সে আমার বন্দিনী পর্ব ৯৩
তানিয়া হুসাইন
রাত তখন অনেক গভীর।
সমুদ্রের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল জাহাজটার চারপাশে শুধু অন্ধকার আর ঢেউয়ের শব্দ।ডেকে দাঁড়িয়ে দূরের কালো আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে ভীর।নিক চলে গেছে, নিচে তাদের মনোরঞ্জনের আলাদা ব্যবস্থা আছে,যেসবের উপর কোন কালেই বিন্দুমাত্রা ইন্টারেস্ট ছিলো না তার।তার জীবনে দুইটা নারীর-ই অস্তিত্ব আছে।এক তার মা আর এক মিসেস ইশায়া রাজভীর,তার ওয়াইফ।
হ্যাঁ এখন হয়তো আরেকটা মেয়ে তার জীবনে আসতে পারে। ভাবতেই ভীরের মুখে ক্ষীণ হাসি ফুটে ওঠে।
চারপাশে তার লোকজন ব্যস্ত,এই বিশৃঙ্খলার মাঝেও একটা মানুষকে ভুলে থাকতে পারছে না সে।
তাকে প্রতিটা ক্ষণ দেখেও তার ভিতরে শান্তি আসছে না।
ভীর ফোনটা বের করে কয়েক সেকেন্ড স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে,গভীর ঘুমে মগ্ন তার প্রান প্রেয়সী,তবুও ভীর কল দেয়।
ওপাশে কয়েকবার রিং হতেই মারিয়া এলেনা ফোন রিসিভ করে।
ইশায়াকে ডাকে, ঘুম ভাঙায় বিরক্ত হয় ইশায়া ভাবে ওই জা*নোয়ারটা এসে গেছে আবার তার জান খেতে।
কিন্তু মারিয়া এলেনা তার দিকে ফোন বাড়িয়ে দেয়,
ইশায়া স্বস্তি পায় আসে নি রাক্ষসটা।
___ফোনে নরম কণ্ঠ ভেসে আসে
হ্যালো….
ইশায়ার কণ্ঠ শুনতেই ভীরের শক্ত মুখটা নরম হয়ে আসে।
___কি করছো? ঠান্ডা গলায় জিজ্ঞেস করে ভীর।
ইশায়া ঘুম ঘুম কন্ঠে বলে,
___ঘুমাচ্ছিলাম।
অজান্তেই ইশায়ার মুখ থেকে বেরিয়ে আসে,
আপনি?
ভীর সামান্য হাসে।মাথা তুলে সমুদ্রের দিকে তাকায়।
___কাজে আছি। তার ছোট্ট উত্তর।
শরীর ভালো আছে তোমার?
___হুম।
আস্তে করে বলে ইশায়া।
এরপর কিছুক্ষণ দুজনই চুপচাপ থাকে।
শুধু দুজনের নিঃশ্বাসের শব্দ ভেসে আসছে ফোনের ওপাশ থেকে।
তারপর গম্ভীর গলায় ভীর বলে,
___তোমার কিছু প্রয়োজন?
কিছু আনবো?
