Home হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৩০ (৩)

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৩০ (৩)

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৩০ (৩)
সাবা খান

ছয় বছর পূর্বে……
আজকের সকালটা ছিল অদ্ভুত রকমের নির্মল। আকাশ যেন ধুয়ে মুছে রাখা নীল কাঁচের বিশাল কোনো প্রাসাদ। সাদা পেজা তুলোর মতো মেঘগুলো দূরে দূরে ভাসছে অলস ভঙ্গিতে সাথে রোদের কোমল আভা শহরের দালানকোঠার গায়ে পড়ে এক স্বর্ণাভ দীপ্তি ছড়িয়ে দিচ্ছে। মৃদুমন্দ বাতাসে কোথা থেকে ভেসে আসছিল শিউলি আর রজনীগন্ধার মাদকতাময় গন্ধ। প্রকৃতি যেন আজ বিশেষ কোনো উৎসবের জন্য নিজেকে অলংকৃত করেছিল। তবে উৎসবটা কীসের?

রিয়ানার বিয়ের?
হ্যাঁ, দিনটা ছিল রিয়ানার বিয়ের দিন। চারদিকে কৃত্রিম আলোর ঝলকানি। ম্যানশনের প্রতিটা কোণ রঙিন ফুল, ঝাড়বাতি আর নরম আলোকসজ্জায় সেজে উঠেছে। মানুষের কোলাহল, হাসির শব্দ, আত্মীয়দের ব্যস্ত পদচারণা সবকিছু মিলিয়ে পুরো পরিবেশটা উৎসবমুখর।
কিন্তু এই সমস্ত উল্লাসের মাঝেও একটা মানুষ যেন নিঃশব্দে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছিল ভেতরে ভেতরে। সে আর কেউ না রিয়ানা। টকটকে লাল পাকিস্তানী লেহেঙ্গাতে মোড়ানো মেয়েটা সবার সামনে বসে আছে নিথর হয়ে। চোখে গাঢ় কাজল, কপালে টকটকে সিঁদুররঙা ছোট্ট বিন্দি, গলায় ভারী গয়না সবকিছু মিলিয়ে দেখতে তাকে যেন রাজপ্রাসাদের কোনো বিষণ্ন রাণীর মতো লাগছিল। কিন্তু তার চোখদুটো?
সেগুলো বারবার সকলের নজর এড়িয়ে ছুটে যাচ্ছিল মেইন ফটকের দিকে। একবার, আরেকবার, আবারও। মনের খুব গভীরে কোথাও একটা সুপ্ত আশা এখনো বেঁচে আছে, হয়তো সারহাদ আসবে। শেষবারের মতো হয়তো তাকে নিজের করে নিতে না পারুক, অন্তত বিদায় জানাতে তো আসবে। কিন্তু নাহ, সারহাদ আসেনি। সময় এগিয়ে যাচ্ছে নিজের গতিতে, তাকে আটকানোর সাধ্যি কার? নিকাহ্‌র আসর বসলো। চারদিক নিস্তব্ধ হয়ে এলো। কাজী সাহেব শান্ত কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন রিয়ানাকে,

–“আপনি কি আয়ানকে স্বামী হিসেবে কবুল করছেন?”
রিয়ানার বুকের ভেতরটা হঠাৎ মোচড় দিয়ে উঠলো। চোখদুটো আবারও ছুটে গেল ফটকের দিকে। না, কেউ আসছে না, কেউ না। “সারহাদ সত্যিই আসবে না” এই বাক্যটা মনে মনে আওড়ালেও কিন্তু বিশ্বাস করতে যেন তার সমস্ত অস্তিত্ব ছিন্নভিন্ন করে দিল। গলার কাছে জমে থাকা কান্নার ঢেলা আরও শক্ত হয়ে বসে রইলো। তারপর সময় নিয়ে মৃতপ্রায় কণ্ঠে শুধালো,
–“ক… কবুল”
এই একটি শব্দের সঙ্গে সঙ্গে যেন তার জীবনের সমস্ত অপূর্ণতা চিরতরে মাটিচাপা পড়ে গেল। শেষ, কবুল বলার সঙ্গে সঙ্গে রিয়ানা নিজের নামটা সারাজীবনের জন্য লিখিয়ে দিল অন্য এক মানুষের নামে। কাবিননামা তার সামনে এগিয়ে দেওয়া হলো।
“আয়ান” নামটার পাশে নিজের নাম লিখতে গিয়ে তার হাত বারবার কেঁপে উঠলো।কলমের নিব কাগজের উপর কাঁপা কাঁপা আঁচড় কাটছে। হঠাৎ টুপ করে একফোঁটা উষ্ণ জল গড়িয়ে পড়ে কাগজের উপর। কেউ খেয়াল করলো না, কেউ বুঝলো না। চারদিকে তখন উল্লাস শুরু হয়ে গেছে।

কিন্তু এই উৎসব মুখর পরিবেশের ঠাঁই হলো না বেশিক্ষণ। কিয়ৎকাল পরই এক গগনবিদারী আওয়াজ তুলে গর্জে উঠলো আকাশ। রোদে ঝলমল করা নির্মল আকাশটা আচমকা কালো মেঘে ঢেকে গেছে। বাতাসের দিক বদলে গেল হঠাৎ। চারপাশে কেমন এক অদ্ভুত অন্ধকার নেমে এসেছে। তারপর ক্ষণিকের মধ্যেই শুরু হয় মুষলধারে বৃষ্টি। এমন ভারী বর্ষণ যেন আকাশ নিজেই আজ কারও জন্য শোক প্রকাশ করছে।
এই বৃষ্টির মধ্যেই বিদায় হলো রিয়ানার। গাড়ির জানালার পাশে বসে থাকা রিয়ানা নিঃশব্দে তাকিয়ে ছিল বাইরে। রাস্তার স্ট্রিট লাইটের আলো বৃষ্টির পানিতে ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। রিয়ানা ভ্রুক্ষেপহীন তাকিয়ে থাকে সেদিকে আর ভাবে, তার বুকের ভেতরটাও কি ঠিক এমন ঝাপসা হয়ে গেছে?
এই প্রশ্নের উত্তর তার কাছে নেই। পাশে বসা আয়ান মাঝে মাঝে আড়চোখে তাকাচ্ছে তার দিকে। আয়ানের চোখে আজ এক অদ্ভুত কোমলতা, তাতে কোনো জোর নেই, কোনো অধিকার ফলানোর চেষ্টা নেই আছে শুধু নীরব যত্ন।
সোফিয়া চেয়েছিল রিয়ানা ‘জাওয়ান ম্যানশনে’ থাকুক। কিন্তু রিয়ানা তাতে একদম সম্মত হয়নি। সে খুব ভালো করেই বুঝতে পেরেছিল, এতে আয়ানের সম্মান ক্ষুণ্ণ হবে। আর যে মানুষটা তাকে নিঃশর্ত ভালোবেসেছে, তার আত্মসম্মানে আঘাত করার মতো নিষ্ঠুরতা সে করতে পারেনি। তাই সে আয়ানের হাত ধরেই নিজের নতুন জীবনের দিকে এগিয়ে এলো।

আয়ানের গুলশানের ছোট্ট ফ্ল্যাটটায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত অনেকটা গড়িয়ে গেছে। ফ্ল্যাটটার সামনে দাঁড়িয়ে রিয়ানা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। তাদের ম্যানশনের থেকে ছোট্ট, সাধারণ একটা জায়গা। তবু কী অদ্ভুত উষ্ণতা আছে এখানে। ভিতরে কদম ফেলতেই রিয়ানা কিছুটা থমকে গেল। পুরো ফ্ল্যাটটা ফুল আর ছোট ছোট আলোকসজ্জায় সাজানো, ড্রয়িংরুমের একপাশে গোলাপের পাপড়ি ছড়িয়ে রাখা, দেয়ালে ঝুলছে রঙিন ফেয়ারি লাইট, টেবিলের উপর ছোট একটা চকলেট কেক। আয়ানের অনাথ আশ্রমের বন্ধুরাই সব সাজিয়েছে। তারা সবাই আয়ানকে ঘিরে হৈচৈ করছে, হাসছে, মজা করছে। আর অন্যদিকে আয়ান?
সেও তাদের সাথে তাল মিলিয়ে এত হাসছিল…এতটা প্রাণ খুলে যেন বহু বছরের কোনো স্বপ্ন আজ পূরণ হয়েছে। আর সেই দৃশ্যটাই রিয়ানার বুকটা আরও ভারী করে তুলছিল। সে বারবার আয়ানের হাসিটাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেও কোনরূপ কৃত্রিমতার ছিটেফোঁটা খুঁজে ফেলো না। রিয়ানা বহু কষ্টে নিজেনিজের ঠোঁটের হাসিটা ধরে রেখেছে। কিন্তু ভিতরে ভিতরে?
সে যেন কাঁচের টুকরোর মতো ভেঙে গুঁড়ো হয়ে গেছে। কান্নারা দলা পাকিয়ে গলায় কুণ্ডলী পাকিয়ে বসে আছে। শ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে ভীষণ। হঠাৎ সে মৃদু হেসে আয়ানকে বললো,

–“আমি একটু… ওয়াশরুমে যাচ্ছি”
আয়ান তার বিপরীতে কিছু বলার আগেই রিয়ানা ওয়াশরুমে ঢুকেই দরজা লাগিয়ে দিল। আর তারপর…নিজেকে আর সামলাতে পারলো না। বেসিন আঁকড়ে ধরে কেঁদে উঠলো নিঃশব্দে। তার সারা শরীর ঝাঁকুনি দিয়ে কেঁপে ওঠে। চোখ দিয়ে অবিরাম অশ্রু ঝরছে। সে আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে তারপর ফিসফিস করে নিজেকেই বললো,
–“তুই স্বার্থপর…ভীষণ স্বার্থপর রিয়ানা”
কিছুক্ষণ পর নিজেই চোখ মুছে জোর করে ঠোঁটে হাসি টেনে তারপর আবার বাইরে ফিরে এলো। মুখের ভাব এমন যেন কিছুই হয়নি। কিন্তু আয়ানের চোখ থেকে তা এড়ালো না। সে সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞেস করে,
–“আপনার কি শরীর খারাপ লাগছে?”
রিয়ানা মাথা নিচু করে মৃদু স্বরে বললো,
–“একটু মাথা ব্যথা…”
ব্যাস, তার বলা এইটুকু বাক্যতেই আয়ান ব্যস্ত হয়ে উঠলো। বিচলিত কণ্ঠে একে একে প্রশ্ন ছুঁড়তে শুরু করে সে,
–“ওষুধ লাগবে?”
–“চা করে দিই?”
–“ডাক্তার ডাকবো?”
তার উদ্বিগ্ন কণ্ঠ শুনে রিয়ানার বুকটা আবার মোচড় দিয়ে উঠে। মনে মনে হাজারও প্রশ্নের সম্মুখীন হয়, এই মানুষটা এত ভালো কেন?
এতটা কোমল কেন?

