ষণ অনুভব করে না। তবে অর্পনা মাঝে-সাঝেই বই পড়ে। নতুন কিছু জানতে, শিখতে পছন্দ করে। অর্পনার পছন্দের দার্শনিকদের কাতারে প্রথমেই রয়েছে প্লেটো। তাই পল্লবের উদ্দেশে বলল—
— আমার কালেকশনের বাইরে প্লেটোর কোনো বই পেলে নিয়ে আসিস।
পল্লব মাথা ঝাঁকাল। ক্যান্টিনের কাছাকাছি পৌঁছাতেই গেটের বাইরে হাঙ্গামার শব্দ শোনা গেল। পাত্তা দিলো না কেউ। ভার্সিটিতে হাঙ্গামা নতুন নয়,, বছর ঘুরে বছর আসে আর নতুন নতুন কিছু হাদারামের উৎপত্তি ঘটে। চার আনার লাভ নেই তাও ফালতু ভার্সিটি নেতাদের পা চেটে মার খেয়ে হসপিটালে পরে থাকে।।
তপ্ত দুপুরের ধুলো মাড়িয়ে থানার গেটে পরপর পাঁচটি কালো রঙের গাড়ি এসে থামল। দুপুরের প্রখর রোদে এবড়ো-থেবড়ো রাস্তাটায় শুকিয়ে থাকা বালি চাকার ঘর্ষণে এদিক-ওদিক উড়ে গেলো কিছুটা। সামনের পিওর ব্ল্যাক রোলস-রয়েস কারটি থামতেই দ্বিতীয় সারির গাড়ি থেকে ত্রস্ত পায়ে নেমে এল চারজন কালো পোশাকধারী গার্ড। প্রফেশনাল মুভমেন্টে এগিয়ে এসে দক্ষতার সহিত দুজন দু’পাশের দরজা খুলে দিল।সঙ্গে সঙ্গে রোদে পোড়া ধুলোর ওপর দুপাশ থেকে দুটি শীতল পায়ের পদাঘাত পড়ল। মুহূর্তেই পায়ের তলায় পিষ্ট হয়ে যাওয়া শুকনো ধুলোগুলো পায়ের আঘাতে চিরচির শব্দ করে উঠল বোধহয়। ড্রাইভিং সিট থেকে নেমে এল সেই চিরাচরিত কঠিন মুখাবয়বের মানুষ, তুখোড় রাজনীতিবিদ, দুই চাচার ডান হাত দ্বীপ জোহান মির্জা।
,, সরাসরি বান্দরবান থেকে ঢাকায় আসার দরুন মানুষটাকে বড্ড অগোছালো ঠেকছে। পরনে সব সময়কার মতো তিনটি বোতাম খোলা শার্ট, যার হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো। কালো প্যান্টের সঙ্গে বেল্টের সাহায্যে শার্টখানা ইন করা। প্রকৃতপক্ষে দ্বীপ মির্জার ড্রেস-আপ অভদ্রতার কাতারে পড়লেও অর্পনা জামানের মতে তাকে অভদ্র রকমের আকর্ষণীয় লাগে, যা অর্পনাকে বরাবর অভদ্র করে তুলতে সক্ষম।
মানুষটার চোখ-মুখ শক্ত। তীক্ষ্ণ দুই ভ্রুর মাঝে চিকন ভাঁজ। দাঁতের সঙ্গে দাঁত পিষে থাকার দরুন মুখাবয়ব বড্ড জটিল এবং ভয়ানক ঠেকছে। সিলভার রিস্টওয়াচ পরিহিত হাতে ঝলঝল করছে আট ইঞ্চি সাইজের রিভলভার। সম্ভবত এটা লোডেড। লোড করার মূল কারণ, অবাধ্যকে বাধ্য করতে জাস্ট একটা ট্রিগার প্রেস করা। গম্ভীর মানুষটা লোডেড গানটা ডান পকেটে গুঁজে রাখতেই পাশাপাশি এসে দাঁড়াল বিহান। তার পরনে ফরমাল স্যুট-বুট। মাত্রই মিটিং রুম থেকে বেরিয়ে সোজা এখানে চলে এসেছে। হাতে রিভলভার। সে লোড করেনি, পকেটেও গুঁজেনি। এমনিতে বিহান শান্ত। কাজ করে শান্ত মস্তিষ্কে। কিন্তু অর্পনার বেলায় সে একটু বেশিই সিরিয়াস। কজ অব, জোহান বিহানের জান। আর অর্পনা জোহানের জান। যে জোহানের জীবনে সামান্যতম প্রবলেম ক্রিয়েট করবে, বিহান সময় নষ্ট না করে তাকে সেখানেই পুঁতে রেখে আসবে।
দু’ভাই কেউ কারও দিকে তাকানোর প্রয়োজন মনে করল না। ভারী পদক্ষেপে এগিয়ে গেল সামনের দিকে। মুহূর্তেই ওদের পিছু নিল উনিশজন লৌহমানব।
থানার দোরগোড়ায় সুপরিচিত গাড়িটির দেখা মিলতেই দারোয়ান লোহার গেট খুলে সরে দাঁড়াল। এই জায়গায় খুব একটা দ্বীপ মির্জার আগমন ঘটে না। যাবতীয় যা লেনদেন হওয়ার, তা বিহান মির্জার মাধ্যমেই সাধিত হয়। তাহলে আজ হঠাৎ বিহান মির্জার আগমন ঘটল যে? এনিথিং সিরিয়াস?