ভীরের কথা বলার ভঙ্গি অদ্ভুত শান্ত।
__না, কিছু লাগবে না।
ইশায়া কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে।তারপর মৃদু স্বরে বলে,
___আপনি সাবধানে থাকবেন।
ভীরের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠে।খুব ছোট্ট, কিন্তু সত্যিকারের হাসি।সমুদ্রের ঠান্ডা বাতাসে তার কোট উড়ছিল।আর সেই ভয়ংকর রাতের মাঝেও প্রথমবারের মতো মানুষটাকে কিছুটা শান্ত লাগছে।
তাকে এভাবে বলে নি কেউ কখনো।কেউ ছিলো ওনা এভাবে বলার,একা সে বড্ড একা।এভাবেই কেটেছে তার জীবন।
টুকটাক কথা বলে ফোন রেখে দেয় ভীর।
ইশায়া আবার ঘুমিয়ে পরে,ইশায়া নিজেও জানেনা সে কি বলেছে,কিন্তু তার ছোট্ট একটা কথায় মাফিয়া বস খুব খুশি হয়েছে।
____এরপর এভাবেই কাটতে থাকে সময়,ইশায়ার প্রেগনেন্সির এখন পাঁচ মাস চলছে।
ইশায়া নিঃশব্দে বসে আছে নিজের রুমে।নির্দিষ্ট দূরে দাঁড়িয়ে আছে তার জন্য নির্ধারিত করা গার্ডরা।
অন্ধকার ঘরের একমাত্র আলোটা আসছে সামনের বড় মনিটর থেকে। সেই মনিটরেই ভেসে উঠছে রহমান ভিলার প্রতিটা দৃশ্য তার পরিবার, তার মানুষগুলো,তার পুরো পৃথিবী।এইটুকুই এখন তার ভরসা।
এর বাইরে আর কোনো উপায় নেই তার কাছে। সামনাসামনি দেখা তো দূরের কথা, ইচ্ছে করলেও সে তাদের সাথে কথা বলতে পারে না। পারবে কি করে সে যে একজন বন্দিনী, একজনের শখের পোষা খাঁচার মধ্যে বন্দি পাখি। তাদেরকে আবারাও স্পর্শ করার ইচ্ছা বহু আগেই হারিয়ে গেছে তার জীবন থেকে।
তবুও ইশায়া আজকাল এই সামান্যতেই নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে।মানিয়ে নেওয়া শিখে গেছে সে এই কঠিন বাস্তবতার সাথে।আগে তো এত টুকু ও পেতো না,এখন তো অন্তত দূর থেকে হলেও তাদেরকে চোখের দেখা দেখতে পারছে।
ঠোঁটের কোণে কষ্ট মেশানো ছোট্ট হাসি ফুটে ওঠে তার।
আমার পেটে ওনার সন্তান এই জন্যই হয়তো এতটুকু দয়া করছে । নাহলে এটুকুও হয়তো পেতাম না।
কথাটা মনে হতেই বুকের ভেতরটা হাহাকার করে ওঠে তার।
মনিটরের ওপাশে রহমান ভিলায় উৎসবের আবহ।
বিয়ের শপিং করা হলেও সেটা দেখানো হয় নি,ছেলেদের কাজের চাপে আজ বের করে একে একে দেখানো হচ্ছে
আদনান রহমান, আবির আর বাকিদের। পুরো বাড়িজুড়ে আনন্দের উষ্ণতা।সবাই কত খুশি…
আর তাদের সেই খুশি দেখেই নিঃশব্দে হাসে ইশায়া।দূরে থেকেও এই মানুষগুলোর হাসিই তার বেঁচে থাকার কারণ।
হঠাৎ সায়মা রহমান হাতে তুলে নিলেন সেই বেবি পিংক গাউন।
নরম কাপড়ের গাউনটা আলতো করে আদনান রহমানের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন,
