Home হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৩০ (২)

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৩০ (২)

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৩০ (২)
সাবা খান

আজকের আকাশটা অদ্ভুত রকম থমথমে। সকালের আলো ফুটেছে ঠিকই কিন্তু সূর্য যেন ইচ্ছে করেই নিজেকে আড়াল করে রেখেছে ঘন কালচে মেঘের আড়ালে। চারদিকে একটা চাপা ধূসরতা বিরাজ করছে, বাতাসে কেমন যেন একটা অস্বস্তিকর ভার। না বৃষ্টি হচ্ছে, না পুরোপুরি আকাশ পরিষ্কার। মনে হচ্ছে প্রকৃতি নিজেও যেন কিছুর অপেক্ষা করছে।
কিসের জন্য?
কোনো বড় পতনের?
নাকি এমন কোনো ঘটনার যেটা ইতিহাস হয়ে থাকবে বহু বছর? যানজট যুক্ত ঢাকা শহরের রাস্তার উপর গাড়িগুলো চলছে ধীরগতিতে। মানুষ হাঁটছে, কথা বলছে, দোকান খুলছে কিন্তু সবার মুখে মুখে একটাই নাম সেটা হলো,
“সোফিয়া জাওয়ান”

আজ সকাল থেকেই পুরো পৃথিবীর পরিস্থিতি যেন উত্তাল, অস্থির, ঘোলাটে হয়ে উঠেছে। প্রতিটা নিউজ চ্যানেল, সোশ্যাল মিডিয়া, সংবাদপত্র এমনকি আন্তর্জাতিক পোর্টাল সবখানে একটাই খবর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে,
“গতরাতে গভীর রাতে বদ্ধ সেলের মধ্যে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন সোফিয়া জাওয়ান। হাসপাতালে নেওয়ার পর তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে”
যদিও এখনো পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু নিশ্চিত করা হয়নি। খবরটা সত্যি না মিথ্যা তা কেউ জানে না। কিন্তু গুজবের এই পৃথিবীতে সত্যের চেয়ে দ্রুত ছড়ায় ভয়। আর ভয় এবার ছড়িয়েছে পুরো বিশ্বজুড়ে। সকাল সাতটা বাজতে না বাজতেই টেলিভিশনের পর্দাগুলো লাল ব্রেকিং নিউজে ভরে ওঠে,
–“দ্য ফল অফ সোফিয়া জাওয়ান?
–“সোফিয়া জাওয়ান ডেড অর এলাইভ?
–“দ্য ওম্যান হু রুলড শ্যাডো এম্পায়ার্স”

একটার পর একটা নিউজ চ্যানেল লাইভে যাচ্ছে। কেউ বলছে এটা আত্মহত্যা, কেউ বলছে এটা পরিকল্পিত হত্যা। কেউ আবার দাবি করছে সোফিয়া জাওয়ানের মতো নারী এত সহজে মরতে পারে না। সোশ্যাল মিডিয়ায় লক্ষ লক্ষ পোস্ট তাকে ঘিরে করা হচ্ছে। তন্মধ্যে কারো চোখে আতঙ্ক, কারো চোখে স্বস্তি, কারো চোখে এক টুকরো কালো শোকের ছায়া। পুরো পৃথিবী যেন এক নারীর মৃত্যুর সম্ভাবনাকে ঘিরে নিঃশ্বাস আটকে বসে আছে।
গতরাতে যেসব মিডিয়া প্রেস শেষ রাতের দিকে ঢাাকা সিটি হসপিটালের ভেতরে ঢুকেছিল তাদের মধ্যে একটা ভিডিও ইতোমধ্যে ভাইরাল হয়ে গেছে। ভিডিওটা অনেকটা ঝাপসা। যতটুকু স্পষ্ট তাতে বুঝা যাচ্ছে হসপিটালের অন্ধকার করিডোরের মধ্যে চারপাশে সশস্ত্র গার্ড ভিড় করিয়ে স্ট্রেচারের উপর সাদা কাপড়ে ঢাকা একটা দেহ নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এত এত সিকিউরিটি কোন সাধারণ মানুষ কে দেওয়া হবে না এটা সকলেরই জানা। আর কাল রাত থকে হসপিটালে বড় মাপের কোন ব্যক্তিবর্গ প্রবেশও করেনি সোফিয়া ছাড়া। তাহলে সেটা কে? কার দেহ?
আর এদিকে ভিডিওর ক্যাপশনেতে লিখা,

“ইজ দিস সোফিয়া জাওয়ান’স ডেড বডি?”
ভিডিওটা মুহূর্তেই আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ে সারা বিশ্বে। মানুষ বারবার ভিডিও থামিয়ে জুম করে প্রতিটা বিষয় কে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে। কেউ বলছে,
“ওটাই সোফিয়া” কেউবা বলছে, “না, এটা ইচ্ছাকৃতভাবে ছড়ানো হচ্ছে”
এদিকে ডাক্তাররাও স্পষ্ট করে কিছুই বলছে না আর না প্রেস মিডিয়ার লোকেরা তাদের সাথে দেখা করে কোন ইন্টারভিউ নিতে পারছে। বা ডাক্তারদের কাছেও কাউকে যেতে দেওয়া হচ্ছে না কিংবা কেউ যাওয়ার সাহস করছে না। তার কারণ একটাই, “যন্ত্রমানব”

হ্যাঁ, জ্যাক স্বয়ং নিজে দাঁড়িয়ে থেকে সবটা সামলাচ্ছে। কাল শেষ প্রহরে আসার পর আরজে সানাকে নিয়ে বেরিয়েছে, কাইলিন কিছুক্ষণ আগে ব্ল্যাক ম্যানশনে ফিরে গেছে। কিন্তু জ্যাক এক পাও নরেনি। আর তাকে অগ্রাহ্য করে কারো আর ভিতরে পা মারানোর হিম্মত হয়ে ওঠেনি। কেননা গত পাঁচ ছয় বছরে আরজে পাবলিক প্লেস বা যে কোন জায়গায় যত বড় কান্ডই করুক না কেন জ্যাক ঠান্ডা মাথায় সবকিছুর উপর কয়েক পলকেই পর্দা টেনে দিয়েছে। এর জন্য যদি তাকে সবার সামনে হিংস্র হতে হলেও সে পিছপা হয়নি। মূলত তখন থেকেই জ্যাক জনসম্মুখে আলাদা করে পরিচিতি লাভ করেছে। হাজার হাজার যুবতী তার নিষ্প্রাণ ধূসর চোখজোড়ায় হারিয়েছে। কিন্তু দিনশেষে এই ধূসর চোখ জোড়ার খোঁজ রাজস্থানী রমণীতেই মিলেছে।
অদ্ভুতভাবে সোফিয়ার মৃত্যুর সম্ভাবনাতে পৃথিবী দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। একদল মানুষ উল্লাস করছে। তাদের ভাষ্যমতে,