এরকম মনোভাব আয়ত্ত করা কনস্টেবলগুলো চুপচাপ নিজেদের জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল। থানায় এসব নতুন নয়। আট-দশ দিন পরপরই রাজনৈতিক নেতাদের আগমন ঘটে। সময়সাপেক্ষে বিভিন্ন মানুষের ও আগমন ঘটে এখানে। সেদিক থেকে এসব কনস্টেবলের গা-সওয়া হয়ে গিয়েছে। দ্বীপ আর বিহানকে আসতে দেখে একজন কনস্টেবল ছুটে গেল ওসির উদ্দেশে। ওসির কানে ততক্ষণে খবর পৌঁছে গিয়েছে, তাই আগেই দ্বীপের মুখোমুখি হওয়ার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে রেখেছিল। দ্বীপ এগিয়ে এসে ওসির মুখোমুখি বসল। ডান পা উঠে এল বাম পায়ের ওপর। ধূসর রঙের বিড়ালচোখ জোড়া শীতল, যা ওসির দিকেই তাক করা।এই শীতল চাহনি দেখে কেঁপে উঠল ওসি পদে থাকা মানুষটা। দ্বীপের পাশের চেয়ারটায় একই মুভমেন্টে বসল বিহান। থানা হওয়ার দরুন হাতে থাকা রিভলভারটা লুকানোর প্রয়াস চালাল না। বরং গান উঁচিয়ে গাল চুলকাল খানিক। বিহানের দৃষ্টিও ওসির দিকে তাক করা। এই দৃষ্টির মানে বোঝেন ওসি,, মধ্যবয়সী লোকটা কেমন ভয়ার্ত ঢোক গিলে কৈফিয়ত দেওয়ার মতো করে বলল—
— ম্যামের ভার্সিটিতে যাওয়ার জন্য আমরা দুঃখিত, স্যার। এই মুহূর্তে ম্যামকে একবার থানায় আসতেই হবে। কম করে হলেও একটা রাত রাখতে হবে। নয়তো…
ওসির কথা ফুরানোর আগেই দ্বীপের ভ্রু বেঁকে এল। চাহনি আরও গভীর হলো। তীরের ডগার ন্যায় ভ্রু উঁচিয়ে ভারিক্কি স্বরে শুধাল—
— হোয়াই দো? হোয়াট্স দ্যা রিজন?
দ্বীপের ভাবভঙ্গি আর কথায় ভড়কাল মধ্যবয়সী ওসি। সব জানার পরও দ্বীপ মির্জার এহেন কথা বলার মানে বুঝল না।তবুও সে আমতা-আমতা করে বলল—
— স্যার, আপনি তো জানেন। ম্যাম সুস্মিতা কাইসারকে দিয়াবাড়ি ফ্লাইওভারের ওপর প্রকাশ্যে শুট করেছে। অনেকেই এর প্রত্যক্ষ সাক্ষী। অনেকেই গুলির শব্দ শুনেছে এবং ম্যামকে রিভলভার পকেটে পুরে বাইক স্টার্ট দিতে দেখেছে। এটা লোকচক্ষুর আড়ালে হলে এতক্ষণে কেসের মোড় ঘুরিয়ে ধামাচাপা দেওয়া যেত। তার ওপর সুস্মিতা কাইসারের অবস্থা বেশ শোচনীয়। গত ছয় মাস যাবৎ কোমায় আছেন। ডাক্তার কোনো ভরসা দিতে পারছে না। যখন-তখন শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করতে পারেন। উনার ভাইয়েরা থেমে নেই। ম্যামকে যেকোনো উপায়ে শাস্তি দিতে তৎপর তারা।
দ্বীপ কিছুক্ষণ ওসির দিকে তাকিয়ে রইল। তবে একটি কথাও বলল না। কিছু সময় পর ঘাড় বাঁকিয়ে বিহানের দিকে তাকাল। দাঁতে দাঁত চেপে ফ্যাসফ্যাসে কণ্ঠে শুধাল— ওই বি*চটা এখনো বেঁচে আছে কী করে, বিহান? এতদিন কার চুল টেনেছ তুমি?