___দেখো তো পছন্দ হয়েছে তাই কিনে নিলাম।
আজ শুধু শুধুই তোমার টাকা টা নষ্ট করলাম।কারন এটা যার জন্য কিনেছি সে তো আর পড়বে না,কিন্তু আমি জানি এর পর ও তুমি আমাকে কিছু বলবেনা।
আদনান রহমান জামাটা হাতে নিলেন।বুঝেন তিনি সায়মা রহমান কি বুঝাতে চেয়েছে।কিছুক্ষণ শুধু তাকিয়েই রইলেন সেটার দিকে।
মনিটরের সামনে বসে থাকা ইশায়ার চোখ ঝাপসা হয়ে আসে।
তার বাবা…আদনান রহমান কাঁপা হাতে গাউনটার উপর হাত বোলাতে থাকেন। যেন সেই কাপড়ের মাঝেই তিনি ছুঁয়ে দেখার চেষ্টা করছেন নিজের মেয়েকে।
তারপর ধীরে চশমাটা খুলে চোখ মুছে নেন।
সেই দৃশ্যটা দেখেই ইশায়ার বুকের ভেতর হু হু করে ওঠে।মনে হয় কেউ যেন ভেতরটা ছিঁড়ে ফেলছে।তার বাবা-মা তার কথা এখনো এভাবে মনে রেখেছে।
আবির এগিয়ে এসে বাবার কাঁধে হাত রাখে।
চোখেমুখে চাপা কষ্ট নিয়েই সে বাবাকে সামলানোর চেষ্টা করে।পরিবেশটা ভারী হয়ে উঠতেই জান্নাত হঠাৎ জোর করে হাসির সুরে বলে ওঠে,
___উফফ! তোমরা কি শুরু করলে বলো তো? বিয়ের শপিং দেখবে নাকি সবাই মিলে কান্নাকাটি করবে? খুশির সময় এখন।
তার কথায় সবাই নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করে।
আদনান রহমানও গভীর নিঃশ্বাস ফেলে নিজেকে স্বাভাবিক করেন।
___ঠিক তখনই মূল দরজা খুলে ভেতরে ঢোকে আদ্রিয়ান।
তাকে দেখামাত্রই রাহির মুখ লাল হয়ে ওঠে লজ্জায়।
চোখ নিচু করে ফেলে সে।
কিন্তু আদ্রিয়ান যেন কিছুই দেখল না।
ড্রয়িংরুমে সবার উপস্থিতি দেখেও সে এক মুহূর্তের জন্য দাঁড়ায় না। নির্লিপ্ত মুখে সোজা সিঁড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করে।
ঠিক তখনই জান্নাত ডাক দেয়,
___আদ্রিয়ান! দাঁড়াও তোমার বিয়ের শপিংগুলো দেখে যাও।
কিন্তু আদ্রিয়ান কথাটা শুনেও শুনল না।
না থেমে দ্রুত পায়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে থাকে সে।
পিছন থেকে সায়মা রহমানও বলে ওঠেন,
___বাবা, শেরওয়ানিটা অন্তত দেখে যা। পছন্দ হয়েছে কি না বলবি তো।
তবুও আদ্রিয়ান পিছন ফিরে তাকায় না।একটিবারের জন্যে ও না।তার নিঃশব্দ উপেক্ষায় মুহূর্তের মধ্যেই রাহির মুখটা মলিন হয়ে যায়।
মনিটরের ওপাশে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে যেতে থাকা আদ্রিয়ানের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে ইশায়া।
বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে আসে তার।
এই মানুষটাই একসময় পুরো বাড়ি মাথায় করে রাখতো নিজের বিয়ের কথা বলে।তার ছোট দাদা ভাই বিয়ের জন্য কী পাগলামিটাই না করতো!