রাত আর একটু বাড়তেই আয়ানের বন্ধুরা সবাই চলে গেল। দরজা বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরো ফ্ল্যাটটা নিস্তব্ধ হয়ে যায়। এখন এই ছোট্ট পৃথিবীতে শুধু দু’জন মানুষ, আয়ান আর রিয়ানা।
শুরু হলো তাদের নব্যবিবাহিত জীবন। এক ছাদের নিচে দুটি মানুষ। দু’জনেরই আলাদা অতীত, আলাদা ক্ষত, আলাদা অপূর্ণতা। তবুও জীবন কারো অপেক্ষায় থেমে থাকে না। সময়ের ছন্দে পা মিলিয়ে এগিয়ে যায় অবিরাম। আর সময় মানুষের সবচেয়ে নির্মম শিক্ষক। সে জোর করেই মানুষকে বাঁচতে শেখায়। যেভাবে রিয়ানা ও আয়ানকে শিখিয়েছে। গুলশানের সেই ছোট্ট ফ্ল্যাটটাতে ধীরে ধীরে সংসারের গন্ধ ছড়িয়ে পড়তে লাগলো। সকালের ব্যস্ততা, রাতের ক্লান্তি, রান্নাঘরে থালা বাসনের শব্দ, বারান্দার গাছে পানি দেওয়া সব মিলিয়ে একটা শান্ত ছোট্ট সংসার। আর এই সংসারের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল আয়ান।
লোকটা যেন মানুষ নয়, এক টুকরো প্রশান্তি। রিয়ানার প্রতি তার যত্নগুলো এতটাই নিঃশব্দ ছিল যে সেগুলো অনেক সময় চোখেও পড়তো না, শুধু অনুভব করা যেত। সকালে ঘুম থেকে উঠেই সে প্রথমে রিয়ানার জন্য চা বানাতো। চায়ের কাপটা হাতে দিয়ে মৃদু হেসে বলতো,

–“আমি চিনি কম করে দিয়েছি। আপনার বেশি মিষ্টি খেলে মাথা ব্যথা করে”
রিয়ানা তার বিপরীতে শুধু অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতো। সে নিজেও হয়তো জানতো না, তার কোন জিনিসে কষ্ট হয়, কোন জিনিসে ভালো লাগে। কিন্তু আয়ান জানতো। অথচ…এই সমস্ত যত্ন, ভালোবাসা, কোমলতার মাঝেও রিয়ানার ভেতরে একটা মৃত শহর বাস করতো। আর সেই শহরের নাম, সারহাদ।
রমণী বহু চেষ্টা করেছে তাকে ভুলে যেতে, যাকে বলে ভীষণ চেষ্টা। কখনো নিজের আলমারির গোপন ড্রয়ারে লুকিয়ে রাখা পুরোনো ছবিগুলো ছিঁড়ে ফেলতে গিয়েও পারেনি। বরং ছবির উপর আঙুল বুলিয়ে কেঁদেছে নিঃশব্দে। এই ছবি গুলো মিডিয়ার সামনে আরজের মুভির ইন্টারভিউর সময় তুলেছে। পরবর্তীতে রিয়ানা ছবিগুলোকে সংগ্রহ করে নিজের কাছে রেখে দিয়েছে। কখনো বারান্দায় দাঁড়িয়ে গভীর রাতে আকাশের দিকে তাকিয়ে নিজেকে বুঝিয়েছে,

“সব শেষ…”
কিন্তু হৃদয় কি এত সহজে বোঝে?
রিয়ানার মাঝে মাঝে মনে হতো সারহাদ যেন কোনো মানব নয়, একটা বিষাক্ত নেশা। সে যত দূরে যেতে চায়, ততই সে শিরা উপশিরায় ছড়িয়ে পড়ে। কখনো আয়ানের পাশে বসে থেকেও হঠাৎ থমকে যেত সে। কেননা আয়ানের হাসির আড়ালেও সে অন্য এক মুখ খুঁজে বেড়াত। কার? সারহাদের, হয়তো। কখনো রান্না করতে করতে চামচ হাতে থেমে যেত। কখনো কাপড় ভাঁজ করতে গিয়ে শূন্য দৃষ্টিতে বসে থাকতো দীর্ঘক্ষণ। তারপর আচমকা বাস্তবে ফিরে এসে নিজের মাথা দুহাতে চেপে ধরে নিজেই নিজেকে বুঝাতো,
–“না… না রিয়ানা…এতটা স্বার্থপর হসনা, এভাবে চললে হবে না…তুই এখন অন্য কারো স্ত্রী”
রিয়ানা বেশি বেশি করে চেষ্টা করতো আয়ানের সাথে সময় কাটাতে। নিজেকে জোর করে হাসিখুশি রাখতে। আয়ান যখন অফিস থেকে ফিরতো, রিয়ানা দরজা খুলে হাসিমুখে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতো। যদিও সেই হাসিতে ক্লান্তির ছাপ থাকতো স্পষ্ট। তবুও এটুকুতেই আয়ান খুশি হয়ে যেত। ছুটির দিনগুলোতে আয়ান তাকে নিয়ে বাইরে বের হতো। কোন বিলাসবহুল জায়গায় নয়, বরং কখনো নদীর ধারে, কখনো ছোট্ট কোনো ক্যাফেতে।
একদিন বৃষ্টির মধ্যে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে দুজনে ফুচকা খাচ্ছিল। রিয়ানা কখনো এভাবে রাস্তায় দাঁড়িয়ে কিছু খায়নি কিন্তু আয়ান বলাতে সে একমুহূর্ত না ভেবে হ্যাঁ বলে দিয়েছে। আয়ান একপলক রিয়ানার দিকে তাকিয়ে হেসে বলে,

–“আপনি ঝাল খেতে পারেন না, তাও খাচ্ছেন কেন?”
রিয়ানা যদিও সত্যি এত ঝাল খেতে পারে না তবুও জোর করে একটা গিলে ভ্রু কুঁচকে প্রতুত্তর করে,
–“আমি পারি না কে বলেছে?”
পরমুহূর্তেই ঝালে কাশি উঠে যায় তার। আর আয়ান হেসে পানির বোতল এগিয়ে দেয়। সেই মুহূর্তে রিয়ানাও হেসেছিল। সত্যি সত্যি, কোন ভনিতা ছিল না তার হাসিতে। আবার কোনোদিন রাতে বিদ্যুৎ চলে গেলে আয়ান মোমবাতি জ্বালিয়ে বলতো,
–“চলেন আজ আপনাকে ভূতের গল্প বলি”
রিয়ানা বিরক্ত হয়ে যেত আয়ানের বাচ্চামতে,
–“আয়ান, তুমি বাচ্চা নাকি?”
আয়ান তখন বাচ্চাদের মতো মুখ করে বলতো,
–“হ্যাঁ, শুধু আপনি বুঝেন না”
এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলো ধীরে ধীরে রিয়ানার হৃদয়ের ভাঙা জায়গাগুলোতে নরম প্রলেপ দিচ্ছিল। কিন্তু সবকিছু সত্ত্বেও কিছু কিছু রাত রিয়ানার জন্য ছিল ভয়ংকর, গভীর রাত। যখন পুরো শহর ঘুমিয়ে পড়তো, আয়ানও ক্লান্ত শরীর নিয়ে পাশে নিশ্চিন্তে ঘুমাতো। আর রিয়ানা?

সে নিঃশব্দে উঠে বারান্দায় গিয়ে বসে থাকতো। দূরের আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতো আনমনে। তার মনে হতো, মানুষের শরীর বদলানো যায়, নাম বদলানো যায়, সম্পর্ক বদলানো যায়…কিন্তু হৃদয়?
হৃদয় বোধহয় কোনোদিনও পুরোপুরি বদলায় না। সে একবার কারো মায়াতে আটকে গেলে আর দ্বিতীয় কাউকে প্রবেশ করতে দেয় না।
একদিন রিয়ানা আর থাকতে না পেরে নিজের সমস্ত আত্মসম্মান গুঁড়িয়ে দিয়ে সে সারহাদকে কল করেছিল। একবার, দুবার, তিনবার কিন্তু প্রতিবারই একই উত্তর আসে,
“নাম্বারটি বর্তমানে বন্ধ আছে”
রিয়ানার বুকের ভেতরটা কেমন ফাঁকা হয়ে গিয়েছে। সে ফোনটা বুকে চেপে ধরে অনেকক্ষণ বসে ছিল একই জায়গায়। তারপর হঠাৎ তিক্ত হেসে বলেছে,

–“তুই সত্যিই নিষ্ঠুর, রিয়ানা”
সময় যত গড়াচ্ছে রিয়ানা তত বুঝতে পারছিল, নিজের সাথে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকাটা কত ভয়ংকর। প্রতিদিন আয়ানের সামনে হাসা, প্রতিদিন নিজেকে বোঝানো, প্রতিদিন অতীতকে হত্যা করার চেষ্টা করা, এ যেন ধীরে ধীরে নিজের আত্মাকে ছিন্নভিন্ন করার মতো হয়ে ওঠেছে। এইভাবেই কেটে গেল তিন মাস। তারপর একদিন…সব বদলে গেল যখন রিয়ানা জানতে পারলো সে মা হতে চলেছে। সেদিন তার হাত কাঁপার সাথে সাথে তার চোখদুটোও অবিশ্বাসে বড় হয়ে গিয়েছিল। তার ভেতরে…আরেকটা প্রাণ, একটা ছোট্ট হৃদস্পন্দন বেড়ে ওঠছে। প্রথমবার নিজের উদরে হাত রেখে রিয়ানা অদ্ভুত এক অনুভূতি টের পেয়েছিল। এটাই কি মাতৃত্ব?
এত কোমল, এত গভীর হয় বুঝি। তার চোখ ভিজে উঠেছিল অজান্তেই। আর আয়ান?
লোকটা যেন পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ হয়ে গিয়েছিল সেদিন। টেস্টক্রিটটা হাতে নিয়েই সে প্রথমে কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে ছিল। তারপর শিশুদের মতো হেসে উঠেছে, একদম সত্যিকারের উচ্ছ্বাস ছিল তার সারা আদলে। তার চোখ চকচক করছিল আনন্দে। সে হাঁটু গেড়ে রিয়ানার সামনে বসে কাঁপা কণ্ঠে আওড়ায়,

–“আমি… আমি বাবা হবো?”
রিয়ানা মৃদু হেসে মাথা নেড়ে তাকে হ্যাঁ বুঝায়। পরমুহূর্তেই আয়ান সেভাবেই তাকে জড়িয়ে ধরে এত শক্ত করে, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসটাকে বুকে আগলে রেখেছে।
সেদিন সারারাত সে ঘুমায়নি। কখনো বাচ্চার নাম ভাবছে, কখনো অনলাইনে ছোট্ট জামাকাপড় দেখছে। কখনো হঠাৎ রিয়ানার পেটের দিকে তাকিয়ে হাসছে নির্বোধের মতো। বারবার একটা বাক্যই বলছে,
–“আমাদের বেবি…”
সেই প্রথম রিয়ানা বুঝতে পেরেছিল, একজন পুরুষ যখন সত্যিকারের বাবা হতে শেখে, তখন তার ভেতরের সমস্ত কঠোরতা গলে যায়। সেদিন অফিস থেকে দুজনের একসাথে হাসপাতালে যাওয়ার কথা ছিল মেডিকেল চেকআপের জন্য। কিন্তু হঠাৎ জরুরি কাজ পড়ে যাওয়ায় আয়ান যেতে পারেনি। ফোনে বহুবার ক্ষমা চেয়ে বলেছিল,
–“প্লিজ রাগ করবেন না…আমি চেষ্টা করছি আপনার ভাইকে মানিয়ে যত দ্রুত সম্ভব আসতে”
রিয়ানা শুধু মৃদু স্বরে বলেছে,

–“ঠিক আছে…”
ঢাকার অভিজাত অঞ্চলে দাঁড়িয়ে থাকা বহুতল কাঁচঘেরা ভবনটির নাম
“অরোরা ক্রিস্ট মেডিকেল ইনস্টিটিউট”
বাইরের ব্যস্ত শহরটার সঙ্গে যেন এর ভেতরের জগতের কোনো মিল নেই। স্বচ্ছ কাঁচের দরজা পেরিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলেই এক ধরনের নির্বাক শীতলতা মানুষকে ঘিরে ধরে। চারদিকে তীব্র কোনো হৈচৈ নেই, না আছে করিডোর কাঁপিয়ে তোলা চিৎকার, না অযথা দৌড়ঝাঁপ। সবকিছুই কেমন পরিমিত, সংযত, নিয়ন্ত্রিত। আর এই সমস্ত শীতল স্থিরতার মাঝখানে গাইনোকলজি বিভাগের সামনের ধূসর চেয়ারে বসে আছে এক নারী,
“রিয়ানা”
তার হাতে একটা কাগজ, না…এটা শুধু কাগজ না। মুহূর্ত কয়েক আগেও যে কাগজটা ছিল মাতৃত্বের আনন্দের প্রতীক, এখন সেটাই যেন মৃত্যুদণ্ডের ঘোষণা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটু আগেও তার পাশে সেক্রেটারি আর ড্রাইভার ছিল। কিন্তু রিয়ানা তাদের চলে যেতে বলেছে। সে একা থাকতে চেয়েছে।

তার কাঁপা কাঁপা আঙুলের ফাঁক গলিয়ে সাদা রিপোর্টের কাগজটা পড়ে যাচ্ছিল প্রায়। ঝাপসা চোখে আবারও তাকালো সে রিপোর্টটার দিকে। কালো অক্ষরগুলো যেন চোখের সামনে ভাসছে কিন্তু পড়তে পারছে না। মুহূর্তে আবারও তার পৃথিবীটা ঘুরে উঠলো। কেমন যেন শ্বাস আটকে আসছে, গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। কণ্ঠনালীতে যেন কেউ অদৃশ্য পাথর চেপে ধরেছে। চোখের পলক বন্ধ করে খুলতেই গড়গড় করে অশ্রু গড়িয়ে পড়লো কাগজটার উপর।কিছুক্ষণ আগে ডাক্তারের কেবিনে বসে থাকা মুহূর্তগুলো আবারও ভেসে উঠলো চোখের সামনে। ডক্টর নায়লা রহমান, মাঝবয়সী নারী তিনি। চোখে ভারী ফ্রেমের চশমাটা একটু উপরে তোলে মুখভর্তি পেশাদার গাম্ভীর্যতা বজায় রেখে অনেকক্ষণ নীরবে রিপোর্টগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিলেন। তারপর ধীরে ধীরে চশমাটা খুলে টেবিলের উপর রেখে বলেন,