‘তুমি’ সম্বোধন শুনে হকচকিয়ে উঠল বিহান। দ্বীপ যখন মাত্রার বাইরে অসন্তুষ্ট হয়, তখনই ‘তুমি’ সম্বোধন করে। বিহান কেমন নিরুপায় ভঙ্গিতে ভাইয়ের দিকে তাকাল। রিভলভার হাতে পায়ের ওপর পা তুলে বসে থাকা দাম্ভিক পুরুষের এমন মুখাবয়বে ভড়কাল ওসি।
আসলেই কি চাচাতো দুই ভাইয়ের সম্পর্ক এতোটা স্ট্রং হয়? হিসেব মাফিক জোহান-বিহান দুজনেই সমান বলিষ্ঠবান। চোখের রং ব্যাতিত চেহারাতেও তেমন আহামরি অমিল খুজে পাওয়া যায়না। অথচ বিহান বরাবরই দ্বীপকে মান্য করে চলে,,দ্বীপকে সামলায়,, দ্বীপের সন্তুষ্টি পাওয়ার জন্য বরাবর তৎপর। এটা কেনো? কিসের এতো বুঝাপড়া এদের মাঝে? শুধুই কি তিন ঘন্টার তফাৎ? বিহানের থেকে দ্বীপ তিন ঘন্টার বড়ো বলেই কি এতো মান্যতা?নাকি অন্য কোনো রিজন আছে? চাচাতো ভাইদের সম্পর্ক এতোটা ও নিখুত হয়? ওসির ভাবনার মাঝে বিহান শির দাড়া টান টান করে বললো– ইট্স মাই ফল্ট,, বাট আ’ম নট সরি ফর দেট। অর্পনা আমার কাছে রিকোয়েস্ট করেছে যেনো সুস্মিতা কাইসারকে একেবারে মেরে না দেই। এই প্রথম আমার বোন আমাকে রিকোয়েস্ট করেছে,, ফেলে দেওয়ার ক্ষমতা নেই আমার।
,,, দ্বীপ বিরক্ত হলো। বিরক্তিতে নাকের পাটা ফুলে উঠলো মানবের,, চোয়াল শক্ত হলো আরও কিছুটা।অর্পনার এই মায়া-দয়া জাস্ট ইরিটেটিং লাগে তার কাছে। সে বিরক্তিতে ‘চ’ জাতীয় শব্দ করে ওসির দিকে তাকিয়ে বলল—
— ব্লা*ডি বু*লশিট! এই সপ্তাহের মাঝে কেসের মোড় যেভাবে ঘোরাতে হয় সেভাবেই ঘোরান। আর একবারও যদি আমার স্ত্রীর ধারে-কাছে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়, তাহলে রমনায় আটকে রাখার জন্য না থানা থাকবে, আর না কাউকে অ্যারেস্ট করার জন্য আপনাদের হাত।
দ্বীপের আচরণ আর কথাবার্তাটা বড্ড গায়ে লাগল ওসির। সারাদিন যেই কনস্টেবলদের সামনে নিজেকে রাজা সাজিয়ে রাখে, ধমকাধমকি করে, সেই কনস্টেবলদের সামনেই এভাবে অপমানিত হওয়াটা বড্ড লজ্জাজনক। সে কিছুটা সাহস নিয়ে দৃঢ় স্বরে আওড়াল—
— স্যার, আপনি আমার সঙ্গে এভাবে কথা বলতে পারেন না। এটা একটা থানা, আর আমি…
দ্বীপ শোনার প্রয়াস চালাল না। মনে পড়ে গেল ঘণ্টাখানেক আগে গার্ডের বলা কথা “স্যার, ম্যামকে গ্রেফতার করার জন্য ভার্সিটিতে পুলিশ গিয়েছিল। আমরা নিষেধ করার পরও পরোয়া না করায় একজনকে শুট করতে বাধ্য হয়েছি।” কথাটা মাথায় আসতেই রাগ সামলাতে না পেরে চাপড় বসাল সামনে রাখা টেবিলে। ঝুঁকে এসে দাঁতে দাঁত চেপে ওসির বলা কথাটা সম্পূর্ণ করে দিল— আর তুই আমার টাকায় কেনা ফালতু একটা ক্যারেক্টার, যে টাকার কাছে শতবার নিজের দায়িত্ব আর ব্যক্তিত্ব বিসর্জন দিয়েছে। তাই জ্ঞান না দিয়ে যা বলেছি মাথায় সেট করে রাখ। আমার স্ত্রীকে গ্রেফতার করা তো দূরের কথা, চোখ তুলে তাকানোর সাহস করলেও সেই চোখ তুলে নিতে আমি দু’বার ভাববো না। মাইন্ড ইট।
বলেই উঠে দাড়ালো দ্বীপ,, হন হন করে বেড়িয়ে গেলো বাহিরের দিকে। সাথে প্রস্থান নিলো ম্যাক্সিমাম গার্ড। শুধু রয়ে গেলো চারজন। বিহান একবার ঘাড় বাকিয়ে গার্ডদের দিকে তাকালো,, সাথে সাথে একজন গার্ড এগিয়ে এসে চেক বুক এগিয়ে দিলো। বিহান তাতে গরগর করে মোটা অঙ্কের এমাউন্ট সাজিয়ে সাইন করে দিলো পরপর ওসির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললো — আশা করি কাজ হয়ে যাবে,, আর জোহানের কথায় কিছু মনে করবেন না। ও সত্যি কথা খুব একটা চাপিয়ে রাখতে পারেনা,, ব্যাক্তিত্বহীনদের তো সম্মান দিতে শিখেই নি। আক্ষরিক ক্ষেত্রে দেখতে গেলে কিন্তু আমাদের থেকেও বড়ো দূর্নীতি বাজ আপনারা। প্রতিটি থানায় আপনাদের মতো এরকম দুয়েকটা ছাগল না থাকলে আমাদের মতো রাজনীতিবিদদের পথ চলাটা এতো সহজ হতো না।