–“একটা দানব কমলো পৃথিবী থেকে”
–“যে এতগুলো খু*ন করেছে তার এই পরিণতিই হওয়া উচিত ছিল”
–“অবশেষে বিচার হয়েছে”
অন্যদিকে আরেকদল যেন তাদের বিপরীতে সুর গাইছে, তারা নিস্তব্ধ, তাদের মুখে অদ্ভুত এক বিষণ্ণতার ছায়া। কারণ তাদের মতে “সোফিয়া জাওয়ান” শুধুমাত্র অন্ধকার সাম্রাজ্যের একটা নাম ছিল না। তার আরেকটা পরিচয়ও ছিল, সে হাজার হাজার অনাথ আশ্রম বানিয়েছে, গরিবদের জন্য হাসপাতাল খুলেছে, অনেক দেশের দুর্যোগে কোটি কোটি টাকা দান করেছে। তারা বলে,
–“যাই হোক…করেছে তো। ক্যামেরার জন্য করুক আর নিজের জন্য। আর ক’জনই বা এমন করে?”
কি অদ্ভুত এই বিচিত্র পৃথিবীর নিয়ম গুলো তাইনা। যেই সোফিয়া বেঁচে থাকতে তাকে পাথর ছুঁড়া হয়েছে, তার মৃত্যুর পরপরই এখন তার ভালো কাজগুলো সবাই স্মরণ করছে। এজন্যই হয়তো বলে,
“পৃথিবীটা বড়ই হাস্যকর, মানুষ এখানে জীবিতকে কথার আঘাতে পিষে ফেলে, আর মৃতের কাছে ক্ষমা প্রর্থনা করে”
সোশ্যাল মিডিয়ায় পুরনো ভিডিও ভেসে উঠছে, সোফিয়ার বক্তৃতা, তার হাসি। অনাথ বাচ্চাদের মাথায় হাত রেখে দাঁড়িয়ে থাকা ছবি। মানুষ তার নিচে কমেন্ট করছে,

–“সে কি সত্যিই খারাপ ছিল?
নাকি পরিস্থিতি তাকে দানব বানিয়েছে?”
আবার কেউবা লিখছে,
–“Every monster was once a broken human”
আবার কেউ কেউ ক্ষোভের সাথে কটুক্তি করছে,
–“একজন অপরাধীকে নায়ক বানানোর চেষ্টা বন্ধ করুন”
সকাল যত গড়াচ্ছে বিশ্ব পরিস্থিতি তত উত্তপ্ত হচ্ছে। স্টক মার্কেট পর্যন্ত অস্থির। কারণ সোফিয়া জাওয়ানের নাম শুধু অপরাধ জগতের সাথেই মিশে নেই, নামটা জড়িয়ে আছে বিশ্ব অর্থনীতির অন্ধকার স্তরগুলোর সাথেও, বড় বড় রাজনীতিবিদরা নীরব, ব্যবসায়ীরা আতঙ্কিত। অনেক ক্ষমতাশালী মানুষ নিজেদের নিরাপত্তা বাড়িয়ে দিয়েছে রাতারাতি। কেননা যদি সত্যিই সোফিয়া জাওয়ান মারা যায় তাহলে তার সাম্রাজ্যের সিংহাসন এখন শূন্য।
সত্যিই কি শুন্য নাকি সেখানে বসতে চলছে নতুন কেউ? এতদিন যেই আরজে মায়ের পেছনে দাঁড়িয়ে সবটা সামলেছে এখন কি সে সবার সামনে বসে হুকুমত করবে। সোফিয়া জাওয়ান যেভাবে আন্ডারওয়ার্ল্ডের গডফাদারদের বিভিন্ন কৌশলে দমিয়ে রেখেছেন আরজে কি সেভাবেই দমাবে? নাকি আবারো শুরু হবে রক্তপাত, বিশ্বাসঘাতকতা, হিংস্রতা। যেমনটা হয়েছিল লরেন্সের মৃত্যুর পর। এই প্রশ্নটাই যেন পুরো অন্ধকার জগৎকে শ্বাস রুদ্ধকর করে তুলছে।
পৃথিবীর উপরিভাগে মানুষ যখন সোফিয়া জাওয়ানের সম্ভাব্য মৃত্যুর খবর নিয়ে হৈচৈ করছে ঠিক তখনই পৃথিবীর নিচের অন্ধকার স্তরটা কেঁপে উঠেছে ভয় আর আতঙ্কে। আন্ডারগ্রাউন্ড জগতে খবরটা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়তেই কারো ঠোঁটে স্বস্তির হাসি ফুটেছে। সাথে আবার কারো রাতের ঘুম উড়ে গেছে। কেননা সোফিয়া জাওয়ান শুধু এক নারী ছিল না, সে ছিল একটা জীবন্ত গোপন ভল্ট।

বিশ্বের অসংখ্য ক্ষমতাশালী মানুষের অন্ধকার মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে থাকা কদর্য চেহারার একমাত্র সাক্ষী। কে কোথায় কাকে হত্যা করেছে, কে কোটি কোটি টাকা পাচার করেছে, কোন মন্ত্রী মানবপাচারের সাথে জড়িত, কোন প্রেসিডেন্ট যুদ্ধ লাগিয়ে অস্ত্র ব্যবসা করেছে সব, সবকিছু সোফিয়ার কাছে প্রমাণসহ গচ্ছিত। আর এই কারণেই তার মৃত্যু যেমন কারো কাছে মুক্তি, ঠিক তেমনই কারো কাছে ধ্বংসের আগমনী বার্তার মতো। তন্মধ্যে ইউরোপের ভিক্টর অরলভ অন্যতম।
সে নিজের বিলাসবহুল অফিসে পায়চারি করছে অবিরাম। তার কপালে জমে ওঠেছে চিকন ঘামের রেখা, চোখ লালছে হয়ে আছে। সে চিৎকার করে নিজের সেক্রেটারির দিকে ফাইল ছুঁড়ে মারে,
–“আমি আরজের সাথে এখনই কথা বলতে চাই, রাইট নাউওওও…”
সেক্রেটারি কাঁপা কণ্ঠে শুধালো,
–“স্যার… আমরা বহুবার কল করেছি। কিন্তু তিনি ফোন রিসিভ করছেন না”

ভিক্টর ক্ষিপ্ত হয়ে ডেস্কের উপর থাকা গ্লাস আছড়ে ফেলে। কেননা দশ বছর আগে পূর্ব ইউরোপের এক গোপন রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের সমস্ত ভিডিও ফুটেজ সোফিয়ার কাছে আছে। ভিডিওটা বাইরে বের হলে শুধু তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার না, বরং তার পুরো জীবনই শেষ। এবার তিবি নিজেই সকল অহংকার গুড়িয়ে নিজের মুঠোফোন দিয়েই কল লাগাতে শুরু করে আরজের নাম্বারে।
আবার অন্যদিকে পাকিস্তানে থাকা হাসান আল মুক্তাদি নিজের ব্যক্তিগত বাঙ্কারে বসে কাঁপা হাতে সিগার ধরাচ্ছে। তার ভয় আরও ভয়ংকর। কারণ সোফিয়ার কাছে তার শিশু পাচার চক্রের ডকুমেন্টস আছে।৷ কেউ যদি কোনমতে জানতে পারে ‘জাতিসংঘের সামনে মানবাধিকার নিয়ে ভাষণ দেওয়া মানুষটা রাতের অন্ধকারে শিশু বিক্রি করত যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে’
তাহলে কি হবে? লোকে শুধু তাকেই নয় পুরো পাকিস্তান কে ধিক্কার জানাবে। এজন্য সে বারবার ফোন করছে। একই নাম,
“আরজে”
সে দাঁত চেপে ফিসফিস করে বলছে,
–“পিক আপ দ্য ড্যাম ফোন”