নির্লজ্জের মতো সারাক্ষণ মায়ের পিছনে পিছনে ঘুরতো।একদিন না, প্রতিদিন।ফুফুকেও রেহাই দিত না সে।যেখানে যেত, সেখানেই বিয়ের প্রসঙ্গ টেনে আনতো।
আর সাফা আপু?সে তো রাগে আগুন হয়ে যেত। ছোট দাদা ভাইকে কী ঝাড়টাই না দিত সে।তবুও আদ্রিয়ান থামতো না।উল্টো আরও বেশি বিরক্ত করতো সবাইকে।
বিয়ে পাগল ছেলেটার যখন সত্যি সত্যিই বিয়ে ঠিক হলো, তখন খুশিতে যেন মাটিতেই পা পড়ছিল না তার।আত্মীয়-স্বজন সবাই তাকে নিয়ে মজা করতো।
কারণ আদ্রিয়ানের উত্তেজনা লুকানোর মতো ছিল না।নিজের বিয়ের শপিং থেকে শুরু করে সাফা আপুর জন্য কী কিনবে সবকিছু সে নিজেই পছন্দ করেছিল।
প্রতিটা জামা, প্রতিটা গয়না, এমনকি ছোট ছোট জিনিসেও ছিল তার উচ্ছ্বাস।সাফার জন্য কিছু কিনতে গেলেই তার চোখে আলাদা একটা আলো ফুটে উঠতো।আর আজসময় সেই মানুষটাকেই কোথা থেকে কোথায় এনে দাঁড় করিয়েছে।ইশায়ার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে।কি থেকে কি হয়ে গেল আদ্রিয়ান।
আগের সেই হাসিখুশি, প্রাণোচ্ছ্বল ছেলেটা আজ কেমন গম্ভীর, ঠান্ডা ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছে।চোখে আর কোনো উচ্ছ্বাস নেই।মুখে নেই সেই দুষ্টুমি ভরা হাসি।
ভালোবাসার মানুষটাকে হারিয়ে ভেতর থেকে পুরোপুরি ছন্নছাড়া হয়ে গেছে সে।এই পরিবর্তনটাই সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয় ইশায়াকে।
সে নিজের ভাইয়ের দিকে ঠিকমতো তাকাতেও পারে না আর।নিজেকে অপরাধী মনে হয় তার।ভীষণ অপরাধী।ইশায়া জানে রাহিকে আদ্রিয়ান বিয়ে করলেও সে কোনোদিন ও খুশি হতে পারবে না।কারণ সে নিজের চোখে দেখেছে সাফা আপু আর আদ্রিয়ানের ভালোবাসার গভীরতা।ওদের সম্পর্কটা শুধু ভালোবাসা ছিল না…ওরা ছিল একে অপরের পুরো পৃথিবী।
আজও চোখ বন্ধ করলেই সেই মুহূর্তগুলো ভেসে ওঠে ইশায়ার সামনে।সাফা আপুর হাসি ভাইয়ের পাগলামি,
ওদের একসাথে কাটানো ছোট ছোট মুহূর্তগুলো।
সবকিছু এখনও জীবন্ত।
গ্র্যানি সবসময় তাকে বোঝায়,
___সব ভুলে যেতে শেখো, ইশায়া। সব মেনে নিতে হয়।
কিন্তু মানুষ কি চাইলেই সব ভুলে যেতে পারে?
কিছু স্মৃতি তো র*ক্তের সাথে মিশে যায়।আর ছোট দাদা ভাই তো তার আপন ভাই।এক মায়ের পেটের সন্তান তারা।তার ভাইয়ের সাথে যে এত বড় অন্যায় করেছে তাকে কিভাবে মেনে নিতে সে। এসব ক্ষত
চাইলেও মুছে ফেলা যায় না।ইশায়া পারেনা।কিছুতেই পারেনা।সাফা আপুর মুখটা বারবার ভেসে ওঠে তার চোখের সামনে।আর সেই সাথে ভেসে ওঠে দুইটা মানুষের গভীর, নিঃস্বার্থ ভালোবাসার অসংখ্য মুহূর্ত
যেগুলোকে সময় নির্মমভাবে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে।
সে পারবেনা কোনদিনো পারবে না এসব ভুলে যেতে।
ইদানিং আবার সাফাকে স্বপ্নে দেখা বেরেছে তার।
ইশায়ার খুব ভয় হয় ভীরের এই পাপ তার বাচ্চাটাকে না ধরে।দিন দিন বাচ্চার জন্য তার আলাদা একটা টান তৈরি হচ্ছে ইশায়া বুঝতে পারে সেটা। ওই মহিলাটাকেও স্বপ্নে দেখে ইশায়া।খুব ভয় হয় তার কুকড়ে থাকে সবসময়।ঘুমাতেও ভয় লাগে সবাই এসে তাকে ঘেড়াও করে।