,,, বলেই কাগজ খানা টেবিলে থাকা কিউবের নিচে রেখে সেও চেয়ারে শব্দ তুলে হনহন করে বেড়িয়ে গেলো। ওসি তখনো আহাম্মকের ন্যায় শক্ত মানবের প্রস্থানের দিকে তাকিয়ে। ছেলেটা কি বলে গেলো? কোনো ভাবে কি উনাকে ছাগল আর ব্যাক্তিত্বহীন বলে গেলো? ওসির মুখের এমন দশা দেখে কনস্টেবল গুলো অন্যদিকে তাকিয়ে হেসে ফেললো। তা বুঝতে পেরে চোখ রাঙালো ওসি। পরপর কিউবের নিচে থাকা কাগজটা হাতে নিলো। ১৮ লাখ টাকার চেক,, থাক সমস্যা নেই। এতো বড়ো এমাউন্টের কাছে এই ছাগল আর ব্যাক্তিত্বহীন শব্দটা বড্ড ফিকে,, এটুকু কথা হরহামেশাই শুনা যায়,, ব্যাপার না।
ভার্সিটি শেষে আরাফাতকে নিয়ে গুলশান তেজগাঁও BMW Bangladesh শোরুমে হাজির হলো অর্পনা। উদ্দেশ্য, আরাফাতকে একটা বাইক কিনে দেওয়া। এই বিষয়ে আরাফাত কোনো কিছুই জানে না। একপ্রকার সারপ্রাইজ দিতেই নিয়ে এসেছে। এই তো মাসখানেক আগেই জয়পুর থেকে আরাফাতের টিসি এনে এখানকার স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিয়েছে অর্পনা। এই কয়েকদিন দ্বীপদের গাড়ি করেই আসা-যাওয়া করেছে আরাফাত, তবে এখন থেকে আর না। অর্পনার যথেষ্ট টাকা রয়েছে। ভাইকে চলাচলের জন্য একটা মস্ত গাড়ি কিনে দেওয়ারও ক্ষমতা রয়েছে। তবে ছেলেরা বরাবরই বাইকের পাগল থাকে। কিছু কিছু ছেলেদের কাছে তো বাইক জিনিসটাই ইমোশন, একেবারে বউ বললেই চলে। যদিও আরাফাতের মনে বাইক নিয়ে এমন কোনো ইমোশন আছে কিনা, ধারণা নেই অর্পনার। তবুও ভাইকে একটা বাইক কিনে দেবে সে।
BMW Bangladesh শোরুম থেকে সরাসরি বাইক পারচেজ করা যায় না। কম করে হলেও মাসখানেক আগে বাইকের জন্য বিল পেমেন্ট করে অর্ডার করতে হয়। সকল প্রসেসিং শেষ করে বাইক স্টকে এলে তারপর শোরুম থেকে জানানো হয় যে বাইক চলে এসেছে। তারপর সেটা সচক্ষে দেখে রিসিভ করতে হয়। অন্যান্য ক্ষেত্রে মাসখানেক আগে অর্ডার করতে হলেও আরশাদ জামান অর্ডার করে দেওয়ায় সাত দিনেই ব্যবস্থা করা গিয়েছে। তাদের পারসোনালি স্টক করা বাইক থেকে তিনটা বাইক রাখা হয়েছে। এবার আরাফাত যেটা পছন্দ করবে, সেটাই নেওয়া হবে।
শোরুমের সামনে গাড়ি পার্ক করতেই পিছনের গাড়ি থেকে দুজন গার্ড নেমে এলো। এগিয়ে এসে ডোর ওপেন করতেই গাড়ি থেকে নেমে পড়ল অর্পনা ও আরাফাত। আগে অর্পনার আশেপাশে অগোচরে গার্ড রাখা হলেও বর্তমানে প্রকাশ্যে গার্ড সেট করে দিয়েছে দ্বীপ। অর্পনা প্রথমে মানা করলেও দ্বীপের চোখ রাঙানিতে মানতে বাধ্য হয়েছে। বিষয়টা এমন নয় যে অর্পনা দ্বীপকে ভয় পায়, তাই দ্বীপের সব কথা মান্য করে। মূলত অর্পনা দ্বীপকে সম্মান করে। একটা স্বামীকে ঠিক যতটা রেসপেক্ট দেওয়া উচিত, ততটাই দেয়। সেই সম্মানের খাতিরে স্বামীর মন রক্ষার্থে সর্বদা সাথে কয়েকজন গার্ড নিয়ে ঘুরতে রাজি হয়েছে রমণী।
অর্পনা আরাফাতকে নিয়ে শোরুমে ঢুকতেই শোরুমের ম্যানেজার এগিয়ে এলো। অর্পনার পিছু পিছু চারজন গার্ডও ঢুকল। অর্পনা ইশারায় বাইরে থাকতে বললেও কথা শুনল না লৌহমানবগণ। এখানকার ম্যানেজারের সাথে আবার আরশাদ জামানের বেশ সখ্যতা রয়েছে। অর্পনার সাথেও বিয়ের আগে দেখা হয়েছিল কয়েকবার,। তিনি এগিয়ে এসে টি-বয়কে তিন কাপ কফি দেওয়ার কথা বলে ওদের নিয়ে ভেতরের দিকে হাঁটতে লাগলেন। চলতি পথে এত এত বাইকের কালেকশন দেখে অবাক হলো আরাফাত। ছোট্ট শিশুর ন্যায় আঁকড়ে ধরল অর্পনার আঙুল। ছেলেটা অর্পনার থেকেও গুনে গুনে চার ইঞ্চি লম্বা, কিন্তু আচরণ দেখো! যেন আপা ছাড়া সে কিছুই বুঝে না। অর্পনা আঙুল হতে ভাইয়ের হাত ছাড়িয়ে সম্পূর্ণ হাতটাই পেঁচিয়ে ধরে এগিয়ে গেল সামনের দিকে। আরাফাত ফিসফিস করে বলল, — আপা! তোমার তো চারটা বাইক আছে, আরও কিনবে? সেদিন না দুলাভাই একটা কিনে দিল?