কিন্তু ওপাশ থেকে কোনো সাড়া নেই। রাগে সে নিজের ফোনটা দেয়ালে ছুঁড়ে মারে। মোবাইল ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। চারদিকটা ঘিরে আছে আতঙ্ক, ভয়, অস্থিরতায়। এদের সবার এখন একটাই ভয়, যদি সোফিয়া সত্যিই মারা যায় তাহলে সেই ডেটাগুলো কোথায়? কার কাছে? আরজের কাছে?
নাকি মৃত্যুর আগেই সে সবকিছু প্রকাশ করার ব্যবস্থা করে গেছে?
এদিকে বিশাল এক এলইডি টিভির সামনে বসে আছেন মিসেস দিলরুবা খানম। পুরো ড্রয়িংরুম জুড়ে টিভির আলো ঝলসে উঠছে। একটার পর একটা ব্রেকিং নিউজ,
–“সোফিয়া জাওয়ান ডিক্লেয়ার্ড ডেড?
–“আনকনফার্মড সোর্সেস ক্লেইম বডি মুভ”
দিলরুবার চোখ ক্রমশ সরু হয়ে আসছে। তার হাতে ধরা রিমোটটা একবার মুষ্টিবদ্ধ হচ্ছে আবার ঢিলে হয়ে যাচ্ছে। কোথাও না কোথাও তার ভিতরে একটা নিশ্চয়তা কাজ করছে,

“সোফিয়া এত সহজে মরতে পারে না, অসম্ভব”
কিন্তু সমস্যা হচ্ছে হাসপাতালে সোফিয়ার কোনো চিহ্ন নেই। না কোনো রুমে, না কোনো রেকর্ডে, না কোনো ট্রান্সফার ফাইলে। যেন পুরো মানুষটাই হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। আর এই অদৃশ্য হয়ে যাওয়াটাই তাকে আরও বেশি অস্থির করে তুলছে। তার লাগানো গুপ্ত সোর্সগুলো থেকেও পরস্পরবিরোধী খবর আসছে। কেউ বলছে,
–“ম্যাডাম, সোফিয়াকে সত্যিই মৃত ঘোষণা করা হয়েছিল”
আবার কেউ বলছে,
–“না ম্যাডাম, কেউ একজন তাকে সরিয়ে ফেলেছে”
সবকিছু এলোমেলো, অগোছালো লাগছে তার কাছে। দিলরুবা খানম দাঁত চেপে টিভির দিকে তাকিয়ে থাকেন। হঠাৎ টিভিতে আবার সেই ঝাপসা ভিডিওটা ভেসে ওঠে, স্ট্রেচার, সাদা কাপড়, চারপাশে গার্ড। আর সাংবাদিকের উত্তেজিত কণ্ঠ,

–“দিস কোড ভি দ্য ফাইনাল ফুটেজ অফ সোফিয়া জাওয়ান”
এবার তার ধৈর্য শেষ প্রান্তে। হঠাৎ তিনি “ড্যামিট” বলে চিৎকার করে হাতের রিমোটটা নিজের সর্বশক্তি দিয়ে ছুঁড়ে মারেন টিভির দিকে। সাথে সাথে ধড়াম করে টিভির স্ক্রিন ফেটে নিভে যায়। পুরো রুমটা নিস্তব্ধতায় চেয়ে যায়। শুধুমাত্র তার ভারী শ্বাস ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছে না। রাগে তার বুক ওঠানামা করছে দ্রুত। তিনি একবার সামনে থাকা ট্রি-টেবিলের উপর রাখা ছবিটার দিকে তাকান। নজরে আসে তার মৃত স্বামী, আর পাশে তার পালক মেয়ে সুনেহনা। মুহূর্তে ছবিটার দিকে তাকিয়ে তার চোখ আরও কঠিন হয়ে ওঠে। তিনি বিড়বিড় করে আওড়ান,
–“সবাই পাগল হয়ে গেছে, কেউ কিছু বুঝছে না”
তারপর ধুপধাপ কদম ফেলে সিঁড়ি ডিঙিয়ে সোজা উপরের দিকে চলে যান।

হাসপাতালের টানা উত্তেজনা, মিডিয়ার বিশৃঙ্খলা, ডাক্তারদের দৌড়ঝাঁপ, আরজের রাগ সবকিছু সামলে কাইলিন সবেমাত্র ব্ল্যাক ম্যানশনের বিশাল লোহার গেট পেরিয়ে ভিতরে প্রবেশ করেছে, তখন প্রত্যুষের আলোটা ধীরে ধীরে সারা ধরণীতে ছড়িয়ে পড়ছে। কালো রঙের গাড়িটা ধীরগতিতে এসে থামে ম্যানশনের সামনের প্রশস্ত পথের ধারে। ইঞ্জিন বন্ধ হতেই চারপাশে এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে আসে। কাইলিন কয়েক মুহূর্ত স্টিয়ারিংয়ের উপর মাথা ঠেকিয়ে বসে থাকে। তার চোখেমুখে স্পষ্ট ক্লান্তির ছাপ। চোখের নিচে হালকা কালি জমেছে কেমন একদিনেই। কপালের শিরাগুলোও টান টান হয়ে আছে।

কালকের পুরো রাতটাই যেন তার শরীরের প্রতিটা স্নায়ুকে নিংড়ে নিয়েছে। সে ধীরে ধীরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দরজা খুলে বাইরে নামে। কিন্তু পরের মুহূর্তেই তার পদযুগল থমকে যায়, একেবারে স্থির। যেন সময় আচমকা থেমে গেছে তার জন্য। ক্লান্তিতে কুঁচকে থাকা ললাট ধীরে ধীরে প্রসারিত হয়ে আসে। চোখদুটো অনিচ্ছা সত্ত্বেও সামনের রমণীতে আটকে যায়। আর ঠিক তখনই একটা অদ্ভুত অনুভূতি তার বুকের ভেতর দিয়ে শিহরণ তুলে পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। বারবার তার গলার অ্যাডামস অ্যাপল দ্রুত উঠানামা করছে। সে চোখ সরিয়ে নিতে চায়, সত্যিই চায়। কিন্তু কেন যেন চোখ আজ তার সাথেই বিশ্বাসঘাতকতা করছে। বারবার অবাধ্য হয়ে সামনে তাকিয়ে থাকছে। কাইলিন বহু কষ্টে একবার ঘাড় ফিরিয়ে অন্যদিকে তাকায়। নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করে, না তাকাবি না, এই মেয়েটা বিপদ, সে কোনো সাধারণ নারী নয়।

কিন্তু পরমুহূর্তেই সে আবারও সামনে তাকায়। আর তাকিয়েই বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে কেঁপে ওঠে। কেননা তার থেকে কিছুটা দূরে বিস্তৃত সবুজ ঘাসের উপর একটা কালো ম্যাট বিছানো। সেই ম্যাটের উপর নিজের জগতে ডুবে এক্সারসাইজ করছে সিয়া। তার গায়ে জড়ানো হালকা সাদা রঙের ছোট স্পোর্টস টপ। নিচে কালো স্কিনি ফিট ট্র্যাক প্যান্ট, যেটা তার শরীরের প্রতিটা বাঁককে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। দীর্ঘ চুলগুলো উঁচু করে বাঁধা। কপালের কাছে হালকা ঘাম জমে চকচক করছে। দ্রুত শ্বাস নেওয়ার সাথে সাথে বুক ওঠানামা করছে ছন্দহীনভাবে। গরমের কারণে নিজের উপরে থাকা জ্যাকেটটা খুলে সে পাশেই রেখে দিয়েছে। কারণ রমণী নিশ্চিত ছিল যে, এই মুহূর্তে বাড়িতে কোনো পুরুষ নেই। জ্যাক, আরজে আর কাইলিন কাল রাতেই বাইরে গেছে। কোথায় গেছে সেটা অবশ্য জানে না সে। আর এসপি সাত সকালেই সারহাদ কল করায় বেড়িয়ে পড়েছে।