–“মিসেস রিয়ানা…আমি চাই আপনি মানসিকভাবে একটু স্ট্রং থাকুন”
রিয়ানার বুক ধক করে উঠেছিল। সে চিন্তিত গ্রস্ত হয়ে বলল,
–“বেবি… ঠিক আছে তো?”
ডক্টর নায়লা কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলেন,
–“ডোন্ট ওয়ারি, বেবি এখনো স্টেবল আছে। কিন্তু… আপনার শরীরের কন্ডিশন খুব ভালো না”
রিয়ানা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে তার কথার অর্থ বুঝার চেষ্টা করে কিছুপল। ডাক্তার রিপোর্টটা তার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলেন,
— “আপনার জরায়ুতে ক্ষতিকারক সিনড্রোম ডেভেলপ করতে শুরু করেছে”
রিয়ানা স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে ছিল। ডাক্তার তার চোখের ভাষা বুঝে ধীরে ধীরে ব্যাখ্যা করতে শুরু করলেন,
–“আমি আপনাকে খোলাখুলিই বলছি, এটা এক ধরনের অত্যন্ত আগ্রাসী ক্যান্সার জাতীয় জটিলতা। সাধারণত দীর্ঘদিনের হরমোনাল ডিসঅর্ডার, অনিয়মিত জীবনযাপন, অতিরিক্ত মানসিক ট্রমা, অপুষ্টি এবং বিশেষ করে দীর্ঘ সময় ধরে ড্রাগস নেওয়ার ফলে শরীরের রিপ্রোডাক্টিভ সিস্টেম ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে এই রোগের ঝুঁকি তৈরি হয়”

রিয়ানা সম্পূর্ণ নিস্তব্ধ, হতভম্ব হয়ে যায়। হ্যাঁ, সে ড্রাগস নিয়েছিল বেশ কয়েকবার। যদিও তার এটা অভ্যাস না, নিয়েছে মূলত সারহাদ কে ভুলার জন্যই। যখন আয়ান কোন বিজনেস ট্রিপ বা কোন কারণে তাকে দূরে যেতে হতো তখন তার মস্তিষ্ক যেন আরো বেশি অবাধ্য হয়ে সারহাদের কথা ভাবতো। তখন এক প্রকার নিজেকে সংবরণ করার জন্যই নিতো। রিয়ানার ঠোঁট থেকে ফিসফিস করে বের হয়,
–“না… না এমনটা হতে পারে না”
–“আমি দুঃখিত। আপনার শরীর বহুদিন ধরে ভেতর থেকে ড্যামেজ হচ্ছিল। আপনার ইউটেরাসের টিস্যুগুলো দুর্বল হয়ে গেছে। এই প্রেগন্যান্সি আপনার শরীরের উপর ভয়াবহ চাপ ফেলছে”
রিয়ামা বিপরীতে কিছুই বলছে না। ডাক্তার কিছুক্ষণ চুপ থেকে তারপর খুব ধীরে বলেন,
–“তবে এর একটাই নিরাপদ উপায় আছে”
রিয়ানার বুকের ভেতরটা ঠান্ডা হয়ে গেল ডাক্তারের এই বাক্যটা শুনে,

–“কি উপায়?”
ডক্টর নায়লা চোখ নামিয়ে আওড়ায়,
–“আপনার জরায়ু অপসারণ করতে হবে”
মুহূর্তে রিয়ানার কানে যেন বিকট শব্দ হতে লাগলো। একটু আগের কিঞ্চিৎ হাসিখুশি চেহারাটায় মুহূর্তে তমাসায় ডুবে গেল। ডাক্তার বাকিটাও বলন নিষ্ঠুর বাস্তবতার মতো,
–“আর সেই সঙ্গে… প্রেগন্যান্সিটাও টার্মিনেট করতে হবে”
ব্যাস, পৃথিবীটা যেন সেখানেই থেমে গিয়েছিল রিয়ানার জন্য। রিয়ানা নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গিয়েছিল কয়েক সেকেন্ডের জন্য। তার ঠোঁট কাঁপছিল। চোখদুটো অবিশ্বাসে বড় বড় হয়ে উঠেছিল। কণ্ঠ থেকে আপনাআপনি বের হয়,
–“আমার… বেবি?”
ডক্টর একটা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে বলেন,

–“দেখুন, আপনি যদি এখনই ট্রিটমেন্ট শুরু না করেন তাহলে ডেলিভারির সময় রোগটা আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। ইন্টারনাল ব্লিডিং হতে পারে। ম্যালিগন্যান্ট সেল শরীরের অন্য অংশেও ছড়িয়ে যেতে পারে। এমনও হতে পারে শেষ মুহূর্তে মা অথবা বাচ্চার মধ্যে যেকোনো একজনকে বাঁচানো সম্ভব হবে”
রিয়ানার চোখ বেয়ে অবিরাম পানি ঝরছে। সে কাঁপা কণ্ঠে শুধালো,
–“মানে… আমি মরেও যেতে পারি?”
ডক্টর নায়লা দীর্ঘশ্বাস ফেলে প্রতুত্তর করে,
–“আমি মিথ্যে আশা দিতে চাই না,
রিস্ক খুব হাই”
রিয়ানা নিজের পেটের উপর কাঁপা হাত রাখলো। সেখানে…একটা না দুটো ছোট্ট প্রাণ তার ভেতরে। আয়ানের ভালোবাসার একমাত্র অস্তিত্ব। তার চোখের সামনে ভেসে উঠলো আয়ানের সেই শিশুসুলভ হাসি,
“আমি বাবা হবো?”
লোকটা কতটা খুশি হয়েছিল সেদিন। কতবার তার পেটের উপর কান রেখে বাচ্চার সঙ্গে কথা বলেছিল। কত স্বপ্ন, কত পরিকল্পনা করেছে বাচ্চা নিয়ে। রিয়ানার বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠলো। সে ভাবলো, জীবনে সে আয়ানকে কি দিয়েছে?

ভালোবাসা?
না,
সম্পূর্ণ মন?
না,
নিজেকে?
না।
লোকটা শুধু দিয়ে গেছে, আর সে?
সে তো আজ পর্যন্ত শুধু ভাঙাচোরা হৃদয়টাই দিতে পারেনি। তাহলে অন্তত…এই ছোট্ট সুখটুকুও কি সে কেড়ে নেবে?
না.. না, রিয়ানা ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করলো। অস্থিরতায় তার বুক ওঠানামা করছিল দ্রুত। তারপর নিজের মনকে শক্ত করে বললো,
–“না…আমি বাচ্চা রাখবো। যে মানুষটা আমাকে নিঃশর্ত ভালোবেসেছে, তাকে আমি এই সুখ থেকে বঞ্চিত করতে পারবো না। স্বামী হিসেবে এতটুকু পাওয়ার অধিকার আয়ানের আছে…আমি যদি এটুকুও না দিতে পারি, তাহলে আমি কিসের স্ত্রী?”
সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল সে। এই মুহূর্তে আয়ান কে কিছুই জানাবে না। আর না কাউকে। তার মতো তুচ্ছ কেউ পৃথিবী থেকে চলে গেলে কে -ই বা স্মরণ করবে?
ধীরে ধীরে রিয়ানা চোখ খুলে হাতে থাকা রিপোর্টটার দিকে শেষবার তাকালো। তারপর দুই হাতে সেটাকে ছিঁড়ে ফেললো। কাগজগুলো একদম দুমড়ে মুচড়ে ডাস্টবিনে ছুঁড়ে ফেলে দিল। কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো সেদিকে। যেন নিজের ভবিষ্যৎকেই আবর্জনার স্তূপে ফেলে দিল। তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে চোখের জল মুছে ঠোঁটে জোর করে একফোঁটা হাসি টেনে নিঃশব্দে হেঁটে বেরিয়ে গেল হাসপাতালের কাঁচঘেরা করিডোর পেরিয়ে।

রিয়ানার পরের সময়গুলো কেটেছিল এক অদ্ভুত দ্বৈততার মধ্যে। বাহিরে সে ছিল একজন স্ত্রী, একজন হবু মা, একটা ছোট্ট সংসারের নরম কেন্দ্রবিন্দু। আর ভিতরে?
ভিতরে সে ছিল এক যুদ্ধবিদ্ধস্ত নারী, যে প্রতিদিন নিজের হৃদয়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকছিল। সেদিন হসপিটাল থেকে ফেরার সময় গাড়ির জানালার কাঁচে কপাল ঠেকিয়ে বসেছিল রিয়ানা। রাস্তার মানুষগুলোকে নীরব চোখে পর্যবেক্ষণ করছিল সে। কেউ হাসছে, কেউ তাড়াহুড়ো করে বাস ধরছে, কেউ প্রেমিকের হাত ধরে হাঁটছে। কত স্বাভাবিক তাদের জীবন। অথচ তার জীবনটা?
মৃত্যু আর মাতৃত্বের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এক নিঃশব্দ প্রতীক্ষা। ড্রাইভার বারবার রিয়ার ভিউ মিররে তাকাচ্ছিল। সেক্রেটারিও কয়েকবার জিজ্ঞেসও করেছিল,

–“ম্যাম, আপনি ঠিক আছেন?”
রিয়ানা শব্দ না করে শুধু মাথা নেড়ে “হ্যাঁ, ঠিক আছে” বুঝিয়েছে। মানুষ কি কখনো মৃত্যুর সংবাদ বুকে নিয়ে ঠিক থাকতে পারে?
গাড়িটা জ্যামে থাকা অবস্থায় থামলো একটা ছোট্ট স্টেশনারি শপের সামনে। হঠাৎ কী ভেবে রিয়ানা নেমে দোকানটার ভেতরে গিয়ে বহুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো। তারপর খুব সাধারণ দেখতে একটা কালো মলাটের ডায়েরি কিনলো। যদিও কোনোদিন তার ডায়েরি লেখার অভ্যাস ছিল না। বরং সে সবসময় এইসবকে একটু ইম্যাচিউর বলেই ভাবতো। অনুভূতি লিখে রাখে কিশোরীরা, অপূর্ণ প্রেমে ভোগা মানুষরা, আর সে?
সে তো একজন ম্যাচিউর নারী। তাহলে কেন কিনলো?
হয়তো কারণ তার মনে হচ্ছিল, সে আর কোনোদিনও সারহাদের দেখা পাবে না। কিন্তু তার হৃদয়ের ভিতরে জমে থাকা কথাগুলো?
সেগুলো কোথায় যাবে?
কার কাছে বলবে সে?
আয়ানকে?

না, পৃথিবীর কোনো পুরুষই হয়তো সহ্য করতে পারে না তার স্ত্রীর হৃদয়ে অন্য কারও নামের বসতি। আর আয়ান তো তাকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবেসেছে। তার সামনে দাঁড়িয়ে অন্য এক পুরুষের কথা স্বীকার করা মানে হবে আয়ানের সমস্ত ভালোবাসাকে অপমান করা।
বিকেলের দিকে নিজের রুমে বসে বহুক্ষণ ডায়েরিটার দিকে তাকিয়ে ছিল রিয়ানা। বাইরে তুমুল বৃষ্টি চলছে। ভিতরে টেবিল ল্যাম্পের হলদেটে আলো পড়ে আছে কালো মলাটের উপর। রিয়ানা দীর্ঘক্ষণ ভেবেছে, সে কি সত্যিই এতটা দুর্বল হয়ে গেছে?
তার ঠোঁটে তিক্ত হাসি ফুটে ওঠে। নিজেই নিজেকে তাচ্ছিল্য করে বলে,
–“ডায়েরি লিখছি আমি?
এটা তো কিশোরীদের কাজ”
তবুও…সেদিন নিজের সমস্ত অহংকার, সমস্ত আত্মমর্যাদা, সমস্ত পরিণতবোধকে ভেঙেচুরে জীবনে প্রথমবারের মতো ডায়েরির প্রথম পৃষ্ঠা খুলেছিল রিয়ানা। কলমটা হাতে নিতেই হাত কেঁপে উঠেছে বারংবার। তার মস্তিষ্ক বারবার সতর্ক করছে, সে পাপ করতে চলছে। তারপরও ধীরে ধীরে লিখতে শুরু করেছে,

“প্রিয় সারহাদ,
আপনাকে ‘প্রিয়’ বলার অধিকারও হয়তো আমার নেই। তবুও দেখুন, হৃদয় বড় অবাধ্য। সে এখনো আপনাকেই নিজের সমস্ত শব্দের শুরু বানায়। আপনি কেন আমাকে গ্রহণ করলেন না সারহাদ?
আমি কি এতটাই অযোগ্য ছিলাম?
নাকি আপনার সেই কৃষ্ণকালো চোখদুটো এমন এক মায়ার গভীরে ডুবে ছিল, যাকে আপনি কোনোদিনও পাবেন না?
আচ্ছা…একবারও কি আমার দিকে তাকানো যেত না, একবারও?
আপনার নীরবতাগুলো আমাকে প্রতিদিন একটু একটু করে হত্যা করেছে। আপনি জানেন?
মানুষের মৃত্যু সবসময় শরীর দিয়ে হয় না। কিছু কিছু মানুষ ভিতর থেকে মরে যায়। আমিও বোধহয় তাদেরই একজন। কি অদ্ভুত তাই না?
আজ আমি অন্য কারো স্ত্রী। অন্য এক পুরুষের সন্তানের মা হতে চলেছি। তবুও রাতের গভীরে আমার সমস্ত অনুভূতির শেষ ঠিকানাটা এখনো আপনি। আপনি কি কখনো আমার কথা ভাবেন সারহাদ?
আনমনেও কি আমাকে মনে পড়ে না?