অর্পনা উত্তর করল না, এগিয়ে গেল সামনের দিকে। আরাফাত বুঝল, আপা এখন কথা বলতে চাচ্ছে না, তাই চুপচাপ এগিয়ে গেল আপার সাথে। তবে যখন ম্যানেজার অর্পনাকে টুকটাক কথা জিজ্ঞেস করল, তখন সে সহাস্যেই উত্তর দিয়েছে। আরাফাত কিছুটা রাগ করল বোধহয়। আপা তার সাথে কথা না বলে ওই উটকো পেটমোটা লোকটার সাথে কথা বলছে কেন? বললে সবার সাথেই বলতে হবে, নয়তো কারও সাথেই বলার দরকার নেই। অর্পনা আড়চোখে একবার ভাইয়ের দিকে তাকাল। দেড় মাসেই কেমন আপন হয়ে উঠেছে ছেলেটা। চেহারা দেখলেই মনের কথাগুলো চট করেই বুঝে ফেলে সে। ভাইয়ের অভিমান বুঝে মনে মনে কিছুটা হাসল অর্পনা। স্টক ফ্লোরে প্রবেশ করতেই সাইড করে রাখা তিনটা বাইকের দিকে ইশারা করল ম্যানেজার। অর্পনার উদ্দেশে বলল,
— তোমার পাপ্পা বলল তিনটাই রাখতে। তুমি নাকি চুজ করে তারপর নেবে? এখানে তিনটাই আছে। তুমি যেটা চুজ করবে, সেটার চাবি তোমার হাতে দিয়ে বাইক বাড়িতে ডেলিভারি দেওয়া হবে। অর্পনা একবার বাইক তিনটার দিকে তাকাল। BMW S 1000 R সিরিজের তিনটা মডেল। একটা পিওর ব্ল্যাক, অন্যটি ব্ল্যাকের মাঝে হালকা স্কাই কালার, তৃতীয়টি সাদার মাঝে হালকা কালোর মিশ্রণ। অর্পনা প্রতিটি বাইক সুনিপুণ দৃষ্টিতে পরখ করে আরাফাতের উদ্দেশে বলল,
— পছন্দ করো একটা।
আরাফাত কেমন বোকা বনে তাকিয়ে আছে। সে আবার কী পছন্দ করবে? সে এসব বুঝে নাকি? তবে আপার আদেশ অমান্য করার মতো ছেলে সে নয়। তাই আঙুল উঁচিয়ে সাদা বাইকটি দেখাল। অর্পনার অবশ্য পিওর ব্ল্যাক বাইকটাই পছন্দ হয়েছিল। কিন্তু ভাই যেহেতু পছন্দ করেছে, তাই এটাই মেনে নিল। আর আরাফাতের বয়স কম। এই বয়সী ছেলেপুলেরা রঙের পিছন ছুটে। যেটাকে চকচক করতে দেখে, তাই সোনা মনে করে। অর্পনা চায়, আরাফাত তার মতো খুব দ্রুত ম্যাচিউর না হোক। সারাজীবন এরকম আলোর পিছনেই ছুটুক। ভাইকে ঠিক পথে আলো খুঁজে দেওয়ার দায়িত্ব অর্পনার। সে কখনোই আরাফাতকে জীবনের তিক্ততা সম্পর্কে ধারণা পেতে দেবে না।
অর্পনা ম্যানেজারের হাত থেকে সাদা বাইকটির চাবিটা নিয়ে আরাফাতের দিকে এগিয়ে দিল। আরাফাত তখনকার অভিমান ধরে রেখে আপার দিকে অভিমানি দৃষ্টি ফেলে শুধাল, — আমাকে দিচ্ছো যে?
অর্পনা মৃদু হেসে বলল,— যার বাইক, চাবি তার কাছে থাকবে, এটাই স্বাভাবিক।
আরাফাত কেমন হতভম্ব হয়ে পড়ল। মনে জমা অভিমানটুকু কোথায় পালাল, কে জানে! সে একবার বাইকের দিকে তাকাল, তারপর চাবির দিকে। এরপর আপা, ম্যানেজার, আবার নিজের দিকে।ম্যানেজার আরাফাতের অবস্থা দেখে হেসে উৎসাহ দিলেন,
— নাও, লিটল ম্যান! তোমার আপুর পক্ষ থেকে এটা সামান্য গিফট।
আরাফাত আবারও বাইকের দিকে তাকিয়ে বাইকের লেংথ, ওয়েট, সাইজ পরিমাপ করে অস্ফুট স্বরে আওড়াল,— এত বড় বাইক আমি কীভাবে হ্যান্ডেল করব, আপা?