সেজন্যই নিশ্চিন্ত মনে এভাবে খোলামেলা ইয়ার্ডে এসে এক্সারসাইজ করছে সে। নয়তো সে কখনোই এমন করত না। এদিকে কাইলিনের অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যাচ্ছে। সে বারবার শুকনো ঢোক গিলছে আর নিজেকে বোঝাচ্ছে,
“সামনে যে দাঁড়িয়ে আছে সে কোনো সাধারণ নারী নয়, সে একটা মরীচিকা, একটা মায়াবী মরীচিকা। যে মানুষকে নিজের দিকে টেনে নিয়ে শেষে অদৃশ্য হয়ে যায়। দূরে থাক কাইলিন, তার থেকে দূরে থাক”
কিন্তু অবাধ্য মন যেন কোনো কথাই শুনছে না। বরং প্রতিটা সেকেন্ডে আরও বেশি তার দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। তার চোখ বারবার গিয়ে আটকে যাচ্ছে সিয়ার উপর। সে চোখ নামাতে চাইছে, কিন্তু পারছে না। এই অজানা অনুভূতিটা তাকে ভয় পাইয়ে দিচ্ছে। কারণ বহু বছর ধরে কাইলিন নিজের অনুভূতিগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে শিখেছে। কিন্তু আজ একটা মেয়েকে দেখে তার সমস্ত নিয়ন্ত্রণ যেন ভেঙে পড়ছে।
ঠিক তখনই সিয়া স্ট্রেচ করতে করতে চোখ খুলে সামনে তাকায় আর মুহূর্তেই জমে যায়। তার পুরো শরীর স্থির হয়ে আসে। চোখ বড় বড় হয়ে যায় সামনে স্ট্যাচুর মতো দাঁড়িয়ে থাকা কাইলিনকে দেখে। ব্যাস, কয়েক সেকেন্ড। তারপর,

–“আআআ”
করে এক আত্মচিৎকার দিয়ে সে পাশ থেকে জ্যাকেটটা একটানে তুলে নিজের গায়ে জড়িয়ে ফেলে। ছোট্ট গোলগাল মুখ মুহূর্তেই লাল হয়ে যায় লজ্জায়, রাগে, অস্বস্তিতে।
ব্ল্যাক ম্যানশনের বিশাল ইয়ার্ড জুড়ে তখনও কালো মেঘের ছায়া কেটে সকালের আলো একটু একটু করে ছড়িয়ে পড়ছে। ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশিরের কণাগুলোও আলো পেয়ে চিকচিক করছে। দূরে ফোয়ারার পানির শব্দ ভেসে আসছে মৃদুভাবে। অথচ সেই শান্ত পরিবেশের মাঝখানে দাঁড়িয়ে যেন আগুন হয়ে জ্বলছে সিয়া। সে এক মুহূর্ত বিলম্ব না করে কোটটা শক্ত করে গায়ে জড়িয়ে নিয়ে ধুপধাপ কদম ফেলে এসে দাঁড়ায় কাইলিনের সামনে। তারপর শুরু হয় তার ক্ষুব্ধ বাক্য ঝড়,

–“আপনি আসলে মানুষ তো?
নাকি জঙ্গলে বড় হওয়া কোনো অসভ্য প্রাণী?
কমনসেন্স বলে কি কিছু আছে আপনার?
লজ্জা বলে কিছু আছে আপনার?”
এভাবে কতগুলো কথা শুনানোর পরও যখন কাইলিনের তরফ থেকে কোন শব্দ আসলো না তখন সিয়া রাগে গড়গড় করে ফের উচ্চ শব্দে বলে,
–“একটা কথাও বলছেন না কেন?
নাকি ধরা খেয়ে এখন কথা বন্ধ হয়ে গেছে?”
সে একনাগাড়ে বকেই যাচ্ছে। রাগে তার নাকের ডগা পর্যন্ত লাল হয়ে উঠেছে। চোখ দুটোও বড় বড় হয়ে আছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় কাইলিন যেন এসবের কিছুই শুনছে না। সে এখনো একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সিয়ার দিকে। সেই দৃষ্টিতে কী আছে?
মুগ্ধতা?
নাকি মোহ?
নাকি বহুদিনের শুকিয়ে যাওয়া অনুভূতির হঠাৎ জেগে ওঠা? হয়তো বা বহুদিন পর হঠাৎ কারো দিকে তাকিয়ে নিজের ভিতর হারিয়ে যাওয়া। কিছুই বোঝা যাচ্ছে না স্পষ্ট। আর না সামনের মানবী এই মুহূর্তে সেটা বোঝার চেষ্টা করার অবস্থায় আছে। সে শুধু বকেই যাচ্ছে,

–“আমি কথা বলছি আপনার সাথে”
হ্যালো?
কোথায় হারিয়ে গেলেন?”
কিন্তু কাইলিনের দিক থেকে কোনো উত্তর আসছে না, একদম না। শেষমেষ রমণী বিরক্ত হয়ে নিজের কথা থামায়। তারপর কাইলিনের চোখের সামনে হাত নাড়ায়। যদিও সে খাটো হওয়ার কারণে কাইলিনের চোখ পর্যন্ত হাত পৌঁছাতে তাকে ভীষণ কষ্ট পোহাতে হচ্ছে। সে বারবার আঙুলের উপর ভর দিয়ে উঁকি দিয়ে দিয়ে হাত নাড়ছে। তবুও কাইলিনের তরফে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। সে এখনো সেই একইভাবে তাকিয়ে আছে। শেষে অতিরিক্ত বেজার হয়ে সিয়া একটা জোরে তুড়ি বাজায়,
“টুক”
শব্দটা হতেই কাইলিন যেন আচমকা ভ্রম থেকে ছিটকে বাস্তবতায় ফিরে আসে। সে চোখ পিটপিট করে সামনে তাকায়। আর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সিয়াকে দেখে খানিকটা অবাক হয়ে যায়। মনে মনে ভাবে,
–“এই মেয়েটা এখানে কখন আসলো?
এখনই তো ওখানে ছিল”
পরমুহূর্তেই নিজের চিন্তাধারার জন্য নিজের মাথায় গাট্টা মারতে ইচ্ছা করে তার। কিন্তু না, এখন এই পিচ্চি মেয়েটার সামনে নিজেকে অপমান করা যাবে না। তাই সে দ্রুত একটা গলা খাঁকারি দিয়ে চারপাশে তাকানোর ভান করে গম্ভীর গলায় বলে ওঠে,