এক মুহূর্তের জন্যও?
নাকি আমি শুধুই আপনার জীবনের এক অপ্রয়োজনীয় অধ্যায় ছিলাম?”
রিয়ানা লিখেই যাচ্ছিল, একটার পর একটা বাক্য। কলম যেন থামতেই চাইছিল না। কত কথা জমে ছিল তার ভিতরে, কত না বলা আর্তনাদ। কিন্তু হঠাৎ…
প্রথম পৃষ্ঠার শেষ প্রান্তে এসে সে থেমে গেল। স্থির হয়ে তাকিয়ে রইলো লেখাগুলোর দিকে। তারপর আচমকা বুকের ভিতর অপরাধবোধের ভয়ংকর ঢেউ আছড়ে পড়লো। সে ধীরে ধীরে ডায়েরিটা বন্ধ করে উঠে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো। বাইরে বৃষ্টির সাথে সাথে ভারী বাতাস এসে তার চুল এলোমেলো করে দিচ্ছে। এক হাত নিজের উদরের উপর রাখলো সে। অনুভব করতে চাইল, ভিতরে ছোট্ট প্রাণগুলো, আয়ানের সন্তান। তাহলে সে কেন অন্য এক পুরুষকে নিয়ে ভাবছে?
কেন?
সে চোখ বন্ধ করে ফিসফিস করে বললো,

–“তুই খুব খারাপ মানুষ রিয়ানা…”
হঠাৎ যেন নিজের উপর প্রচণ্ড ঘৃণা জন্মালো তার। সে এক ছুটে গিয়ে ডায়েরিটা খুললো। সারহাদকে নিয়ে লেখা পৃষ্ঠাটা একটানে ছিঁড়ে ফেললো। দুমড়ে মুচড়ে ডাস্টবিনে ছুঁড়ে মারলো। তারপর গভীর শ্বাস নিয়ে জোর করে আয়ানকে নিয়ে লিখতে বসলো। কলম হাতে নিয়ে ভাবতে শুরু করল কী লিখবে?
কিন্তু, কি অদ্ভুত!
এতক্ষণ যে কলম থামছিল না, এখন সেটা একদম চলছেই না। এক মিনিট, দুই মিনিট করে সময় গড়িয়ে গেল পাঁচ মিনিট। এদিকে সাদা পৃষ্ঠাটা সাদাই রয়ে গেল। একটা শব্দও লিখতে পারলো না সে।
না আয়ান, না ভালোবাসা, না স্বামী, কিছুই না। তার নিজের উপরেই রাগ হতে লাগলো। কেন পারছে না? কেন?
সে রাগে নিজের হাত টেবিলের কোণায় জোরে আঘাত করলো। ব্যথায় মুখ বিকৃত হয়ে গেল তবুও ভিতরের যুদ্ধ থামলো না। সে দুহাতে নিজের চুল টেনে ধরলো, শ্বাস নিতে প্রচন্ড কষ্ট হচ্ছে তার। তারপর আচমকা ডায়েরিটা বন্ধ করে ছুঁড়ে ফেললো দূরে। এবার তার ভীষণ কান্না পাচ্ছে, ভীষণ। সে নিজেকে আর আটকাতে পারলো না। চিৎকার করে কেঁদে উঠলো,

–“কেন পারছি না আমি?
কেন ভুলতে পারছি না?
কেন?”
রাগে জিদে সে নিজের গালে নিজেই চড় মারলো কয়েকবার। নিজেকে জোর করে বুঝাতে শুরু করে বাস্তবতা মেনে নিতে, সে এখন অন্য কারো স্ত্রী, তার সন্তান হবে। কিন্তু হৃদয়?
হৃদয় তো কোনো যুক্তি মানে না। ঠিক তখনই নিস্তব্ধ কক্ষে কলিংবেলের শব্দে হঠাৎ বাস্তবে ফিরে এলো রিয়ানা। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো বিকেল চারটা বেজে গেছে। এখন আয়ানের ফেরার সময়। মানে দরজার বাইরে এখন আয়ান দাঁড়িয়ে আছে। রিয়ানা তড়িঘড়ি করে উঠে ওয়াশরুমে ঢুকে মুখ ধুয়ে নিল। তবুও আয়নায় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে গালের উপর পাঁচ আঙুলের দাগ। সে দ্রুত ক্রিম লাগালো, চোখের জল মুছে ফেললো। তারপর ঠোঁটে জোর করে একটা মেকি হাসি টেনে দরজার সামনে গিয়ে গভীর শ্বাস নিল।
ধীরে ধীরে দরজা খুললো। আর দরজা খুলতেই, নজরে এলো আয়ানের বৃষ্টিসিক্ত হাস্যোজ্জ্বল মুখ। আয়ান একদম ভিজে জবজবে হয়ে আছে। তারর এক হাতে কত রকম চিপস, চকলেট, ফলমূল। আর অন্য হাতে বিশাল এক লাল গোলাপের বুকেট।রিয়ানা কিছু বুঝে ওঠার আগেই আয়ান হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো তার সামনে। ফুলগুলো এগিয়ে দিয়ে নাটকীয় ভঙ্গিতে বললো,

–“আম সো সরি মিসেস আয়ান। আমি আজকে আপনার সাথে হাসপাতালে যেতে পারিনি”
তারপর নিজের কান ধরে বাচ্চাদের মতো করে বললো,
–“বাট প্রমিস, প্রমিস, প্রমিস। নেক্সট টাইম এমন হবে না”
বিপরীতে রিয়ানা সম্পূর্ণ হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। আয়ান আবার শুরু করলো,
–“জানেন সব দোষ আপনার ভাইয়ের। নিজে মিটিংয়ে আসবে না, আবার মিটিং ডাকবে। পুরো মিটিং আমাকে একা সামলাতে হয়েছে। কিন্তু আমি শপথ করছি, পরেরবার যদি এমন হয় আমি চাকরি ছেড়ে দিবো বা রিজাইন করে দিবো। তবুও আপনার সাথে হাসপাতালে যাবো”
রিয়ানা বিস্মিত চোখে তাকিয়ে ছিল তার দিকে। লোকটা এত সহজ কেন?
এত নির্মল কেন?
কিছুক্ষণ পর হুঁশ ফিরতেই তড়িঘড়ি করে আয়ানকে দাঁড় করিয়ে উদ্ধিগ্ন কণ্ঠে শুধালো,

–“ওকে, ওকে। তুমি এসব কি করছো, উঠো। আর তুমি এতটা কীভাবে ভিজে গেলে। গাড়ি নিয়ে যাওনি”
আয়ান ঠোঁট ফুলিয়ে বললো,
–“গিয়েছিলাম তো, কিন্তু রাস্তায় আসার পথে একটা দোকানেও ফুল পাইনি বৃষ্টির কারণে। তাই বাজারের একদম ভিতরের দোকান থেকে আনতে গিয়েছিলাম। সেখানে তো আর গাড়ি যাবে না তাই একটু আরকি”
রিয়ানার আয়ানের এমন জবাবে সাথে সাথে চোখ দিয়ে গরগর করে জল গড়িয়ে পড়তে শুরু করল। লোকটা তাকে এতটা ভালোবাসে যে তার খুশির জন্য বৃষ্টির পর্যন্ত তোয়াক্কা করেনি আর সে। এদিকে তার চোখে জল দেখেই আয়ান বিচলিত হয়ে পড়ে। রিয়ানা নিজের চোখ মুছে জোর করে হেসে বললো,

–“কোনো সমস্যা হয়নি। সব ঠিক আছে”
আয়ান কিছুটা শান্ত হয়ে সাথে সাথে রিপোর্ট দেখতে চাইল।রিয়ানা বুক ধড়ফড় নিয়েই রিপোর্ট এগিয়ে দিল। সৌভাগ্যবশত সে আসার সময় শুধুমাত্র বেবির স্ট্যাটাসের রিপোর্টও নিয়ে এসেছে। আয়ান রিপোর্ট দেখে যেন পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ হয়ে গেল, সাথে যমজ দেখে তার খুশিটা যেন ঢের দ্বিগুণ হয়ে গেল,
–“বেবি একদম ঠিক আছে”
সে আনন্দে রিয়ানাকে জড়িয়ে ধরলো ভিজা শরীরেই। পরমুহূর্তে রিয়ানার ঠান্ডা লেগে যাবে ভেবে আবার ছেড়ে দিয়ে তারপর হাঁটু গেড়ে রিয়ানার পেটের সামনে বসে বললো,
–“হ্যালো ছোট্ট বেবিরা, আমি তোমাদের পাপা”
রিয়ানার চোখ আবার ভিজে উঠলো। কিন্তু এবার সে কাঁদলো না। শুধু মনে মনে বললো,
–“আম সরি, আয়ান”

পরবর্তী দিনগুলো ধীরে ধীরে গড়িয়ে যাচ্ছে খুব দ্রুত। সময়ের চাকা থেমে থাকেনি, কিন্তু রিয়ানার কাছে প্রতিটা দিন যেন একই রঙে রঞ্জিত, অদ্ভুত এক ধূসরতায়। এমন এক ধূসরতা, যেখানে হাসি আছে অথচ প্রাণ নেই, আলো আছে অথচ উষ্ণতা নেই। গুলশানের ছোট্ট ফ্ল্যাটটার জানালায় প্রতিদিন ভোর এসে কড়া নাড়ত। শিশির ভেজা বাতাস পাতলা পর্দাগুলো দুলিয়ে দিত আলতো করে। দূরে কোথাও আজানের ধ্বনি ভেসে আসত, রাস্তার পাশে গাছের পাতায় জমে থাকা পানিকণা সূর্যের ক্ষীণ আলোয় চিকচিক করে উঠত। আর সেই ভোরবেলায় প্রায় প্রতিদিনই আয়ান ঘুম থেকে উঠে প্রথমে তাকাত রিয়ানার দিকে। মেয়েটা ঠিকমতো ঘুমিয়েছে কিনা, মাঝরাতে আবার দুঃস্বপ্ন দেখেছে কিনা, বমি হয়েছে কিনা সবকিছুর হিসেব যেন লোকটা নিঃশ্বাস নেওয়ার মতো স্বাভাবিকভাবে করে ফেলত।
প্রতিটা সকাল শুরু হতো আয়ানের উষ্ণ কণ্ঠে,

–“রিয়া উঠবেন? ওষুধ খাওয়ার সময় হয়ে গেছে”
প্রেগ্ন্যাসির পর থেকেই রিয়ানা খেয়াল করছে আয়ান তাকে ‘রিয়া’ বলে ডাকে। রমণী আধো ঘুমে চোখ খুলে তাকাত। দেখত, আয়ান হাতে গরম দুধের মগ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কখনো ফল কেটে ছোট ছোট টুকরো করে প্লেটে সাজিয়ে রেখেছে। কখনো আবার নিজ হাতে জুস বানিয়েছে। রিয়ানার মাঝে মাঝে অবাক লাগত। মনে মনে প্রশ্ন জাগতো এই মানুষটা ক্লান্ত হয় না?
সকালবেলা অফিসে যাওয়ার আগে আয়ান পুরো ফ্ল্যাটটা গুছিয়ে রাখত। রান্নাঘরে খাবার তৈরি করে রাখত, ফ্রিজে আলাদা আলাদা বক্সে লিখে দিত,
“দুপুরে এটা খাবেম”
“এটা না খেলে রাগ করব”
“ওষুধ খেতে ভুললে বাসায় এসে ঝগড়া করব”
ছোট ছোট কাগজে লিখে রেখে যেত হাস্যকর সব কথা। আর রিয়ানা, সে শুধু নিঃশব্দে তাকিয়ে থাকত। লোকটা তাকে যেন সত্যিই কাঁচের পুতুলের মতো আগলে রাখছিল।একবার পানি আনতে গেলেও আয়ান রেগে উঠত,

–“আপনি কেন উঠেছেন?
–“আমি কি হাত পা ভেঙে ফেলেছি, আয়ান?”
–“না, কিন্তু আপনি এখন তিনজন। তাই কোনো রিস্ক না”
তারপর নিজেই দৌড়ে গিয়ে সব করে আনত। রিয়ানার মাঝে মাঝে খুব মায়া হতো, অদ্ভুত এক মায়া। লোকটা যেন সারাটা পৃথিবী তার পায়ের কাছে এনে রাখার চেষ্টা করছে। অথচ সে… সে দিনশেষে অন্য এক মানুষের চোখে ডুবে আছে। প্রতিটা রাতের শেষে, যখন আয়ান ঘুমিয়ে পড়ত ক্লান্ত শরীর নিয়ে, তখন রিয়ানা ধীরে ধীরে উঠে বসত। ড্রয়ার খুলে বের করত সেই কালো মলাটের ডায়েরিটা। ডায়েরিটার উপর আঙুল বুলিয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকত। যেন ভিতরে শব্দ না, রক্ত জমে আছে। তারপর ধীরে ধীরে লিখা শুরু করতো।
কখনো লিখতে লিখতে তার চোখ ঝাপসা হয়ে যেত। কালির সাথে অশ্রু মিশে অক্ষরগুলো বিকৃত হয়ে যেত। কখনো কলম থেমে যেত মাঝপথে। সে নিজের মাথা চেপে ধরত দুহাতে। কারণ প্রতিটা শব্দের শেষে সে নিজেকেই অপরাধী মনে করত, সে আয়ানের স্ত্রী, তার গর্ভে আয়ানের সন্তান। তাহলে কেন তার হৃদয়ের ভেতর এখনো সারহাদের কৃষ্ণকালো চোখজোড়া ঘূর্ণিঝড় তুলে দেয়?