অর্পনা ভাবেনি আরাফাত এহেন কথা বলবে। সে ভেবেছিল, আরাফাত বুঝি শুনেই খুশিতে লাফিয়ে উঠবে। নিজের উপর কনফিডেন্ট থাকবে। অর্পনা বাইক চালিয়েছে ১৩ বছর বয়সে, আর তার ভাই কিনা ১৫ বছর বয়সে এসে বাইক দেখে ভয় পাচ্ছে! নাহ! ভাইটা পুরোপুরি তার মতো হয়নি। পারু আপার মতো ভীতু ভীতু ভাবও আছে ভেতরে। অর্পনা ভাইয়ের কাঁধ পেঁচিয়ে ধরল। চাবিটা আরাফাতের শার্টের বুকপকেটে রেখে শুধাল, — মির্জা বাড়ির উত্তর পাশে তিনটা হেলিকপ্টার রাখা আছে, দেখেছ?
আরাফাত মাথা ঝাঁকাল।অর্পনা এবার কোমল স্বরে আওড়াল, — একজন পাইলট কখনোই হেলিকপ্টারের সমান হতে পারে না। তাই বলে কি সেই পাইলট হেলিকপ্টার ফ্লাইং করছে না? ল্যান্ড করতে পারছে না? তুমিও পারবে। আজ বাইক চালাবে, তারপর একদিন প্লেন ওড়াবে।
,,, প্লেন উড়াবে!! কথাটা শুনে হতচকিত হলো আরাফাত। ছোট্ট মুখখানায় তীব্র বিস্ময়। সে বোকা কণ্ঠে শুধালো— আমি পাইলট হবো?
,,, অর্পনা মুচকি হেসে ভাইয়ের ঝড়ঝরা চুলগুলো এলোমেলো করে দিলো। এই চুলগুলোও তার চুলের মতো হয়েছে। আরাফাতের মাঝে নিজেকে দেখতে বড্ড ভালো লাগে অর্পনার। কেমন আপন আপন মনে হয়। আরাফাত আসার পর থেকে অর্পনার কেমন অন্যরকম একটা অনুভূতি কাজ করে। নিজেকে কারোর অভিভাবক মনে হয়। মনে হয় সে কারোর ভরসা, কারোর অনুপ্রেরণা। বিষয়টা খুবই সুন্দর।
অর্পনা যখন খুব ছোট ছিল, তখন বড্ড শখ ছিল পাখির মতো উড়ে বেড়ানোর। নিজেকে পাইলট হিসেবে দেখার। সেই স্বপ্ন থেকেই সায়েন্স নিয়ে পড়া। ইন্টার পরীক্ষাটা দিয়েই ফ্লাইং স্কুলে অ্যাপ্লাই করত, কিন্তু ভাগ্য তার সহায় হয়নি। এক সুদর্শনকে ভালোবেসে তার সবকিছু ধ্বংস হয়ে গেল। ভেবেই তপ্ত শ্বাস ফেললো অর্পনা। আরাফাত তখনো উত্তরের আশায় তাকিয়ে। অর্পনা এবার উত্তর করলো— এটা তোমার ইচ্ছার উপর ডিপেন্ড করে। আমার দিক থেকে কোনো জোর নেই। আমি যখন ছোট ছিলাম, তখন পাইলট হওয়ার খুব সখ ছিল। কিন্তু আমি মেডিক্যালি ফিট ছিলাম না, তাই আর অ্যাপ্লাই করা হয়নি। তুমি চাইলে করতে পারো। আমি তোমার পাশে থাকবো।
,,, আরাফাত অতসব বুঝে না। কিভাবে পাইলট হতে হয়, কী নিয়ে পড়তে হয়, কিছুই জানে না। এখনো পর্যন্ত নিজের এইম নিয়ে ভাবা হয়নি। আব্বা জানিয়েছিল, তাকে ঢাকা পড়তে দেবে না। যা পড়ার জয়পুরে থেকেই পড়তে হবে, তারপর বাবার মতো কৃষিকাজ করবে। তার ভাবনাও ওই পর্যন্তই ছিল। এর বাইরে আর কিছু ভাবা হয়নি। আরাফাত কেমন উৎসুক দৃষ্টিতে শুধালো— আমি পাইলট হলে তুমি খুশি হবে?