–“আরে কার পিচ্চি বাচ্চা এটা? বাগানে এভাবে ছেড়ে দিয়েছেন কেন? কোথাও পড়ে হাত-পা ভেঙে বসে থাকবে, তখন দায় কে নিবে? আজকাল মানুষ বাচ্চা সামলাতেও জানে না….”
এদিকে সিয়া যেন নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় অপমান শুনে ফেলেছে। সে খুব ভালো মতেই জানে তার হাইট ছোট। কিন্তু এটা নিয়ে কেউ কটুক্তি করলেই তার মাথা গরম হয়ে যায়। ঐ সময় হুস জ্ঞান সব হারিয়ে ফেলে। তার মতে, সে কি নিজে ইচ্ছা করে এই হাইট নিয়ে জন্মেছে। এটা উপরঅলাই দিয়েছে, তাহলে মানুষ এটা নিয়ে কেন খোঁচা দিবে?
সে রাগে ফুসতে ফুসতে কোমরে দুহাত রাখে।
তারপর যতটুকু সম্ভব আঙুলের উপর ভর দিয়ে নিজেকে লম্বা করার চেষ্টা করে চিৎকার করে ওঠে,
–“আপনার চোখ দুটো হাতে নাকি পকেটে?
যেখানেই থাকুক, আগে চোখের জায়গায় চোখ লাগান, তারউপর চার চোখ লাগিয়ে ভালো করে দেখুন সামনে পিচ্চি না কে?
ভেবেছি শুধু তালগাছ, এখন তো দেখি চোখেরও অভাব”
শেষের বাক্যটা মিনমিন করে বলায় কাইলিন শুনতে পেলো না কিন্তু প্রথম বাক্য গুলো ভালো করেই শুনেছে তাই সেও এবার অবাক হওয়ার ভান করে নিচের দিকে তাকায়। তারপর ভীষণ শান্ত স্বরে আওড়ায়,

–“ও আচ্ছা, এটা তো মিস হরলিক্স”
সিয়া থমকে যায়। তার ভ্রু সঙ্গে সঙ্গে কুঁচকে ওঠে। নিজমনে বিড়বিড় করে,
–“কিহ? মিস হরলিক্স!!”
পরের মুহূর্তেই কাইলিনের টিটকারির মানে বুঝে রাগে প্রায় ফেটে পড়ে সে। নিজের দন্ত পাটি পিষে খেঁকিয়ে উঠে,
–“কোন অ্যাঙ্গেলে আমাকে হরলিক্স মনে হয় আপনার?”
কাইলিন নির্বিকার চিত্তে আড়চোখে তার দিকে তাকায়। তারপর ঠাণ্ডা স্বরে প্রতুত্তর করে,
–“হুম, সত্যি বলতে ৩৬০ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে”
ব্যাস, সিয়ার মনে হলো তার মাথার ভিতরে এইমাত্র বিস্ফোরণ হয়েছে। কাইলিন আবারও তার হাইট নিয়ে অপমান করেছে। সে দাঁত কিড়মিড় করে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকে কাইলিনের দিকে। তারপর নিজেকে জোর করে শান্ত করার চেষ্টা করে। গভীর শ্বাস টেনে নেয় আর মনে মনে বলতে থাকে,
“না…এই মুহূর্তটা রাগার না। এইরকম তালগাছের সাথে কথা বাড়ানো নির্বুদ্ধিতা। আমি কাণ্ডজ্ঞানহীন মেয়ে না, বুদ্ধিমতী মেয়েরা এসব ঝামেলা এড়িয়ে চলে”
এইসব ভাবতেই সে ঠোঁটের কোণে তির্যক হাসি টেনে সামনে কয়েক কদম এগিয়ে জোরে জোরে বলে ওঠে,

–“একজন আছে…যে নিজে তালগাছ হয়ে অন্যকে পিচ্চি দাবি করে”
এদিকে কাইলিন তার কথা শুনে ঠোঁট কামড়ে হাসছে। কেন জানি এই মেয়েটার সাথে পায়ে পা লাগিয়ে ঝগড়া করতেও তার ভালো লাগছে। তারপর সেও সিয়াকে পাশ কাটিয়ে সামনে যেতে যেতে সমান গলায় বলে ওঠে,
–“আর একজন আছে…যাকে নিচে তাকালে খুঁজে পাওয়া যাবে না। সে আবার অন্যকে তালগাছ বলে। হেহহহ…”
সিয়া রাগে প্রায় গজগজ করতে করতে তার পা থামিয়ে,
–“অসভ্য, নির্লজ্জ”
দাঁত কিড়মিড় করতে করতে একের পর এক গালি ছুঁড়তে থাকে কাইলিনের দিকে। আর কাইলিন? সে কিছুই না বলে শুধু সামনে হাঁটতে হাঁটতে অদ্ভুতভাবে হাসতে থাকে। যেন বহুদিন পর আজ কেউ তার নিস্তব্ধ জীবনে একটা প্রাণবন্ত বিশৃঙ্খলা এনে দিয়েছে।

আজ সকাল থেকেই আকাশটা ভীষণ ভারী হয়ে আছে। মেঘগুলো যেন রাতের সমস্ত বিষণ্নতা বুকে নিয়ে এখনো দিগন্তজুড়ে ছড়িয়ে আছে। সূর্য উঠেছে ঠিকই, কিন্তু তার আলো মেঘের ঘন চাদর ভেদ করে পৃথিবীর বুকে পৌঁছাতে পারছে না পুরোপুরি। চারদিক কেমন ধূসর, স্তব্ধ, নিস্তব্ধ। বাতাসে ভেজা মাটির গন্ধ। ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশির বিন্দুগুলোও যেন আজ আলো পেয়ে ঝলমল না করে নিঃশব্দে কাঁদছে। দূরে কোথাও নাম না জানা পাখির করুণ ডাক ভেসে আসছে। সেই ডাকের মধ্যেও যেন একটা শূন্যতা লুকিয়ে আছে।
এই নিস্তব্ধ সকালের বুক চিরে ধীরে ধীরে ফটকের ভিতরে প্রবেশ করে আয়ান। কিছুক্ষণ স্থির চোখে সামনের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার চোখের নিচে ক্লান্তির গাঢ় ছাপ। যেন বহু রাত ধরে মানুষটা ঘুমায় না। নিজের কোলে থাকা কিয়ান ও কিয়ারা কে নিয়ে সামনে এগিয়ে যায়। বড় ফটকটা বন্ধ হতেই চারপাশের নীরবতা যেন আরও গাঢ় হয়ে ওঠে। কয়েক কদম যাওয়ার পরই আয়ান দুজনকে নামিয়ে দেয়। মুহূর্তের মধ্যেই দুই ভাইবোন দৌড়ে চলে যায় সামনে। সেখানে দেড় হাত সমান উঁচু করে চারদিক দেওয়াল তোলা একটা কবর। তার সামনের দিকটায় সাদা পাথরের ফলকে খোদাই করে লিখা,

“রিয়ানা জাওয়ান”
“মাতা — সোফিয়া জাওয়ান”
“পিতা — ইকবাল জাওয়ান”
“স্বামী — আয়ান”
কবরটার সামনে গিয়ে কিয়ারা হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে। তার ছোট্ট হাত দুটো কবরের উপরে রেখে এক নিঃশ্বাসে বাচ্চাদের মতো করে বলতে শুরু করে,
–“মাম্মাম, তুমি জানো? কালকে আবার পেটে ব্যথা করছিল। আমি সারারাত কেঁদেছি। পাপা অনেক আদর করছে, তাও তোমার মতো না”
সে একটু থেমে ফের আওড়ায়,
–“তুমি কেন আসো না?
তুমি কি এখনো রাগ করে আছো?”
বলতে বলতে তার গলাটা ধরে আসে। পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা কিয়ান মুখ ফুলিয়ে বলে ওঠে,