কেন?
এই “কেন” শব্দটাই ধীরে ধীরে রিয়ানাকে ভিতর থেকে শেষ করে দিচ্ছিল। মাঝরাতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে সে নিজের উদরে হাত রেখে চোখ বন্ধ করে অনুভব করার চেষ্টা করত ভিতরের প্রাণটাকে। তারপর কাঁপা গলায় বলত,
–“তোমাদের বাবা খুব ভালো মানুষ বেবি… খুব ভালো। তোমরা প্লিজ তোমাদের মাম্মা নয় পাপার মতো হয়ো”
বলতে বলতেই তার গলা ভেঙে যেত। কারণ সেই মুহূর্তেও তার মনের ভিতরে ভেসে উঠত সারহাদের মুখ। আর তখনই নিজের উপর ঘৃণা জন্মাত, ভীষণ ঘৃণা। সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকেই প্রশ্ন করত,
–“তুই কেমন মেয়ে রিয়ানা?
যে স্বামী তোকে এত ভালোবাসছে, তুই তার প্রাপ্যটুকুও দিতে পারছিস না?
তুই কি সত্যিই এতটা স্বার্থপর?
তোর সাথে যা হচ্ছে ঠিকই হচ্ছে। তোর মৃত্যু হওয়াই উচিত। হয়তো উপরওয়ালা এজন্যই তোকে এই শাস্তিটা দিয়েছে”

এই কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই সে নিজের গালে চড় মারত, রাগে নখ বসিয়ে দিত হাতে। কিন্তু তবুও সারহাদকে ভুলতে পারত না। সারহাদ যেন তার হৃদয়ের ভেতরে কোনো মানুষ হয়ে নয়, একটা অভিশাপ হয়ে বাসা বেঁধেছিল। এদিকে আয়ান এর ব্যাপারে কিচ্ছু টি জানতো না। সে প্রতিদিন অফিস থেকে ফেরার সময় কিছু না কিছু নিয়ে আসত, কখনো টক আম, কখনো ফুচকা, কখনো রাত বারোটায় দাঁড়িয়ে আইসক্রিম খাওয়ানোর জেদ। রিয়ানার সামান্য ইচ্ছেকেও লোকটা নিজের জীবনের উদ্দেশ্য বানিয়ে ফেলেছিল। একদিন গভীর রাতে রিয়ানা ঘুম থেকে উঠে দেখে আয়ান রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে ইউটিউব দেখে সুপ বানানোর চেষ্টা করছে। সে বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করেছিল,
–“এই রাত তিনটায় কি করছ?”
আয়ান চমকে তাকিয়ে হেসে বলেছিল,
–“আপনি ঘুমের মধ্যে বলছিলেন সুপ খেতে ইচ্ছে করছে”
রিয়ানার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠেছিল। এত ভালোবাসা মানুষ কিভাবে দেয়?
সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল। আর আয়ান শিশুর মতো উচ্ছ্বসিত হয়ে শুধালো,
–“দেখেন তো লবণ বেশি হয়েছে নাকি?”
সেদিন রিয়ানার খুব কান্না পেয়েছিল। কারণ সে ধীরে ধীরে বুঝতে পারছিল, এই মানুষটার প্রতি তার মায়া জন্মাচ্ছে, গভীর, নিঃশব্দ এক মায়া। কিন্তু ভালোবাসা?

না…সেটা এখনো বন্দি হয়ে আছে একজোড়া কৃষ্ণকালো চোখে।
রাতগুলো কেমন অদ্ভুতভাবে বদলে যাচ্ছিল ধীরে ধীরে। আগের মতো আর হাসি ঠাট্টায় ভরে থাকত না সবটা সময়। তবুও বাইরে থেকে দেখলে কেউ বুঝতেই পারত না এই ছোট্ট ফ্ল্যাটটার দেয়ালের আড়ালে নিঃশব্দে জন্ম নিচ্ছে এক অসমাপ্ত ভাঙনের গল্প। সেদিন সন্ধ্যাতেও তেমনই এক নিস্তব্ধতা ছড়িয়ে ছিল চারদিকে। বাইরে মৃদু বৃষ্টি হচ্ছিল, বারান্দার কাঁচ বেয়ে টুপটাপ জল গড়িয়ে পড়ছে। ঘরের ভিতরে হালকা হলদেটে আলোয় ড্রেসিং টেবিলের পাশে বসে ছিল রিয়ানা। তার সামনে খোলা কালো মলাটের ডাইরিটা। উদাসীন দৃষ্টিতে সে একের পর এক শব্দ লিখে যাচ্ছিল। কলমের কালো কালি যেন তার বুকের জমে থাকা দীর্ঘশ্বাসগুলোকে শব্দে রূপ দিচ্ছিল,
“কি অদ্ভুত তাই না সারহাদ?
আমি অন্য কারো ঘরে থেকেও এখনো আপনার মায়ার ভিতরে আটকে আছি। আপনি আমাকে চাইলেন না, অথচ আমার সমস্ত হৃদয় জুড়ে শুধু আপনিই রয়ে গেলেন”
লিখতে লিখতেই হঠাৎ পিছন থেকে দুটো শক্ত পরুষালী হাত এসে তার বাহু আঁকড়ে ধরল,

–“সারপ্রাইজ”
উচ্ছ্বাসভরা পরিচিত কণ্ঠটা কানে আসতেই রিয়ানা ভয়ে প্রায় চমকে উঠল। তার হাত থেকে কলমটা পড়ে যেতে যেতে বাঁচল। সে বিস্ফারিত চোখে পিছনে তাকাল। নজরে আসে আয়ানের হাস্যজ্বল আদল। কণ্ঠ থেকে ফিসফিস করে বের হয়,
–“আ… আয়ান”
আয়ান হেসে তার কাঁধে থুতনি রাখল তারপর ক্লান্ত ভরা কণ্ঠে শুধালো
–“মিসেস আয়ান আমাকে দেখে এতটা শকড কেন?”
কিন্তু রিয়ানার বুকের ভিতর তখন ধকধক করছে। তার মাথায় যেন এক মুহূর্তে বজ্রপাত হলো। আয়ান এখানে কিভাবে?
সে তো বিজনেস ট্রিপে ছিল। পরমুহূর্তেই তার চোখ পড়ল সামনে খোলা ডাইরিটার উপর। মুহূর্তের মধ্যে তার মুখের র*ক্ত উধাও হয়ে গেল। সে তড়িঘড়ি করে ডাইরিটা বন্ধ করে ড্রয়ারের ভিতরে ঢুকিয়ে দিল। এতটাই তাড়াহুড়ো করল যে ড্রয়ারটা ঠিকভাবে বন্ধ হতেও কয়েক সেকেন্ড লেগে গেল। তারপর ঠোঁটে জোর করে একটা হাসি টেনে বলল,

–“তুমি… তুমি এত তাড়াতাড়ি কিভাবে চলে এলে?”
আয়ান একবার ড্রয়ারের দিকে তাকাল খুবই ক্ষণিকের জন্য। তারপর যেন কিছুই দেখেনি এমন ভঙ্গিতে নাটকীয়ভাবে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
–“জীবনে প্রথমবার আপনার ভাই আমার উপর দয়া করেছে। আগে আগে ছুটি দিয়ে দিয়েছে”
রিয়ানা কপাল কুঁচকে তাকাল,
–“ভাইয়া দয়া করেছে?”
–“হুম, না হলে উনি কি আর মানুষ? সকাল থেকে রাত পর্যন্ত শুধু কাজ আর কাজ। আমি তো ভাবছিলাম এবার হয়তো অফিসেই বুড়ো হয়ে যাব। ওনার বউ চলে গেছে এতে কী আমার দোষ, বলেন?
আমি যখনি বলি, স্যার বাড়িতে আমার বউ বসে আছে তখনি একগাধা কাজ দিয়ে বসিয়ে দেয়”
রিয়ানা হালকা হেসে ফেলল তার কথায়। আয়ান সঙ্গে সঙ্গে আঙুল তুলে বলল,
–“এই যে, হাসছেন কেন?
আমি কিন্তু সিরিয়াস”
দুজনের মাঝখানে আবার স্বাভাবিক কিছু কথাবার্তা শুরু হলো। আয়ান বাইরে থেকে আনা ব্যাগগুলো সোফায় রাখছে, আর রিয়ানা নিজেকে স্বাভাবিক দেখানোর প্রাণপণ চেষ্টা করছে। কিন্তু তার বুকের ভিতরের ভয়টা কিছুতেই থামছে না। কথার মাঝেই সে বলল,

–“আমি… আমি একটু ফ্রেশ হয়ে আসছি”
আয়ান হালকা করে মাথা নাড়ল। রিয়ানা ওয়াশরুমে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিতেই আয়ানের দৃষ্টি ধীরে ধীরে সেই ড্রয়ারের দিকে চলে গেল। যেখানে একটু আগে কালো ডাইরিটা লুকানো হয়েছে। তার ভ্রু কুঁচকে এলো। কিন্তু পরমুহূর্তেই সে নিজের মাথা ঝাঁকিয়ে হাসল। আনমনেই বলে ওঠে,
“কি সব ভাবছিস আয়ান, পাগল নাকি?”
সে ব্যাগ খুলে একে একে রিয়ানার জন্য আনা জিনিস বের করতে লাগল, চকলেট, ফল, ছোট্ট একটা টেডি, আর গোলাপি রঙের বেবি ড্রেস। তবুও…কোথাও না কোথাও মনের গভীরে একটা প্রশ্ন কাঁটার মতো বিঁধে রইল।
সেই প্রশ্নটা পরের দুদিনেও তাকে ছাড়ল না। বরং ধীরে ধীরে আরো বড় হতে লাগল। কারণে অকারণে তার চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগল কালো ডাইরিটা। রিয়ানার সেই অস্থির হয়ে লুকিয়ে ফেলার দৃশ্যটা। আয়ান নিজের উপরই রাগ করত। সে কিভাবে তার কল্পবাসিনীকে সন্দেহ করতে পারে?