____ইশায়া লম্বা একটা শ্বাস নেয়,নিজের মুখে শক্ত শক্ত কথা বললেও ইশায়া জানে তার ভেতরের মনটা মোটেও এত শক্ত না।বরং এই মনটাই আজকাল তাকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয়।ভীষণ বেহায়া একটা মন।
যতই সে নিজেকে বোঝাক, যতই ঘৃণা করতে চায়, তবুও বুকের গভীরে কোথাও একটা নরম অনুভূতি বারবার মাথা তুলে দাঁড়ায়।নাড়ির টান নিজের অনাগত সন্তানের প্রতি অদ্ভুত এক দুর্বলতা,আর সেই সন্তানের বাবাকে ঘিরে অসম্ভব জটিল কিছু অনুভূতি।ইশায়া চোখ বন্ধ করে ফেলে।তারও তো ইচ্ছে করে একটুকরো সংসার এর।স্বাভাবিক একটা জীবনের।ভালোবাসা মেশানো কয়েকটা মুহূর্ত।যেখানে ভয় থাকবে না, র*ক্ত থাকবে না, অন্ধকার থাকবে না।কিন্তু সেই স্বপ্নগুলো ভাবতেই নিজের উপর ঘৃণা হয় তার।কারণ যার সাথে এই স্বপ্নগুলো জড়িয়ে যাচ্ছে… সে মানুষ না।
সে একটা জা*নোয়ার।ইশায়ার ঠোঁট কেঁপে ওঠে।
আজকাল মনটা বড্ড অবাধ্য হয়ে উঠেছে তার।
যত দূরে ঠেলতে চায়, ততই সেই মানুষটার দিকেই ছুটে যায়।আর এটাই সবচেয়ে বেশি আতঙ্কিত করে তাকে।
কিন্তু ইশায়া নিজের মনকে কখনও মস্তিষ্কের উপর আধিপত্য করতে দেয় না।কখনও না।সে জানে এই দুর্বলতা তার জন্য বিষ।এই অনুভূতিগুলো একদিন তাকে পুরোপুরি শেষ করে দেবে।
তাই সে নিজের ভেতরের সেই নরম মনটাকে ধীরে ধীরে দুমড়ে-মুচড়ে শেষ করে ফেলছে।মেরে ফেলতে চায় সমস্ত অনুভূতি।কারণ এই মন তার দরকার নেই।
একদমই না।যেই মন একটা জা*নোয়ারকে চাইতে পারে,সেই মনকে সে নিজের ভেতরে বাঁচিয়ে রাখতে চায় না।তার বুক ধকধক করে ওঠে।চোখের সামনে আবার ভেসে ওঠে তার পরিবারটার মুখ।সবকিছু কেমন সুন্দর ছিল।আর সেই সুন্দর পৃথিবীটাকে ধ্বংস করে দিয়েছে একজন মানুষ।একটা মানুষ না… একটা অন্ধকার।যে তাদের পুরো পরিবারটাকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে।তার ছোট ভাইয়ের জীবনটা নষ্ট করে দিয়েছে।সাফা আপুকে কেড়ে নিয়েছে তাদের কাছ থেকে।মেরে ফেলেছে তাকে।ইশায়ার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসে।তবুও…তবুও তার এই অভিশপ্ত মন সেই মানুষটাকেই চায়।এই সত্যিটাই তাকে সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করায় নিজেকে।তার নিজের কাছেই নিজেকে নোংরা লাগে।সে চায় না এই অনুভূতি।চায় না এই দুর্বলতা।কিছুতেই না।কারণ যে মানুষটা তার জীবনকে অন্ধকারে ডুবিয়েছেতার প্রতি ভালোবাসা জন্মানো মানে নিজের আত্মাকেই অপমান করা।
_____বুকের ভেতরের ভারী অনুভূতিগুলো থেকে পালাতে চাইলেও পারে না ইশায়া।তবুও নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করে সে।
কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকার পর হঠাৎই বিরক্ত গলায় বলে ওঠে,
___মারিয়া এলেনা,আমার খুব ক্ষুধা লেগেছে।
তার কণ্ঠে ক্লান্তি।
রুমের একপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মারিয়া এলেনা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নিচু করে এগিয়ে আসে।
নরম গলায় জিজ্ঞেস করে,
___কি খাবেন, ম্যাম?
ইশায়া কিছুক্ষণ ভেবে ঠোঁট কামড়ে বলে,
___কাচ্চি বিরিয়ানি… ঝাল ঝাল।
কয়েক মাস আগেও এত ভারী খাবারের নাম শুনলেই বিরক্ত লাগতো। আর এখন?