–“মাম্মাম, তুমি শুধু কিয়ারার কথাই শুনবে না। আমারও অভিযোগ আছে। ইউ নো, পাপা কালকে আবার আমাকে ব্রকলি খাইয়েছে। আমি বারবার বলেছি আমি খাব না। কিন্তু পাপা বলছে, তুমি নাকি ছোটবেলায় অনেক খেতে তাই….”
কিয়ারা সঙ্গে সঙ্গে ভাইয়ের দিকে ঘুরে তার কথা কেটে ছোট্ট হাত দুটো কোমরে জড়িয়ে ধরে বলে,
–“মিথ্যা, মাম্মাম কখনো ব্রকলি খেত না”
কিয়ান এবার রেগে যায়,
–“তুই জানিস? তুই তো মাম্মামের পেট থেকে পরে বের হয়েছিস। আমি আগে বের হয়েছি। তাই আমিই বেশি জানি”
কিয়ারা ঠোঁট ফুলিয়ে চিৎকার করে ওঠে,
–“আমি মাম্মামের প্রিন্সেস”
–“মাম্মাম আমাকে বেশি ভালোবাসে”
–‘না আমাকে”
–“আমাকে”
–“আমাকে”

দুজনের মধ্যে বেঁধে যায় এই নিয়ে পুরোদমে ঝগড়া। আর তাদের কথা কাটাকাটির মধ্যেই মেঘে ঢেকে থাকা আকাশটা আরও বেশি স্তব্ধ হয়ে আসছে। আকাশের বুক জুড়ে জমাট ধূসর মেঘের কারণে সূর্যের আলোও যেন আজ পৃথিবীতে নামতে ভয় পাচ্ছে। বাতাসে ভেজা মাটির গন্ধ, কুয়াশা আর শিশিরের মিশ্রণে চারপাশটা কেমন নিথর, স্তব্ধ। দূরে কোথাও একটা কাক কর্কশ কণ্ঠে ডাকছে বারবার। যেন প্রকৃতিও আজ কারও শোকে মাতম করছে। সেই নিস্তব্ধতার মাঝখানে ধীরে ধীরে সামনে এসে দাঁড়ায় আয়ান। আর এদিকে কিয়ান ও কিয়ারা এখনো নিজেদের মতো করে মায়ের সাথে কথা বলছে। কেউ অভিযোগ করছে, কেউ আদর চাইছে, কেউ অভিমান করছে। আবার একটু পর এই নিয়ে দুজনেই ঝগড়াও লেগে যাচ্ছে।
আর আয়ান? সে যেন ধীরে ধীরে নিজের সমস্ত ভাঙা অস্তিত্ব উজাড় করে দিচ্ছে সেই নিশ্চুপ কবরটার সামনে। রিয়ানার কবরের সামনে দাঁড়াতেই তার শ্বাস ভারী হয়ে আসে। আজ পাঁচটা বছর হয়ে গেছে, পুরো পাঁচটা বছর। তবুও আজ পর্যন্ত যতবার সে এখানে এসেছে, ততবারই তার হাঁটু কেঁপে উঠেছে। মনে হয়েছে এই মাটির নিচে শুধু একজন মানুষ না, তার পুরো পৃথিবীটা ঘুমিয়ে আছে। আয়ান আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। ধীরে ধীরে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে কবরটার সামনে। তার আঙুল গুলো তিরতির করে কাঁপছে। চোখের কোণটা লাল হয়ে উঠছে ধীরে ধীরে। হঠাৎ যেন কিছু একটা মনে পড়তেই তার ঠোঁটের কোণে ভাঙা একটা হাসি ফুটে ওঠে। সে একটা ঢোক গিলে নিচু স্বরে বলতে শুরু করে,

–“কল্পবাসিনী…আপনি জানেন?
আজও আমি ঘুমানোর আগে বিছানার পাশটা ফাঁকা রাখি। অদ্ভুত না?
পাঁচটা বছর হয়ে গেছে, তবুও মনে হয় আপনি বুঝি দরজা খুলে ভিতরে ঢুকবেন। আমার চুলগুলো আপনার মসৃণ হাত দিয়ে নেড়ে এলোমেলো করে বলবেন, ‘আয়ান, আবার না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছ? এক্ষুনি উঠে খাবে তুমি’
আয়ান এগুলো বলে নিজের অতীতের মিষ্টি ভাবনা গুলোতে ঢুব দেয়। কিয়ৎকাল পর নিজের ভ্রম কাটিয়ে মৃদু হেসে আবার থেমে যায়। চোখের কার্নিশ বেয়ে উষ্ণ জল গড়িয়ে পড়ে। সেদিকে বিন্দু মাত্র ধ্যান না দিয়ে ফের নিজের ধরে আসা গলায় আওড়ায়,
–“আমার কল্পবাসিনী…আপনি না চাইতেও আমি সারাটা জীবন আপনার হয়ে গেলাম। যদি একবার চাইতেন…একবার যদি সত্যিই আমার দিকে তাকিয়ে বলতেন ‘থেকে যাও’ না জানি আমি কী করে ফেলতাম আপনার জন্য”
তার কণ্ঠস্বর কেঁপে ওঠে। বাতাস পর্যন্ত তার কাতর করা স্বরে নিস্তব্ধ হয়ে যায় যেন। আয়ান ডানহাতের উল্টো পিঠে গড়িয়ে পড়া অশ্রু মুছে আবারও বলে,

–“কল্পবাসিনী…আমার থেকে এতটা দূরত্ব বানিয়েছেন যে, আপনার জন্য লেখা নিদ্রাহীন চিঠিগুলো আজ আপনার কাছে পৌঁছাচ্ছেই না। অথচ আমি বোকারাম উত্তরহীন লিখেই যাচ্ছি”
আয়ান কিছুক্ষণ থেমে আনমনে একবার মৃদু হেসে মাথা নিচু করে বলে,
–“দিনের শেষে, রাতের শেষে, জীবনের শেষ প্রহর পর্যন্তও হয়তো লিখে যাব। কি অদ্ভুত না? ক্লান্তি আসে না, অপেক্ষা করতে করতে মানুষ ক্লান্ত হয়ে যায় শুনেছি। কিন্তু আপনি আর আসবেন না জেনেও আমি কেন হচ্ছি না ক্লান্ত?

কেন আজও আপনার জন্য বুকের ভিতরটা এভাবে ধুকপুক করে?
বলবেন কল্পবাসিনী?
কি হলো?
চুপ করে আছেন কেন?
কিছু বলছেন না কেন?”
নাহ, আয়ানের কাতর স্বরের বিপরীতে এবারও কোন প্রত্যুত্তর ভেসে আসলো না। সে জানে আসবেও না, কবর থেকে কী আওয়াজ আসে?
না। তবুও আয়ান অপেক্ষা করে। কিছুপল এভাবেই কেটে যায় নীরবতায়। কিয়ান ও কিয়ারা ততক্ষণে একরু দূরে পড়ে থাকা কিছু ফুল কুড়াচ্ছে নিজের মাম্মাম কে দিবে বলে। আয়ান নিজের মতো করে বলে,
–“তাহলে কি আমি ধরে নিব নীরবতাই আপনার ভাষা?”
সে ঠোঁট কামড়ে নিজেকে সংবরণ করে তবুও তার চোখ বেয়ে জল ঠিকই গড়িয়ে পড়ে। সে আলতো করে কবরের মাটি ছুঁয়ে দেয় সাথে সাথে তার আঙুলের ডগা কেঁপে ওঠে। আয়ান নিজেকে একটু শক্ত করে বলে,