হয়তো রিয়ানা বাচ্চাদের নিয়ে কিছু লিখছে। হয়তো নিজের অনুভূতি লিখছে। তবুও…সন্দেহগুলো ধীরে ধীরে অন্ধকার ছায়ার মতো তার ভিতরে জমাট বাঁধতে লাগল। অবশেষে এক গভীর রাতে চারদিকে তখন নিস্তব্ধতা। কক্ষে শুধু দেয়াল ঘড়ির টিকটিক শব্দ ছাড়া আর কোন শব্দই হচ্ছে না। রিয়ানা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। আয়ান ধীরে ধীরে উঠে বসল। তার বুক ধুকপুক করছে অস্বাভাবিকভাবে। সে নিঃশব্দে ড্রয়ারের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। কয়েক সেকেন্ড শুধু তাকিয়ে রইল। তারপর খুব আস্তে ড্রয়ার খুলে কালো মলাটের ডাইরিটা বের করল। আয়ান একবার পিছনে তাকায় নজরে আসে বিছানায় ঘুমিয়ে থাকা রিয়ানাকে। তাকে এই মুহূর্তে অদ্ভুত নিষ্পাপ লাগছে। আয়ানের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। না…এই ডাইরি খোলার মানে সে রিয়ানাকে সন্দেহ করছে। আর সে কখনোই তার কল্পবাসিনীকে সন্দেহ করবে না। কিন্তু পরমুহূর্তেই অন্য একটা কণ্ঠ মাথার ভিতরে ফিসফিস করে উঠল,
–“তাহলে খুলে দেখে নিজেকে ভুল প্রমাণ কর”

আয়ান মন মস্তিষ্কের দ্বিধা কিয়ৎকাল পর কাটিয়ে অবশেষে সে ডাইরিটা খুলল। আর পরমুহূর্তেই তার পৃথিবীটা থেমে গেল, শ্বাস আটকে এলো। চোখের সামনে কেমন শব্দগুলো ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। তার নিঃশ্বাস এলোমেলো হয়ে উঠল। সে অস্থিরভাবে একের পর এক পৃষ্ঠা উল্টাতে লাগল। খসখস শব্দে নিস্তব্ধ কক্ষ টাকে আরো ভারী হয়ে উঠল। প্রতিটা পাতায় সারহাদ, সারহাদ আর শুধু সারহাদ। তার জন্য ভালোবাসা, অপেক্ষা, অভিমান, হাহাকার কিন্তু কোথাও আয়ান নেই, কোথাও না। একসময় সে আজকের লেখার পাতায় এসে থামল। তার হাত রীতিমতো থরথর করে কাঁপছে। বুকের ভেতর টা যেন কেউ শক্ত করে খামচে ধরেছে। চোখের কোণে অশ্রু জমে উঠেছে। না, আজকের পাতাটাতেও তার নাম নেই একটা লাইনও না।

মুহূর্তে আয়ানের মনে হলো তার চারপাশের সবকিছু মিথ্যা, তার ভালোবাসা মিথ্যা, তার স্বপ্ন মিথ্যা, এমনকি তার কল্পবাসিনীও মিথ্যা। তার হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসছে। বুকের ভিতরটা এমনভাবে মোচড় দিচ্ছে যেন কেউ মুঠো করে হৃদয়টা চেপে ধরেছে। তারমানে তার কল্পবাসিনীর হৃদয়ে সে নেই। সেই হৃদয়ের সমস্তটা জুড়ে অন্য একজন পুরুষ বাস করে। ভাবতেই আয়ানের সমস্ত অঙ্গ কেঁপে উঠল। সে শক্ত হাতে ডাইরিটা চেপে ধরল। এক মুহূর্তের জন্য ইচ্ছে হলো এটাকে ছিঁড়ে ফেলুক, পুড়িয়ে ফেলুক, ধ্বংস করে দিক। কিন্তু পারল না। কেন যেন এক অদৃশ্য শক্তি তার হাত থামিয়ে দিল। শেষমেষ দাঁত চেপে ডাইরিটা আবার আগের জায়গায় রেখে দিল সে। তারপর নিঃশব্দে বারান্দায় চলে গেল। দরজাটা আস্তে করে লাগিয়ে দিল। কাচের স্লাইডিং গ্লাসটাও টেনে দিল যাতে ঠান্ডা বাতাসে রিয়ানার ঘুম ভেঙে না যায়।
আর তারপর…নিজের চুল নিজেই খামচে ধরল সর্বশক্তি দিয়ে। রাগে, অসহায়তায়, কষ্টে সে একের পর এক দেয়ালে ঘুষি মারতে শুরু করল। দমবন্ধ হয়ে আসা কণ্ঠে ফিসফিস করে আওড়ালো,

–“কেন? কোথায় কমতি ছিল আমার?”
তার চোখ দিয়ে টপটপ করে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। সে নিজেকেই আঘাত করছে বারংবার। ধীরে ধীরে সে হাঁটু ভেঙে নিচে বসে নিজেকেই দোষ দিচ্ছে। মনে মনে ভাবছে,
“হয়তো দোষটা তারই। হয়তো তার ভালোবাসাতেই কমতি ছিল। না হলে এতদিনেও সে তার কল্পবাসিনীর হৃদয়ে একটুখানি জায়গা করে নিতে পারল না কেন?”
একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে অবশেষে ভিতরে ফিরে এলো আয়ান। বিছানার দিকে তাকাতেই তার বুকটা আবার কেঁপে উঠল। রিয়ানা ঘুমিয়ে আছে একদম বাচ্চাদের মতো ঠোঁট উল্টে। প্রেগন্যান্ট হওয়ার পর মেয়েটা আরো গোলুমলু হয়ে গেছে। আগের চেয়ে আরো ফর্সা আরো মায়াবী হয়ে গেছে। এই মুহূর্তে তার ইচ্ছে করছে, গিয়ে সেই ফুলে থাকা গাল দুটোতে একটা জোরে চুমু খায়। কিন্তু পরমুহূর্তেই ডাইরির পাতাগুলো চোখের সামনে ভেসে উঠল। আর সঙ্গে সঙ্গে আয়ানের হাত মুষ্টিবদ্ধ হয়ে গেল প্রচন্ড ক্রোধে। এখন তার চুমু না…কামড় দিতে ইচ্ছে করছে। এত জোরে কামড় দিতে ইচ্ছে করছে যেন দাগ বসে যায়। আর রিয়ানা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অন্তত সেই দাগ দেখে তার কথা ভাবে। ভাবনাটা মাথায় আসতেই নিজেই নিজের উপর বিরক্ত হয়ে গেল আয়ান এসব এলোমেলো বাচ্চামোর জন্য।
সে দ্রুত মুখ ফিরিয়ে নিয়ে দূরে গিয়ে শুয়ে পড়ল। কিন্তু ঘুম?

ঘুম যেন তার চোখ থেকে বহু দূরে পালিয়ে গেছে। সে এপাশ ওপাশ করে বারবার নড়েচড়ে শুতে লাগল। তবুও ঘুম ধরা দিলো না তার চোখে। অবশেষে বিরক্ত হয়ে উঠে বসল। তারপর খুব ধীরে বুঝতে পারল, তার অভ্যাস হয়ে গেছে। রিয়ানাকে বুকে নিয়ে না ঘুমালে তার ঘুম আসবে না। সে নিজের সাথে জেদ করল, না আজ আর না।
কিন্তু সেই জেদ টিকল কতক্ষণ?
এক মিনিট? দুই মিনিট? তারপরই হেরে গেল সে। নিজেকেই বুঝিয়ে বলল,
–“রিয়ানা তো ঘুমিয়ে আছে। সে জানবেও না”
ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে আলতো করে রিয়ানাকে টেনে নিজের বুকের উপর নিয়ে এলো আয়ান। ঘুমন্ত রিয়ানা অচেতনভাবেই তার বুকের কাছে মুখ গুঁজে দিল। আর আয়ান নিজের সমস্ত ভাঙাচোরা হৃদয় নিয়েই চোখ বন্ধ করে ফেলল।

তারপর থেকে যেন ধীরে ধীরে বদলে যেতে লাগল সবকিছু। না, বাইরে থেকে দেখলে কেউ বুঝতে পারত না। সবকিছু আগের মতোই ছিল একই ফ্ল্যাট, একই মানুষ, একই সংসার। শুধু বদলে গিয়েছিল এক মানুষের ভিতরের পৃথিবীটা। আয়ান আর আগের মতো ছিল না। ডাইরির সেই কালো পাতাগুলো যেন তার হাসির ভিতর লুকিয়ে থাকা সমস্ত নিশ্চিন্ততা চুরি করে নিয়ে গিয়েছিল। তবুও সে চিৎকার করেনি, রাগ দেখায়নি রিয়ানার সাথে। একবারের জন্যও রিয়ানাকে প্রশ্ন করেনি,
–“আপনার হৃদয়ে আমি নেই কেন?”
বরং সে চুপ হয়ে গেল, ভীষণভাবে চুপ। প্রতিদিন সকালে রিয়ানার ঘুম ভাঙার আগেই আয়ান উঠে পড়ত। নিঃশব্দে পুরো ফ্ল্যাট গুছিয়ে ফেলত, কখনো ডাইনিং টেবিলে খাবার সাজিয়ে রাখত, কখনো ফ্রিজের দরজায় ছোট ছোট স্টিকার আটকে দিত,
“সকাল আটটায় মেডিসিন খেতে ভুলবেন না”
“ফলগুলো কেটে রেখেছি”
-ঝাল খাবেন না। ডাক্তার নিষেধ করেছে”
“দুপুরে ঘুমাবেন”
প্রতিটা স্টিকারের শেষে ছোট্ট একটা হাসির চিহ্ন আঁকা থাকত। যেন মানুষটা প্রাণপণ চেষ্টা করছে সবকিছু স্বাভাবিক রাখতে। কিন্তু সে নিজে?

নিজেকে ধীরে ধীরে গুটিয়ে নিচ্ছিল। রিয়ানা ঘুম থেকে উঠার আগেই সে বেরিয়ে যেত। আবার সন্ধ্যার পর ফিরে এসে রান্নাঘরে ঢুকে পড়ত। রিয়ানার পছন্দের খাবারগুলো নিজ হাতে রান্না করত, কখনো চিংড়ি মালাইকারি, কখনো টক দই দিয়ে চিকেন, কখনো মাঝরাতে হঠাৎ উঠে ফল কেটে এনে দিত। মোটকথা রিয়ানার যত্নে একরত্তি কমতি রাখত না সে। কিন্তু…কথাগুলো কমে যাচ্ছিল, ভীষণভাবে কমে যাচ্ছিল। আগে যে মানুষটা সারাক্ষণ রিয়ানার পিছনে পিছনে ঘুরত, এক মুহূর্ত না দেখে থাকতে পারত না, সেই মানুষটাই এখন প্রয়োজন ছাড়া সামনে আসত না। রিয়ানা প্রথম প্রথম ব্যাপারটা বুঝতে পারেনি। ভেবেছিল হয়তো অফিসের চাপ। কিন্তু ধীরে ধীরে তার মনে কেমন একটা অস্বস্তি জমতে শুরু করল। কেননা রিয়ানা বুঝতে পারছে মানুষটা তাকে এড়িয়ে চলছে স্পষ্টভাবে।
রিয়ানা কখনো ড্রয়িংরুমে এলে আয়ান রান্নাঘরে চলে যেত। সে রান্নাঘরে গেলে আয়ান বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকত। তবুও তার প্রয়োজনের একটাও জিনিস ভুলত না। এই বিষয়টাই রিয়ানাকে আরো বেশি অস্থির করে তুলছিল। একদিন দুপুরে সে ডাইনিং টেবিলে বসে ছিল। সামনে ধোঁয়া ওঠা খিচুড়ি তার পাশেই স্টিকি নোট,
“বৃষ্টি হচ্ছে তাই খিচুড়ি করেছি। গরম থাকতে খেয়ে নিবেন”
নোটটার দিকে তাকিয়ে রিয়ানার বুকটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠল। এভাবে কেটে গেল পুরো এক সপ্তাহ। আয়ানও আগের মতো তাকে রিয়া বলেও ডাকে না। অবশেষে এক রাতে আয়ান অফিস থেকে ফিরতেই রিয়ানা সরাসরি তার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে চোখমুখ গম্ভীর করে প্রশ্ন ছুড়ে,

–“তোমার কি সমস্যা?”
আয়ান থমকে গেল। সে একপলক তাকিয়ে নিচু স্বরে বলল,
–“কি?’
–“তুমি আমাকে এড়িয়ে চলছ কেন?”
আয়ান চোখ সরিয়ে নিল রিয়ানার থেকে। কেননা সে রিয়ানার চোখে চোখ রেখে মিথ্যা বলতে পারবে না,
–“এড়িয়ে চলছি মানে?”
— মানে তুমি খুব ভালো করেই জানো, আয়ান। তুমি আমার সাথে ঠিকভাবে কথা বলছ না। আমার সামনে আসছ না। কিন্তু আবার সবকিছু করে যাচ্ছ। ঠিক কি হয়েছে?’
আয়ানের বুকের ভিতরটা ধক করে উঠল।আজ…আজ সে কি বলে দিবে সবটা?
সে কি জানিয়ে দিবে, সে সব জেনে গেছে, রিয়ানার হৃদয়ে অন্য কারো নাম লেখা আছে। হ্যাঁ, মনে মনে নিজেকে প্রস্তুত করে চোখ খুলে রিয়ানার দিকে তাকাতেই কথাগুলো কোথায় যেন হারিয়ে গেল। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার উদরটা এখন স্পষ্ট গোল হয়ে উঠেছে। তার ভিতরে তাদের সন্তান। আর সেই মেয়েটা এখন তাকিয়েছে এমনভাবে… যেন সত্যিই কিছু জানে না। আয়ান চোখ বন্ধ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। নাহ, সে পারবে না, একদম পারবে না। তারপর জোর করে হাসি টেনে বলল,