এখন মনে হয় সব সে একাই শেষ করে ফেলতে পারবে।
মারিয়া এলেনা কোনো প্রশ্ন না করেই নিচে চলে যায়।
এই প্যালেসে ইশায়ার জন্য আলাদা ব্যবস্থা করা আছে সবকিছুর।ভীর নিজে বাংলাদেশ থেকে নামকরা শেফ এনেছে ইশায়ার জন্য।তার খাওয়া দাওয়া থেকে শুরু করে সব ছোট ছোট পছন্দও কারও অজানা নয় এখানে।
ইশায়ার বলা মতো রান্না শেষ হয়। কিছুক্ষণ পর পুরো রুমে ছড়িয়ে পড়ে কাচ্চি বিরিয়ানির গাঢ়, মসলাদার ঘ্রাণ।
টেবিলে বড় প্লেটে সাজিয়ে রাখা হয় ধোঁয়া ওঠা কাচ্চি বিরিয়ানি।ইশায়া উঠে না,সে বলে তাকে বিছানায় এনে দিতে,
তাই করা হয়।
সে বিছানায় আরাম করে বসেই খাওয়া শেষ করে।
খাওয়া আর ঘুমানো এটাই তার কাজ।খাওয়া শেষে বিরক্ত মুখে নিজের পেটের দিকে তাকায় ইশায়া।
সে কিছুতেই বুঝতে পারে না তার এত খেতে ইচ্ছে করে কেন।এমন অবস্থা হয়েছে যে, পেট ভরে খাওয়ার আধাঘণ্টা পরই আবার ক্ষুধায় মাথা ঘুরতে শুরু করে তার।মনে হয় যেন বহুদিন কিছু খায়নি।এই ব্যাপারটা ভীষণ বিরক্ত করে তাকে।
ঠোঁট ফুলিয়ে বিড়বিড় করে বলে ওঠে,
__এভাবে কেউ খায় নাকি।তবুও হাত থামে না তার।
যতই বিরক্ত হোক
তার শরীর এখন শুধু একটাই জিনিস বোঝে
ক্ষুধা।
_____ক্যাটালিনার ভাইয়ের ছেলে জেইন।সে এসেছে আলভারেয স্টেইটে।
তার চোখে ভয়ংকর দম্ভ, ক্যাটালিনার মতোই সে।
ছোটবেলা থেকেই শিখেছে যা ভালো লাগে, তা ছিনিয়ে নেওয়া।আর এই প্যালেসে পা রাখার পর প্রথমবারের মতো তার সেই নোংরা আকাঙ্ক্ষা গিয়ে আটকে একজন নারীর উপর।সে আর কেউ নয় ইশায়া।
তখন থেকেই ইশায়া যে সময় বাগানে যায় হাটার জন্য সে তখন দূর থেকে দেখে তাকে।
___দূরের ঝাড়বাতির সোনালি আলো পড়ে মার্বেলের মেঝে চকচক করছে।
জেইন ধীর পায়ে করিডোর পার হচ্ছিল।চোখে অলস বিরক্তি।আর সেই সময়-ই সিঁড়ির ধারে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার দিকে তার নজর যায়।
যাকে ঘিরে চলেছে আরো অনেক মেয়ে।
সাদা পোশাকে ঢাকা শরীর।চোখেমুখে শান্ত ক্লান্তি।
তবুও এমন এক সৌন্দর্য, যেটা চোখ সরাতে দেয় না।
জেইনের হাঁটা থেমে যায়।সে স্থির হয়ে তাকিয়ে থাকে।
মুহূর্তের মধ্যেই তার চোখের দৃষ্টি বদলে যায়।