–“যদি তাই হয়, তাহলে আপনিও ধরে নিন আমিও আপনার এক নীরব প্রেমিক”
আয়ন একবার চোখ তুলে কিয়ান ও কিয়ারার দিকে দৃষ্টিপাত করে বলে,
–“আমি না হয় নীরবে, নিভৃতে থেকে গেলাম।
কিন্তু এই দুটো নিষ্পাপ ফুলের কী দোষ ছিল বলুন?
যারা জন্মের পর একবারও মায়ের কণ্ঠ শুনলো না, একবারও আপনার কোলে মাথা রাখতে পারলো না। তবুও দেখুন তাদের ঘুম ভাঙলে মাম্মাম লাগে, ব্যথা পেলে মাম্মাম লাগে, খুশি হলে মাম্মাম লাগে। আমি হাজার চেষ্টা করেও ওদের কাছে মা হতে পারলাম না”
সে ঠোঁট থেকে একটা ভাঙা হাসে বেড়িয়ে আসে। সে শ্লেষাত্মক কণ্ঠে নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করে,
–“মা কি এমনই হয়? হয়তো।

আহা, মাতৃত্ব বুঝি এতটাই মধুর আর এতটাই বিলাসী, যে তার মূল্য পরিশোধ করার ক্ষমতা এই আয়ানের ছিল না গো কল্পবাসিনী। তাই হয়তো, না আমি আপনাকে পেলাম আর না আমার সন্তানেরা তাদের মাকে পেল”
তার গলা ভেঙে আসছে। চোখের জল ঝরে পড়ে কবরের মাটির উপর। সে এতটাই নিজের কল্পবাসিনীর সাথে কথা বলতে ব্যস্ত ছিল যে একবারও পিছনে ফিরে তাকানোর প্রয়োজন অনুভব করেনি। পিছনে তাকালে হয়তো দেখতে পেত চার জোড়া চোখ স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে। সেই ফটকের ভিতর দিয়েই কিছুক্ষণ আগে প্রবেশ করেছে সানা আর আরজে।
যদিও তারা আয়ানের বলা প্রথম বাক্যগুলো শুনতে পায়নি কিন্তু এখনকার বলা প্রতিটা কথা স্পষ্ট শুনতে পেয়েছে। সানাতো প্রথম বুঝতেই পারেনি এখানে কি হচ্ছে। কিন্তু যখনই দেখেছে ঠিক তাদের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে আছে আয়ান। তার দু’পাশে দাঁড়িয়ে কিয়ান আর কিয়ারা নিজেদের ছোট ছোট হাত দিয়ে কবরের উপর রাখা ফুলগুলো ঠিক করছে। আর আয়ান সে যেন নিজের সমস্ত অস্তিত্ব হারিয়ে বসে আছে সেই সাদা পাথরের ফলকের সামনে,
“রিয়ানা জাওয়ান”
নামটার উপর জমে থাকা শিশিরবিন্দু গুলোও যেন আজ তার সাথে কাঁদছে। আয়ানের কণ্ঠ ভারী, ভাঙা, ক্লান্ত। সে ধীরে ধীরে কবরটার উপর হাত রেখে তারপর কাঁপা কণ্ঠে ফিসফিস করে বলে,

–“আপনি বড়ই নিষ্ঠুর ছিলেন কল্পবাসিনী,
খুব নিষ্ঠুর। একবারও ভাবলেন না, আপনার পরে এই পৃথিবীতে আমি কীভাবে বাঁচবো?”
তার ঠোঁটের কোণে একটা তিক্ত হাসি ফুটে ওঠে,
–“দেখুন না…আজও আমি আপনার কবরে এসে আপনাকেই বলি আমার দিনের গল্প। আজও অফিস শেষে বাসায় ফিরলে মনে হয় আপনি হয়তো দরজা খুলবেন। আজও মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলে হাত বাড়িয়ে আপনাকেই খুঁজি, আমাকে ছেড়ে যাওয়া কি এতটাই দরকার ছিল?”
চক্ষু সম্মুখে এই দৃশ্য দেখে সানার শ্বাস যেন বুকের ভিতর আটকে গেছে। তার মনে হচ্ছে কেউ বুকের মাঝখানটা ছিঁড়ে ধরেছে। সে কখনো, কখনোই এমনটা কল্পনা করেনি। ছয় বছর আগে সে এখান থেকে যাওয়ার আগে দেখেছিল রিয়ানা আর আয়ানের বিয়ে।
সেই বিয়ের হাসি, আলো, সাজসজ্জা এখনো তার চোখে ভাসে। সে তো ভেবেছিল আজ হয়তো তারা নিজেদের সন্তানদের নিয়ে সুখী এক সংসার করছে।

কিন্তু আজ আজ সেই মেয়েটা ঠান্ডা মাটির নিচে শুয়ে আছে। তার সন্তানগুলো কবরের সামনে দাঁড়িয়ে মাকে খুঁজছে? আর তার স্বামী দাঁড়িয়ে আছে জীবন্ত লাশ হয়ে। তার বিয়ের পর থেকে রিয়ানাই ছিল একমাত্র জাওয়ান পরিবারে যে সানাকে কোনরকম কটুক্তি বা নিচু কথা শোনায় নি, কোনদিনও তার সাথে খারাপ ব্যবহার করে নি। সানার চোখ দিয়ে গড়গড় করে পানি ঝরতে লাগলো। এমন না যে সে কান্না থামানোর চেষ্টা করছে না। কিন্তু আজ তার ভেতরটা যেন ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। কেমন একটা দুর্বলতা পুরো শরীর জুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে। মনে হচ্ছে হাঁটতেই পারছে না। ঠিক তখনই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আরজে একপলক তার দিকে তাকালো। তার অভিজ্ঞ চোখ মুহূর্তেই বুঝে ফেললো সানার অবস্থাটা। ধীরে ধীরে সে নিজের হাত বাড়িয়ে সানার ডান বাহুটা আলতো করে টেনে নিল নিজের বুকের কাছে। সানার মাথাটা তার বুকে ঠেসে ধরলো হালকা করে। সানা একহাতে শক্ত করে চেপে ধরলো আরজের শার্ট। যেন এই মুহূর্তে এটাই তার একমাত্র ভরসা। রমণীর চোখ জোড়া বন্ধ, শ্বাস কাঁপছে। আরজে নিচু স্বরে ফিসফিস করে,