,,, হবো।
,,, আরাফাত চট করেই জড়িয়ে ধরলো আপাকে। ইসস!! কেমন মা-মা গন্ধ আসছে। আরাফাত মাকে পায় না আজ সাত বছর। তবুও কিভাবে কিভাবে যেন আপার সাথে মাকে গুলিয়ে ফেললো সে।আরাফাত অস্ফুট স্বরে বললো— তুমি খুশি হলে আমার জান কুরবান, আপা। আমি পাইলটই হবো।
,,, অর্পনা মুচকি হেসে আরাফাতের পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে ডানপাশে তাকাতেই তার চোখজোড়া থমকে গেল। কিছুটা দূরে BMW K 1300 সিরিজের পিওর ব্ল্যাক বাইক দাঁড় করানো। অর্পনা এবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালো। এই বাইকটা তার উইশলিস্টে আছে। খুব শীঘ্রই নিজের গ্যারেজে জায়গা হতো এমন একটা বাইকের। সেই শীঘ্রইটা আজ কেন নয়? আজকেই তবে এই বাইকটা তার হোক। অর্পনাকে বাইকের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে ম্যানেজার হাস্যোজ্জ্বল কণ্ঠে বললেন—
— এটা BMW K 1300S। লং ট্যুর ও হাইওয়ে ক্রুজিংয়ের জন্য দুর্দান্ত। এই তো গতকাল সন্ধ্যাতেই এলো। রহমান বাড়ির ছোট ছেলের জন্য অর্ডার করেছেন রহমান সাহেব। তোমার পছন্দ হলে আজ অর্ডার দিয়ে যাও। মাস দেড়েকের মধ্যে চলে আসবে।
,,, অর্পনা আরাফাতকে সরিয়ে বাইকটার দিকে এগিয়ে গেলো। বিক্রি করার জন্য ম্যানেজারও এগিয়ে গেলেন সেদিকে। অর্পনা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলো বাইকটা। ম্যানেজার কিছুটা বাড়িয়ে বাড়িয়েই প্রশংসা করলেন, যেন অর্পনা অর্ডার করতে রাজি হয়। তিনি খুব ভালো করেই জানেন, অর্পনা বাইকের প্রতি উইক। মাত্রারও বাইরে গিয়ে উইক। ম্যানেজার যেই ভাবনায় অর্পনাকে বাইকের ডিটেইলস দিচ্ছিলেন, সেই ভাবনায় ভাটা ফেলে অর্পনা বলে বসলো—
— বাট, এটা যে এই মুহূর্তে আমার চাই, আঙ্কেল।
,,, অর্পনার কথায় থতমত খেয়ে গেলেন লোকটা। বুঝানোর মতো করে বললেন— এটা তো পসিবল না অর্পন। বাইকটা আজকেই রহমান বাড়িতে ডেলিভারি দেওয়ার কথা। এই মুহূর্তে অন্য কারোর প্রোডাক্ট তোমার কাছে হস্তান্তর করা অসম্ভব।
,,, অর্পনা যেন বুঝেও বুঝলো না। জেদি কণ্ঠে আওড়ালো– তারপরেও এটা আমার এখন চাই, আঙ্কেল। এখন মানে এখন।
,,, ম্যানেজার ফের বুঝানোর মতো করে বললো—
— সম্ভব না। আমরা কথার খেলাপ করতে পারি না। কিছুক্ষণের মাঝেই হয়তো রহমান বাড়ি থেকে কেউ চলে আসবে। তখন আমরা কী জবাব দেবো? তার চেয়ে বেটার আজ বিল পেমেন্ট করে যাও। মাসখানেকের মাঝে বাইক বাড়িতে পৌঁছে দেবো। তোমার কষ্ট করে আসতেও হবে না।
— এটার কস্ট কেমন পড়েছে?
— ১৯ প্লাস!!
— আমি ডাবল দেবো, তাও এটা আমার চাই।
— তারপরেও সম্ভব না। আমরা নিয়মের বাইরে এক পাও বাড়াই না। এটা রেপুটেশনের ব্যাপার।
,,, এত বড় অফার দেওয়ার পরেও রাজি হলো না? কিন্তু অর্পনার যে ঘাড়ের রগ একটা বাকা! এই বাকা রগ তো স্বয়ং দ্বীপ মির্জাও সোজা করতে পারেনি। তাহলে এই ম্যানেজার কিভাবে করবে? সহসা অর্পনার ঠোঁটে কুটিল হাসি ফুটে উঠলো। সে ভ্রু উঁচিয়ে শুধাল
— আপনি শিওর, সম্ভব না?
,,, ম্যানেজার ইশারায় সায় জানিয়ে বললো— বিক্রিত প্রোডাক্ট আমরা বিক্রয় করি না।
,,, অর্পনা একবার বাঁকা চোখে গার্ডদের দিকে তাকালো। সাথে সাথে গার্ডরা রিভলবার তাক করলো ম্যানেজারের দিকে। ভয়ের চোটে কেঁপে উঠলো লোকটা। এমনিতেই শুরুতে এদের দেখে ভয়ে মরিমরি অবস্থা ছিল, এখন এভাবে গান তাক করায় আত্মা বেরিয়ে আসার জোগাড়। অর্পনা ম্যানেজারের হাবভাব দেখে গার্ডদের ইশারায় গান নামাতে বললো। পরপর জগারের পকেট থেকে ফোন বের করে হোয়াটসঅ্যাপে ঢুকলো। “বনমানুষ” দিয়ে সেভ করা নম্বরটিতে ঢুকে ভয়েসে ক্লিক করলো—
— হাসবেন্ড!! BMW Bangladesh শোরুমে BMW K 1300 সিরিজের পিওর ব্ল্যাক বাইকটা আমার মনে ধরেছে। বর্তমানে আরাফাতের বাইক ডেলিভারির জন্য পাঠিয়ে আরাফাত সহ পল্লব, অরুণ আর রাত্রির সাথে মিট করবো। একসাথে রেস্টুরেন্টে খাবো। খাওয়া শেষে বাড়ি ফিরবো। অলমোস্ট ২ ঘণ্টার ব্যাপার-স্যাপার। বহু সময় আছে আপনার হাতে। আমি বাড়ি ফিরে বাইকটা আমার বাইক কালেকশনে দেখতে চাই। যদি না পাই, তাহলে আগামী ১০ দিন আপনার সাথে আমার ন্যূনতম যোগাযোগ হবে না। আপাতত আল্লাহ হাফেজ!!