–“আরে না না… এমন কিছু না। অফিসের চাপ একটু বেশি যাচ্ছে”
রিয়ানা সঙ্গে সঙ্গে গাল ফুলিয়ে বলল,
–“মিথ্যা”
আয়ান থমকাল। রিয়ানা এবার আরো কাছে এসে বলল,
–“কাজ আগেও ছিল, কিন্তু তুমি আগে এমন ছিলে না”
এই বাক্যটাই যেন আয়ানের বুকের ভিতর ছুরি হয়ে বিঁধল। সে দৃষ্টি নামিয়ে ফেলল। কিছুক্ষণ নীরব থেকে হঠাৎ ধীরে ধীরে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল রিয়ানার সামনে। রিয়ানা হতবাক হয়ে তাকাল। আয়ান আলতো করে তার হাত ধরে শান্ত স্বরে বুলি আওড়ায়,
–“আই এম সরি, মিসেস আয়ান”
রিয়ানার ভ্রু কুঁচকে গেল,
–“এটা আবার কী নাটক?”
আয়ান ম্লান হেসে মাথা নিচু করে বলল,
–“না, সত্যি বলছি, আমার ভুল হয়েছে।
অতিরিক্ত কাজের চাপে হয়তো একটু বদলে গিয়েছিলাম। কিন্তু আমার উচিত ছিল না আপনারর সাথে এমন ব্যবহার করা”
আয়ান রিয়ানার ফোলে ওটা উদরে একটা আলতো করে চুমু খেয়ে তার চোখে চোখ রেখে আওড়ায়,

–“আম সরি রিয়া, এই সময়ে আপনাকে আরো সময় দেওয়া উচিত ছিল আমার”
রিয়ানা কিছুক্ষণ চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
–“আচ্ছা… তাহলে মাফ করে দিলাম”
আয়ান হালকা হাসল বিপরীতে,
–“সত্যি?”
–“হুম। কিন্তু আবার এমন করলে কথা বলব না”
–“ঠিক আছে”
রিয়ানা তখনও বুঝতে পারেনি এই হাসির আড়ালে থাকা মানুষটা ভেঙে চুরমার হয়ে আছে। কথা শেষ করে সে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল। আয়ান কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইল। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দেয়ালে মাথা ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে মনে মনে ভাবল,
“আমি পারব, আমাকেই পারতে হবে”
তার কল্পবাসিনীর হৃদয়ে যদি এখনো সারহাদের ছায়া থেকেও থাকে তবুও সে হার মানবে না। সে একজন ভালো স্বামী হবে, একজন ভালো বাবা হবে। সে নিজের ভালোবাসা দিয়ে ধীরে ধীরে মুছে ফেলবে সেই নাম। হয়তো সময় লাগবে, অনেকটা সময়। তবুও সমস্যা নেই। কারণ আয়ানের পৃথিবী জুড়ে রিয়ানা ছাড়া আর কেউ নেই। সে ভয়ংকরভাবে রিয়ানা কেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে।
এমনভাবে…যেন রিয়ানাকে ছাড়া তার নিঃশ্বাস পর্যন্ত অসম্পূর্ণ।

ধীরে ধীরে সময় এগিয়ে যাচ্ছিল। দিন গড়িয়ে মাস, আর মাস গড়িয়ে সেই প্রতীক্ষিত মুহূর্ত যেন দরজায় এসে কড়া নাড়ছিল। রিয়ানার ডেলিভারির দিন যত ঘনিয়ে আসছিল, আয়ান ততটাই অদ্ভুতভাবে অস্থির হয়ে উঠছিল। সে অফিসের কাজ কমিয়ে দিয়েছিল। আর আরজেও রিয়ানার জন্য তাকে চাপও দিচ্ছিল না। আয়ান রিয়ানাকে এক মুহূর্তের জন্যও একা রাখত না।
ফ্ল্যাটের ছোট্ট একটা রুম সে আগেই সাজিয়ে ফেলেছিল বাচ্চাদের জন্য। দেয়ালে ছোট ছোট মেঘের স্টিকার, সাদা রঙের ক্ষুদ্র বেবি কট, কোণের টেবিলে সারি সারি খেলনা। মাঝে মাঝেই গভীর রাতে উঠে দাঁড়িয়ে সেই রুমটার দিকে তাকিয়ে থাকত আয়ান। তার ঠোঁটের কোণে তখন এমন এক হাসি ফুটে উঠত যেন সে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ। কিন্তু সে জানত না তার সুখের আড়ালেই লুকিয়ে আছে এক নির্মম অন্ধকার। সেদিন রাতটাও শুরু হয়েছিল খুব স্বাভাবিকভাবেই। বাইরে টুপটাপ বৃষ্টি পড়ছিল। রিয়ানা বিছানায় আধশোয়া হয়ে জানালার কাচের ফাঁক গলিয়ে বৃষ্টি দেখছিল। আর আয়ান তার পাশে বসে ফল কেটে দিচ্ছিল।
হঠাৎ রিয়ানার পুরো শরীরটা কেঁপে উঠল তীব্র যন্ত্রণায়। পরমুহূর্তেই তার ঠোঁট ফাঁক হয়ে একটা ব্যথাভরা চাপা আর্তনাদ বেরিয়ে এলো,

–“আ… আয়ান”
আয়ান চমকে উঠল। নিজের হাতে থাকা ছুরিটা কোনমতে পাশে রেখে বিচলিত হয়ে পড়ে,
–“কি হয়েছে?”
রিয়ানা নিজের পেট শক্ত করে চেপে ধরল। তার নিঃশ্বাস দ্রুত উঠানামা করছে। বহু কসরতে আওড়ায়,
–“ব্য… ব্যথা…”
মুহূর্তের মধ্যে আয়ানের মুখের রঙ পাল্টে গেল। সে যেন দিশেহারা হয়ে পড়ল ক্ষণিকে।
–“রিয়া, রিয়ানা, কল্পবাসিনী, কি হয়েছে? বেশি ব্যথা করছে?”
রিয়ানা এবার চিৎকার করে উঠল ব্যথায়। আর সেই মুহূর্তে আয়ানের যেন মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিল। সে একবার ফোন খুঁজছে, একবার ব্যাগ টানছে, একবার পানি আনতে গিয়ে গ্লাস ফেলে দিচ্ছে। তার হাত পর্যন্ত কাঁপছে। কিন্তু ভাগ্যক্রমে ডেলিভারির আগেই সে সবকিছু রেডি করে রেখেছিল। হসপিটালের ফাইল, ব্যাগ, বেবি ক্লথস সব। তাই খুব দ্রুতই রিয়ানাকে নিয়ে হসপিটালে পৌঁছে যায় আয়ান।
হসপিটালে যাওয়ার পর রিয়ানাকে দেখার সঙ্গে সঙ্গেই সেই গাইনোকোলজিস্ট ডাক্তার নায়লার মুখ গম্ভীর হয়ে উঠল। তিনি সব জানতেন, রিয়ানার রোগ সম্পর্কে, তার ঝুঁকি সম্পর্কে। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো, রিয়ানা তাকে কড়া নিষেধ করে রেখেছিল যেন আয়ান বা কাউকে কিছু না বলা হয়।
ডাক্তার এক মুহূর্ত দেরি না করে রিয়ানাকে দ্রুত ভিতরে নিয়ে গেলেন আইসিইউ সংলগ্ন অপারেশন থিয়েটারে। আর বাইরে দাঁড়িয়ে রইল আয়ান সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত অবস্থায়। সে বারবার ডাক্তারকে অনুরোধ করছিল,

–“প্লিজ… আমাকে ভিতরে যেতে দিন। আমি শুধু একবার দেখব ওকে”
কিন্তু ডাক্তার রাজি হলেন না। আয়ানের হাজার টা অনুরোধ কে উপেক্ষা করে থিয়েটারের দরজাটা নির্মম ভাবে বন্ধ হয়ে গেল। অসহায় আয়ান কি করবে?
সে তখন করিডোরে পায়চারি করতে লাগল। তার হাঁটার গতি এতটাই দ্রুত ছিল যেন সে থেমে গেলেই দম বন্ধ হয়ে যাবে। হঠাৎ তার হাতের উপর টুপ করে কিছু পড়ল। আয়ান থমকে গেল। নিচে তাকাতেই নজরে আসে তার নিজের চোখ থেকেই টপটপ করে পানি পড়ছে। সে এতটাই অস্থির ছিল যে নিজেই টের পায়নি সে কাঁদছে। তার বুকটা কেমন ভেঙে যাচ্ছে ভিতর থেকে। সে দুই হাত মুখে চাপা দিয়ে দেয়ালে মাথা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
এদিকে ভিতরে রিয়ানাকে অপারেশন টেবিলে শুইয়ে দেওয়া হয়েছে। তার শ্বাস দ্রুত উঠানামা করছে পুরো শরীর ব্যথায় কাঁপছে।
ডাক্তার নায়লা গম্ভীর মুখে তার দিকে তাকিয়ে বললেন,

–“মিসেস আয়ান, আমি আপনাকে শুরু থেকেই সতর্ক করেছিলাম। আপনার কন্ডিশন খুবই খারাপ”
রিয়ানা চোখ বন্ধ করে ব্যথা সহ্য করার চেষ্টা করছিল। ডাক্তার আবার বললেন,
–“এখন পরিস্থিতি আরো ক্রিটিক্যাল। এই মুহূর্তে আমাকে আপনার হাজবেন্ডের সাথে কথা বলতে হবে। হয়তো মা অথবা বাচ্চাদের মধ্যে একজনকে চুজ করতে হবে”
কথাটা শুনেই রিয়ানা তড়িঘড়ি করে ডাক্তারের হাত চেপে ধরল। তার চোখ দিয়ে অনবরত পানি পড়ছে তবুও কাঁপা কাঁপা স্বরে অনুরোধ করে,
–“না…না প্লিজ… আয়ানকে কিছু বলবেন না”
ব্যথায় তার কথা পর্যন্ত ঠিকমতো বের হচ্ছিল না। রিয়ানা খুব ভালো করেই জানে আয়ান কি করবে। সে কখনোই বাচ্চাদের চাইবে না, সে রিয়ানাকেই বেছে নিবে। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল আয়ানের হাসিমাখা মুখটা। লোকটা তাকে কি ভয়ংকরভাবে ভালোবাসে। আর সেই মানুষটাকে সে?
না…সে কখনোই আয়ানকে তার প্রাপ্য ভালোবাসাটা দিতে পারেনি। আর হয়তো সারা জীবনেও তাকে ভালোবাসতে পারব না। তাহলে কেন… কেন মানুষটাকে শুধু শুধু এত কষ্ট দেবে?
সে চোখ বন্ধ করে ফিসফিস করে বলল,

–“আমি না থাকলে… হয়তো সে নতুন করে সুখ খুঁজে পাবে। হয়তো কেউ এসে তাকে তার মতো করে ভালোবাসবে যেটা রিয়ানা করতে পারবে না”
তারপর হঠাৎ কাঁপা হাতে নিজের উদরটা ছুঁয়ে দিল। তারপর ডক্টর নায়লাকে অনুরোধের সুরে বলে,
–“প্লিজ ডক্টর, সেভ মাই বেবি”
ডাক্তার হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে ছিলেন। রিয়ানা বারবার অনুরোধ করতে লাগল তাকে, কখনো কাঁদছিল, কখনো ডাক্তারকে ব্ল্যাকমেইল করছিল,
–“আপনি যদি আয়ানকে বলেন… আমি এখনই সব মেশিন খুলে ফেলব”
শেষমেশ ডাক্তার নায়লা রাজি হয়। রিয়ানার চোখ বেয়ে অনবরত অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল। সেন্স হারানোর ইনজেকশন দেওয়ার আগে সে আবার ডাক্তারের হাত শক্ত করে ধরে কান্নারত করে বলে,
–“একবার… শুধু একবার… আমার বাচ্চাদের দেখাবেন আমাকে”
ডাক্তারের চোখ ঝাপসা হয়ে উঠল। তিনি খুব আস্তে তার হাতটা সরিয়ে বললেন,

–“আমরা চেষ্টা করব”
তারপর ইনজেকশন পুশ করা হলো। ধীরে ধীরে রিয়ানার চোখ ভারী হয়ে এলো অপারেশন শুরু হলো। যদিও অন্যান্যদের বেলায় এই ইনজেকশন দেওয়া হয় না কিন্তু রিয়ানার কেসটা ভিন্ন। এদিকে বাইরে আয়ান এখনো পায়চারি করছে। তার পুরো শরীর কাঁপছে উৎকণ্ঠায়। প্রায় আধাঘণ্টা পর অপারেশন থিয়েটারের দরজা খুলে দুজন নার্স বেরিয়ে এলো। তাদের কোলে দুইটা ছোট্ট বাচ্চা, একটা ছেলে, একটা মেয়ে।
আয়ান সেদিকে পলক ফেলতেই থমকে গেল।তার নিঃশ্বাস যেন বন্ধ হয়ে এলো। নার্স এগিয়ে এসে বলল,
–“কংগ্র্যাচুলেশনস, যমজ বেবি”