অস্বাভাবিক হয়ে ওঠে।যেন সামনে কোনো মানুষ না, বরং বহুদিনের ক্ষুধার সামনে খাবার দাঁড়িয়ে আছে।
জেইনের ঠোঁটে ধীরে ধীরে বাঁকা হাসি ফুটে ওঠে।
সে পাগল হয়ে যাচ্ছে দিন দিন ইশায়ার জন্য।
বেলা এসব বলে দেয় ক্যাটালিনাকে।
____সেই রাতেই ক্যাটালিনার ঘরে বৈঠক বসে।ক্যাটালিনা সোফায় বসে আছে।হাতে ওয়া*ইনের গ্লাস।চোখদুটো বরফের মতো ঠান্ডা।তার সামনে দাঁড়িয়ে জেইন।
ক্যাটালিনা বলে ওঠে,
___যদি মরতে না চাস তাহলে ওর থেকে নজর সরা।
জেইন হাসে ক্যাটালিনার কথায়।
ক্যাটালিনা এবার শক্ত গলায় বলে,
___ভীর যদি জানতে পারে তোকে মে*রে তার কু*কুর গুলোকে খাওয়াবে।
কিন্তু ভয় পাওয়ার বদলে জেইনের চোখে আরো নোংরা আগ্রহ জ্বলে ওঠে।
সে গম্ভীর গলায় বলে,
___তো তুমি কি ওকে ছেড়ে দিবে?
ক্যাটালিনার চোখ সরু হয়ে আসে।
জেইন এবার সামনে ঝুঁকে নিচু গলায় বলে,
___তুমি-ই তো চাইছো ওকে শেষ করতে,তাহলে শেষ করার আগে একবার…
ঠাসসসসস!
চ*ড়ের শব্দে পুরো ঘর কেপে ওঠে ।
জেইনের মুখ একপাশে ঘুরে যায়।
ক্যাটালিনা ততক্ষণে দাঁড়িয়ে গেছে।চোখেমুখে তার ভয়ংকর রাগ।সে আঙুল তুলে ফিসফিসিয়ে বলে ওঠে,
___চুপ! একদম চুপ!
তার নিশ্বাস ভারী হয়ে উঠেছে।
তুই নিজে ম*রবি, সাথে আমাকেও মা*রবি। একেবারে চুপ।
জেইন কিছু বলতে যেতেই ক্যাটালিনা আরো কঠিন গলায় বলে ওঠে,
___নাহয় এক্ষুনি তোকে বের করে দিবো এখান থেকে।
তুই ওর দিকে আর তাকাবি না। ভীর যদি আন্দাজ ও পায় ধ্বংস করে ফেলবে সবাইকে, আমাদের ও ছাড়বে না ওই মেয়ের কিছু হলে।
___”ভীর।”
নামটা শুনেই কয়েক সেকেন্ডের জন্য নিশ্চুপ হয়ে যায় জেইন।
কারণ সবাই জানে ভীর শুধু মানুষ মারে না।মানুষের অস্তিত্ব মুছে দেয়।কিন্তু ইশায়াকে সে ভেতর থেকে বের করতে পারছেনা।
ক্যাটালিনা ও*য়াইনের গ্লাস নামিয়ে রাখে।
সে আমার বন্দিনী পর্ব ৯২
___ওকে আমি কিভাবে সরাই সেটা সময় হোক তখন দেখবি।
কয়েক সেকেন্ড থেমে আবার ও বলে,
___ডেলিভারির সময়-ই বুঝতে পারবি সব।
ভীরের অনুপস্থিতিতে তার শ*ত্রুরা মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে।
আর যে এখনো জানেই না,তার পৃথিবীর দিকে বিষাক্ত সাপের মতো এগিয়ে আসছে নতুন বিপদ।