,,, নীলক্ষেত বইয়ের দোকান আর আজিমপুর গাউসিয়া মার্কেট, নিউ মার্কেট কাছাকাছি হওয়ার দরুন দুপুরের দিকে প্রবেশপথে ভালোই ভিড় জমে। রাস্তা প্রায় ভরাট হয়ে থাকে, যার ফলস্বরূপ রিকশাচালকরা ভেতরে খুব একটা ঢুকতে চায় না অগত্যা রাত্রি, অরুণ আর পল্লবকে নীলক্ষেত মোড়ের একটু আগেই নামতে হলো। রাত্রি আর অরুণের ভাব হয়েছে অনেকক্ষণ। ওর ওপর এখন আর রেগে নেই রাত্রি। তেমন রাগও করেনি। তখন রেগে-মেগে বেরিয়ে যাওয়ার সময় অরুণ পিছন থেকে হাত টেনে ধরতেই কেমন গলে গেলো মেয়েটা। তবে পল্লবের সাথে কথা বলছে না। চোখে চোখ পড়লে সরিয়ে নিচ্ছে, যেন আমৃত্যু অভিমান জমেছে পল্লবের উপর। পল্লবের কি আদৌ এসবে কিছু আসে যায়?নাহ!! আসে যায় না।
সে সহাস্যে অরুণের সাথে খোশগল্প করতে করতে এগিয়ে যাচ্ছে। এই যে পল্লব রাত্রির অভিমানকে গুরুত্ব দিচ্ছে না, এতে রাত্রির অভিমান বাড়ছে। প্রথমত ছেলেটা সব কথায় তাকে ধমকাধমকি করে। তার ওপর ওর কারণেই অরুণ তখন তাকে ধমক দিলো। এত কিছুর পরেও পল্লব ওকে একবার সরি বললো না। কেন বলে না? রাত্রি বাকিদের সাথে রাগ-অভিমান করলে সবাই হুটহাট ওকে সরি বলে সব মিলমিশ করে নেয়। পল্লব কেন করে না? এই ছেলেটা এত অবাধ্য কেন? এত নির্লিপ্তই বা কেন?
রাত্রির ভাবনার মাঝেই খেয়াল করলো, অরুণ আর পল্লব আগে আগে এগিয়ে যাচ্ছে। তাদের বোধহয় খেয়ালই নেই, এখানে রাত নামক কেউ আছে।তক্ষুনি একটা ছেলের কনুই এসে রাত্রির বাহুতে লাগলো। সাথে সাথে দাঁড়িয়ে গিয়ে রাত্রিকে টেনে নিলো পল্লব। খেঁকিয়ে উঠলো ছেলেটার উপর— হেই! দেখে চলতে পারিস না? মেয়েদের গায়ে টাচ লাগে কিভাবে? পারশোনালিটি ল্যাস ছেলেপুলে।
,,, ছেলেটা নিতান্তই ভদ্র। বোধহয় ইচ্ছাকৃত এমন করেনি। তাই অনুতপ্ত স্বরে বললো— দুঃখিত, আপু! কিছু মনে করবেন না। ভাইয়া, সরি।
,,, রাত্রি মাথা ঝাঁকালো। সে কিছু মনে করেনি। ছেলেটা ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে প্রস্থান নিলো। ছেলেটা চলে যেতেই পল্লব কেমন খিটমিট করে রাত্রির দিকে তাকালো। অরুণও ততক্ষণে দাঁড়িয়ে পড়েছে। বিষয়টা বুঝতে পেরেই রাত্রির দিকে অনুতপ্ত দৃষ্টিতে তাকালো অরুণ। বইয়ের স্তুপ পর্যবেক্ষণ করতে করতে সে ভুলেই গিয়েছিল, সাথে যে রাত আছে। পল্লব রাত্রির হাত টেনে অরুণের হাতে গুঁজে দিয়ে ফ্যাসফ্যাসে কণ্ঠে শাসালো—
— নিজের জিনিস নিজে সামলে রাখতে শিখ। ছেলেরা এসে ধাক্কা দিয়ে চলে যাচ্ছে। কেমন ভালোবাসিস, ভাই? ভালোবাসি বললেই সব শেষ হয়ে যায়? আর কোনো দায়িত্ব নেই? বারবার ভালোবাসি, ভালোবাসি বললেই ভালোবাসা প্রমাণ হয়ে যায় না। ভালোবাসা একটা অনুভূতি, যা যত্ন আর আগলে রাখার মাঝে নিহিত থাকে। হোয়াটএভার! ওকে নিয়ে এগো, আমি পিছনে আছি।
৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৬৪
,,, অরুণ যেন অপ্রস্তুত হয়ে পড়লো। তাড়াহুড়ো করে রাত্রিকে টেনে নিলো নিজের বাহুবন্ধনে। অজান্তেই রাত্রির মনটা ভার হয়ে এলো। এখানে থাকতে ইচ্ছা করছে না। সবকিছু বিষাক্ত ঠেকছে। তবুও হেঁটে গেলো অরুণের সাথে সাথে। পল্লব কিছুটা পিছিয়ে গেলো। অরুণের সাথে কথা বলতে বলতে নজর রাখছে রাত্রির বাম দিকে। অরুণ যেহেতু ওকে ডান দিক থেকে আগলে রেখেছে, সেহেতু ওর নজরটা নাহয় বাম দিকেই থাক। কিছু কিছু জিনিস মানুষের ধরা ছোঁয়ার বাহিরে থাকে তখন সেই মূল্যবান জিনিসটার উপর দূর থেকেই নজর রাখতে হয়।