মুহূর্তের মধ্যে আয়ানের পৃথিবী বদলে গেল। সে কাঁপা হাতে বাচ্চা দুটোকে কোলে নিল। এত ছোট্ট এত নরম…সে যেন বিশ্বাসই করতে পারছিল না এগুলো তার সন্তান। সে বাবা হয়ে গেছে। তার পৃথিবীতে আরো দুটো পৃথিবীর জন্ম হয়েছে। তার চোখ আবার ভিজে উঠল খুশিতে। এই প্রথমবার সে অনুভব করল, কোন মানুষ এত সুখীও হতে পারে। ঠিক তখনই হসপিটালে পৌঁছাল সোফিয়া আর আরজে। আরজে শুটিং ছেড়ে সরাসরি চলে এসেছে। সে দূর থেকে দাঁড়িয়ে দেখল, আয়ান দুই বাচ্চাকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে আছে।
তার মুখে অদ্ভুত এক নম্রতা। বাচ্চাদের কান্নার শব্দ শুনতেই আরজের বুকটা কেমন করে উঠল। সে ধীরে হাত বাড়িয়ে দিল।আয়ান কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে খুব আস্তে বাচ্চাগুলো তার কোলে তুলে দিল। তারপর তড়িঘড়ি করে আবার অপারেশন থিয়েটারের দিকে ছুটে গেল। নিজের অস্থির ভরা কণ্ঠে শুধালো,
–“আমি রিয়ানাকে দেখব। প্লিজ একবার, একবার আমাকে ভিতরে যেতে দিন”
কিন্তু নার্স তাকে থামিয়ে দিল,

–“দেখুন প্লিজ, এখন সম্ভব না। অপারেশন এখনো শেষ হয়নি”
আয়ান ভেঙে পড়া চোখে দরজার দিকে তাকিয়ে রইল। সে বারবার অনুরোধ করছিল। কিন্তু কেউ তাকে ভিতরে যেতে দিল না। শেষমেশ সে ধীরে ধীরে আবার ফিরে এলো
মুখটা সম্পূর্ণ বিষণ্ন করে।
এদিকে সোফিয়া চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল অদূরে। তার চোখ স্থির হয়ে আছে বাচ্চা দুটোর দিকে। কেমন যেন বহু পুরনো কোনো স্মৃতি ফিরে এসেছে তার সামনে। হঠাৎ তার বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠল বহুদিন পর। সে ধীরে অপারেশন থিয়েটারের দিকে তাকাল। আজ তার মনটা ভীষণ অস্থির। সকাল থেকেই কেমন ছটফট করছে। যেন ভিতরের মাতৃসত্তা বারবার অশুভ কিছু অনুভব করছে।
ঠিক এই কারণেই তো সে আন্ডারগ্রাউন্ডের গুরুত্বপূর্ণ মিটিং পর্যন্ত ছেড়ে চলে এসেছে আয়ানের এক কলেই। কিন্তু কেন এমন লাগছে?
কেন মনে হচ্ছে কোন অঘটন ঘটাতে চলছে।
টানা দুই ঘণ্টা ধরে অপারেশন থিয়েটারের লাল বাতিটা জ্বলছিল। সেই দুই ঘণ্টা যেন দুই যুগ হয়ে দাঁড়িয়েছিল বাইরে অপেক্ষারত প্রতিটি মানুষের জন্য। সময় যেন থমকে গিয়েছিল, অথচ দেয়ালে ঝুলে থাকা ঘড়িটার কাঁটা নিষ্ঠুরের মতো সামনের দিকে এগিয়েই যাচ্ছিল। আর এদিকে অপারেশন থিয়েটারের ভেতরে তখন মৃত্যুর সাথে এক নারীর শেষ লড়াই চলছিল।

অবশেষে দীর্ঘ দুই ঘণ্টা পর রিয়ানার জ্ঞান ফিরল। তাও পুরোপুরি নয় মাত্র কয়েক মুহূর্তের জন্য। তার মুখে অক্সিজেন মাস্ক লাগানো। বুকটা ভীষণভাবে ওঠানামা করছে। মনে হচ্ছে প্রতিটা শ্বাস নিতে তাকে যুদ্ধ করতে হচ্ছে। ঠোঁটগুলো নীলচে বর্ণ ধারণ করেছে। সারা শরীর ফ্যাকাশে, রক্তশূন্য হয়ে গেছে ইতিমধ্যে। অপারেশনের পর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার শরীর প্রায় নিস্তেজ হয়ে পড়েছে। জরায়ুর ভেতরে ছড়িয়ে পড়া ক্যান্সারজনিত জটিলতা পুরো শরীরকে ধীরে ধীরে বিষিয়ে তুলেছে। রক্তচাপ দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে, হার্টবিট অনিয়মিত। মনিটরের স্ক্রিনে ওঠানামা করা সবুজ রেখাগুলো যেন যেকোনো মুহূর্তে থেমে যেতে পারে। ডাক্তারদের মুখ গম্ভীর। একজন নার্স তাড়াহুড়ো করে রক্তের ব্যাগ বদলাচ্ছে। আরেকজন ইনজেকশন প্রস্তুত করছে। ডাক্তার নায়লার কপালের ঘাম মুছে গভীর উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে রিয়ানার দিকে তাকিয়ে রইলেন। রিয়ানা কিছু বলতে চাইছে বুঝতে পেরে তিনি আলতো করে তার অক্সিজেন মাস্কটা সামান্য সরিয়ে দিলেন। সাথে সাথেই কাঁপা ঠোঁটে রিয়ানা ফিসফিস করে বলল,

–“আমার… বাচ্চাগুলোকে… একবার… আনুন”
কথাগুলো বলতে গিয়েই তার গলা রোধ হশে আসলো সাথে নিঃশ্বাস জড়িয়ে গেল। ডাক্তার এক মুহূর্ত চোখ বন্ধ করে নার্সকে ইশারা করলেন। নার্স দ্রুত বেরিয়ে গেল বাইরে। কিন্তু নার্স বের হওয়ার পরপরই আচমকা রিয়ানার শরীরটা তীব্রভাবে কেঁপে উঠল। পরমুহূর্তেই কেউ কিছু বুঝে উঠার আগেই তার মুখভর্তি রক্ত উঠে এলো। গড়গড় করে টকটকে লাল রক্ত বমি হতে শুরু করল। মুহূর্তের মধ্যে সাদা চাদর, বেড, মেঝে সব রক্তে ভেসে গেল। আইসিইউর সাদা পরিবেশটা এক বিভীষিকাময় লাল রঙে ঢেকে উঠল। একজন নার্স চমকে উঠে বলল,
–“ম্যাম, ব্লিডিং ইনক্রিজিং”
ডাক্তার নায়লা দ্রুত নির্দেশ দিলেন,
–“সাকশন কুইক”
চারদিকে মুহূর্তে হুলস্থুল পড়ে গেল। কেউ হার্ট মনিটর চেক করছে, কেউ অক্সিজেন বাড়াচ্ছে, কেউ থেরাপির মেশিন প্রস্তুত করছে। রিয়ানা হাঁপানি রোগীর মতো শ্বাস টানতে লাগল। গলা কাটা মুরগির মতো ব্যথায় ছটপট করছে সে। কিন্তু যেন বাতাস তার ফুসফুস পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে না। বুকটা ছটফট করছে, আঙুলগুলো কাঁপছে। র*ক্তবমির পর ক্লান্ত, অবসন্ন দেহটা নিথর হয়ে বিছানায় পড়ে রইল। ধীরে ধীরে সে অশ্রুসিক্ত নয়নজোড়া বন্ধ করল আর ঠিক তখনই, তার ঝাপসা অন্ধকারের ভেতর সর্বপ্রথম যে মুখটা ভেসে উঠল, সেটা সারহাদের। সেই কৃষ্ণকালো দৃষ্টি, সেই নির্লিপ্ত মুখ, সেই নিষ্ঠুর পুরুষ, যার জন্য একটা জীবন নিঃশব্দে জ্বলে ছাই হয়ে গেল। রিয়ানার ঠোঁটের কোণে তিক্ত, ভাঙা একটা হাসি ফুটে উঠল। সে বিড়বিড় করে আওড়াল,

–“আমি… শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত… এক শ্যাম পুরুষের অপেক্ষায় ছিলাম গো ধরণী… অথচ সেই নিষ্ঠুর মানব… একবারও ধরা দিল না”
তার চোখের কোণ বেয়ে অনাবরত জল গড়িয়ে পড়ল। এবার আর বিড়বিড়াতে পারল না বরং মনে মনে ভাবলো,
–“আমি অন্য কারো স্ত্রী হয়েও… এক পর পুরুষের জন্য তৃষ্ণার্তের মতো হাহাকার করেছি, এ কি পাপ নয়? অবশ্যই পাপ
ভালোবাসা কি এমনই হয়?
মানুষ এখানে পাপ পুণ্যের ব্যবধানও ভুলে যায়?
একটা হৃদয় একটা মানুষকে এতটা চায় যে মৃত্যুর মুহূর্তেও তাকে ভুলতে পারে না?
সারহাদ…আপনি জানেন?
আমি কখনো আপনার কাছে ভালোবাসা চাইনি, শুধু চেয়েছিলাম একবার… একবার আমার দিকে তাকান…আমি তো আপনার জীবনের দাবি করিনি… শুধু আপনার দৃষ্টির সামান্য আশ্রয় চেয়েছিলাম”
তার চোখ ঝাপসা হয়ে আসছিল তবুও তার ভাবনারা থামার নাম নিল না,
–“আমি কারো স্ত্রী ছিলাম… কারো সন্তানের মা হতে চলেছিলাম… তবুও আমার হৃদয়ের গভীরে আপনি ছিলেন… শুধুই আপনি…
এই পাপের শাস্তি হয়তো এভাবেই লেখা ছিল”
মনিটরের শব্দ দ্রুত উঠানামা করতে লাগল। ডাক্তার তৎক্ষণাৎ বলে উঠলেন,

–“ডিফিব্রিলেটর রেডি”
একজন নার্স দৌড়ে মেশিন এগিয়ে দিল।
–“পালস ড্রপ করছে, ম্যাম”
রিয়ানা কষ্টে চোখ খুলল। তার নিঃশ্বাস প্রায় বন্ধ হয়ে আসছে। ডাক্তার নায়লা বললেন,
–“মিসেস আয়ান, প্লিজ শান্ত হোন”
কিন্তু শান্ত হওয়ার মতো শক্তি আর তার মধ্যে অবশিষ্ট ছিল না। পরমুহূর্তেই থেরাপির মেশিন তার বুকে চাপানো হলো। ঝট্ করে তার পুরো শরীরটা তীব্রভাবে কেঁপে উঠল। রিয়ানা হঠাৎ বিছানা থেকে সামান্য উপরে উঠে আবার পড়ে গেল। সে কাঁপা কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল,
–“শে…শেষবারের মতো আপনাকে বলতে চাই, একতরফা ভালোবাসায়… শুধু আপনি না… আমিও আসক্ত ছিলাম… সারহাদ…”

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৩০ (২)

তারপর আবার থেরাপি দেওয়া হলো কিন্তু
এবার সে আর উঠল না। চোখদুটো ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে এলো। ঠিক তখনই দরজার দিকে তাকিয়ে সে আবছাভাবে দেখতে পেল সাদা পোশাক পরা নার্সের পেছনে হাসিমুখে আয়ান ছুটে আসছে। তার দুই হাতে দুইটা ছোট্ট শিশু। আয়ানের মুখজুড়ে এক অসম্ভব উচ্ছ্বাস। সে বুঝতেই পারেনি, ঠিক কোন দৃশ্যটার দিকে এগিয়ে আসছে। রিয়ানা শেষবারের মতো তাকিয়ে রইল। হয়তো সে কিছু বলতে চেয়েছিল। হয়তো “ক্ষমা করো” বলতে চেয়েছিল নয়তো “ভালো থেকো” কিন্তু আর কিছু বলা হলো না। মনিটরের সবুজ রেখাটা হঠাৎ সোজা হয়ে গেল। সকল রকমের শব্দ থেমে গেল, সবকিছু নিস্তব্ধ। রিয়ানার নিথর হাতটা ধীরে ধীরে বিছানা থেকে ঝুলে নিচে পড়ে গেল।

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৩০ (৪)