–“ডোন্ট লুক ইফ ইউ কান্ট টেক ইট, সুইটহার্ট”
সানা মাথা নাড়লো। কিন্তু চোখ সরাতে পারলো না। আর না কোন বাক্য উচ্চারণ করতে পারলো। কারণ কিছু কিছু শোকের সামনে ভাষাও বড় অসহায় হয়ে যায়।
এদিকে সানা ও আরজের ঠিক পিছনেই এসে দাঁড়িয়েছে এসপি, একটু দূরে, এক কোণে। তার দু হাত বুকের উপর ভাঁজ করা, অথচ একটু আগের মুখের চিরচেনা সেই দুষ্টু হাসিটা এখন কোথাও নেই। চোখ দুটো স্থির হয়ে আছে সামনের দৃশ্যপটের উপর। সে তো এখানে এসেছিল সম্পূর্ণ অন্য একটা উদ্দেশ্য নিয়ে। ভেবেছিল, আরজের পিছু পিছু এসে একটু খোঁচাখুঁচি করবে। সানাকে সামনে রেখে দু’একটা কথা শুনিয়ে দিবে। যেহেতু সানা পাশে আছে, তাই আরজেও খুব বেশি কিছু করতে পারবে না। কিন্তু এখানে এসে সে যেন সম্পূর্ণ অন্য এক বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে গেছে। তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে একটা ভাঙা পরিবার, একটা অসমাপ্ত জীবন, একটা মৃত ভালোবাসা।
এসপির দৃষ্টি গিয়ে থামলো আয়ানের উপর। আজকে সানডে মানডে হাঁটু গেড়ে বসে আছে একটা কবরের সামনে। একটা মানুষ কতটা ভেঙে গেলে এমন হয়? আর তার দুই সন্তান ছোট ছোট হাতে সেই কবরের উপর ফুল সাজাচ্ছে। এই দৃশ্যটা কেন যেন এসপির বুকের ভেতরও অদ্ভুত ভার নামিয়ে দিল। সে ধীরে ধীরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। কিন্তু এখানে এসপি একা নয়। আরও একজন আছে যে এই মুহূর্তে সম্পূর্ণ বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে আর কেউ না,

“সারহাদ চৌধুরী”
সারহাদ যদিও এখানে এসেছে সানার জন্য। তার সমস্ত মনোযোগ থাকার কথা ছিল সানার দিকে। কিন্তু এই মুহূর্তে তার চোখ আটকে আছে সেই সাদা পাথরের ফলকের উপর যেখানে খোদাই করে লিখা,
“রিয়ানা জাওয়ান”
নামটা দেখেই কেন যেন বুকের ভেতর কেমন একটা চাপা ব্যথা ছড়িয়ে পড়লো তার। অদ্ভুত, খুব অদ্ভুত। কারণ রিয়ানাকে সে কখনো ভালোবাসেনি। না, কখনোই না। তার হৃদয়ের কোনো অংশ জুড়ে রিয়ানা ছিল না। কখনোই না। হ্যাঁ, রিয়ানা অবশ্যই ছিল অন্ধকারের এক মানবী। রক্তমাখা প্রতিশোধের বৃত্তে আবদ্ধ একটা নাম। কিন্তু তবুও সারহাদের প্রতিশোধের খেলায় কোথাও রিয়ানার নাম ছিল না। সে চাইলে খুব সহজেই মেয়েটাকে ব্যবহার করতে পারতো। সোফিয়ার বিরুদ্ধে অস্ত্র বানাতে পারতো, কিন্তু সে তা করেনি। বরঞ্চ এই বিষয়ে কোনরূপ কল্পনাও মনের কোণে জমা হতে দেয়নি। কেননা সারহাদের কাছে নারী কখনোই ব্যবহার করার বস্তু নয়। নারী তার কাছে বরাবরই সম্মানের। সেই সম্মান ও খারাপ লাগার জায়গা থেকেই হয়তো রিয়ানার জন্য তার মনের কোথাও একফোঁটা অনুভূতি জন্মেছিল। ওটার নাম কি দয়া?

হয়তো। কেননা রিয়ানার ভাগ্যটাও আর পাঁচটা সাধারণ মেয়ের মতো ছিল না। সারহাদ পাথর হতে পারে কিন্তু সেও রক্ত মাংসে গড়া মানুষ। যার কারণে এই মুহূর্তে রিয়ানার কবরটা সামনে দেখে তার বুকের ভেতরটা কেমন ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে।
সে কয়েক কদম পিছিয়ে গেল ধীরে ধীরে। শ্বাসগুলো এলোমেলো হয়ে আসছে। মনে হচ্ছে বাতাসটা ভারী হয়ে গেছে। নিজের অজান্তেই চোখের কার্নিশ বেয়ে একফোঁটা জল গড়িয়ে পড়লো। সারহাদ দ্রুত চোখ ফিরিয়ে নিতে চাইল, কিন্তু পারলো না। তার মাথার ভেতর বারবার ভেসে উঠছে ছয় বছর আগের সেই রাতটা, যেদিন রিয়ানা বারবার ফোন করে অনুরোধ করছিল। অন্যের জন্য কনে সেজেও বলেছিল,
–“একবার…শুধু একবার আমাকে নিজের করে নিন সারহাদ”

আর সে? সারহাদ যায়নি। যাওয়ার প্রয়োজনও বোধ করেনি। কারণ সে জানতো, যাকে সে ভালোবাসে না তাকে আশ্রয় দেওয়া মানে তাকে আরও বড় শাস্তি দেওয়া। কিন্তু আজ, আজ কেন মনে হচ্ছে সেই সিদ্ধান্তটাই একটা জীবনের সমাধি লিখে দিয়েছিল?
সারহাদ ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করলো। তার বুকের ভেতর কেমন একটা অদ্ভুত শূন্যতা জমছে। সে রিয়ানাকে ভালোবাসতো না, একরত্তিও না। তবুও…তবুও কেন আজ মনে হচ্ছে কোনো এক অসমাপ্ত আর্তনাদ তার বুকের ভেতর রক্তাক্ত হয়ে পড়ে আছে?
কেন মনে হচ্ছে মেয়েটা হয়তো শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করেছিল?
একবার, শুধু একবার, তার জন্য। সারহাদের গলা শুকিয়ে আসছে। সে আবার চোখ খুললো। নজরে আসে সামনে আয়ান এখনো কবরের সামনে বসে কথা বলে যাচ্ছে নিজের মৃত স্ত্রীর সাথে। আর সেই দৃশ্যটা যেন সারহাদের বুকের ভিতর আরও গভীর একটা ব্যথা ছড়িয়ে দিচ্ছে।
এদিকে আয়ান এখনো নিজের কল্পবাসিনীর সাথে কথা বলেই যাচ্ছে,
–“জানেন কল্পবাসিনী…আপনার পরে আমি আর কাউকে ভালোবাসিনি, চেষ্টাও করিনি। কারণ আমার হৃদয়ে আপনি এমনভাবে জায়গা নিয়েছেন, যেখানে দ্বিতীয় কারও প্রবেশ নিষিদ্ধ”
সে নিচু হয়ে কবরের উপর কপাল ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে আওড়ায়,

–“কল্পবাসিনী,
আপনি চলে যাওয়ার পর বুঝেছি, কিছু মানুষকে পাওয়া যায় না বাঁচার জন্য। তাদের শুধু ভালোবেসে মৃত্যুর জন্য পাঠানো হয়”
এদিকে আরজে নিঃশব্দে সানার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। সানা এখনো কাঁদছে। তার চোখের পানি থামার নাম নেই। সে আরজেকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। আরজেও সান্ত্বনার চিত্তে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল ধীরে ধীরে। সে নিচু হয়ে তার কানে ধীরে বললো,
–“শান্ত হও, ওয়াইফি..”
কিছুক্ষণ নীরবতায় কেটে যায়। তারপর সানা কাঁপা কণ্ঠে ফিসফিস করে বলে,
–“রানভীর…কিভাবে?

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৩০

কিভাবে এসব হলো?”
আরজের দৃষ্টি ধীরে ধীরে গিয়ে থামলো রিয়ানার কবরে। তার চোখেও জমে উঠলো অদ্ভুত অন্ধকার। সে একটা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে তারপর নিচু, ভারী কণ্ঠে শুধালো,
–“ছয় বছর আগে…..সবকিছু শুরু হয়েছিল একটা ভুল সিদ্ধান্ত থেকে

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৩০ (৩)